Advertisement Banner

কাবুলে সরকার পরিবর্তনের ছক আঁকছে পাকিস্তান?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
কাবুলে সরকার পরিবর্তনের ছক আঁকছে পাকিস্তান?
কাবুলের কেউ কেউ চিন্তিত যে, পাকিস্তান হয়তো কোনোভাবে সেখানে সরকার পরিবর্তনের চেষ্টা করতে পারে। ছবি: রয়টার্স

অভ্যন্তরীণ সমস্যা পাকিস্তানের সামরিক প্রধান ও ‘প্রকৃত শাসক’ আসিম মুনিরকে কঠোর বাস্তবতার মুখোমুখি এনে দাঁড় করিয়েছে। সম্প্রতি তিনি বিশ্বজুড়ে এক বৈশ্বিক শান্তিদূত হিসেবে ভূমিকা পালন করছিলেন। গত ২২ মে আমেরিকা ও ইরানের মধ্যকার সংঘাত থামাতে তিনি তেহরানে ছিলেন। দুই মাসের মধ্যে এটি ছিল তার দ্বিতীয় ইরান সফর। এর তিন দিন পর তিনি চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিংকে সর্বশেষ পরিস্থিতি জানাতে বেইজিংয়ে ছিলেন।

তবুও ফিল্ড মার্শাল মুনিরের চীনে পৌঁছানোর মুহূর্তটি দেশের এক নির্মম খবরে ম্লান হয়ে যায়। পাকিস্তানের পশ্চিমাঞ্চলের একটি বিশাল প্রদেশ বেলুচিস্তানে একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী যাত্রীবাহী ট্রেনে বিস্ফোরণ ঘটায়, নিহত হন ৪৭ জন। এই হামলাটি চালিয়েছিল বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি (বিএলএ)। এই বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীটি চীনের অবকাঠামো এবং নাগরিকদেরও লক্ষ্যবস্তু করে আসছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক এই হামলাটি হয়তো বেইজিংয়ে ফিল্ড মার্শালকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্যই করা হয়েছিল। তার সমস্যা আরও বাড়িয়ে দিতে, বিএলএ-এর এই তৎপরতা পাকিস্তানে চলমান দুটি বিদ্রোহের একটি মাত্র। তিনি যখন বিদেশে নিজের শক্তি প্রদর্শন করতে চাচ্ছেন, ঠিক তখন দেশের অভ্যন্তরে জঙ্গি সহিংসতা গত এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে

ব্রিটিশ সাময়িকী ইকোনমিস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রেনে বোমা হামলাটি ছিল এই বছর বিএলএ-এর চালানো ধারাবাহিক হামলাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে দুঃসাহসিক। বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনটির অন্তত ২ হাজার যোদ্ধা রয়েছে বলে ধারণা করা হয়।

পাকিস্তানি নাগরিকদের হত্যার পাশাপাশি, গোষ্ঠীটি গত পাঁচ বছরে অন্তত ২০ জন চীনা নাগরিককে হত্যা করেছে। তারা মূলত জ্বালানি ও খনিজ প্রকল্পে হামলা চালিয়ে চীনা বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত এবং পাকিস্তানি সরকারকে বিব্রত করতে চায়। ইসলামাবাদভিত্তিক থিংক ট্যাংক পাকিস্তান-চীন ইনস্টিটিউটের চেয়ারম্যান মুশাহেদ হুসাইন বলেন, ‘‘আমরা (চীনকে) নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম এবং আমরা ব্যর্থ হয়েছি।’’

যদিও বিএলএ-এর এই তৎপরতা অত্যন্ত জঘন্য, তবুও ইসলামাবাদের কর্মকর্তাদের কাছে এই সংগঠনটি দ্বিতীয় আরেকটি প্রতিপক্ষের চেয়ে কম উদ্বেগের বিষয়। ইসলামাবাদের সবচেয়ে উদ্বেগজনক প্রতিপক্ষ হলো তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)। এর প্রায় ৬ হাজার যোদ্ধা উত্তর-পশ্চিম পাকিস্তানে নিজেদের একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখে।

