সোহরাব হাসান

পৃথিবীতে দুই শ্রেণির মানুষের নির্দিষ্ট দেশ নেই। যারা ধনী, তারা যে দেশেই যাবেন, সেটাই তাদের দেশ। তাদের পাসপোর্ট ভিসা পেতে সমস্যা হয় না। ইদানিং অনেক ধনী ব্যক্তি বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ত্যাগ করে অন্য দেশের ‘সম্মানিত’ নাগরিক হয়েছেন। টাকা দিলেই উন্নত দেশের নাগরিকত্ব মেলে। আবার তারা ভবিষ্যতে মাতৃভূমিতে ফিরে আসতে চাইলেও সমস্যা হবে না।
সমস্যা হলো হতদরিদ্র ও নিঃস্ব মানুষগুলোর। তারা যে দেশে জন্ম নেন, সেদেশের চালকেরা তাদের দায়িত্ব নেন না। ফলে তারা জীবন-জীবিকার খোঁজে বিদেশে গিয়ে পদে পদে লাঞ্চিত হন। কখনো তাদের দেশে ফিরতে হয় চরম অপমানিত হয়ে।
গত বছর যুক্তরাষ্ট্র থেকে কয়েক দফায় কয়েক শ বাংলাদেশি ফিরেছেন। পুরো বিমানযাত্রায় তাদের হাতে ছিল কড়া, পায়ে বেড়ি ও গায়ে শেকল। তখন বাংলাদেশে ক্ষমতায় ছিল ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। যুক্তরাষ্ট্রের আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত। কিন্তু বাংলাদেশি নাগরিকদের ওপর এত বড় লাঞ্ছনার পরও সরকারের কেউ টু শব্দ করেছেন বলে আমাদের জানা নেই।
এ কথা সত্য যে এই নাগরিকেরা বৈধ কাগজপত্র নিয়ে সেখানে যাননি বা ছিলেন না। কেউ ট্যুরিস্ট ভিসায় গিয়ে থেকে গেছেন। কাজ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্র তাদের ফেরত পাঠাতে পারে। কিন্তু চোর-ডাকাতের মতো হাতকড়া ও শেকল পরিয়ে বাংলাদেশগামী উড়োজাহাজে তুলে দিতে হবে কেন?
গত সেপ্টেম্বরে ফেরত আসা অভিবাসনপ্রত্যাশী যুবক রুবেল (ছদ্মনাম) অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলেছিলেন, পুরা পেটে শিকল আছিলো, হাতে হাতকড়া ছিল, তারপর দুই পায়ে কড়া লাগানো ছিল। দেশে ফেরত পাঠানোর আগে প্রায় ১০ মাস রুবেল ও তার সঙ্গীদের ডিটেনশন সেন্টারে রাখা হয়। সেখানে পর্যাপ্ত খাবার দেওয়া হয়নি।
ব্র্যাকের সূত্র অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৮ জুন একটি চার্টার্ড ফ্লাইটে ৪২ জন বাংলাদেশিকে ফিরিয়ে আনা হয়। এর আগে, ৬ মার্চ থেকে ২১ শে এপ্রিল পর্যন্ত একাধিক ফ্লাইটে আরও অন্তত ৩৪ বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠানো হয়েছিল। এ তো গেল যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেরত আসা বাংলাদেশি নাগরিকদের হাল।
সম্প্রতি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর ‘বাঙাল খেদাও’ অভিযান শুরু করেছে। এর ঘোষণা তারা আগেই দিয়ে রেখেছিল। ভারত থেকে কাদের ফেরত পাঠানো হচ্ছে? যারা একবারে চালচুলোহীন। জীবিকার জন্য বহু বছর আগে পশ্চিমবঙ্গে গিয়েছেন। সেখানে তাদের কেউ রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন, কেউ গৃহসহায়িকার কাজ করতেন। জীবিকার প্রয়োজনে এ রকম অভিবাসন চলে আসছে বহু বছর ধরে। ভারতে যেমন বাংলাদেশি নাগরিকেরা কাজ করেন, তেমনি ভারতীয়রাও বাংলাদেশে এসে কাজ করেন। একপক্ষ হোয়াইট কলার শ্রমিক, আরেকপক্ষ ব্লু কলার শ্রমিক।
বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর কথিত বাংলাদেশিদের কেউ ঘর ভাড়া দিতে চাইছেন না। নির্বাচনের আগে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেছিলেন, লাখ লাখ বাংলাদেশি মুসলমান নাকি তৃণমূলকে ভোট দিয়ে যায়। কিন্তু যাদের এ পর্যন্ত বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত করা লোকের সংখ্যা শিশুসহ দুই হাজারের কিছু বেশি।
সপ্তাহ খানিক আগে দিল্লিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল এক ব্রিফিংয়ে বলেছেন, “যেসব বিদেশিরা বেআইনিভাবে ভারতে আছেন, তারা বাংলাদেশি হোন বা যেকোনো দেশেরই হোন, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
সম্প্রতি ভারতের বেশ কয়েকটি রাজ্যে কথিত বেআইনি বাংলাদেশি চিহ্নিতকরণের যে অভিযান চলছে, তাদের ক্ষেত্রে এইসব পন্থা অবলম্বন করা হচ্ছে না বলেই একাধিক নিরাপত্তা এজেন্সি বিবিসির কাছে নিশ্চিত করেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২৪ মে থেকে সীমান্তবর্তী হাকিমপুর গ্রামে ভিড় করে চলেছে। গত রাতেও সীমান্তরক্ষী বাহিনী তৎপরতার সঙ্গে পরিস্থিতি সামাল দিয়ে প্রায় ২৫০ লোককে জন আটক করে রাত তিনটে নাগাদ তিনটি অস্থায়ী হোল্ডিং সেন্টারে স্থানান্তরিত করেছে। এরপরও ‘অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করা’ নাগরিকরা সীমান্তে জড়ো হচ্ছেন। এদের মধ্যে এমন লোকও আছেন, যারা বহু বছর ধরেই ওই দেশের বাসিন্দা। তাদের কারও কারও জন্ম পশ্চিমবঙ্গেই।
কেবল ভারতে নয়, পাকিস্তানেও আটকা পড়া বহু বাংলাদেশি আছেন। চলতি বছর ২৩ ফেব্রুয়ারি তাদের নিয়ে সমকালে প্রকাশিত খবরে বলা হয়, বর্তমানে পাকিস্তানে অনুমানিক ১০ লাখের বেশি বাঙালি বসবাস করছেন। অধিকাংশই মুক্তিযুদ্ধের আগে এসেছিলেন। এখন তারা একটি সংখ্যালঘু গোষ্ঠী। দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন, পাকিস্তান তাদের কখনোই নাগরিক হিসেবে মেনে নেয়নি। ফলে শিক্ষা, ব্যবসার সুযোগ ও স্থাবর সম্পত্তির বাজার থেকে তারা বঞ্চিত হচ্ছেন।
করাচির অন্যতম বড় বস্তি মাচ্ছর কলোনিতে বসবাস করেন ২০ বছর বয়সী হোসেন আহমেদ। এই কলোনির অধিকাংশ বাসিন্দা বাঙালি। হোসেনের কাছে পাকিস্তানের কোনো জাতীয়তা বা পরিচয়পত্র নেই। মাছের আড়তে কাজ করা এই যুবক এএফপিকে বলেন, ‘‘আমি (বাংলাদেশে) যাব কীভাবে? আমি সেখানে যেতে চাই। কিন্তু আমার বাবারও কোনো পরিচয়পত্র নেই।’’
বাঙালি অধ্যুষিত করাচির এলাকাগুলোর বেশির ভাগই বস্তি। বাসিন্দাদের মতে, পূর্ব পাকিস্তান বাংলাদেশ হওয়ার আগে থেকেই তারা এখানে বসবাস করছেন। বেশির ভাগ বাঙালি সাধারণত বস্তির বাইরে খুব একটা বের হন না। কারণ, বাইরে গেলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জিজ্ঞাসাবাদ ও পাকিস্তানি নাগরিকত্বের প্রমাণ দেখতে চায়।

