Advertisement Banner

পয়লা বৈশাখে নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্ক আর কত?

পয়লা বৈশাখে নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্ক আর কত?
‘মঙ্গল’ বাদ, ‘আনন্দ’ বাদ, এবার বাংলা নতুন বর্ষবরণে হবে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’। ছবি: সুদীপ্ত সালাম

পুরনো বছরের গ্লানি ঝেড়ে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খোলে পয়লা বৈশাখ। নতুন বছরের প্রথম দিন বাঙালি মেতে ওঠে উৎসবে। তবে উৎসবের এই ঔজ্জ্বল্যের আড়ালেই প্রতি বছর ফিরে আসে এক প্রশ্ন—নিরাপত্তার কোনো শঙ্কা নেই তো? এই আশঙ্কা পুরোপুরি কাটবে কবে?

২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল রাজধানীর রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে ভয়াবহ বোমা হামলার পর থেকে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ যেন স্থায়ী শঙ্কায় পরিণত হয়েছে। সেদিন নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ (হুজি) বাংলাদেশের বোমা হামলায় ১০ জন নিহত এবং অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হন।

হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দায়ের হওয়া দুই মামলার দীর্ঘ বিচার শেষে ২০১৪ সালের ২৩ জুন নিম্ন আদালত মুফতি হান্নানসহ আটজনের মৃত্যুদণ্ড ও ছয়জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। পরে হাইকোর্টের রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন করা হয়। সেই রক্তাক্ত স্মৃতি এখনো বৈশাখের আনন্দে বিষাদের ছায়া ফেলে।

এবারও ‘কঠোর নিরাপত্তা’

বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ উপলক্ষে রাজধানীসহ সারা দেশে নেওয়া হয়েছে বহুমাত্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, কয়েক স্তরে নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে। প্রতিটি অনুষ্ঠানস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনের পাশাপাশি থাকবে গোয়েন্দা নজরদারি, সাইবার মনিটরিং, টহল টিম, সিসিটিভি ক্যামেরা ও ড্রোন পর্যবেক্ষণ।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী জানিয়েছেন, রমনা পার্ক, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, হাতিরঝিল ও রবীন্দ্র সরোবরসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোর অনুষ্ঠান সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে শেষ করতে হবে। বিকাল ৫টার পর নতুন করে কাউকে অনুষ্ঠানস্থলে ঢুকতে দেওয়া হবে না। বৈশাখী শোভাযাত্রায় মুখোশ পরে অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মাঝপথে কেউ যোগ দিতে পারবে না।

নিরাপত্তার স্বার্থে ফানুস, আতশবাজি, গ্যাস বেলুন ও ভুভুজেলা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে আর্চওয়ে, ওয়াচ টাওয়ার, ডগ স্কোয়াড ও বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট থাকবে। ইভটিজিং ও ছিনতাই প্রতিরোধে সাদা পোশাকে গোয়েন্দা সদস্য ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনার কথাও জানানো হয়েছে। বড় আয়োজনগুলোতে ফায়ার সার্ভিস, অ্যাম্বুলেন্স ও মেডিকেল টিম প্রস্তুত থাকবে। রমনা লেকে থাকবে ডুবুরি দল।

সাধারণ মানুষকে ব্যাগ, দিয়াশলাই বা লাইটার না আনার অনুরোধ জানানো হয়েছে। শিশুদের সঙ্গে পরিচয়পত্র রাখার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্র সচিব বলেছেন, “উৎসব নিরাপদ রাখতে প্রশাসন সর্বাত্মক প্রস্তুত রয়েছে।”

কী বলছে র‍্যাব

র‍্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী জানিয়েছেন, পয়লা বৈশাখের মতো বড় জাতীয় আয়োজনে বাড়তি নিরাপত্তা নেওয়া নিয়মিত দায়িত্বের অংশ। চরচাকে তিনি বলেন, “সন্ত্রাসীরা কখন কোথায় অপচেষ্টা চালাবে তা আগে থেকে জানা যায় না। তাই সবসময় প্রস্তুত থাকতে হয়।”

তার ভাষ্য অনুযায়ী, এবার তিন স্তরের নিরাপত্তা নেওয়া হয়েছে। প্রথম স্তরে সারা দেশের বড় আয়োজনগুলোতে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে এবং স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে র‍্যাব মোতায়েন থাকবে।

দ্বিতীয় স্তরে রাজধানীর রমনা বটমূল ও আনন্দ শোভাযাত্রাকে ঘিরে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত রুটে স্ট্যাটিক চেকপোস্ট, প্রায় ৩০টি মোটরসাইকেল টহল টিম, ২০টি পিকআপ টিম, সাদা পোশাকে নজরদারি এবং পুলিশ, বিজিবি ও সেনাবাহিনীর সমন্বিত উপস্থিতি থাকবে। রমনা বটমূল এলাকায় কন্ট্রোল রুম স্থাপন করে সিসিটিভির মাধ্যমে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হবে।

