রাশেদুর রহমান

বাংলা সাহিত্যে কবি কাজী নজরুল ইসলামের (১৮৯৯-১৯৭৬) আবির্ভাব কালবৈশাখী ঝড়ের মতো। বাংলাভাষা ও সাহিত্যকে নানা দিক দিয়ে তিনি করেছেন সমৃদ্ধ ও মজবুত। নজরুল তার লেখা দিয়ে মানব মুক্তি, দেশের ও নিপীড়িত-বঞ্চিত মানুষের কথা বলেছেন। বন্দুকের চেয়ে কলম যে অনেক বেশি শক্তিশালী হতে পারে, তা তিনি প্রমাণ করেছেন। ক্ষুরধার আগুনঝরা লেখনীর কারণে তিনি বিদ্রোহী কবি হিসেবে পরিচিত। জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তার কবিতা-গান দেশ-জাতি-সমাজ ও ব্যক্তিকে সামনে চলার পথকে শক্তি ও সাহস জোগায়। একাত্তরের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালে তিনি ছিলেন স্বাধীনতাকামী মানুষের প্রেরণার উৎস। তিনি আমাদের জাতীয় কবি। আজ (১১ জ্যৈষ্ঠ) তার ১২৭তম জন্মবার্ষিকী।
কাজী নজরুল ইসলাম ১৯৪২ সালের ১০ জুলাই ৪৩ বছর বয়সে আকস্মিকভাবে গুরুতর অসুস্থ হয়ে বাক ও স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলেন। এর পাঁচ বছর পর ১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে ভারতবর্ষ ভাগ করে পাকিস্তান ও ভারত নামে আলাদা দুটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হয়। এ সময় বাংলাও দ্বিখণ্ডিত হয়। ভারতের অংশে পড়ে হিন্দু অধ্যুষিত পশ্চিমবঙ্গ আর মুসলিম অধ্যুষিত পূর্ববঙ্গ বা পূর্ব বাংলা (বর্তমান বাংলাদেশ) পাকিস্তানের অংশ হয়। এর পর পশ্চিমবঙ্গের বেশির ভাগ মুসলমান পূর্ব বাংলায় চলে এলেও নজরুলের পরিবার ভারতেই থেকে যায়।
নজরুল অখণ্ড ভারত, তথা বাংলার স্বপ্ন দেখতেন। তাই তিনি হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের পক্ষে এবং ভারত বা বাংলার ধর্মভিত্তিক বিভাজনের বিরোধী ছিলেন। ১৯৪০ সালে লাহোর প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার পর থেকেই ভারত ভাগের দাবি প্রবল হতে থাকলেও তিনি পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের দাবি সমর্থন করেননি। এ কারণেই হয়তো নজরুলের পরিবার পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় থাকার সিদ্ধান্ত নেয়। তখন অবশ্য নজরুল পুরোদমে অসুস্থ ছিলেন।
এদিকে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পাকিস্তানে বিশেষত পূর্ব বাংলায় রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে নজরুলকে ব্যবহার করা হতে থাকে। কিছু অতি পাকিস্তানপন্থী ও রবীন্দ্রবিরোধী অপপ্রচার শুরু করলেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হিন্দু, তিনি ভারতের কবি। আর কাজী নজরুল ইসলাম মুসলমান, তিনি পাকিস্তানের কবি।
১৯৪৮ সালে ঢাকায় রবীন্দ্রজয়ন্তী উদ্যাপিত হয় এবং রাষ্ট্র ভাষাকে কেন্দ্র করে পূর্ব বাংলার মানুষের মধ্যে ক্ষোভ দানা বাঁধতে থাকে। এর নিষ্পত্তি হয় ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। পরে ১৯৬১ সালে পূর্ব বাংলায় (তখন পূর্ব পাকিস্তান, বর্তমানে বাংলাদেশ) সাড়ম্বরে উদ্যাপন করা হয় রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষ।
এসব ঘটনাকে তৎকালীন পাকিস্তানের মুসলিম লীগ শাসকেরা সুনজরে দেখেনি। বাংলা ভাষা, বাঙালি সংস্কৃতি ও বাঙালি জাতীয়তাবাদ ঠেকাতে পাকিস্তান সরকার ও মুসলিম লীগের একটি বড় অংশ কৌশলে বাঙালি মুসলমান কবি বিবেচনায় কাজী নজরুল ইসলামকে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে শুরু করে। এই চেষ্টার অংশ হিসেবে ১৯৬৭ সালে ঢাকায় প্রতিষ্ঠা করা হয় নজরুল একাডেমি।
এ সময় ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের কনসাল হিসেবে কর্মরত ছিলেন ডরিস ভার্জিনিয়া মেটকাফ। ৭ নভেম্বর ওয়াশিংটনে পাঠানো এক বার্তায় তিনি এ ইঙ্গিত দিয়েছিলেন।
বার্তায় তিনি উল্লেখ করেন, “বাঙালিদের বিরুদ্ধে মুসলিম লীগের ওই মিশন ছিল উচ্চাভিলাষী। কারণ, শিক্ষিত বাঙালিরা রবীন্দ্রনাথকে শেক্সপিয়ার-ওয়ার্ডসওয়ার্থ-ইয়েটস-গ্যেটের দলভুক্ত মনে করেন। অন্যদিকে নজরুলকে তারা মনে করেন জর্জ এম কোহেন ও আরভিং বার্লিনদের (এই দুজনই আমেরিকান লেখক ও গীতিকার) দলভুক্ত। যদিও নজরুল মুসলমান হয়েও পাকিস্তান সমর্থন করেননি। তিনি তার হিন্দু ধর্মবালম্বী স্ত্রীকে নিয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বাস করেন।
“১ সেপ্টেম্বর ১৯৬৭ পাকিস্তান সরকার ঢাকায় ব্যাপক উদ্দীপনায় নজরুল একাডেমি প্রতিষ্ঠা করে। এর উদ্দেশ্য ছিল মুসলিম ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকারের ভিত্তিতে পাকিস্তানি সংস্কৃতির উন্নয়ন সাধন করা। ২৪ সেপ্টেম্বরে মুসলিম লীগের নেতা খান এ সবুরকে একাডেমির প্রধান পৃষ্ঠপোষক করা হয়। অথচ তিনি কোনো সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নন এবং সাহিত্যে তার অনুরাগও নেই।
“খান এ সবুর বাঙালির আকাঙ্ক্ষা ও বিশ্বাসের বিরুদ্ধে আক্রমণ চালান। ১৬ আগস্ট খুলনায় তিনি বলেছেন, দীর্ঘ ২০ বছর পরে ভারত পূর্ব পাকিস্তানে একদল বুদ্ধিজীবী নিয়োগ করতে সক্ষম হয়েছে, যারা কতিপয় কবির জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী পালন করতে গিয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে একটি বিদেশি সংস্কৃতির বিজয় দেখতে চাইছে। এই মুষ্টিমেয় বুদ্ধিজীবী পাকিস্তান সৃষ্টির আদর্শগত যৌক্তিকতাকে নাকচ করার চেষ্টা করছেন।”
মেটকাফ আরও উল্লেখ করেন, “১৯৪৮ সালের ৯ মে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে যে জনমত গঠন শুরু হয়, তাতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছিলেন প্রাদেশিক সরকারের মন্ত্রী হাবিবুল্লাহ বাহার। তিনি রবীন্দ্রনাথের জন্মজয়ন্তী উদ্যাপনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তার (রবীন্দ্রনাথ) জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে বাঙালির ভাষা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের বিকাশের সূচনা ঘটে। এই অনুষ্ঠানের বিরোধিতা করে মুসলিম লীগের অবাঙালি নেতারা মৌখিকভাবে আক্রমণ করেছিলেন। আর এই ঘটনা নিয়ে মুসলিম লীগ নেতাদের মধ্যে প্রথম চিড় ধরেছিল। ১৯৬১ সালের ৯ মের পর থেকে ঢাকা এবং পূর্ব পাকিস্তানের নানা জায়গায় রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তী পালিত হয়ে আসছে।”
মেটকাফের ভাষায়, “১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত যখন বামপন্থীদের নেতৃত্বে ছাত্ররা ঢাকায় দাঙ্গা সৃষ্টি করেছিল, তখন সরকারকে তারা একটি প্রতিশ্রুতি প্রদানে বাধ্য করে যে বাংলা হবে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা। সেই থেকে বাঙালিদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলো বাংলা ভাষাকে জাতীয়করণ করা এবং পূর্ব পাকিস্তানিদের অধিকার প্রতিষ্ঠার উপায় হিসেবে গণ্য হচ্ছে।”
