সোহরাব হাসান

আওয়ামী লীগের ফেরা নিয়ে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের দুই উপদেষ্টা দুই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন। যদিও দুজনের দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা। সাবেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলম জুলাই অভ্যুত্থানকারীদের কী কী ব্যর্থতার কারণে আওয়ামী লীগ ব্যাক করেছে বা ফিরে এসেছে, তার একটি নাতিদীর্ঘ বর্ণনা দিয়েছেন। আর উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেছেন, “আওয়ামী লীগ ব্যাক করেনি। তারা ছিলই।”
প্রথমে মাহফুজ আলমের বক্তব্য ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। তিনি বলেছেন, “লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে, যেদিন ২৪-কে ৭১-এর বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছিল স্বাধীনতার বিরুদ্ধের শক্তি। লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে, যেদিন থেকে ডানপন্থীদের উত্থানের জন্য অন্তরীণ (অন্তর্বর্তী) সরকারের লোকজন কাজ করা শুরু করেছে, লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে, যেদিন আইনের শাসনের বদলে মবের শাসনে আনন্দ পেয়েছিল গত ১৭ বছরের মজলুমগণ।” মাহফুজ আলম মনে করেন, “যেদিন থেকে উগ্রবাদীরা মাজারে হামলা করেছে, মসজিদ থেকে ভিন্নমতাবলম্বীদের বের করে দিয়েছে। লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে, যেদিন হিন্দুদের উপর নিপীড়ন নিয়ে মজলুমগণ চুপ ছিল।”
জুলাই অভ্যুত্থানে সমাজের সর্বস্তরের মানুষ অংশ নিলেও এর কৃতিত্ব নেওয়ার চেষ্টা করেছে মহলবিশেষ, যাদের একাংশ চব্বিশকে একাত্তরের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। অর্থাৎ চব্বিশের মাধ্যমে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করা। এই মহলটি ১৭ বছর জেল জুলুমের শিকার হওয়া বিএনপি বা অন্য কোনো দলের ভূমিকাও স্বীকার করতে চায় না। তাদের প্ররোচনায় মাজার, পীরের দরগায় হামলার পাশাপাশি যত্রতত্র মবের ঘটনা ঘটেছে। বাউলশিল্পীরা, নারীরা তাদের আক্রমণের শিকার হয়েছেন। প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, ছায়ানট ও উদীচী কার্যালয় পুড়িয়ে দেওয়ার পর এই মহলটিকে উল্লাস করতে দেখা গেছে।
আওয়ামী লীগ ব্যাক করার ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের নীতি ও কার্যক্রমকে দায়ী করে মাহফুজ আলম লিখেছেন, “লীগ সেদিনই ব্যাক করেছিল, যেদিন ব্যবস্থা বিলোপের বদলে ন্যূনতম সংস্কার ও ঐকমত্য কমিশন নাম দিয়ে জনগণকে বিচ্ছিন্ন এবং হতাশ করা হলো। লীগ সেদিনই ব্যাক করেছিল, যেদিন থেকে বিএনপি ও অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে গেল আর বিএনপি ঠেকাতে জামাতকে কোলে নিল অন্তরিণ।”
মাহফুজ আলমের মতে, “লীগ সেদিনই ব্যাক করেছিল, যেদিন নির্বাচনি বাঁটোয়ারার মাধ্যমে সংস্কার ও বিচারকে কম্প্রোমাইজ করা হলো অ্যান্ড বিএনপি-জামাতের বার্গেইনিং টুল বানানো হলো। লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে, যেদিন কমিশন, ট্রাইবুনাল, বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদিকে একটি আদর্শের লোকদের মাধ্যমে ক্ষমতারোহণের বার্গেইনিং টুলে পরিণত করা হল।” তাঁর মতে, “অন্তর্বর্তী সরকারের কিচেন ক্যাবিনেটের অধিকাংশ লোকই ছিল জামায়াত-বিএনপি বা লীগের ছুপা দালাল। যাদের কাছে জুলাই মানে ছিল, নিজেদের পরিবার, প্রজন্ম আর প্রতিষ্ঠানের স্বার্থরক্ষা।”
মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারে বিএনপি ও জামায়াতের লোক ছিল, এটা আমরা জানি। ছাত্রনেতৃত্ব থেকে আসা প্রতিনিধি ছিলেন, এটাও অজানা নয়। কিন্তু সেখানে ছুপা আওয়ামী লীগার কারা ছিলেন, তা জানা জরুরি। ছুপা মানে গুপ্ত। অন্তর্বর্তী সরকারেই যদি ছুপা আওয়ামী লীগাররা থেকে থাকেন, তাহলে কার বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থান হয়েছিল? ব্যক্তি শেখ হাসিনা বা তার কয়েকজন সহযোগীর বিরুদ্ধে?
