ফজলে রাব্বি

দেশীয় গ্যাসের মজুত ফুরিয়ে আসছে। বাড়ছে ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানির চাপ। শিল্প, বিদ্যুৎ ও নগর জীবনের জ্বালানি নিরাপত্তা ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। এমন প্রেক্ষাপটে দীর্ঘ ২৩ মাসের বিরতির পর আবারও বঙ্গোপসাগরের বিশাল সমুদ্রাঞ্চল খুলে দিচ্ছে বাংলাদেশ।
রাষ্ট্রীয় সংস্থা পেট্রোবাংলা ২৬টি অফশোর ব্লকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করতে যাচ্ছে। আগামীকাল রোববার দেশি-বিদেশি সংবাদমাধ্যমে এই দরপত্র বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হবে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মো. সাইফুল ইসলাম চরচাকে বলেন, “অফশোর অনুসন্ধানের আন্তর্জাতিক দরপত্র বিজ্ঞপ্তি আগামী ২৪ মে প্রকাশিত হবে। আমরা সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছি। এবারের উৎপাদন বণ্টন চুক্তিতে (পিএসসি) গ্যাসের ট্যারিফ উন্নত করা হয়েছে, পাইপলাইন নির্মাণব্যয় ও ডেটা মূল্য কমানো হয়েছে এবং শ্রমিক কল্যাণ তহবিলের বিধান সংশোধন করা হয়েছে।”
এবারের বিডিং রাউন্ডে বঙ্গোপসাগরের গভীর ও অগভীর মিলিয়ে মোট ২৬টি ব্লক আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর জন্য উন্মুক্ত করা হচ্ছে। দরপত্র জমার শেষ সময় আগামী ৩০ নভেম্বর।
নতুন বড় কোনো গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত না হলে আগামী এক দশকের মধ্যেই দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কার্যত শূন্যের কোঠায় নেমে আসতে পারে। তখন পুরো ব্যবস্থাকে আরও বেশি আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভর করতে হবে, যা ইতোমধ্যে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর তীব্র চাপ তৈরি করছে।
গ্যাসের মজুত ‘দ্রুত ফুরিয়ে আসছে’
জাতীয় সংসদে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানিয়েছেন, দেশের মোট উত্তোলনযোগ্য গ্যাস মজুত ২৯ দশমিক ৭৪ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ)। এর মধ্যে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত উত্তোলিত হয়েছে ২২ দশমিক ১১ টিসিএফ। অবশিষ্ট রয়েছে মাত্র ৭ দশমিক ৬৩ টিসিএফ গ্যাস।
বর্তমানে দৈনিক প্রায় ১৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) হারে গ্যাস সরবরাহ অব্যাহত থাকলে এই মজুত টিকবে আনুমানিক আর ১২ বছর। নতুন বড় কোনো গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত না হলে আগামী এক দশকের মধ্যেই দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কার্যত শূন্যের কোঠায় নেমে আসতে পারে। তখন পুরো ব্যবস্থাকে আরও বেশি আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভর করতে হবে, যা ইতোমধ্যে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর তীব্র চাপ তৈরি করছে।
এই বাস্তবতায় সমুদ্র অনুসন্ধান এখন আর শুধু অর্থনৈতিক কৌশল নয়, বরং জ্বালানি নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।
২০২৪ সালের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা
গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ২০২৪ সালের মার্চে ২৪টি অফশোর ব্লকের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করেছিল পেট্রোবাংলা। এক্সনমোবিল, শেভরন, সিএনওওসি-সহ ১৫টির বেশি আন্তর্জাতিক কোম্পানি সিসমিক ডেটা কিনলেও শেষ পর্যন্ত কেউ দরপত্র জমা দেয়নি। ছয় মাসের সময়সীমা আরও তিন মাস বাড়িয়েও সাড়া মেলেনি। মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অফশোরের এ দরপত্রের সময়সীমা শেষ হয়।
