চরচা প্রতিবেদক

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে দেশে জ্বালানি তেল নিয়ে আতঙ্ক ও অতিরিক্ত কেনাকাটা বাড়তে থাকায় বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে অবৈধ মজুত ও অতিরিক্ত দামে বিক্রি ঠেকাতে মাঠপর্যায়ে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছে সরকার। দেশের প্রধান জ্বালানি তেল ডিপোগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিতে সেনাবাহিনী মোতায়েন এবং ফিলিং স্টেশনগুলোতে শৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশি টহল জোরদার করার জরুরি নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।
একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং চাহিদা অনুযায়ী আমদানিও নিশ্চিত করা হয়েছে। ফলে তেল নিয়ে আতঙ্কের কোনো কারণ নেই।
ডিপোর নিরাপত্তায় সেনাবাহিনী
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিবের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে বিপিসি জানায়, জ্বালানি তেল বিপণনে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দেশের বিভিন্ন ডিপো থেকে ডিলাররা আকস্মিকভাবে বর্ধিত হারে তেল সংগ্রহের চাহিদা দিচ্ছে। বিশেষ করে চট্টগ্রামের পতেঙ্গা, খুলনার দৌলতপুর, সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ি, নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল ও ফতুল্লা, দিনাজপুরের পার্বতীপুর এবং বরিশালের প্রধান ডিপোগুলোতে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সৃষ্টির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার স্বার্থে এসব গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা (কেপিআই) রক্ষায় জরুরি ভিত্তিতে সেনাবাহিনী মোতায়েন প্রয়োজন বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
পাম্পে বিশৃঙ্খলা রোধে পুলিশি টহল
এদিকে, জ্বালানি সংকটের গুজবে সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ায় ফিলিং স্টেশনগুলোতে অতিরিক্ত তেল সংগ্রহের হিড়িক পড়েছে। বিপিসি জানিয়েছে, গত কয়েক দিনের তুলনায় গ্রাহকরা এখন স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে তেল সংগ্রহের চেষ্টা করছেন, যা অনেক ক্ষেত্রে অনুমোদিত সীমার বাইরে। এর ফলে ফিলিং স্টেশনগুলোতে গ্রাহকদের সঙ্গে কর্মীদের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটছে।
অবৈধ মজুত ঠেকাতে মোবাইল কোর্ট
এক বিজ্ঞপ্তিতে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী জ্বালানি তেলের বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরির উদ্দেশ্যে অবৈধভাবে মজুত করছে–এমন তথ্য বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
বিভাগটির নির্দেশনায় বলা হয়েছে, বিভিন্ন পেট্রোল পাম্প ও ফিলিং স্টেশনে সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে তেল বিক্রি, অতিরিক্ত মুনাফার আশায় মজুত, খোলা বাজারে বিক্রি এবং পাচারের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এসব অনিয়ম রোধে জেলা প্রশাসকদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, “জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুত, নির্ধারিত মূল্যের বেশি দামে বিক্রি, খোলা বাজারে বিক্রি ও পাচার রোধে প্রয়োজন অনুযায়ী মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করতে হবে।”
জ্বালানি বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. এনামুল হক স্বাক্ষরিত ওই নির্দেশনায় বাজারে নিয়মিত নজরদারি বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দরে তেল খালাস, সোমবার আসছে আরও ২ জাহাজ
