দুই হাসপাতালে আসা অজ্ঞাত লাশের ৩৯% তরুণ-যুবার

শেখ সাদিয়া বানু
শেখ সাদিয়া বানু
দুই হাসপাতালে আসা অজ্ঞাত লাশের ৩৯% তরুণ-যুবার
হাসপাতালের মর্গ। ছবি: চরচা

এই যে পথে বা স্টেশনে নানা সময় অনেককে শুয়ে থাকতে দেখা যায়, তাদের অনেকেই পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন। এদের কেউ ছোটখাটো নানা ধরনের কাজ করে, কেউ হয়তো মানুষের কাছ থেকে চেয়েচিনতে খেয়ে পরে বেঁচে থাকে। এই শহরে তারা এসেছিলেন কিছু একটার আশায়। কিন্তু অনেকেরই সে আশা পূর্ণ হয় না। অপঘাতে মৃত্যু লেখা থাকে তাদের কারও কারও নিয়তিতে। এই স্বজনহীন মানুষদের অনেকের ঠাঁই এমনকি হয় না সরকারি তথ্যভাণ্ডারেও। ফলে বিভিন্ন হাসপাতালের মর্গে অজ্ঞাত লাশ হয়ে আশ্রয় নিতে হয় তাদের।

মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) ৩১ ডিসেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলেছে, গণমাধ্যমে প্রকাশিত ও এমএসএফ কর্তৃক সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ৬৪১টি অজ্ঞতনামা লাশ উদ্ধার হয়েছে, যার মধ্যে ২২ জন শিশু, ৬ জন কিশোর ও ৭ জন কিশোরী, ১৫৭ জন নারী ও ৪১৫ জন পুরুষ। ৬০ বয়সের উর্দ্ধে ১৮ জন পুরুষ ও ৬ জন নারী রয়েছেন। ১০ জনের বয়স নিরূপণ করা যায়নি।

এটা স্পষ্ট যে, দেশে অজ্ঞাত লাশের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। চলতি বছর সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী শুধু আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামই ৬০৯টি অজ্ঞাত মরদেহ সৎকার করেছে। শুধু ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গত বছরের হিসাব অনুযায়ী এসেছে ৫৩৭টি অজ্ঞাত লাশ। এর মধ্যে ৩৯ শতাংশেরই বয়স ১৯ থেকে ৪৫ বছর পর্যন্ত।

চরচার অনুসন্ধানে উঠে আসা এই তথ্য বলছে, এমএসএফের প্রতিবেদনে উল্লিখিত অজ্ঞাত লাশের সংখ্যা বলছে, গণমাধ্যমে সব অজ্ঞাত লাশের খবর প্রকাশ হয় না। এ কারণে অনেক অজ্ঞাত লাশই তাদের হিসাবের বাইরে রয়ে গেছে। কারণ, রাজধানীর মাত্র দুটি হাসপাতালের তথ্যই চমকে দেওয়ার মতো। শুধু এ দুই হাসপাতালেই বিগত বছরে ৫৩৭টি অজ্ঞাত লাশ এসেছে।

বাংলাদেশের প্রতিটি জেলা থেকে প্রতিদিন ভাগ্যের চাকা ঘোরাতে অসংখ্য মানুষ রাজধানীতে আসে। এর মধ্যে দুর্ঘটনাসহ দুষ্কৃতকারীদের কবলে পড়ে অনেকে নিহত হয়। পাশাপাশি রয়েছে স্বজনহীন ভবঘুরে নানা মানুষ, যারা অসুস্থতায় ভুগে পথেই মরে পড়ে থাকে। হাসপাতাল ফুটপাত বা রেলওয়ে স্টেশনে প্রতিনিয়ত পাওয়া যাচ্ছে কারও না কারও মরদেহ। সঠিক নাম-পরিচয় না পাওয়ায় অজ্ঞাত মরদেহ হিসেবেই তাদের নাম ওঠে হাসপাতালের মর্গের রেজিস্টার খাতায়।

চরচার অনুসন্ধানে দেখা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের হাসপাতালে মোট ৫৩৭টি মরদেহ অজ্ঞাত পরিচয়ে তালিকাভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ২০৯টি মরদেহ তরুণ–যুবাদের বলে তথ্য রয়েছে।

হাসপাতালের রেজিস্টার খাতায় এ অজ্ঞাত মরদেহগুলো পোস্টমর্টেম নম্বর দিয়ে তালিকাভুক্ত করা হয়। চরচা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের খাতায় তোলা তালিকাটি পরীক্ষা করে দেখেছে।

তালিকায় মোট অজ্ঞাত মরদেহের মধ্যে ৪৮টি মরদেহ ১ থেকে ১৮ বছর বয়সী মানুষের। এর মধ্যে ৩৮টি মরদেহই শিশুদের, যাদের একটি বড় অংশের বয়স কয়েক দিন মাত্র। সবচেয়ে বেশিসংখ্যক মরদেহ আছে ৩১ থেকে ৪৫ বছর বয়সীদের। আর ১৯ থেকে ৩০ বছর বয়সীদের মরদেহ আছে ৬৪টি। ৪৬ থেকে ৬০ বছর বয়সীদের মরদেহের সংখ্যা ৭৯টি এবং ৬০ বছরের বেশি বয়সীদের মরদেহের সংখ্যা ৫১টি।