তিনি আরও মন্তব্য করেন, “১৯৫৫ সালে তরুণ রাজনীতিক নুরুল হুদা বুলবুল ললিত কলা একাডেমি (বাফা) প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ভাষা আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। হুদাকে এ কাজে যারা আর্থিক সহায়তা দিয়েছিলেন হাবিবুল্লাহ বাহার তাদের অন্যতম। রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তী পালন বাংলা ভাষা আন্দোলনকে বেগবান করেছিল।”
১৯৬৮ সালে পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান ১৯ সেপ্টেম্বর আট দিনব্যাপী সফরে পূর্ব পাকিস্তানে আসেন। সফরকালে তিনি ২৪ সেপ্টেম্বর হোটেল ইন্টারকন্টিনালে নজরুল একাডেমি আয়োজিত সংগীত ও নৃত্যসন্ধ্যা উপভোগ এবং ৫০ হাজার রুপি অনুদান দেন।
পরদিন ২৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে একটি বার্তা পাঠিয়েছিলেন তৎকালীন আমেরিকান কনাসল স্কয়ার্স। বার্তায় তিনি মন্তব্য করেছিলেন, “এক বছর আগে আইয়ুব সরকার বাঙালি সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে প্রতিহত করতে নজরুল একাডেমি প্রতিষ্ঠা করেছিল। যদিও নজরুল হিন্দু বিয়ে করেছেন। তিনি বাঙালি কমিউনিস্ট পার্টির পূর্বসূরি সংগঠনকে সহায়তা দিয়েছেন। দেশভাগের বিরোধিতা করেছেন। পাকিস্তান সৃষ্টির পরে ভারতে থেকে গেছেন। এখন কিছুটা অসুস্থ অবস্থায় কলকাতার কাছে বসবাস করছেন। কবি নজরুল আসলে স্থানীয় মুসলিম লীগের কাছে বিড়ম্বনার উৎস। কারণ, তিনি সর্বদাই মুসলিম লীগের বিরোধিতা করেছেন।”
এর আগে ১৯৬৭ সালের ২৩ জুন পাকিস্তানি সরকারের তথ্যমন্ত্রী খাজা শাহাবুদ্দিন রেডিওতে রবীন্দ্রসংগীত প্রচার বন্ধ করে দেন। তার বক্তব্য ছিল, “রবীন্দ্রসংগীত আমাদের সংস্কৃতি নয়, এই সংগীত পাকিস্তানের আদর্শবিরোধী।” তার এই বক্তব্যের বিরুদ্ধে পূর্ব বাংলার ১৯ জন নাগরিক বিবৃতি দিয়ে প্রতিবাদে জানিয়ে বলেন, রবীন্দ্রনাথ পাকিস্তানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। একই সময় রবীন্দ্রনাথ ও তার সংগীতের বিরুদ্ধে পাল্টা বিবৃতি দেন রবীন্দ্রবিরোধী ও পাকিস্তানপন্থী ৪২ জন।
এ ছাড়া, মানুষের মধ্যে এমন একটা অপতথ্য রটিয়ে দেওয়া হয় যে, নজরুলই নোবেল পুরস্কার পেতেন, কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ষড়যন্ত্র করে সেই নোবেল চুরি করে নিয়েছেন।
বিষয়টি আরও পরিষ্কার করা যাক। রবীন্দ্রনাথ গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থের জন্য নোবেল পেয়েছেন। এই গ্রন্থের কবিতাগুলো আসলে নজরুলের লেখা। রবীন্দ্রনাথ তার ভাইঝি/নাতনী প্রমীলাকে নজরুলের পেছনে লেলিয়ে দিয়ে সেই কবিতাগুলো চুরি করেছিলেন। এই কবিতার জন্যই রবীন্দ্রনাথ নোবেল পেয়েছেন। নজরুল যাতে কবিতা চুরির কথা ফাঁস করতে না পারেন, সে জন্য প্রমীলার মাধ্যমে নজরুলকে ওষুধ খাইয়ে রবীন্দ্রনাথই অসুস্থ করেছেন।
এই ভ্রান্ততথ্য বা রটনা তখন পূর্ব বাংলার (বাংলাদেশ) এক দল মানুষ বিশ্বাসও করেছিল। এখনো কিছুসংখ্যক মানুষ এই ভ্রান্ততথ্য বিশ্বাস করেন এবং কাউকে কাউকে এটা বলতেও শোনা যায়।
এখন সত্যটা জানা যাক। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্ম ১৮৬১ সালে। নোবেল পুরস্কার পান ১৯১৩ সালে। এ সময় তার বয়স ছিল ৫২ বছর। তিনি গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থের জন্য নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। এই গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত কবিতাগুলোর রচনাকাল ১৯০৮ থেকে ১৯০৯। গীতাঞ্জলির প্রথম বাংলা সংস্করণ প্রকাশ হয়েছিল ১৯১০ সালে। আর ইংরেজি অনুবাদগ্রন্থ ‘গীতাঞ্জলী/দ্য সং অফারিংস’-এর প্রথম সংস্করণ প্রকাশ হয় ১৯১২ সালে।
অন্যদিকে কাজী নজরুল ইসলামের জন্ম ১৮৯৯ সালে। গীতাঞ্জলির বাংলা ও ইংরেজি সংস্করণ যখন প্রকাশ হয়, তখন নজরুলের বয়স ছিল যথাক্রমে ১১ ও ১৩! রবীন্দ্রনাথ যখন নোবেল পুরস্কার পান; অর্থাৎ, ১৯১৩ সালে নজরুলের বয়স ছিল ১৪ বছর। তখন নজরুল কবিতা লেখাও শুরু করেননি। এ সময় তিনি বর্ধমানের আসানসোলে একটি রুটির দোকানে কাজ করতেন। আর নজরুলের প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয় রবীন্দ্রনাথ নোবেল পুরস্কার পাওয়ার ৬ বছর পর–১৯১৯ সালে।

তবে নজরুলের কাব্য প্রতিভার সূচনা হয়েছিল ছোটবেলাতেই। ১৯০৮ সালে বাবার মৃত্যুর পর ১০ বছরের বালক নজরুল রাঢ় বাংলার (ভারতের পশ্চিম বাংলার বর্ধমান-বীরভূম অঞ্চল) কবিতা, গান আর নৃত্যের মিশ্র আঙ্গিকের একটি লোকনাট্য লেটোদলে যোগদান করেছিলেন। ওই দলে বালক নজরুল ছিলেন একাধারে পালাগান রচয়িতা ও অভিনেতা। নজরুল তাৎক্ষণিকভাবে কবিতা ও গান রচনার কৌশল লেটোগান বা কবিগানের দলেই রপ্ত করেছিলেন।
১৯১০ সালে নজরুল আবার ছাত্রজীবনে ফিরে যান। প্রথমে তিনি রানীগঞ্জ সিয়ারসোল রাজ স্কুলে ভর্তি হন। যেখানে পরে সাহিত্যিক শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে নজরুলের সখ্য হয়। এই সখ্য অনেক গভীর ছিল। নজরুল পরে মাথরুন উচ্চ ইংরেজি স্কুলে (পরে নবীনচন্দ্র ইনস্টিটিউশন) ভর্তি হন। এখানে পড়াকালে আর্থিক অনটনের কারণে আবার নজরুলের ছাত্রজীবনের বিঘ্ন ঘটে। তিনি স্কুল ছেড়ে প্রথমে বাসুদেবের কবিদলে, পরে এক খ্রিস্টান রেলওয়ে গার্ডের খানসামা পদে এবং শেষে আসানসোলে চা-রুটির দোকানে কাজ নেন। এই সময়ই রবীন্দ্রনাথ নোবেল পুরস্কার পান। আসানসোলে কাজ করার সময় সেখানকার দারোগা রফিকউল্লার সঙ্গে পরিচয় হয় নজরুলের। তার সুবাদেই নজরুল ১৯১৪ সালে ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশালের দরিরামপুর স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হন। কিন্তু এক বছর পর তিনি নিজের গ্রামে ফিরে যান। ১৯১৫ সালে আবার রানীগঞ্জ সিয়ারসোল রাজস্কুলে অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তি হন। এই স্কুলে নজরুল একটানা অষ্টম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। ১৯১৭ সালের শেষদিকে প্রিটেস্ট পরীক্ষার সময় নজরুল ব্রিটিশ ভারত সেনাবাহিনীর ৪৯ নম্বর বেঙ্গল রেজিমেন্টে যোগ দেন। সৈনিক জীবন তাকে স্থিরভাবে সাহিত্যচর্চার সুযোগ এনে দিয়েছিল। এ সময় তিনি গল্প লিখে ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকায়’ পাঠাতে থাকেন। তার গল্প প্রকাশিত হতে থাকে। নজরুল তার ঘনিষ্ঠ বাল্যবন্ধু শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়কে চিঠি লিখে এ কথা জানাতেন।
শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় তার ‘আমার বন্ধু নজরুল’ গ্রন্থে লিখেছেন: “নজরুলের চিঠি এসেছে। আমার পাশের খবর পেয়ে আনন্দিত হয়ে লিখেছে, ‘তোমাকেও একটা আনন্দের খবর দিই। এখান থেকে কলকাতার কয়েকটা কাগজে গল্প পাঠিয়েছিলাম। একটাও ফিরে আসেনি। সব ছাপা হয়েছে। 49th Regiment-এর একজন বাঙালী সৈনিক করাচি ক্যান্টনমেন্ট থেকে লেখা পাঠাচ্ছে দেখে বোধহয় ভয়েই ছেপে ফেলছে। এন্তার লিখছি এখানে বসে বসে।’ কিছুদিন পরে ‘মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা’ নামে একখানি ত্রৈমাসিক সাহিত্য-পত্রিকা নজরুল আমাকে পাঠিয়ে দিলে। দেখলাম, তাতে নজরুলের একটি গল্প ছাপা হয়েছে। চিঠিতে লিখেছে ‘আমি ল্যান্স নায়েক হয়েছি।’ আরও কিছুদিন পরে জানালে, ‘এখন আমি হাবিলদার।’ আমি লিখলাম, ‘বহুত বহুত সালাম হাবিলদার-সাহেব! এবার চুটিয়ে একটা কবিতা লিখে পত্রিকায় পাঠিয়ে দাও। গল্প আর লিখো না।’ জবাবে নজরুল জানালে, ‘কবিতাও লিখেছি দু’একটা। কিন্তু পাঠাতে ভরসা হয় না। আমার কবিতা বোধহয় ছাপবে না।” (পৃষ্ঠা ২১৭ ও ২১৮)
নজরুল গবেষক রফিকুল ইসলাম তার কাজী নজরুল ইসলাম জীবন ও সৃজন গ্রন্থে লিখেছেন, “শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের উৎসাহে নজরুল মুক্তক স্বরবৃত্ত ছন্দে রচিত ‘ক্ষমা’ কবিতাটি প্রকাশের জন্যে পাঠিয়েছিলেন ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকায়’। কিন্তু ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা’ কবিতাটির ‘ক্ষমা’ নাম পরিবর্তন করে ‘মুক্তি’ নামে ছাপিয়ে ছিলেন। কবিতাটির পাদটীকায় লেখা ছিল: “ইহা সত্য ঘটনা। ১৯১৬ সালের এপ্রিল মাসে এই দরবেশের শোচনীয় মৃত্যু ঘটে। তাঁহার পবিত্র সমাধি এখনও ‘হাত বাঁধা ফকিরের মাজার শরীফ’ বলিয়া কথিত হয়।” (পৃষ্ঠা-৩৬)
নজরুলের প্রথম কবিতা ‘মুক্তি’ প্রকাশিত হয় ১৯১৯ সালের আগস্টে। এর আগে কবি হিসেবে নজরুলের কোনো পরিচয়ই ছিল না। নজরুলের প্রথম কবিতাটি নির্ঝর কাব্যগ্রন্থে সন্নিবেশিত হয়েছে।
নজরুল তার ‘বিদ্রোহী’ কবিতা লিখেছিলেন ১৯২১ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহের কোনো এক দিন। কমরেড মুজফফর আহমদের কলকাতার ৩/৪-সি তালতলা লেনের দোতলা বাড়ির নিচতলার দক্ষিণ-পূর্ব কোণের ঘরে। কবিতাটি ১৯২২ সালের ৬ জানুয়ারি (১৩২৮ বঙ্গাব্দের ২২ পৌষ, শুক্রবার) বিজলী পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয়। ‘বিদ্রোহী’ প্রকাশিত হওয়া মাত্রই ব্যাপক জাগরণ সৃষ্টি করে। কবিতাটি বিজলী পত্রিকা দুবার ছাপতে হয়েছিল। ২৯ হাজার কপি ছাপা হয়। কমরেড মুজাফ্ফর আহমেদের মতে, সেদিন কমপক্ষে দুই লাখ মানুষ ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি পড়েছিল। কবিতাটিতে দৃপ্ত বিদ্রোহী মানসিকতা এবং অসাধারণ শব্দবিন্যাস ও ছন্দের জন্য আজও বাঙালি মানসে ‘চির উন্নত মম শির’ হিসেবে বিরাজমান।
‘বিদ্রোহী’ কবিতার জন্য নজরুল বিপুল খ্যাতি ও জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। এই কবিতা লেখার আগে তিনি সাহিত্য সমাজে একেবারে অজ্ঞাত ছিলেন–এ কথা বলা যাবে না। করাচি থেকে কলকাতায় আসার পর ‘মোসলেম ভারত’ পত্রিকায় নজরুলের কয়েকটি কবিতা প্রকাশিত হয়। তখন অনেকের মধ্যে নজরুলকে নিয়ে আগ্রহ ও কৌতূহল সৃষ্টি হয়। রবীন্দ্রনাথও ‘মোসলেম ভারত’ পত্রিকায় নজরুলের কবিতা পড়ে তার সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে শুরু করেন। অবশেষে পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়ের মাধ্যমে তাদের দুজনের প্রথম পরিচয় হয়। তবে ঠিক কত তারিখে তাদের প্রথম দেখা হয়েছিল, তা জানা যায় না। আবদুল আজিজ আল্-আমান তার ‘নজরুল-পরিক্রমা’ গ্রন্থে লিখেছেন, একদিন পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায় গিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা করতে। প্রয়োজনীয় কথার পর রবীন্দ্রনাথের সামনে ‘মোসলেম ভারত’ দেখে পত্রিকাটি সম্পর্কে কথা তুললেন পবিত্র বাবু। সে সময় ‘মোসলেম ভারত’ মানেই নজরুল। রবীন্দ্রনাথ নজরুলের বন্ধু পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়ের কাছে নজরুলের কথা জিজ্ঞেস করলেন এবং বিশেষ আগ্রহের সঙ্গে তাকে নিয়ে আসার আহ্বান জানালেন। শেষে নির্দিষ্ট দিনে পবিত্র বাবু নজরুলকে নিয়ে রবীন্দ্রনাথের সামনে হাজির হলেন। সেদিন তাদের মাঝে বিশেষ কোনো কথা হয়নি। (পৃষ্ঠা ২২-২৪)
অন্যদিকে প্রভাত কুমারের ‘রবীন্দ্রজীবনী’ (পৃষ্ঠা-৮৬) থেকে জানা যায়, ১৯২০ সালের ১২ মে থেকে ১৯২১ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত প্রায় ১৪ মাস রবীন্দ্রনাথ ইউরোপ-আমেরিকা সফর করেন। ১৬ জুলাই বোম্বাই থেকে বর্ধমান হয়ে বোলপুর পৌঁছান। ২০ জুলাই কলকাতায় আসেন আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে দেখা করার জন্য। মাঝখানে একবার শান্তিনিকেতনে ফিরে গেলেও সেপ্টেম্বরের ৬ তারিখ পর্যন্ত তিনি কলকাতাতেই ছিলেন। ওই সময়ে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে নজরুলের প্রথম দেখা হওয়া সম্ভবপর।
প্রথম দেখা যখনই হোক রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে বেশ কয়েকবার নজরুলের সাক্ষাৎ হয় এবং তাদের দুজনের মধ্যে যোগাযোগ ও উষ্ণ সম্পর্ক ছিল।
নজরুলের ‘ধূমকেতু’ প্রকাশিত হয় ১৯২২ সালের ১১ আগস্ট (১৩২৯ বঙ্গাব্দের ২৪ শ্রাবণ)। রবীন্দ্রনাথ এই পত্রিকার বাণী লিখে দিয়েছিলেন। ধূমকেতুর ৬টি সংখ্যায় প্রথম পৃষ্ঠায় এবং ৭ম সংখ্যা থেকে ৩য় পৃষ্ঠায় সম্পাদকীয় স্তম্ভের ওপর ওই বাণী ছাপা হয়।
নজরুলের প্রচ্ছন্ন রাজনৈতিক কবিতা ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ ১৯২২ সালে ধূমকেতুর ২৬ সেপ্টেম্বর সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল। ৮ নভেম্বর পত্রিকার ওই সংখ্যা নিষিদ্ধ করা হয়। নজরুলের প্রবন্ধগ্রন্থ যুগবাণী বাজেয়াপ্ত করা হয় ২৩ নভেম্বর। একই দিন নজরুলকে কুমিল্লা থেকে গ্রেপ্তার করে কলকাতায় আনা হয়। বিচারাধীন বন্দি হিসেবে ১৯২৩ সালের ৭ জানুয়ারি নজরুল আত্মপক্ষ সমর্থন করে চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট সুইনহোর আদালতে যে জবানবন্দি প্রদান করেন, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তা ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’ নামে সাহিত্য-মর্যাদা পেয়ে আসছে। ১৬ জানুয়ারি বিচারের রায়ে নজরুল এক বছর সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন।
নজরুল যখন আলীপুর সেন্ট্রাল জেলে বন্দি, তখন রবীন্দ্রনাথ তার বসন্ত গীতিনাট্য তাকে উৎসর্গ করেন (২২ জানুয়ারি ১৯২৩)। এ ঘটনায় উল্লসিত নজরুল জেলখানায় বসে তার ‘আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে’ কবিতা রচনা করেন।
১৯২৩ সালের ১৪ এপ্রিল নজরুলকে হুগলি জেলে স্থানান্তর করা হয়। রাজবন্দিদের প্রতি ইংরেজ জেল-সুপারের দুর্ব্যবহারের প্রতিবাদে ওই দিন থেকেই তিনি অনশন ধর্মঘট শুরু করেন। রবীন্দ্রনাথ অনশন ভঙ্গ করার অনুরোধ জানিয়ে নজরুলকে টেলিগ্রাম করেন: ‘Give up hunger strike, our literature claims you.’
