চরচা ডেস্ক

“আমেরিকা কি চীনের পেছনে পড়ে যেতে পারে?”—গত বছরের শেষের দিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সংক্রান্ত এক প্রশ্নোত্তর পর্বে এনভিডিয়া প্রধান জেসন হুয়াং নিজেই প্রশ্নটি উত্থাপন করেন। তিনি নিজেই এর উত্তর দেন, “অবশ্যই সম্ভব।”
কথাটি কিছুটা বিস্ময়কর মনে হতে পারে। কারণ গত এক দশকের প্রায় পুরোটা সময় এআই প্রতিযোগিতায় আমেরিকা বেশ দাপটের সাথেই শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে। ফ্রন্টিয়ার মডেল তৈরি করা বিশ্বের সবচাইতে উন্নত প্রতিষ্ঠানগুলোর কেন্দ্রস্থল এই দেশ। এখানকার প্রকৌশলীদের হাতে যেমন পর্যাপ্ত মূলধন রয়েছে, তেমনি রয়েছে এনভিডিয়ার মতো অত্যাধুনিক চিপের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ। তবে হুয়াংয়ের উদ্বেগের মূল কারণ ছিল উদ্ভাবনের জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ অন্য একটি উপাদান–মানবিক প্রতিভা।
সম্প্রতি পর্যন্ত এআই গবেষণার মূল নিয়ন্ত্রণ ছিল পশ্চিমা বিশ্বের হাতে। তবে সেই আধিপত্যে এখন বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে। ২০২৫ সালে প্রথমবারের মতো দেখা গেছে, বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ এআই সম্মেলনে উপস্থাপিত গবেষণাপত্রগুলোর প্রধান লেখকদের মধ্যে আমেরিকা বা ইউরোপের তুলনায় চীনের গবেষকদের সংখ্যা ছিল অনেক বেশি।
বিশ্বজুড়ে এআই মেধার এই আন্তর্জাতিক স্থানান্তর এবং বিবর্তন আরও গভীরভাবে বোঝার জন্য ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট একটি বিশেষ অনুসন্ধান চালায়। তারা ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নিউরাল ইনফরমেশন প্রসেসিং সিস্টেমস বা নিউয়ারআইপিএস সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী গবেষকদের শিক্ষাগত পটভূমি ও ইতিহাস বিশ্লেষণ করেছে। উল্লেখ্য, নিউয়ারআইপিএস হলো এআই জগতের বৃহত্তম এবং সবচাইতে প্রভাবশালী সম্মেলন।
সেই সম্মেলনে ২১ হাজারের বেশি গবেষণাপত্র জমা পড়েছিল, যার মধ্যে মাত্র এক-চতুর্থাংশ গ্রহণের জন্য মনোনীত হয়। ইতিপূর্বে ‘ম্যাক্রোপোলো’ নামক একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ২০১৯ এবং ২০২২ সালের গবেষকদের শিক্ষাগত পরিবর্তনের ধারা বিশ্লেষণ করেছিল। ২০২৫ সালের প্রায় ৪ হাজার গবেষকের লেখা ৬০০টি দৈবচয়নকৃত গবেষণাপত্রের ওপর তাদের সেই একই বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি প্রয়োগ করে নতুন চিত্র পায় ইকোনমিস্ট।
২০২৫ সালের সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী গবেষকদের স্নাতক ডিগ্রির উৎস বিশ্লেষণ করলে এক বিস্ময়কর চিত্র ফুটে ওঠে। শীর্ষ দশটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে নয়টিই চীনের। শুধুমাত্র সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েটরাই নিউয়ারআইপিএস সম্মেলনে মোট গবেষকদের ৪ শতাংশ দখল করে নিয়েছেন; যেখানে আমেরিকার শীর্ষ বিদ্যাপীঠ এমআইটি থেকে এসেছেন মাত্র ১ শতাংশ।
