সিএনএনের বিশ্লেষণ
চরচা ডেস্ক

অবৈধ শুল্ক আরোপের মতো যুদ্ধ কোনো প্রেসিডেন্টের খেয়ালখুশি মেটাতে কিংবা ক্রমাগত পতনশীল বাজারকে স্থায়ীভাবে চাঙা করতে ইচ্ছামতো শুরু বা বন্ধ করা যায় না। তাই ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হামলার হুমকি স্থগিত করার পর মূল প্রশ্নটি এটি নয় যে, তিনি আবারও ‘টাকো’ (ট্রাম্প অলওয়েজ চিকেনস আউট বা ট্রাম্প সবসময় রণে ভঙ্গ দেন) মুহূর্তের জন্ম দিয়েছেন কি না। বরং প্রশ্ন হলো, ট্রাম্প নিজে চাইলেও ইরানের বিরুদ্ধে তার এই যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসতে পারবেন কি না।
কয়েক দিনের পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের পর, সোমবার ট্রাম্প এই সংঘাতে প্রথমবারের মতো সম্ভাব্য উত্তেজনা হ্রাসের ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন, ইরানের সাথে ফলপ্রসূ আলোচনায় ১৫টি বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে। তবে তেহরান জানিয়েছে, তাদের মধ্যে এমন কোনো আলোচনাই হয়নি।
সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক বিশ্লেষণ হলো, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়ই এমন এক পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে, যেখানে সংঘাত আরও বৃদ্ধির পরিণতি এতটাই ভয়াবহ হবে যে, দুই পক্ষেরই এখন এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার একটি পথ প্রয়োজন। এ ধরনের উপলব্ধি অনেক সময় যুদ্ধের অবসান ঘটাতে ভূমিকা রাখে।
জ্বালানি তেল রপ্তানির অন্যতম প্রধান জলপথ হরমুজ প্রণালী খুলে না দিলে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে বোমা হামলার হুমকি দিয়ে দুই শত্রু দেশকেই খাদের কিনারায় ঠেলে দিয়েছিলেন ট্রাম্প। জবাবে মার্কিন মিত্র উপসাগরীয় দেশগুলোর গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংস করে দেওয়ার পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়েছিল তেহরান। এই ভয়াবহ সংঘাত একটি বৈশ্বিক মন্দার সূচনা করতে পারত এবং ট্রাম্প যেসব সাধারণ ইরানি নাগরিককে সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তাদের মানবিক সংকটকে আরও চরম আকার দিতে পারত।
তবে খুব শিগগিরই কোনো যুগান্তকারী সমাধান আসতে চলেছে, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশের যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

ট্রাম্পের টানা কয়েকদিনের অসংলগ্ন ও পরস্পরবিরোধী বক্তব্য এবং এই যুদ্ধের পক্ষে কোনো সুনির্দিষ্ট যুক্তি দাঁড় করাতে বা যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার কৌশল নির্ধারণে মার্কিন প্রশাসনের ব্যর্থতার অর্থ হলো, যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো একক বিবৃতিরই এখন আর কোনো বিশ্বাসযোগ্যতা নেই।
ইরানে নিজের বেঁধে দেওয়া সময়সীমার মধ্যেই বোমা হামলার যে অভ্যাস প্রেসিডেন্টের রয়েছে, তাতে তিনি যদি দেশটির বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে হামলার ওপর নিজের দেওয়া পাঁচ দিনের স্থগিতাদেশ নিজেই ভঙ্গ করেন, তবে এতে কেউ অবাক হবে না।
নিন্দুকেরা তো এও বলছেন যে, বিশ্ববাজারে লেনদেনের পুরো সপ্তাহ জুড়েই প্রেসিডেন্টের এই স্থগিতাদেশ বহাল থাকবে। সাপ্তাহিক ছুটির পর শেয়ারের আগাম লেনদেনে (স্টক ফিউচারস) ধস ও তেলের দাম হু হু করে বাড়তে থাকায়, তিনি কি কেবল বাজারে স্থিতিশীলতার একটি সুরক্ষা বলয় তৈরি করতে চাইছিলেন?