পাকিস্তানে আটকা পড়া বাংলাদেশি নাগরিকদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে পাকিস্তানের খারাপ সম্পর্কের কারণে তারা আসতে পারেননি। ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার আসার পর পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো হয়েছে। করাচি-ঢাকা সরাসরি বিমান চলাচল শুরু হয়েছে। এখন তারা ফেরার বিষয়ে আশাবাদী। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তাদের কেউ ফিরতে পারেননি। ২০২৪ সালে শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর থেকেই ঢাকা-ইসলামাবাদের শীতল সম্পর্ক উষ্ণ হতে শুরু করে। ইতিমধ্যে পাকিস্তানের একাধিক মন্ত্রীও বাংলাদেশ সফর করেছেন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে দুই পক্ষ মুখোমুখি। প্রতিদিনই জনপরিসরে তারা কথা বলছেন। বিরোধী দলের দাবি, বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে জুলাই যোদ্ধাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করছে। সরকারি দলের পাল্টা অভিযোগ, বিরোধী দল পতিত স্বৈরাচারের সঙ্গে তলে তলে আঁতাত করে সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে।
কিন্তু কেউ জনজীবনের মৌলিক সমস্যা নিয়ে তারা খুব কম কথা বলছেন। ড. মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের সময় হাতে কড়া পায়ে বেড়ি ও গায়ে শিকল পরিয়ে বাংলাদেশি নাগরিকদের ফেরত পাঠানোর ঘটনায় নাগরিক সমাজ মৃদু প্রতিবাদ করলেও কোনো প্রতিকার হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকার সেই নাগরিক অপমানের জবাব দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অসম ও অধীনতামূলক বাণিজ্য চুক্তি করে।
বাংলাদেশে এই মুহূর্তের প্রধান সমস্যা কি? এই প্রশ্নের উত্তরে কেউ বলবেন, সংস্কার। কেউ বলবেন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা। কারও কারও মতে, থেমে থেমে মবের দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে না পারা। এসব সমস্যা কেউ অস্বীকার করবে না। কিন্তু বাংলাদেশের বড় সমস্যা যে বেকারত্ব, তা রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকেরা বুঝতে চান না। বুঝলেও স্বীকার করেন না।
যারা পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তে আটকা পড়েছেন, যারা হোল্ডিং সেন্টারে আছেন, তারা কোন দেশের নাগরিক সেটা বড় কথা নয়। তার চেয়েও বড় সমস্যা হলো আমরা সীমান্তে আবার একটি মানবিক বিপর্যের মুখোমুখি হচ্ছি কি না।
আমাদের মনে আছে, নব্বই দশকের প্রথমার্ধে পশ্চিমবঙ্গ সীমান্ত দিয়ে ভারতে পুশ ইন ঘটাতে চাইলে বাংলাদেশ তার বিরোধিতা করেছিল। তাদের কাউকে কাউকে পুশ ব্যাক করানো হয়েছিল। আবার অনেক নারী-পুরুষ ও শিশু কোনো দেশে জায়গা না পেয়ে নো ম্যান্স ল্যান্ডে ঠাঁই নিয়েছিলেন। সে রকম পরিস্থিতি তৈরি হোক তা কোনোভাবে কাম্য নয়।
যে মানুষ বৈধ কাগজপত্র না থাকা সত্ত্বেও জীবিকার তাগিদে ভারতে গেছেন, ভারত সরকার না হয় তাদের দায়িত্ব অস্বীকার করল। কিন্তু যারা ভারতে জন্ম নিয়েছেন, তাদের কোন আইনে তারা ফেরত পাঠাবে? জন্মসূত্রে যেমন নরেন্দ্র মোদি-শুভেন্দু অধিকারীরা ভারতের নাগরিক, তেমনি পশ্চিমবঙ্গে জন্ম নেওয়া একজন বাংলা ভাষাভাষী মানুষও ভারতীয়, ধর্মীয় পরিচয় তার যা-ই হোক।
লেখক: সম্পাদক চরচা

