তাসীন মল্লিক

নারীর ক্ষমতায়নকে এগিয়ে নিতে জাতীয় সংসদে সরাসরি নির্বাচিত প্রতিনিধিত্বের পাশাপাশি সংরক্ষিত আসন ব্যবস্থা রয়েছে। তবে দীর্ঘদিন ধরেই এই আসনগুলোর মনোনয়ন প্রক্রিয়া পুরোপুরি দলীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। ফলে ঘুরেফিরে প্রশ্ন উঠছেই, নারীর ক্ষমতায়ন বাস্তবে হচ্ছে নাকি দলের শীর্ষ নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হচ্ছে?
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নারী আসনগুলোর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে আগামী ১২ মে। আইন অনুযায়ী বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ৩৬টি, জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোট ১৩টি এবং ছয়জন স্বতন্ত্র প্রার্থীর জোট মনোনয়ন দেবে একটি আসনে। অর্থাৎ, ৫০টি সংরক্ষিত আসনের নারী প্রতিনিধি কারা হবেন, সেই সিদ্ধান্ত কার্যত নির্ভর করছে দল বা জোটের নেতৃত্বের ওপরই।
ইতোমধ্যে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট থেকে মনোনয়ন পেতে দলটির ১২ শতাধিক নারী সদস্য দলীয় মনোনয়ন সংগ্রহ করেছেন। অন্যদিকে আগামী ২০ এপ্রিল জোট মনোনীত সংরক্ষিত নারী আসনের প্রার্থীদের তালিকা প্রকাশ করবে জামায়াতে ইসলামী। ফলে আবারো আলোচনায় এসেছে–মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রে কী প্রাধান্য পাচ্ছে–যোগ্যতা নাকি দলীয় ও ব্যক্তিগত ইচ্ছা?
সব মিলিয়ে একটি দ্বৈত বাস্তবতা সামনে আসছে। একদিকে নারীর ক্ষমতায়নের ভাষ্য–সংখ্যা বাড়ানো, অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি। অন্যদিকে বাস্তব কাঠামো, যেখানে প্রার্থী নির্ধারণ, বণ্টন ও রাজনৈতিক অবস্থান–সবই নির্ধারিত হচ্ছে দলীয় নিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়ে। ফলে সংরক্ষিত নারী আসন ব্যবস্থা কার্যত নারীদের জন্য একটি ‘নির্বাচিত’ নয়, বরং ‘মনোনীত’ প্রতিনিধিত্বের কাঠামো তৈরি করেছে।
যদিও দলগুলোর পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, সংসদ নির্বাচনের মতোই পরিবার বা ব্যক্তিগত পছন্দ নয়, বরং যোগ্যতার ভিত্তিতেই সংরক্ষিত আসনে মনোনয়ন দেওয়া হবে। বিবেচনায় রাখা হবে আন্দোলন-সংগ্রামে প্রার্থীদের ভূমিকা। তৃণমূলের নারী কর্মীদের পরামর্শকে এ ক্ষেত্রে বিবেচনায় নেওয়া হবে। কেউ কেউ সম্মতির ভিত্তিতে মনোনয়ন দেওয়ার কথাও বলছে।
এ বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং দলটির প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের চরচাকে বলেন, “রাজনৈতিক, সামাজিক এবং শিক্ষাগত পারদর্শিতার ওপর ভিত্তি করেই মনোনয়ন দিচ্ছি আমরা। আইন পেশায় নিয়োজিতদের প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।”
আগেই বলা হয়েছে ত্রয়োদশ সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপি পাচ্ছে ৩৬টি আসন। দলটি সরকারে থাকায় বিপুলসংখ্যক নারী মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন। এসব মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের প্রক্রিয়া নিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশারফ হোসেন চরচাকে বলেন, “সাক্ষাৎকার পর্ব শুরু হয়েছে। যোগ্য নেতৃত্ব বাছাইয়ে আমরা সবগুলো ক্রাইটেরিয়া খুব স্বচ্ছতার সঙ্গে বিবেচনা করছি।”
