চরচা প্রতিবেদক

মুক্তিযুদ্ধের এক বীর সেনানি সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। ২৭ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করে তিনি বিশ্বকে জানিয়ে দিয়েছিলেন গণহত্যা আর ধ্বংসযজ্ঞ বাঙালিকে বিলীন করে দিতে পারেনি। বাঙালি বরং আরও দৃঢ় প্রতিজ্ঞ স্বাধীনতা আদায়ের জন্য। নিজেদের স্বাধিকারের জন্য বাঙালি প্রস্তুত সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারে। ২৭ মার্চ কালুরঘাট থেকে করা সেই স্বাধীনতার ঘোষণা ২৫ মার্চ কালরাতের ধাক্কা সামলে বাঙালিকে করেছিল আত্মপ্রত্যয়ী।
হঠাৎ করেই কালুরঘাট বেতারকেন্দ্রে গিয়ে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেননি জিয়াউর রহমান। বরং সেই ঘোষণাটি ছিল বেশ অনেক দিনের প্রস্তুতির চূড়ান্তরূপ। সেই ঘোষণাটি দিয়েই মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন জিয়া। তাঁর সামনে তখন হয় মাতৃভূমির মুক্তি নয়তো মৃত্যু।
১৯৭২ সালে ২৬ মার্চ দেশের প্রথম স্বাধীনতা দিবসে দৈনিক বাংলা পত্রিকার এক বিশেষ আয়োজনে ‘একটি জাতির জন্ম’ শিরোনামে একটি লেখা লিখেছিলেন জিয়াউর রহমান। তিনি মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার হিসেবেই লেখাটি লিখেছিলেন, নিজের যুদ্ধ অভিজ্ঞতা ও যুদ্ধের প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে। সেই সঙ্গে ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে শেখ মুজিবের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা তাঁকে দেশব্যাপি করে তুলেছিল ভীষণ পরিচিত। দেশের মানুষের মুখে মুখে তখন জিয়াউর রহমানের নাম। তিনি তখন একজন বীর। স্বাধীনতার পর নিয়োগ পেয়েছিলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উপপ্রধান হিসেবে।
একটি জাতির জন্ম ছিল একটি দীর্ঘ লেখা। সেখানে তিনি একজন বাঙালি হিসেবে পাকিস্তান রাষ্ট্রের কাঠামোতে কোন ধরনের বৈষম্যের শিকার হতেন, সে বিষয়ে বিশদভাবেই লিখেছেন। বর্ণনা করেছেন পশ্চিম পাকিস্তানের কাছে পূর্ব পাকিস্তান বা আজকের বাংলাদেশ যে নিতান্তই একটি উপনিবেশ ছিল সে বিষয়টি। বাঙালি জাতীয়তাবাদের উন্মেষ নিয়ে জিয়া লিখেছিলেন, “পাকিস্তান সৃষ্টির পরই ঐতিহাসিক ঢাকা নগরীতে মিস্টার জিন্নাহ যে দিন ঘোষণা করলেন উর্দু এবং একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা, আমার মতে ঠিক সেদিনই বাঙালি হৃদয়ে অংকুরিত হয়েছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদ।”
পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমির বিভিন্ন বৈষম্যের কথাও তুলে ধরেছেন জিয়া ‘একটি জাতির জন্মে’। তিনি লেখায় বেশ কয়েকবার পাকিস্তানকে ‘অস্বাভাবিক রাষ্ট্র’ বলেছেন। জিয়া এক জায়গায় লিখেছেন, “স্কুল জীবন থেকেই পাকিস্তানিদের দৃষ্টিভঙ্গির অস্বচ্ছতা আমাকে পীড়া দিত। আমি জানতাম অন্তর দিয়ে ওরা আমাদের ঘৃণা করে। স্কুল জীবনেই বহুদিন শুনেছি আমার স্কুল বন্ধুদের আলোচনা। তাদের অভিভাবকেরা বাড়িতে বলত, তা–ই তারা রোমন্থন করত স্কুল প্রাঙ্গনে।”
স্কুল জীবনেই প্রতিজ্ঞা করেছিলেন জিয়া। সেটি পাকিস্তানের রাষ্ট্রকাঠামোকে আঘাত করারই, “বাঙালিদের মধ্যে একটা ঘৃণার বীজ উপ্ত করে দেওয়া হতো স্কুল ছাত্রদের শিশু মনেই। শিক্ষা দেওয়া হতো বাঙালিকে নিকৃষ্টতম জাতি রূপে বিবেচনা করতে। অনেক সময়ই আমি থাকতাম নীরব শ্রোতা। আবার মাঝেমধ্যে প্রত্যাঘাত হানতাম আমিও। সেই স্কুল জীবন থেকেই মনে মনে আমার একটা আকাঙ্খাই লালিত হতো, যদি কখনো দিন আসে তাহলে আমি এই পাকিস্তানের অস্তিত্বেই আঘাত হানব।”

পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার পর জিয়া দেখেছিলেন আরেক বৈষম্য। সামরিক বাহিনীতে নিয়োগের ক্ষেত্রে বাঙালিদের প্রতি বৈষম্য। পশ্চিম পাকিস্তানি, বিশেষ করে পাঞ্জাবিরা মনে করত, বাঙালিরা কখনোই ভালো সৈনিক নয়। তারা যুদ্ধ করতে জানে না। ভীতু, কাপুরুষ ধরনের জাতি। জিয়া লিখেছেন, ১৯৬৫ সালের পাকিস্তান–ভারত যুদ্ধে পাঞ্জাবিদের সেই বদ্ধমূল ধারণা ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিল বাঙালি সৈনিকেরা, ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট। জিয়া ১৯৬৫ সালের যুদ্ধ সম্পর্কে গর্ব করে লিখেছেন, “১৯৬৫ সালে ভারত–পাকিস্তান যুদ্ধ হচ্ছে আরও একটি উল্লেখযোগ্য বিষয়। সে সময়ে আমি ছিলাম পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যার নামে গর্ববোধ করতো তেমনি একটা ব্যাটালিয়নের কোম্পানি কমান্ডার। সেই ব্যাটালিয়ন এখন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীরও গর্বের বিষয়। খেম কারান রণাঙ্গনের বেদিয়ানে তখন আমরা যুদ্ধ করেছিলাম। সেখানে আমাদের ব্যাটালিয়ন বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করেছিল। এই ব্যাটালিয়নই লাভ করেছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মধ্যে দ্বিতীয় সর্বাধিক বীরত্ব পদক।”
স্কুল জীবনে পাকিস্তান রাষ্ট্রের ভিত্তিমূলে আঘাত করার যে চিন্তা জিয়াকে পেয়ে বসেছিল, সেই সুযোগ আসে ১৯৭১ সালে। এর আগে ১৯৭০ সাল অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে জিয়া নিয়োগ পান চট্টগ্রামে। সময়টা উত্তাল, একই সঙ্গে বাঙালিদের জন্য আশারও। সত্তরের ডিসেম্বরে পাকিস্তানের ইতিহাসে প্রথম জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যেটিতে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্ব আওয়ামী লীগ জাতীয় পরিষদে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। আওয়ামী লীগ জাতীয় পরিষদে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য বরাদ্দ ১৬৯ আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসন লাভ করে সরকার গঠনের ম্যান্ডেট অর্জন করে। জাতীয় পরিষদে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আসন ছিল জুলফিকার আলী ভূট্টোর পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি)—৮৮টি। বাঙালিরা সরকার গঠন করছে, শেখ মুজিব প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন, এটাই ছিল বাস্তবতা। কিন্তু পাকিস্তানিরা শুরু করে নানা ষড়যন্ত্র। নির্বাচনে জিতেও আওয়ামী লীগকে সরকার গঠন করতে দেওয়া হয়নি।
হঠাৎ করেই চট্টগ্রামে জিয়ার অষ্টম ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টকে পশ্চিম পাকিস্তানের খাড়িয়ানে স্থানান্তরিত করার সিদ্ধান্ত হয়। চট্টগ্রামে যে অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অস্ত্র ও গোলাবারুদের পরিমাণ ছিল নগন্য। এটা জিয়া তার লেখায় উল্লেখ করেছেন, “আমাদের তখন যেসব অস্ত্রশস্ত্র দেওয়া হয়েছিল তার মধ্যে ছিল তিনশ পুরানো ৩০৩ রাইফেল, চারটা লাইট মেশিন গান (এলএমজি) ও দুটি তিন ইঞ্চি মর্টার। আমাদের কাছে কোনো অ্যান্টি ট্যাঙ্ক গান ও ভারী মেশিনগান ছিল না।”