মাহফুজ হয়তো ‘গুপ্ত’ শব্দটি ব্যবহার করেননি হয়তো মহল বিশেষের সাঁড়াশি আক্রমণের ভয়ে। এরপরও আক্রমণ থেমে থাকেনি।
সেই আক্রমণের মুখে কয়েক ঘণ্টা পর তিনি আরেকটি বার্তায় আওয়ামী লীগের ‘কাম ব্যাক’ করা ঠেকাতে কিছু পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, “আমাদের এখনকার কাজ হলো, সকল নিপীড়নের বিরুদ্ধে, নিপীড়িতের পক্ষে থাকা। দল-মত-ধর্ম নির্বিশেষে বাংলাদেশের সকল নাগরিকের মানবাধিকারের পক্ষে থাকা। হঠকারী, উগ্রবাদী এবং অন্তর্ঘাতমূলক রাজনীতিকে পরাস্ত করা। সংখ্যালঘু ও মাজারপন্থিদের উপর হামলার বিচার করার দাবি অব্যাহত রাখা। জুলাই গণহত্যার বিচারের দাবিকে প্রধান করে তোলা এবং বিচারের ক্ষেত্রে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে থাকা।”
সমস্যা হলো ৫ আগস্টের আগে যারা মজলুম ছিলেন, তাদেরই অনেকে এখন জালিমের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। চেহারা বদল হয়েছে, চরিত্র বদল হয়নি।
প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করতে বর্তমান সরকারকে বাধ্য করতে হবে উল্লেখ করে এই সাবেক উপদেষ্টা বাংলার বহু ভাষা-সংস্কৃতি যাপন-উদযাপন করার কথা বলেছেন। একইসঙ্গে তিনি জুলাইকে একটি মতাদর্শের ব্যানারে কুক্ষিগত ও বিভাজিত করার সকল প্রকল্প পরাস্ত করার ওপর জোর দিয়েছেন।
অন্যদিকে সাবেক উপদেষ্টা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল বলেছেন, “আওয়ামী লীগ ছিলই। ব্যাক করেছে তাদের দম্ভ, মিথ্যাচার আর মানুষকে বিভ্রান্ত করার দুঃসাহস।”
আওয়ামী লীগ যদি থেকেই থাকবে, তাহলে এত বড় গণঅভ্যুত্থান হলো কেন? এত মানুষ জীবন দিল কেন? আওয়ামী লীগ যদি থেকেই থাকবে, তাহলে নতুন করে ফিরে আসা বা ব্যাক করার প্রশ্ন আসে কেন?
আসলে দুই উপদেষ্টা বিষয়টিকে দুভাবে দেখেছেন। মাহফুজের আক্ষেপ, যেই উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য নিয়ে আওয়ামী লীগকে বিতাড়িত করা হয়েছিল, সেটি পূরণ হলো না। আওয়ামী লীগকে সরাতে না পারার মনোবেদনা প্রকাশ করেছেন আসিফ নজরুলও। তার এই মনোবেদনা আমলে নিয়েও যে প্রশ্নটি করা প্রয়োজন মনে করি, সেটি হলো আইন উপদেষ্টা হিসেবে তিনি তার মন্ত্রণালয়ে যে সংস্কারগুলো করেছিলেন, সেটা কেন টিকল না? সে জন্যও কি আওয়ামী লীগ দায়ী? আসলে ক্ষমতার ভাষাই এক–সেখানে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও অন্তর্বর্তী কিংবা তত্ত্বাবধায়কের ফারাকটি কম। ধীরে ধীরে সবই প্রকাশিত হচ্ছে।
মাহফুজ আলম এর আগেও ডানপন্থা ও মওদুদীবাদের উত্থান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা থাকাকালে তিনি বলেছেন, কীভাবে প্রশাসনকে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী ভাগাভাগি করে নিয়েছিল। তাহলে আজ যে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে ‘যুদ্ধাবস্থা’ চলছে, সেটা কি যুদ্ধ শেষের প্রাপ্য নিয়ে? গণতন্ত্র, আইনের শাসন, মানবাধিকার এসব নিছকই কথার কথা।
