ডনের বিশ্লেষণ

পাকিস্তান-আফগানিস্তান সম্পর্ক কোন পথে যাবে?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
পাকিস্তান-আফগানিস্তান সম্পর্ক কোন পথে যাবে?
আফগানিস্তান-পাকিস্তান সীমান্ত। ছবি: রয়টার্স

ইতিহাসের পাতায় আফগানিস্তান ও পাকিস্তান দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সম্পর্ক অনেকটা একই বৃন্তের দুটি ফলের মতো হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। গত কয়েক দিন ধরে সীমান্তের কাঁটাতার পেরিয়ে ডুরান্ড লাইনের দুই পাশে যেভাবে ভারী গোলন্দাজ বাহিনীর গর্জন শোনা যাচ্ছে, তাতে স্পষ্ট যে, পুরনো ক্ষতে আবারও নতুন করে রক্তক্ষরণ শুরু হয়েছে।

কূটনৈতিক আলোচনার টেবিলে রাখা চায়ের কাপ যখন ঠান্ডা হতে হতে হিমশীতল হয়ে যায়, তখনই যুদ্ধের দামামা বেজে ওঠে। আফগান সীমান্তে পাকিস্তানের বিমান হামলা আর তার জবাবে তালেবান বাহিনীর পাল্টা আক্রমণ কেবল দুই দেশের সার্বভৌমত্বের লড়াই নয়, এটি দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এক চরম অস্থিতিশীলতার ইঙ্গিত।

এক সময়ের মিত্র দেশ দুটির মধ্যে বিশ্বাসের দেয়াল এখন ঠিক কতটা চওড়া, আর এই সংঘাতের আগুনে সাধারণ মানুষের ভবিষ্যৎ ঠিক কোন দিকে পুড়ছে, তা এখন এক অনিশ্চিত পথে।

পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম ডনের প্রতিবেদনে বলা হয়, আফগান তালেবান স্থানীয় সময় গতকাল বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) রাতে পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্তে সেই নীতি ভঙ্গ করেছে বলে মনে হচ্ছে। যার ফলে ডুরান্ড লাইন এবং আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে বিমান হামলা ও কামানের গোলা হামলার মতো তীব্র সামরিক সংঘাত শুরু হয়েছে।

আর যখন রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে এমন উত্তেজনা বাড়ে, তখন তাদের তাদের সক্ষমতা এবং উদ্দেশ্য সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়।

তবে উত্তেজনার প্রেক্ষাপটটি নতুন নয়। ইসলামাবাদ বছরের পর বছর ধরে দাবি করে আসছে, আফগান তালেবানের মদদপুষ্ট পাকিস্তানি গোষ্ঠী তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) আফগানিস্তানের মাটি ব্যবহার করে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

এই সংকট শুরু হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাহির আনদ্রাবি জানিয়েছিলেন, পাকিস্তানের লড়াই আফগান জনগণের বিরুদ্ধে নয়, বরং সেইসব সন্ত্রাসী আস্তানাগুলোর বিরুদ্ধে যা পাকিস্তানিদের জীবনের জন্য হুমকি।

এটি ছিল একটি রাজনৈতিক অবস্থান, যেখানে ধৈর্যশীল আলোচনা এবং গোপনীয় সংকেত আদান-প্রদানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। তবে আফগান তালেবান জনসমক্ষে এবং সরাসরি ঘোষণার মাধ্যমে বেশ কয়েকটি সীমান্ত শহরে ‘বড় ধরনের আক্রমণাত্মক অভিযান’ শুরু করার কথা জানায়।

তালেবান সরকার কেন এই পথ বেছে নিয়েছিল, তার পেছনে কিছু কারণ থাকতে পারে। প্রথমত, আফগান রাজনৈতিক চিন্তাধারায় এই সীমান্তকে আজও একটি ‘উপনিবেশিক চাপিয়ে দেওয়া সীমানা’ হিসেবে দেখা হয়।

দ্বিতীয়ত, তালেবান নেতৃত্ব এটা বোঝাতে চেয়েছিল যে, তারা সীমান্ত অতিক্রম করে কোনো আক্রমণ মেনে নেবে না। বিশেষ করে ২২ ফেব্রুয়ারি আফগান ভূখণ্ডে সন্ত্রাসীদের আস্তানায় ইসলামাবাদের হামলার পর, তারা এই পদক্ষেপকে ‘দেশের অখণ্ডতা রক্ষার লড়াই’ হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছে। যদিও এই যুক্তিটি বিতর্কিত, কারণ আফগান সার্বভৌমত্ব প্রথম তখনই লঙ্ঘিত হয়েছে যখন তারা সন্ত্রাসী গোষ্ঠীদের আশ্রয় দিয়েছে। তবুও এই জনসমাবেশ বা প্রচারণার একটি অভ্যন্তরীণ উদ্দেশ্য রয়েছে। এটি তাদের নিজস্ব সমর্থকদের কাছে একটি বার্তা দেয়–সরকার দেশ রক্ষায় বদ্ধপরিকর।

