দেশজুড়ে গুলি-কোপাকুপি, প্রথম ৭ দিনেই ২০ খুন

দেশজুড়ে গুলি-কোপাকুপি, প্রথম ৭ দিনেই ২০ খুন
প্রতীকী ছবি: চরচা

নতুন বছরের শুরুতেই দেশজুড়ে গুলি ও কোপাকুপির ঘটনায় বাড়ছে প্রাণহানি। মাত্র সাত দিনের ব্যবধানে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে গুলিতে ও ধারালো অস্ত্রের আঘাতে অন্তত ২০ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে দুর্বত্তদের গুলিতে বিএনপির তিনজন নেতাসহ ৮ জন নিহত এবং কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে অন্তত ১২ জনকে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে এ ধরনের সহিংসতা ভোটার, সম্ভাব্য প্রার্থী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। রাজনৈতিক বিরোধ, আধিপত্য বিস্তার ও ব্যক্তিগত শত্রুতাকে কেন্দ্র করে একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটছে, যা নির্বাচনী পরিবেশকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

গত ৭ জানুয়ারি রাতে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে স্টার হোটেলের পাশের একটি গলিতে দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক নেতা আজিজুর রহমান মোসাব্বির (৪৪)। পুলিশ জানায়, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও আধিপত্য বিস্তারের জেরেই এ হত্যাকাণ্ড। এর আগে ৫ জানুয়ারি চট্টগ্রামের রাউজানে মোটরসাইকেলে এসে যুবদল নেতা মুহাম্মদ জানে আলম সিকদারকে (৪৮) গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। তিনি রাউজান উপজেলা যুবদলের সদস্য এবং পূর্ব গুজরা ইউনিয়ন যুবদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। আর ৩ জানুয়ারি সকালে যশোর শহরের শংকরপুর এলাকায় অজ্ঞাতনামা দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন বিএনপি নেতা আলমগীর হোসেন (৫৫)। তিনি শংকরপুর ৭ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।

গত ২৯ ডিসেম্বর পুলিশের মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায় পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম আসন্ন নির্বাচনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে নির্দেশ দেন। সভায় ভার্চ্যুয়ালি সব জেলার পুলিশ সুপার, রেঞ্জ ডিআইজি ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অংশ নেন।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে আইজিপি চরচাকে বলেন, “আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। রাজনৈতিক বিরোধ থেকে কিছু পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড ঘটছে, যা পুরোপুরি ঠেকানো কঠিন। তবে ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তার করা গেলে সংঘাত কমে আসবে।”

আইজিপি আরও জানান, অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেজ-২ চলমান রয়েছে এবং এটি অব্যাহত থাকবে। যারা নির্বাচন বানচালের হুমকি দিচ্ছে বা দিতে পারে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে, তাদের অনেকেই চলমান অভিযানে গ্রেপ্তার হচ্ছে। তবে তিনি স্বীকার করেন, গ্রেপ্তার হলেই যে সহিংসতা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে–তা নিশ্চিত নয়। বিশেষ করে রাউজানে রাজনৈতিক দুটি গ্রুপের বিরোধে একাধিক হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলেও জানান তিনি।

‘ডেভিল হান্ট’ চললেও প্রশ্ন রয়েই গেছে

ডেভিল হান্ট অভিযানের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৩ ডিসেম্বর থেকে ২৩ দিনে এ অভিযানে ১৫ হাজার ৯ জন গ্রেপ্তার এবং ২১৮টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। এর আগে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চে চালানো অভিযানে গ্রেপ্তার হয় ১২ হাজারের বেশি।

এত বিপুল গ্রেপ্তারের পরও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কোনো উন্নতি নেই। সমালোচনা আছে, অপারেশন ডেভিল হান্ট মূলত রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েলে ব্যবহৃত হচ্ছে। বিশেষত কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরাই এ অভিযানের প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। ফলে অপরাপর অপরাধীরা অনেক সময় আইনের আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছে। বিশেষত দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে বিস্ফোরণ এবং সেই সূত্রে বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক জব্দের ঘটনায় এ সমালোচনা ব্যাপক আকার নিয়েছে।

আলোচিত কিছু হত্যাকাণ্ড

নতুন বছরের শুরুতেই দেশের বিভিন্ন জেলায় একাধিক হত্যাকাণ্ড হয়েছে। নারায়ণগঞ্জে রায়হান খানকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে, ফরিদপুরে অজ্ঞাত ব্যক্তিকে গলাকেটে, রাজধানীর বসুন্ধরায় আইনজীবী নাঈম কিবরিয়াকে পিটিয়ে এবং হাজারীবাগে শিপন নামের এক যুবককে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ ছাড়া সাভারে এক ব্যবসায়ীকে চোখ উপড়ে ও লিঙ্গ কর্তন করে হত্যা এবং মাগুরায় গাঁজা সেবনে বাধা দেওয়ায় টিটো মণ্ডল নামে এক যুবককে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

