আহমেদ নাজার

কয়েক দশক ধরে ইসরায়েলের পারমাণবিক অস্ত্রাগার একটি ‘অস্বস্তিকর’ গোপনীয়তা হিসেবে গণ্য হয়ে আসছে। এটি এমন কিছু, যা সবাই জানে যে এর অস্তিত্ব আছে, কিন্তু খুব কম লোকই এ নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা করতে আগ্রহী। ইসরায়েল কখনোই আনুষ্ঠানিকভাবে পারমাণবিক অস্ত্রের মালিকানার কথা স্বীকার করেনি। তবুও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের কাছে এটি ব্যাপকভাবে স্বীকৃত যে, দেশটির উল্লেখযোগ্য পারমাণবিক সক্ষমতা রয়েছে।
স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এসআইপিআরআই) মতো সংস্থাগুলোর অনুমান অনুযায়ী, ইসরায়েলের কাছে প্রায় ৮০টির মতো পারমাণবিক ওয়ারহেড রয়েছে। এর পাশাপাশি তাদের এমন সব ডেলিভারি সিস্টেম বা অস্ত্র নিক্ষেপণ ব্যবস্থা রয়েছে, যার মধ্যে যুদ্ধবিমান এবং ব্যালিস্টিক মিসাইল অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। এই অস্ত্রাগার পরিচালনার নীতিটি ‘পারমাণবিক অস্পষ্টতা’ হিসেবে পরিচিত।
ইসরায়েল তাদের পারমাণবিক অস্ত্রের অস্তিত্ব নিশ্চিতও করে না, আবার অস্বীকারও করে না। কার্যত, এই অস্পষ্টতা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে একটি কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়া এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। আর তা হলো, ঠিক কোন পরিস্থিতিতে ইসরায়েল প্রকৃতপক্ষে এগুলো ব্যবহার করবে?
সাম্প্রতিক দশকগুলোর যেকোনো সময়ের তুলনায় এই প্রশ্নটি আজ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ আমেরিকা এবং ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে একটি বিপজ্জনক যুদ্ধে লিপ্ত। গত শনিবার, ইরান ইসরায়েলের দিমোনা শহরে আঘাত হেনেছে, যেখানে দেশটির একটি গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনা অবস্থিত। এর মাধ্যমে ইরান এটিই প্রদর্শন করল যে, তাদের নিজস্ব পারমাণবিক কেন্দ্রগুলোতে হামলা চালানো হলে তারা তার প্রতিশোধ নেওয়ার সক্ষমতা রাখে।
ইসরায়েলের কৌশলগত চিন্তাধারা দীর্ঘকাল ধরে একটি অস্তিত্ব রক্ষার হুমকি বা সমূলে বিনাশ হওয়ার ভয় দ্বারা প্রভাবিত। অধিকাংশ পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রের সামরিক নীতি যেখানে অন্য শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি বা প্রতিযোগিতাকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়, সেখানে ইসরায়েলের নিরাপত্তা ব্যবস্থার মূলে রয়েছে এই বিশ্বাস যে, যদি কোনো যুদ্ধ তাদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত মোড় নেয়, তবে দেশটি ধ্বংসের মুখে পড়তে পারে।

১৯৬৭ ও ১৯৭৩ সালের যুদ্ধ থেকে শুরু করে বর্তমানে ইরান এবং গাজা ও লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সাথে সংঘাত—প্রতিটি আঞ্চলিক লড়াইকেই ইসরায়েলি নেতারা বারবার ‘জাতীয় অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সংগ্রাম’ হিসেবে তুলে ধরেছেন। যখন পারমাণবিক অস্ত্রের বিষয়টি সামনে আসে, তখন এই বিশেষ মানসিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
অধিকাংশ পারমাণবিক নীতির ক্ষেত্রে, পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সীমা অত্যন্ত উঁচুতে নির্ধারণ করা হয়। মূলত অন্যান্য পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রকে প্রতিহত করার জন্যই এই অস্ত্রগুলো রাখা হয়। তবে ইসরায়েলের কৌশলগত চিন্তাধারা এখানে একটি ভিন্ন মাত্রা যোগ করে। কোনো পারমাণবিক অস্ত্রহীন রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আসা হুমকির কারণেও যদি দেশটির অস্তিত্ব সংকটে পড়ে, তবে সেক্ষেত্রে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনা করা হতে পারে।
কৌশলগত গবেষণায় দীর্ঘকাল ধরে একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়ে আসছে যা অনেক সময় ‘স্যামসন অপশন’ নামে পরিচিত। এর মানে হলো পরাজয়ের মুখে পড়লে ইসরায়েল শেষ উপায় হিসেবে পারমাণবিক অস্ত্রের আশ্রয় নিতে পারে। এ ধরনের কোনো নীতিমালা আনুষ্ঠানিকভাবে বিদ্যমান থাকুক বা না থাকুক, এর পেছনের যুক্তিটি স্পষ্ট। যদি কোনো রাষ্ট্র প্রকৃতপক্ষে বিশ্বাস করে যে তার অস্তিত্ব হুমকির মুখে, তবে যুদ্ধের তীব্রতা নাটকীয়ভাবে বাড়িয়ে দেওয়ার চাপ বহুগুণ বেড়ে যায়।
