Advertisement Banner

ড্রোন যুদ্ধে এবার চীনের ‘লেজার তলোয়ার’

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
ড্রোন যুদ্ধে এবার চীনের ‘লেজার তলোয়ার’
লিজিয়ান-২ ও লিজিয়ান-৩ মডেলের ওজন যথাক্রমে ৩০ ও ২৫ কেজি। ছবি: সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট

যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন এখন আর শুধু একটি অস্ত্র নয়; এটি আধুনিক যুদ্ধের চরিত্রই বদলে দিয়েছে। ইউক্রেন থেকে মধ্যপ্রাচ্য– সবখানেই দেখা যাচ্ছে, কয়েকশ বা কয়েক হাজার ডলারের একটি ড্রোন কোটি ডলারের সামরিক সরঞ্জামকে অকার্যকর করে দিতে পারে। ফলে বিশ্বের বড় সামরিক শক্তিগুলোর সামনে নতুন প্রশ্ন–ড্রোনকে কীভাবে থামানো যাবে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে চীন এমন একটি প্রযুক্তি সামনে এনেছে, যা একসময় বিজ্ঞান কল্পকাহিনীর অংশ ছিল। এখন সেটি বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রের অস্ত্র হয়ে উঠছে। বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত ডিফেন্স ইনফরমেশন ইক্যুইপমেন্ট অ্যান্ড টেকনোলজি এক্সিবিশন-২০২৬-এ প্রদর্শন করা হয়েছে ‘লিজিয়ান’ সিরিজের বহনযোগ্য লেজার অস্ত্র। চীনা ভাষায় ‘লিজিয়ান’-এর অর্থ ‘ধারালো তরোয়াল’।

এই অস্ত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি একজন বা দুজন সৈনিকের পক্ষে ব্যাকপ্যাকে বহন করা সম্ভব। অর্থাৎ ড্রোন প্রতিরোধ আর শুধু বড় সামরিক ঘাঁটি বা বিশেষায়িত ইউনিটের কাজ নয়; ভবিষ্যতে সাধারণ পদাতিক ইউনিটও নিজেদের আকাশ প্রতিরক্ষা নিজেরাই গড়ে তুলতে পারবে।

লেজার অস্ত্রের ধারণা নতুন নয়। বহু বছর ধরেই যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ এ ধরনের প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে। কিন্তু সমস্যাটি ছিল আকার, শক্তি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ। অধিকাংশ লেজার ব্যবস্থা এত বড় ছিল যে সেগুলো জাহাজ, সাঁজোয়া যান বা স্থায়ী স্থাপনায় বসাতে হতো। চীনের নতুন উদ্যোগের গুরুত্ব এখানেই–তারা প্রযুক্তিটিকে ছোট আকারে নামিয়ে এনেছে।

প্রদর্শনীতে দেখানো লিজিয়ান-২ ও লিজিয়ান-৩ মডেলের ওজন যথাক্রমে ৩০ ও ২৫ কেজি। পুরো সিস্টেমে রয়েছে মাত্র তিনটি প্রধান অংশ–একটি লেজার নির্গমনকারী ইউনিট, একটি শীতলীকরণ ব্যবস্থা এবং একটি হাতে ধরা নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র। সবকিছু একটি ব্যাগে বহন করা যায়।

চীনা নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের দাবি, এই অস্ত্র ৫০০ মিটার দূরের ড্রোন ধ্বংস করতে পারে। বড় স্থায়ী সংস্করণগুলোর পাল্লা ১ হাজার ২০০ মিটার পর্যন্ত। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, লিজিয়ান-৩ মাত্র চার সেকেন্ডের মধ্যে একটি ড্রোনকে পুড়িয়ে ফেলতে সক্ষম। এরপর আবার নতুন লক্ষ্যবস্তুর জন্য প্রস্তুত হতে পাঁচ সেকেন্ডেরও কম সময় লাগে।

এখানে লেজার প্রযুক্তির একটি বড় সুবিধা রয়েছে। প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্র বা গোলাবারুদ ব্যবহার করলে প্রতিটি আক্রমণের জন্য নতুন অস্ত্র ব্যয় করতে হয়। কিন্তু লেজার অস্ত্রে মূল ব্যয় বিদ্যুৎ। ফলে দীর্ঘমেয়াদে এটি অনেক সাশ্রয়ী হতে পারে। বিশেষ করে যখন প্রতিপক্ষ শত শত সস্তা ড্রোন ব্যবহার করে আক্রমণ চালায়।