এর মধ্যেই জিয়া খবর পেয়েছিলেন, চট্টগ্রামে বিহারীদের বাড়িতে গোপনে থাকছে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আসা কমান্ডোরা। তারা বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ জমা করছে বিহারীদের বাড়িতে। এমনকি তারা রাতের অন্ধকারে বিহারী তরুণদের যুদ্ধের প্রশিক্ষণও দিচ্ছে। জিয়া বুঝে যান, অশুভর কিছু শিগগিরই ঘটতে যাচ্ছে।
জিয়া ১৯৭১ সালের ১ মার্চ ইয়াহিয়া খান যখন জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করে বাঙালিদের সঙ্গে বিশ্বাস ঘাতকতা করলেন, সেই সময়ের কথা লিখেছেন তার লেখায়। শেখ মুজিবুর রহমানের অসহযোগ আন্দোলনের সঙ্গে নিজেদের মানিসক সম্পৃক্ততার কথা বলেছেন। লেখার এই পর্যায়ে জিয়া মুজিবকে ‘জাতির পিতা’ সম্বোধন করেছেন।
‘একটি জাতির জন্ম’ শিরোনামের লেখায় জিয়াউর রহমান এক ভয়ংকর ঘটনার সাক্ষী হওয়ার কথা লিখেছেন, “এই সময় আমার ব্যাটালিয়নের এনসিওরা আমাকে জানায় প্রতিদিন সন্ধ্যায় বিংশতিতম বালুচ রেজিমেন্টের জওয়ানরা বেসামরিক পোশাক পরে, বেসামরিক ট্রাকে করে কোথায় যেন যায়। তারা ফিরে আসে শেষ রাতের দিকে। আমি উৎসুক হলাম। লোক লাগালাম খবর নিতে। খবর নিয়ে জানলাম প্রতি রাতেই তারা যায় কতগুলো নির্দিষ্ট বাঙালি পাড়ায়। সেখানে নির্বিচারে হত্যা করে বাঙালিদের।”
এর মধ্যেই অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি সৈনিকদের নিরস্ত্র করার খবর পান জিয়াউর রহমান। এ নিয়ে প্রচণ্ড ক্ষোভ দেখা দেয় বাঙালি সৈনিক, জেসিও ও এনসিওদের মধ্যে। জিয়া তার ঘনিষ্ঠ চার সহযোদ্ধার সঙ্গে এ নিয়ে পরামর্শ করেন। এরা চারজন হলেন মেজর মীর শওকত আলী, ক্যাপ্টেন শমসের মোবিন চৌধুরী, মেজর খালিকুজ্জামান চৌধুরী ও ক্যাপ্টেন অলি আহমেদ। জিয়া তাদের বলেছিলেন, সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করার সময় এগিয়ে আসছে। সবাইকে তিনি সতর্ক ও সজাগ থাকার নির্দেশ দেন।
এর মধ্যেই একদিন জিয়া ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের এক কথোপকথন শুনে ফেলেন এক ভোজসভায়। সেই ভোজসভাটি আয়োজিত হয়েছিল পাকিস্তানের চিফ অব স্টাফ জেনারেল আবদুল হামিদের সফর উপলক্ষে। সেখানে জেনারেল হামিদ ২০ বালুচ রেজিমেন্টের কমান্ডিং অফিসার লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফাতেমীকে নির্দেশ দিয়েছিলেন সংক্ষিপ্ত অপারেশনে ক্ষিপ্রগতিতে আর যতোটা সম্ভব কম লোকক্ষয়ে ‘কাজ সারতে’। জিয়া বুঝে যান শিগগিরই বাঙালি সৈনিকদের নিরস্ত্র করা হচ্ছে।
জিয়া তার লেখায় ২৪ মার্চ, ১৯৭১ চট্টগ্রাম বন্দরে সোয়াত জাহাজ থেকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ খালাসে পাকিস্তানি সেনাদের শক্তি প্রয়োগের কথা লিখেছেন। ওই জাহাজ থেকে যেন অস্ত্র খালাস না করা যায়, সেই লক্ষ্যে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ জনতাকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিরোধ তৈরি করেছিল। কিন্তু পাকিস্তানি সেনারা শক্তি প্রযোগ করে। অনেক বাঙালি নিহত হন সেই ঘটনায়।
