দ্য ইকোনোমিস্টের বিশ্লেষণ

ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্ব অর্থনীতির ক্ষতি হবে ভয়াবহ

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্ব অর্থনীতির ক্ষতি হবে ভয়াবহ
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

অর্থনীতিবিদদের একটি পুরো প্রজন্মকে শেখানো হয়েছিল যে, জ্বালানি তেলের বড় ধরনের সংকট এখন সুদূর অতীতের বিষয়। ধারণা করা হতো, মধ্যপ্রাচ্যের একক আধিপত্যের অবসান হয়েছে এবং বিশ্ব অর্থনীতি আগের চেয়ে অনেক বেশি জ্বালানি-সাশ্রয়ী হয়ে ওঠায় সেই দিন ফুরিয়েছে।

তবে গত দুই সপ্তাহের ঘটনাবলি সেই পুরনো চিন্তাধারাকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। এটি স্পষ্ট যে, পারস্য উপসাগরে যেকোনো বড় ধরনের অস্থিরতা আজও এক গভীর সংকটের সূত্রপাত করতে পারে। আর বর্তমানে হরমুজ প্রণালী থেকে যে ধাক্কাটি আসছে, তা আক্ষরিক অর্থেই বিশাল।

ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে বিশ্বজুড়ে তেলের মোট সরবরাহের প্রায় ১৫% এখন হরমুজ প্রণালীর ওপারে আটকা পড়ে আছে। এই বিঘ্নের মাত্রা ১৯৭০-এর দশকের সংকটের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। যদিও সেই সময়ের তুলনায় বর্তমানে বিশ্ব অর্থনীতির জ্বালানি-নির্ভরতা প্রায় অর্ধেক কমে এসেছে, তবুও সরবরাহের এই বিশাল ঘাটতি সেই অগ্রগতিকে ম্লান করে দিচ্ছে।

শুধু জ্বালানি তেল নয়, সংকটের প্রভাব পড়ছে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) বাজারেও। বিশ্বের মোট এলএনজি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ বর্তমানে বন্ধ রয়েছে, যার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে অন্যান্য কাঁচামাল ও পণ্যের ওপর। আইএমএফ তাই দেশগুলোকে অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকতে বলেছে।

কোনো পথ নেই

প্রণালীটি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এবং তা পুনরায় খোলার কোনো নিশ্চিত উপায় না থাকায়, তেলের দামের পরিবর্তন এখন পর্যন্ত তুলনামূলকভাবে সামান্যই বলা চলে। এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত অপরিশোধিত তেলের দাম যুদ্ধপূর্ব পরিস্থিতির চেয়ে ব্যারেল প্রতি মাত্র ২৫ ডলার বেশি ছিল। মূলত ৯ মার্চ ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে তার এই ‘সামান্য অভিযান’ ইতিমধ্যে ‘পুরোপুরি সম্পন্ন’ হয়েছে বলে মন্তব্য করার পর দাম কিছুটা কমে আসে।

মার্কিন প্রেসিডেন্টের সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষায় যত দেরি হচ্ছে, বাজারে তেলের সরবরাহ ও চাহিদার ভারসাম্য বজায় রাখা ততই কঠিন হয়ে পড়ছে। বিশ্বের তেলের চাহিদা স্থায়ীভাবে ১৫ শতাংশ কমিয়ে আনতে দাম ঠিক কতটা বাড়াতে হবে, তা এখন পর্যন্ত কারোরই জানা নেই।

বিশ্লেষকদের মতে, যদি চলতি মাসের শেষ পর্যন্ত হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকে, তবে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১৫০ এমনকি ২০০ ডলারেও ঠেকতে পারে। এমনটা ঘটলে বিশ্বজুড়ে চরম মুদ্রাস্ফীতি ও ভয়াবহ অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেবে—যা হবে ১৯৭০-এর দশকের সেই কুখ্যাত স্থবির মুদ্রাস্ফীতিরই পুনরাবৃত্তি। এমনকি পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও, অর্থাৎ সামান্য তেল সরবরাহ সম্ভব হলেও যদি অধিকাংশ জাহাজ চলাচল ব্যাহত থাকে, তবে বিশ্ব অর্থনীতির ক্ষয়ক্ষতি হবে অপূরণীয়।

