Advertisement Banner

‘আওয়ামী লীগ ব্যাক করেছে’, কারণ জানালেন ২৪-এর ‘মাস্টারমাইন্ড’ মাহফুজ

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
‘আওয়ামী লীগ ব্যাক করেছে’, কারণ জানালেন ২৪-এর ‘মাস্টারমাইন্ড’ মাহফুজ
মাহফুজ আলম। ছবি: সংগৃহীত

‘আওয়ামী লীগ ব্যাক করেছে’ বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ও ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের ‘মাস্টারমাইন্ড’ খ্যাত মাহফুজ আলম। আজ মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এ মন্তব্য করেন।

নিজের ভ্যারিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে মাহফুজ লিখেছেন, ‘‘আওয়ামীলীগ ব্যাক করেছে, দেখো নাই? লীগ রাজনৈতিক দলের আগে একটা ধর্মতত্ত্ব, সে ধর্মতত্ত্বে ইমান আবার ফেরত এসেছে। কিভাবে ফিরল, সে গল্পই বলব আজ।’’

মাহফুজ লেখেন, ‘‘লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে, যেদিন ২৪ কে ৭১ এর বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছিল স্বাধীনতার বিরুদ্ধের শক্তি। লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে, যেদিন থেকে ডানপন্থীদের উত্থানের জন্য অন্তরীণ সরকারের লোকজন কাজ করা শুরু করেসে।’’

আওয়ামী লীগের ফেরা নিয়ে মাহফুজ লেখেন, ‘‘লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে, যেদিন আইনের শাসনের বদলে মবের শাসনে আনন্দ পেয়েছিল গত ১৭ বছরের মজলুমগণ। লীগ সেদিনই ব্যাক করেছিল, যেদিন থেকে উগ্রবাদীরা মাজারে হামলা করেছে, মসজিদ থেকে ভিন্নমতাবলম্বীদের বের করে দিয়েছে।’’

আওয়ামী লীগের ফেরার কারণ হিসেবে মাহফুজ তার পোস্টে লেখেন, ‘‘লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে, যেদিন হিন্দুদের উপর নিপীড়ন নিয়ে মজলুমগণ চুপ ছিল। লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে, যেদিন সেকুলার মূল্যবোধে বিশ্বাসী মানুষজন এদেশে সরকার প্রযোজিত ডানপন্থার উত্থানে ভয় পেয়েছিল। লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে, যেদিন মবস্টারদের এদেশে হিরো বানানো হয়েছিল। উগ্রবাদীর সেফ স্পেইস দেয়া হইসিল।’’

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে পতন হওয়া আওয়ামী লীগের ফিরে আসার কারণ হিসেবে তিনি ব্যবস্থা বদলের নামে সংস্কার কমিশনের নামে জনতার সঙ্গে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টিকে চিহ্নিত করেছেন। মাহফুজ লিখেছেন, ‘‘লীগ সেদিনই ব্যাক করেছিল, যেদিন ব্যবস্থা বিলোপের বদলে ন্যুনতম সংস্কার ও ঐকমত্য কমিশন' নাম দিয়ে জনগণকে বিচ্ছিন্ন এবং হতাশ করা হল। লীগ সেদিনই ব্যাক করেছিল, যেদিন থেকে বিএনপি ও অন্তরীণ সরকারের বিরুদ্ধে গেল আর বিএনপি ও ঠেকাতে জামাতকে কোলে নিল অন্তরীণ।’’

লীগের ফেরার কারণ হিসেবে ছাত্রদের বিপথে যাওয়াকেও কারণ বলে মনে করেন মাহফুজ। তিনি তার পোস্টে লিখেছেন, ‘‘লীগ সেদিনই ব্যাক করেছিল, যেদিন ছাত্ররা বিপ্লবী সংগঠনে রূপ না নিয়ে লুম্পেন চরিত্রের ক্লাব আর মবে রূপ নিয়েছিল।লীগ সেদিনই ব্যাক করেছিল, যেদিন মিডিয়া আর সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের উপর হামলা প্রযোজিত হল।’’

মাহফুজের দেওয়া পোস্টে বহুল আলোচিত কিচেন ক্যাবিনেটের কথারও উল্লেখ আছে, যা এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের একাধিক উপদেষ্টা গণমাধ্যমের সামনে অস্বীকার করেছেন। মাহফুজ লেখেন, ‘‘লীগ সেদিনই ব্যাক করেছিল, যেদিন অন্তরীণ সরকার পলিটিকাল থেকে আমলাতান্ত্রিক হল এবং আমলানির্ভর কিচেন ক্যাবিনেট থেকে সিদ্ধান্ত নেয়া শুরু হল। যে কিচেন ক্যাবিনেটের অধিকাংশ লোকই ছিল জামাত-বিএনপি বা লীগের ছুপা দালাল। যাদের কাছে জুলাই মানে ছিল নিজেদের পরিবার, প্রজন্ম আর প্রতিষ্ঠানের স্বার্থরক্ষা।’’

তিনি লিখেছেন, ‘‘লীগ সেদিনই ব্যাক করেছিল, যেদিন ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে গণতন্ত্রের বদলে সংঘতন্ত্র জয়ী হল। লীগ সেদিনই ব্যাক করেছিল, যেদিন নতুন মিডিয়া অনুমোদনে বাধা দেয়ার জন্য একজোট হইসিল কিচেন ক্যাবিনেট। (সে গল্প অন্যদিন)। লীগ সেদিনই ব্যাক করেছিল, যেদিন জুলাই ঘোষণাপত্র কিংবা সনদের প্রক্রিয়া তুলে দেয়া হইসিল আমলাতন্ত্র আর ভেস্টেড ইন্টারেস্ট গ্রুপের হাতে। লীগ সেদিনই ব্যাক করেছিল, যেদিন বাম-শাহবাগী  পিটাইলে আনন্দ পেয়েছিল মজলুমগণ।’’