বাজারের অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে সরকারি বিবৃতি দেওয়ার ঘটনা এবারই প্রথম নয়। এই কৌশলটি আবারও কাজে লেগেছে- সোমবার ডাউ জোনস, এসঅ্যান্ডপি ৫০০ এবং নাসডাক সব সূচকই ১ শতাংশের বেশি বেড়েছে। অন্যদিকে, বিশ্ববাজারে তেলের বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১১ শতাংশ কমেছে। এর ফলে মার্কিন গাড়িচালকরা গ্যাস স্টেশনগুলোতে জ্বালানির দামে কিছুটা স্বস্তির আশা করতে পারেন।
কেন ট্রাম্পের উত্তেজনা কমানো প্রয়োজন
ট্রাম্প হয়ত ভিন্ন আরেকটি কারণেও সময় নিতে চাইছেন। তা হলো- ইরানের তেলশিল্পের প্রাণকেন্দ্র ও গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক হাব খারগ দ্বীপ আক্রমণ কিংবা প্রণালীর আশেপাশের দ্বীপ ও উপকূলীয় অঞ্চলগুলো দখলের জন্য প্রয়োজনীয় মার্কিন বাহিনী এখনো পুরোপুরি একত্রিত হতে পারেনি। জাপান থেকে রওনা হওয়া মার্কিন মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিটের একটি দল হয়তো খুব শিগগিরই ওই অঞ্চলে পৌঁছাবে। তবে দ্বিতীয় আরেকটি দল মাত্র গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূল থেকে যাত্রা শুরু করেছে।
এখানে এটিও মনে রাখা প্রয়োজন যে, ট্রাম্প অতিরঞ্জন বা বাড়িয়ে বলতে পছন্দ করেন। অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, কূটনৈতিক অগ্রগতির বিষয়ে তার ব্যাপক উচ্ছ্বাস এবং ইরান চুক্তির জন্য মরিয়া হয়ে আছে-তার এই দাবিগুলো নেহাতই অতিরঞ্জিত হতে পারে। যদিও সংকট সমাধানের পথ তৈরি করতে রাষ্ট্রনায়কেরা অনেক সময় কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ইচ্ছাকৃতভাবে এমন বিভ্রান্তির বা ছলনার আশ্রয় নিয়ে থাকেন।
একদিন যুদ্ধের অবসান ঘটানোর কথা বলা এবং পরদিনই আবার তা উসকে দেওয়ার মতো প্রেসিডেন্টের চরম অস্থির আচরণ যুদ্ধকালীন নেতৃত্বের সাথে একেবারেই বেমানান। তবে এটি ট্রাম্পের একেবারেই স্বভাবজাত বিষয়। গত ২৩ মার্চ নাগাদ এই পুরো বিষয়টিকেই তার এমন একটি ফন্দি বলে মনে হচ্ছিল, যার মাধ্যমে তিনি দাবি করতে পারেন যে তার কঠোর কৌশল কূটনৈতিক অগ্রগতি এনে দিয়েছে।
নিজের তৈরি করা সংকটগুলো সামাল দেওয়ার এই খামখেয়ালিপনা ও প্রবণতা ট্রাম্পের ব্যক্তিগত জীবন, ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক ক্যারিয়ার, এমনকি বিচার ব্যবস্থার সাথে তার একাধিক আইনি জটিলতার ঘটনা থেকেই সবার কাছে পরিচিত। তার প্রতিটি দিনই যেন দিন শেষে কোনোমতে টিকে থাকার এক লড়াই হিসেবে সামনে আসে। এই কৌশল ব্যবহার করে ট্রাম্প এক অন্তহীন তাৎক্ষণিক কৌশল বদলের খেলায় তার চূড়ান্ত জবাবদিহিতা বিলম্বিত করেন এবং নিজের কর্মকাণ্ডের সবচেয়ে খারাপ পরিণতিগুলো পিছিয়ে দেন।
তবে এমন একটি আশংকাও রয়েছে যে, পারস্য উপসাগরে ট্রাম্পের এই খামখেয়ালি কৌশল হয়তো চূড়ান্ত পরীক্ষার মুখে পড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরান হয়ত অস্ত্রশস্ত্র ও সামরিক শক্তির দিক থেকে পিছিয়ে রয়েছে এবং এমন এক যুদ্ধে তাদের নৌ, বিমান ও স্থলবাহিনীর সম্পদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে যে যুদ্ধে এরই মধ্যে ইসলামি ধর্মতান্ত্রিক সরকারের শীর্ষ নেতারা প্রাণ হারিয়েছেন।
