চরচা ডেস্ক

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে টানা ১০০ দিনেরও বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধের পরও ইরান এখনো টিকে রয়েছে। এই হামলায় দেশটির শীর্ষ সামরিক ও রাজনৈতিক নেতারা নিহত হয়েছেন, স্থল, জল ও আকাশপথে সামরিক অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে গেছে এবং তেল রাজস্বের পথ বন্ধ হয়ে গেছে।
বছরের পর বছর ধরে চলা মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে আগে থেকেই দুর্বল হয়ে পড়া ইরানের অর্থনীতি এবার বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে।
যুদ্ধের কারণে তেহরানের আনুমানিক ক্ষতি হয়েছে ৩৪৭ বিলিয়ন ডলার এবং জাতিসংঘ পূর্বাভাস দিয়েছে যে চলতি বছরে দেশটির অর্থনীতি ৬ দশমিক ১ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে।
কিন্তু এত কিছুর পরও কেন ইরান পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়নি? কীভাবে তারা এখনো তাদের সৈন্যদের অস্ত্র জোগাচ্ছে এবং নাগরিকদের ভরণপোষণ করছে?
যেভাবে টিকে আছে ইরানের অর্থনীতি
অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হওয়া ইরানের জন্য নতুন কিছু নয়। এটি এমন এক দেশ যা কয়েক দশক ধরে যুদ্ধ, অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতা এবং নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে লড়াই করে আসছে। এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে দেশটি বেশ কিছু কৌশল রপ্ত করেছে, যা বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় সাহায্য করছে।
তেহরান এর আগেও দীর্ঘ সময় ধরে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি হ্রাসের পরিস্থিতি পার করেছে। বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে, যখন তিনি ইরানের সাথে আন্তর্জাতিক পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেন এবং কঠোর নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করেন।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর ইরান যখন হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়, তখন ধারণা করা হয়েছিল যে এই পদক্ষেপ অন্যান্য নির্ভরশীল দেশের পাশাপাশি তেহরানকেও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। কারণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার অর্থ হলো ক্রেতাদের কাছে ইরানের তেল রপ্তানি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়া। এই গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথটি দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জ্বালানি পরিবহন করা হয়। কিন্তু দুটি বিষয় ইরানকে এই সংকট থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছে।
প্রথমত, যুদ্ধ-অভিজ্ঞ ইরানি অর্থনীতিতে এই অবরোধের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে কিছুটা সময় লাগবে বলে মত বিশেষজ্ঞদের।
দ্বিতীয়ত, ইরানের কাছে বেশ ভালো অর্থনৈতিক ‘বাফার’ বা আপদকালীন মজুত ছিল। হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার আগেই ইরান তার ক্রেতা দেশগুলোতে তেল সরবরাহ বাড়িয়ে দিয়েছিল, যা দেশটিকে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব এনে দেয়। ব্লুমবার্গের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সংগৃহীত অর্থই ইরানি অর্থনীতিকে সচল রাখতে সাহায্য করেছে।
এছাড়াও, ইরান ব্যবসায়িক লেনদেনের জন্য ছদ্মবেশী বা শেল কোম্পানির একটি নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে এবং তেল রপ্তানির জন্য ব্যবহার করে ডার্ক ফ্লিট (শনাক্তকরণ এড়ানো জাহাজ)। এই জাহাজগুলো ট্র্যাকিং এড়াতে তাদের ট্রান্সপন্ডার (অবস্থান নির্দেশক যন্ত্র) বন্ধ করে দেয় এবং মাঝসমুদ্রে অন্য জাহাজে তেল স্থানান্তর করে।
পাশাপাশি, ইরান সরকার বেশ কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের (মূলত কৃষি, ইস্পাত ও পেট্রোকেমিক্যাল) আমদানির ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। একই সাথে, যেসব খাত হরমুজ প্রণালির ওপর খুব বেশি নির্ভরশীল নয়, সেসব খাতের রপ্তানি বৃদ্ধি করেছে। বিশেষ করে প্রতিবেশী পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সাথে সাম্প্রতিক বাণিজ্য এবং হরমুজ প্রণালি অবরোধের পর থেকে রেলপথের মাধ্যমে মধ্য চীনে পণ্য পরিবহনের হার বৃদ্ধি এর বড় প্রমাণ।