কাদের কারণে জুলাই অভ্যুত্থানের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হাসিল হয়নি, কারা ক্ষমতা জুলাই সনদের নামে ক্ষমতা ভাগ বাটোয়ারা করেছেন, সেটা রাখঢাক না করেই বলেছেন মাহফুজ আলম। তার বক্তব্যের সার কথা হলো জুলাই অভ্যুত্থানের পর কোনো কিছু্ই বদলায়নি। সেই আমলাতন্ত্র ও কোটারি রাজনৈতিক স্বার্থ অটুট আছে। সম্প্রতি চরচার সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে কবি ও ভাবুক ফরহাদ মজহারও বলেছেন, বাঙালির আবাহমান সংস্কৃতি মুছে ফেলা কিংবা পীরের মাজার দরগাহ ভেঙে দেওয়ার জন্য জুলাই অভ্যুত্থান হয়নি। অভ্যুত্থান হয়েছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে ইনসাফ প্রতিষ্ঠার জন্য। একটি বহুত্ববাদী গণতান্ত্রিক ও সমতাভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের জন্য। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার সেসব না করে নির্বাচনের মাধ্যমে ‘রেজিম চেঞ্জ’ করেছে।
আওয়ামী লীগের নিজের ফিরে আসার পরিকল্পনা আছে বলে জানি না। আওয়ামী লীগের দেশান্তরিত নেতারা বিদেশে বসে যে খোয়াব দেখছেন তা দিবাস্বপ্ন ছাড়া কিছু নয়। ফেসবুকে উসকানিমূলক বার্তা দিলে স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্বদানকারী দলটির প্রতি মানুষের যেটুকু সহানুভুতি আছে, সেটাও হারাবে। আওয়ামী লীগকে রাজনীতিকে ফিরে আসতে হলে প্রথমত সবকিছুর পেছনে ষড়যন্ত্র না খুঁজে চব্বিশের বাস্তবতা মেনে নিতে হবে। দ্বিতীয়ত কাদের ভুলে ও অবিমৃশ্যকারিতায় এই বিপর্যয় ঘটেছে, তাও খুঁজে বের করতে হবে।
লেখক: সম্পাদক, চরচা।

আওয়ামী লীগের ফেরা নিয়ে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের দুই উপদেষ্টা দুই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন। যদিও দুজনের দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা। সাবেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলম জুলাই অভ্যুত্থানকারীদের কী কী ব্যর্থতার কারণে আওয়ামী লীগ ব্যাক করেছে বা ফিরে এসেছে, তার একটি নাতিদীর্ঘ বর্ণনা দিয়েছেন। আর উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেছেন, “আওয়ামী লীগ ব্যাক করেনি। তারা ছিলই।”
প্রথমে মাহফুজ আলমের বক্তব্য ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। তিনি বলেছেন, “লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে, যেদিন ২৪-কে ৭১-এর বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছিল স্বাধীনতার বিরুদ্ধের শক্তি। লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে, যেদিন থেকে ডানপন্থীদের উত্থানের জন্য অন্তরীণ (অন্তর্বর্তী) সরকারের লোকজন কাজ করা শুরু করেছে, লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে, যেদিন আইনের শাসনের বদলে মবের শাসনে আনন্দ পেয়েছিল গত ১৭ বছরের মজলুমগণ।” মাহফুজ আলম মনে করেন, “যেদিন থেকে উগ্রবাদীরা মাজারে হামলা করেছে, মসজিদ থেকে ভিন্নমতাবলম্বীদের বের করে দিয়েছে। লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে, যেদিন হিন্দুদের উপর নিপীড়ন নিয়ে মজলুমগণ চুপ ছিল।”
জুলাই অভ্যুত্থানে সমাজের সর্বস্তরের মানুষ অংশ নিলেও এর কৃতিত্ব নেওয়ার চেষ্টা করেছে মহলবিশেষ, যাদের একাংশ চব্বিশকে একাত্তরের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। অর্থাৎ চব্বিশের মাধ্যমে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করা। এই মহলটি ১৭ বছর জেল জুলুমের শিকার হওয়া বিএনপি বা অন্য কোনো দলের ভূমিকাও স্বীকার করতে চায় না। তাদের প্ররোচনায় মাজার, পীরের দরগায় হামলার পাশাপাশি যত্রতত্র মবের ঘটনা ঘটেছে। বাউলশিল্পীরা, নারীরা তাদের আক্রমণের শিকার হয়েছেন। প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, ছায়ানট ও উদীচী কার্যালয় পুড়িয়ে দেওয়ার পর এই মহলটিকে উল্লাস করতে দেখা গেছে।