বিশ্ব অর্থনীতির ওপর এই আঘাত তীব্র হলেও এর প্রভাব সব অঞ্চলে সমান নয়। আমেরিকার আর্থিক বাজারের গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে আপাতদৃষ্টিতে মনে হবে না যে কোনো বড় ধরনের অর্থনৈতিক মহাপ্রলয় ঘনিয়ে আসছে। চলতি মার্চে মার্কিন পুঁজিবাজারের প্রধান সূচক ‘এসঅ্যান্ডপি ৫০০’ কমেছে মাত্র ১.৫ শতাংশ। এমনকি ১০ বছর মেয়াদী ট্রেজারি বন্ডের মুনাফার হার বাড়লেও তা গত তিন মাসের সর্বোচ্চ সীমাকে এখনও অতিক্রম করেনি। তবে ইউরোপের চিত্র কিছুটা ভিন্ন এবং তুলনামূলক বেশি উদ্বেগের। সেখানে মাসের ব্যবধানে শেয়ারবাজারের পতন হয়েছে ৫ থেকে ৬ শতাংশ। এশিয়ার পরিস্থিতি আরও নাজুক, যেখানে জাপানের বাজার ৭.৩ শতাংশ এবং দক্ষিণ কোরিয়ার বাজার ১০ শতাংশের বেশি পড়ে গেছে।

সহজ কথায়, বৈশ্বিক আর্থিক বাজারগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, কিছু নির্দিষ্ট অঞ্চল অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। মূলত ২০১৯ সাল থেকে ‘ফ্র্যাকিং’ বিপ্লবের হাত ধরে আমেরিকা এখন জ্বালানি তেলের একটি নিট রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে। ফলে তেলের চড়া দাম তাদের অর্থনীতির কিছু খাতের জন্য উল্টো আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া মার্কিন অর্থনীতি এখন আগের তুলনায় অনেক কম তেল-নির্ভর। ১৯৭০ এর দশকের তুলনায় বর্তমানে দেশটির জিডিপির বিপরীতে তেল ব্যবহারের হার ৭০ শতাংশেরও বেশি কমেছে। মূলত যানবাহনের জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন ও হিটিং ব্যবস্থায় তেলের বদলে সস্তা প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহার এই আমূল পরিবর্তন এনেছে। যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমেরিকার এলএনজি রপ্তানি বেড়েছে, তবে তা ইউরোপের বাজারে গ্যাসের আকাশচুম্বী দামের সাথে সমতা আনার জন্য পর্যাপ্ত ছিল না। বর্তমানে ইউরোপে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম আমেরিকার তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণেরও বেশি।

আমেরিকান ভোক্তারা ইতিমধ্যে পেট্রোল পাম্পগুলোতে এই সংকটের আঁচ পেতে শুরু করেছেন। দেশটিতে জ্বালানির ওপর করের হার কম হওয়ায় তেলের বাজারের সামান্যতম ওঠানামাও সরাসরি সাধারণ মানুষের ‘পকেটে’ আঘাত হানে। একটি প্রচলিত হিসাব অনুযায়ী, তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ১০ ডলার বাড়লে প্রতি গ্যালন গ্যাসোলিনের দাম প্রায় ২৫ সেন্ট বেড়ে যায়। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে পাম্পগুলোতে জ্বালানির গড় দাম ইতিমধ্যে প্রায় ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং এই যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হবে, দাম ততটাই বাড়বে। এর ফলে তেলের ব্যবসায়ীরা চড়া মুনাফা করলেও সাধারণ মানুষ যদি অন্যান্য পণ্য কেনা কমিয়ে দেয়, তবে স্থানীয় বাজারে সামগ্রিক চাহিদায় বড় ধস নামবে, যা শেষ পর্যন্ত অর্থনীতির জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

ছবি: এআই দিয়ে তৈরি
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

এমন পরিস্থিতিতে ফেডারেল রিজার্ভের পক্ষে সুদের হার কমিয়ে এই ধাক্কা সামলানো সহজ হবে না। কারণ যুদ্ধ শুরুর আগে থেকেই তারা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছিল। ব্যবসায়ীরা এখনও সুদের হার কমার আশা করলেও সেই প্রত্যাশা যুদ্ধপূর্ব সময়ের তুলনায় অনেক ক্ষীণ হয়ে এসেছে। আগামী এক বছরে সুদের হার কোথায় গিয়ে ঠেকবে, সেই পূর্বাভাস ফেব্রুয়ারি শেষ থেকে এখন পর্যন্ত ০.৪ শতাংশ পয়েন্ট বেড়ে প্রায় ৩.৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ট্রেজারি বন্ডের মুনাফার হারের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হচ্ছে, যা বৈশ্বিক অস্থিরতার এই সময়ে সাধারণত কমার কথা ছিল।

