পর্ব- ১
চরচা ডেস্ক

স্পেনের ইউনিভার্সিটি অব নাভারা ল’ স্কুল-এর সেন্টার ফর গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড স্ট্রাটেজিক স্টাডিজের গবেষক নিকোলাস এসতেভেজ বাংলাদেশে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে আঞ্চলিক রাজনীতি নিয়ে এক গবেষণা নিবন্ধ লিখেছেন।
গবেষণা নিবন্ধের সারসংক্ষেপে নিকোলাস লিখেছেন, বাংলাদেশে শেখ হাসিনা সরকারের পতন এবং এর ফলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের অবনতি ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পর দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা কাঠামোয় সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য রূপান্তর।
নিকোলাস এসতেভেজের এই নিবন্ধে মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন বিশ্লেষণ করা হয়েছে। দেখানো হয়েছে, চীন-পাকিস্তান অক্ষের সাথে বাংলাদেশের সম্পৃক্ততা কেবল একটি সাময়িক বিষয় নয়, বরং একটি কাঠামোগত পুনর্বিন্যাস। এই নিবন্ধে বিশ্লেষণ করা হয়েছে, কীভাবে অভ্যন্তরীণ ‘মুক্তিকামী মূল্যবোধ’ এবং ঐতিহাসিক ভারতবিরোধী মনোভাব এই কৌশলগত বহুমুখীকরণের জন্য একটি প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে।
তাছাড়া নিবন্ধে দেখানো হয়েছে, কীভাবে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং নিরাপত্তা প্রকল্পে বিনিয়োগের মাধ্যমে এই নতুন বিন্যাসকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হচ্ছে। এতে দেখানো হয়েছে যে, বাংলাদেশ যদিও ‘ধারণাগত ভারতীয় আধিপত্যের’ ভারসাম্য করতে চায়, কিন্তু একই সঙ্গে চীনা প্রভাবের নতুন ও গভীরতর নির্ভরতার ঝুঁকি তৈরি করেছে।
উল্লেখ্য যে, এই গবেষণা নিবন্ধটি চলতি বছরের মার্চ মাসের শুরুর দিকেই প্রকাশিত হয়েছে। এ নিবন্ধের অধ্যায়ভিত্তিক কিছু অংশ হুবহু অনুবাদ করা হলো।
উদীয়মান অক্ষ
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক বহু বছর ধরে দ্বিপক্ষীয় স্বার্থে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে। তবুও ভারত দ্বারা বৈষম্যের শিকার হওয়া বা প্রভাবিত হওয়ার অনুভূতি ঢাকার অভ্যন্তরীণ আলোচনার একটি কেন্দ্রীয় বিষয় ছিল। এর প্রমাণ পাওয়া যায়, যখন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নয়াদিল্লির সাথে ঘনিষ্ঠ থাকা সত্ত্বেও নব্বইয়ের দশকে মেয়াদ শেষ হওয়ার পর মৈত্রী চুক্তিটি নবায়ন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। অন্যদিকে, পূর্ববর্তী নেতারা যদিও ইসলামাবাদের সাথে কূটনৈতিক যোগাযোগ স্থাপন করেছিলেন; মুহাম্মদ ইউনূস এই প্রবণতাকে আরও গভীরভাবে এগিয়ে নিয়েছেন, যা চীনের স্বার্থ দিয়ে আরও শক্তিশালী হয়েছে।

এর ফলে দশকজুড়ে নিম্নমুখী সম্পর্কের অবসান ঘটেছে। তবে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ঐতিহ্যগত সম্পর্ক থেকে একটি গভীর বিচ্যুতি দেখিয়েছে। কেবল কূটনৈতিক ক্ষেত্রেই নয়, সামরিক ক্ষেত্রেও নতুন যোগাযোগের পথ তৈরি হয়েছে এবং সামগ্রিক সম্পর্ক নতুন নতুন মাত্রা খুঁজতে শুরু করেছে। ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর নরেন্দ্র মোদির সাথে সহযোগিতার তথাকথিত স্বর্ণযুগ কার্যত ভেঙে পড়েছে। আওয়ামী লীগের নির্বাসনের ফলে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে তা বাংলাদেশের নিরপেক্ষ অবস্থানে পরিণত হয়নি; বরং দ্রুত ইসলামাবাদ থেকে বেইজিং পর্যন্ত বিস্তৃত একটি কৌশলগত অক্ষে পরিণত হয়েছে। এই নতুন জোট কেবল কূটনৈতিক যোগাযোগ ও বিনিময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং নিরাপত্তা ও সামরিক সম্পর্কের সমন্বয়ের পথও খুলে দিয়েছে। যা ঢাকার জন্য নয়াদিল্লির পূর্ববর্তী আধিপত্যের বিরুদ্ধে নিজস্ব ভারসাম্য ও স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনার পতন বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার পর তার শাসনকাল শেষ হয় দুই মাসব্যাপী তীব্র গণঅভ্যুত্থানের পর। যেখানে শত শত আন্দোলনকারীর মৃত্যু ঘটে। শিক্ষার্থী-নেতৃত্বাধীন সংগঠন ও আন্দোলন এমন আইনগুলোর সংস্কারের দাবিতে হয়েছিল, যেগুলো বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর থেকে মূলত অপরিবর্তিত রয়ে গেছে। তবে যুক্তি দেওয়া যেতে পারে যে, এটি ছিল কেবল একটি বাঁক বদলের মুহূর্ত, অস্থিরতার মূল কারণ নয়। কারণ, হাসিনা সরকার ওই আইন সংশোধনে সম্মত হয়েছিল। বরং দমন-পীড়নের ব্যাপক অভিযোগ, নিম্নমানের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ধারাবাহিক উপস্থিতি এবং সরকারের জবাবদিহির অভাব অসন্তোষকে আরও উসকে দেয়। যা শেষ পর্যন্ত হাসিনাকে ভারতে নির্বাসনে যেতে বাধ্য করে, যেখানে তিনি এখনো অবস্থান করছেন।
আন্দোলনের পর একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা হয় এবং মুহাম্মদ ইউনূস প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন। যদিও তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের কোনোটির সাথেই সম্পৃক্ত নন, তবুও তার নীতিগত অবস্থান পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে বিএনপির দৃষ্টিভঙ্গির সাথে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে হতে পারে। ইউনূসের বৈদেশিক নীতির অগ্রাধিকারগুলো আশঙ্কাজনকভাবে পাকিস্তানের দিকে শক্তিশালী হয়েছে। এটি গুরুত্বপূর্ণ যে তার এই দৃষ্টিভঙ্গি ভারতের ভূমিকাকে যেন অতিসরলীকরণ না করে। যে প্রতিবাদগুলো সরকার পরিবর্তনের দিকে নিয়ে গেছে, সেগুলোকে দুটি ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে।
প্রথমত, বাংলাদেশের যে বৃহত্তর সামাজিক-অর্থনৈতিক রূপান্তর ঘটেছিল, সেই প্রেক্ষাপট পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে। বিভিন্ন গবেষক উল্লেখ করেছেন যে, অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধারণত শিক্ষা ও তথ্যপ্রাপ্তির সুযোগ বাড়ায় এবং বিভিন্ন মতামতের বিকাশ উৎসাহিত করে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে, শিক্ষা বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষা এবং মধ্যবিত্তের আয়বৃদ্ধি গণতন্ত্রের উত্থানের সাথে সম্পর্কিত। প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও গণতন্ত্রে বিশ্বাস থাকলে তা অর্জন করা সম্ভব। সুতরাং, দেশের উন্নয়নের সাথে সাথে, ইনগলহার্ট ও ওয়েলজেলের Evolutionary Modernization Theory অনুযায়ী, তরুণ প্রজন্ম স্বাধীন মূল্যবোধের দিকে ঝুঁকে পড়ে এবং সিস্টেমের শক্তিশালী পরিবর্তনের আশা করে, যা আসলে বিবর্তনশীল গতিশীলতার প্রতিফলন।
