Advertisement Banner

বেবি বুমাররা যেভাবে ইউরোপের অর্থনীতি ডুবিয়েছিল

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
বেবি বুমাররা যেভাবে ইউরোপের অর্থনীতি ডুবিয়েছিল
ইউরোপের শহর (বার্লিন)। ছবি: উইকিমিডিয়া কমনস

ইউরোপে বৈষম্যের রূপ একসময় ছিল মূলত ভৌগোলিক। ধনী পশ্চিম ইউরোপের বাসিন্দারা বিলাসবহুল বিএমডব্লিউ গাড়ি চড়ে বেড়াতেন, ছুটি কাটাতে যেতেন বিদেশে। অন্যদিকে, সাবেক কমিউনিস্ট শাসিত পূর্ব ইউরোপের গরিব মানুষ এক টুকরো রুটির জন্য লাইনে দাঁড়াতেন, ঘরের ভাঙা টেলিভিশন কিংবা ফ্রিজ নিজেই মেরামত করতেন। তবে গত তিন দশকে পূর্ব ইউরোপের অভাবনীয় অর্থনৈতিক উন্নতি সেই দৃশ্যপট বদলে দিয়েছে। রোমানিয়ার তৈরি কমদামি গাড়ি নিয়ে একসময়ের সেই বিখ্যাত কৌতুক—‘এসব গাড়ি কেবল পাহাড় থেকে নামার সময়ই জোরে চলে’—আজ শুধুই অতীত।

আজকের ইউরোপে বৈষম্য আর অঞ্চলভিত্তিক নয়; তা রূপ নিয়েছে পারিবারিক ও বংশগত স্তরে, যা এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ছে। আকাশচুম্বী আবাসন ব্যয়ের কারণে আজকের তরুণদের একটি বড় অংশ এখনো বাবা-মায়ের ঘরের এক কোণে পড়ে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। তারা ভাবেন, শৈশবে বাবা-মায়ের সাথে যে আরাম-আয়েশে তারা বড় হয়েছেন, নিজেরা কঠোর পরিশ্রম করেও কি কোনোদিন তা অর্জন করতে পারবেন?

অন্যদিকে, কর্মক্ষেত্রে থাকা ৩০ থেকে ৪০ বছর বয়সী যুবকেরা তাদের আয়ের সিংহভাগ চড়া ট্যাক্স বা কর হিসেবে তুলে দিচ্ছেন সরকারের হাতে। আর সেই করের টাকা দিয়ে চালানো হচ্ছে প্রবীণদের পেনশনের খরচ—যারা নিজেদের ভরা যৌবনেই চাকরি থেকে অবসরে চলে গিয়েছিলেন। বুড়ো মানুষদের দেখভাল আর পেনশনের পেছনেই এখন ইউরোপীয় ইউনিয়নের মোট জিডিপির চার ভাগের এক ভাগ খরচ হয়ে যাচ্ছে। দিন দিন বুড়ো হতে থাকা এই মহাদেশে এই ব্যয় কমার কোনো লক্ষণই নেই। আজকের একজন তরুণ ইউরোপীয়র কাছে তাই নিজেকে এক ‘সাজানো সামাজিক প্রতারণার’ শিকার ছাড়া আর কিছুই মনে হয় না।

পিরামিড স্কিমের শীর্ষে ‘বেবি বুমার’ প্রজন্ম

ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টের এক প্রতিবেদনে বলছে, ইউরোপের এই পুরো ব্যবস্থাটা যদি একটা পিরামিড স্কিম (আর্থিক প্রতারণার ফাঁদ) হয়, তবে এর আসল সুবিধাভোগী বা রাজা-বাদশারা হলেন ‘বেবি বুমার’ প্রজন্ম। ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী ২০ বছরে যে লাখ লাখ শিশুর জন্ম হয়েছিল, তারাই এই দলের অন্তর্ভুক্ত। এদের বর্তমান বয়স ৬০ থেকে ৮০ বছরের মধ্যে। তারা ইতিহাসে নিজেদের এমন এক শান্তিকামী প্রজন্ম হিসেবে তুলে ধরতে চান, যারা বহু বছর ইউরোপে কোনো বড় যুদ্ধ হতে দেননি। সমাজবিজ্ঞানীরা ১৯৬০-এর দশককে বাহবা দিতেই পারেন, কারণ এই বুমাররাই উগ্র দেশপ্রেম বা সংঘাত ভুলে সমাজকে মেতে তুলেছিলেন গান-বাজনা আর রক অ্যান্ড রোলে।