একদিকে রবিন্দ্রনাথ ১৯২৩ সালে নজরুলকে বসন্ত গীতিনাট্য উৎসর্গ করেছেন, অন্যদিকে ১৯৪১ সালে রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুতে ব্যাথিত নজরুল ‘রবি হারা’ কবিতা লিখেছেন।
নজরুল ও রবীন্দ্রনাথের এই চিরায়ত সম্পর্কের বিষয়ে না জেনেই কেউ কেউ তাদের দুজনকে মুখোমুখি দাঁড় করানোর অপচেষ্টা চালিয়েছেন। সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মীয় বিভাজনে তাদের দুজনকে শত্রু বানিয়ে ফেলা হয়েছে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলকে যারা জেনেছেন, তারা স্বীকার করবেন সত্যিকার অর্থেই তাদের মধ্যে সম্পর্ক ছিল সৌহার্দ্রপূর্ণ। নজরুলের প্রতি রবীন্দ্রনাথের স্নেহ ছিল অপরিমেয়। অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথের প্রতি নজরুলের ছিল অতল শ্রদ্ধা।
তারপরও বাংলাদেশের এক শ্রেণির মানুষ রবীন্দ্রনাথের নোবেল পাওয়া নিয়ে ভ্রান্ততথ্য বা রটনা বিশ্বাস করে আসছেন কয়েক দশক ধরে? তারা না জানেন রবীন্দ্রনাথকে, না নজরুলকে। বিখ্যাত ব্যক্তিরা কেউ কারও বিকল্প হতে পারেন না, সবাই যার যার মহিমায় জ্বাজ্জ্বল্যমান। এই দুই কবির মধ্যে তাই তুলনা করাটা রীতিমতো অযৌক্তিক ও হাস্যকরও বটে। বাংলা কবিতার ইতিহাসে প্রতিভা ও অর্জনের দিক থেকে রবীন্দ্রনাথের পরই নজরুলের স্থান। তারা একে অপর থেকে পৃথক এবং তাদের মধ্যে দূরত্ব অবশ্য দুর্লঙ্ঘ্য। তারা মানবতার দর্শনকেই লালনপালন করে আমাদের পথ দেখিয়েছেন।
তবে নজরুলও নোবেল পেতে পারতেন তার সাহিত্য দিয়ে। তার কবিতাগুলো তখন যদি ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ করে প্রকাশের ব্যবস্থা করা যেত, তাহলে হয়তো নজরুলও নোবেল পেতে পারতেন। অবশ্য নজরুলের ভাষা, অহম, অলঙ্কার ইংরেজিতে অনুবাদ করা কিছুটা কষ্টসাধ্য ছিল। যদি নোবেল নাও পেতেন পৃথিবীজুড়ে শোষণের প্রতিবাদ হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারত তার কবিতা।
রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর এক বছর পরই, অর্থাৎ ১৯৪২ সালে নজরুল চিরতরে অসুস্থ এবং ক্রমান্বয়ে সম্বিতহারা ও নির্বাক হয়ে যান। বাংলার দুই মহান কবির কণ্ঠ প্রায় একই সময়ে নীরব হয়ে যায়। রবীন্দ্রনাথ-নজরুল বাঙালি জাতি ও বাংলার দুই মহান ব্যক্তি। তাদের মহত্ব বাঙালির গর্বের ধন।
নজরুলের আগমন কেবল চাঞ্চল্যকর ঘটনা ছিল না, ছিল নতুন একটি যুগের আগমন বার্তা। নজরুল নতুন যুগটাকে মূর্ত করে তোলেন। যুগের তিনি স্রষ্টা নন, যুগের মুখপাত্র। ১৯২৯ সালে নজরুলকে যে নাগরিক সম্বর্ধনা দেওয়া হয়েছিল, তাতে সভাপতিত্ব করেন বিজ্ঞানী প্রফুল্লচন্দ্র রায়। তিনি বলেছিলেন, নজরুল একজন প্রতিভাবান মৌলিক কবি। “রবীন্দ্রনাথের আওতায় নজরুল প্রতিভা পরিপুষ্ট হয়নি। তাই রবীন্দ্রনাথ তাকে কবি বলে স্বীকার করেছেন।” সভায় সুভাষচন্দ্র বসুও ছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “আমরা যখন যুদ্ধ ক্ষেত্রে যাব, তখন গাওয়া হবে নজরুলের গান, যখন কারাগারে যাব, তখনও গাইব নজরুলের গান।”

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্যোগ আর কূটনৈতিক তৎপরতায় ভারত সরকারের অনুমতিক্রমে অসুস্থ কবি কাজী নজরুল ইসলামকে সপরিবারে বাংলাদেশে আনা হয়। ১৯৭২ সালের ২৪ মে একটি বিশেষ ফ্লাইটে কলকাতা থেকে সপরিবারে ঢাকায় এসে পৌঁছান অসুস্থ কবি। সেদিন ঢাকার তেজগাঁওয়ের বিমানবন্দরে ছিল হাজার হাজার উৎসুক জনতার ভিড়। ঢাকায় আসার আগে অসুস্থ কবিকে নিয়ে পরিবার বাস করত কলকাতার ক্রিস্টোফার রোডের একটি ফ্ল্যাটে।
১৯৭৪ সালের ৯ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এক বিশেষ সমাবর্তনে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে কাজী নজরুল ইসলামের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে সম্মানসূচক ডি.লিট উপাধিতে ভূষিত করে। ১৯৭৬ সালের জানুয়ারি মাসে বাংলাদেশ সরকার নজরুলকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান এবং ২১ ফেব্রুয়ারি ‘একুশে পদকে’ ভূষিত করে।
১৯৭৬ সালেন ২৯ আগস্ট (১২ ভাদ্র ১৩৮৩) ঢাকার পিজি (বর্তমানে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়) হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কাজী নজরুল ইসলামকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদের উত্তর পাশে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়েছে।
তথ্যসূত্র:
মিজানুর রহমান খান, বায়ান্নর গোপন মার্কিন দলিল–১৭, প্রথম আলো, ১৭ ফ্রেবয়ারি, ২০১৪
মুজফফর আহমদ, কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতিকথা
রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের প্রথম সাক্ষাৎ, জহিরুল হক
চির উন্নত শির, সম্পাদক মানিক মুখোপাধ্যায়, সারা বাংলা নজরুল শতবর্ষ কমিটি, কলকাতা ২০০১
বাংলাপিডিয়া

বাংলা সাহিত্যে কবি কাজী নজরুল ইসলামের (১৮৯৯-১৯৭৬) আবির্ভাব কালবৈশাখী ঝড়ের মতো। বাংলাভাষা ও সাহিত্যকে নানা দিক দিয়ে তিনি করেছেন সমৃদ্ধ ও মজবুত। নজরুল তার লেখা দিয়ে মানব মুক্তি, দেশের ও নিপীড়িত-বঞ্চিত মানুষের কথা বলেছেন। বন্দুকের চেয়ে কলম যে অনেক বেশি শক্তিশালী হতে পারে, তা তিনি প্রমাণ করেছেন। ক্ষুরধার আগুনঝরা লেখনীর কারণে তিনি বিদ্রোহী কবি হিসেবে পরিচিত। জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তার কবিতা-গান দেশ-জাতি-সমাজ ও ব্যক্তিকে সামনে চলার পথকে শক্তি ও সাহস জোগায়। একাত্তরের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালে তিনি ছিলেন স্বাধীনতাকামী মানুষের প্রেরণার উৎস। তিনি আমাদের জাতীয় কবি। আজ (১১ জ্যৈষ্ঠ) তার ১২৭তম জন্মবার্ষিকী।
কাজী নজরুল ইসলাম ১৯৪২ সালের ১০ জুলাই ৪৩ বছর বয়সে আকস্মিকভাবে গুরুতর অসুস্থ হয়ে বাক ও স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলেন। এর পাঁচ বছর পর ১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে ভারতবর্ষ ভাগ করে পাকিস্তান ও ভারত নামে আলাদা দুটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হয়। এ সময় বাংলাও দ্বিখণ্ডিত হয়। ভারতের অংশে পড়ে হিন্দু অধ্যুষিত পশ্চিমবঙ্গ আর মুসলিম অধ্যুষিত পূর্ববঙ্গ বা পূর্ব বাংলা (বর্তমান বাংলাদেশ) পাকিস্তানের অংশ হয়। এর পর পশ্চিমবঙ্গের বেশির ভাগ মুসলমান পূর্ব বাংলায় চলে এলেও নজরুলের পরিবার ভারতেই থেকে যায়।