ইসরায়েলের বর্তমান আঞ্চলিক অবস্থানের প্রেক্ষাপটে এই উদ্বেগ আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। বর্তমানে ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে, মানে গাজা থেকে লেবানন, সিরিয়া এবং ইরান পর্যন্ত সংঘাতপূর্ণ এক বিস্তৃত জালে জড়িয়ে পড়েছে। একাধিক ফ্রন্টে ও সীমান্তে একই সাথে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা এখন আর কেবল তাত্ত্বিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ নেই।
এমন পরিস্থিতিতে, ইসরায়েলি নেতারা নিজেদের কেবল একটি প্রথাগত যুদ্ধে লিপ্ত হিসেবে না দেখে বরং একটি আঞ্চলিক জোটের মোকাবিলা করছেন বলে মনে করতে পারেন। একটি রাষ্ট্র তার যুদ্ধগুলোকে যত বেশি অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই হিসেবে ব্যাখ্যা করবে, চরম উত্তেজনাকর পদক্ষেপ বা সংঘাতের মাত্রা তীব্রতর করার ক্ষেত্রে মনস্তাত্ত্বিক বাধা ততই কমে আসবে। ঠিক এই কারণেই অধিকাংশ দেশের পারমাণবিক নীতিগুলো কঠোর কৌশলগত কাঠামো এবং আন্তর্জাতিক তদারকির মাধ্যমে সীমাবদ্ধ রাখা হয়।

যাইহোক, ইসরায়েলের পারমাণবিক অস্ত্রাগার প্রায় সম্পূর্ণভাবেই আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণের বাইরে। ইসরায়েল পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তিতে (এনপিটি) স্বাক্ষর করেনি এবং তাদের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো এমন কোনো পরিদর্শন ব্যবস্থার অধীন নয় যা বিশ্বের অন্যান্য অধিকাংশ রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
এটি বৈশ্বিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এক বিরল পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। ইসরায়েল এমন একটি পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্র যার সক্ষমতা এবং রণকৌশল মূলত আন্তর্জাতিক নজরদারি থেকে মুক্ত। বিশ্ব যখন দশকের পর দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যের অন্য কোথাও পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধে মনোযোগ দিচ্ছে, তখন এই অঞ্চলের একমাত্র বিদ্যমান পারমাণবিক অস্ত্রাগারটি মূলত আলোচনার ঊর্ধ্বে রয়ে গেছে।
গাজার সাম্প্রতিক ঘটনাবলিও সংঘাতের তীব্রতা বৃদ্ধির সীমা নিয়ে কিছু কঠিন প্রশ্ন উত্থাপন করছে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে এবং ভূখণ্ডের বেশিরভাগ অবকাঠামো প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। পুরো এলাকা মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। হাসপাতাল, স্কুল এবং বেসামরিক অবকাঠামো বারবার আক্রান্ত হয়েছে। ধ্বংসলীলার এই বিশালতা দেখে অনেক মানবাধিকার সংস্থা এবং আইন বিশেষজ্ঞ এই অভিযানকে গণহত্যা হিসেবে অভিহিত করেছেন।
বোমাবর্ষণের তীব্রতা ছিল অস্বাভাবিক। কিছু সামরিক বিশ্লেষকের অনুমান অনুযায়ী, যুদ্ধের শুরুর ধাপেই গাজায় যে পরিমাণ বিস্ফোরক নিক্ষেপ করা হয়েছে, তার ক্ষমতা হিরোশিমায় ব্যবহৃত পারমাণবিক বোমার ধ্বংসক্ষমতার চেয়েও কয়েক গুণ বেশি।
এই তুলনাটি পারমাণবিক এবং প্রথাগত অস্ত্রের মধ্যে সমতা বোঝানোর জন্য নয়। একটি পারমাণবিক বিস্ফোরণের ধ্বংসলীলা হবে আরও বহুগুণ ভয়াবহ। তবে এটি ইসরায়েলি নেতাদের সামরিক শক্তি প্রয়োগের মানসিকতা সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উন্মোচন করে। অর্থাৎ যখন তারা মনে করেন জাতীয় নিরাপত্তা সংকটে, তখন তারা ঠিক কতখানি বিধ্বংসী হতে পারেন। কোনো রাষ্ট্র যদি প্রথাগত উপায়ে এমন ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে দ্বিধা না করে, তবে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন জাগে: যদি তারা সত্যিই কোনো যুদ্ধে পরাজিত হচ্ছে বলে মনে করে, তবে তাদের পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সীমা আসলে কোথায়?