মুদ্রাস্ফীতির এই ভয়াবহ ধাক্কায় আমেরিকার চেয়েও বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে ইউরোপ। পাইপলাইনের মাধ্যমে আসা রাশিয়ার গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমাতে ইউরোপ এখন অনেকাংশেই এলএনজির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। আইইএর সাম্প্রতিক প্রাক্কলন অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে এলএনজি সরবরাহের এক-চতুর্থাংশই আমদানির প্রয়োজন হবে ইউরোপের। ফলে এলএনজির আকাশচুম্বী দামের মুখে ইউরোপ এখন চরম অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে।

ইতিমধ্যেই স্পট মার্কেটে এলএনজি নিয়ে এক ধরনের কাড়াকাড়ি শুরু হয়ে গেছে, যেখানে বেশি দামের প্রস্তাব পাওয়ামাত্রই কার্গোগুলোর গন্তব্য বদলে ফেলা হচ্ছে। যেমন, ক্লিন মিস্ট্রাল নামের একটি ট্যাঙ্কার আমেরিকা থেকে স্পেনের দিকে রওনা দিলেও মাঝপথে হঠাৎ দিক পরিবর্তন করে এশিয়ার দিকে যাত্রা শুরু করে। গত ৯ মার্চ ইউরোপের বেঞ্চমার্ক গ্যাসের দাম প্রতি মেগাওয়াট-ঘণ্টায় ৫৬ ইউরো (৬৫ ডলার) ছাড়িয়ে যায়, যা যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় ৭৫ শতাংশেরও বেশি। যদিও পরবর্তীতে দাম সামান্য কমেছে।

আপাতত ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের পরবর্তী সেই ভয়াবহ জ্বালানি সংকটের পুনরাবৃত্তি হওয়ার সম্ভাবনা কম বলেই মনে হচ্ছে। তখন গ্যাসের দাম মেগাওয়াট-ঘণ্টায় ৩০০ ইউরো ছাড়িয়েছিল, ইউরোজোনের মুদ্রাস্ফীতি ১১ শতাংশের উপরে উঠেছিল এবং মহাদেশটির অর্থনীতি এক বছরেরও বেশি সময় ধরে স্থবির হয়ে ছিল। তা সত্ত্বেও, গ্যাসের উচ্চমূল্য মুদ্রাস্ফীতিকে উসকে দেবে, বিশেষ করে ব্রিটেনে, যেখানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৩০ শতাংশ এখনও গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। কেন্দ্রীয় ব্যাংকাররা সাধারণত জ্বালানি তেলের ধাক্কাকে উপেক্ষা করার চেষ্টা করেন, কারণ তাদের ধারণা এটি মুদ্রাস্ফীতিতে কেবল একটি সাময়িক উল্লম্ফন ঘটায়। তবে এই কৌশল তখনই কাজ করে যখন সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করে যে, মুদ্রাস্ফীতি আবার কমে আসবে। কিন্তু টানা কয়েক বছর ধরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে মুদ্রাস্ফীতি বেশি থাকায় সেই বিশ্বাস এখন বড় প্রশ্নের মুখে।

গোল্ডম্যান স্যাকস ব্যাংকের প্রাক্কলন অনুযায়ী, দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির পর জ্বালানির দাম ১০ শতাংশ বাড়লে ইউরোপীয় ইউনিয়নে দীর্ঘমেয়াদী মুদ্রাস্ফীতির প্রত্যাশা প্রায় ০.১২ শতাংশ পয়েন্ট বেড়ে যায়, যা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় তিনগুণ বেশি। ব্যাংকটি মনে করছে, হরমুজ প্রণালীর এই অচলাবস্থা যদি আরও পাঁচ সপ্তাহ স্থায়ী হয়, তবে আগামী এক বছরে ইউরোজোনের মুদ্রাস্ফীতি প্রায় এক শতাংশ বাড়তে পারে।

প্রকৃতপক্ষে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে ব্যবসায়ীরা বাজি ধরেছিলেন যে ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক শীঘ্রই সুদের হার কমানো শুরু করবে। কিন্তু এখন তারা ঠিক উল্টোটা আশা করছেন। বিনিয়োগকারীরা মুদ্রাস্ফীতির এই নতুন পরিস্থিতি পুনর্মূল্যায়ন করায় বাজার এখন বছরের শেষ নাগাদ দুই দফায় সুদের হার বৃদ্ধির পূর্বাভাস দিচ্ছে। এর ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এমন এক সংকটে পড়তে পারে যেখানে জ্বালানির উচ্চমূল্যে পিষ্ট ভোক্তা ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তা করার পরিবর্তে, সুদের হার বাড়িয়ে তারা জনগণের ভোগান্তি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