যদিও বাস্তবতা বলছে, মনোনয়নের এই কাঠামোতে নারীদের সরাসরি রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার সুযোগ সীমিতই থেকে যাচ্ছে। কারণ, নির্বাচিত হওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ভোটারদের হাতে না থেকে দলীয় মনোনয়ন নির্ধারণকারী নেতৃত্বের হাতেই কেন্দ্রীভূত থাকছে।
‘তিন পা এগিয়ে চার পা পেছনে’
সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধির প্রশ্নে বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা, প্রস্তাব, আর পাল্টা প্রস্তাবের ঘূর্ণি চলছে। কাগজে-কলমে নানা উদ্যোগের কথা শোনা গেলেও বারবার তা থমকে যাচ্ছে। কখনো রাজনৈতিক আপত্তিতে, কখনো দলীয় স্বার্থে, আবার কখনো কাঠামোগত সীমাবদ্ধতায়। ফলে সামনের দিকে এগোনোর চেয়ে পিছিয়ে পড়ার প্রবণতাই বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
সরাসরি ভোটের ৩০০ সংসদীয় আসনের বিপরীতে ১৯৭৩ সালে প্রথম নির্বাচনে সংরক্ষিত আসন ছিল ১৫টি। পরে তা বাড়িয়ে দ্বিতীয়, তৃতীয়, পঞ্চম, ষষ্ঠ ও সপ্তম সংসদে ৩০টি করা হয়।

আইনের মেয়াদ না থাকায় চতুর্থ সংসদে সংরক্ষিত নারী আসন ছিল না। অষ্টম সংসদের শুরুতেও নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন ছিল না। ২০০৪ সালে সংবিধানের চতুর্দশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংরক্ষিত আসন বাড়িয়ে ৪৫ করা হয়। নবম সংসদে ২০১১ সালে করা সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে আরও পাঁচটি আসন বাড়ানো হয়।
২০১৮ সালে সপ্তদশ সংশোধনীতে এসব আসনের মেয়াদ আরও ২৫ বছর বহাল রাখা হয়। সে অনুযায়ী, ২০৪৩ সাল পর্যন্ত সংসদে ৫০টি আসন নারীদের জন্য সংরক্ষিত থাকার কথা।
জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হয়ে আসা ৩০০ সংসদ সদস্যের সংসদীয় এলাকা নির্ধারিত। তবে সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্যদের এলাকাভিত্তিক পরিধি বা দায়িত্বের বিষয়ে সংবিধানে আলাদা করে কিছু বলা নেই। ফলে ভোটারদের সঙ্গে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্যদের সরাসরি কোনো যোগাযোগ ঘটে না। এখানেই আসে ক্ষমতায়নের প্রশ্নটি, যা সামনে রেখে এই আসন সংরক্ষণ করা হয়েছিল।
এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশারফ হোসেন চরচাকে বলেন, “নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন কেবল সংখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। এটি হতে হবে কার্যকর অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাস্তবায়িত একটি প্রক্রিয়া। সংরক্ষিত আসন একটি অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি রাজনৈতিক পরিবেশ গড়ে তোলা, যেখানে নারীরা সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাধ্যমে সাধারণ আসন থেকেও নির্বাচিত হয়ে আসতে পারেন।”
যদিও ২০০৮ সালে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশের মাধ্যমে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে বেশ কিছু সংশোধন এনে রাজনৈতিক দলের সব পর্যায়ের কমিটিতে ৩৩ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্ব রাখার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়। ওই সময় নির্বাচনে অংশ নেওয়া দলগুলো প্রতিশ্রুতি করে, ২০২০ সালের মধ্যে দলের সব পর্যায়ের কমিটিতে অন্তত ৩৩ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্ব রাখবে তারা।