পণ্যের এই সরবরাহ বৃদ্ধি কেবল রেলপথেই সীমাবদ্ধ নয়। ইরান তার উত্তরের বন্দরগুলোর মাধ্যমেও বাণিজ্য সহজতর করেছে, যা একসময় মূলত রাশিয়ার সাথে বাণিজ্যের জন্য ব্যবহৃত হতো। এই সবকিছুই ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দেওয়া একটি নীতি অনুসরণ করে চলছে। তিনি ২০১৩ সালে ইরানের উৎপাদন ক্ষমতা জোরদার করতে এবং আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে অর্থনৈতিক প্রতিরোধ নীতি চালু করেছিলেন। উচ্চ শুল্কের কারণে বিদেশি পণ্য বাজার থেকে গায়েব হয়ে যাওয়ায় স্থানীয় উৎপাদকদের জন্য সুযোগ তৈরি হয়, যা পশ্চিমাদের থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জনে ইরানকে এক ধাপ এগিয়ে দেয়।
পাশাপাশি, ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনার জন্য তাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে বলে জানা গেছে।
যুদ্ধোত্তর ইরানের অর্থনীতি
তার মানে এই নয় যে ইরানের অর্থনীতি খুব ভালো অবস্থায় আছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরান বিপুল পরিমাণ অবকাঠামোগত ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। হামলায় আবাসিক ভবন, হাসপাতাল, স্কুল, গ্যাসক্ষেত্র, ইস্পাত কারখানা এবং আরও অনেক কিছু মাটির সাথে মিশে গেছে।
সম্পদ ধ্বংসের পাশাপাশি এই যুদ্ধে হাজার হাজার ইরানি নিহত হয়েছেন। বলা হচ্ছে, এই সহিংসতার মাত্রা ইরানের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ। এটিই দেশের অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ার এবং অর্থনীতি মন্থর হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ।
ইরান সরকারের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিলে সম্মত হওয়া যুদ্ধবিরতির আগে অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ ছিল ২৭০ বিলিয়ন ডলার। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালে ইরানের জিডিপি (জিডিপি) যেখানে প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলার, সেখানে এই ক্ষতির পরিমাণ প্রায় জিডিপির সমান।

আইএমএফ ধারণা করছে, চলতি বছর ইরানের অর্থনীতি ৬ দশমিক ১ শতাংশ সংকুচিত হবে, যা গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ পারফরম্যান্স। ইরানি রিয়াল ইতিহাসের সর্বনিম্ন স্তরে নেমে গেছে এবং মুদ্রাস্ফীতির হার ৭৭ শতাংশ ছাড়িয়েছে।
অর্থনীতি এতটাই ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে যে, নগদ টাকার অভাবে দেশের সাধারণ পরিবারগুলো ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে ঠেকেছে যে বই কেনা বা ট্যাক্সি ভাড়ার মতো জরুরি পণ্য ও সেবার জন্যও কিস্তি সুবিধা চালু করতে হয়েছে। পাশাপাশি তৈরি হয়েছে ব্যাপক বেকারত্ব।
বেকার ইরানিদের সংখ্যা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ইরানের শ্রম ও সামাজিক কল্যাণ বিষয়ক উপমন্ত্রী গোলাম হোসেন মোহাম্মদী ‘এতেমাদ’ পত্রিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানান, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা শুরু হওয়ার পর থেকে অন্তত ১০ লাখ মানুষ চাকরি হারিয়েছেন।
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) অনুমান করছে যে, ইরানের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫ শতাংশ আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যেতে পারে। ব্লুমবার্গের মতে, এই সংখ্যাটি প্রায় ৪১ লাখ মানুষের সমান।
যুদ্ধপূর্ব ইরানের অর্থনীতি
চলতি যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেও ইরানের অর্থনৈতিক অবস্থা মোটেও আদর্শ ছিল না।
ইরান আগে থেকেই উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির সাথে লড়াই করছিল। ডিম, আলু এবং চালের মতো মৌলিক খাদ্যপণ্যও অনেকের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গিয়েছিল। মানুষ বাধ্য হয়ে কম দামি বিকল্প বেছে নিচ্ছিল—যেমন মাংসের বদলে সয়াবিন খাওয়া।
২০১৬ সালে ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহালের পর থেকেই মূলত ইরানের রপ্তানি এবং বৈদেশিক মুদ্রার আগমন তীব্রভাবে হ্রাস পায়, যার ফলে মূল্যবৃদ্ধি ভয়াবহ রূপ নেয়। দেশে ডলারের সরবরাহ কমে যাওয়ায় রিয়ালের মান মারাত্মকভাবে পড়ে যায়, যা সব ধরনের আমদানিকে ব্যয়বহুল করে তোলে।
রিয়ালের এই পতনের কারণে দেশে গণবিক্ষোভ এবং পরবর্তীতে সরকারের কঠোর দমনপীড়ন দেখা দেয়, যাতে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার হস্তক্ষেপ করে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর পরিবর্তন, নির্ধারিত সময়ের আগে নগদ ভর্তুকি ও বেতন প্রদান এবং সরকারি কর্মচারীদের মজুরি বৃদ্ধির মতো পদক্ষেপ নেয়।
কিন্তু এত সব ব্যবস্থার পরও ইরানের সাধারণ মানুষ এই কঠিন পরিস্থিতি থেকে তেমন কোনো স্বস্তি পায়নি।
এই অর্থনৈতিক সংকট কি ইরানে সরকার পতন ঘটাতে পারে?