কৌশলগত বিতর্কগুলোতে আরেকটি বিষয় খুব কমই আলোচিত হয়। আর তা হলো, ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি। দেশটির বর্তমান সরকারকে ইতিহাসের সবচেয়ে কট্টরপন্থী হিসেবে বর্ণনা করা হয়, যেখানে এমন অনেক মন্ত্রী রয়েছেন যারা ফিলিস্তিন এবং আঞ্চলিক প্রতিপক্ষদের বিষয়ে প্রকাশ্যে চরমপন্থা অবলম্বনের পক্ষে কথা বলেন।
একই সাথে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসরায়েলি সমাজে উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটেছে, সেখানে জাতীয়তাবাদী এবং সামরিকায়িত নীতির প্রতি সমর্থন ক্রমবর্ধমান। এটি ‘অস্তিত্ব রক্ষার হুমকি’ হিসেবে গণ্য হতে পারে–এমন পরিস্থিতির সীমা আরও কমিয়ে দেয়।
এই সমস্ত বিষয়েই অন্যান্য পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র এবং পারমাণবিক মহাপ্রলয় ঠেকানোর দায়িত্বে নিয়োজিত আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে উদ্বেগে ফেলার কথা। আর বর্তমানে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে, এটি তাদের জরুরি পদক্ষেপ হওয়া উচিত।
লেখক: ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও নাট্যকার

কয়েক দশক ধরে ইসরায়েলের পারমাণবিক অস্ত্রাগার একটি ‘অস্বস্তিকর’ গোপনীয়তা হিসেবে গণ্য হয়ে আসছে। এটি এমন কিছু, যা সবাই জানে যে এর অস্তিত্ব আছে, কিন্তু খুব কম লোকই এ নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা করতে আগ্রহী। ইসরায়েল কখনোই আনুষ্ঠানিকভাবে পারমাণবিক অস্ত্রের মালিকানার কথা স্বীকার করেনি। তবুও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের কাছে এটি ব্যাপকভাবে স্বীকৃত যে, দেশটির উল্লেখযোগ্য পারমাণবিক সক্ষমতা রয়েছে।
স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এসআইপিআরআই) মতো সংস্থাগুলোর অনুমান অনুযায়ী, ইসরায়েলের কাছে প্রায় ৮০টির মতো পারমাণবিক ওয়ারহেড রয়েছে। এর পাশাপাশি তাদের এমন সব ডেলিভারি সিস্টেম বা অস্ত্র নিক্ষেপণ ব্যবস্থা রয়েছে, যার মধ্যে যুদ্ধবিমান এবং ব্যালিস্টিক মিসাইল অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। এই অস্ত্রাগার পরিচালনার নীতিটি ‘পারমাণবিক অস্পষ্টতা’ হিসেবে পরিচিত।
ইসরায়েল তাদের পারমাণবিক অস্ত্রের অস্তিত্ব নিশ্চিতও করে না, আবার অস্বীকারও করে না। কার্যত, এই অস্পষ্টতা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে একটি কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়া এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। আর তা হলো, ঠিক কোন পরিস্থিতিতে ইসরায়েল প্রকৃতপক্ষে এগুলো ব্যবহার করবে?