এই বিশ্লেষণটি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উন্মোচন করেছে। আমেরিকার এআই কার্যক্রম মূলত চীনা বংশোদ্ভূত গবেষকদের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। বর্তমানে আমেরিকান প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যুক্ত গবেষকদের প্রায় ৩৫ শতাংশই চীন থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন, যা আমেরিকায় ডিগ্রিধারী গবেষকদের সংখ্যার সমান।
তবে নিউয়ারআইপিএস সম্মেলনের এই পরিসংখ্যানই এআই জগতের চূড়ান্ত চিত্র কি না, তা নিয়ে বিতর্কের অবকাশ রয়েছে। চীনা গবেষকদের ক্ষেত্রে এই সম্মেলনে গবেষণাপত্র জমা দেওয়ার পেছনে বাড়তি কিছু কারণ থাকতে পারে। যেমন—সেখানকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে পদোন্নতির জন্য জীবনবৃত্তান্তে শীর্ষস্থানীয় সম্মেলনের প্রকাশনা থাকা বাধ্যতামূলক। এছাড়া, চীনের ‘ওপেন-সোর্স’ বা উন্মুক্ত এআই মডেল তৈরির সংস্কৃতি বিজ্ঞানীদের একাডেমিক ফোরামে গবেষণাপত্র প্রকাশে উৎসাহিত করে। অন্যদিকে, আমেরিকার সেরা মেধাবীদের একটি বড় অংশ বর্তমানে বিভিন্ন করপোরেট প্রতিষ্ঠানের অত্যন্ত গোপনীয় ও বিশেষায়িত ফ্রন্টিয়ার ল্যাবগুলোতে কাজ করছেন, যার কারণে তাদের কাজগুলো সচরাচর জনসমক্ষে প্রকাশিত হয় না।

আমেরিকার এআই খাতে চীনা গবেষকদের গুরুত্ব কতটা অপরিসীম, তা পরিমাপ করার আরও কিছু জোরালো মানদণ্ড রয়েছে। গত জুনে যখন প্রযুক্তি জায়ান্ট মেটা তাদের নতুন ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স ল্যাব’-এর জন্য গবেষক নিয়োগের ঘোষণা দেয়, তখন ফাঁস হওয়া একটি তালিকা থেকে জানা যায় যে, সেখানকার অর্ধেক গবেষকই চীনা বংশোদ্ভূত।
একইভাবে, ওপেনএআইয়ের বহুল আলোচিত ‘জিপিটি-৫’ প্রকল্পে যুক্ত ৪৮৩ জন কর্মীর ওপর দ্য ইকোনমিস্ট একটি বিশ্লেষণ চালায়। এতে দেখা গেছে যে, এআই গবেষক থেকে শুরু করে বিপণন, নকশা এবং নেতৃত্ব পর্যায়ের কর্মীদের মধ্যে অন্তত ১৫ শতাংশের ন্যূনতম একটি ডিগ্রি রয়েছে চীনের কোনো না কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে।
এআই মেধা ধরে রাখার ক্ষেত্রে চীন এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সফল। ডাটা ফার্ম ‘ডিজিটাল সায়েন্স’-এর তথ্যমতে, বর্তমানে চীনে সক্রিয় এআই গবেষকের সংখ্যা আমেরিকা, ব্রিটেন এবং ইউরোপের সম্মিলিত সংখ্যার চেয়েও বেশি—যদিও মাথাপিছু বা জনসংখ্যার অনুপাতে তারা এখনো পশ্চিমাদের চেয়ে পিছিয়ে।
সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক দিক হলো, চীনের এই গবেষক দলটি মূলত তরুণনির্ভর; যাদের ৪৭ শতাংশই শিক্ষার্থী, যেখানে পশ্চিমা দেশগুলোতে এই হার মাত্র ৩০ শতাংশ। এর অন্যতম কারণ হলো, চীন বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত (স্টেম) শিক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। দেশটির বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের প্রায় দুই-পঞ্চমাংশই স্টেম বিষয়ের ছাত্র, যা আমেরিকার তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
অবশ্য এই গ্র্যাজুয়েটদের সবাই যে যুগান্তকারী উদ্ভাবন করবেন তা নয়। তবে এক্ষেত্রে মেধার বিশাল সংখ্যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এআই-দক্ষ গবেষকদের এই সুবিশাল ভাণ্ডার একদিকে যেমন নতুন কোনো আবিষ্কারের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়, তেমনি নতুন প্রযুক্তির দ্রুত প্রসারেও বড় ভূমিকা রাখে। ডিজিটাল সায়েন্সয়ের প্রধান ড্যানিয়েল হুক বলেন, “চীন উচ্চমানের ও উচ্চশিক্ষিত এক এআই-সচেতন কর্মীবাহিনী গড়ে তুলছে। এর পরিষ্কার অর্থ হলো, ভবিষ্যতে চীন থেকে আরও অসংখ্য শক্তিশালী টেক কোম্পানি বিশ্ববাজারে আত্মপ্রকাশ করবে।”