পরে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে এই অধ্যাদেশ সংসদে পাস করে। সে লক্ষ্য কোনো দলই অর্জন করতে পারেনি। বর্তমান ক্ষমতাসীন বিএনপিও এ লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ। এমনকি সর্বশেষ সংসদ নির্বাচনেও তাদের প্রার্থী তালিকায় মাত্র ১০ জন নারী স্থান পেয়েছিল। বিরোধী দলের আসনে বসা জামায়াতে ইসলামীর কোনো নারী প্রার্থীই ছিল না। ফলে নারীরা সরাসরি নির্বাচিত হয়ে সংসদে আসতে পারেন–এমন পরিবেশ গড়ার ভাষ্যটি শুনতে ভালো হলেও বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে।
এ ক্ষেত্রে বিএনপির বর্তমান অবস্থান প্রশ্নে খন্দকার মোশারফ হোসেন বলেন, “বিএনপি সবসময়ই নারীর মর্যাদা, অধিকার ও অংশগ্রহণের প্রশ্নে ইতিবাচক অবস্থানে থেকেছে। আমরা বিশ্বাস করি, সংরক্ষিত আসনের কাঠামোকে আরও স্বচ্ছ, গণতান্ত্রিক ও প্রতিনিধিত্বশীল করতে হবে, যাতে এটি কেবল দলীয় মনোনয়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে জনগণের প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটাতে পারে।”
২০২৪ সালে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের গঠন করা সংবিধান সংস্কার কমিশন ও নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন সংরক্ষিত নারী আসন বাড়িয়ে ১০০ করার পাশাপাশি সরাসরি ভোটের প্রস্তাব করেছিল। দুটি কমিশন কোথাও ঘূর্ণায়মান পদ্ধতিতে, কোথাও সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে সরাসরি ভোটের প্রস্তাব দেয়।
নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশন আরেক ধাপ এগিয়ে সংসদের আসন ৬০০ করে তার মধ্যে ৩০০টি নারীদের জন্য সংরক্ষিত রেখে সরাসরি নির্বাচনের সুপারিশ করে।
অর্থাৎ, নীতিগতভাবে নারীর সরাসরি প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার একটি স্পষ্ট ধারণা তৈরি হচ্ছিল। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন পথে মোড় নেয় রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থানের কারণে। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে অধিকাংশ দল এসব প্রস্তাবে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা আপত্তি জানায়। ফলে শেষ পর্যন্ত কমিশন সংরক্ষিত আসন ৫০ রেখেই পুরনো মনোনয়নভিত্তিক পদ্ধতি বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নেয়।

রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রায় সবাই কোনো না কোনোভাবে সরাসরি নির্বাচনের প্রস্তাবকে এড়িয়ে গেছে। কেউ সংখ্যানুপাতিক হারে নির্বাচন চেয়েছে। কেউ বিদ্যমান পদ্ধতিকে একটু বাড়িয়ে রাখতে চেয়েছে, আবার কেউ ধাপে ধাপে শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। কিন্তু নারীদের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হওয়ার পথটি স্পষ্ট ও বাধ্যতামূলক করার ব্যাপারে দৃঢ় ঐকমত্য গড়ে ওঠেনি।
পরবর্তী সময়ে কমিশন যে সমঝোতামূলক প্রস্তাব দেয়, তাতেও একই প্রবণতা দেখা যায়। সেখানে বলা হয়, বিদ্যমান ৫০টি সংরক্ষিত আসন বহাল রেখে রাজনৈতিক দলগুলোকে ধীরে ধীরে নারী প্রার্থী মনোনয়ন বাড়াতে হবে–প্রথমে সাত শতাংশ, পরে ১৫ শতাংশ, এরপর প্রতি নির্বাচনে পাঁচ শতাংশ করে বৃদ্ধি। লক্ষ্য হিসেবে ১০০ নারী প্রতিনিধিত্বের কথা বলা হলেও এটি তাৎক্ষণিক কোনো বাধ্যবাধকতা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি একটি অনিশ্চিত প্রতিশ্রুতি।