নজরুল অখণ্ড ভারত, তথা বাংলার স্বপ্ন দেখতেন। তাই তিনি হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের পক্ষে এবং ভারত বা বাংলার ধর্মভিত্তিক বিভাজনের বিরোধী ছিলেন। ১৯৪০ সালে লাহোর প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার পর থেকেই ভারত ভাগের দাবি প্রবল হতে থাকলেও তিনি পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের দাবি সমর্থন করেননি। এ কারণেই হয়তো নজরুলের পরিবার পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় থাকার সিদ্ধান্ত নেয়। তখন অবশ্য নজরুল পুরোদমে অসুস্থ ছিলেন।
এদিকে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পাকিস্তানে বিশেষত পূর্ব বাংলায় রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে নজরুলকে ব্যবহার করা হতে থাকে। কিছু অতি পাকিস্তানপন্থী ও রবীন্দ্রবিরোধী অপপ্রচার শুরু করলেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হিন্দু, তিনি ভারতের কবি। আর কাজী নজরুল ইসলাম মুসলমান, তিনি পাকিস্তানের কবি।
১৯৪৮ সালে ঢাকায় রবীন্দ্রজয়ন্তী উদ্যাপিত হয় এবং রাষ্ট্র ভাষাকে কেন্দ্র করে পূর্ব বাংলার মানুষের মধ্যে ক্ষোভ দানা বাঁধতে থাকে। এর নিষ্পত্তি হয় ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। পরে ১৯৬১ সালে পূর্ব বাংলায় (তখন পূর্ব পাকিস্তান, বর্তমানে বাংলাদেশ) সাড়ম্বরে উদ্যাপন করা হয় রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষ।
এসব ঘটনাকে তৎকালীন পাকিস্তানের মুসলিম লীগ শাসকেরা সুনজরে দেখেনি। বাংলা ভাষা, বাঙালি সংস্কৃতি ও বাঙালি জাতীয়তাবাদ ঠেকাতে পাকিস্তান সরকার ও মুসলিম লীগের একটি বড় অংশ কৌশলে বাঙালি মুসলমান কবি বিবেচনায় কাজী নজরুল ইসলামকে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে শুরু করে। এই চেষ্টার অংশ হিসেবে ১৯৬৭ সালে ঢাকায় প্রতিষ্ঠা করা হয় নজরুল একাডেমি।
এ সময় ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের কনসাল হিসেবে কর্মরত ছিলেন ডরিস ভার্জিনিয়া মেটকাফ। ৭ নভেম্বর ওয়াশিংটনে পাঠানো এক বার্তায় তিনি এ ইঙ্গিত দিয়েছিলেন।
বার্তায় তিনি উল্লেখ করেন, “বাঙালিদের বিরুদ্ধে মুসলিম লীগের ওই মিশন ছিল উচ্চাভিলাষী। কারণ, শিক্ষিত বাঙালিরা রবীন্দ্রনাথকে শেক্সপিয়ার-ওয়ার্ডসওয়ার্থ-ইয়েটস-গ্যেটের দলভুক্ত মনে করেন। অন্যদিকে নজরুলকে তারা মনে করেন জর্জ এম কোহেন ও আরভিং বার্লিনদের (এই দুজনই আমেরিকান লেখক ও গীতিকার) দলভুক্ত। যদিও নজরুল মুসলমান হয়েও পাকিস্তান সমর্থন করেননি। তিনি তার হিন্দু ধর্মবালম্বী স্ত্রীকে নিয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বাস করেন।
“১ সেপ্টেম্বর ১৯৬৭ পাকিস্তান সরকার ঢাকায় ব্যাপক উদ্দীপনায় নজরুল একাডেমি প্রতিষ্ঠা করে। এর উদ্দেশ্য ছিল মুসলিম ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকারের ভিত্তিতে পাকিস্তানি সংস্কৃতির উন্নয়ন সাধন করা। ২৪ সেপ্টেম্বরে মুসলিম লীগের নেতা খান এ সবুরকে একাডেমির প্রধান পৃষ্ঠপোষক করা হয়। অথচ তিনি কোনো সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নন এবং সাহিত্যে তার অনুরাগও নেই।
“খান এ সবুর বাঙালির আকাঙ্ক্ষা ও বিশ্বাসের বিরুদ্ধে আক্রমণ চালান। ১৬ আগস্ট খুলনায় তিনি বলেছেন, দীর্ঘ ২০ বছর পরে ভারত পূর্ব পাকিস্তানে একদল বুদ্ধিজীবী নিয়োগ করতে সক্ষম হয়েছে, যারা কতিপয় কবির জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী পালন করতে গিয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে একটি বিদেশি সংস্কৃতির বিজয় দেখতে চাইছে। এই মুষ্টিমেয় বুদ্ধিজীবী পাকিস্তান সৃষ্টির আদর্শগত যৌক্তিকতাকে নাকচ করার চেষ্টা করছেন।”
মেটকাফ আরও উল্লেখ করেন, “১৯৪৮ সালের ৯ মে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে যে জনমত গঠন শুরু হয়, তাতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছিলেন প্রাদেশিক সরকারের মন্ত্রী হাবিবুল্লাহ বাহার। তিনি রবীন্দ্রনাথের জন্মজয়ন্তী উদ্যাপনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তার (রবীন্দ্রনাথ) জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে বাঙালির ভাষা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের বিকাশের সূচনা ঘটে। এই অনুষ্ঠানের বিরোধিতা করে মুসলিম লীগের অবাঙালি নেতারা মৌখিকভাবে আক্রমণ করেছিলেন। আর এই ঘটনা নিয়ে মুসলিম লীগ নেতাদের মধ্যে প্রথম চিড় ধরেছিল। ১৯৬১ সালের ৯ মের পর থেকে ঢাকা এবং পূর্ব পাকিস্তানের নানা জায়গায় রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তী পালিত হয়ে আসছে।”
মেটকাফের ভাষায়, “১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত যখন বামপন্থীদের নেতৃত্বে ছাত্ররা ঢাকায় দাঙ্গা সৃষ্টি করেছিল, তখন সরকারকে তারা একটি প্রতিশ্রুতি প্রদানে বাধ্য করে যে বাংলা হবে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা। সেই থেকে বাঙালিদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলো বাংলা ভাষাকে জাতীয়করণ করা এবং পূর্ব পাকিস্তানিদের অধিকার প্রতিষ্ঠার উপায় হিসেবে গণ্য হচ্ছে।”
তিনি আরও মন্তব্য করেন, “১৯৫৫ সালে তরুণ রাজনীতিক নুরুল হুদা বুলবুল ললিত কলা একাডেমি (বাফা) প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ভাষা আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। হুদাকে এ কাজে যারা আর্থিক সহায়তা দিয়েছিলেন হাবিবুল্লাহ বাহার তাদের অন্যতম। রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তী পালন বাংলা ভাষা আন্দোলনকে বেগবান করেছিল।”
১৯৬৮ সালে পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান ১৯ সেপ্টেম্বর আট দিনব্যাপী সফরে পূর্ব পাকিস্তানে আসেন। সফরকালে তিনি ২৪ সেপ্টেম্বর হোটেল ইন্টারকন্টিনালে নজরুল একাডেমি আয়োজিত সংগীত ও নৃত্যসন্ধ্যা উপভোগ এবং ৫০ হাজার রুপি অনুদান দেন।