আওয়ামী লীগ ব্যাক করার ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের নীতি ও কার্যক্রমকে দায়ী করে মাহফুজ আলম লিখেছেন, “লীগ সেদিনই ব্যাক করেছিল, যেদিন ব্যবস্থা বিলোপের বদলে ন্যূনতম সংস্কার ও ঐকমত্য কমিশন নাম দিয়ে জনগণকে বিচ্ছিন্ন এবং হতাশ করা হলো। লীগ সেদিনই ব্যাক করেছিল, যেদিন থেকে বিএনপি ও অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে গেল আর বিএনপি ঠেকাতে জামাতকে কোলে নিল অন্তরিণ।”
মাহফুজ আলমের মতে, “লীগ সেদিনই ব্যাক করেছিল, যেদিন নির্বাচনি বাঁটোয়ারার মাধ্যমে সংস্কার ও বিচারকে কম্প্রোমাইজ করা হলো অ্যান্ড বিএনপি-জামাতের বার্গেইনিং টুল বানানো হলো। লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে, যেদিন কমিশন, ট্রাইবুনাল, বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদিকে একটি আদর্শের লোকদের মাধ্যমে ক্ষমতারোহণের বার্গেইনিং টুলে পরিণত করা হল।” তাঁর মতে, “অন্তর্বর্তী সরকারের কিচেন ক্যাবিনেটের অধিকাংশ লোকই ছিল জামায়াত-বিএনপি বা লীগের ছুপা দালাল। যাদের কাছে জুলাই মানে ছিল, নিজেদের পরিবার, প্রজন্ম আর প্রতিষ্ঠানের স্বার্থরক্ষা।”
মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারে বিএনপি ও জামায়াতের লোক ছিল, এটা আমরা জানি। ছাত্রনেতৃত্ব থেকে আসা প্রতিনিধি ছিলেন, এটাও অজানা নয়। কিন্তু সেখানে ছুপা আওয়ামী লীগার কারা ছিলেন, তা জানা জরুরি। ছুপা মানে গুপ্ত। অন্তর্বর্তী সরকারেই যদি ছুপা আওয়ামী লীগাররা থেকে থাকেন, তাহলে কার বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থান হয়েছিল? ব্যক্তি শেখ হাসিনা বা তার কয়েকজন সহযোগীর বিরুদ্ধে?
মাহফুজ হয়তো ‘গুপ্ত’ শব্দটি ব্যবহার করেননি হয়তো মহল বিশেষের সাঁড়াশি আক্রমণের ভয়ে। এরপরও আক্রমণ থেমে থাকেনি।
সেই আক্রমণের মুখে কয়েক ঘণ্টা পর তিনি আরেকটি বার্তায় আওয়ামী লীগের ‘কাম ব্যাক’ করা ঠেকাতে কিছু পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, “আমাদের এখনকার কাজ হলো, সকল নিপীড়নের বিরুদ্ধে, নিপীড়িতের পক্ষে থাকা। দল-মত-ধর্ম নির্বিশেষে বাংলাদেশের সকল নাগরিকের মানবাধিকারের পক্ষে থাকা। হঠকারী, উগ্রবাদী এবং অন্তর্ঘাতমূলক রাজনীতিকে পরাস্ত করা। সংখ্যালঘু ও মাজারপন্থিদের উপর হামলার বিচার করার দাবি অব্যাহত রাখা। জুলাই গণহত্যার বিচারের দাবিকে প্রধান করে তোলা এবং বিচারের ক্ষেত্রে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে থাকা।”
সমস্যা হলো ৫ আগস্টের আগে যারা মজলুম ছিলেন, তাদেরই অনেকে এখন জালিমের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। চেহারা বদল হয়েছে, চরিত্র বদল হয়নি।
প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করতে বর্তমান সরকারকে বাধ্য করতে হবে উল্লেখ করে এই সাবেক উপদেষ্টা বাংলার বহু ভাষা-সংস্কৃতি যাপন-উদযাপন করার কথা বলেছেন। একইসঙ্গে তিনি জুলাইকে একটি মতাদর্শের ব্যানারে কুক্ষিগত ও বিভাজিত করার সকল প্রকল্প পরাস্ত করার ওপর জোর দিয়েছেন।
অন্যদিকে সাবেক উপদেষ্টা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল বলেছেন, “আওয়ামী লীগ ছিলই। ব্যাক করেছে তাদের দম্ভ, মিথ্যাচার আর মানুষকে বিভ্রান্ত করার দুঃসাহস।”
আওয়ামী লীগ যদি থেকেই থাকবে, তাহলে এত বড় গণঅভ্যুত্থান হলো কেন? এত মানুষ জীবন দিল কেন? আওয়ামী লীগ যদি থেকেই থাকবে, তাহলে নতুন করে ফিরে আসা বা ব্যাক করার প্রশ্ন আসে কেন?