২৫ মার্চের রাতে ঢাকায় পাকিস্তানি সেনারা গণহত্যা চালাল। চট্টগ্রামে বসে খবর পেলেন জিয়াউর রহমান। ২৫ ও ২৬ মার্চের মধ্যবর্তী রাতেই অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের কমান্ডিং অফিসার কর্নেল জানজুয়া জিয়াকে নির্দেশ দিলেন চট্টগ্রাম বন্দরে গিয়ে সোয়াত জাহাজ থেকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ খালাস করার। সেখানে ছিলেন মেজর জেনারেল আনসারি। সঙ্গে ছিল নৌবাহিনীর সেন্ট্রি (পশ্চিম পাকিস্তানি) জিয়াকে অবশ্য তিনজন নিজের লোক নেওয়ারও অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। জিয়া কী করবেন বুঝে উঠতে পারছিলেন না। তিনি একটা ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলেন, কমান্ডিং অফিসার তার জন্য এক ধরনের ফাঁদই তৈরি করেছেন। চট্টগ্রাম বন্দরে গেলে তার জীবন হুমকির মুখেও পড়তে পারে।

তবুও তিনি বন্দরের দিকে এগোলেন। পথে দেখা হলো মেজর খালিকুজ্জামানের সঙ্গে। পথে পথে ব্যারিকেড। খালিকুজ্জামার বার্তা নিয়ে এসেছিলেন ক্যাপ্টেন অলির কাছ থেকে। খালিকুজ্জামান জিয়াকে একটু আড়ালে ডেকে নিয়ে কানে কানে বলেন, চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টে সামরিক তৎপরতা ও বাঙালিদের হত্যা করার বিষয়টি।
জিয়া লিখেছেন, ওটাই ছিল চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময়। জিয়া ওই মুহূর্তে খালিকুজ্জামানের পাশে দাঁড়িয়েই বললেন, ‘উই রিভোল্ট’ আমরা বিদ্রোহ করলাম। তিনি খালিকুজ্জামানকে নির্দেশ দেন ষোলশহর বাজারে গিয়ে পাকিস্তানি অফিসারদের গ্রেপ্তার করতে। অলিকে ব্যাটালিয়ন তৈরি রাখার নির্দেশ দিতে ভুললেন না জিয়া।
তিনি ট্রাকের দিকে ফিরে এসে সবাইকে বললেন, তিনি বন্দরে যাবেন না। ট্রাকে চেপে বসে পাঞ্জাবি চালককে নির্দেশ দিলেন ট্রাক ঘুরিয়ে ক্যান্টনমেন্টের দিকে যেতে। ষোলশহর বাজারে ট্রাক পৌঁছাতেই জিয়া লাফ দিয়ে ট্রাক থেকে নেমে একটি রাইফেল হাতে তুলে পশ্চিম পাকিস্তানি সৈনিক ও অফিসারদের দিকে তাক করলেন। সবাই মুহূর্তে হতচকিত। নিজেদের অস্ত্র সমর্পণ করল তারা। পরিস্থিতি তখন জিয়ার নিয়ন্ত্রণে। একটা কাজ বাকি ছিল, সেটা ক্যান্টনমেন্টে গিয়ে কমান্ডিং অফিসার জানজুয়াকে নিরস্ত্র করা। তিনি একটা জিপ নিয়ে ক্যান্টনমেন্টে গিয়ে সরাসরি চলে গেলেন জানজুয়ার বাড়িতে। কলিং বেল টিপতেই বেরিয়ে এলেন জিয়ার কমান্ডিং অফিসার। জিয়া ক্ষিপ্র গতিতে ঘরে ঢুকে তাকে গ্রেপ্তার করলেন। ব্যাটালিয়ন মেসের একটি কক্ষে তাকে বন্দী করা হলো। ক্যান্টনমেন্টে তার সঙ্গে মিলিত হলেন মীর শওকত আলী। তিনি হাত মেলাতেই জিয়া তাঁকে বললেন, আমরা বিদ্রোহ করেছি শওকত। যুদ্ধ শুরু। এর মধ্যেই মেজর খালিকুজ্জামান চট্টগ্রাম ইপিআরের কমান্ডিং অফিসার মেজর রফিকুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানান চট্টগ্রামে অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট বিদ্রোহ করে দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে যোগ দিয়েছে।
গোটা ব্যাটালিয়ন নিয়ে সবাই বেরিয়ে গেলেন ক্যান্টনমেন্ট থেকে। জিয়া যখন দেশ মাতৃকার ডাকে যুদ্ধ করার জন্য বেরিয়ে যাচ্ছেন, ক্যান্টনমেন্টের অফিসার্স কোয়ার্টারে তাঁর স্ত্রী ও দুই শিশুপুত্র। কে একজন বলেন, স্যার, ভাবীর সঙ্গে দেখা করে বিদায় নিয়ে নিন। জিয়া বললেন, ‘কোনো দরকার নেই। আমরা সবাই একই পথের পথিক। আমার সৈনিকেরা তো তাদের পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে পারছে না। আমি কীভাবে করি।’
অনিশ্চয়তার পথে যাত্রা শুরু হয় এর পরই। ‘একটি জাতির জন্ম’ জিয়া শেষ করেছেন এভাবে, “রাত ২টা বেজে ১৫ মিনিট। ২৬ মার্চ। ১৯৭১ সাল। রক্তের অক্ষরে বাঙালির হৃদয়ে লেখা একটি দিন। বাংলাদেশের জনরগণ চিরদিন মনে রাখবে এই দিনটিকে। এই দিনটিকে তারা কোনোদিন ভুলবে না। কো–নো–দি–ন–না।”