পরে পেট্রোবাংলার তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে উঠে আসে, আগের পিএসসির কয়েকটি শর্ত আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর কাছে অনাকর্ষণীয় ছিল। বিশেষ করে গ্যাসের মূল্য কম হওয়া, শ্রমিক কল্যাণ তহবিলে উচ্চ হারে মুনাফা ভাগ এবং পাইপলাইন নির্মাণব্যয়ের অস্পষ্ট কাঠামো বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করেছিল।

ওই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই প্রণয়ন করা হয়েছে নতুন ‘বাংলাদেশ অফশোর মডেল প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট (পিএসসি) ২০২৬’। তবে পিএসসির সঙ্গে যুক্ত পেট্রোবাংলার একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকতা নাম না প্রকাশ করে চরচাকে বলেন, “মূলত অরাজনৈতিক সরকারের সময় আস্থাহীনতার কারণেই কোনো বিদেশি কোম্পানি বিড জমা দেয়নি বলে বিভিন্ন কোম্পানির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল।”
তারপরও নতুন করে পিএসসি সংশোধন, শ্রমিক কল্যাণ তহবিলে মুনাফার অংশ কমানোসহ কয়েকটি পরিবর্তনের আদৌ দরকার ছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের।
কী কী বদল এল
গত ৭ মে অর্থনৈতিক বিষয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি (সিসিইএ) নতুন পিএসসির খসড়ায় নীতিগত অনুমোদন দেয়। সংশোধিত চুক্তিতে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের জন্য একাধিক শর্ত শিথিল করা হয়েছে।
গভীর সমুদ্রে গ্যাসের মূল্য ব্রেন্ট ক্রুডের ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১১ শতাংশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতি পাঁচ বছর পর মূল্য পুনঃনির্ধারণের সুযোগ রাখা হয়েছে। শ্রমিক কল্যাণ তহবিলে মুনাফার অংশ ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ দশমিক ৫ শতাংশ করা হয়েছে। অনুসন্ধান পর্যায়ে বাধ্যতামূলক ব্লক ত্যাগের হার ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশে নামানো হয়েছে।
এ ছাড়া পাইপলাইন ট্যারিফ আগের মতো পূর্বনির্ধারিত না রেখে এখন বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হবে। সুদহারের রেফারেন্সও সিকিউরড ওভারনাইট ফিন্যান্সিং রেট (সোফর)-এ নেওয়া হয়েছে।
পেট্রোবাংলার একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “বিদেশি কোম্পানিগুলো আগের পিএসসিতে যেসব বিষয়ে আপত্তি তুলেছিল, সেগুলো আমরা সংশোধন করেছি। গ্যাসের মূল্য, পাইপলাইন ব্যয় ও কল্যাণ তহবিলের বিষয়গুলো এবার অনেক বেশি বিনিয়োগবান্ধব করা হয়েছে।”
সামনে কী
পেট্রোবাংলার পরিকল্পনা অনুযায়ী, ১ জুন থেকে প্রমোশনাল ডেটা প্যাকেজ বিক্রি শুরু হবে। জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত বিভিন্ন দেশে রোড শো, দূতাবাসভিত্তিক প্রচার এবং আন্তর্জাতিক প্রেস ব্রিফিং আয়োজন করা হবে। এরপর ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত বিড গ্রহণ করা হবে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের মধ্যেই মূল্যায়ন শেষে চুক্তি সম্পাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পেট্রোবাংলা আশা করছে পিএসসিতে যেসব সংশোধন আনা হয়েছে, তাতে বিদেশি কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে ভালো ফলাফল মিলবে।
জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, দরপত্র বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর প্রমোশনাল প্যাকেজ বিক্রি শুরু হবে। বিদেশি কোম্পানিগুলো সময়সীমার মধ্যে পেট্রোবাংলার সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে জরিপের তথ্য-উপাত্ত কিনতে পারবে।
তবু রয়ে যাচ্ছে অনিশ্চয়তা
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, অফশোর অনুসন্ধান শুরু থেকে বাণিজ্যিকভাবে গ্যাস উৎপাদনে যেতে সাধারণত সাত থেকে ১০ বছর সময় লাগে। সে হিসেবে এখন অনুসন্ধানে সফল হলেও নতুন গ্যাস জাতীয় গ্রিডে পৌঁছানোর আগেই দেশের বর্তমান মজুতের বড় অংশ শেষ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. বদরুল ইমামও কস্ট রিকভারি-ভিত্তিক পুরনো মডেল নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার মতে, অতীতে আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলো অনুসন্ধান ব্যয় স্ফীত করে দেখিয়ে অতিরিক্ত অর্থ তুলে নিয়েছে। সাঙ্গু গ্যাসক্ষেত্র পরিচালনায় বিদেশি কোম্পানিগুলোর বিপুল মুনাফার উদাহরণও তিনি তুলে ধরেন।
নতুন পিএসসি আন্তর্জাতিক কোম্পানিকে আকৃষ্ট করতে পারলেও আবিষ্কার থেকে উৎপাদন পর্যন্ত দীর্ঘ সময়ের ব্যবধান কীভাবে সামাল দেবে সরকার? সেই ‘জ্বালানি গ্যাপ’ পূরণের সুস্পষ্ট রোডম্যাপ এখনো প্রকাশ হয়নি।
২০২৩ সালে এক্সনমোবিল বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রে ১০ থেকে ৩০ বিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য বিনিয়োগ প্রস্তাব দিয়েছিল, যা দেশের ইতিহাসে কোনো পশ্চিমা কোম্পানির সবচেয়ে বড় আগ্রহ হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। কিন্তু সেই আগ্রহ শেষ পর্যন্ত চুক্তিতে রূপ নেয়নি।
এবার সংশোধিত শর্ত ও নতুন দরপত্র আন্তর্জাতিক জ্বালানি জায়ান্টদের কতটা আকৃষ্ট করতে পারে–তার উত্তর মিলবে আগামী নভেম্বরের বিড বাক্স খোলার পর।

দেশীয় গ্যাসের মজুত ফুরিয়ে আসছে। বাড়ছে ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানির চাপ। শিল্প, বিদ্যুৎ ও নগর জীবনের জ্বালানি নিরাপত্তা ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। এমন প্রেক্ষাপটে দীর্ঘ ২৩ মাসের বিরতির পর আবারও বঙ্গোপসাগরের বিশাল সমুদ্রাঞ্চল খুলে দিচ্ছে বাংলাদেশ।
রাষ্ট্রীয় সংস্থা পেট্রোবাংলা ২৬টি অফশোর ব্লকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করতে যাচ্ছে। আগামীকাল রোববার দেশি-বিদেশি সংবাদমাধ্যমে এই দরপত্র বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হবে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মো. সাইফুল ইসলাম চরচাকে বলেন, “অফশোর অনুসন্ধানের আন্তর্জাতিক দরপত্র বিজ্ঞপ্তি আগামী ২৪ মে প্রকাশিত হবে। আমরা সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছি। এবারের উৎপাদন বণ্টন চুক্তিতে (পিএসসি) গ্যাসের ট্যারিফ উন্নত করা হয়েছে, পাইপলাইন নির্মাণব্যয় ও ডেটা মূল্য কমানো হয়েছে এবং শ্রমিক কল্যাণ তহবিলের বিধান সংশোধন করা হয়েছে।”
এবারের বিডিং রাউন্ডে বঙ্গোপসাগরের গভীর ও অগভীর মিলিয়ে মোট ২৬টি ব্লক আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর জন্য উন্মুক্ত করা হচ্ছে। দরপত্র জমার শেষ সময় আগামী ৩০ নভেম্বর।
নতুন বড় কোনো গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত না হলে আগামী এক দশকের মধ্যেই দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কার্যত শূন্যের কোঠায় নেমে আসতে পারে। তখন পুরো ব্যবস্থাকে আরও বেশি আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভর করতে হবে, যা ইতোমধ্যে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর তীব্র চাপ তৈরি করছে।