তবুও বাংলাদেশের গতিশীলতা বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে এই বিষয়গুলোকে অবমূল্যায়ন করা হতে পারে। প্রবৃদ্ধি ও পরিবর্তনের এই সময়কাল আন্তর্জাতিক পর্যায়েও প্রতিফলিত হতে পারে। কারণ, তারা এমন একটি ব্যবস্থা থেকে দেশকে মুক্ত করতে চায়, যাকে তারা বৈষম্যমূলক আচরণ বা পুরনো বলে মনে করে। এটি ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুরের বিরুদ্ধে এবং ২০২৪ সালে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্দোলনের পর ক্রমবর্ধমান ভারতবিরোধী মনোভাবের ব্যাখ্যা দিতে পারে।
দ্বিতীয়ত, এটি একটি আঞ্চলিক চেতনার অংশ–যেখানে কর্তৃত্ববাদী, দমনমূলক এবং কথিত দুর্নীতিগ্রস্ত সরকার কাঠামোর বিরুদ্ধে জাগরণ দেখা যাচ্ছে। ‘জেন-জি প্রতিবাদ’ মূলত দক্ষিণ, পূর্ব এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াজুড়ে প্রতিবাদের একটি ব্যাপক ঢেউ সৃষ্টি করেছে। এই আন্দোলনগুলো শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, নেপাল, মঙ্গোলিয়াতে শাসক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়েছে এবং ইন্দোনেশিয়ায় সরকারি নীতির অবনমন ঘটিয়েছে। এই আন্দোলনগুলোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তাদের তথাকথিত ‘বিকেন্দ্রিভূত এবং নেতৃত্বহীন আন্দোলন’, যা সরকারি সেন্সরশিপ অমান্য করতে এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য ও তরুণদের সুযোগের অভাবের বিরুদ্ধে লড়াই করতে জোটবদ্ধ।

বাংলাদেশে সর্বশেষ অভ্যুত্থানের পর, ভারতবিরোধী মনোভাব তীব্র হয়েছে। ভারতের বাঁধ থেকে পানি ছেড়ে দেওয়ায় ২০২৪ সালের আগস্টের শেষে বাংলাদেশে বন্যা হয়েছে–এমন বিভিন্ন মিথ্যা অভিযোগের মাধ্যমে টানাপোড়েনে থাকা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক প্রভাবিত করেছে। এসব দাবি মিথ্যা এবং বিভ্রান্তিকর প্রমাণিত হয়েছে। ভারতে শেখ হাসিনার আশ্রয় নেওয়ার পর বাংলাদেশে হিন্দু সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন বেড়েছে। যার ফলে বাংলাদেশের ভেতরে হিন্দু মন্দিরগুলোর নিরাপত্তা বাড়ানোর প্রয়োজন দেখা দেয়। একই সাথে, পাকিস্তানের সঙ্গে একটি দৃশ্যমান সমঝোতা বিভিন্ন ক্ষেত্রে সুসংহত হচ্ছে, এমনকি এমন যুক্তিও দেওয়া হচ্ছে যে, তাদের নতুন জোটগুলোকে যেকোনো বাহ্যিক প্রভাব থেকে রক্ষা করা উচিত, যা পরোক্ষভাবে ভারতের দিকে ইঙ্গিত করে।
এই সহযোগিতা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আবারও শুরু হয়েছে। পাকিস্তান থেকে চাল আমদানি এবং ভিসা পদ্ধতি সহজতর করা হয়েছে। তাছাড়া এটি প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিসহ নতুন সামরিক সম্পর্ককে উৎসাহিত করেছে। ভারত অভিযোগ করছে যে, নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সহযোগিতা গভীরতর হয়েছে, অন্যদিকে ঢাকা ও ইসলামাবাদের ইসলামি দলগুলোর মধ্যে ঘনিষ্ঠতা বাড়ছে।
শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়ার মাধ্যমে ভারত পরোক্ষভাবে নিজেকে একটি অবস্থানভুক্ত করেছে। বাংলাদেশের সরকারি সংস্থা এবং জাতিসংঘ মানবাধিকার সংস্থার মতো অন্য আন্তর্জাতিক সংস্থার মতে, এমন প্রমাণ রয়েছে যা তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার এবং তখনকার কর্মকর্তাদের অভিযুক্ত করতে পারে: “...ওএইচসিএইচআর দেখতে পেয়েছে যে, এটি বিশ্বাস করার যুক্তিসঙ্গত কারণ রয়েছে যে, সাবেক সরকার এবং এর নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থা, আওয়ামী লীগের সাথে যুক্ত সহিংস উপাদানগুলোর সাথে মিলে পরিকল্পিতভাবে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনে লিপ্ত ছিল। এর মধ্যে রয়েছে শত শত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, হাজার হাজার আন্দোলনকারীর গুরুতর আহত হওয়ার মতো বলপ্রয়োগের ঘটনা, ব্যাপক নির্বিচার গ্রেপ্তার ও আটক এবং নির্যাতন ও অন্যান্য ধরনের বাজে আচরণ। বিশ্বাস করার যুক্তিসঙ্গত কারণ রয়েছে যে, এই লঙ্ঘনগুলো রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং ঊর্ধ্বতন নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সমন্বয় ও নির্দেশনায় পরিচালিত হয়েছিল, যা বিক্ষোভ ও ভিন্নমত দমনের একটি কৌশল ছিল...।”