মুক্তিযুদ্ধের এক বীর সেনানি সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। ২৭ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করে তিনি বিশ্বকে জানিয়ে দিয়েছিলেন গণহত্যা আর ধ্বংসযজ্ঞ বাঙালিকে বিলীন করে দিতে পারেনি। বাঙালি বরং আরও দৃঢ় প্রতিজ্ঞ স্বাধীনতা আদায়ের জন্য। নিজেদের স্বাধিকারের জন্য বাঙালি প্রস্তুত সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারে। ২৭ মার্চ কালুরঘাট থেকে করা সেই স্বাধীনতার ঘোষণা ২৫ মার্চ কালরাতের ধাক্কা সামলে বাঙালিকে করেছিল আত্মপ্রত্যয়ী।
হঠাৎ করেই কালুরঘাট বেতারকেন্দ্রে গিয়ে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেননি জিয়াউর রহমান। বরং সেই ঘোষণাটি ছিল বেশ অনেক দিনের প্রস্তুতির চূড়ান্তরূপ। সেই ঘোষণাটি দিয়েই মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন জিয়া। তাঁর সামনে তখন হয় মাতৃভূমির মুক্তি নয়তো মৃত্যু।
১৯৭২ সালে ২৬ মার্চ দেশের প্রথম স্বাধীনতা দিবসে দৈনিক বাংলা পত্রিকার এক বিশেষ আয়োজনে ‘একটি জাতির জন্ম’ শিরোনামে একটি লেখা লিখেছিলেন জিয়াউর রহমান। তিনি মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার হিসেবেই লেখাটি লিখেছিলেন, নিজের যুদ্ধ অভিজ্ঞতা ও যুদ্ধের প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে। সেই সঙ্গে ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে শেখ মুজিবের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা তাঁকে দেশব্যাপি করে তুলেছিল ভীষণ পরিচিত। দেশের মানুষের মুখে মুখে তখন জিয়াউর রহমানের নাম। তিনি তখন একজন বীর। স্বাধীনতার পর নিয়োগ পেয়েছিলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উপপ্রধান হিসেবে।
একটি জাতির জন্ম ছিল একটি দীর্ঘ লেখা। সেখানে তিনি একজন বাঙালি হিসেবে পাকিস্তান রাষ্ট্রের কাঠামোতে কোন ধরনের বৈষম্যের শিকার হতেন, সে বিষয়ে বিশদভাবেই লিখেছেন। বর্ণনা করেছেন পশ্চিম পাকিস্তানের কাছে পূর্ব পাকিস্তান বা আজকের বাংলাদেশ যে নিতান্তই একটি উপনিবেশ ছিল সে বিষয়টি। বাঙালি জাতীয়তাবাদের উন্মেষ নিয়ে জিয়া লিখেছিলেন, “পাকিস্তান সৃষ্টির পরই ঐতিহাসিক ঢাকা নগরীতে মিস্টার জিন্নাহ যে দিন ঘোষণা করলেন উর্দু এবং একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা, আমার মতে ঠিক সেদিনই বাঙালি হৃদয়ে অংকুরিত হয়েছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদ।”
পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমির বিভিন্ন বৈষম্যের কথাও তুলে ধরেছেন জিয়া ‘একটি জাতির জন্মে’। তিনি লেখায় বেশ কয়েকবার পাকিস্তানকে ‘অস্বাভাবিক রাষ্ট্র’ বলেছেন। জিয়া এক জায়গায় লিখেছেন, “স্কুল জীবন থেকেই পাকিস্তানিদের দৃষ্টিভঙ্গির অস্বচ্ছতা আমাকে পীড়া দিত। আমি জানতাম অন্তর দিয়ে ওরা আমাদের ঘৃণা করে। স্কুল জীবনেই বহুদিন শুনেছি আমার স্কুল বন্ধুদের আলোচনা। তাদের অভিভাবকেরা বাড়িতে বলত, তা–ই তারা রোমন্থন করত স্কুল প্রাঙ্গনে।”
স্কুল জীবনেই প্রতিজ্ঞা করেছিলেন জিয়া। সেটি পাকিস্তানের রাষ্ট্রকাঠামোকে আঘাত করারই, “বাঙালিদের মধ্যে একটা ঘৃণার বীজ উপ্ত করে দেওয়া হতো স্কুল ছাত্রদের শিশু মনেই। শিক্ষা দেওয়া হতো বাঙালিকে নিকৃষ্টতম জাতি রূপে বিবেচনা করতে। অনেক সময়ই আমি থাকতাম নীরব শ্রোতা। আবার মাঝেমধ্যে প্রত্যাঘাত হানতাম আমিও। সেই স্কুল জীবন থেকেই মনে মনে আমার একটা আকাঙ্খাই লালিত হতো, যদি কখনো দিন আসে তাহলে আমি এই পাকিস্তানের অস্তিত্বেই আঘাত হানব।”

পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার পর জিয়া দেখেছিলেন আরেক বৈষম্য। সামরিক বাহিনীতে নিয়োগের ক্ষেত্রে বাঙালিদের প্রতি বৈষম্য। পশ্চিম পাকিস্তানি, বিশেষ করে পাঞ্জাবিরা মনে করত, বাঙালিরা কখনোই ভালো সৈনিক নয়। তারা যুদ্ধ করতে জানে না। ভীতু, কাপুরুষ ধরনের জাতি। জিয়া লিখেছেন, ১৯৬৫ সালের পাকিস্তান–ভারত যুদ্ধে পাঞ্জাবিদের সেই বদ্ধমূল ধারণা ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিল বাঙালি সৈনিকেরা, ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট। জিয়া ১৯৬৫ সালের যুদ্ধ সম্পর্কে গর্ব করে লিখেছেন, “১৯৬৫ সালে ভারত–পাকিস্তান যুদ্ধ হচ্ছে আরও একটি উল্লেখযোগ্য বিষয়। সে সময়ে আমি ছিলাম পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যার নামে গর্ববোধ করতো তেমনি একটা ব্যাটালিয়নের কোম্পানি কমান্ডার। সেই ব্যাটালিয়ন এখন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীরও গর্বের বিষয়। খেম কারান রণাঙ্গনের বেদিয়ানে তখন আমরা যুদ্ধ করেছিলাম। সেখানে আমাদের ব্যাটালিয়ন বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করেছিল। এই ব্যাটালিয়নই লাভ করেছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মধ্যে দ্বিতীয় সর্বাধিক বীরত্ব পদক।”
স্কুল জীবনে পাকিস্তান রাষ্ট্রের ভিত্তিমূলে আঘাত করার যে চিন্তা জিয়াকে পেয়ে বসেছিল, সেই সুযোগ আসে ১৯৭১ সালে। এর আগে ১৯৭০ সাল অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে জিয়া নিয়োগ পান চট্টগ্রামে। সময়টা উত্তাল, একই সঙ্গে বাঙালিদের জন্য আশারও। সত্তরের ডিসেম্বরে পাকিস্তানের ইতিহাসে প্রথম জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যেটিতে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্ব আওয়ামী লীগ জাতীয় পরিষদে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। আওয়ামী লীগ জাতীয় পরিষদে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য বরাদ্দ ১৬৯ আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসন লাভ করে সরকার গঠনের ম্যান্ডেট অর্জন করে। জাতীয় পরিষদে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আসন ছিল জুলফিকার আলী ভূট্টোর পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি)—৮৮টি। বাঙালিরা সরকার গঠন করছে, শেখ মুজিব প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন, এটাই ছিল বাস্তবতা। কিন্তু পাকিস্তানিরা শুরু করে নানা ষড়যন্ত্র। নির্বাচনে জিতেও আওয়ামী লীগকে সরকার গঠন করতে দেওয়া হয়নি।
হঠাৎ করেই চট্টগ্রামে জিয়ার অষ্টম ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টকে পশ্চিম পাকিস্তানের খাড়িয়ানে স্থানান্তরিত করার সিদ্ধান্ত হয়। চট্টগ্রামে যে অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অস্ত্র ও গোলাবারুদের পরিমাণ ছিল নগন্য। এটা জিয়া তার লেখায় উল্লেখ করেছেন, “আমাদের তখন যেসব অস্ত্রশস্ত্র দেওয়া হয়েছিল তার মধ্যে ছিল তিনশ পুরানো ৩০৩ রাইফেল, চারটা লাইট মেশিন গান (এলএমজি) ও দুটি তিন ইঞ্চি মর্টার। আমাদের কাছে কোনো অ্যান্টি ট্যাঙ্ক গান ও ভারী মেশিনগান ছিল না।”