গ্যাসের মজুত ‘দ্রুত ফুরিয়ে আসছে’
জাতীয় সংসদে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানিয়েছেন, দেশের মোট উত্তোলনযোগ্য গ্যাস মজুত ২৯ দশমিক ৭৪ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ)। এর মধ্যে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত উত্তোলিত হয়েছে ২২ দশমিক ১১ টিসিএফ। অবশিষ্ট রয়েছে মাত্র ৭ দশমিক ৬৩ টিসিএফ গ্যাস।
বর্তমানে দৈনিক প্রায় ১৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) হারে গ্যাস সরবরাহ অব্যাহত থাকলে এই মজুত টিকবে আনুমানিক আর ১২ বছর। নতুন বড় কোনো গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত না হলে আগামী এক দশকের মধ্যেই দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কার্যত শূন্যের কোঠায় নেমে আসতে পারে। তখন পুরো ব্যবস্থাকে আরও বেশি আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভর করতে হবে, যা ইতোমধ্যে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর তীব্র চাপ তৈরি করছে।
এই বাস্তবতায় সমুদ্র অনুসন্ধান এখন আর শুধু অর্থনৈতিক কৌশল নয়, বরং জ্বালানি নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।
২০২৪ সালের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা
গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ২০২৪ সালের মার্চে ২৪টি অফশোর ব্লকের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করেছিল পেট্রোবাংলা। এক্সনমোবিল, শেভরন, সিএনওওসি-সহ ১৫টির বেশি আন্তর্জাতিক কোম্পানি সিসমিক ডেটা কিনলেও শেষ পর্যন্ত কেউ দরপত্র জমা দেয়নি। ছয় মাসের সময়সীমা আরও তিন মাস বাড়িয়েও সাড়া মেলেনি। মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অফশোরের এ দরপত্রের সময়সীমা শেষ হয়।
পরে পেট্রোবাংলার তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে উঠে আসে, আগের পিএসসির কয়েকটি শর্ত আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর কাছে অনাকর্ষণীয় ছিল। বিশেষ করে গ্যাসের মূল্য কম হওয়া, শ্রমিক কল্যাণ তহবিলে উচ্চ হারে মুনাফা ভাগ এবং পাইপলাইন নির্মাণব্যয়ের অস্পষ্ট কাঠামো বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করেছিল।

ওই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই প্রণয়ন করা হয়েছে নতুন ‘বাংলাদেশ অফশোর মডেল প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট (পিএসসি) ২০২৬’। তবে পিএসসির সঙ্গে যুক্ত পেট্রোবাংলার একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকতা নাম না প্রকাশ করে চরচাকে বলেন, “মূলত অরাজনৈতিক সরকারের সময় আস্থাহীনতার কারণেই কোনো বিদেশি কোম্পানি বিড জমা দেয়নি বলে বিভিন্ন কোম্পানির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল।”
তারপরও নতুন করে পিএসসি সংশোধন, শ্রমিক কল্যাণ তহবিলে মুনাফার অংশ কমানোসহ কয়েকটি পরিবর্তনের আদৌ দরকার ছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের।
কী কী বদল এল
গত ৭ মে অর্থনৈতিক বিষয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি (সিসিইএ) নতুন পিএসসির খসড়ায় নীতিগত অনুমোদন দেয়। সংশোধিত চুক্তিতে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের জন্য একাধিক শর্ত শিথিল করা হয়েছে।