কিন্তু এই সংঘাত যখন চতুর্থ সপ্তাহে গড়িয়েছে, তখন হরমুজ প্রণালী কার্যকরভাবে বন্ধ করে দিয়ে এবং বিশ্ব অর্থনীতিকে (সেইসাথে আগামী নভেম্বরের নির্বাচনে রিপাবলিকানদের রাজনৈতিক আশাকে) জিম্মি করার মাধ্যমে ইরান নিজেদের ক্ষমতারও জানান দিয়েছে।
যুক্তি বলে, যুদ্ধের আগেই যে শাসনব্যবস্থা চরম কট্টরপন্থী ছিল, নিজেদের সর্বোচ্চ নেতার হত্যাকাণ্ড এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি ক্ষেপণাস্ত্র ও যুদ্ধবিমানের প্রবল হামলা সহ্য করার পর ট্রাম্পের দাবিগুলোর প্রতি তাদের নমনীয় হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
যুদ্ধ অবসানে ট্রাম্পের দেওয়া শর্তগুলো যার মধ্যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্প থেকে সরে আসার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে যা সমঝোতার পথে বড় বাধা বা অগ্রহণযোগ্য হতে পারে। এর কারণ হলো, গত তিন সপ্তাহের ঘটনাপ্রবাহ স্পষ্টভাবেই দেখিয়ে দিয়েছে যে, বিদেশি শক্তির ভবিষ্যৎ হামলা থেকে বাঁচতে কেন একটি একগুঁয়ে শাসনব্যবস্থা এ ধরনের ‘সুরক্ষাকবচ’ বেছে নিতে পারে।

এমনকি যদি আলোচনা শুরুও হয় এবং পাকিস্তান ইতোমধ্যে তা আয়োজনের প্রস্তাব দিয়েছে, তবুও এটা স্পষ্ট নয় যে ইরানের হয়ে কে এই আলোচনায় অংশ নেবেন। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ঘটা এবং শীর্ষ নেতাদের হারানোর পর এই শাসনব্যবস্থার জন্য কোনো সম্মিলিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা কঠিন হতে পারে। আর কিছু বিশেষজ্ঞের ধারণা অনুযায়ী, যদি ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) এখন পুরো নিয়ন্ত্রণ নিয়ে থাকে, তবে তাদের অবস্থান আগের চেয়েও বেশি কট্টরপন্থী হতে পারে।
তাছাড়া, অতীতে ওয়াশিংটন তুলনামূলকভাবে মধ্যপন্থী ইরানি কর্মকর্তাদের সাথে আলোচনায় বসলেও শেষ পর্যন্ত দেখা গেছে যে, কট্টরপন্থীরা কোনো ধরনের আপসের ঘোর বিরোধী অবস্থান নিয়েছে।
এটিও অবাক হওয়ার মতো কোনো বিষয় হবে না, যদি ইরানের নেতারা মার্কিন প্রেসিডেন্টের বারবার সিদ্ধান্ত বদল, স্ববিরোধী বক্তব্য এবং আবেগপ্রবণ সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টগুলোকে তাদের সফলতার লক্ষণ হিসেবে ধরে নেন। তারা হয়ত মনে করছেন যে, ট্রাম্পের ওপর অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টির যে কৌশল তারা নিয়েছেন, তা আসলেই কাজে দিচ্ছে।
ট্রাম্পের সামনে থাকা প্রায় সব বিকল্পই কেন খারাপ
ইরানে ভবিষ্যতে কী ঘটতে যাচ্ছে, তা কেউই নিশ্চিত করে বলতে পারে না। এমনটা হতেই পারে যে, শীর্ষ নেতাদের গুপ্তহত্যা এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি হামলা দেশটির শাসনব্যবস্থায় মারাত্মক ফাটল ধরিয়েছে, যা হয়তো এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। তবে এখন পর্যন্ত এই শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ার কোনো সুস্পষ্ট প্রকাশ্য লক্ষণ চোখে পড়েনি।