এর মধ্যেই জিয়া খবর পেয়েছিলেন, চট্টগ্রামে বিহারীদের বাড়িতে গোপনে থাকছে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আসা কমান্ডোরা। তারা বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ জমা করছে বিহারীদের বাড়িতে। এমনকি তারা রাতের অন্ধকারে বিহারী তরুণদের যুদ্ধের প্রশিক্ষণও দিচ্ছে। জিয়া বুঝে যান, অশুভর কিছু শিগগিরই ঘটতে যাচ্ছে।
জিয়া ১৯৭১ সালের ১ মার্চ ইয়াহিয়া খান যখন জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করে বাঙালিদের সঙ্গে বিশ্বাস ঘাতকতা করলেন, সেই সময়ের কথা লিখেছেন তার লেখায়। শেখ মুজিবুর রহমানের অসহযোগ আন্দোলনের সঙ্গে নিজেদের মানিসক সম্পৃক্ততার কথা বলেছেন। লেখার এই পর্যায়ে জিয়া মুজিবকে ‘জাতির পিতা’ সম্বোধন করেছেন।
‘একটি জাতির জন্ম’ শিরোনামের লেখায় জিয়াউর রহমান এক ভয়ংকর ঘটনার সাক্ষী হওয়ার কথা লিখেছেন, “এই সময় আমার ব্যাটালিয়নের এনসিওরা আমাকে জানায় প্রতিদিন সন্ধ্যায় বিংশতিতম বালুচ রেজিমেন্টের জওয়ানরা বেসামরিক পোশাক পরে, বেসামরিক ট্রাকে করে কোথায় যেন যায়। তারা ফিরে আসে শেষ রাতের দিকে। আমি উৎসুক হলাম। লোক লাগালাম খবর নিতে। খবর নিয়ে জানলাম প্রতি রাতেই তারা যায় কতগুলো নির্দিষ্ট বাঙালি পাড়ায়। সেখানে নির্বিচারে হত্যা করে বাঙালিদের।”
এর মধ্যেই অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি সৈনিকদের নিরস্ত্র করার খবর পান জিয়াউর রহমান। এ নিয়ে প্রচণ্ড ক্ষোভ দেখা দেয় বাঙালি সৈনিক, জেসিও ও এনসিওদের মধ্যে। জিয়া তার ঘনিষ্ঠ চার সহযোদ্ধার সঙ্গে এ নিয়ে পরামর্শ করেন। এরা চারজন হলেন মেজর মীর শওকত আলী, ক্যাপ্টেন শমসের মোবিন চৌধুরী, মেজর খালিকুজ্জামান চৌধুরী ও ক্যাপ্টেন অলি আহমেদ। জিয়া তাদের বলেছিলেন, সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করার সময় এগিয়ে আসছে। সবাইকে তিনি সতর্ক ও সজাগ থাকার নির্দেশ দেন।
এর মধ্যেই একদিন জিয়া ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের এক কথোপকথন শুনে ফেলেন এক ভোজসভায়। সেই ভোজসভাটি আয়োজিত হয়েছিল পাকিস্তানের চিফ অব স্টাফ জেনারেল আবদুল হামিদের সফর উপলক্ষে। সেখানে জেনারেল হামিদ ২০ বালুচ রেজিমেন্টের কমান্ডিং অফিসার লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফাতেমীকে নির্দেশ দিয়েছিলেন সংক্ষিপ্ত অপারেশনে ক্ষিপ্রগতিতে আর যতোটা সম্ভব কম লোকক্ষয়ে ‘কাজ সারতে’। জিয়া বুঝে যান শিগগিরই বাঙালি সৈনিকদের নিরস্ত্র করা হচ্ছে।
জিয়া তার লেখায় ২৪ মার্চ, ১৯৭১ চট্টগ্রাম বন্দরে সোয়াত জাহাজ থেকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ খালাসে পাকিস্তানি সেনাদের শক্তি প্রয়োগের কথা লিখেছেন। ওই জাহাজ থেকে যেন অস্ত্র খালাস না করা যায়, সেই লক্ষ্যে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ জনতাকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিরোধ তৈরি করেছিল। কিন্তু পাকিস্তানি সেনারা শক্তি প্রযোগ করে। অনেক বাঙালি নিহত হন সেই ঘটনায়।