পাকিস্তানের সামরিক প্রধান আসিম মুনির। ছবি: রয়টার্স
পাকিস্তানের সামরিক প্রধান আসিম মুনির। ছবি: রয়টার্স

উর্দু, পশতু এবং ইংরেজি ভাষায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত তাদের আকর্ষণীয় ভিডিওগুলোতে যোদ্ধারা পাকিস্তানি রাষ্ট্রকে ‘অনৈসলামিক’ ও ‘আইএমএফ এর গোলাম’ বলে গালিগালাজ করে। মে মাসে তাদের চালানো বেশ কয়েকটি হামলার মধ্যে একটি ছিল গাড়ি বোমা হামলা। উত্তর-পশ্চিমের একটি প্রদেশে চালানো এই হামলায় ২১ জন পুলিশ সদস্য নিহত হন।

টিটিপি একসময় অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল ও বিশৃঙ্খল ছিল। ২০১০-এর দশকে গোষ্ঠীটি নিঃস্ব যুবকদের জোরপূর্বক নিয়োগের ওপর নির্ভর করত। তাদের সহিংসতা ছিল নির্বিচার।  ২০১৪ সালে তারা পাকিস্তানের পেশোয়ারের একটি স্কুলে হামলা চালিয়ে ১৩২ জন শিশুকে হত্যা করে। আজকাল তারা আরও সুসংগঠিত এবং অর্থায়নে পুষ্ট। তারা কেবল পাকিস্তানি সেনা ও পুলিশকে লক্ষ্যবস্তু করে। ২০১৪ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেওয়ার আগে কাউন্টার-ইনসার্জেন্সি (বিদ্রোহ দমন) অভিযানের নেতৃত্ব দেওয়া লেফটেন্যান্ট জেনারেল তারিক খান জানান, টিটিপি বেকার যুবকদের প্রতি মাসে ৫০ হাজার পাকিস্তানি রুপি বেতন দেয়।  

পাকিস্তানি বিশ্লেষক এহসানুল্লাহ টিপু মেহসুদ বলেন, তাদের কাছে এখন স্নাইপার, থার্মাল গগলস এবং চীনে তৈরি ড্রোন রয়েছে।

পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে আফগান তালেবানের বিরুদ্ধে টিটিপি-কে আশ্রয় ও সমর্থন দেওয়ার অভিযোগ এনে আসছে। এতে অতিষ্ঠ হয়ে গত ফেব্রুয়ারিতে পাকিস্তান আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে উন্মুক্ত যুদ্ধ ঘোষণা করে, তাদের প্রশিক্ষণ শিবির ও গোলাবারুদের ডিপোতে বোমাবর্ষণ করে। পাকিস্তান সরকার ইতিমধ্যেই আফগান শরণার্থীদের বহিষ্কার করা শুরু করেছে এবং অক্টোবর থেকে দুই দেশের সীমান্তজুড়ে বাণিজ্য বন্ধ করে দিয়েছে।এতে তালেবানরা বছরে প্রায় ৩০ কোটি ডলারের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, যা তাদের বার্ষিক বাজেটের প্রায় ১০ শতাংশ। পাকিস্তান আশা করছিল যে, এর মাধ্যমে তারা টিটিপি-কে নিরস্ত্র করতে বা তাদের সীমান্ত অতিক্রম করা বন্ধ করতে বাধ্য করতে পারবে।

কিন্তু এটি ছিল অবাস্তব চিন্তাভাবনা। পাকিস্তানের সামরিক হামলার পরপরই টিটিপি-এর তৎপরতা কমে গেলেও, গত মাসে তা আবার বৃদ্ধি পেয়েছে। তালেবানের প্রভাবশালী উপদলগুলো টিটিপিকে তাদের সমমনা মনে করে। অতীতে তারা একসাথে লড়াই করেছে। তারা এটাও ভয় পায় যে টিটিপিকে নিরস্ত্র করার চেষ্টা করলে যোদ্ধারা আরও চরমপন্থী অন্যান্য জঙ্গিগোষ্ঠীতে যোগ দিতে পারে, যাদের কেউ কেউ আবার তালেবানেরই বিরোধী। পাকিস্তানের এই হামলার কারণে আফগানিস্তানে দুটি বড় পরিবর্তন দেখা গেছে। এর একদিকে যেমন তালেবানরা আগের চেয়ে বেশি ঐক্যবদ্ধ হয়েছে, অন্যদিকে সাধারণ আফগানদের খেপিয়ে তোলাও অনেক সহজ হয়েছে।