হাসপাতালে আসা এসব অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহগুলো নগরীর বিভিন্ন স্থান থেকে উদ্ধার হওয়া। এর বেশির ভাগই সড়ক, নদী পথ ও রেল দুর্ঘটনায় মারা যায়। এসবের বাইরে হত্যা, অসুস্থতায় কিংবা অস্বাভাবিক মৃত্যুরও শিকার হয় অনেকে। মূলত স্বজনদের সন্ধান না পাওয়ায় এসব লাশ অজ্ঞাত লাশ হিসেবে পরিচয় পায় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

হাসপাতালের মর্গ। ছবি: চরচা
হাসপাতালের মর্গ। ছবি: চরচা

এ নিয়ে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গের ইনচার্জ যতন কুমার জানান, প্রতিদিনই দু-একটি অজ্ঞাত মরদেহ এখানে আসে। অন্যদিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মর্গে প্রায় দিনই আসছে বেওয়ারিশ লাশ।

এসব লাশ সৎকারের জন্য সাধারণত আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের কাছে পাঠানো হয়। মরদেহ সৎকারের জায়গার ব্যবস্থা করে সিটি করপোরেশন। চলতি বছরে আঞ্জুমান মফিদুল ইসলাম থেকে ৬০৯টি অজ্ঞাত মরদেহ সৎকার করা হয়েছে। এর মধ্যে জুরাইনে ১৪৮ ও রায়েরবাজার কবরস্থানে দাফন হয়েছে ৪৫৪টি মরদেহের। সনাতন ধর্মালম্বীদের সৎকার করা হয় পোস্তগোলা শ্মশান ঘাটে। চলতি বছর এ শ্মশানঘাটে দাহ হয়েছে ৭টা মরদেহের।

অজ্ঞাত লাশ দাফন সম্পর্কে আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের দাফন সেবা কর্মকর্তা মো. কামরুল আহমেদ চরচাকে বলেন, “পুলিশের অনুমতি পাওয়ার পর আঞ্জুমান মফিদুলের নিজস্ব গাড়ি করে ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত কবরস্থানে অজ্ঞাত পরিচয় লাশ দাফন করা হয়।”

নাম পরিচয়হীন এসব লাশ ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গা, ফুটপাত, ফুটওভার ব্রিজসহ বিভিন্ন সড়ক থেকে উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া রমনা পার্ক, জাতীয় ঈদগাহ এলাকা, শহীদ মিনার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পয়েন্ট থেকেও মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) উপপুলিশ কমিশনার মো. তালেবুর রহমান বলেন, “ঢাকা মহানগরী ও এর আশপাশের এলাকা থেকে যেসব মরদেহ উদ্ধার করা হয়, তাদের বেশির ভাগই পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া মানুষ। যাদের ভোটার আইডি কার্ড নেই, তাদের শনাক্ত করা মুশকিল হয়ে যায়।”

কিন্তু অজ্ঞাত লাশ শনাক্তের ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে এমএসএফ। তারা বলছে, ২০২৫ সালে উদ্বেগ-আতঙ্কের বিষয় ছিল অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধারের ঘটনা, যার মধ্য দিয়ে জনজীবনের নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি জোরালোভাবে সকলের সামনে এসেছে। খুবই অল্পসংখ্যক অজ্ঞাতনামা লাশ শনাক্ত করা সম্ভব হলেও বাকি লাশের পরিচয় অজ্ঞাতই থেকে যাচ্ছে। পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা লাশের পরিচয় উদ্ধারে অপারগতা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে। এসব অজ্ঞাতনামা লাশ স্কচটেপ দিয়ে হাত-পা বাঁধা, রাস্তার ধারে পড়ে থাকা, বস্তাবন্দি, নদীর পানিতে ভাসমান, রেললাইনের ধারে বা খাল বিল থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।

ডিএমপি যদিও এ ক্ষেত্রে উদ্ধার হওয়া মরদেহ পঁচে গলে যাওয়াকে কারণ হিসেবে সামনে আনছে। তারা বলছে, কিছু মরদেহ খালবিলে পাওয়া যায়। অনেক সময় এসব মরদেহ পঁচা বা গলিত অবস্থায় উদ্ধার হয়।

এ নিয়ে ডিএমপির উপপুলিশ কমিশনার মো. তালেবুর রহমান বলেন বলেন, “মরদেহ যদি পঁচে বা গলে যায়, তাহলে পরিচয় বের করার পন্থা ফিঙ্গারপ্রিন্ট। এ ক্ষেত্রে যদি ফিঙ্গারপ্রিন্ট নষ্ট হয়ে যায়, বা ন্যাশনাল ডেটাবেজে কোনো তথ্য না থাকে, তাহলে শনাক্ত করতে চ্যালেঞ্জ হয়ে যায়।”

সম্পর্কিত