চীনা মেধাবীদের নিজ দেশে থেকে যাওয়ার প্রবণতা এখন তুঙ্গে। ২০১৯ সালে চীন থেকে স্নাতক সম্পন্ন করা নিউয়ারআইপিএস গবেষকদের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ নিজ দেশে অবস্থান করতেন। ২০২২ সালে সেই হার বেড়ে দাঁড়ায় ৫৮ শতাংশে এবং ২০২৫ সালে তা রেকর্ড ৬৮ শতাংশে পৌঁছেছে। এমনকি চীনের সাম্প্রতিক সময়ের সেরা কিছু উদ্ভাবন এখন পুরোপুরি স্থানীয় মেধার ফসল। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেওয়া এআই মডেল ‘ডিপসিক আর-১’-এর মূল উদ্ভাবকদের কেউই চীনের বাইরের কোনো ডিগ্রিধারী নন।
এই পরিবর্তনের পেছনে ‘পুল এন্ড পুশ’ ফ্যাক্টর কাজ করছে। একদিকে চীনা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ে ক্রমাগত আধিপত্য বিস্তার করছে; অন্যদিকে, মেধাবীদের দেশে ফিরিয়ে আনতে ‘কিমিং প্ল্যান’-এর মতো উদ্যোগগুলো বছরে ৭ লাখ ইউয়ানের (১ লাখ ডলার) বেশি বেতন, মোটা অঙ্কের গবেষণা অনুদান ও আবাসন সুবিধার মতো প্রলোভন দিচ্ছে।

বিপরীত দিকে, গবেষকদের কাছে আমেরিকার আকর্ষণ আগের চেয়ে ম্লান হয়ে আসছে। গবেষণা তহবিলে কাটছাঁট এবং ভিসা নিয়ে অনিশ্চয়তা সম্ভাব্য আবেদনকারীদের দ্বিধায় ফেলেছে। সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তাদের আনুগত্য নিয়ে ক্রমবর্ধমান সন্দেহ। গত বছর পারডু ইউনিভার্সিটি ১০০-রও বেশি স্নাতক শিক্ষার্থীর ভর্তি বাতিল করে, যাদের অধিকাংশই ছিল চীনা। মূলত আইনপ্রণেতারা এই গবেষকদের সঙ্গে চীনা প্রতিষ্ঠানের কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তার প্রমাণ চাওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়টি এমন কঠোর সিদ্ধান্ত নেয়। পরিস্থিতি এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, আমেরিকার বিভিন্ন এআই কনফারেন্সে অনেক চীনা গবেষক নিজেদের ‘কর্পোরেট স্পাই’ নন—তা স্পষ্ট করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছেন।
ফলে, বিপুল সংখ্যক মেধাবী এখন স্বদেশের পথ ধরছেন। ২০১৯ সালে বিদেশ থেকে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনকারী নিউয়ারআইপিএস গবেষকদের মাত্র ১২ শতাংশ চীনে ফিরে গিয়েছিলেন; ২০২৫ সাল নাগাদ সেই হার দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে ২৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
দ্য ইকোনমিস্ট এমন কয়েকজন চীনা বংশোদ্ভূত তরুণ গবেষকের সঙ্গে কথা বলেছে, যারা সম্প্রতি আমেরিকা থেকে পাকাপাকিভাবে দেশে ফিরেছেন অথবা দুই দেশের মধ্যেই যাতায়াত করছেন। তাদের কেউ কেউ এখনো মনে করেন যে, আমেরিকার গবেষণার পরিবেশ চীনের চেয়ে উন্নত। আবার অনেকে চীনের দ্রুত বর্ধনশীল প্রতিষ্ঠানগুলোর তীব্র প্রতিযোগিতা এবং অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা নিয়ে অভিযোগও করেছেন। তা সত্ত্বেও, তাদের মতে—সব মিলিয়ে একটি শক্তিশালী কর্মসংস্থান বাজার, আকর্ষণীয় সুযোগ-সুবিধা এবং পরিবারের সান্নিধ্য এখন ওইসব নেতিবাচক দিকগুলোর তুলনায় অনেক বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