এর মাধ্যমে ভারত সহজাতভাবেই ইউনূসের সরকারের সাথে যেকোনো সম্পর্ককে চাপের মুখে ফেলছে। তাছাড়া এটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক যে, ইউনূস নিজে হাসিনার মন্তব্যের ভিত্তিতে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিচার বিভাগীয় তদন্তের শিকার হয়েছিলেন। এখন মুহাম্মদ ইউনূস এবং ছাত্র আন্দোলনই হাসিনার বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন দাবি করছে যাতে তিনি বিক্ষোভ দমনে সহিংসতা এবং তার মেয়াদে দুর্নীতির অভিযোগের বিচারের মুখোমুখি হতে পারেন।
এই আলাপ সামনে আনা যেতে পারে যে, পাকিস্তানের সাথে পুনঃসংযোগ হয়তো কেবল ভারতকে হাসিনার অবস্থার বিষয়টি পুনর্বিবেচনা বা আলোচনার জন্য চাপ দেওয়ার একটি কৌশল হতে পারে, যার বিনিময়ে দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করা এবং পাকিস্তানের সাথে গভীরতর সম্পর্ক এড়ানো সম্ভব হবে। তবুও ভারতের সেই সম্ভাবনাকে অতিমূল্যায়ন করা উচিত নয়, বরং এই ক্রমবর্ধমান সম্পর্ক দেশ ও অঞ্চলের জন্য কী প্রভাব নিয়ে আসে তা খতিয়ে দেখা উচিত। এবং পরবর্তী সময়ে নিজস্ব নিরাপত্তার স্বার্থে একটি কৌশলগত পদ্ধতি নির্ধারণ করা উচিত।
চলবে…

স্পেনের ইউনিভার্সিটি অব নাভারা ল’ স্কুল-এর সেন্টার ফর গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড স্ট্রাটেজিক স্টাডিজের গবেষক নিকোলাস এসতেভেজ বাংলাদেশে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে আঞ্চলিক রাজনীতি নিয়ে এক গবেষণা নিবন্ধ লিখেছেন।
গবেষণা নিবন্ধের সারসংক্ষেপে নিকোলাস লিখেছেন, বাংলাদেশে শেখ হাসিনা সরকারের পতন এবং এর ফলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের অবনতি ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পর দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা কাঠামোয় সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য রূপান্তর।
নিকোলাস এসতেভেজের এই নিবন্ধে মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন বিশ্লেষণ করা হয়েছে। দেখানো হয়েছে, চীন-পাকিস্তান অক্ষের সাথে বাংলাদেশের সম্পৃক্ততা কেবল একটি সাময়িক বিষয় নয়, বরং একটি কাঠামোগত পুনর্বিন্যাস। এই নিবন্ধে বিশ্লেষণ করা হয়েছে, কীভাবে অভ্যন্তরীণ ‘মুক্তিকামী মূল্যবোধ’ এবং ঐতিহাসিক ভারতবিরোধী মনোভাব এই কৌশলগত বহুমুখীকরণের জন্য একটি প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে।
তাছাড়া নিবন্ধে দেখানো হয়েছে, কীভাবে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং নিরাপত্তা প্রকল্পে বিনিয়োগের মাধ্যমে এই নতুন বিন্যাসকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হচ্ছে। এতে দেখানো হয়েছে যে, বাংলাদেশ যদিও ‘ধারণাগত ভারতীয় আধিপত্যের’ ভারসাম্য করতে চায়, কিন্তু একই সঙ্গে চীনা প্রভাবের নতুন ও গভীরতর নির্ভরতার ঝুঁকি তৈরি করেছে।