সরকারি সূত্রগুলো বলছে, দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) পর্যাপ্ত মজুত ধরে রেখেছে। চট্টগ্রাম বন্দরে গত দুদিন ধরে একটি তেলবাহী জাহাজ থেকে তেল খালাস চলছে। বিপিসি জানিয়েছে, সোমবার আরও দুটি তেলবাহী জাহাজ বন্দরে পৌঁছাবে। কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এপ্রিল পর্যন্ত দেশের চাহিদা অনুযায়ী তেল আমদানির সূচি ইতোমধ্যে নিশ্চিত করা হয়েছে।
হরমুজ অবরোধে আমদানিতে প্রভাবের আশঙ্কা কম
হরমুজ প্রণালী ঘিরে আন্তর্জাতিক উত্তেজনা বাড়লেও বাংলাদেশে তেল আমদানিতে তা বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে না বলে মনে করছেন জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা। তাদের মতে, বাংলাদেশের অনেক তেলবাহী কার্গো চীনা জাহাজে পরিবাহিত হয় এবং এসব জাহাজ নিষেধাজ্ঞার বাইরে থাকায় সরবরাহে বড় কোনো বাধা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা নেই।
জ্বালানি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল পর্যন্ত ২ লাখ ৮০ হাজার টন ডিজেল আমদানি চূড়ান্ত করা হয়েছে এবং এর একটি অংশ দেশে পৌঁছাতে শুরু করেছে। এ ছাড়া ব্রুনাই থেকে আরও এক লাখ টন ডিজেল আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদন অব্যাহত রাখতে বর্তমানে দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য প্রায় ৫০ দিনের চাহিদা মেটানোর মতো ফার্নেস অয়েলের মজুত রয়েছে বলেও কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
আতঙ্কে তেল কিনতে পাম্পে দীর্ঘ লাইন
আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি নিয়ে গুজব ও সম্ভাব্য সংকটের আশঙ্কায় গত কয়েক দিনে দেশে তেল কেনায় অস্বাভাবিক চাপ দেখা গেছে। প্রয়োজনের তুলনায় বেশি তেল কেনার প্রবণতায় রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়।
গতকাল শনিবার পরিস্থিতি সবচেয়ে জটিল হয়ে ওঠে। অনেক জায়গায় সকাল গড়াতেই পাম্পে তেল শেষ হয়ে যায় এবং বিক্রি বন্ধ রাখতে হয়। রাজধানীর কয়েকটি পাম্পের সামনে এক থেকে দেড় কিলোমিটার দীর্ঘ গাড়ির সারি দেখা গেছে।
আজ রোববার রাজধানীর সংসদ ভবনের পাশের তালুকদার ফিলিং স্টেশনের সামনে গাড়ির সারি জিয়া উদ্যানের লেকের মোড় পর্যন্ত পৌঁছে যায়। শনিবার রাতেও আসাদগেট এলাকায় প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। কারওয়ান বাজার এলাকায় বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এটিএন বাংলার গাড়িচালক নজরুল ইসলাম বলেন, “শনিবার কয়েক ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও তেল পাইনি। আজ সকালেও কয়েকটি পাম্প ঘুরেও তেল পাওয়া যায়নি।”
অনেক জায়গায় দেখা গেছে, দীর্ঘ অপেক্ষার পর তেল পেয়ে চালকদের মুখে স্বস্তির হাসি ফুটেছে। আবার পরবর্তী সময়ে একই ভোগান্তির আশঙ্কায় সেই স্বস্তি দ্রুত মিলিয়ে গেছে।
জেলা শহরগুলোতেও একই চিত্র
খুলনা, সিলেট, রাজশাহী ও নোয়াখালীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও পাম্পে তেল নিতে ভিড় বেড়েছে। অনেক জায়গায় পাম্পগুলোতে সীমিত পরিমাণে তেল দেওয়া হচ্ছে, কোথাও আবার ‘তেল নেই’ লিখে বিক্রি বন্ধ রাখা হয়েছে।
খুলনা শহরের গল্লামারি, শিববাড়ি ও রূপসা এলকার পাম্পগুলোতে দেখা যায়, পেট্রোল সীমিত দেওয়া হলেও ডিজেল ও অকটেন নেই। শিববাড়ি মোড়ে তেল নিতে আসা মিরাজ হোসেন বলেন, “শহরের বেশির ভাগ পাম্পে ২০০ টাকার বেশি তেল দেওয়া হচ্ছে না। কোথাও আবার অকটেনই নেই।”

সরবরাহ নিয়ে পাম্প মালিকদের অভিযোগ