এই ধরনের ধাপে ধাপে বৃদ্ধির পরিকল্পনা বাস্তবে কার্যকর হয়নি–যেটিকে নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রধান শিরীন পারভীন হক আখ্যা দিয়েছেন ‘তিন পা এগিয়ে চার পা পেছনে’ হিসেবে। চরচাকে তিনি বলেন, “জাতীয় সংসদে নারীদের জন্য ১০০ আসনের সরাসরি নির্বাচনের প্রস্তাবও শেষ পর্যন্ত গ্রহণ করা হয়নি। আমরা এখন পিছিয়ে যাচ্ছি। আগে ছিল–তিন পা এগোতাম, দুই পা পিছাতাম। এখন চার পা এগিয়ে তিন পা পেছাই।”
সংরক্ষিত নারী আসনের বিধান ৫৩ বছর আগে শুরু হয়ে পর্যায়ক্রমে সংখ্যা বাড়লেও এত বছরে সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে নারীদের জন্য আলাদা কোনো স্থায়ী কাঠামো গড়ে ওঠেনি। সংবিধানের ৬৫(৩) অনুচ্ছেদে সংরক্ষিত আসনের মেয়াদ নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নির্ধারণ করা হলেও বারবার সংশোধনের মাধ্যমে সেটি বাড়ানো হয়েছে। অর্থাৎ, সমস্যার স্থায়ী সমাধান না করে অস্থায়ী ব্যবস্থা দীর্ঘায়িত করা হয়েছে। এতে নারীর প্রকৃত রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন না হয়ে বরং একটি নির্ভরশীল প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে।
রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এ সম্পর্কিত চর্চায় তেমন কোনো তফাৎ নজরে পড়ছে না। এমনকি গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জন্ম নেওয়া রাজনৈতিক দল এনসিপিও এ ক্ষেত্রে পুরনো দলগুলোর পথই অনুসরণ করছে। দলটি নির্বাচনে মাত্র দুজন নারী প্রার্থী দিয়েছিল। মোট ২ হাজার ১৭ প্রার্থীর নির্বাচনে ৮৫ জন নারীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করাটা অনেক সত্যই প্রকাশ্যে আনে। এটি একইসঙ্গে বলে দেয় যে, জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের নামে ক্ষমতায়নের পথ প্রশস্তের বদলে নারীকে নির্ভরশীল করে রাখারই একটা আড়ালের রাজনীতিও চলছে, যা তার ওপর পুরুষ নিয়ন্ত্রিত দলের কর্তৃত্ব জোরালো করতেই কাজে লাগে।

নারীর ক্ষমতায়নকে এগিয়ে নিতে জাতীয় সংসদে সরাসরি নির্বাচিত প্রতিনিধিত্বের পাশাপাশি সংরক্ষিত আসন ব্যবস্থা রয়েছে। তবে দীর্ঘদিন ধরেই এই আসনগুলোর মনোনয়ন প্রক্রিয়া পুরোপুরি দলীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। ফলে ঘুরেফিরে প্রশ্ন উঠছেই, নারীর ক্ষমতায়ন বাস্তবে হচ্ছে নাকি দলের শীর্ষ নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হচ্ছে?
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নারী আসনগুলোর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে আগামী ১২ মে। আইন অনুযায়ী বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ৩৬টি, জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোট ১৩টি এবং ছয়জন স্বতন্ত্র প্রার্থীর জোট মনোনয়ন দেবে একটি আসনে। অর্থাৎ, ৫০টি সংরক্ষিত আসনের নারী প্রতিনিধি কারা হবেন, সেই সিদ্ধান্ত কার্যত নির্ভর করছে দল বা জোটের নেতৃত্বের ওপরই।
ইতোমধ্যে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট থেকে মনোনয়ন পেতে দলটির ১২ শতাধিক নারী সদস্য দলীয় মনোনয়ন সংগ্রহ করেছেন। অন্যদিকে আগামী ২০ এপ্রিল জোট মনোনীত সংরক্ষিত নারী আসনের প্রার্থীদের তালিকা প্রকাশ করবে জামায়াতে ইসলামী। ফলে আবারো আলোচনায় এসেছে–মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রে কী প্রাধান্য পাচ্ছে–যোগ্যতা নাকি দলীয় ও ব্যক্তিগত ইচ্ছা?