আমেরিকার আকর্ষণ যে একেবারে ফুরিয়ে গেছে, তা কিন্তু নয়। এটি এখনো বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের চেয়ে বেশি আন্তর্জাতিক মেধাবীকে আকৃষ্ট করে এবং আমেরিকায় উচ্চতর ডিগ্রি সম্পন্ন করা অধিকাংশ চীনা গবেষকই কর্মজীবনের জন্য সেখানেই থেকে যান। ২০১৯ সালের সম্মেলনে অংশ নেওয়া আমেরিকায় বসবাসরত চীনা বংশোদ্ভূত গবেষকদের একটি নমুনা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০২৫ সালেও তাদের ৮৭ শতাংশ সেখানেই অবস্থান করছেন। কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের গবেষক ম্যাট শিহান বলেন, “দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলো রাতারাতি বিলীন হয়ে যায় না।”
তবে পরিসংখ্যানগুলো ক্রমশ চীনের পাল্লাকেই ভারী করছে। নিউয়ারআইপিএস গবেষণাপত্রের লেখকদের মানদণ্ড হিসেবে ধরলে দেখা যায়, বিশ্বের শীর্ষ এআই গবেষকদের প্রায় ৩৭ শতাংশ এখন চীনা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত; যেখানে আমেরিকান প্রতিষ্ঠানে এই হার ৩২ শতাংশ। গত এক দশকের এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে, ২০২৮ সাল নাগাদ চীনে অবস্থানরত শীর্ষ গবেষকের সংখ্যা আমেরিকায় থাকা গবেষকদের তুলনায় দ্বিগুণ হয়ে যেতে পারে। এনভিডিয়া প্রধান জেসন হুয়াংয়ের মতে, এআই খাতে নেতৃত্ব দেওয়ার লড়াইয়ে মেধাবী ডেভেলপারদের জয় করাই আসল কথা। আর মেধা দখলের সেই লড়াই এখন ক্রমেই একপাক্ষিক হয়ে উঠছে।

“আমেরিকা কি চীনের পেছনে পড়ে যেতে পারে?”—গত বছরের শেষের দিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সংক্রান্ত এক প্রশ্নোত্তর পর্বে এনভিডিয়া প্রধান জেসন হুয়াং নিজেই প্রশ্নটি উত্থাপন করেন। তিনি নিজেই এর উত্তর দেন, “অবশ্যই সম্ভব।”
কথাটি কিছুটা বিস্ময়কর মনে হতে পারে। কারণ গত এক দশকের প্রায় পুরোটা সময় এআই প্রতিযোগিতায় আমেরিকা বেশ দাপটের সাথেই শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে। ফ্রন্টিয়ার মডেল তৈরি করা বিশ্বের সবচাইতে উন্নত প্রতিষ্ঠানগুলোর কেন্দ্রস্থল এই দেশ। এখানকার প্রকৌশলীদের হাতে যেমন পর্যাপ্ত মূলধন রয়েছে, তেমনি রয়েছে এনভিডিয়ার মতো অত্যাধুনিক চিপের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ। তবে হুয়াংয়ের উদ্বেগের মূল কারণ ছিল উদ্ভাবনের জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ অন্য একটি উপাদান–মানবিক প্রতিভা।
সম্প্রতি পর্যন্ত এআই গবেষণার মূল নিয়ন্ত্রণ ছিল পশ্চিমা বিশ্বের হাতে। তবে সেই আধিপত্যে এখন বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে। ২০২৫ সালে প্রথমবারের মতো দেখা গেছে, বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ এআই সম্মেলনে উপস্থাপিত গবেষণাপত্রগুলোর প্রধান লেখকদের মধ্যে আমেরিকা বা ইউরোপের তুলনায় চীনের গবেষকদের সংখ্যা ছিল অনেক বেশি।