উল্লেখ্য যে, এই গবেষণা নিবন্ধটি চলতি বছরের মার্চ মাসের শুরুর দিকেই প্রকাশিত হয়েছে। এ নিবন্ধের অধ্যায়ভিত্তিক কিছু অংশ হুবহু অনুবাদ করা হলো।
উদীয়মান অক্ষ
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক বহু বছর ধরে দ্বিপক্ষীয় স্বার্থে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে। তবুও ভারত দ্বারা বৈষম্যের শিকার হওয়া বা প্রভাবিত হওয়ার অনুভূতি ঢাকার অভ্যন্তরীণ আলোচনার একটি কেন্দ্রীয় বিষয় ছিল। এর প্রমাণ পাওয়া যায়, যখন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নয়াদিল্লির সাথে ঘনিষ্ঠ থাকা সত্ত্বেও নব্বইয়ের দশকে মেয়াদ শেষ হওয়ার পর মৈত্রী চুক্তিটি নবায়ন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। অন্যদিকে, পূর্ববর্তী নেতারা যদিও ইসলামাবাদের সাথে কূটনৈতিক যোগাযোগ স্থাপন করেছিলেন; মুহাম্মদ ইউনূস এই প্রবণতাকে আরও গভীরভাবে এগিয়ে নিয়েছেন, যা চীনের স্বার্থ দিয়ে আরও শক্তিশালী হয়েছে।

এর ফলে দশকজুড়ে নিম্নমুখী সম্পর্কের অবসান ঘটেছে। তবে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ঐতিহ্যগত সম্পর্ক থেকে একটি গভীর বিচ্যুতি দেখিয়েছে। কেবল কূটনৈতিক ক্ষেত্রেই নয়, সামরিক ক্ষেত্রেও নতুন যোগাযোগের পথ তৈরি হয়েছে এবং সামগ্রিক সম্পর্ক নতুন নতুন মাত্রা খুঁজতে শুরু করেছে। ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর নরেন্দ্র মোদির সাথে সহযোগিতার তথাকথিত স্বর্ণযুগ কার্যত ভেঙে পড়েছে। আওয়ামী লীগের নির্বাসনের ফলে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে তা বাংলাদেশের নিরপেক্ষ অবস্থানে পরিণত হয়নি; বরং দ্রুত ইসলামাবাদ থেকে বেইজিং পর্যন্ত বিস্তৃত একটি কৌশলগত অক্ষে পরিণত হয়েছে। এই নতুন জোট কেবল কূটনৈতিক যোগাযোগ ও বিনিময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং নিরাপত্তা ও সামরিক সম্পর্কের সমন্বয়ের পথও খুলে দিয়েছে। যা ঢাকার জন্য নয়াদিল্লির পূর্ববর্তী আধিপত্যের বিরুদ্ধে নিজস্ব ভারসাম্য ও স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনার পতন বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার পর তার শাসনকাল শেষ হয় দুই মাসব্যাপী তীব্র গণঅভ্যুত্থানের পর। যেখানে শত শত আন্দোলনকারীর মৃত্যু ঘটে। শিক্ষার্থী-নেতৃত্বাধীন সংগঠন ও আন্দোলন এমন আইনগুলোর সংস্কারের দাবিতে হয়েছিল, যেগুলো বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর থেকে মূলত অপরিবর্তিত রয়ে গেছে। তবে যুক্তি দেওয়া যেতে পারে যে, এটি ছিল কেবল একটি বাঁক বদলের মুহূর্ত, অস্থিরতার মূল কারণ নয়। কারণ, হাসিনা সরকার ওই আইন সংশোধনে সম্মত হয়েছিল। বরং দমন-পীড়নের ব্যাপক অভিযোগ, নিম্নমানের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ধারাবাহিক উপস্থিতি এবং সরকারের জবাবদিহির অভাব অসন্তোষকে আরও উসকে দেয়। যা শেষ পর্যন্ত হাসিনাকে ভারতে নির্বাসনে যেতে বাধ্য করে, যেখানে তিনি এখনো অবস্থান করছেন।
আন্দোলনের পর একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা হয় এবং মুহাম্মদ ইউনূস প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন। যদিও তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের কোনোটির সাথেই সম্পৃক্ত নন, তবুও তার নীতিগত অবস্থান পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে বিএনপির দৃষ্টিভঙ্গির সাথে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে হতে পারে। ইউনূসের বৈদেশিক নীতির অগ্রাধিকারগুলো আশঙ্কাজনকভাবে পাকিস্তানের দিকে শক্তিশালী হয়েছে। এটি গুরুত্বপূর্ণ যে তার এই দৃষ্টিভঙ্গি ভারতের ভূমিকাকে যেন অতিসরলীকরণ না করে। যে প্রতিবাদগুলো সরকার পরিবর্তনের দিকে নিয়ে গেছে, সেগুলোকে দুটি ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে।