সাম্প্রতিক দশকগুলোর যেকোনো সময়ের তুলনায় এই প্রশ্নটি আজ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ আমেরিকা এবং ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে একটি বিপজ্জনক যুদ্ধে লিপ্ত। গত শনিবার, ইরান ইসরায়েলের দিমোনা শহরে আঘাত হেনেছে, যেখানে দেশটির একটি গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনা অবস্থিত। এর মাধ্যমে ইরান এটিই প্রদর্শন করল যে, তাদের নিজস্ব পারমাণবিক কেন্দ্রগুলোতে হামলা চালানো হলে তারা তার প্রতিশোধ নেওয়ার সক্ষমতা রাখে।
ইসরায়েলের কৌশলগত চিন্তাধারা দীর্ঘকাল ধরে একটি অস্তিত্ব রক্ষার হুমকি বা সমূলে বিনাশ হওয়ার ভয় দ্বারা প্রভাবিত। অধিকাংশ পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রের সামরিক নীতি যেখানে অন্য শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি বা প্রতিযোগিতাকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়, সেখানে ইসরায়েলের নিরাপত্তা ব্যবস্থার মূলে রয়েছে এই বিশ্বাস যে, যদি কোনো যুদ্ধ তাদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত মোড় নেয়, তবে দেশটি ধ্বংসের মুখে পড়তে পারে।

১৯৬৭ ও ১৯৭৩ সালের যুদ্ধ থেকে শুরু করে বর্তমানে ইরান এবং গাজা ও লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সাথে সংঘাত—প্রতিটি আঞ্চলিক লড়াইকেই ইসরায়েলি নেতারা বারবার ‘জাতীয় অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সংগ্রাম’ হিসেবে তুলে ধরেছেন। যখন পারমাণবিক অস্ত্রের বিষয়টি সামনে আসে, তখন এই বিশেষ মানসিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
অধিকাংশ পারমাণবিক নীতির ক্ষেত্রে, পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সীমা অত্যন্ত উঁচুতে নির্ধারণ করা হয়। মূলত অন্যান্য পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রকে প্রতিহত করার জন্যই এই অস্ত্রগুলো রাখা হয়। তবে ইসরায়েলের কৌশলগত চিন্তাধারা এখানে একটি ভিন্ন মাত্রা যোগ করে। কোনো পারমাণবিক অস্ত্রহীন রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আসা হুমকির কারণেও যদি দেশটির অস্তিত্ব সংকটে পড়ে, তবে সেক্ষেত্রে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনা করা হতে পারে।
কৌশলগত গবেষণায় দীর্ঘকাল ধরে একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়ে আসছে যা অনেক সময় ‘স্যামসন অপশন’ নামে পরিচিত। এর মানে হলো পরাজয়ের মুখে পড়লে ইসরায়েল শেষ উপায় হিসেবে পারমাণবিক অস্ত্রের আশ্রয় নিতে পারে। এ ধরনের কোনো নীতিমালা আনুষ্ঠানিকভাবে বিদ্যমান থাকুক বা না থাকুক, এর পেছনের যুক্তিটি স্পষ্ট। যদি কোনো রাষ্ট্র প্রকৃতপক্ষে বিশ্বাস করে যে তার অস্তিত্ব হুমকির মুখে, তবে যুদ্ধের তীব্রতা নাটকীয়ভাবে বাড়িয়ে দেওয়ার চাপ বহুগুণ বেড়ে যায়।
ইসরায়েলের বর্তমান আঞ্চলিক অবস্থানের প্রেক্ষাপটে এই উদ্বেগ আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। বর্তমানে ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে, মানে গাজা থেকে লেবানন, সিরিয়া এবং ইরান পর্যন্ত সংঘাতপূর্ণ এক বিস্তৃত জালে জড়িয়ে পড়েছে। একাধিক ফ্রন্টে ও সীমান্তে একই সাথে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা এখন আর কেবল তাত্ত্বিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ নেই।
এমন পরিস্থিতিতে, ইসরায়েলি নেতারা নিজেদের কেবল একটি প্রথাগত যুদ্ধে লিপ্ত হিসেবে না দেখে বরং একটি আঞ্চলিক জোটের মোকাবিলা করছেন বলে মনে করতে পারেন। একটি রাষ্ট্র তার যুদ্ধগুলোকে যত বেশি অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই হিসেবে ব্যাখ্যা করবে, চরম উত্তেজনাকর পদক্ষেপ বা সংঘাতের মাত্রা তীব্রতর করার ক্ষেত্রে মনস্তাত্ত্বিক বাধা ততই কমে আসবে। ঠিক এই কারণেই অধিকাংশ দেশের পারমাণবিক নীতিগুলো কঠোর কৌশলগত কাঠামো এবং আন্তর্জাতিক তদারকির মাধ্যমে সীমাবদ্ধ রাখা হয়।