বিশ্বজুড়ে এআই মেধার এই আন্তর্জাতিক স্থানান্তর এবং বিবর্তন আরও গভীরভাবে বোঝার জন্য ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট একটি বিশেষ অনুসন্ধান চালায়। তারা ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নিউরাল ইনফরমেশন প্রসেসিং সিস্টেমস বা নিউয়ারআইপিএস সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী গবেষকদের শিক্ষাগত পটভূমি ও ইতিহাস বিশ্লেষণ করেছে। উল্লেখ্য, নিউয়ারআইপিএস হলো এআই জগতের বৃহত্তম এবং সবচাইতে প্রভাবশালী সম্মেলন।
সেই সম্মেলনে ২১ হাজারের বেশি গবেষণাপত্র জমা পড়েছিল, যার মধ্যে মাত্র এক-চতুর্থাংশ গ্রহণের জন্য মনোনীত হয়। ইতিপূর্বে ‘ম্যাক্রোপোলো’ নামক একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ২০১৯ এবং ২০২২ সালের গবেষকদের শিক্ষাগত পরিবর্তনের ধারা বিশ্লেষণ করেছিল। ২০২৫ সালের প্রায় ৪ হাজার গবেষকের লেখা ৬০০টি দৈবচয়নকৃত গবেষণাপত্রের ওপর তাদের সেই একই বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি প্রয়োগ করে নতুন চিত্র পায় ইকোনমিস্ট।
২০২৫ সালের সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী গবেষকদের স্নাতক ডিগ্রির উৎস বিশ্লেষণ করলে এক বিস্ময়কর চিত্র ফুটে ওঠে। শীর্ষ দশটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে নয়টিই চীনের। শুধুমাত্র সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েটরাই নিউয়ারআইপিএস সম্মেলনে মোট গবেষকদের ৪ শতাংশ দখল করে নিয়েছেন; যেখানে আমেরিকার শীর্ষ বিদ্যাপীঠ এমআইটি থেকে এসেছেন মাত্র ১ শতাংশ।
এই বিশ্লেষণটি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উন্মোচন করেছে। আমেরিকার এআই কার্যক্রম মূলত চীনা বংশোদ্ভূত গবেষকদের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। বর্তমানে আমেরিকান প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যুক্ত গবেষকদের প্রায় ৩৫ শতাংশই চীন থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন, যা আমেরিকায় ডিগ্রিধারী গবেষকদের সংখ্যার সমান।
তবে নিউয়ারআইপিএস সম্মেলনের এই পরিসংখ্যানই এআই জগতের চূড়ান্ত চিত্র কি না, তা নিয়ে বিতর্কের অবকাশ রয়েছে। চীনা গবেষকদের ক্ষেত্রে এই সম্মেলনে গবেষণাপত্র জমা দেওয়ার পেছনে বাড়তি কিছু কারণ থাকতে পারে। যেমন—সেখানকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে পদোন্নতির জন্য জীবনবৃত্তান্তে শীর্ষস্থানীয় সম্মেলনের প্রকাশনা থাকা বাধ্যতামূলক। এছাড়া, চীনের ‘ওপেন-সোর্স’ বা উন্মুক্ত এআই মডেল তৈরির সংস্কৃতি বিজ্ঞানীদের একাডেমিক ফোরামে গবেষণাপত্র প্রকাশে উৎসাহিত করে। অন্যদিকে, আমেরিকার সেরা মেধাবীদের একটি বড় অংশ বর্তমানে বিভিন্ন করপোরেট প্রতিষ্ঠানের অত্যন্ত গোপনীয় ও বিশেষায়িত ফ্রন্টিয়ার ল্যাবগুলোতে কাজ করছেন, যার কারণে তাদের কাজগুলো সচরাচর জনসমক্ষে প্রকাশিত হয় না।

আমেরিকার এআই খাতে চীনা গবেষকদের গুরুত্ব কতটা অপরিসীম, তা পরিমাপ করার আরও কিছু জোরালো মানদণ্ড রয়েছে। গত জুনে যখন প্রযুক্তি জায়ান্ট মেটা তাদের নতুন ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স ল্যাব’-এর জন্য গবেষক নিয়োগের ঘোষণা দেয়, তখন ফাঁস হওয়া একটি তালিকা থেকে জানা যায় যে, সেখানকার অর্ধেক গবেষকই চীনা বংশোদ্ভূত।