গভীর সমুদ্রে গ্যাসের মূল্য ব্রেন্ট ক্রুডের ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১১ শতাংশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতি পাঁচ বছর পর মূল্য পুনঃনির্ধারণের সুযোগ রাখা হয়েছে। শ্রমিক কল্যাণ তহবিলে মুনাফার অংশ ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ দশমিক ৫ শতাংশ করা হয়েছে। অনুসন্ধান পর্যায়ে বাধ্যতামূলক ব্লক ত্যাগের হার ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশে নামানো হয়েছে।
এ ছাড়া পাইপলাইন ট্যারিফ আগের মতো পূর্বনির্ধারিত না রেখে এখন বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হবে। সুদহারের রেফারেন্সও সিকিউরড ওভারনাইট ফিন্যান্সিং রেট (সোফর)-এ নেওয়া হয়েছে।
পেট্রোবাংলার একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “বিদেশি কোম্পানিগুলো আগের পিএসসিতে যেসব বিষয়ে আপত্তি তুলেছিল, সেগুলো আমরা সংশোধন করেছি। গ্যাসের মূল্য, পাইপলাইন ব্যয় ও কল্যাণ তহবিলের বিষয়গুলো এবার অনেক বেশি বিনিয়োগবান্ধব করা হয়েছে।”
সামনে কী
পেট্রোবাংলার পরিকল্পনা অনুযায়ী, ১ জুন থেকে প্রমোশনাল ডেটা প্যাকেজ বিক্রি শুরু হবে। জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত বিভিন্ন দেশে রোড শো, দূতাবাসভিত্তিক প্রচার এবং আন্তর্জাতিক প্রেস ব্রিফিং আয়োজন করা হবে। এরপর ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত বিড গ্রহণ করা হবে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের মধ্যেই মূল্যায়ন শেষে চুক্তি সম্পাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পেট্রোবাংলা আশা করছে পিএসসিতে যেসব সংশোধন আনা হয়েছে, তাতে বিদেশি কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে ভালো ফলাফল মিলবে।
জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, দরপত্র বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর প্রমোশনাল প্যাকেজ বিক্রি শুরু হবে। বিদেশি কোম্পানিগুলো সময়সীমার মধ্যে পেট্রোবাংলার সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে জরিপের তথ্য-উপাত্ত কিনতে পারবে।
তবু রয়ে যাচ্ছে অনিশ্চয়তা
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, অফশোর অনুসন্ধান শুরু থেকে বাণিজ্যিকভাবে গ্যাস উৎপাদনে যেতে সাধারণত সাত থেকে ১০ বছর সময় লাগে। সে হিসেবে এখন অনুসন্ধানে সফল হলেও নতুন গ্যাস জাতীয় গ্রিডে পৌঁছানোর আগেই দেশের বর্তমান মজুতের বড় অংশ শেষ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. বদরুল ইমামও কস্ট রিকভারি-ভিত্তিক পুরনো মডেল নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার মতে, অতীতে আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলো অনুসন্ধান ব্যয় স্ফীত করে দেখিয়ে অতিরিক্ত অর্থ তুলে নিয়েছে। সাঙ্গু গ্যাসক্ষেত্র পরিচালনায় বিদেশি কোম্পানিগুলোর বিপুল মুনাফার উদাহরণও তিনি তুলে ধরেন।
নতুন পিএসসি আন্তর্জাতিক কোম্পানিকে আকৃষ্ট করতে পারলেও আবিষ্কার থেকে উৎপাদন পর্যন্ত দীর্ঘ সময়ের ব্যবধান কীভাবে সামাল দেবে সরকার? সেই ‘জ্বালানি গ্যাপ’ পূরণের সুস্পষ্ট রোডম্যাপ এখনো প্রকাশ হয়নি।
২০২৩ সালে এক্সনমোবিল বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রে ১০ থেকে ৩০ বিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য বিনিয়োগ প্রস্তাব দিয়েছিল, যা দেশের ইতিহাসে কোনো পশ্চিমা কোম্পানির সবচেয়ে বড় আগ্রহ হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। কিন্তু সেই আগ্রহ শেষ পর্যন্ত চুক্তিতে রূপ নেয়নি।
এবার সংশোধিত শর্ত ও নতুন দরপত্র আন্তর্জাতিক জ্বালানি জায়ান্টদের কতটা আকৃষ্ট করতে পারে–তার উত্তর মিলবে আগামী নভেম্বরের বিড বাক্স খোলার পর।