এশিয়ার দেশগুলোর অর্থনীতি এই সংকটে আরও বেশি ঝুঁকির মুখে রয়েছে। এই অঞ্চলটি জ্বালানি আমদানির ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল। চীন, ভারত, জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়া সমুদ্রপথে যে পরিমাণ অপরিশোধিত তেল আমদানি করে, তার ৪০ থেকে ৮০ শতাংশই আসে পারস্য উপসাগর থেকে। সেই সঙ্গে তাদের গ্যাসের চাহিদার একটি বড় অংশও এখান থেকে মেটানো হয়। ২০২৫ সালের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাতায়াতকারী অপরিশোধিত তেলের ৮৭ শতাংশ এবং এলএনজির ৮৬ শতাংশই ব্যবহার করেছে এশিয়া।

চীন প্রতিদিন ১ কোটি ১০ লাখ ব্যারেলের বেশি অপরিশোধিত তেল আমদানি করলেও তাদের সরকারি ও বাণিজ্যিক মজুত দিয়ে ১০০ দিনের বেশি চাহিদা মেটানো সম্ভব। পাশাপাশি তাদের এলএনজি মজুত দিয়ে চলবে ৪০ দিনের বেশি। পরিস্থিতি সামাল দিতে চীনা কর্মকর্তারা ইতিমধ্যেই অভ্যন্তরীণ সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছেন; তেল শোধনাগারগুলোকে ডিজেল ও পেট্রোল রপ্তানি স্থগিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া চীনে জ্বালানির দামের ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ থাকায় সাধারণ ভোক্তারা তেলের চড়া দাম থেকে সুরক্ষা পাবেন। ফলে বর্ধিত মূল্যের এই বড় বোঝাটি সাধারণ মানুষের পরিবর্তে মূলত রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তেল শোধনাগারগুলোকেই বইতে হবে।

হরমুজের পূর্বে: এশিয়ার সংকট

এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলোর পরিস্থিতি চীনের মতো এতটা অনুকূল নয়। আইইএর তথ্যমতে, জাপানের মোট জ্বালানি ব্যবহারের ৮৭ শতাংশ এবং দক্ষিণ কোরিয়ার ৮৪ শতাংশই আমদানিনির্ভর। এই দুটি দেশই মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। জাপান তার প্রয়োজনীয় তেলের প্রায় ৯৫ শতাংশই পায় মধ্যপ্রাচ্য থেকে, যার ৭০ শতাংশই আসে হরমুজ প্রণালী দিয়ে। অন্যদিকে, দক্ষিণ কোরিয়া তাদের তেলের ৭০ শতাংশ এবং এলএনজির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করে। কৌশলগত মজুত কিছুটা স্বস্তি দিলেও, তেলের দাম দীর্ঘ মেয়াদে চড়া থাকলে দেশ দুটির আমদানি ব্যয় আকাশচুম্বী হবে।

ছবি: এআই দিয়ে তৈরি
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

জালানির এই বাড়তি খরচ এশীয় দেশগুলোর মুদ্রার মানেও ধস নামাচ্ছে, যা আগে থেকেই দুর্বল অবস্থায় ছিল। গত ৯ মার্চ দক্ষিণ কোরীয় মুদ্রার (ওন) মান ডলার প্রতি ১,৫০০তে নেমে আসে, যা ২০০৯ সালের পর সর্বনিম্ন। দক্ষিণ কোরিয়ার শেয়ারবাজারে এই ভয়াবহ পতন রাজনৈতিক অঙ্গনকেও কাঁপিয়ে দিয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রেসিডেন্ট লি জে-মিউং ১০০ ট্রিলিয়ন ওন (৬৮ বিলিয়ন ডলার) মূল্যের একটি বাজার স্থিতিশীলকরণ তহবিল ঘোষণা করেছেন এবং জ্বালানির দামের সর্বোচ্চ সীমা বেঁধে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