ব্লুমবার্গের মতে, দেশে গণঅসন্তোষ বা নাগরিক অস্থিরতার সম্ভাবনা প্রবল হলেও, সরকার পতনের ঝুঁকি খুবই কম। এর কারণ হলো, ‘ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস’ এখনো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ওপর শক্ত নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে। উপরন্তু, এই যুদ্ধ সাধারণ মানুষের মনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রতি ক্ষোভ বাড়িয়ে দিয়েছে, যা পরোক্ষভাবে ইরানি সরকারকে জনগণের সরাসরি অসন্তোষ থেকে রক্ষা করছে।
তবে সরকার পরিবর্তন হোক বা না হোক, ইরানি অর্থনীতির পুনর্গঠন সহজ হবে না। দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, একটি খসড়া চুক্তি অনুসারে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় ইরানে যে বিনিয়োগ তহবিল গঠিত হতে পারে, তার পরিমাণ হতে পারে প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলার।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে টানা ১০০ দিনেরও বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধের পরও ইরান এখনো টিকে রয়েছে। এই হামলায় দেশটির শীর্ষ সামরিক ও রাজনৈতিক নেতারা নিহত হয়েছেন, স্থল, জল ও আকাশপথে সামরিক অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে গেছে এবং তেল রাজস্বের পথ বন্ধ হয়ে গেছে।
বছরের পর বছর ধরে চলা মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে আগে থেকেই দুর্বল হয়ে পড়া ইরানের অর্থনীতি এবার বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে।
যুদ্ধের কারণে তেহরানের আনুমানিক ক্ষতি হয়েছে ৩৪৭ বিলিয়ন ডলার এবং জাতিসংঘ পূর্বাভাস দিয়েছে যে চলতি বছরে দেশটির অর্থনীতি ৬ দশমিক ১ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে।
কিন্তু এত কিছুর পরও কেন ইরান পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়নি? কীভাবে তারা এখনো তাদের সৈন্যদের অস্ত্র জোগাচ্ছে এবং নাগরিকদের ভরণপোষণ করছে?