কিন্তু অর্থনীতিবিদরা তাদের ওপর একদমই খুশি নন। এই বুমাররা নিজেদের জন্য বড় বড় পেনশনের ব্যবস্থা করে গিয়েছিলেন এই ধারণার ওপর ভিত্তি করে যে, ভবিষ্যতে জনসংখ্যা সব সময় বাড়তেই থাকবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। আর এই পেনশনের বিপুল খরচ আজ পুরো ইউরোপকে অলস ও দুর্বল করে ফেলেছে। আজকের এই দাদা-দাদিরা তাদের ছোটবেলায় পেয়েছিলেন যুদ্ধ শেষে নতুন করে গড়ে ওঠা এক সম্ভাবনাময় ইউরোপ। অথচ তারা নিজেদের ছেলেমেয়েদের হাতে দিয়ে যাচ্ছেন এমন এক ভাঙাচোরা মহাদেশ, যা তাদের নিজেদের ত্রুটিপূর্ণ নীতির কারণেই আজ ক্ষয়ে যেতে বসেছে।

ইউরোপ। ছবি: সংগৃহীত
ইউরোপ। ছবি: সংগৃহীত

আবাসন সংকট: বুড়োদের ভাগ্য, তরুণদের দুর্ভাগ্য

এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মের সবকিছু কেড়ে নেওয়ার এই খেলায় সবচেয়ে বড় ক্ষেত্রটি হলো আবাসন খাত। আজকের প্রবীণরা একসময় প্রায় জলের দামে যেসব বাড়ি কিনেছিলেন, আজ সেগুলোর দাম কোটি কোটি টাকা। হ্যাঁ, এটা সত্যি যে তারা তখন চড়া সুদে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে বাড়িগুলো কিনেছিলেন—কিন্তু ঋণের কিস্তি শোধ হওয়ার পর যখন দিন দিন বাড়ির দাম বাড়তেই থাকল, আসল মুনাফাটা তারাই পেয়ে গেলেন। গত মাত্র ১০ বছরেই ইউরোপে বাড়ির দাম বেড়েছে প্রায় ২৫ শতাংশ। সেই সাথে ভাড়াও বাড়ছে মানুষের গড় আয় বৃদ্ধির চেয়ে অনেক দ্রুত গতিতে।

এর ফলে যা হয়েছে, এই বুড়োরা নিজেদের অনেক বড় আর্থিক দূরদর্শী ভাবতেই পারেন, কিন্তু আসলে তারা ছিলেন কেবলই ভাগ্যবান। আর তাদের এই ভাগ্যের কারণেই আজকের তরুণদের নিজেদের একটা বাড়ি কেনার পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। এখন অবস্থা এমন হয়েছে যে, মাঝবয়সে এসেও অনেক ইউরোপীয়কে বাধ্য হয়ে বাবা-মায়ের বাড়িতেই পড়ে থাকতে হচ্ছে। ১৯৮০-র দশকে যাদের জন্ম, তাদের চার ভাগের এক ভাগ মানুষই ৩০ বছর বয়সেও বাবা-মায়ের সাথে থাকছেন, যা তাদের আগের প্রজন্মের চেয়ে দেড় গুণ বেশি। একসময় নিজের একটা বাড়ি হওয়া মানেই ছিল নিজের পায়ে দাঁড়ানো। আর এখন? তরুণেরা ভাবেন, নিজের উপার্জনে বাড়ি কেনার চেয়ে বাবা-মায়ের সম্পত্তি পাওয়ার আশাই ভালো, যদি কোনোদিন তা কপালে জোটে!