২৫ মার্চের রাতে ঢাকায় পাকিস্তানি সেনারা গণহত্যা চালাল। চট্টগ্রামে বসে খবর পেলেন জিয়াউর রহমান। ২৫ ও ২৬ মার্চের মধ্যবর্তী রাতেই অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের কমান্ডিং অফিসার কর্নেল জানজুয়া জিয়াকে নির্দেশ দিলেন চট্টগ্রাম বন্দরে গিয়ে সোয়াত জাহাজ থেকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ খালাস করার। সেখানে ছিলেন মেজর জেনারেল আনসারি। সঙ্গে ছিল নৌবাহিনীর সেন্ট্রি (পশ্চিম পাকিস্তানি) জিয়াকে অবশ্য তিনজন নিজের লোক নেওয়ারও অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। জিয়া কী করবেন বুঝে উঠতে পারছিলেন না। তিনি একটা ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলেন, কমান্ডিং অফিসার তার জন্য এক ধরনের ফাঁদই তৈরি করেছেন। চট্টগ্রাম বন্দরে গেলে তার জীবন হুমকির মুখেও পড়তে পারে।

তবুও তিনি বন্দরের দিকে এগোলেন। পথে দেখা হলো মেজর খালিকুজ্জামানের সঙ্গে। পথে পথে ব্যারিকেড। খালিকুজ্জামার বার্তা নিয়ে এসেছিলেন ক্যাপ্টেন অলির কাছ থেকে। খালিকুজ্জামান জিয়াকে একটু আড়ালে ডেকে নিয়ে কানে কানে বলেন, চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টে সামরিক তৎপরতা ও বাঙালিদের হত্যা করার বিষয়টি।
জিয়া লিখেছেন, ওটাই ছিল চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময়। জিয়া ওই মুহূর্তে খালিকুজ্জামানের পাশে দাঁড়িয়েই বললেন, ‘উই রিভোল্ট’ আমরা বিদ্রোহ করলাম। তিনি খালিকুজ্জামানকে নির্দেশ দেন ষোলশহর বাজারে গিয়ে পাকিস্তানি অফিসারদের গ্রেপ্তার করতে। অলিকে ব্যাটালিয়ন তৈরি রাখার নির্দেশ দিতে ভুললেন না জিয়া।
তিনি ট্রাকের দিকে ফিরে এসে সবাইকে বললেন, তিনি বন্দরে যাবেন না। ট্রাকে চেপে বসে পাঞ্জাবি চালককে নির্দেশ দিলেন ট্রাক ঘুরিয়ে ক্যান্টনমেন্টের দিকে যেতে। ষোলশহর বাজারে ট্রাক পৌঁছাতেই জিয়া লাফ দিয়ে ট্রাক থেকে নেমে একটি রাইফেল হাতে তুলে পশ্চিম পাকিস্তানি সৈনিক ও অফিসারদের দিকে তাক করলেন। সবাই মুহূর্তে হতচকিত। নিজেদের অস্ত্র সমর্পণ করল তারা। পরিস্থিতি তখন জিয়ার নিয়ন্ত্রণে। একটা কাজ বাকি ছিল, সেটা ক্যান্টনমেন্টে গিয়ে কমান্ডিং অফিসার জানজুয়াকে নিরস্ত্র করা। তিনি একটা জিপ নিয়ে ক্যান্টনমেন্টে গিয়ে সরাসরি চলে গেলেন জানজুয়ার বাড়িতে। কলিং বেল টিপতেই বেরিয়ে এলেন জিয়ার কমান্ডিং অফিসার। জিয়া ক্ষিপ্র গতিতে ঘরে ঢুকে তাকে গ্রেপ্তার করলেন। ব্যাটালিয়ন মেসের একটি কক্ষে তাকে বন্দী করা হলো। ক্যান্টনমেন্টে তার সঙ্গে মিলিত হলেন মীর শওকত আলী। তিনি হাত মেলাতেই জিয়া তাঁকে বললেন, আমরা বিদ্রোহ করেছি শওকত। যুদ্ধ শুরু। এর মধ্যেই মেজর খালিকুজ্জামান চট্টগ্রাম ইপিআরের কমান্ডিং অফিসার মেজর রফিকুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানান চট্টগ্রামে অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট বিদ্রোহ করে দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে যোগ দিয়েছে।
গোটা ব্যাটালিয়ন নিয়ে সবাই বেরিয়ে গেলেন ক্যান্টনমেন্ট থেকে। জিয়া যখন দেশ মাতৃকার ডাকে যুদ্ধ করার জন্য বেরিয়ে যাচ্ছেন, ক্যান্টনমেন্টের অফিসার্স কোয়ার্টারে তাঁর স্ত্রী ও দুই শিশুপুত্র। কে একজন বলেন, স্যার, ভাবীর সঙ্গে দেখা করে বিদায় নিয়ে নিন। জিয়া বললেন, ‘কোনো দরকার নেই। আমরা সবাই একই পথের পথিক। আমার সৈনিকেরা তো তাদের পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে পারছে না। আমি কীভাবে করি।’
অনিশ্চয়তার পথে যাত্রা শুরু হয় এর পরই। ‘একটি জাতির জন্ম’ জিয়া শেষ করেছেন এভাবে, “রাত ২টা বেজে ১৫ মিনিট। ২৬ মার্চ। ১৯৭১ সাল। রক্তের অক্ষরে বাঙালির হৃদয়ে লেখা একটি দিন। বাংলাদেশের জনরগণ চিরদিন মনে রাখবে এই দিনটিকে। এই দিনটিকে তারা কোনোদিন ভুলবে না। কো–নো–দি–ন–না।”