সব মিলিয়ে একটি দ্বৈত বাস্তবতা সামনে আসছে। একদিকে নারীর ক্ষমতায়নের ভাষ্য–সংখ্যা বাড়ানো, অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি। অন্যদিকে বাস্তব কাঠামো, যেখানে প্রার্থী নির্ধারণ, বণ্টন ও রাজনৈতিক অবস্থান–সবই নির্ধারিত হচ্ছে দলীয় নিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়ে। ফলে সংরক্ষিত নারী আসন ব্যবস্থা কার্যত নারীদের জন্য একটি ‘নির্বাচিত’ নয়, বরং ‘মনোনীত’ প্রতিনিধিত্বের কাঠামো তৈরি করেছে।
যদিও দলগুলোর পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, সংসদ নির্বাচনের মতোই পরিবার বা ব্যক্তিগত পছন্দ নয়, বরং যোগ্যতার ভিত্তিতেই সংরক্ষিত আসনে মনোনয়ন দেওয়া হবে। বিবেচনায় রাখা হবে আন্দোলন-সংগ্রামে প্রার্থীদের ভূমিকা। তৃণমূলের নারী কর্মীদের পরামর্শকে এ ক্ষেত্রে বিবেচনায় নেওয়া হবে। কেউ কেউ সম্মতির ভিত্তিতে মনোনয়ন দেওয়ার কথাও বলছে।
এ বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং দলটির প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের চরচাকে বলেন, “রাজনৈতিক, সামাজিক এবং শিক্ষাগত পারদর্শিতার ওপর ভিত্তি করেই মনোনয়ন দিচ্ছি আমরা। আইন পেশায় নিয়োজিতদের প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।”
আগেই বলা হয়েছে ত্রয়োদশ সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপি পাচ্ছে ৩৬টি আসন। দলটি সরকারে থাকায় বিপুলসংখ্যক নারী মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন। এসব মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের প্রক্রিয়া নিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশারফ হোসেন চরচাকে বলেন, “সাক্ষাৎকার পর্ব শুরু হয়েছে। যোগ্য নেতৃত্ব বাছাইয়ে আমরা সবগুলো ক্রাইটেরিয়া খুব স্বচ্ছতার সঙ্গে বিবেচনা করছি।”
যদিও বাস্তবতা বলছে, মনোনয়নের এই কাঠামোতে নারীদের সরাসরি রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার সুযোগ সীমিতই থেকে যাচ্ছে। কারণ, নির্বাচিত হওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ভোটারদের হাতে না থেকে দলীয় মনোনয়ন নির্ধারণকারী নেতৃত্বের হাতেই কেন্দ্রীভূত থাকছে।
‘তিন পা এগিয়ে চার পা পেছনে’
সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধির প্রশ্নে বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা, প্রস্তাব, আর পাল্টা প্রস্তাবের ঘূর্ণি চলছে। কাগজে-কলমে নানা উদ্যোগের কথা শোনা গেলেও বারবার তা থমকে যাচ্ছে। কখনো রাজনৈতিক আপত্তিতে, কখনো দলীয় স্বার্থে, আবার কখনো কাঠামোগত সীমাবদ্ধতায়। ফলে সামনের দিকে এগোনোর চেয়ে পিছিয়ে পড়ার প্রবণতাই বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
সরাসরি ভোটের ৩০০ সংসদীয় আসনের বিপরীতে ১৯৭৩ সালে প্রথম নির্বাচনে সংরক্ষিত আসন ছিল ১৫টি। পরে তা বাড়িয়ে দ্বিতীয়, তৃতীয়, পঞ্চম, ষষ্ঠ ও সপ্তম সংসদে ৩০টি করা হয়।

আইনের মেয়াদ না থাকায় চতুর্থ সংসদে সংরক্ষিত নারী আসন ছিল না। অষ্টম সংসদের শুরুতেও নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন ছিল না। ২০০৪ সালে সংবিধানের চতুর্দশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংরক্ষিত আসন বাড়িয়ে ৪৫ করা হয়। নবম সংসদে ২০১১ সালে করা সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে আরও পাঁচটি আসন বাড়ানো হয়।
২০১৮ সালে সপ্তদশ সংশোধনীতে এসব আসনের মেয়াদ আরও ২৫ বছর বহাল রাখা হয়। সে অনুযায়ী, ২০৪৩ সাল পর্যন্ত সংসদে ৫০টি আসন নারীদের জন্য সংরক্ষিত থাকার কথা।
জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হয়ে আসা ৩০০ সংসদ সদস্যের সংসদীয় এলাকা নির্ধারিত। তবে সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্যদের এলাকাভিত্তিক পরিধি বা দায়িত্বের বিষয়ে সংবিধানে আলাদা করে কিছু বলা নেই। ফলে ভোটারদের সঙ্গে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্যদের সরাসরি কোনো যোগাযোগ ঘটে না। এখানেই আসে ক্ষমতায়নের প্রশ্নটি, যা সামনে রেখে এই আসন সংরক্ষণ করা হয়েছিল।
এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশারফ হোসেন চরচাকে বলেন, “নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন কেবল সংখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। এটি হতে হবে কার্যকর অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাস্তবায়িত একটি প্রক্রিয়া। সংরক্ষিত আসন একটি অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি রাজনৈতিক পরিবেশ গড়ে তোলা, যেখানে নারীরা সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাধ্যমে সাধারণ আসন থেকেও নির্বাচিত হয়ে আসতে পারেন।”
যদিও ২০০৮ সালে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশের মাধ্যমে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে বেশ কিছু সংশোধন এনে রাজনৈতিক দলের সব পর্যায়ের কমিটিতে ৩৩ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্ব রাখার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়। ওই সময় নির্বাচনে অংশ নেওয়া দলগুলো প্রতিশ্রুতি করে, ২০২০ সালের মধ্যে দলের সব পর্যায়ের কমিটিতে অন্তত ৩৩ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্ব রাখবে তারা।
পরে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে এই অধ্যাদেশ সংসদে পাস করে। সে লক্ষ্য কোনো দলই অর্জন করতে পারেনি। বর্তমান ক্ষমতাসীন বিএনপিও এ লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ। এমনকি সর্বশেষ সংসদ নির্বাচনেও তাদের প্রার্থী তালিকায় মাত্র ১০ জন নারী স্থান পেয়েছিল। বিরোধী দলের আসনে বসা জামায়াতে ইসলামীর কোনো নারী প্রার্থীই ছিল না। ফলে নারীরা সরাসরি নির্বাচিত হয়ে সংসদে আসতে পারেন–এমন পরিবেশ গড়ার ভাষ্যটি শুনতে ভালো হলেও বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে।
এ ক্ষেত্রে বিএনপির বর্তমান অবস্থান প্রশ্নে খন্দকার মোশারফ হোসেন বলেন, “বিএনপি সবসময়ই নারীর মর্যাদা, অধিকার ও অংশগ্রহণের প্রশ্নে ইতিবাচক অবস্থানে থেকেছে। আমরা বিশ্বাস করি, সংরক্ষিত আসনের কাঠামোকে আরও স্বচ্ছ, গণতান্ত্রিক ও প্রতিনিধিত্বশীল করতে হবে, যাতে এটি কেবল দলীয় মনোনয়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে জনগণের প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটাতে পারে।”
২০২৪ সালে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের গঠন করা সংবিধান সংস্কার কমিশন ও নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন সংরক্ষিত নারী আসন বাড়িয়ে ১০০ করার পাশাপাশি সরাসরি ভোটের প্রস্তাব করেছিল। দুটি কমিশন কোথাও ঘূর্ণায়মান পদ্ধতিতে, কোথাও সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে সরাসরি ভোটের প্রস্তাব দেয়।
নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশন আরেক ধাপ এগিয়ে সংসদের আসন ৬০০ করে তার মধ্যে ৩০০টি নারীদের জন্য সংরক্ষিত রেখে সরাসরি নির্বাচনের সুপারিশ করে।
