উৎপল দত্ত: জনবিচ্ছিন্ন, একাকী স্রষ্টা

উৎপল দত্ত: জনবিচ্ছিন্ন, একাকী স্রষ্টা
‘জন অরণ্য’ সিনেমায় উৎপলকে শট বুঝিয়ে দিচ্ছেন সত্যজিৎ রায়। ছবি: সংগৃহীত

উৎপল দত্ত। মানুষটির অনেকগুলো পরিচয়। সফল অভিনেতা, নাট্যকার, কবি, পরিচালক ও রাজনৈতিক কর্মী। যারা পর্দায় তাকে বেশি দেখেছেন, তাদের কাছে তার রাজনৈতিক পরিচয়টি বড় হয়ে ওঠেনি। যদিও এই পরিচয়টি ছাড়া উৎপল দত্ত অসম্পূর্ণ। অনেকের মতে, অভিনয়, নাটক, কবিতা ছিল উৎপল দত্তের রাজনৈতিক হাতিয়ার। মার্কসবাদী রাজনীতি জন্য তিনি একাধিকবার জেলও খেটেছেন।

‘টিনের তলোয়ার’ নাটকের লেখক উৎপল দত্ত বলতেন, “মার্কসবাদ অধ্যয়ন না করে নাটক লিখতে বসার কোন মানে হয় না। কেননা এই সমাজব্যবস্থা এত জটিল হয়ে উঠেছে–একে বিশ্লেষণ করতে গেলে মার্কসবাদ হচ্ছে আমাদের হাতিয়ার।” তিনি যেখানে হাত দিয়েছেন সেখানেই সোনা ফলেছে। বাংলা সিনেমায় তো তাক লাগানো অভিনয় করেছেনই, বলিউডেও ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। চাইলে শুধু অভিনয় করেই সুখে-শান্তিতে জীবনটা পার করে দিতে পারতেন উৎপল দত্ত। তা তিনি করেননি। শোষণ ও বৈষম্যহীন সমাজ গড়তে কাজ করে গেছেন–কখনো পার্টির হয়ে, কখনো-বা থিয়েটার কর্মী হিসেবে।

উৎপল দত্তের নাটক। ছবি: সংগৃহীত
উৎপল দত্তের নাটক। ছবি: সংগৃহীত

নকশাল-রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। নকশাল আন্দোলনকে বেগবান করতে অস্ত্রশস্ত্রের কনসাইনমেন্ট ডেলিভারির দায়িত্ব পর্যন্ত নিয়েছিলেন তিনি। রাজনীতির জন্য নিষিদ্ধ হয়েছে তার নাটক, থেকেছেন কারাবন্দী। চারু মজুমদারের সঙ্গে তার একাধিকবার দেখা হয়েছে। একবার চারু উৎপলকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন–তিনি নিজেকে কীভাবে দেখেন? উৎপল উত্তর দিয়েছিলেন, “আমি সাংস্কৃতিক ফ্রন্টের একজন কর্মী মাত্র।” চারু মজুমদার বলেছিলেন, “তুমি ভুল বলছ। তুমি বিপ্লবী। তুমি অন্য কিছু হতেই পার না।” চারু মজুমদার অসত্য বলেননি।

তার সহধর্মিণী অভিনেত্রী শোভা সেন লিখেছেন, উৎপল ছিলেন, ‘জনবিচ্ছিন্ন, একাকী স্রষ্টা’। নিজের রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণেই উৎপল দত্তকে একা হয়ে পড়তে হয়েছিল, ‘টিনের তলোয়ার’ নাটকের বেণী মাধবের মতো, ‘বড় একা। কেউই কখনো পাশে নেই। দেবতার মতন একা। অভিশাপের মতন, অবজ্ঞার মতন একা।’

শোভা সেন একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেছেন, ষাটের দশকের গোড়াতে ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন হুমায়ুন কবীর। নিজেও বিখ্যাত প্রাবন্ধিক। তিনি উৎপলকে ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামার অধ্যক্ষ হিসেবে ঠিক করেছিলেন। ১৯৬২ সালে সাধারণ নির্বাচনের ডামাডোল শুরু হয়ে যায়। হুমায়ুন কবীর চেয়েছিলেন উৎপল তার নির্বাচনী এলাকায় নাটক করুক। কিন্তু উৎপল সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। যদিও তখন তাদের সংসারে আর্থিক সংকট চলছিল। এর ফলও পেলেন, একই বছরের ২৭ ফেব্রুয়ারি এক তারবার্তায় তাকে জানিয়ে দেওয়া হলো, ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামার অধ্যক্ষ পদে উৎপলের নিয়োগ বাতিল হয়েছে। ১৯৬৬ সালেও ভারত সরকার তার সঙ্গে অবিচার করে। জার্মান সরকার উৎপল দত্তকে নিমন্ত্রণ করেছিল। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার তার ভিসা মঞ্জুর না করায় তিনি জার্মানি যেতে পারেননি।

হীরক-রাজা চরিত্রে উৎপল দত্ত। ছবি: সংগৃহীত
হীরক-রাজা চরিত্রে উৎপল দত্ত। ছবি: সংগৃহীত

তিনি নিজেও অনেক পুরস্কার ও সম্মাননা পায়ে ঠেলেছেন ওই রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণেই। ১৯৬৬ সালে দিল্লির সংগীত নাটক একাডেমি ‘ফেরারী ফৌজ’ নাটকের জন্য শ্রেষ্ঠ পরিচালক হিসেবে পুরস্কার দিতে উৎপলকে মনোনীত করে। কিন্তু তা প্রত্যাখ্যান করেন তিনি। এক কবিতায় জানিয়ে দিয়েছিলেন, ‘শাহেনশা তোমার পুরস্কার তোমারই থাক’। আরো বলেছিলেন, “যে হাতে কারাদণ্ড, সেই হাতেই পুরস্কারের প্রলোভন শোভা পায় না।” আর ১৯৯১ সালে প্রত্যাখ্যান করেন ভারতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক জাতীয় পুরস্কার ‘পদ্মবিভূষণ’। তখন সত্যজিৎ রায় মন্তব্য করেছিলেন, “এই সাহস ও বলিষ্ঠ মনোভাব একমাত্র উৎপলই দেখাতে পারে।”

পুরস্কার বা নানা সুবিধা পেতে তখনো যেমন কাড়াকাড়ি, মারামারি ও নির্লজ্জ তোষামোদ ছিল, এখনো আছে। এমন ভিড়ে উৎপল দত্তের মতো আত্মমর্যাদা ও আত্মাভিমানসম্পন্ন ধীমান মানুষের অভাব তখনো ছিল, এখনো আছে। পুরস্কার যে তিনি একেবারেই নেননি, তা নয়; কিন্তু তখনই ‘না’ করেছেন, যখন মনে হয়েছে এই সুবিধা বা পুরস্কার তাকে নতজানু করবে, তার আত্মমর্যাদাকে আঘাত করবে।

তথ্যসূত্র:

সামগ্রিক উৎপল মানস–অরূপ মুখোপাধ্যায়

আমার উৎপল–শোভা সেন

টোয়ার্ডস এ রেভোলিউশনারি থিয়েটার–উৎপল দত্ত

‘পর্বান্তর’, বর্ষ ২, জানুয়ারি ১৯৯৫–পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত

সম্পর্কিত