যেভাবে টিকে আছে ইরানের অর্থনীতি
অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হওয়া ইরানের জন্য নতুন কিছু নয়। এটি এমন এক দেশ যা কয়েক দশক ধরে যুদ্ধ, অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতা এবং নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে লড়াই করে আসছে। এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে দেশটি বেশ কিছু কৌশল রপ্ত করেছে, যা বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় সাহায্য করছে।
তেহরান এর আগেও দীর্ঘ সময় ধরে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি হ্রাসের পরিস্থিতি পার করেছে। বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে, যখন তিনি ইরানের সাথে আন্তর্জাতিক পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেন এবং কঠোর নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করেন।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর ইরান যখন হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়, তখন ধারণা করা হয়েছিল যে এই পদক্ষেপ অন্যান্য নির্ভরশীল দেশের পাশাপাশি তেহরানকেও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। কারণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার অর্থ হলো ক্রেতাদের কাছে ইরানের তেল রপ্তানি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়া। এই গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথটি দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জ্বালানি পরিবহন করা হয়। কিন্তু দুটি বিষয় ইরানকে এই সংকট থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছে।
প্রথমত, যুদ্ধ-অভিজ্ঞ ইরানি অর্থনীতিতে এই অবরোধের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে কিছুটা সময় লাগবে বলে মত বিশেষজ্ঞদের।
দ্বিতীয়ত, ইরানের কাছে বেশ ভালো অর্থনৈতিক ‘বাফার’ বা আপদকালীন মজুত ছিল। হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার আগেই ইরান তার ক্রেতা দেশগুলোতে তেল সরবরাহ বাড়িয়ে দিয়েছিল, যা দেশটিকে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব এনে দেয়। ব্লুমবার্গের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সংগৃহীত অর্থই ইরানি অর্থনীতিকে সচল রাখতে সাহায্য করেছে।
এছাড়াও, ইরান ব্যবসায়িক লেনদেনের জন্য ছদ্মবেশী বা শেল কোম্পানির একটি নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে এবং তেল রপ্তানির জন্য ব্যবহার করে ডার্ক ফ্লিট (শনাক্তকরণ এড়ানো জাহাজ)। এই জাহাজগুলো ট্র্যাকিং এড়াতে তাদের ট্রান্সপন্ডার (অবস্থান নির্দেশক যন্ত্র) বন্ধ করে দেয় এবং মাঝসমুদ্রে অন্য জাহাজে তেল স্থানান্তর করে।
পাশাপাশি, ইরান সরকার বেশ কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের (মূলত কৃষি, ইস্পাত ও পেট্রোকেমিক্যাল) আমদানির ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। একই সাথে, যেসব খাত হরমুজ প্রণালির ওপর খুব বেশি নির্ভরশীল নয়, সেসব খাতের রপ্তানি বৃদ্ধি করেছে। বিশেষ করে প্রতিবেশী পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সাথে সাম্প্রতিক বাণিজ্য এবং হরমুজ প্রণালি অবরোধের পর থেকে রেলপথের মাধ্যমে মধ্য চীনে পণ্য পরিবহনের হার বৃদ্ধি এর বড় প্রমাণ।
পণ্যের এই সরবরাহ বৃদ্ধি কেবল রেলপথেই সীমাবদ্ধ নয়। ইরান তার উত্তরের বন্দরগুলোর মাধ্যমেও বাণিজ্য সহজতর করেছে, যা একসময় মূলত রাশিয়ার সাথে বাণিজ্যের জন্য ব্যবহৃত হতো। এই সবকিছুই ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দেওয়া একটি নীতি অনুসরণ করে চলছে। তিনি ২০১৩ সালে ইরানের উৎপাদন ক্ষমতা জোরদার করতে এবং আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে অর্থনৈতিক প্রতিরোধ নীতি চালু করেছিলেন। উচ্চ শুল্কের কারণে বিদেশি পণ্য বাজার থেকে গায়েব হয়ে যাওয়ায় স্থানীয় উৎপাদকদের জন্য সুযোগ তৈরি হয়, যা পশ্চিমাদের থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জনে ইরানকে এক ধাপ এগিয়ে দেয়।
পাশাপাশি, ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনার জন্য তাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে বলে জানা গেছে।
যুদ্ধোত্তর ইরানের অর্থনীতি
তার মানে এই নয় যে ইরানের অর্থনীতি খুব ভালো অবস্থায় আছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরান বিপুল পরিমাণ অবকাঠামোগত ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। হামলায় আবাসিক ভবন, হাসপাতাল, স্কুল, গ্যাসক্ষেত্র, ইস্পাত কারখানা এবং আরও অনেক কিছু মাটির সাথে মিশে গেছে।