জাতিসংঘ জানিয়েছে, মার্চের শেষ নাগাদ পাকিস্তানি বোমায় ৩৭২ জন আফগান বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। আরও হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। কুনার প্রদেশের নারি জেলার ৩১ বছর বয়সী দেলাওয়ার খান বলেন, তার পরিবার এবং আরও অনেকেই পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন। খাবার ও পানি জোগাড় করা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।

পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে যে ভারত বিএলএ-কে অর্থায়ন করে। আজকাল কর্মকর্তারা এমন অভিযোগও করছেন যে, ভারত আফগানিস্তানে অর্থ ঢালছে এবং এমনকি পরোক্ষভাবে টিটিপি যোদ্ধাদের বেতনও দিচ্ছে। ভারত অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তালেবানের সাথে ভারতের সম্পর্ক নিশ্চিতভাবেই বন্ধুত্বপূর্ণ হয়েছে এবং পাকিস্তান ও ভারত উভয়েরই প্রক্সি গ্রুপ ব্যবহারের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে।

ফেব্রুয়ারিতে পাকিস্তান আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে উন্মুক্ত যুদ্ধ ঘোষণা করে। ছবি: রয়টার্স
ফেব্রুয়ারিতে পাকিস্তান আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে উন্মুক্ত যুদ্ধ ঘোষণা করে। ছবি: রয়টার্স

মার্কিন থিংক-ট্যাংক কুইন্সি ইনস্টিটিউটের অ্যাডাম ওয়েনস্টাইন বলেন, অভ্যন্তরীণ ক্ষোভের কারণে সৃষ্ট বিদ্রোহের জন্য বিদেশি হস্তক্ষেপকে দায়ী করা সরকারগুলোর জন্য প্রায়শই সহজ উপায় হয়ে দাঁড়ায়।

পশ্চিম পাকিস্তানে বিএলএ এবং টিটিপি উভয়ই সক্রিয়। অঞ্চলটি অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়েছে। সেখানে দশকের পর দশক ধরে সেনাবাহিনী ও পুলিশের কঠোর আচরণের শিকার হয়েছে। বিদ্রোহের প্রতি ফিল্ড মার্শাল মুনিরের এই পাশবিক বলপ্রয়োগের নীতি রাজনৈতিক সমঝোতার জন্য খুব কম সুযোগই রেখেছে। একজন সাবেক পাকিস্তানি কূটনীতিক বলেন, ‘‘এর অত্যন্ত নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া হবে।’’

চীনের অনুরোধে গত এপ্রিলে পাকিস্তানের কর্মকর্তারা তালেবানের সাথে এক অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় বসেন। তবে কোনো অগ্রগতি ছাড়াই তা শেষ হয়। সাম্প্রতিক হামলাগুলোর পর পাকিস্তান বেশ বুঝেশুনে ও শান্তভাবে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। এর কারণ হতে পারে, সেনাপ্রধান মুনির আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে একটি আলোচনার মধ্যস্থতা করতে চান এবং তিনি ভাবছেন যে দেশের ভেতরের সমস্যাগুলো যেন এই বড় উদ্যোগে কোনো বাধা না হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু এর পরে কী ঘটবে তা স্পষ্ট নয়।

আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলের কেউ কেউ চিন্তিত যে, পাকিস্তান হয়তো কোনোভাবে সেখানে সরকার পরিবর্তনের চেষ্টা করতে পারে। পাকিস্তান কেবল প্রশিক্ষণ শিবিরই নয়, বরং তালেবান নেতাদেরও লক্ষ্যবস্তু করার কথা বিবেচনা করবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে একজন পাকিস্তানি কর্মকর্তা ক্ষোভ ও হতাশা নিয়ে বলেন, ‘‘তারা যদি আমাদের হত্যা করা বন্ধ না করে (তবে আমরা তা করব)।’’

সম্পর্কিত