একইভাবে, ওপেনএআইয়ের বহুল আলোচিত ‘জিপিটি-৫’ প্রকল্পে যুক্ত ৪৮৩ জন কর্মীর ওপর দ্য ইকোনমিস্ট একটি বিশ্লেষণ চালায়। এতে দেখা গেছে যে, এআই গবেষক থেকে শুরু করে বিপণন, নকশা এবং নেতৃত্ব পর্যায়ের কর্মীদের মধ্যে অন্তত ১৫ শতাংশের ন্যূনতম একটি ডিগ্রি রয়েছে চীনের কোনো না কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে।
এআই মেধা ধরে রাখার ক্ষেত্রে চীন এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সফল। ডাটা ফার্ম ‘ডিজিটাল সায়েন্স’-এর তথ্যমতে, বর্তমানে চীনে সক্রিয় এআই গবেষকের সংখ্যা আমেরিকা, ব্রিটেন এবং ইউরোপের সম্মিলিত সংখ্যার চেয়েও বেশি—যদিও মাথাপিছু বা জনসংখ্যার অনুপাতে তারা এখনো পশ্চিমাদের চেয়ে পিছিয়ে।
সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক দিক হলো, চীনের এই গবেষক দলটি মূলত তরুণনির্ভর; যাদের ৪৭ শতাংশই শিক্ষার্থী, যেখানে পশ্চিমা দেশগুলোতে এই হার মাত্র ৩০ শতাংশ। এর অন্যতম কারণ হলো, চীন বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত (স্টেম) শিক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। দেশটির বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের প্রায় দুই-পঞ্চমাংশই স্টেম বিষয়ের ছাত্র, যা আমেরিকার তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
অবশ্য এই গ্র্যাজুয়েটদের সবাই যে যুগান্তকারী উদ্ভাবন করবেন তা নয়। তবে এক্ষেত্রে মেধার বিশাল সংখ্যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এআই-দক্ষ গবেষকদের এই সুবিশাল ভাণ্ডার একদিকে যেমন নতুন কোনো আবিষ্কারের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়, তেমনি নতুন প্রযুক্তির দ্রুত প্রসারেও বড় ভূমিকা রাখে। ডিজিটাল সায়েন্সয়ের প্রধান ড্যানিয়েল হুক বলেন, “চীন উচ্চমানের ও উচ্চশিক্ষিত এক এআই-সচেতন কর্মীবাহিনী গড়ে তুলছে। এর পরিষ্কার অর্থ হলো, ভবিষ্যতে চীন থেকে আরও অসংখ্য শক্তিশালী টেক কোম্পানি বিশ্ববাজারে আত্মপ্রকাশ করবে।”
চীনা মেধাবীদের নিজ দেশে থেকে যাওয়ার প্রবণতা এখন তুঙ্গে। ২০১৯ সালে চীন থেকে স্নাতক সম্পন্ন করা নিউয়ারআইপিএস গবেষকদের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ নিজ দেশে অবস্থান করতেন। ২০২২ সালে সেই হার বেড়ে দাঁড়ায় ৫৮ শতাংশে এবং ২০২৫ সালে তা রেকর্ড ৬৮ শতাংশে পৌঁছেছে। এমনকি চীনের সাম্প্রতিক সময়ের সেরা কিছু উদ্ভাবন এখন পুরোপুরি স্থানীয় মেধার ফসল। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেওয়া এআই মডেল ‘ডিপসিক আর-১’-এর মূল উদ্ভাবকদের কেউই চীনের বাইরের কোনো ডিগ্রিধারী নন।
এই পরিবর্তনের পেছনে ‘পুল এন্ড পুশ’ ফ্যাক্টর কাজ করছে। একদিকে চীনা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ে ক্রমাগত আধিপত্য বিস্তার করছে; অন্যদিকে, মেধাবীদের দেশে ফিরিয়ে আনতে ‘কিমিং প্ল্যান’-এর মতো উদ্যোগগুলো বছরে ৭ লাখ ইউয়ানের (১ লাখ ডলার) বেশি বেতন, মোটা অঙ্কের গবেষণা অনুদান ও আবাসন সুবিধার মতো প্রলোভন দিচ্ছে।