পরদিন ২৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে একটি বার্তা পাঠিয়েছিলেন তৎকালীন আমেরিকান কনাসল স্কয়ার্স। বার্তায় তিনি মন্তব্য করেছিলেন, “এক বছর আগে আইয়ুব সরকার বাঙালি সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে প্রতিহত করতে নজরুল একাডেমি প্রতিষ্ঠা করেছিল। যদিও নজরুল হিন্দু বিয়ে করেছেন। তিনি বাঙালি কমিউনিস্ট পার্টির পূর্বসূরি সংগঠনকে সহায়তা দিয়েছেন। দেশভাগের বিরোধিতা করেছেন। পাকিস্তান সৃষ্টির পরে ভারতে থেকে গেছেন। এখন কিছুটা অসুস্থ অবস্থায় কলকাতার কাছে বসবাস করছেন। কবি নজরুল আসলে স্থানীয় মুসলিম লীগের কাছে বিড়ম্বনার উৎস। কারণ, তিনি সর্বদাই মুসলিম লীগের বিরোধিতা করেছেন।”
এর আগে ১৯৬৭ সালের ২৩ জুন পাকিস্তানি সরকারের তথ্যমন্ত্রী খাজা শাহাবুদ্দিন রেডিওতে রবীন্দ্রসংগীত প্রচার বন্ধ করে দেন। তার বক্তব্য ছিল, “রবীন্দ্রসংগীত আমাদের সংস্কৃতি নয়, এই সংগীত পাকিস্তানের আদর্শবিরোধী।” তার এই বক্তব্যের বিরুদ্ধে পূর্ব বাংলার ১৯ জন নাগরিক বিবৃতি দিয়ে প্রতিবাদে জানিয়ে বলেন, রবীন্দ্রনাথ পাকিস্তানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। একই সময় রবীন্দ্রনাথ ও তার সংগীতের বিরুদ্ধে পাল্টা বিবৃতি দেন রবীন্দ্রবিরোধী ও পাকিস্তানপন্থী ৪২ জন।
এ ছাড়া, মানুষের মধ্যে এমন একটা অপতথ্য রটিয়ে দেওয়া হয় যে, নজরুলই নোবেল পুরস্কার পেতেন, কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ষড়যন্ত্র করে সেই নোবেল চুরি করে নিয়েছেন।
বিষয়টি আরও পরিষ্কার করা যাক। রবীন্দ্রনাথ গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থের জন্য নোবেল পেয়েছেন। এই গ্রন্থের কবিতাগুলো আসলে নজরুলের লেখা। রবীন্দ্রনাথ তার ভাইঝি/নাতনী প্রমীলাকে নজরুলের পেছনে লেলিয়ে দিয়ে সেই কবিতাগুলো চুরি করেছিলেন। এই কবিতার জন্যই রবীন্দ্রনাথ নোবেল পেয়েছেন। নজরুল যাতে কবিতা চুরির কথা ফাঁস করতে না পারেন, সে জন্য প্রমীলার মাধ্যমে নজরুলকে ওষুধ খাইয়ে রবীন্দ্রনাথই অসুস্থ করেছেন।
এই ভ্রান্ততথ্য বা রটনা তখন পূর্ব বাংলার (বাংলাদেশ) এক দল মানুষ বিশ্বাসও করেছিল। এখনো কিছুসংখ্যক মানুষ এই ভ্রান্ততথ্য বিশ্বাস করেন এবং কাউকে কাউকে এটা বলতেও শোনা যায়।
এখন সত্যটা জানা যাক। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্ম ১৮৬১ সালে। নোবেল পুরস্কার পান ১৯১৩ সালে। এ সময় তার বয়স ছিল ৫২ বছর। তিনি গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থের জন্য নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। এই গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত কবিতাগুলোর রচনাকাল ১৯০৮ থেকে ১৯০৯। গীতাঞ্জলির প্রথম বাংলা সংস্করণ প্রকাশ হয়েছিল ১৯১০ সালে। আর ইংরেজি অনুবাদগ্রন্থ ‘গীতাঞ্জলী/দ্য সং অফারিংস’-এর প্রথম সংস্করণ প্রকাশ হয় ১৯১২ সালে।
অন্যদিকে কাজী নজরুল ইসলামের জন্ম ১৮৯৯ সালে। গীতাঞ্জলির বাংলা ও ইংরেজি সংস্করণ যখন প্রকাশ হয়, তখন নজরুলের বয়স ছিল যথাক্রমে ১১ ও ১৩! রবীন্দ্রনাথ যখন নোবেল পুরস্কার পান; অর্থাৎ, ১৯১৩ সালে নজরুলের বয়স ছিল ১৪ বছর। তখন নজরুল কবিতা লেখাও শুরু করেননি। এ সময় তিনি বর্ধমানের আসানসোলে একটি রুটির দোকানে কাজ করতেন। আর নজরুলের প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয় রবীন্দ্রনাথ নোবেল পুরস্কার পাওয়ার ৬ বছর পর–১৯১৯ সালে।

তবে নজরুলের কাব্য প্রতিভার সূচনা হয়েছিল ছোটবেলাতেই। ১৯০৮ সালে বাবার মৃত্যুর পর ১০ বছরের বালক নজরুল রাঢ় বাংলার (ভারতের পশ্চিম বাংলার বর্ধমান-বীরভূম অঞ্চল) কবিতা, গান আর নৃত্যের মিশ্র আঙ্গিকের একটি লোকনাট্য লেটোদলে যোগদান করেছিলেন। ওই দলে বালক নজরুল ছিলেন একাধারে পালাগান রচয়িতা ও অভিনেতা। নজরুল তাৎক্ষণিকভাবে কবিতা ও গান রচনার কৌশল লেটোগান বা কবিগানের দলেই রপ্ত করেছিলেন।
১৯১০ সালে নজরুল আবার ছাত্রজীবনে ফিরে যান। প্রথমে তিনি রানীগঞ্জ সিয়ারসোল রাজ স্কুলে ভর্তি হন। যেখানে পরে সাহিত্যিক শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে নজরুলের সখ্য হয়। এই সখ্য অনেক গভীর ছিল। নজরুল পরে মাথরুন উচ্চ ইংরেজি স্কুলে (পরে নবীনচন্দ্র ইনস্টিটিউশন) ভর্তি হন। এখানে পড়াকালে আর্থিক অনটনের কারণে আবার নজরুলের ছাত্রজীবনের বিঘ্ন ঘটে। তিনি স্কুল ছেড়ে প্রথমে বাসুদেবের কবিদলে, পরে এক খ্রিস্টান রেলওয়ে গার্ডের খানসামা পদে এবং শেষে আসানসোলে চা-রুটির দোকানে কাজ নেন। এই সময়ই রবীন্দ্রনাথ নোবেল পুরস্কার পান। আসানসোলে কাজ করার সময় সেখানকার দারোগা রফিকউল্লার সঙ্গে পরিচয় হয় নজরুলের। তার সুবাদেই নজরুল ১৯১৪ সালে ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশালের দরিরামপুর স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হন। কিন্তু এক বছর পর তিনি নিজের গ্রামে ফিরে যান। ১৯১৫ সালে আবার রানীগঞ্জ সিয়ারসোল রাজস্কুলে অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তি হন। এই স্কুলে নজরুল একটানা অষ্টম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। ১৯১৭ সালের শেষদিকে প্রিটেস্ট পরীক্ষার সময় নজরুল ব্রিটিশ ভারত সেনাবাহিনীর ৪৯ নম্বর বেঙ্গল রেজিমেন্টে যোগ দেন। সৈনিক জীবন তাকে স্থিরভাবে সাহিত্যচর্চার সুযোগ এনে দিয়েছিল। এ সময় তিনি গল্প লিখে ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকায়’ পাঠাতে থাকেন। তার গল্প প্রকাশিত হতে থাকে। নজরুল তার ঘনিষ্ঠ বাল্যবন্ধু শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়কে চিঠি লিখে এ কথা জানাতেন।
শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় তার ‘আমার বন্ধু নজরুল’ গ্রন্থে লিখেছেন: “নজরুলের চিঠি এসেছে। আমার পাশের খবর পেয়ে আনন্দিত হয়ে লিখেছে, ‘তোমাকেও একটা আনন্দের খবর দিই। এখান থেকে কলকাতার কয়েকটা কাগজে গল্প পাঠিয়েছিলাম। একটাও ফিরে আসেনি। সব ছাপা হয়েছে। 49th Regiment-এর একজন বাঙালী সৈনিক করাচি ক্যান্টনমেন্ট থেকে লেখা পাঠাচ্ছে দেখে বোধহয় ভয়েই ছেপে ফেলছে। এন্তার লিখছি এখানে বসে বসে।’ কিছুদিন পরে ‘মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা’ নামে একখানি ত্রৈমাসিক সাহিত্য-পত্রিকা নজরুল আমাকে পাঠিয়ে দিলে। দেখলাম, তাতে নজরুলের একটি গল্প ছাপা হয়েছে। চিঠিতে লিখেছে ‘আমি ল্যান্স নায়েক হয়েছি।’ আরও কিছুদিন পরে জানালে, ‘এখন আমি হাবিলদার।’ আমি লিখলাম, ‘বহুত বহুত সালাম হাবিলদার-সাহেব! এবার চুটিয়ে একটা কবিতা লিখে পত্রিকায় পাঠিয়ে দাও। গল্প আর লিখো না।’ জবাবে নজরুল জানালে, ‘কবিতাও লিখেছি দু’একটা। কিন্তু পাঠাতে ভরসা হয় না। আমার কবিতা বোধহয় ছাপবে না।” (পৃষ্ঠা ২১৭ ও ২১৮)