পৃথিবীতে দুই শ্রেণির মানুষের নির্দিষ্ট দেশ নেই। যারা ধনী, তারা যে দেশেই যাবেন, সেটাই তাদের দেশ। তাদের পাসপোর্ট ভিসা পেতে সমস্যা হয় না। ইদানিং অনেক ধনী ব্যক্তি বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ত্যাগ করে অন্য দেশের ‘সম্মানিত’ নাগরিক হয়েছেন। টাকা দিলেই উন্নত দেশের নাগরিকত্ব মেলে। আবার তারা ভবিষ্যতে মাতৃভূমিতে ফিরে আসতে চাইলেও সমস্যা হবে না।
সমস্যা হলো হতদরিদ্র ও নিঃস্ব মানুষগুলোর। তারা যে দেশে জন্ম নেন, সেদেশের চালকেরা তাদের দায়িত্ব নেন না। ফলে তারা জীবন-জীবিকার খোঁজে বিদেশে গিয়ে পদে পদে লাঞ্চিত হন। কখনো তাদের দেশে ফিরতে হয় চরম অপমানিত হয়ে।
গত বছর যুক্তরাষ্ট্র থেকে কয়েক দফায় কয়েক শ বাংলাদেশি ফিরেছেন। পুরো বিমানযাত্রায় তাদের হাতে ছিল কড়া, পায়ে বেড়ি ও গায়ে শেকল। তখন বাংলাদেশে ক্ষমতায় ছিল ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। যুক্তরাষ্ট্রের আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত। কিন্তু বাংলাদেশি নাগরিকদের ওপর এত বড় লাঞ্ছনার পরও সরকারের কেউ টু শব্দ করেছেন বলে আমাদের জানা নেই।
এ কথা সত্য যে এই নাগরিকেরা বৈধ কাগজপত্র নিয়ে সেখানে যাননি বা ছিলেন না। কেউ ট্যুরিস্ট ভিসায় গিয়ে থেকে গেছেন। কাজ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্র তাদের ফেরত পাঠাতে পারে। কিন্তু চোর-ডাকাতের মতো হাতকড়া ও শেকল পরিয়ে বাংলাদেশগামী উড়োজাহাজে তুলে দিতে হবে কেন?
গত সেপ্টেম্বরে ফেরত আসা অভিবাসনপ্রত্যাশী যুবক রুবেল (ছদ্মনাম) অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলেছিলেন, পুরা পেটে শিকল আছিলো, হাতে হাতকড়া ছিল, তারপর দুই পায়ে কড়া লাগানো ছিল। দেশে ফেরত পাঠানোর আগে প্রায় ১০ মাস রুবেল ও তার সঙ্গীদের ডিটেনশন সেন্টারে রাখা হয়। সেখানে পর্যাপ্ত খাবার দেওয়া হয়নি।
ব্র্যাকের সূত্র অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৮ জুন একটি চার্টার্ড ফ্লাইটে ৪২ জন বাংলাদেশিকে ফিরিয়ে আনা হয়। এর আগে, ৬ মার্চ থেকে ২১ শে এপ্রিল পর্যন্ত একাধিক ফ্লাইটে আরও অন্তত ৩৪ বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠানো হয়েছিল। এ তো গেল যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেরত আসা বাংলাদেশি নাগরিকদের হাল।
সম্প্রতি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর ‘বাঙাল খেদাও’ অভিযান শুরু করেছে। এর ঘোষণা তারা আগেই দিয়ে রেখেছিল। ভারত থেকে কাদের ফেরত পাঠানো হচ্ছে? যারা একবারে চালচুলোহীন। জীবিকার জন্য বহু বছর আগে পশ্চিমবঙ্গে গিয়েছেন। সেখানে তাদের কেউ রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন, কেউ গৃহসহায়িকার কাজ করতেন। জীবিকার প্রয়োজনে এ রকম অভিবাসন চলে আসছে বহু বছর ধরে। ভারতে যেমন বাংলাদেশি নাগরিকেরা কাজ করেন, তেমনি ভারতীয়রাও বাংলাদেশে এসে কাজ করেন। একপক্ষ হোয়াইট কলার শ্রমিক, আরেকপক্ষ ব্লু কলার শ্রমিক।
বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর কথিত বাংলাদেশিদের কেউ ঘর ভাড়া দিতে চাইছেন না। নির্বাচনের আগে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেছিলেন, লাখ লাখ বাংলাদেশি মুসলমান নাকি তৃণমূলকে ভোট দিয়ে যায়। কিন্তু যাদের এ পর্যন্ত বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত করা লোকের সংখ্যা শিশুসহ দুই হাজারের কিছু বেশি।
সপ্তাহ খানিক আগে দিল্লিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল এক ব্রিফিংয়ে বলেছেন, “যেসব বিদেশিরা বেআইনিভাবে ভারতে আছেন, তারা বাংলাদেশি হোন বা যেকোনো দেশেরই হোন, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
সম্প্রতি ভারতের বেশ কয়েকটি রাজ্যে কথিত বেআইনি বাংলাদেশি চিহ্নিতকরণের যে অভিযান চলছে, তাদের ক্ষেত্রে এইসব পন্থা অবলম্বন করা হচ্ছে না বলেই একাধিক নিরাপত্তা এজেন্সি বিবিসির কাছে নিশ্চিত করেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২৪ মে থেকে সীমান্তবর্তী হাকিমপুর গ্রামে ভিড় করে চলেছে। গত রাতেও সীমান্তরক্ষী বাহিনী তৎপরতার সঙ্গে পরিস্থিতি সামাল দিয়ে প্রায় ২৫০ লোককে জন আটক করে রাত তিনটে নাগাদ তিনটি অস্থায়ী হোল্ডিং সেন্টারে স্থানান্তরিত করেছে। এরপরও ‘অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করা’ নাগরিকরা সীমান্তে জড়ো হচ্ছেন। এদের মধ্যে এমন লোকও আছেন, যারা বহু বছর ধরেই ওই দেশের বাসিন্দা। তাদের কারও কারও জন্ম পশ্চিমবঙ্গেই।
কেবল ভারতে নয়, পাকিস্তানেও আটকা পড়া বহু বাংলাদেশি আছেন। চলতি বছর ২৩ ফেব্রুয়ারি তাদের নিয়ে সমকালে প্রকাশিত খবরে বলা হয়, বর্তমানে পাকিস্তানে অনুমানিক ১০ লাখের বেশি বাঙালি বসবাস করছেন। অধিকাংশই মুক্তিযুদ্ধের আগে এসেছিলেন। এখন তারা একটি সংখ্যালঘু গোষ্ঠী। দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন, পাকিস্তান তাদের কখনোই নাগরিক হিসেবে মেনে নেয়নি। ফলে শিক্ষা, ব্যবসার সুযোগ ও স্থাবর সম্পত্তির বাজার থেকে তারা বঞ্চিত হচ্ছেন।
করাচির অন্যতম বড় বস্তি মাচ্ছর কলোনিতে বসবাস করেন ২০ বছর বয়সী হোসেন আহমেদ। এই কলোনির অধিকাংশ বাসিন্দা বাঙালি। হোসেনের কাছে পাকিস্তানের কোনো জাতীয়তা বা পরিচয়পত্র নেই। মাছের আড়তে কাজ করা এই যুবক এএফপিকে বলেন, ‘‘আমি (বাংলাদেশে) যাব কীভাবে? আমি সেখানে যেতে চাই। কিন্তু আমার বাবারও কোনো পরিচয়পত্র নেই।’’
বাঙালি অধ্যুষিত করাচির এলাকাগুলোর বেশির ভাগই বস্তি। বাসিন্দাদের মতে, পূর্ব পাকিস্তান বাংলাদেশ হওয়ার আগে থেকেই তারা এখানে বসবাস করছেন। বেশির ভাগ বাঙালি সাধারণত বস্তির বাইরে খুব একটা বের হন না। কারণ, বাইরে গেলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জিজ্ঞাসাবাদ ও পাকিস্তানি নাগরিকত্বের প্রমাণ দেখতে চায়।