এদিকে রাজশাহী ও নাটোরের পদ্মা চরাঞ্চলে দুই দফায় গুলিতে সোহেল রানা নামে দুই যুবক নিহত হয়। এ ঘটনায় তাদের স্ত্রীও আহত হয়েছেন। যশোরে প্রকাশ্যে গুলি করে রানা প্রতাপকে হত্যা, নেত্রকোনায় গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার এবং ঢাকার কদমতলীতে ব্যবসায়ী শাহাব উদ্দিনকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনাও ঘটেছে। এসব ঘটনায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই পূর্বশত্রুতা ও আধিপত্য বিস্তারকে কারণ হিসেবে মনে করছে পুলিশ। তবে একের পর এক সহিংস ঘটনায় জনমনে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সারাদেশে ৩ হাজার ৭৮৫ জন খুন হয়। ২০২৪ সালে হত্যা মামলা দায়ের হয়েছিল ৩ হাজার ৪৩২টি। আর ২০২৩ সালে ৩ হাজার ২৩টি এবং ২০২২ সালে ৩ হাজার ১২৬টি।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পরিসংখ্যানও উদ্বেগজনক। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে রাজনৈতিক সহিংসতায় ১০২ জন নিহত ও ৪ হাজার ৭৪৫ জন আহত হয়। মোট সহিংস ঘটনার সংখ্যা ছিল ৪০১টি। সবচেয়ে বেশি সহিংসতার ঘটনা ঘটে রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি এবং মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের তথ্যেও রাজনৈতিক সহিংসতার ঊর্ধ্বমুখী চিত্র উঠে এসেছে।

হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) বলছে, গত বছর রাজনৈতিক সহিংসতায় ১২৩ জন এবং ২০২৩ সালে ৯৬ জন নিহত হয়। আহতের সংখ্যা পর্যায়ক্রমে ৭ হাজার ৫১১ ও ৯ হাজার ৩৭৯। আর মানবাধিকার সাংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের তথ্য বলছে, গত বছর রাজনৈতিক সংহিসতায় ৫৯৯টি ঘটনায় ৮৬ জন নিহত ও ৫ হাজার ৫১৮ জন আহত হয়, যার মধ্যে ৯৭ জনই গুলিবিদ্ধ হয়।

লুণ্ঠিত অস্ত্র বড় হুমকি

নির্বাচনের পরিবেশকে আরও ঝুঁকিতে ফেলছে পুলিশের লুণ্ঠিত অস্ত্র। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এখনো ১ হাজার ৩৩৩টি আগ্নেয়াস্ত্র ও আড়াই লাখের বেশি গুলি উদ্ধার হয়নি। এসব অস্ত্র নির্বাচনের সময় সহিংসতায় ব্যবহৃত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। সরকার একাধিকবার পুরস্কার ঘোষণা করলেও এখন পর্যন্ত লুণ্ঠিত অস্ত্র ও গোলাবারুদের সন্ধানে কার্যকর তথ্য পায়নি পুলিশ।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, গুলি, কোপাকুপি ও অবৈধ অস্ত্রের অবাধ প্রবাহ আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না এলে নির্বাচনী পরিবেশ আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠতে পারে।

এ বিষয়ে মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন চরচাকে বলেন, “সাম্প্রতিক সময়ে দেশজুড়ে যেভাবে গুলি, কোপাকুপি ও নৃশংস হত্যাকাণ্ড বাড়ছে, তা গভীরভাবে উদ্বেগজনক। বিশেষ করে নির্বাচনের প্রাক্কালে রাজনৈতিক নেতা-কর্মীসহ সাধারণ মানুষের প্রাণহানি প্রমাণ করে যে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। সহিংসতা ও অবৈধ অস্ত্রের অবাধ ব্যবহার শুধু মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে না। বরং গণতান্ত্রিক পরিবেশকেও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

লিটন বলেন, “এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে শুধু অভিযান নয়, কার্যকর তদন্ত, দোষীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা জরুরি। নির্বাচনকে সামনে রেখে যদি সহিংসতার লাগাম টানা না যায়, তাহলে ভোটারদের মধ্যে ভয় ও অনাস্থা আরও বাড়বে। মানবাধিকার রক্ষা এবং অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে এখনই রাষ্ট্রকে কঠোর ও জবাবদিহিমূলক পদক্ষেপ নিতে হবে।”

সম্পর্কিত