পাম্প মালিকদের একাংশ এই পরিস্থিতির জন্য সরবরাহ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাকে দায়ী করছেন। তাদের মতে, শুক্রবার ও শনিবার সরকারি ছুটির দিনে ডিপো থেকে সরবরাহ বন্ধ থাকায় পাম্পগুলোতে তেলের মজুত কম থাকে। পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতির একাংশের সভাপতি নাজমুল হক বলেন, “অনেকে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি তেল কিনছেন। ফলে দুপুরের মধ্যেই অনেক পাম্পে তেল শেষ হয়ে যাচ্ছে।” তার মতে, ছুটির দিনেও সীমিত আকারে ডিপো খোলা থাকলে এই ভোগান্তি অনেকটাই কমানো যেত।
শনিবার তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরেন বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু এবং প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। বৈঠক শেষে বিদ্যুৎমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, “দেশে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত তেল সংগ্রহের প্রয়োজন নেই। সোমবার আরও দুটি জাহাজ আসছে, তাই সরবরাহে কোনো সমস্যা হবে না।”
পেট্রোল ও অকটেনের বড় অংশই দেশীয় উৎপাদন
বিপিসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশের পেট্রোলের প্রায় পুরোটা এবং অকটেনের বড় অংশই দেশেই উৎপাদিত হয়। বাংলাদেশের পেট্রোল মূলত দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে পাওয়া কনডেনসেট প্রক্রিয়াজাত করে উৎপাদন করা হয়।
সরকারি প্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড এবং কয়েকটি বেসরকারি রিফাইনারি কনডেনসেট থেকে পেট্রোল, অকটেনসহ প্রায় ৪০ ধরনের পেট্রোলিয়াম পণ্য উৎপাদন করে। এসব প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত উৎপাদন ক্ষমতা বছরে প্রায় ১৬ লাখ টন।
অন্যদিকে দেশে পেট্রোল ও অকটেনের বার্ষিক চাহিদা ৮ থেকে সাড়ে ৮ লাখ টন। ফলে স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা বিবেচনায় এই দুই জ্বালানি নিয়ে বড় ধরনের সংকটের আশঙ্কা নেই বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে দেশে জ্বালানি তেল নিয়ে আতঙ্ক ও অতিরিক্ত কেনাকাটা বাড়তে থাকায় বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে অবৈধ মজুত ও অতিরিক্ত দামে বিক্রি ঠেকাতে মাঠপর্যায়ে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছে সরকার। দেশের প্রধান জ্বালানি তেল ডিপোগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিতে সেনাবাহিনী মোতায়েন এবং ফিলিং স্টেশনগুলোতে শৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশি টহল জোরদার করার জরুরি নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।
একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং চাহিদা অনুযায়ী আমদানিও নিশ্চিত করা হয়েছে। ফলে তেল নিয়ে আতঙ্কের কোনো কারণ নেই।
ডিপোর নিরাপত্তায় সেনাবাহিনী
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিবের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে বিপিসি জানায়, জ্বালানি তেল বিপণনে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দেশের বিভিন্ন ডিপো থেকে ডিলাররা আকস্মিকভাবে বর্ধিত হারে তেল সংগ্রহের চাহিদা দিচ্ছে। বিশেষ করে চট্টগ্রামের পতেঙ্গা, খুলনার দৌলতপুর, সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ি, নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল ও ফতুল্লা, দিনাজপুরের পার্বতীপুর এবং বরিশালের প্রধান ডিপোগুলোতে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সৃষ্টির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার স্বার্থে এসব গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা (কেপিআই) রক্ষায় জরুরি ভিত্তিতে সেনাবাহিনী মোতায়েন প্রয়োজন বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
পাম্পে বিশৃঙ্খলা রোধে পুলিশি টহল