আওয়ামী লীগের ফিরে আসার কারণ হিসেবে সাংস্কৃতিক বিভাজনের কথাও উল্লেখ করেছেন মাহফুজ, ‘‘লীগ সেদিনই ব্যাক করেছিল, যেদিন এদেশে কাওয়ালী/ইনকিলাবি কালচারের মতন রিগ্রেসিভ কালচার ব্যবস্থা দিয়ে বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদ মোকাবেলার মহারম্ভ হয়েছিল।’’

মাহফুজ আরও লিখেছেন, ‘‘লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে, যেদিন নির্বাচনি  বাটোয়ারার মাধ্যমে সংস্কার ও বিচারকে কম্প্রোমাইজ করা হল এন্ড বিএনপি-জামাতের বার্গেইনিং টুল বানানো হল৷ লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে, যেদিন কমিশন, ট্রাইবুনাল, বিশ্ববিদ্যালয়, ইত্যাদিকে একটি আদর্শের লোকদের মাধ্যমে ক্ষমতারোহণের বার্গেইনিং টুলে পরিণত করা হল। লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে, যেদিন কালচারালি-ইন্টেলেকচুয়ালি যারা জুলাইয়ে আমাদের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল তাদের বাদ দিয়ে জিরো কন্ট্রিবিউশান গুপ্তদের ক্ষমতায়িত করা হল।’’

ফেসবুকে দেওয়া ওই পোস্টে পুনশ্চতে মাহফুজ লিখেছেন, ‘‘পুনশ্চ: মূল কথাই বলা হয়নি। লীগ ফিরত আসবে। কারণ, সব দোষ মাহফুজ আলমের। (প্রচারে- নিখিল বাংলাদেশের চিরকাল মজলুম-ডানপন্থী বলয়, অন্তরীণ কিচেনের দালাল-সুবিধাভোগী গুপ্ত বলয়, এবং দিস এন্ড দোস বটফোর্সেস, সিন্ডিকেট আর গং মানে গয়রহ।)’’

পোস্টের একদম মাহফুজ যোগ করেন, ‘কি, রাগ করলা? পড়ো ইন্নালিল্লাহ!’ কথাটি উল্লেখ করেন।

এই পোস্টের কয়েক ঘণ্টা পর মাহফুজ আলম আরেকটি পোস্টে এর ব্যাখ্যা ও করণীয় হাজির করেন। সেখানে তিনি লিখেছেন, ‘‘যারা আগের পোস্টকে পর্যালোচনা হিসাবে পাঠ করেছেন, তাঁদের জন্য বলছি। আমাদের এখনকার কাজ হল-

সকল নিপীড়নের বিরুদ্ধে, নিপীড়িতের পক্ষে থাকা। দল-মত-ধর্ম নির্বিশেষে বাংলাদেশের সকল নাগরিকের মানবাধিকারের পক্ষে থাকা। হঠকারী, উগ্রবাদী এবং অন্তর্ঘাতমূলক রাজনীতিকে পরাস্ত করা। সংখ্যালঘু ও মাজারপন্থিদের উপর হামলার বিচার করার দাবি অব্যাহত রাখা। জুলাই গণহত্যার বিচারের দাবিকে প্রধান করে তোলা এবং বিচারের ক্ষেত্রে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে থাকা। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করতে বর্তমান সরকারকে বাধ্য করা। বাংলার বহু ভাষা-সংস্কৃতিকে যাপন-উদযাপন করা এবং রিগ্রেসিভ-ডিফিটিস্ট কালচারাল লড়াইকে জায়গা না দেয়া। কালচারালি-ইন্টেলেকচুয়ালি যারা বিভিন্ন বর্গ থেকে জুলাইয়ের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন, তাঁদেরকে ঔন করা। লীগের ফ্যাসিস্টদের লক্ষ্যবস্তু এরাই। যে যার জায়গা থেকে সক্ষম, যতবেশি সম্ভব গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন গড়ে তোলা।’’

একইসঙ্গে জুলাইয়ের শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করার কথাও বলেছেন তিনি, ‘‘জুলাইয়ের পক্ষের সকল শক্তির মধ্যে ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াইয়ের একটা কমন স্পেইস/ল্যাঙ্গুয়েজ তৈরি করা। অন্তর্ঘাতের ইতিহাস মাথায় রাখা। লীগের ধর্মতত্ত্ব ও বয়ানকে নর্মালাইজ করার বিরুদ্ধে জুলাই ও গত ১৬ বছরের গণতান্ত্রিক লড়াইয়ের বয়ানকে কেন্দ্রীয় করে তোলা। যারা গত দেড় বছরকে ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদের চাইতে দু;সহ/ খারাপ করে দেখাতে চেষ্টা করার মাধ্যমে ফ্যাসিস্ট হাসিনার অপকর্ম ভুলিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে, সেসব লীগের ফ্যাসিস্টদের প্রতিহত করা। অর্থনৈতিক সংস্কার ও পুনর্গঠনের মাধ্যমে দেশের কৃষক-শ্রমিক, নিম্ম-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের জীবন-জীবিকার সঙ্কট দূরীকরণে সরকারকে বাধ্য করা। জুলাইকে একটি মতাদর্শের ব্যানারে কুক্ষিগত ও বিভাজিত করার সকল প্রকল্পকে পরাস্ত করা।’’

২০২৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে ‘ক্লিনটন গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভ লিডারস স্টেজ’ অনুষ্ঠানে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও সরকার পতনের ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে মাহফুজ আলমকে বিশ্বমঞ্চে পরিচয় করিয়ে দেন।

সম্পর্কিত