বিপরীত দিকে, গবেষকদের কাছে আমেরিকার আকর্ষণ আগের চেয়ে ম্লান হয়ে আসছে। গবেষণা তহবিলে কাটছাঁট এবং ভিসা নিয়ে অনিশ্চয়তা সম্ভাব্য আবেদনকারীদের দ্বিধায় ফেলেছে। সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তাদের আনুগত্য নিয়ে ক্রমবর্ধমান সন্দেহ। গত বছর পারডু ইউনিভার্সিটি ১০০-রও বেশি স্নাতক শিক্ষার্থীর ভর্তি বাতিল করে, যাদের অধিকাংশই ছিল চীনা। মূলত আইনপ্রণেতারা এই গবেষকদের সঙ্গে চীনা প্রতিষ্ঠানের কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তার প্রমাণ চাওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়টি এমন কঠোর সিদ্ধান্ত নেয়। পরিস্থিতি এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, আমেরিকার বিভিন্ন এআই কনফারেন্সে অনেক চীনা গবেষক নিজেদের ‘কর্পোরেট স্পাই’ নন—তা স্পষ্ট করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছেন।
ফলে, বিপুল সংখ্যক মেধাবী এখন স্বদেশের পথ ধরছেন। ২০১৯ সালে বিদেশ থেকে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনকারী নিউয়ারআইপিএস গবেষকদের মাত্র ১২ শতাংশ চীনে ফিরে গিয়েছিলেন; ২০২৫ সাল নাগাদ সেই হার দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে ২৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
দ্য ইকোনমিস্ট এমন কয়েকজন চীনা বংশোদ্ভূত তরুণ গবেষকের সঙ্গে কথা বলেছে, যারা সম্প্রতি আমেরিকা থেকে পাকাপাকিভাবে দেশে ফিরেছেন অথবা দুই দেশের মধ্যেই যাতায়াত করছেন। তাদের কেউ কেউ এখনো মনে করেন যে, আমেরিকার গবেষণার পরিবেশ চীনের চেয়ে উন্নত। আবার অনেকে চীনের দ্রুত বর্ধনশীল প্রতিষ্ঠানগুলোর তীব্র প্রতিযোগিতা এবং অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা নিয়ে অভিযোগও করেছেন। তা সত্ত্বেও, তাদের মতে—সব মিলিয়ে একটি শক্তিশালী কর্মসংস্থান বাজার, আকর্ষণীয় সুযোগ-সুবিধা এবং পরিবারের সান্নিধ্য এখন ওইসব নেতিবাচক দিকগুলোর তুলনায় অনেক বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
আমেরিকার আকর্ষণ যে একেবারে ফুরিয়ে গেছে, তা কিন্তু নয়। এটি এখনো বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের চেয়ে বেশি আন্তর্জাতিক মেধাবীকে আকৃষ্ট করে এবং আমেরিকায় উচ্চতর ডিগ্রি সম্পন্ন করা অধিকাংশ চীনা গবেষকই কর্মজীবনের জন্য সেখানেই থেকে যান। ২০১৯ সালের সম্মেলনে অংশ নেওয়া আমেরিকায় বসবাসরত চীনা বংশোদ্ভূত গবেষকদের একটি নমুনা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০২৫ সালেও তাদের ৮৭ শতাংশ সেখানেই অবস্থান করছেন। কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের গবেষক ম্যাট শিহান বলেন, “দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলো রাতারাতি বিলীন হয়ে যায় না।”
তবে পরিসংখ্যানগুলো ক্রমশ চীনের পাল্লাকেই ভারী করছে। নিউয়ারআইপিএস গবেষণাপত্রের লেখকদের মানদণ্ড হিসেবে ধরলে দেখা যায়, বিশ্বের শীর্ষ এআই গবেষকদের প্রায় ৩৭ শতাংশ এখন চীনা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত; যেখানে আমেরিকান প্রতিষ্ঠানে এই হার ৩২ শতাংশ। গত এক দশকের এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে, ২০২৮ সাল নাগাদ চীনে অবস্থানরত শীর্ষ গবেষকের সংখ্যা আমেরিকায় থাকা গবেষকদের তুলনায় দ্বিগুণ হয়ে যেতে পারে। এনভিডিয়া প্রধান জেসন হুয়াংয়ের মতে, এআই খাতে নেতৃত্ব দেওয়ার লড়াইয়ে মেধাবী ডেভেলপারদের জয় করাই আসল কথা। আর মেধা দখলের সেই লড়াই এখন ক্রমেই একপাক্ষিক হয়ে উঠছে।