বিমান হামলার কারণে এই অঞ্চলে ইরানের তৈরি করা হুমকি মারাত্মকভাবে কমে গেছে। কিন্তু এত ব্যাপক বলপ্রয়োগ করেও যদি দেশটিকে এখনো মাথা নত করানো না গিয়ে থাকে, তবে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বড় কোনো ছাড় আদায় করা ছাড়া ইরান কেন তাদের প্রধান হাতিয়ার অর্থাৎ হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দেবে, তার কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা ট্রাম্প এখনো দিতে পারেননি।
তবে প্রেসিডেন্ট কেন আলোচনার সম্ভাবনায় প্রলুব্ধ হতে পারেন, তা সহজেই অনুমেয়। তার এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার একটি পথ প্রয়োজন, কারণ তার সামনে থাকা সম্ভাব্য বিকল্পগুলোর অনেকগুলোই সুবিধার না।
প্রণালীর চারপাশে থাকা ইরানি সম্পদগুলোর ওপর মার্কিন হামলা কেন্দ্রীভূত করার মাধ্যমে ট্রাম্প এই যুদ্ধকে আরও জোরদার করতে পারেন। তবে এতে তেহরানের সক্ষমতা এতটাই কমে যাবে যে জাহাজ চলাচলের জন্য তা নিরাপদ হবে, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। ট্রাম্প চাইলে স্থলবাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্তও নিতে পারেন। কিন্তু এটি এমন এক চূড়ান্ত রাজনৈতিক সীমা (পলিটিক্যাল রুবিকন) অতিক্রম করার শামিল হবে, যা সেই অন্তহীন যুদ্ধগুলোর স্মৃতি ফিরিয়ে আনবে, যেগুলোর বিরুদ্ধে ট্রাম্প বরাবরই অবস্থান নিয়েছেন।
এবার টাকো অর্থ্যাৎ ট্রাম্পের রণে ভঙ্গ দেওয়ার বিষয়ে ফেরত যাওয়া যাক।
টাকো সত্যিই এখন বিকল্প হোক বা না হোক, বিজয়ের একটি ঘোষণা বেশ আকর্ষণীয় বলেই মনে হচ্ছে। তবে এই সংঘাত থেকে পিছু হটার অর্থ হলো, যেসব মার্কিন উপসাগরীয় মিত্র তার এই যুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল, তাদের একটি ক্ষুব্ধ ও ক্ষমতাবান ইরানের সামনে অরক্ষিত অবস্থায় ফেলে দেওয়া।
ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত সুরক্ষিত না করেই যুদ্ধের সমাপ্তি টানা হলে, তা হয়ত ভবিষ্যতে কোনো একদিন দেশটিকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দিকে ধাবিত হওয়ার সুযোগ করে দেবে এবং এই যুদ্ধের পক্ষে ট্রাম্পের দেওয়া সবচেয়ে ধারাবাহিক যুক্তিটিকেই দুর্বল করে দেবে।
প্রেসিডেন্টরা প্রায়ই এমন সব সংকটের মুখোমুখি হন, যেখানে কোনো ভালো বিকল্প হাতে থাকে না। কিন্তু ট্রাম্প ইরানে নিজেই নিজের জন্য যে ধরনের জটিল পরিস্থিতি তৈরি করেছেন, এমন দুরূহ পরিস্থিতির মুখে খুব কম প্রেসিডেন্টকেই পড়তে হয়।

অবৈধ শুল্ক আরোপের মতো যুদ্ধ কোনো প্রেসিডেন্টের খেয়ালখুশি মেটাতে কিংবা ক্রমাগত পতনশীল বাজারকে স্থায়ীভাবে চাঙা করতে ইচ্ছামতো শুরু বা বন্ধ করা যায় না। তাই ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হামলার হুমকি স্থগিত করার পর মূল প্রশ্নটি এটি নয় যে, তিনি আবারও ‘টাকো’ (ট্রাম্প অলওয়েজ চিকেনস আউট বা ট্রাম্প সবসময় রণে ভঙ্গ দেন) মুহূর্তের জন্ম দিয়েছেন কি না। বরং প্রশ্ন হলো, ট্রাম্প নিজে চাইলেও ইরানের বিরুদ্ধে তার এই যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসতে পারবেন কি না।