পণ্য সংকটের এই প্রতিযোগিতায় উন্নত বিশ্বের দেশগুলো তাদের আর্থিক সক্ষমতা দিয়ে জয়ী হবে এবং তাদের সরকারগুলো ক্রমবর্ধমান ঋণের বোঝা সত্ত্বেও জনগণকে ভর্তুকি দিতে পারবে। তবে এই জ্বালানি সংকটের মূল ধাক্কাটি সইতে হবে এশিয়ার দরিদ্র দেশগুলোকে, যা তাদের সরকারি কোষাগার এবং বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যের ওপর চরম চাপ সৃষ্টি করবে।

ভারত প্রতি বছর তাদের জিডিপির প্রায় ৩ শতাংশ এবং থাইল্যান্ড প্রায় ৫ শতাংশ ব্যয় করে তেল আমদানিতে। ফলে বাজারে তেলের দাম বাড়লে দেশগুলোর আমদানি বিল খুব দ্রুত ফুলে-ফেঁপে ওঠে। গোল্ডম্যান স্যাকস-এর হিসাব অনুযায়ী, তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ৭০ ডলার থেকে বেড়ে যদি স্থায়ীভাবে ৮৫ ডলারে দাঁড়ায়, তবে তা থাইল্যান্ডের চলতি হিসাবের ভারসাম্যে জিডিপির প্রায় ১.২ শতাংশ এবং ভারতের প্রায় ০.৬ শতাংশ ঘাটতি তৈরি করবে—অথচ বর্তমান বাজারদর এর চেয়েও অনেক বেশি। এই ক্রমবর্ধমান ঘাটতি স্থানীয় মুদ্রাকে দুর্বল করে দেয়। সম্প্রতি ডলারের বিপরীতে ভারতীয় রুপির রেকর্ড পতন হয়েছে, যা আমদানিকৃত পণ্যের ব্যয় বাড়িয়ে দিয়ে অর্থনৈতিক সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে।

আরেকটি বড় ঝুঁকি লুকিয়ে আছে রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রে। বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের লাখ লাখ কর্মী বর্তমানে উপসাগরীয় দেশগুলোতে কর্মরত রয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হলে এই প্রবাসী আয়ের প্রবাহ কমে আসবে, যা দেশগুলোর বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যের ওপর সরাসরি আঘাত হানবে। পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটিয়ে গত ১০ মার্চ জাতিসংঘ সতর্কবার্তা দিয়েছে যে, জ্বালানি, সার এবং পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে খাদ্যপণ্যের দামও পাল্লা দিয়ে বাড়তে পারে।

সরকারি কোষাগারও এই সংকটে বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হবে। অনেক দেশের সরকার ভর্তুকি, কর ছাড় কিংবা রাষ্ট্রীয় তেল সংস্থাগুলোর মুনাফা বিসর্জন দিয়ে খুচরা পর্যায়ে জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করে। এটি সাধারণ মানুষকে তেলের আকাশচুম্বী দাম থেকে সুরক্ষা দিলেও মূল বোঝাটি গিয়ে পড়ে রাষ্ট্রের ওপর। উদাহরণস্বরূপ, ভারত ইতিমধ্যেই জ্বালানিতে বছরে ৩ হাজার কোটি ডলারের বেশি ভর্তুকি দিচ্ছে। তবে দরিদ্রতম দেশগুলোর সামনে রেশনিং বা জ্বালানি সংকটের মতো পরিস্থিতি মেনে নেওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। অনেকেই চড়া দামে এলএনজি কেনার সামর্থ্য রাখে না। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া জুড়ে সারের কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ফিলিপাইন সরকার দুপুরবেলা অফিসের কম্পিউটার বন্ধ রাখা এবং এসি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার নির্দেশ দিয়েছে, এমনকি বাংলাদেশ তাদের ঈদের ছুটিও এগিয়ে নিয়ে এসেছে। সবচেয়ে সংকটাপন্ন দেশগুলোর ক্ষেত্রে পাকিস্তান। তারা আইএমএফ ঋণের ওপর নির্ভরশীল–তাদের নড়বড়ে অর্থনীতি নিয়ে আমদানির বর্ধিত বিল পরিশোধে ব্যর্থ হতে পারে।