নজরুল গবেষক রফিকুল ইসলাম তার কাজী নজরুল ইসলাম জীবন ও সৃজন গ্রন্থে লিখেছেন, “শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের উৎসাহে নজরুল মুক্তক স্বরবৃত্ত ছন্দে রচিত ‘ক্ষমা’ কবিতাটি প্রকাশের জন্যে পাঠিয়েছিলেন ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকায়’। কিন্তু ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা’ কবিতাটির ‘ক্ষমা’ নাম পরিবর্তন করে ‘মুক্তি’ নামে ছাপিয়ে ছিলেন। কবিতাটির পাদটীকায় লেখা ছিল: “ইহা সত্য ঘটনা। ১৯১৬ সালের এপ্রিল মাসে এই দরবেশের শোচনীয় মৃত্যু ঘটে। তাঁহার পবিত্র সমাধি এখনও ‘হাত বাঁধা ফকিরের মাজার শরীফ’ বলিয়া কথিত হয়।” (পৃষ্ঠা-৩৬)
নজরুলের প্রথম কবিতা ‘মুক্তি’ প্রকাশিত হয় ১৯১৯ সালের আগস্টে। এর আগে কবি হিসেবে নজরুলের কোনো পরিচয়ই ছিল না। নজরুলের প্রথম কবিতাটি নির্ঝর কাব্যগ্রন্থে সন্নিবেশিত হয়েছে।
নজরুল তার ‘বিদ্রোহী’ কবিতা লিখেছিলেন ১৯২১ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহের কোনো এক দিন। কমরেড মুজফফর আহমদের কলকাতার ৩/৪-সি তালতলা লেনের দোতলা বাড়ির নিচতলার দক্ষিণ-পূর্ব কোণের ঘরে। কবিতাটি ১৯২২ সালের ৬ জানুয়ারি (১৩২৮ বঙ্গাব্দের ২২ পৌষ, শুক্রবার) বিজলী পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয়। ‘বিদ্রোহী’ প্রকাশিত হওয়া মাত্রই ব্যাপক জাগরণ সৃষ্টি করে। কবিতাটি বিজলী পত্রিকা দুবার ছাপতে হয়েছিল। ২৯ হাজার কপি ছাপা হয়। কমরেড মুজাফ্ফর আহমেদের মতে, সেদিন কমপক্ষে দুই লাখ মানুষ ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি পড়েছিল। কবিতাটিতে দৃপ্ত বিদ্রোহী মানসিকতা এবং অসাধারণ শব্দবিন্যাস ও ছন্দের জন্য আজও বাঙালি মানসে ‘চির উন্নত মম শির’ হিসেবে বিরাজমান।
‘বিদ্রোহী’ কবিতার জন্য নজরুল বিপুল খ্যাতি ও জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। এই কবিতা লেখার আগে তিনি সাহিত্য সমাজে একেবারে অজ্ঞাত ছিলেন–এ কথা বলা যাবে না। করাচি থেকে কলকাতায় আসার পর ‘মোসলেম ভারত’ পত্রিকায় নজরুলের কয়েকটি কবিতা প্রকাশিত হয়। তখন অনেকের মধ্যে নজরুলকে নিয়ে আগ্রহ ও কৌতূহল সৃষ্টি হয়। রবীন্দ্রনাথও ‘মোসলেম ভারত’ পত্রিকায় নজরুলের কবিতা পড়ে তার সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে শুরু করেন। অবশেষে পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়ের মাধ্যমে তাদের দুজনের প্রথম পরিচয় হয়। তবে ঠিক কত তারিখে তাদের প্রথম দেখা হয়েছিল, তা জানা যায় না। আবদুল আজিজ আল্-আমান তার ‘নজরুল-পরিক্রমা’ গ্রন্থে লিখেছেন, একদিন পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায় গিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা করতে। প্রয়োজনীয় কথার পর রবীন্দ্রনাথের সামনে ‘মোসলেম ভারত’ দেখে পত্রিকাটি সম্পর্কে কথা তুললেন পবিত্র বাবু। সে সময় ‘মোসলেম ভারত’ মানেই নজরুল। রবীন্দ্রনাথ নজরুলের বন্ধু পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়ের কাছে নজরুলের কথা জিজ্ঞেস করলেন এবং বিশেষ আগ্রহের সঙ্গে তাকে নিয়ে আসার আহ্বান জানালেন। শেষে নির্দিষ্ট দিনে পবিত্র বাবু নজরুলকে নিয়ে রবীন্দ্রনাথের সামনে হাজির হলেন। সেদিন তাদের মাঝে বিশেষ কোনো কথা হয়নি। (পৃষ্ঠা ২২-২৪)
অন্যদিকে প্রভাত কুমারের ‘রবীন্দ্রজীবনী’ (পৃষ্ঠা-৮৬) থেকে জানা যায়, ১৯২০ সালের ১২ মে থেকে ১৯২১ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত প্রায় ১৪ মাস রবীন্দ্রনাথ ইউরোপ-আমেরিকা সফর করেন। ১৬ জুলাই বোম্বাই থেকে বর্ধমান হয়ে বোলপুর পৌঁছান। ২০ জুলাই কলকাতায় আসেন আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে দেখা করার জন্য। মাঝখানে একবার শান্তিনিকেতনে ফিরে গেলেও সেপ্টেম্বরের ৬ তারিখ পর্যন্ত তিনি কলকাতাতেই ছিলেন। ওই সময়ে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে নজরুলের প্রথম দেখা হওয়া সম্ভবপর।
প্রথম দেখা যখনই হোক রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে বেশ কয়েকবার নজরুলের সাক্ষাৎ হয় এবং তাদের দুজনের মধ্যে যোগাযোগ ও উষ্ণ সম্পর্ক ছিল।
নজরুলের ‘ধূমকেতু’ প্রকাশিত হয় ১৯২২ সালের ১১ আগস্ট (১৩২৯ বঙ্গাব্দের ২৪ শ্রাবণ)। রবীন্দ্রনাথ এই পত্রিকার বাণী লিখে দিয়েছিলেন। ধূমকেতুর ৬টি সংখ্যায় প্রথম পৃষ্ঠায় এবং ৭ম সংখ্যা থেকে ৩য় পৃষ্ঠায় সম্পাদকীয় স্তম্ভের ওপর ওই বাণী ছাপা হয়।
নজরুলের প্রচ্ছন্ন রাজনৈতিক কবিতা ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ ১৯২২ সালে ধূমকেতুর ২৬ সেপ্টেম্বর সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল। ৮ নভেম্বর পত্রিকার ওই সংখ্যা নিষিদ্ধ করা হয়। নজরুলের প্রবন্ধগ্রন্থ যুগবাণী বাজেয়াপ্ত করা হয় ২৩ নভেম্বর। একই দিন নজরুলকে কুমিল্লা থেকে গ্রেপ্তার করে কলকাতায় আনা হয়। বিচারাধীন বন্দি হিসেবে ১৯২৩ সালের ৭ জানুয়ারি নজরুল আত্মপক্ষ সমর্থন করে চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট সুইনহোর আদালতে যে জবানবন্দি প্রদান করেন, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তা ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’ নামে সাহিত্য-মর্যাদা পেয়ে আসছে। ১৬ জানুয়ারি বিচারের রায়ে নজরুল এক বছর সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন।
নজরুল যখন আলীপুর সেন্ট্রাল জেলে বন্দি, তখন রবীন্দ্রনাথ তার বসন্ত গীতিনাট্য তাকে উৎসর্গ করেন (২২ জানুয়ারি ১৯২৩)। এ ঘটনায় উল্লসিত নজরুল জেলখানায় বসে তার ‘আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে’ কবিতা রচনা করেন।
১৯২৩ সালের ১৪ এপ্রিল নজরুলকে হুগলি জেলে স্থানান্তর করা হয়। রাজবন্দিদের প্রতি ইংরেজ জেল-সুপারের দুর্ব্যবহারের প্রতিবাদে ওই দিন থেকেই তিনি অনশন ধর্মঘট শুরু করেন। রবীন্দ্রনাথ অনশন ভঙ্গ করার অনুরোধ জানিয়ে নজরুলকে টেলিগ্রাম করেন: ‘Give up hunger strike, our literature claims you.’