কয়েক দিনের পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের পর, সোমবার ট্রাম্প এই সংঘাতে প্রথমবারের মতো সম্ভাব্য উত্তেজনা হ্রাসের ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন, ইরানের সাথে ফলপ্রসূ আলোচনায় ১৫টি বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে। তবে তেহরান জানিয়েছে, তাদের মধ্যে এমন কোনো আলোচনাই হয়নি।
সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক বিশ্লেষণ হলো, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়ই এমন এক পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে, যেখানে সংঘাত আরও বৃদ্ধির পরিণতি এতটাই ভয়াবহ হবে যে, দুই পক্ষেরই এখন এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার একটি পথ প্রয়োজন। এ ধরনের উপলব্ধি অনেক সময় যুদ্ধের অবসান ঘটাতে ভূমিকা রাখে।
জ্বালানি তেল রপ্তানির অন্যতম প্রধান জলপথ হরমুজ প্রণালী খুলে না দিলে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে বোমা হামলার হুমকি দিয়ে দুই শত্রু দেশকেই খাদের কিনারায় ঠেলে দিয়েছিলেন ট্রাম্প। জবাবে মার্কিন মিত্র উপসাগরীয় দেশগুলোর গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংস করে দেওয়ার পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়েছিল তেহরান। এই ভয়াবহ সংঘাত একটি বৈশ্বিক মন্দার সূচনা করতে পারত এবং ট্রাম্প যেসব সাধারণ ইরানি নাগরিককে সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তাদের মানবিক সংকটকে আরও চরম আকার দিতে পারত।
তবে খুব শিগগিরই কোনো যুগান্তকারী সমাধান আসতে চলেছে, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশের যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

ট্রাম্পের টানা কয়েকদিনের অসংলগ্ন ও পরস্পরবিরোধী বক্তব্য এবং এই যুদ্ধের পক্ষে কোনো সুনির্দিষ্ট যুক্তি দাঁড় করাতে বা যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার কৌশল নির্ধারণে মার্কিন প্রশাসনের ব্যর্থতার অর্থ হলো, যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো একক বিবৃতিরই এখন আর কোনো বিশ্বাসযোগ্যতা নেই।
ইরানে নিজের বেঁধে দেওয়া সময়সীমার মধ্যেই বোমা হামলার যে অভ্যাস প্রেসিডেন্টের রয়েছে, তাতে তিনি যদি দেশটির বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে হামলার ওপর নিজের দেওয়া পাঁচ দিনের স্থগিতাদেশ নিজেই ভঙ্গ করেন, তবে এতে কেউ অবাক হবে না।
নিন্দুকেরা তো এও বলছেন যে, বিশ্ববাজারে লেনদেনের পুরো সপ্তাহ জুড়েই প্রেসিডেন্টের এই স্থগিতাদেশ বহাল থাকবে। সাপ্তাহিক ছুটির পর শেয়ারের আগাম লেনদেনে (স্টক ফিউচারস) ধস ও তেলের দাম হু হু করে বাড়তে থাকায়, তিনি কি কেবল বাজারে স্থিতিশীলতার একটি সুরক্ষা বলয় তৈরি করতে চাইছিলেন?