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

তবে আরেকটি হিসাব হতে পারে, এই উত্তেজনা হয়তো একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যেই থাকবে। আর এমন নজির আগেও আছে। গত বছরের অক্টোবরে তীব্র সংঘর্ষের পর কাতার ও তুরস্কের মধ্যস্থতায় একটি যুদ্ধবিরতি হয়েছিল। যদিও সেই সমঝোতা খুব একটা স্বস্তিদায়ক ছিল না, তবুও তা কাজ করেছিল। কাবুল হয়তো ভেবেছিল, এবারও পাল্টাপাল্টি হামলার পর মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে পরিস্থিতি ঠান্ডা হয়ে যাবে। কিন্তু সেই ধারণাটি ছিল ঝুঁকিপূর্ণ।

তবে পাকিস্তান এবার কোনো অস্পষ্টতা রাখেনি। তারা সরাসরি ‘গাজাব লিল-হক’ নামে একটি অভিযানের ঘোষণা দেয় এবং আফগানিস্তানের অনেক গভীরে কাবুল, কান্দাহার, পাকতিয়া ও নানগারহারের মতো এলাকায় বিমান হামলা চালায়। এদিকে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ অত্যন্ত কঠোর ভাষায় বলেন, তাদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে এবং পরিস্থিতি এখন অনেকটা ‘যুদ্ধের’ মতো।

পাকিস্তানের যুক্তি ছিল স্পষ্ট। ২০২১ সালের আগস্টে তালেবান ক্ষমতা দখলের পর পাকিস্তানে সন্ত্রাসবাদ অনেক বেড়ে গেছে এবং গত দেড় বছরে তা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে আফগান মাটি থেকে আসা কোনো হুমকি সহ্য করার মতো মানসিকতা বা সক্ষমতা ইসলামাবাদের এখন আর নেই। এই অবস্থায়, আফগান বাহিনীর দিক থেকে পাকিস্তানি অবস্থানের ওপর সরাসরি আক্রমণ বিনা জবাবে ছেড়ে দেওয়ার সুযোগ ছিল না। কারণ এমন প্রকাশ্য উসকানির মুখে পাকিস্তান যদি সংযম দেখাত, তবে তাদের সামরিক মনোবল ও রাজনৈতিক ভাবমূর্তি উভয়ই সংকটে পড়ত।

ফলস্বরূপ, পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে যায়, যা কোনো পক্ষের নিয়ন্ত্রণেই ছিল না। হতাহতের সংখ্যা নিয়ে দুই পক্ষই ভিন্ন ভিন্ন দাবি করছে এবং সরকারি প্রচারণায় পাল্টাপাল্টি তথ্যের লড়াই চলছে।

যুদ্ধক্ষেত্র বা সীমান্ত সংঘাতের ঊর্ধ্বে এখানে মূল বিষয়টি হলো শক্তির হিসাব-নিকাশ। তালেবানের শক্তি হলো গেরিলা যুদ্ধ, অন্যদিকে পাকিস্তানের শক্তি হলো তাদের আধুনিক সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী এবং বড় ধরনের হামলা ঠেকানোর ক্ষমতা।

সরাসরি সামরিক যুদ্ধে কাবুল (তালেবান) কখনোই পাকিস্তানের সঙ্গে পেরে উঠবে না। তালেবান এখানেই ভুল করেছে। তারা আড়ালে থেকে লড়াই করার বদলে সরাসরি রাষ্ট্রীয় সংঘাতে জড়িয়ে নিজেদের এমন এক বিপদে ফেলেছে, যা সামলানোর ক্ষমতা তাদের নেই।

তবে শুধু শক্তি দিয়ে এই সমস্যার সমাধান হবে না। ইসলামাবাদের মূল অভিযোগ কোনো জমি দখল বা আদর্শ নিয়ে নয়। তাদের মূল সমস্যা হলো, আফগান মাটি ব্যবহার করে সন্ত্রাসীরা পাকিস্তানে হামলা চালাচ্ছে। এটি কেবল মুখের কথা নয়, প্রতি বছর জাতিসংঘের রিপোর্টেও আফগানিস্তানে টিটিপির উপস্থিতি এবং তালেবানের সাথে তাদের সম্পর্কের প্রমাণ পাওয়া গেছে।

এখন যেহেতু মূল সমস্যা হলো সন্ত্রাসীদের আশ্রয়স্থল, তাই শুধু লোক দেখানো কাজ করলে হবে না। বরং শুরুতে খেয়াল রাখতে হবে।

এই অবস্থায় সমস্যা সমাধানে তিনটি পদক্ষেপ জরুরি–

কাবুলকে প্রমাণসহ দেখাতে হবে, তাদের মাটিতে কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠী নেই। শুধু অস্বীকার করলেই চলবে না। কাতার, সৌদি আরব, চীন, তুরস্ক, রাশিয়া এবং ইরানের মতো দেশগুলোকে এই দুই দেশের মধ্যে শান্তি ফেরাতে এগিয়ে আসতে হবে। পাশাপাশি দুই দেশকেই যুদ্ধের হুঙ্কার দেওয়া বন্ধ করতে হবে।

তর্জন-গর্জন হয়তো দেশের মানুষকে খুশি করে, কিন্তু এতে আলোচনার পথ বন্ধ হয়ে যায়। যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়লে সীমান্ত এলাকার মানুষ কষ্ট থাকে এবং অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যার সুযোগ নেয় সন্ত্রাসীরা।

সম্পর্কিত