ইউরোপ বনাম আমেরিকা: পেনশনের ভিন্ন অর্থনীতি

দামি দামি বাড়িতে প্রবীণরা থাকছেন—এমন চিত্র শুধু ইউরোপেই নয়, সব ধনী দেশেই দেখা যায়। কিন্তু ইউরোপের ‘জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত’ সব দায়িত্ব নেওয়ার যে কল্যাণকামী রাষ্ট্রীয় নিয়ম, তা প্রবীণদের এই বিশাল খরচটাকে পুরোপুরি তরুণদের কাঁধে চাপিয়ে দিয়েছে। আমেরিকা, জাপান বা দক্ষিণ কোরিয়ার মতো অন্য ধনী দেশগুলোতে ৬৫ বছরের বেশি বয়সীরা বেশিরভাগ টাকা পান অবসরের পর ছোটখাটো কাজ করে, কিংবা চাকরি জীবনে নিজেদের জমানো ব্যক্তিগত পেনশন ফান্ড থেকে। কিন্তু ইউরোপের মানুষজন খুব জলদি চাকরি ছেড়ে দেন, বাঁচেনও অনেক বছর, আর আশা করেন যে তাঁদের অবসরের পুরো খরচ চালাবে সরকার। যার অর্থ হলো—আজকের তরুণ করদাতারা।

আমেরিকায় মানুষের পেনশনের জমানো লাখ লাখ কোটি ডলার বিভিন্ন ফাণ্ডে জমা থাকে, যা দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও স্টার্ট-আপ বাড়াতে সাহায্য করে। আর এই পুঁজি পেয়েই আমেরিকার বড় বড় কোম্পানিগুলো আজ পুরো দুনিয়া কাঁপাচ্ছে। কিন্তু ইউরোপের গল্পটা উল্টো। এখানে আজকের তরুণদের ট্যাক্সের টাকায় মেটানো হচ্ছে আজকের বুড়োদের পেনশন। আশা করা হচ্ছে, ভবিষ্যতে যারা জন্মাবে, তারা বড় হয়ে তাদের বাবা-মায়ের পেনশনের দায়িত্ব নেবে। এমনকি এই খরচের একটি বড় অংশ সরকার ধার-দেনা করে চালাচ্ছে, যা ভবিষ্যতের সেই না-জন্মানো শিশুদেরই একদিন সুদে-আসলে শোধ করতে হবে। এর ফলে ইউরোপের কোম্পানিগুলোর নতুন ব্যবসা খোলার মতো কোনো উদ্বৃত্ত টাকা হাতে থাকছে না। আর এই কারণেই গুগল বা অ্যাপলের মতো বড় বড় প্রযুক্তি কোম্পানি ইউরোপে গড়ে উঠছে না। উল্টো সেখানে জমছে শুধু ঋণের পাহাড়, যা সরকারি তহবিলকে দিন দিন ফাঁকা করে দিচ্ছে।

ছবি: এআই
ছবি: এআই

জনমিতির বিপর্যয় ও উগ্র ডানপন্থার উত্থান

যতদিন দেশের অর্থনীতি বাড়ছিল আর জনসংখ্যাও বাড়ছিল, ততদিন এসবের কোনো কিছুই সমস্যা মনে হয়নি—যা এই বুমাররা তাদের নিজেদের তরুণ বয়সেও দেখেছেন। কিন্তু ইউরোপের জনসংখ্যা এখন আর বাড়ছে না, বরং কমতে শুরু করেছে। এর পেছনেও বড় কারণ হলো এই বুড়োরাই প্রথম কম সন্তান নেওয়ার চল শুরু করেছিলেন। ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৬০ সালের দিকেও পশ্চিম ইউরোপে একজন পেনশনভোগীর বিপরীতে পাঁচজনেরও বেশি কর্মক্ষম তরুণ ছিলেন। আর আজ একজন বুড়ো মানুষের খরচ টানতে আছেন মাত্র আড়াই জন কর্মী।

এর ফল যা হওয়ার তা-ই হচ্ছে; আজকের তরুণরা খুব ভালো করেই জানেন যে, একদিকে যেমন বাবা-মায়ের পেনশনের জন্য তাদের পকেট থেকে চড়া ট্যাক্স গুনতে হচ্ছে, তেমনি নিজেদের ভবিষ্যতের বুড়ো বয়সের জন্য আমেরিকানদের মতো আলাদা করে টাকা জমাতে হবে। এই অবস্থায় কর্মী ও প্রবীণ মানুষের অনুপাত ঠিক রাখার একমাত্র সহজ উপায় হলো বাইরে থেকে দলে দলে নতুন কর্মী বা অভিবাসী নিয়ে আসা। কিন্তু এই অভিবাসী আনার চেষ্টাই এখন ইউরোপের রাজনীতিকে বিষাক্ত করে তুলছে এবং উগ্র ডানপন্থী দলগুলোর হাত শক্ত করছে।

প্রবীণদের রাজত্ব, ভবিষ্যৎহীন গণতন্ত্র

বুড়ো মানুষরা কেন বেশি দিন বাঁচছেন, এই নিয়ে নিশ্চয়ই কেউ তাদের ওপর রাগ করতে পারে না। কিন্তু প্রবীণ বা বয়োবৃদ্ধ মানুষের সংখ্যা যে সমাজে বেশি, সেই সমাজ ভবিষ্যতের কথা না ভেবে শুধু আজকের তাৎক্ষণিক লাভ-ক্ষতির কথাই বেশি চিন্তা করে। যেমন, ফ্রান্সের গত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোটারদের গড় বয়সই ছিল ৫২ বছর। এর কারণ হলো, তরুণদের চেয়ে বুড়ো মানুষরাই বেশি কষ্ট করে ভোটকেন্দ্রে যান। আর এই ৫২ বছর বয়সটা কিন্তু অবসরে যাওয়ার বয়সের খুব কাছাকাছি।

তাই স্বাভাবিকভাবেই, দেশের রাজনৈতিক নেতারাও এই বুড়ো মানুষদের খুশি করাকেই নিজেদের প্রধান কাজ বানিয়ে নিয়েছেন। সরকারের হাতে যখন টাকা কম থাকে, তখন প্রবীণদের পেনশন বা বৃদ্ধাশ্রমের খরচ ঠিকই জোগাড় হয়ে যায়, অথচ স্কুল-কলেজের শিক্ষা বা নতুন নতুন গবেষণার বাজেট খুব সহজেই কেটে ফেলা হয়। ফ্রান্সের এক অর্থনীতিবিদ আফসোস করে বলেছেন, ‘গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ এখন এমন সব ভোটারদের হাতে ঠিক হচ্ছে, যাদের নিজেদেরই আসলে কোনো দীর্ঘ ভবিষ্যৎ নেই।’’

করোনা মহামারির পর হয়তো এই অবস্থাটা কিছুটা বদলাতে পারত। কারণ, তখন তরুণরা বছরের পর বছর ঘরের ভেতর বন্দি জীবন কাটিয়েছিলেন মূলত এই বুড়ো মানুষদের জীবন বাঁচানোর জন্য। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, তরুণদের সেই ত্যাগের প্রতিদান তারা আজও ফেরত পাননি (যদিও আজকাল ইউরোপীয় ইউনিয়নে তরুণদের সুবিধার কথা চিন্তা করার জন্য একজন বিশেষ কমিশনার রাখা হয়েছে)।

একটা সমাজ যখন বুড়ো হয়ে যায়, তখন সে নতুন কিছু করার সাহস হারিয়ে ফেলে এবং সবকিছু থেকে হাত গুটিয়ে নেয়। ইউরোপের আজকের তরুণদের অবস্থা দেখলে ঠিক তেমনই মনে হয়। চোখের সামনে প্রতিদিন শিশুদের একটা করে খেলার স্কুল বন্ধ হয়ে সেখানে যখন বুড়োদের থাকার বৃদ্ধাশ্রম গড়ে উঠছে, তখন তরুণ প্রজন্ম একরাশ হতাশা নিয়ে শুধু নির্বাক তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে।

সম্পর্কিত