বাজারের অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে সরকারি বিবৃতি দেওয়ার ঘটনা এবারই প্রথম নয়। এই কৌশলটি আবারও কাজে লেগেছে- সোমবার ডাউ জোনস, এসঅ্যান্ডপি ৫০০ এবং নাসডাক সব সূচকই ১ শতাংশের বেশি বেড়েছে। অন্যদিকে, বিশ্ববাজারে তেলের বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১১ শতাংশ কমেছে। এর ফলে মার্কিন গাড়িচালকরা গ্যাস স্টেশনগুলোতে জ্বালানির দামে কিছুটা স্বস্তির আশা করতে পারেন।
কেন ট্রাম্পের উত্তেজনা কমানো প্রয়োজন
ট্রাম্প হয়ত ভিন্ন আরেকটি কারণেও সময় নিতে চাইছেন। তা হলো- ইরানের তেলশিল্পের প্রাণকেন্দ্র ও গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক হাব খারগ দ্বীপ আক্রমণ কিংবা প্রণালীর আশেপাশের দ্বীপ ও উপকূলীয় অঞ্চলগুলো দখলের জন্য প্রয়োজনীয় মার্কিন বাহিনী এখনো পুরোপুরি একত্রিত হতে পারেনি। জাপান থেকে রওনা হওয়া মার্কিন মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিটের একটি দল হয়তো খুব শিগগিরই ওই অঞ্চলে পৌঁছাবে। তবে দ্বিতীয় আরেকটি দল মাত্র গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূল থেকে যাত্রা শুরু করেছে।
এখানে এটিও মনে রাখা প্রয়োজন যে, ট্রাম্প অতিরঞ্জন বা বাড়িয়ে বলতে পছন্দ করেন। অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, কূটনৈতিক অগ্রগতির বিষয়ে তার ব্যাপক উচ্ছ্বাস এবং ইরান চুক্তির জন্য মরিয়া হয়ে আছে-তার এই দাবিগুলো নেহাতই অতিরঞ্জিত হতে পারে। যদিও সংকট সমাধানের পথ তৈরি করতে রাষ্ট্রনায়কেরা অনেক সময় কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ইচ্ছাকৃতভাবে এমন বিভ্রান্তির বা ছলনার আশ্রয় নিয়ে থাকেন।
একদিন যুদ্ধের অবসান ঘটানোর কথা বলা এবং পরদিনই আবার তা উসকে দেওয়ার মতো প্রেসিডেন্টের চরম অস্থির আচরণ যুদ্ধকালীন নেতৃত্বের সাথে একেবারেই বেমানান। তবে এটি ট্রাম্পের একেবারেই স্বভাবজাত বিষয়। গত ২৩ মার্চ নাগাদ এই পুরো বিষয়টিকেই তার এমন একটি ফন্দি বলে মনে হচ্ছিল, যার মাধ্যমে তিনি দাবি করতে পারেন যে তার কঠোর কৌশল কূটনৈতিক অগ্রগতি এনে দিয়েছে।
নিজের তৈরি করা সংকটগুলো সামাল দেওয়ার এই খামখেয়ালিপনা ও প্রবণতা ট্রাম্পের ব্যক্তিগত জীবন, ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক ক্যারিয়ার, এমনকি বিচার ব্যবস্থার সাথে তার একাধিক আইনি জটিলতার ঘটনা থেকেই সবার কাছে পরিচিত। তার প্রতিটি দিনই যেন দিন শেষে কোনোমতে টিকে থাকার এক লড়াই হিসেবে সামনে আসে। এই কৌশল ব্যবহার করে ট্রাম্প এক অন্তহীন তাৎক্ষণিক কৌশল বদলের খেলায় তার চূড়ান্ত জবাবদিহিতা বিলম্বিত করেন এবং নিজের কর্মকাণ্ডের সবচেয়ে খারাপ পরিণতিগুলো পিছিয়ে দেন।