প্রথমত, বাংলাদেশের যে বৃহত্তর সামাজিক-অর্থনৈতিক রূপান্তর ঘটেছিল, সেই প্রেক্ষাপট পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে। বিভিন্ন গবেষক উল্লেখ করেছেন যে, অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধারণত শিক্ষা ও তথ্যপ্রাপ্তির সুযোগ বাড়ায় এবং বিভিন্ন মতামতের বিকাশ উৎসাহিত করে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে, শিক্ষা বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষা এবং মধ্যবিত্তের আয়বৃদ্ধি গণতন্ত্রের উত্থানের সাথে সম্পর্কিত। প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও গণতন্ত্রে বিশ্বাস থাকলে তা অর্জন করা সম্ভব। সুতরাং, দেশের উন্নয়নের সাথে সাথে, ইনগলহার্ট ও ওয়েলজেলের Evolutionary Modernization Theory অনুযায়ী, তরুণ প্রজন্ম স্বাধীন মূল্যবোধের দিকে ঝুঁকে পড়ে এবং সিস্টেমের শক্তিশালী পরিবর্তনের আশা করে, যা আসলে বিবর্তনশীল গতিশীলতার প্রতিফলন।
তবুও বাংলাদেশের গতিশীলতা বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে এই বিষয়গুলোকে অবমূল্যায়ন করা হতে পারে। প্রবৃদ্ধি ও পরিবর্তনের এই সময়কাল আন্তর্জাতিক পর্যায়েও প্রতিফলিত হতে পারে। কারণ, তারা এমন একটি ব্যবস্থা থেকে দেশকে মুক্ত করতে চায়, যাকে তারা বৈষম্যমূলক আচরণ বা পুরনো বলে মনে করে। এটি ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুরের বিরুদ্ধে এবং ২০২৪ সালে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্দোলনের পর ক্রমবর্ধমান ভারতবিরোধী মনোভাবের ব্যাখ্যা দিতে পারে।
দ্বিতীয়ত, এটি একটি আঞ্চলিক চেতনার অংশ–যেখানে কর্তৃত্ববাদী, দমনমূলক এবং কথিত দুর্নীতিগ্রস্ত সরকার কাঠামোর বিরুদ্ধে জাগরণ দেখা যাচ্ছে। ‘জেন-জি প্রতিবাদ’ মূলত দক্ষিণ, পূর্ব এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াজুড়ে প্রতিবাদের একটি ব্যাপক ঢেউ সৃষ্টি করেছে। এই আন্দোলনগুলো শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, নেপাল, মঙ্গোলিয়াতে শাসক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়েছে এবং ইন্দোনেশিয়ায় সরকারি নীতির অবনমন ঘটিয়েছে। এই আন্দোলনগুলোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তাদের তথাকথিত ‘বিকেন্দ্রিভূত এবং নেতৃত্বহীন আন্দোলন’, যা সরকারি সেন্সরশিপ অমান্য করতে এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য ও তরুণদের সুযোগের অভাবের বিরুদ্ধে লড়াই করতে জোটবদ্ধ।

বাংলাদেশে সর্বশেষ অভ্যুত্থানের পর, ভারতবিরোধী মনোভাব তীব্র হয়েছে। ভারতের বাঁধ থেকে পানি ছেড়ে দেওয়ায় ২০২৪ সালের আগস্টের শেষে বাংলাদেশে বন্যা হয়েছে–এমন বিভিন্ন মিথ্যা অভিযোগের মাধ্যমে টানাপোড়েনে থাকা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক প্রভাবিত করেছে। এসব দাবি মিথ্যা এবং বিভ্রান্তিকর প্রমাণিত হয়েছে। ভারতে শেখ হাসিনার আশ্রয় নেওয়ার পর বাংলাদেশে হিন্দু সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন বেড়েছে। যার ফলে বাংলাদেশের ভেতরে হিন্দু মন্দিরগুলোর নিরাপত্তা বাড়ানোর প্রয়োজন দেখা দেয়। একই সাথে, পাকিস্তানের সঙ্গে একটি দৃশ্যমান সমঝোতা বিভিন্ন ক্ষেত্রে সুসংহত হচ্ছে, এমনকি এমন যুক্তিও দেওয়া হচ্ছে যে, তাদের নতুন জোটগুলোকে যেকোনো বাহ্যিক প্রভাব থেকে রক্ষা করা উচিত, যা পরোক্ষভাবে ভারতের দিকে ইঙ্গিত করে।