আসলে দুই উপদেষ্টা বিষয়টিকে দুভাবে দেখেছেন। মাহফুজের আক্ষেপ, যেই উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য নিয়ে আওয়ামী লীগকে বিতাড়িত করা হয়েছিল, সেটি পূরণ হলো না। আওয়ামী লীগকে সরাতে না পারার মনোবেদনা প্রকাশ করেছেন আসিফ নজরুলও। তার এই মনোবেদনা আমলে নিয়েও যে প্রশ্নটি করা প্রয়োজন মনে করি, সেটি হলো আইন উপদেষ্টা হিসেবে তিনি তার মন্ত্রণালয়ে যে সংস্কারগুলো করেছিলেন, সেটা কেন টিকল না? সে জন্যও কি আওয়ামী লীগ দায়ী? আসলে ক্ষমতার ভাষাই এক–সেখানে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও অন্তর্বর্তী কিংবা তত্ত্বাবধায়কের ফারাকটি কম। ধীরে ধীরে সবই প্রকাশিত হচ্ছে।
মাহফুজ আলম এর আগেও ডানপন্থা ও মওদুদীবাদের উত্থান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা থাকাকালে তিনি বলেছেন, কীভাবে প্রশাসনকে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী ভাগাভাগি করে নিয়েছিল। তাহলে আজ যে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে ‘যুদ্ধাবস্থা’ চলছে, সেটা কি যুদ্ধ শেষের প্রাপ্য নিয়ে? গণতন্ত্র, আইনের শাসন, মানবাধিকার এসব নিছকই কথার কথা।
কাদের কারণে জুলাই অভ্যুত্থানের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হাসিল হয়নি, কারা ক্ষমতা জুলাই সনদের নামে ক্ষমতা ভাগ বাটোয়ারা করেছেন, সেটা রাখঢাক না করেই বলেছেন মাহফুজ আলম। তার বক্তব্যের সার কথা হলো জুলাই অভ্যুত্থানের পর কোনো কিছু্ই বদলায়নি। সেই আমলাতন্ত্র ও কোটারি রাজনৈতিক স্বার্থ অটুট আছে। সম্প্রতি চরচার সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে কবি ও ভাবুক ফরহাদ মজহারও বলেছেন, বাঙালির আবাহমান সংস্কৃতি মুছে ফেলা কিংবা পীরের মাজার দরগাহ ভেঙে দেওয়ার জন্য জুলাই অভ্যুত্থান হয়নি। অভ্যুত্থান হয়েছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে ইনসাফ প্রতিষ্ঠার জন্য। একটি বহুত্ববাদী গণতান্ত্রিক ও সমতাভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের জন্য। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার সেসব না করে নির্বাচনের মাধ্যমে ‘রেজিম চেঞ্জ’ করেছে।
আওয়ামী লীগের নিজের ফিরে আসার পরিকল্পনা আছে বলে জানি না। আওয়ামী লীগের দেশান্তরিত নেতারা বিদেশে বসে যে খোয়াব দেখছেন তা দিবাস্বপ্ন ছাড়া কিছু নয়। ফেসবুকে উসকানিমূলক বার্তা দিলে স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্বদানকারী দলটির প্রতি মানুষের যেটুকু সহানুভুতি আছে, সেটাও হারাবে। আওয়ামী লীগকে রাজনীতিকে ফিরে আসতে হলে প্রথমত সবকিছুর পেছনে ষড়যন্ত্র না খুঁজে চব্বিশের বাস্তবতা মেনে নিতে হবে। দ্বিতীয়ত কাদের ভুলে ও অবিমৃশ্যকারিতায় এই বিপর্যয় ঘটেছে, তাও খুঁজে বের করতে হবে।
লেখক: সম্পাদক, চরচা।