তবে এমন একটি আশংকাও রয়েছে যে, পারস্য উপসাগরে ট্রাম্পের এই খামখেয়ালি কৌশল হয়তো চূড়ান্ত পরীক্ষার মুখে পড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরান হয়ত অস্ত্রশস্ত্র ও সামরিক শক্তির দিক থেকে পিছিয়ে রয়েছে এবং এমন এক যুদ্ধে তাদের নৌ, বিমান ও স্থলবাহিনীর সম্পদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে যে যুদ্ধে এরই মধ্যে ইসলামি ধর্মতান্ত্রিক সরকারের শীর্ষ নেতারা প্রাণ হারিয়েছেন।
কিন্তু এই সংঘাত যখন চতুর্থ সপ্তাহে গড়িয়েছে, তখন হরমুজ প্রণালী কার্যকরভাবে বন্ধ করে দিয়ে এবং বিশ্ব অর্থনীতিকে (সেইসাথে আগামী নভেম্বরের নির্বাচনে রিপাবলিকানদের রাজনৈতিক আশাকে) জিম্মি করার মাধ্যমে ইরান নিজেদের ক্ষমতারও জানান দিয়েছে।
যুক্তি বলে, যুদ্ধের আগেই যে শাসনব্যবস্থা চরম কট্টরপন্থী ছিল, নিজেদের সর্বোচ্চ নেতার হত্যাকাণ্ড এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি ক্ষেপণাস্ত্র ও যুদ্ধবিমানের প্রবল হামলা সহ্য করার পর ট্রাম্পের দাবিগুলোর প্রতি তাদের নমনীয় হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
যুদ্ধ অবসানে ট্রাম্পের দেওয়া শর্তগুলো যার মধ্যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্প থেকে সরে আসার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে যা সমঝোতার পথে বড় বাধা বা অগ্রহণযোগ্য হতে পারে। এর কারণ হলো, গত তিন সপ্তাহের ঘটনাপ্রবাহ স্পষ্টভাবেই দেখিয়ে দিয়েছে যে, বিদেশি শক্তির ভবিষ্যৎ হামলা থেকে বাঁচতে কেন একটি একগুঁয়ে শাসনব্যবস্থা এ ধরনের ‘সুরক্ষাকবচ’ বেছে নিতে পারে।

এমনকি যদি আলোচনা শুরুও হয় এবং পাকিস্তান ইতোমধ্যে তা আয়োজনের প্রস্তাব দিয়েছে, তবুও এটা স্পষ্ট নয় যে ইরানের হয়ে কে এই আলোচনায় অংশ নেবেন। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ঘটা এবং শীর্ষ নেতাদের হারানোর পর এই শাসনব্যবস্থার জন্য কোনো সম্মিলিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা কঠিন হতে পারে। আর কিছু বিশেষজ্ঞের ধারণা অনুযায়ী, যদি ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) এখন পুরো নিয়ন্ত্রণ নিয়ে থাকে, তবে তাদের অবস্থান আগের চেয়েও বেশি কট্টরপন্থী হতে পারে।
তাছাড়া, অতীতে ওয়াশিংটন তুলনামূলকভাবে মধ্যপন্থী ইরানি কর্মকর্তাদের সাথে আলোচনায় বসলেও শেষ পর্যন্ত দেখা গেছে যে, কট্টরপন্থীরা কোনো ধরনের আপসের ঘোর বিরোধী অবস্থান নিয়েছে।
এটিও অবাক হওয়ার মতো কোনো বিষয় হবে না, যদি ইরানের নেতারা মার্কিন প্রেসিডেন্টের বারবার সিদ্ধান্ত বদল, স্ববিরোধী বক্তব্য এবং আবেগপ্রবণ সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টগুলোকে তাদের সফলতার লক্ষণ হিসেবে ধরে নেন। তারা হয়ত মনে করছেন যে, ট্রাম্পের ওপর অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টির যে কৌশল তারা নিয়েছেন, তা আসলেই কাজে দিচ্ছে।
ট্রাম্পের সামনে থাকা প্রায় সব বিকল্পই কেন খারাপ
ইরানে ভবিষ্যতে কী ঘটতে যাচ্ছে, তা কেউই নিশ্চিত করে বলতে পারে না। এমনটা হতেই পারে যে, শীর্ষ নেতাদের গুপ্তহত্যা এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি হামলা দেশটির শাসনব্যবস্থায় মারাত্মক ফাটল ধরিয়েছে, যা হয়তো এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। তবে এখন পর্যন্ত এই শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ার কোনো সুস্পষ্ট প্রকাশ্য লক্ষণ চোখে পড়েনি।
বিমান হামলার কারণে এই অঞ্চলে ইরানের তৈরি করা হুমকি মারাত্মকভাবে কমে গেছে। কিন্তু এত ব্যাপক বলপ্রয়োগ করেও যদি দেশটিকে এখনো মাথা নত করানো না গিয়ে থাকে, তবে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বড় কোনো ছাড় আদায় করা ছাড়া ইরান কেন তাদের প্রধান হাতিয়ার অর্থাৎ হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দেবে, তার কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা ট্রাম্প এখনো দিতে পারেননি।
তবে প্রেসিডেন্ট কেন আলোচনার সম্ভাবনায় প্রলুব্ধ হতে পারেন, তা সহজেই অনুমেয়। তার এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার একটি পথ প্রয়োজন, কারণ তার সামনে থাকা সম্ভাব্য বিকল্পগুলোর অনেকগুলোই সুবিধার না।
প্রণালীর চারপাশে থাকা ইরানি সম্পদগুলোর ওপর মার্কিন হামলা কেন্দ্রীভূত করার মাধ্যমে ট্রাম্প এই যুদ্ধকে আরও জোরদার করতে পারেন। তবে এতে তেহরানের সক্ষমতা এতটাই কমে যাবে যে জাহাজ চলাচলের জন্য তা নিরাপদ হবে, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। ট্রাম্প চাইলে স্থলবাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্তও নিতে পারেন। কিন্তু এটি এমন এক চূড়ান্ত রাজনৈতিক সীমা (পলিটিক্যাল রুবিকন) অতিক্রম করার শামিল হবে, যা সেই অন্তহীন যুদ্ধগুলোর স্মৃতি ফিরিয়ে আনবে, যেগুলোর বিরুদ্ধে ট্রাম্প বরাবরই অবস্থান নিয়েছেন।
এবার টাকো অর্থ্যাৎ ট্রাম্পের রণে ভঙ্গ দেওয়ার বিষয়ে ফেরত যাওয়া যাক।
টাকো সত্যিই এখন বিকল্প হোক বা না হোক, বিজয়ের একটি ঘোষণা বেশ আকর্ষণীয় বলেই মনে হচ্ছে। তবে এই সংঘাত থেকে পিছু হটার অর্থ হলো, যেসব মার্কিন উপসাগরীয় মিত্র তার এই যুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল, তাদের একটি ক্ষুব্ধ ও ক্ষমতাবান ইরানের সামনে অরক্ষিত অবস্থায় ফেলে দেওয়া।
ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত সুরক্ষিত না করেই যুদ্ধের সমাপ্তি টানা হলে, তা হয়ত ভবিষ্যতে কোনো একদিন দেশটিকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দিকে ধাবিত হওয়ার সুযোগ করে দেবে এবং এই যুদ্ধের পক্ষে ট্রাম্পের দেওয়া সবচেয়ে ধারাবাহিক যুক্তিটিকেই দুর্বল করে দেবে।
প্রেসিডেন্টরা প্রায়ই এমন সব সংকটের মুখোমুখি হন, যেখানে কোনো ভালো বিকল্প হাতে থাকে না। কিন্তু ট্রাম্প ইরানে নিজেই নিজের জন্য যে ধরনের জটিল পরিস্থিতি তৈরি করেছেন, এমন দুরূহ পরিস্থিতির মুখে খুব কম প্রেসিডেন্টকেই পড়তে হয়।