এই সহযোগিতা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আবারও শুরু হয়েছে। পাকিস্তান থেকে চাল আমদানি এবং ভিসা পদ্ধতি সহজতর করা হয়েছে। তাছাড়া এটি প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিসহ নতুন সামরিক সম্পর্ককে উৎসাহিত করেছে। ভারত অভিযোগ করছে যে, নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সহযোগিতা গভীরতর হয়েছে, অন্যদিকে ঢাকা ও ইসলামাবাদের ইসলামি দলগুলোর মধ্যে ঘনিষ্ঠতা বাড়ছে।
শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়ার মাধ্যমে ভারত পরোক্ষভাবে নিজেকে একটি অবস্থানভুক্ত করেছে। বাংলাদেশের সরকারি সংস্থা এবং জাতিসংঘ মানবাধিকার সংস্থার মতো অন্য আন্তর্জাতিক সংস্থার মতে, এমন প্রমাণ রয়েছে যা তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার এবং তখনকার কর্মকর্তাদের অভিযুক্ত করতে পারে: “...ওএইচসিএইচআর দেখতে পেয়েছে যে, এটি বিশ্বাস করার যুক্তিসঙ্গত কারণ রয়েছে যে, সাবেক সরকার এবং এর নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থা, আওয়ামী লীগের সাথে যুক্ত সহিংস উপাদানগুলোর সাথে মিলে পরিকল্পিতভাবে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনে লিপ্ত ছিল। এর মধ্যে রয়েছে শত শত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, হাজার হাজার আন্দোলনকারীর গুরুতর আহত হওয়ার মতো বলপ্রয়োগের ঘটনা, ব্যাপক নির্বিচার গ্রেপ্তার ও আটক এবং নির্যাতন ও অন্যান্য ধরনের বাজে আচরণ। বিশ্বাস করার যুক্তিসঙ্গত কারণ রয়েছে যে, এই লঙ্ঘনগুলো রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং ঊর্ধ্বতন নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সমন্বয় ও নির্দেশনায় পরিচালিত হয়েছিল, যা বিক্ষোভ ও ভিন্নমত দমনের একটি কৌশল ছিল...।”
এর মাধ্যমে ভারত সহজাতভাবেই ইউনূসের সরকারের সাথে যেকোনো সম্পর্ককে চাপের মুখে ফেলছে। তাছাড়া এটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক যে, ইউনূস নিজে হাসিনার মন্তব্যের ভিত্তিতে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিচার বিভাগীয় তদন্তের শিকার হয়েছিলেন। এখন মুহাম্মদ ইউনূস এবং ছাত্র আন্দোলনই হাসিনার বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন দাবি করছে যাতে তিনি বিক্ষোভ দমনে সহিংসতা এবং তার মেয়াদে দুর্নীতির অভিযোগের বিচারের মুখোমুখি হতে পারেন।
এই আলাপ সামনে আনা যেতে পারে যে, পাকিস্তানের সাথে পুনঃসংযোগ হয়তো কেবল ভারতকে হাসিনার অবস্থার বিষয়টি পুনর্বিবেচনা বা আলোচনার জন্য চাপ দেওয়ার একটি কৌশল হতে পারে, যার বিনিময়ে দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করা এবং পাকিস্তানের সাথে গভীরতর সম্পর্ক এড়ানো সম্ভব হবে। তবুও ভারতের সেই সম্ভাবনাকে অতিমূল্যায়ন করা উচিত নয়, বরং এই ক্রমবর্ধমান সম্পর্ক দেশ ও অঞ্চলের জন্য কী প্রভাব নিয়ে আসে তা খতিয়ে দেখা উচিত। এবং পরবর্তী সময়ে নিজস্ব নিরাপত্তার স্বার্থে একটি কৌশলগত পদ্ধতি নির্ধারণ করা উচিত।
চলবে…