ইউক্রেন যুদ্ধ ড্রোন প্রযুক্তির গুরুত্ব নতুন করে সামনে এনেছে। যুদ্ধের শুরুতে ড্রোন ছিল নজরদারির একটি মাধ্যম। কিন্তু দ্রুতই তা হামলা, লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ এবং ঝাঁক বেধে আক্রমণের অস্ত্রে পরিণত হয়। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতগুলোও একই বাস্তবতা দেখিয়েছে। ফলে বিশ্বের সেনাবাহিনীগুলো এখন শুধু নতুন ড্রোন তৈরির প্রতিযোগিতায় নেই; বরং ড্রোন ধ্বংসের প্রযুক্তিকেও সমান গুরুত্ব দিচ্ছে।

চীনের নতুন লেজার অস্ত্র সেই বৃহত্তর প্রতিযোগিতারই অংশ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতের যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোনের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা হবে বহুস্তরবিশিষ্ট। দূরপাল্লায় ক্ষেপণাস্ত্র, মাঝারি দূরত্বে কামান এবং কাছাকাছি এলাকায় লেজার বা ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ব্যবস্থা ব্যবহার করা হবে। লিজিয়ান সিরিজ সেই শেষ স্তরের প্রতিরক্ষা হিসেবে কাজ করতে পারে।

চীনা নির্মাতারা আরও দাবি করেছেন, এই অস্ত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করা হয়েছে। এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করতে পারে এবং রাডার বা অন্য সেন্সরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ড্রোনের গতিপথ অনুসরণ করতে পারে। অর্থাৎ এটি শুধু একটি লেজার বন্দুক নয়; বরং বৃহত্তর অ্যান্টি-ড্রোন নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে কাজ করার জন্য তৈরি।

প্রদর্শনীতে শুধু লেজার অস্ত্র নয়, নতুন প্রজন্মের ড্রোন প্রযুক্তিও দেখানো হয়েছে। বিশেষভাবে নজর কেড়েছে ঝেজিয়াং বিশ্ববিদ্যালয়ের তৈরি শাঝুই-৩২০ সাবসনিক স্টেলথ ড্রোন। এটি ঝাঁক আকারে ব্যবহার করা সম্ভব। নির্মাতাদের দাবি, ৩০টি ড্রোন একসঙ্গে সমন্বিত আক্রমণ চালাতে পারে। প্রয়োজন হলে এগুলোকে লোইটারিং মিউনিশন বা আত্মঘাতী ড্রোনেও রূপান্তর করা যায়।

একই প্রদর্শনীতে ড্রোনের জন্য বিশেষ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক চিপও উপস্থাপন করা হয়েছে, যা স্বয়ংক্রিয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও নেভিগেশনে সহায়তা করবে। এটি দেখাচ্ছে, চীন শুধু ড্রোন ধ্বংসের প্রযুক্তি নয়, ড্রোন পরিচালনার প্রযুক্তিতেও সমানভাবে বিনিয়োগ করছে।

আসলে আধুনিক যুদ্ধের একটি নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। একদিকে আক্রমণাত্মক ড্রোন, অন্যদিকে সেগুলো ঠেকানোর প্রযুক্তি। এই দুইয়ের মধ্যকার প্রতিযোগিতাই আগামী দিনের যুদ্ধের গতিপথ নির্ধারণ করবে। যে দেশ দ্রুত, সস্তা এবং কার্যকর সমাধান দিতে পারবে, তারাই কৌশলগত সুবিধা পাবে।

চীনের লিজিয়ান সিরিজ সেই প্রতিযোগিতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এটি শুধু একটি নতুন অস্ত্র নয়; বরং যুদ্ধক্ষেত্রে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের ইঙ্গিত। আগে যেখানে আকাশ প্রতিরক্ষা ছিল উচ্চপর্যায়ের সামরিক ইউনিটের দায়িত্ব, সেখানে ভবিষ্যতে একজন সাধারণ সৈনিকও নিজের অবস্থানকে ড্রোন হামলা থেকে রক্ষা করতে সক্ষম হতে পারে।

ফলে প্রশ্নটি আর শুধু চীনের প্রযুক্তিগত অগ্রগতি নিয়ে নয়। প্রশ্ন হলো, বিশ্বের সামরিক শক্তিগুলো কি এখন এমন এক যুগে প্রবেশ করছে, যেখানে আকাশে ড্রোন আর মাটিতে লেজার–এই দ্বৈরথই হবে যুদ্ধের নতুন সংজ্ঞা? চীনের নতুন ‘লেজার তরোয়াল’ অন্তত সেই ভবিষ্যতেরই ইঙ্গিত দিচ্ছে।

সূত্র: সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট

সম্পর্কিত