Advertisement Banner

অভিন্ন শিক্ষা ব্যবস্থা: সময়ের দাবি

মো. ফজলুল করিম
মো. ফজলুল করিম
অভিন্ন শিক্ষা ব্যবস্থা: সময়ের দাবি
আমাদের শিক্ষাপদ্ধতি এখনো মুখস্থনির্ভর। ছবি: চরচা

বাংলাদেশে শিক্ষাব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে একাধিক ধারায় পরিচালিত হয়ে আসছে–বাংলা মাধ্যম, ইংরেজি মাধ্যম, মাদ্রাসা শিক্ষা এবং কারিগরি শিক্ষা। স্বাধীনতার পর দেশে শিক্ষার বিস্তার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সাক্ষরতার হার যেমন বেড়েছে, তেমনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও অনেক বেড়েছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়–এই বিস্তৃত শিক্ষাব্যবস্থা কি সত্যিই দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় মানবসম্পদ তৈরি করতে পারছে?

বাস্তবতা হলো, বহুধারার এই শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটি স্পষ্ট বিভাজন তৈরি করেছে। বিভিন্ন ধারার শিক্ষার্থীরা ভিন্ন ভিন্ন পাঠ্যক্রম, ভাষা ও চিন্তাধারার মধ্যে বেড়ে ওঠে। ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীরা তুলনামূলকভাবে বৈশ্বিক জ্ঞানব্যবস্থার সঙ্গে বেশি পরিচিত হয়। অন্যদিকে বাংলা মাধ্যমের শিক্ষার্থীরা মূলত জাতীয় পাঠ্যক্রমের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা ধর্মীয় জ্ঞানে সমৃদ্ধ হলেও অনেক ক্ষেত্রে আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সঙ্গে তাদের সংযোগ সীমিত থাকে। ফলে একই দেশের নাগরিক হয়েও তাদের জ্ঞানভিত্তি, দৃষ্টিভঙ্গি ও পেশাগত প্রস্তুতির মধ্যে পার্থক্য তৈরি হয়।

এই বাস্তবতা আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে–আমরা কি এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে পেরেছি, যা জাতিকে একই বৌদ্ধিক ও সামাজিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে পারে?

এই প্রেক্ষাপটে ‘অভিন্ন শিক্ষাব্যবস্থা’ নিয়ে আলোচনা ক্রমেই গুরুত্ব পাচ্ছে। অভিন্ন শিক্ষাব্যবস্থা বলতে এমন একটি কাঠামোকে বোঝায়, যেখানে দেশের সব শিক্ষার্থী একটি সাধারণ মান ও মৌলিক পাঠ্যক্রমের মধ্যে বেড়ে ওঠে। এর লক্ষ্য সবার জন্য সমান মানের শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং শিক্ষার সুযোগ ও ফলাফলের বৈষম্য কমিয়ে আনা।

তবে বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার সমস্যা কেবল বিভাজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। অনেক ক্ষেত্রে আমাদের শিক্ষাপদ্ধতি এখনো মুখস্থনির্ভর। পরীক্ষায় ভালো ফল অর্জনই যেন শিক্ষার প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু সৃজনশীল চিন্তা, সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ, গবেষণামনস্কতা কিংবা বাস্তব সমস্যা সমাধানের দক্ষতা যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না। ফলে অনেক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার ডিগ্রি অর্জন করলেও কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দক্ষতার ঘাটতি থেকে যায়।

নতুন বই পাওয়ার উল্লাসে শিক্ষার্থীরা। ছবি: চরচা
নতুন বই পাওয়ার উল্লাসে শিক্ষার্থীরা। ছবি: চরচা

গবেষণা ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সীমাবদ্ধতা দেখা যায়। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর অগ্রগতির পেছনে শক্তিশালী গবেষণা সংস্কৃতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণা ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে বিশ্বে শীর্ষস্থানীয়। জাপান তাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে শিল্প ও প্রযুক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করে একটি দক্ষ ও শৃঙ্খলাবদ্ধ মানবসম্পদ তৈরি করেছে। কিন্তু বাংলাদেশের অনেক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এখনো পর্যাপ্ত গবেষণা তহবিল, আধুনিক ল্যাবরেটরি এবং দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা পরিকল্পনার অভাব রয়েছে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হলো–শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মধ্যে দুর্বল সংযোগ। অনেক শিক্ষার্থী এমন বিষয়ে পড়াশোনা করেন, যার সঙ্গে দেশের শিল্প, প্রযুক্তি বা অর্থনীতির বাস্তব চাহিদার সরাসরি সম্পর্ক নেই। ফলে একদিকে বেকারত্ব বাড়ে, অন্যদিকে দক্ষ জনশক্তির ঘাটতিও থেকে যায়।

এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে শিক্ষাব্যবস্থাকে নতুনভাবে ভাবতে হবে। একটি সমন্বিত ও অভিন্ন শিক্ষা কাঠামো শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটি সাধারণ জ্ঞানভিত্তি তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে পাঠ্যক্রমে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, মানবিক মূল্যবোধ এবং নৈতিক শিক্ষার ভারসাম্যপূর্ণ সমন্বয় জরুরি। শিক্ষক প্রশিক্ষণ, গবেষণায় বিনিয়োগ ও শিক্ষার সঙ্গে শিল্প ও প্রযুক্তি খাতের সংযোগ বাড়ানোও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

অবশ্য অভিন্ন শিক্ষাব্যবস্থা মানে একরূপতা নয়। এর অর্থ হলো–একটি সাধারণ ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে বহুমাত্রিক জ্ঞান ও দক্ষতার বিকাশের সুযোগ তৈরি করা।

বাংলাদেশের সামনে একটি বড় সম্ভাবনা রয়েছে–তরুণ জনগোষ্ঠী। এই বিশাল মানবসম্পদকে দক্ষ, সৃজনশীল ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হলে শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও ন্যায়ভিত্তিক, আধুনিক এবং সমন্বিত করতে হবে। সময় এসেছে শিক্ষাকে কেবল ডিগ্রি অর্জনের পথ হিসেবে নয়; বরং জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রধান ভিত্তি হিসেবে নতুন করে দেখার।

লেখক: অধ্যাপক, বিজিই বিভাগ, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

সম্পর্কিত