অর্থাৎ, নীতিগতভাবে নারীর সরাসরি প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার একটি স্পষ্ট ধারণা তৈরি হচ্ছিল। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন পথে মোড় নেয় রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থানের কারণে। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে অধিকাংশ দল এসব প্রস্তাবে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা আপত্তি জানায়। ফলে শেষ পর্যন্ত কমিশন সংরক্ষিত আসন ৫০ রেখেই পুরনো মনোনয়নভিত্তিক পদ্ধতি বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নেয়।

রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রায় সবাই কোনো না কোনোভাবে সরাসরি নির্বাচনের প্রস্তাবকে এড়িয়ে গেছে। কেউ সংখ্যানুপাতিক হারে নির্বাচন চেয়েছে। কেউ বিদ্যমান পদ্ধতিকে একটু বাড়িয়ে রাখতে চেয়েছে, আবার কেউ ধাপে ধাপে শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। কিন্তু নারীদের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হওয়ার পথটি স্পষ্ট ও বাধ্যতামূলক করার ব্যাপারে দৃঢ় ঐকমত্য গড়ে ওঠেনি।
পরবর্তী সময়ে কমিশন যে সমঝোতামূলক প্রস্তাব দেয়, তাতেও একই প্রবণতা দেখা যায়। সেখানে বলা হয়, বিদ্যমান ৫০টি সংরক্ষিত আসন বহাল রেখে রাজনৈতিক দলগুলোকে ধীরে ধীরে নারী প্রার্থী মনোনয়ন বাড়াতে হবে–প্রথমে সাত শতাংশ, পরে ১৫ শতাংশ, এরপর প্রতি নির্বাচনে পাঁচ শতাংশ করে বৃদ্ধি। লক্ষ্য হিসেবে ১০০ নারী প্রতিনিধিত্বের কথা বলা হলেও এটি তাৎক্ষণিক কোনো বাধ্যবাধকতা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি একটি অনিশ্চিত প্রতিশ্রুতি।
এই ধরনের ধাপে ধাপে বৃদ্ধির পরিকল্পনা বাস্তবে কার্যকর হয়নি–যেটিকে নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রধান শিরীন পারভীন হক আখ্যা দিয়েছেন ‘তিন পা এগিয়ে চার পা পেছনে’ হিসেবে। চরচাকে তিনি বলেন, “জাতীয় সংসদে নারীদের জন্য ১০০ আসনের সরাসরি নির্বাচনের প্রস্তাবও শেষ পর্যন্ত গ্রহণ করা হয়নি। আমরা এখন পিছিয়ে যাচ্ছি। আগে ছিল–তিন পা এগোতাম, দুই পা পিছাতাম। এখন চার পা এগিয়ে তিন পা পেছাই।”
সংরক্ষিত নারী আসনের বিধান ৫৩ বছর আগে শুরু হয়ে পর্যায়ক্রমে সংখ্যা বাড়লেও এত বছরে সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে নারীদের জন্য আলাদা কোনো স্থায়ী কাঠামো গড়ে ওঠেনি। সংবিধানের ৬৫(৩) অনুচ্ছেদে সংরক্ষিত আসনের মেয়াদ নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নির্ধারণ করা হলেও বারবার সংশোধনের মাধ্যমে সেটি বাড়ানো হয়েছে। অর্থাৎ, সমস্যার স্থায়ী সমাধান না করে অস্থায়ী ব্যবস্থা দীর্ঘায়িত করা হয়েছে। এতে নারীর প্রকৃত রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন না হয়ে বরং একটি নির্ভরশীল প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে।
রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এ সম্পর্কিত চর্চায় তেমন কোনো তফাৎ নজরে পড়ছে না। এমনকি গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জন্ম নেওয়া রাজনৈতিক দল এনসিপিও এ ক্ষেত্রে পুরনো দলগুলোর পথই অনুসরণ করছে। দলটি নির্বাচনে মাত্র দুজন নারী প্রার্থী দিয়েছিল। মোট ২ হাজার ১৭ প্রার্থীর নির্বাচনে ৮৫ জন নারীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করাটা অনেক সত্যই প্রকাশ্যে আনে। এটি একইসঙ্গে বলে দেয় যে, জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের নামে ক্ষমতায়নের পথ প্রশস্তের বদলে নারীকে নির্ভরশীল করে রাখারই একটা আড়ালের রাজনীতিও চলছে, যা তার ওপর পুরুষ নিয়ন্ত্রিত দলের কর্তৃত্ব জোরালো করতেই কাজে লাগে।