পাকিস্তানে আটকা পড়া বাংলাদেশি নাগরিকদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে পাকিস্তানের খারাপ সম্পর্কের কারণে তারা আসতে পারেননি। ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার আসার পর পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো হয়েছে। করাচি-ঢাকা সরাসরি বিমান চলাচল শুরু হয়েছে। এখন তারা ফেরার বিষয়ে আশাবাদী। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তাদের কেউ ফিরতে পারেননি। ২০২৪ সালে শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর থেকেই ঢাকা-ইসলামাবাদের শীতল সম্পর্ক উষ্ণ হতে শুরু করে। ইতিমধ্যে পাকিস্তানের একাধিক মন্ত্রীও বাংলাদেশ সফর করেছেন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে দুই পক্ষ মুখোমুখি। প্রতিদিনই জনপরিসরে তারা কথা বলছেন। বিরোধী দলের দাবি, বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে জুলাই যোদ্ধাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করছে। সরকারি দলের পাল্টা অভিযোগ, বিরোধী দল পতিত স্বৈরাচারের সঙ্গে তলে তলে আঁতাত করে সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে।
কিন্তু কেউ জনজীবনের মৌলিক সমস্যা নিয়ে তারা খুব কম কথা বলছেন। ড. মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের সময় হাতে কড়া পায়ে বেড়ি ও গায়ে শিকল পরিয়ে বাংলাদেশি নাগরিকদের ফেরত পাঠানোর ঘটনায় নাগরিক সমাজ মৃদু প্রতিবাদ করলেও কোনো প্রতিকার হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকার সেই নাগরিক অপমানের জবাব দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অসম ও অধীনতামূলক বাণিজ্য চুক্তি করে।
বাংলাদেশে এই মুহূর্তের প্রধান সমস্যা কি? এই প্রশ্নের উত্তরে কেউ বলবেন, সংস্কার। কেউ বলবেন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা। কারও কারও মতে, থেমে থেমে মবের দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে না পারা। এসব সমস্যা কেউ অস্বীকার করবে না। কিন্তু বাংলাদেশের বড় সমস্যা যে বেকারত্ব, তা রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকেরা বুঝতে চান না। বুঝলেও স্বীকার করেন না।
যারা পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তে আটকা পড়েছেন, যারা হোল্ডিং সেন্টারে আছেন, তারা কোন দেশের নাগরিক সেটা বড় কথা নয়। তার চেয়েও বড় সমস্যা হলো আমরা সীমান্তে আবার একটি মানবিক বিপর্যের মুখোমুখি হচ্ছি কি না।
আমাদের মনে আছে, নব্বই দশকের প্রথমার্ধে পশ্চিমবঙ্গ সীমান্ত দিয়ে ভারতে পুশ ইন ঘটাতে চাইলে বাংলাদেশ তার বিরোধিতা করেছিল। তাদের কাউকে কাউকে পুশ ব্যাক করানো হয়েছিল। আবার অনেক নারী-পুরুষ ও শিশু কোনো দেশে জায়গা না পেয়ে নো ম্যান্স ল্যান্ডে ঠাঁই নিয়েছিলেন। সে রকম পরিস্থিতি তৈরি হোক তা কোনোভাবে কাম্য নয়।
যে মানুষ বৈধ কাগজপত্র না থাকা সত্ত্বেও জীবিকার তাগিদে ভারতে গেছেন, ভারত সরকার না হয় তাদের দায়িত্ব অস্বীকার করল। কিন্তু যারা ভারতে জন্ম নিয়েছেন, তাদের কোন আইনে তারা ফেরত পাঠাবে? জন্মসূত্রে যেমন নরেন্দ্র মোদি-শুভেন্দু অধিকারীরা ভারতের নাগরিক, তেমনি পশ্চিমবঙ্গে জন্ম নেওয়া একজন বাংলা ভাষাভাষী মানুষও ভারতীয়, ধর্মীয় পরিচয় তার যা-ই হোক।
লেখক: সম্পাদক চরচা