এদিকে, জ্বালানি সংকটের গুজবে সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ায় ফিলিং স্টেশনগুলোতে অতিরিক্ত তেল সংগ্রহের হিড়িক পড়েছে। বিপিসি জানিয়েছে, গত কয়েক দিনের তুলনায় গ্রাহকরা এখন স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে তেল সংগ্রহের চেষ্টা করছেন, যা অনেক ক্ষেত্রে অনুমোদিত সীমার বাইরে। এর ফলে ফিলিং স্টেশনগুলোতে গ্রাহকদের সঙ্গে কর্মীদের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটছে।
অবৈধ মজুত ঠেকাতে মোবাইল কোর্ট
এক বিজ্ঞপ্তিতে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী জ্বালানি তেলের বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরির উদ্দেশ্যে অবৈধভাবে মজুত করছে–এমন তথ্য বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
বিভাগটির নির্দেশনায় বলা হয়েছে, বিভিন্ন পেট্রোল পাম্প ও ফিলিং স্টেশনে সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে তেল বিক্রি, অতিরিক্ত মুনাফার আশায় মজুত, খোলা বাজারে বিক্রি এবং পাচারের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এসব অনিয়ম রোধে জেলা প্রশাসকদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, “জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুত, নির্ধারিত মূল্যের বেশি দামে বিক্রি, খোলা বাজারে বিক্রি ও পাচার রোধে প্রয়োজন অনুযায়ী মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করতে হবে।”
জ্বালানি বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. এনামুল হক স্বাক্ষরিত ওই নির্দেশনায় বাজারে নিয়মিত নজরদারি বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দরে তেল খালাস, সোমবার আসছে আরও ২ জাহাজ
সরকারি সূত্রগুলো বলছে, দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) পর্যাপ্ত মজুত ধরে রেখেছে। চট্টগ্রাম বন্দরে গত দুদিন ধরে একটি তেলবাহী জাহাজ থেকে তেল খালাস চলছে। বিপিসি জানিয়েছে, সোমবার আরও দুটি তেলবাহী জাহাজ বন্দরে পৌঁছাবে। কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এপ্রিল পর্যন্ত দেশের চাহিদা অনুযায়ী তেল আমদানির সূচি ইতোমধ্যে নিশ্চিত করা হয়েছে।
হরমুজ অবরোধে আমদানিতে প্রভাবের আশঙ্কা কম
হরমুজ প্রণালী ঘিরে আন্তর্জাতিক উত্তেজনা বাড়লেও বাংলাদেশে তেল আমদানিতে তা বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে না বলে মনে করছেন জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা। তাদের মতে, বাংলাদেশের অনেক তেলবাহী কার্গো চীনা জাহাজে পরিবাহিত হয় এবং এসব জাহাজ নিষেধাজ্ঞার বাইরে থাকায় সরবরাহে বড় কোনো বাধা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা নেই।
জ্বালানি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল পর্যন্ত ২ লাখ ৮০ হাজার টন ডিজেল আমদানি চূড়ান্ত করা হয়েছে এবং এর একটি অংশ দেশে পৌঁছাতে শুরু করেছে। এ ছাড়া ব্রুনাই থেকে আরও এক লাখ টন ডিজেল আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদন অব্যাহত রাখতে বর্তমানে দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য প্রায় ৫০ দিনের চাহিদা মেটানোর মতো ফার্নেস অয়েলের মজুত রয়েছে বলেও কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
আতঙ্কে তেল কিনতে পাম্পে দীর্ঘ লাইন
আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি নিয়ে গুজব ও সম্ভাব্য সংকটের আশঙ্কায় গত কয়েক দিনে দেশে তেল কেনায় অস্বাভাবিক চাপ দেখা গেছে। প্রয়োজনের তুলনায় বেশি তেল কেনার প্রবণতায় রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়।