একদিকে রবিন্দ্রনাথ ১৯২৩ সালে নজরুলকে বসন্ত গীতিনাট্য উৎসর্গ করেছেন, অন্যদিকে ১৯৪১ সালে রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুতে ব্যাথিত নজরুল ‘রবি হারা’ কবিতা লিখেছেন।
নজরুল ও রবীন্দ্রনাথের এই চিরায়ত সম্পর্কের বিষয়ে না জেনেই কেউ কেউ তাদের দুজনকে মুখোমুখি দাঁড় করানোর অপচেষ্টা চালিয়েছেন। সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মীয় বিভাজনে তাদের দুজনকে শত্রু বানিয়ে ফেলা হয়েছে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলকে যারা জেনেছেন, তারা স্বীকার করবেন সত্যিকার অর্থেই তাদের মধ্যে সম্পর্ক ছিল সৌহার্দ্রপূর্ণ। নজরুলের প্রতি রবীন্দ্রনাথের স্নেহ ছিল অপরিমেয়। অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথের প্রতি নজরুলের ছিল অতল শ্রদ্ধা।
তারপরও বাংলাদেশের এক শ্রেণির মানুষ রবীন্দ্রনাথের নোবেল পাওয়া নিয়ে ভ্রান্ততথ্য বা রটনা বিশ্বাস করে আসছেন কয়েক দশক ধরে? তারা না জানেন রবীন্দ্রনাথকে, না নজরুলকে। বিখ্যাত ব্যক্তিরা কেউ কারও বিকল্প হতে পারেন না, সবাই যার যার মহিমায় জ্বাজ্জ্বল্যমান। এই দুই কবির মধ্যে তাই তুলনা করাটা রীতিমতো অযৌক্তিক ও হাস্যকরও বটে। বাংলা কবিতার ইতিহাসে প্রতিভা ও অর্জনের দিক থেকে রবীন্দ্রনাথের পরই নজরুলের স্থান। তারা একে অপর থেকে পৃথক এবং তাদের মধ্যে দূরত্ব অবশ্য দুর্লঙ্ঘ্য। তারা মানবতার দর্শনকেই লালনপালন করে আমাদের পথ দেখিয়েছেন।
তবে নজরুলও নোবেল পেতে পারতেন তার সাহিত্য দিয়ে। তার কবিতাগুলো তখন যদি ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ করে প্রকাশের ব্যবস্থা করা যেত, তাহলে হয়তো নজরুলও নোবেল পেতে পারতেন। অবশ্য নজরুলের ভাষা, অহম, অলঙ্কার ইংরেজিতে অনুবাদ করা কিছুটা কষ্টসাধ্য ছিল। যদি নোবেল নাও পেতেন পৃথিবীজুড়ে শোষণের প্রতিবাদ হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারত তার কবিতা।
রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর এক বছর পরই, অর্থাৎ ১৯৪২ সালে নজরুল চিরতরে অসুস্থ এবং ক্রমান্বয়ে সম্বিতহারা ও নির্বাক হয়ে যান। বাংলার দুই মহান কবির কণ্ঠ প্রায় একই সময়ে নীরব হয়ে যায়। রবীন্দ্রনাথ-নজরুল বাঙালি জাতি ও বাংলার দুই মহান ব্যক্তি। তাদের মহত্ব বাঙালির গর্বের ধন।
নজরুলের আগমন কেবল চাঞ্চল্যকর ঘটনা ছিল না, ছিল নতুন একটি যুগের আগমন বার্তা। নজরুল নতুন যুগটাকে মূর্ত করে তোলেন। যুগের তিনি স্রষ্টা নন, যুগের মুখপাত্র। ১৯২৯ সালে নজরুলকে যে নাগরিক সম্বর্ধনা দেওয়া হয়েছিল, তাতে সভাপতিত্ব করেন বিজ্ঞানী প্রফুল্লচন্দ্র রায়। তিনি বলেছিলেন, নজরুল একজন প্রতিভাবান মৌলিক কবি। “রবীন্দ্রনাথের আওতায় নজরুল প্রতিভা পরিপুষ্ট হয়নি। তাই রবীন্দ্রনাথ তাকে কবি বলে স্বীকার করেছেন।” সভায় সুভাষচন্দ্র বসুও ছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “আমরা যখন যুদ্ধ ক্ষেত্রে যাব, তখন গাওয়া হবে নজরুলের গান, যখন কারাগারে যাব, তখনও গাইব নজরুলের গান।”

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্যোগ আর কূটনৈতিক তৎপরতায় ভারত সরকারের অনুমতিক্রমে অসুস্থ কবি কাজী নজরুল ইসলামকে সপরিবারে বাংলাদেশে আনা হয়। ১৯৭২ সালের ২৪ মে একটি বিশেষ ফ্লাইটে কলকাতা থেকে সপরিবারে ঢাকায় এসে পৌঁছান অসুস্থ কবি। সেদিন ঢাকার তেজগাঁওয়ের বিমানবন্দরে ছিল হাজার হাজার উৎসুক জনতার ভিড়। ঢাকায় আসার আগে অসুস্থ কবিকে নিয়ে পরিবার বাস করত কলকাতার ক্রিস্টোফার রোডের একটি ফ্ল্যাটে।
১৯৭৪ সালের ৯ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এক বিশেষ সমাবর্তনে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে কাজী নজরুল ইসলামের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে সম্মানসূচক ডি.লিট উপাধিতে ভূষিত করে। ১৯৭৬ সালের জানুয়ারি মাসে বাংলাদেশ সরকার নজরুলকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান এবং ২১ ফেব্রুয়ারি ‘একুশে পদকে’ ভূষিত করে।
১৯৭৬ সালেন ২৯ আগস্ট (১২ ভাদ্র ১৩৮৩) ঢাকার পিজি (বর্তমানে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়) হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কাজী নজরুল ইসলামকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদের উত্তর পাশে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়েছে।
তথ্যসূত্র:
মিজানুর রহমান খান, বায়ান্নর গোপন মার্কিন দলিল–১৭, প্রথম আলো, ১৭ ফ্রেবয়ারি, ২০১৪
মুজফফর আহমদ, কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতিকথা
রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের প্রথম সাক্ষাৎ, জহিরুল হক
চির উন্নত শির, সম্পাদক মানিক মুখোপাধ্যায়, সারা বাংলা নজরুল শতবর্ষ কমিটি, কলকাতা ২০০১
বাংলাপিডিয়া