উপসাগরীয় দেশগুলোর হাতে থাকা বিশাল ‘পেট্রোডলার’ তহবিলের কারণে তারা বড় কোনো সংকটে পড়ার আশঙ্কা কম থাকলেও, তাদের অর্থনীতি গভীর মন্দার মুখে পড়তে পারে এবং তাদের প্রচলিত অর্থনৈতিক কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। ইরান ইতিমধ্যেই এ অঞ্চলের তেলক্ষেত্র, শোধনাগার, বন্দর এবং বিমানবন্দর সেখানে আঘাত হেনেছে। যদিও সৌদি আরব তাদের একটি পাইপলাইনের মাধ্যমে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে কিছু তেল সরিয়ে নিতে পারে, তবুও এ অঞ্চলের উৎপাদিত অধিকাংশ তেলই এখন সেখানে আটকা পড়ে আছে।

জ্বালানি তেলের মজুত উপচে পড়ায় কোম্পানিগুলো বাধ্য হয়ে উৎপাদন বন্ধ করে দিচ্ছে—যার ফলে প্রতি সপ্তাহে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের রাজস্ব হাতছাড়া হচ্ছে তাদের। গোল্ডম্যান স্যাকস-এর প্রাক্কলন অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালী যদি এপ্রিল পর্যন্ত বন্ধ থাকে এবং উৎপাদন প্রক্রিয়া স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে আরও দুই মাস সময় লাগে, তবে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের বার্ষিক হাইড্রোকার্বন উৎপাদন প্রায় ১২-১৬% পর্যন্ত হ্রাস পেতে পারে। বাহরাইন, কুয়েত এবং কাতারের ক্ষেত্রে এই ক্ষতির পরিমাণ তাদের বার্ষিক মোট উৎপাদনের এক-চতুর্থাংশও ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সরবরাহহীন প্রবাহ

সংকট শুধু তেল শিল্পেই সীমাবদ্ধ নেই। উপসাগরীয় অঞ্চল বর্তমানে ধাতু ও রাসায়নিক পণ্যেরও বড় রপ্তানিকারক, কিন্তু যুদ্ধের কারণে সেসব কারখানাও বন্ধ করতে হচ্ছে। কাতারের একটি বড় অ্যালুমিনিয়াম স্মেল্টার ইতিমধ্যে উৎপাদন স্থগিত করেছে। বাহরাইনের তার চেয়েও বড় একটি কারখানা তাদের রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছে।

পর্যটন খাতেও বড় ধরনের ধস নেমেছে। বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের জিডিপিতে পর্যটন খাতের অবদান ১২ শতাংশের বেশি। ক্ষেপণাস্ত্র হামলাগুলো যে কেবল তাৎক্ষণিকভাবে পর্যটকদের যাতায়াত বন্ধ করেছে তা নয়, বরং যুদ্ধ থামার অনেক পরেও এই খাতের ওপর দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব থেকে যাবে। পর্যটক সংখ্যা কমে যাওয়ার সাথে সাথে আবগারি ও ভ্যাট থেকে আসা রাজস্বও কমে যাচ্ছে। বিদেশি ক্রেতাদের ওপর নির্ভরশীল আবাসন বাজারগুলোতেও মন্দা দেখা দিতে পারে।

সামগ্রিকভাবে, গোল্ডম্যান স্যাকস মনে করছে দুই মাসব্যাপী এই সংঘাতের ফলে বাহরাইন, কুয়েত ও কাতারের জিডিপি দুই অঙ্কের ঘরে নেমে আসতে পারে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের ক্ষেত্রে এই পতন হতে পারে প্রায় ৮ শতাংশ এবং সৌদি আরবে ৫ শতাংশ। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এই সংঘাত এই অঞ্চলের দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক মডেলকেই হুমকির মুখে ফেলেছে। বছরের পর বছর ধরে এই রাজতন্ত্রগুলো নিজেদের পুঁজি ও মেধার জন্য একটি নিরাপদ ও স্থিতিশীল কেন্দ্র হিসেবে তুলে ধরেছিল, কিন্তু সেই ভাবমূর্তি এখন বড় ধরনের সংকটের মুখে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হয়তো বিশ্বাস করেন যে, বাজার অস্থির হলে যুদ্ধ নিয়ন্ত্রণ করে তিনি অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি সীমিত রাখতে পারবেন। কিন্তু ইতিমধ্যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেছে। আর তার শুরু করা বাণিজ্য যুদ্ধগুলোর মতো এই পরিস্থিতির সব চাবিকাঠি তার হাতে নেই। ইরান রেভল্যুশনারি গার্ডসের একজন মুখপাত্র এ সপ্তাহেই হুঙ্কার দিয়ে বলেছেন, “এই যুদ্ধের সমাপ্তি কখন হবে, তা আমরাই নির্ধারণ করব।”

সম্পর্কিত