গতকাল শনিবার পরিস্থিতি সবচেয়ে জটিল হয়ে ওঠে। অনেক জায়গায় সকাল গড়াতেই পাম্পে তেল শেষ হয়ে যায় এবং বিক্রি বন্ধ রাখতে হয়। রাজধানীর কয়েকটি পাম্পের সামনে এক থেকে দেড় কিলোমিটার দীর্ঘ গাড়ির সারি দেখা গেছে।
আজ রোববার রাজধানীর সংসদ ভবনের পাশের তালুকদার ফিলিং স্টেশনের সামনে গাড়ির সারি জিয়া উদ্যানের লেকের মোড় পর্যন্ত পৌঁছে যায়। শনিবার রাতেও আসাদগেট এলাকায় প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। কারওয়ান বাজার এলাকায় বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এটিএন বাংলার গাড়িচালক নজরুল ইসলাম বলেন, “শনিবার কয়েক ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও তেল পাইনি। আজ সকালেও কয়েকটি পাম্প ঘুরেও তেল পাওয়া যায়নি।”
অনেক জায়গায় দেখা গেছে, দীর্ঘ অপেক্ষার পর তেল পেয়ে চালকদের মুখে স্বস্তির হাসি ফুটেছে। আবার পরবর্তী সময়ে একই ভোগান্তির আশঙ্কায় সেই স্বস্তি দ্রুত মিলিয়ে গেছে।
জেলা শহরগুলোতেও একই চিত্র
খুলনা, সিলেট, রাজশাহী ও নোয়াখালীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও পাম্পে তেল নিতে ভিড় বেড়েছে। অনেক জায়গায় পাম্পগুলোতে সীমিত পরিমাণে তেল দেওয়া হচ্ছে, কোথাও আবার ‘তেল নেই’ লিখে বিক্রি বন্ধ রাখা হয়েছে।
খুলনা শহরের গল্লামারি, শিববাড়ি ও রূপসা এলকার পাম্পগুলোতে দেখা যায়, পেট্রোল সীমিত দেওয়া হলেও ডিজেল ও অকটেন নেই। শিববাড়ি মোড়ে তেল নিতে আসা মিরাজ হোসেন বলেন, “শহরের বেশির ভাগ পাম্পে ২০০ টাকার বেশি তেল দেওয়া হচ্ছে না। কোথাও আবার অকটেনই নেই।”

সরবরাহ নিয়ে পাম্প মালিকদের অভিযোগ
পাম্প মালিকদের একাংশ এই পরিস্থিতির জন্য সরবরাহ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাকে দায়ী করছেন। তাদের মতে, শুক্রবার ও শনিবার সরকারি ছুটির দিনে ডিপো থেকে সরবরাহ বন্ধ থাকায় পাম্পগুলোতে তেলের মজুত কম থাকে। পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতির একাংশের সভাপতি নাজমুল হক বলেন, “অনেকে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি তেল কিনছেন। ফলে দুপুরের মধ্যেই অনেক পাম্পে তেল শেষ হয়ে যাচ্ছে।” তার মতে, ছুটির দিনেও সীমিত আকারে ডিপো খোলা থাকলে এই ভোগান্তি অনেকটাই কমানো যেত।
শনিবার তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরেন বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু এবং প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। বৈঠক শেষে বিদ্যুৎমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, “দেশে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত তেল সংগ্রহের প্রয়োজন নেই। সোমবার আরও দুটি জাহাজ আসছে, তাই সরবরাহে কোনো সমস্যা হবে না।”
পেট্রোল ও অকটেনের বড় অংশই দেশীয় উৎপাদন
বিপিসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশের পেট্রোলের প্রায় পুরোটা এবং অকটেনের বড় অংশই দেশেই উৎপাদিত হয়। বাংলাদেশের পেট্রোল মূলত দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে পাওয়া কনডেনসেট প্রক্রিয়াজাত করে উৎপাদন করা হয়।
সরকারি প্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড এবং কয়েকটি বেসরকারি রিফাইনারি কনডেনসেট থেকে পেট্রোল, অকটেনসহ প্রায় ৪০ ধরনের পেট্রোলিয়াম পণ্য উৎপাদন করে। এসব প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত উৎপাদন ক্ষমতা বছরে প্রায় ১৬ লাখ টন।
অন্যদিকে দেশে পেট্রোল ও অকটেনের বার্ষিক চাহিদা ৮ থেকে সাড়ে ৮ লাখ টন। ফলে স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা বিবেচনায় এই দুই জ্বালানি নিয়ে বড় ধরনের সংকটের আশঙ্কা নেই বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।