সম্পদ ধ্বংসের পাশাপাশি এই যুদ্ধে হাজার হাজার ইরানি নিহত হয়েছেন। বলা হচ্ছে, এই সহিংসতার মাত্রা ইরানের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ। এটিই দেশের অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ার এবং অর্থনীতি মন্থর হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ।
ইরান সরকারের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিলে সম্মত হওয়া যুদ্ধবিরতির আগে অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ ছিল ২৭০ বিলিয়ন ডলার। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালে ইরানের জিডিপি (জিডিপি) যেখানে প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলার, সেখানে এই ক্ষতির পরিমাণ প্রায় জিডিপির সমান।

আইএমএফ ধারণা করছে, চলতি বছর ইরানের অর্থনীতি ৬ দশমিক ১ শতাংশ সংকুচিত হবে, যা গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ পারফরম্যান্স। ইরানি রিয়াল ইতিহাসের সর্বনিম্ন স্তরে নেমে গেছে এবং মুদ্রাস্ফীতির হার ৭৭ শতাংশ ছাড়িয়েছে।
অর্থনীতি এতটাই ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে যে, নগদ টাকার অভাবে দেশের সাধারণ পরিবারগুলো ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে ঠেকেছে যে বই কেনা বা ট্যাক্সি ভাড়ার মতো জরুরি পণ্য ও সেবার জন্যও কিস্তি সুবিধা চালু করতে হয়েছে। পাশাপাশি তৈরি হয়েছে ব্যাপক বেকারত্ব।
বেকার ইরানিদের সংখ্যা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ইরানের শ্রম ও সামাজিক কল্যাণ বিষয়ক উপমন্ত্রী গোলাম হোসেন মোহাম্মদী ‘এতেমাদ’ পত্রিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানান, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা শুরু হওয়ার পর থেকে অন্তত ১০ লাখ মানুষ চাকরি হারিয়েছেন।
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) অনুমান করছে যে, ইরানের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫ শতাংশ আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যেতে পারে। ব্লুমবার্গের মতে, এই সংখ্যাটি প্রায় ৪১ লাখ মানুষের সমান।
যুদ্ধপূর্ব ইরানের অর্থনীতি
চলতি যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেও ইরানের অর্থনৈতিক অবস্থা মোটেও আদর্শ ছিল না।
ইরান আগে থেকেই উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির সাথে লড়াই করছিল। ডিম, আলু এবং চালের মতো মৌলিক খাদ্যপণ্যও অনেকের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গিয়েছিল। মানুষ বাধ্য হয়ে কম দামি বিকল্প বেছে নিচ্ছিল—যেমন মাংসের বদলে সয়াবিন খাওয়া।
২০১৬ সালে ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহালের পর থেকেই মূলত ইরানের রপ্তানি এবং বৈদেশিক মুদ্রার আগমন তীব্রভাবে হ্রাস পায়, যার ফলে মূল্যবৃদ্ধি ভয়াবহ রূপ নেয়। দেশে ডলারের সরবরাহ কমে যাওয়ায় রিয়ালের মান মারাত্মকভাবে পড়ে যায়, যা সব ধরনের আমদানিকে ব্যয়বহুল করে তোলে।
রিয়ালের এই পতনের কারণে দেশে গণবিক্ষোভ এবং পরবর্তীতে সরকারের কঠোর দমনপীড়ন দেখা দেয়, যাতে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার হস্তক্ষেপ করে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর পরিবর্তন, নির্ধারিত সময়ের আগে নগদ ভর্তুকি ও বেতন প্রদান এবং সরকারি কর্মচারীদের মজুরি বৃদ্ধির মতো পদক্ষেপ নেয়।
কিন্তু এত সব ব্যবস্থার পরও ইরানের সাধারণ মানুষ এই কঠিন পরিস্থিতি থেকে তেমন কোনো স্বস্তি পায়নি।
এই অর্থনৈতিক সংকট কি ইরানে সরকার পতন ঘটাতে পারে?
ব্লুমবার্গের মতে, দেশে গণঅসন্তোষ বা নাগরিক অস্থিরতার সম্ভাবনা প্রবল হলেও, সরকার পতনের ঝুঁকি খুবই কম। এর কারণ হলো, ‘ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস’ এখনো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ওপর শক্ত নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে। উপরন্তু, এই যুদ্ধ সাধারণ মানুষের মনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রতি ক্ষোভ বাড়িয়ে দিয়েছে, যা পরোক্ষভাবে ইরানি সরকারকে জনগণের সরাসরি অসন্তোষ থেকে রক্ষা করছে।
তবে সরকার পরিবর্তন হোক বা না হোক, ইরানি অর্থনীতির পুনর্গঠন সহজ হবে না। দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, একটি খসড়া চুক্তি অনুসারে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় ইরানে যে বিনিয়োগ তহবিল গঠিত হতে পারে, তার পরিমাণ হতে পারে প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলার।