Advertisement Banner

মব যে দেশে গুড জব!

মব যে দেশে গুড জব!
নিহত মোহাম্মদ সাঈদ সিলেটের সুনামগঞ্জের বাসিন্দা। প্রতিকী ছবি

মব আমাদের দেশে আর নতুন কোনো ঘটনা নয়। বরং যত দিন যাচ্ছে, এটি যেন নিত্যকার একটি ঘটনায় পরিণত হচ্ছে। সেই সাথে চলে আসছে ‘গুড মব’ বা ‘ব্যাড মব’-এর মতো ধারণাও। কখনো কখনো কোনো কোনো মবের প্রতিক্রিয়ায় আবার ‘গুড জব’ বলার প্রবণতাও ফুটে উঠছে দারুণভাবে!

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর এই দেশের শাসনভার নেয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এরপরই মবের মাত্রা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। মব এই দেশটায় আগেও ছিল। তবে ইন্টেরিমের সময় সেই মাত্রা এতটাই বাড়ে যে, তা মাত্রাছাড়া হয়ে যায় একসময়।

গত ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুতে এ-সংক্রান্ত একটি পরিসংখ্যানও সামনে আসে। জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পূর্ব সহিংসতার প্রতিবেদন’ প্রকাশ করে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)। তাতে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়। সংস্থাটি ১৫টি জাতীয় দৈনিক, দেড় শতাধিক স্থানীয় পত্রিকা এবং জেলা প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যের ভিত্তিতে এই প্রতিবেদন তৈরি করে। সেই প্রতিবেদন অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর ১৭ মাসে দেশে মব ভায়োলেন্সের অন্তত ৪১৩টি ঘটনায় ২৫৯ জন প্রাণ হারিয়েছে। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এই ভয়াবহ প্রবণতা বর্তমানে জননিরাপত্তার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে তখন মন্তব্যও করেছিল এইচআরএসএস।

তা এমন অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্যই নির্বাচনে আশা খুঁজতে চেয়েছিল সাধারণ মানুষ। ভেবেছিল, ভোটে নির্বাচিত সরকার হয়তো এসব অবৈধ কাজের ক্ষেত্রে আর নিষ্ক্রিয় থাকবে না। নির্বাচিত সরকার এসেই মুখে অন্তত আশ্বস্ত করেছিল যে, ‘কোনো মব কালচার থাকবে না’। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেই জাতীয় সংসদে এ কথা বলেছিলেন। অথচ, ধারাবাহিক ঘটনাক্রমে অনুভূত হচ্ছে, আগের অরাজনৈতিক সরকারের সময় যেভাবে মব’কে স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা হয়েছিল, ঠিক সেই পথেই যেন হাঁটছে জনতার ভোটে নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার।

চলুন, কিছু ঘটনা সম্পর্কে জানা যাক। এই যেমন, নতুন সরকার শপথ নেওয়ার পরপরই বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের পদত্যাগ নিয়ে বেশ হুলুস্থূল হলো। এই প্রবীণ অর্থনীতিবিদ তাকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে বলে গুঞ্জন শুনে নিজেই বাংলাদেশ ব্যাংকের ভবন ছেড়ে চলে গেলেন। তার এক উপদেষ্টাকেও বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের এক ধরনের সংঘবদ্ধ প্রতিবাদের মুখে পড়তে হলো এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ভবন ছাড়তে হলো। সংবাদমাধ্যমগুলোর অভিযোগ, এই ঘটনাটি ‘মব’। পরবর্তী সময়ে সরকারের পক্ষ থেকেও বলা হলো, ওই সব পদে পরিবর্তন করা হবে এবং হলোও। তাহলে কি বলা যাবে যে, পরিবর্তনের প্রেক্ষাপট তৈরিতে মব ব্যবহৃত হচ্ছে?

আবার গত মার্চ মাসে দেখা গেল রাজধানীতে শাহবাগ থানার সামনে ৭ মার্চের ভাষণ বাজাতেই, শেখ তাসনিম আফরোজ ইমিসহ বেশ কয়েকজন এমন পরিকল্পিত মব আক্রমণের শিকার হলেন। তাদের থানার ভেতরে মারধরও করা হলো। পুলিশ তখন কিছু করল না। যদিও সংবাদমাধ্যমের লাইভ টেলিকাস্টে সবই দেখা গেল, মবের মুখও। পরে মারধরের শিকার ব্যক্তিদের আবার পুলিশ ধরে ফেলে, সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলাও দিয়ে দেয়। কারণ, অবশ্যই মবের প্রেশার!

আবার গত রোজার মাসেই একজন শিক্ষার্থীকে সেহরির সময় পিটিয়ে থানা প্রাঙ্গণে ফেলে রাখা হয়েছিল। অপরাধ হিসেবে সেই ছাত্রলীগ বা আওয়ামী লীগের বহুচর্চিত ট্যাগ ব্যবহার করা হয়। ঠিক যেমনটা আওয়ামী লীগের বিগত সরকারের আমলে ছাত্রদল, বিএনপি বা জামায়াত-শিবিরের ট্যাগের যথেচ্ছ ব্যবহার হতো। পিটিয়ে ফেলে রাখা সেই পাভেলের বেশ কিছু ভিডিও ও স্থিরচিত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়েও পড়েছিল।

এর পর আরেক ঘটনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ‘সমকামী’ অভিযোগ তুলে কিছু মানুষকে পেটানোর অভিযোগও ওঠে। এক্ষেত্রে আরও অভিযোগ আছে যে, মারধরের শিকার ব্যক্তিরা এ নিয়ে থানা-পুলিশের কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত সহযোগিতাও নাকি পাননি। এর পর তো ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে পীর আবদুর রহমান ওরফে শামীম নামের ব্যক্তিকে হত্যাই করা হলো। কিছু মানুষ জড়ো হয়ে হামলা চালাল, আর মেরে ফেলল একটা মানুষকে। সাথে হলো ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট।

এভাবে ধারাবাহিকভাবে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোকে পাশাপাশি সাজালে দেখা যায়, বাংলাদেশ দিন দিন একটি পরিকল্পিত ‘মব’-এর দেশে পরিণত হচ্ছে যেন। এই দেশের বাস্তবতা মানলে মবের সর্বস্বীকৃত সংজ্ঞা নির্ধারণ করা একটু কঠিনই। তাত্ত্বিকভাবে দেখলে প্রকৃতিগতভাবে মব সাধারণত একটি বিশৃঙ্খল ও অনিয়ন্ত্রিত কর্মকাণ্ড। তবে বাংলাদেশে মব কেবলই অনিয়ন্ত্রিত রূপে থাকে না। এ দেশের মব প্রায় সময়ই পুরোপুরি নিয়ন্ত্রিত ও উদ্দেশ্যমূলক হয়ে থাকে। এই উদ্দেশ্যমূলক বা পুরোপুরি ‘পরিকল্পিত মব’-এর বাজারই এখন রমরমা!

গত বৃহস্পতিবার রাতে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীদের মধ্যে রাজধানীর শাহবাগে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ফাইল ছবি
গত বৃহস্পতিবার রাতে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীদের মধ্যে রাজধানীর শাহবাগে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ফাইল ছবি

সাম্প্রতিক একটি ঘটনা ‘মব’ শব্দটিকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে। গত বৃহস্পতিবার রাতে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীদের মধ্যে রাজধানীর শাহবাগে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এসএম সলিমুল্লাহ হলের শিক্ষার্থী ও ছাত্রশিবির কর্মী আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ ফেসবুকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার কন্যা জাইমা রহমানকে নিয়ে একটি পোস্ট শেয়ার করেন। পরে তিনি দাবি করেন, তার আইডি হ্যাক হয়েছিল। এ ঘটনায় তিনি শাহবাগ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে গেলে উত্তেজনার সূত্রপাত হয়। অভিযোগ উঠেছে, জিডি করতে যাওয়ার সময় ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা আবদুল্লাহ আল মাহমুদকে মারধর করে। পরে বিষয়টি জানাজানি হলে উভয় পক্ষের নেতা-কর্মীরা শাহবাগ থানার সামনে জড়ো হন। একপর্যায়ে থানার ভেতর ও বাইরে কয়েক দফা হাতাহাতি ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। ডাকসুর কয়েকজন নেতার উপস্থিতিতে ছাত্রশিবিরের কর্মীরা সেখানে গেলে দুই পক্ষের মধ্যে বাগ্‌বিতণ্ডা থেকে সংঘর্ষে রূপ নেয়। এতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পাদক মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদসহ আরো কয়েকজন মারধরের শিকার হন।

ছাত্রদল বলছে, ছাত্রশিবিরের ‘গুপ্ত রাজনীতি’ নাকি এসব ঝামেলার জন্য দায়ী। ওদিকে ছাত্রশিবির ও ডাকসুর নেতারা এবং তাদের সমর্থকেরা বলছেন, সেখানে ‘মব’ হয়েছে। ওই ঘটনার নানা ধরনের ভিডিও এরই মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। তাতে দেখা গেছে, একজনকে তাড়া করে ধরে অনেকে পেটাচ্ছে, কিল-ঘুঁষি মারছে। থানার ভেতরে ও বাইরে।

এদিকে যারা ওই ঘটনায় মার খেয়েছে, তারা সবাই বেশ পরিচিত মুখ, ডাকসুর নেতা। এই লেখার শুরুর দিকে মবের শিকার হয়ে জেলে চলে যাওয়া যে ইমির কথা বলা হয়েছে, তার ওপর যে মব আক্রমণ হয়েছিল, তাতে ওইসব মুখগুলোকেও আগ্রাসী ভূমিকায় দেখা গিয়েছিল। এখন এক পক্ষ বলছে, মবমাস্টারেরা নাকি মবের শিকার হয়েছে! এমন কথা বলে তারা বেশ উল্লাসও প্রকাশ করছে। মনে হচ্ছে, কেউ কেউ মনে করছে, মব হয়েছে বেশ হয়েছে!

মব হয়েছে, নাকি শুধু মারধর হয়েছে–সেটি বিশ্লেষণের বিষয়। দুই পক্ষেই যেহেতু পেশির প্রবল উপস্থিতি আছে, সুতরাং কে মব, আর কারা মবের শিকার হয়েছে, তা নির্ধারণ একটু জটিলই। কিন্তু এক্ষেত্রে যে বিষয় নিয়ে জটিলতা নেই, সেটি হলো–মব, তা যার বিপক্ষেই হোক, সেটি অপরাধ। এমনকি মব করার অভিযোগ থাকা ব্যক্তির বিরুদ্ধে মব করাও অপরাধ। একইসাথে সংঘবদ্ধ হয়ে প্রকাশ্যে কাউকে পেটানোও ফৌজদারি অপরাধ।

প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি

কিন্তু এমন একটি মত প্রতিষ্ঠার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে, যাতে মনে হচ্ছে, মবকারীর বিরুদ্ধে মব করলে যেন তা জায়েজ হয়ে যায়! ঠিক এভাবেই একসময় সরকারিভাবে এ দেশে মব’কে ‘প্রেশার গ্রুপ’ বানানোর চেষ্টা হয়েছিল। এর বিপরীত প্রতিক্রিয়াতেও যদি একই মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ দেখা যায়, তাহলে বলতে হয়–জাতিগতভাবে আমাদের এগোনোর পথ ধীরে ধীরে রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে।

অদ্ভুত বিষয় হলো, এখন আমরা শুনতে পাচ্ছি যে, থানার ভেতরে পেটানো খুবই বাজে কাজ হয়েছে। যারা বলছে, তাদের বিরুদ্ধেই আবার অভিযোগ আছে অন্যদের থানার ভেতরে পেটানোর। অন্যদিকে যারা একসময় মবের শিকার হয়েছে, তারা আবার অন্য কোনো পক্ষের ওপর মব বা তুমুল মারধরের ঘটনায় উল্লাস প্রকাশ করছে, হাসছে। তাহলে কি আমরা এমন অবস্থার দিকেই এগোচ্ছি, যেখানে পক্ষের হিসাবে অপরাধের সংজ্ঞা বদলে যাবে? ওরা করলে অন্যায়, আর নিজেরা করলে ন্যায়?

অথচ শুরু থেকেই বেআইনি কাজের সঠিক আইনি প্রতিকার করা গেলে এমন পরিস্থিতি দেখতে হতো না। কিন্তু সেটি গত দেড় বছরের বেশি সময়ে আর হয়নি। হওয়ার লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না খুব একটা। ফলে এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি হতে চলেছে, যা হয়তো অচিরেই একটি নতুন ধ্রুব সত্যের উদ্ভব করতে পারে। আর সেটি হয়তো এমনই হবে–ক্ষমতা যার, মব তার!

লেখক: বার্তা সম্পাদক, চরচা

সম্পর্কিত