যাইহোক, ইসরায়েলের পারমাণবিক অস্ত্রাগার প্রায় সম্পূর্ণভাবেই আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণের বাইরে। ইসরায়েল পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তিতে (এনপিটি) স্বাক্ষর করেনি এবং তাদের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো এমন কোনো পরিদর্শন ব্যবস্থার অধীন নয় যা বিশ্বের অন্যান্য অধিকাংশ রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
এটি বৈশ্বিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এক বিরল পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। ইসরায়েল এমন একটি পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্র যার সক্ষমতা এবং রণকৌশল মূলত আন্তর্জাতিক নজরদারি থেকে মুক্ত। বিশ্ব যখন দশকের পর দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যের অন্য কোথাও পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধে মনোযোগ দিচ্ছে, তখন এই অঞ্চলের একমাত্র বিদ্যমান পারমাণবিক অস্ত্রাগারটি মূলত আলোচনার ঊর্ধ্বে রয়ে গেছে।
গাজার সাম্প্রতিক ঘটনাবলিও সংঘাতের তীব্রতা বৃদ্ধির সীমা নিয়ে কিছু কঠিন প্রশ্ন উত্থাপন করছে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে এবং ভূখণ্ডের বেশিরভাগ অবকাঠামো প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। পুরো এলাকা মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। হাসপাতাল, স্কুল এবং বেসামরিক অবকাঠামো বারবার আক্রান্ত হয়েছে। ধ্বংসলীলার এই বিশালতা দেখে অনেক মানবাধিকার সংস্থা এবং আইন বিশেষজ্ঞ এই অভিযানকে গণহত্যা হিসেবে অভিহিত করেছেন।
বোমাবর্ষণের তীব্রতা ছিল অস্বাভাবিক। কিছু সামরিক বিশ্লেষকের অনুমান অনুযায়ী, যুদ্ধের শুরুর ধাপেই গাজায় যে পরিমাণ বিস্ফোরক নিক্ষেপ করা হয়েছে, তার ক্ষমতা হিরোশিমায় ব্যবহৃত পারমাণবিক বোমার ধ্বংসক্ষমতার চেয়েও কয়েক গুণ বেশি।
এই তুলনাটি পারমাণবিক এবং প্রথাগত অস্ত্রের মধ্যে সমতা বোঝানোর জন্য নয়। একটি পারমাণবিক বিস্ফোরণের ধ্বংসলীলা হবে আরও বহুগুণ ভয়াবহ। তবে এটি ইসরায়েলি নেতাদের সামরিক শক্তি প্রয়োগের মানসিকতা সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উন্মোচন করে। অর্থাৎ যখন তারা মনে করেন জাতীয় নিরাপত্তা সংকটে, তখন তারা ঠিক কতখানি বিধ্বংসী হতে পারেন। কোনো রাষ্ট্র যদি প্রথাগত উপায়ে এমন ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে দ্বিধা না করে, তবে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন জাগে: যদি তারা সত্যিই কোনো যুদ্ধে পরাজিত হচ্ছে বলে মনে করে, তবে তাদের পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সীমা আসলে কোথায়?
কৌশলগত বিতর্কগুলোতে আরেকটি বিষয় খুব কমই আলোচিত হয়। আর তা হলো, ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি। দেশটির বর্তমান সরকারকে ইতিহাসের সবচেয়ে কট্টরপন্থী হিসেবে বর্ণনা করা হয়, যেখানে এমন অনেক মন্ত্রী রয়েছেন যারা ফিলিস্তিন এবং আঞ্চলিক প্রতিপক্ষদের বিষয়ে প্রকাশ্যে চরমপন্থা অবলম্বনের পক্ষে কথা বলেন।
একই সাথে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসরায়েলি সমাজে উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটেছে, সেখানে জাতীয়তাবাদী এবং সামরিকায়িত নীতির প্রতি সমর্থন ক্রমবর্ধমান। এটি ‘অস্তিত্ব রক্ষার হুমকি’ হিসেবে গণ্য হতে পারে–এমন পরিস্থিতির সীমা আরও কমিয়ে দেয়।
এই সমস্ত বিষয়েই অন্যান্য পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র এবং পারমাণবিক মহাপ্রলয় ঠেকানোর দায়িত্বে নিয়োজিত আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে উদ্বেগে ফেলার কথা। আর বর্তমানে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে, এটি তাদের জরুরি পদক্ষেপ হওয়া উচিত।
লেখক: ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও নাট্যকার