তৃতীয় স্তরে ওয়াচ টাওয়ার ও ড্রোনের মাধ্যমে আকাশপথে নজরদারি থাকবে। অনুষ্ঠান শুরুর ৭২ ঘণ্টা আগে থেকেই র‍্যাবের সাইবার মনিটরিং টিম অনলাইন পর্যবেক্ষণ করবে। যাতে গুজব বা উসকানিমূলক প্রচারণা রোধ করা যায়।

নিরাপত্তা উদ্বেগ কাটবে কবে? এমন জিজ্ঞাসায় র‌্যাব কর্মকর্তা ইন্তেখাব চৌধুরী বলেন, “আশঙ্কা পুরোপুরি নির্মূল করা যায় না। অপরাধ ও অপতৎপরতা সবসময়ই কোনো না কোনোভাবে থাকবে। আমাদের কাজ হলো সেসব মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকা।”

বৃহৎ আয়োজন, তাই বাড়তি সতর্কতা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. আজহারুল ইসলাম শেখ চঞ্চল চরচাকে বলেন, “পয়লা বৈশাখ দেশের অন্যতম বৃহৎ জনসমাগমের আয়োজন। এখানে শিশু থেকে বৃদ্ধ—সব বয়সের মানুষ, নানা ধর্ম-বর্ণের মানুষ, এমনকি বিদেশি অতিথিরাও অংশ নেন। এত বড় আয়োজন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকা স্বাভাবিক।”

তার মতে, পয়লা বৈশাখকে ঘিরে সমাজে ভিন্নমত বা বিতর্ক থাকতে পারে। তবে ইতিহাস-ঐতিহ্য ও শিল্প-সংস্কৃতির গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বাড়লে ভুল ধারণা কমবে। এই শিক্ষক বলেন, “একটি জাতির পরিচয় তার শিল্প-সংস্কৃতিতে। বৈশাখী শোভাযাত্রার প্রতীকী উপস্থাপনার গভীরতা বুঝতে পারলে অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক কমে যাবে।”

দীর্ঘমেয়াদি সমাধান কী?

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের চেয়ারম্যান ও অধ্যাপক ড. মো. ওমর ফারুক চরচাকে বলেন, পয়লা বৈশাখ বাঙালির সাংস্কৃতিক চেতনার গভীরে প্রোথিত। তবে সমাজে কিছু উগ্র মতাদর্শী গোষ্ঠী এ উৎসবকে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখে। এই দ্বন্দ্বমূলক অবস্থান থেকেই অতীতে সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে।

এই অপরাধ বিশেষজ্ঞ বলেন, “কেবল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোরতায় দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব নয়। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক পরিমণ্ডলে অসাম্প্রদায়িক ও সাংস্কৃতিক চেতনার চর্চা জোরদার করতে হবে। নতুন প্রজন্মকে ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঠিক ব্যাখ্যা জানাতে হবে। অন্যথায় বিভ্রান্তি বা উগ্র ব্যাখ্যার প্রভাব বাড়তে পারে।”

রাজনৈতিক স্বার্থে এ ধরনের ইস্যু ব্যবহার হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, “পয়লা বৈশাখ বাঙালির একটি সর্বজনীন উৎসব। অতীতে কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে। সেই অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে আমরা নিরাপত্তা জোরদার করেছি, যাতে মানুষ স্বস্তিতে উৎসব উপভোগ করতে পারেন।”

ডিবি প্রধান জানান, নিরাপত্তার পাশাপাশি ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাতেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মানুষ যেন যানজটের ভোগান্তি ছাড়াই চলাচল করতে পারেন, ছিনতাই বা চুরির শঙ্কা ছাড়া রাত পর্যন্ত ঘোরাফেরা করতে পারেন—সেই লক্ষ্যেই পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

নিরাপত্তা উদ্বেগ প্রসঙ্গে পুলিশর এই কর্মকর্তা বলেন, “উদ্বেগ পুরোপুরি অমূলক নয়। তবে গণতন্ত্র সুসংহত হলে, মানুষের মানসিকতায় ইতিবাচক পরিবর্তন এলে এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বাড়লে এ ধরনের শঙ্কা কমে আসবে।”

উৎসব বনাম আতঙ্ক

প্রতি বছর পয়লা বৈশাখের আগে কঠোর নিরাপত্তা, সতর্কতা ও বিধিনিষেধের ঘোষণা একদিকে প্রশাসনের প্রস্তুতির বার্তা দেয়। অন্যদিকে, মনে করিয়ে দেয় সম্ভাব্য ঝুঁকির কথাও। প্রশ্ন উঠতেই পারে, উৎসব ছাপিয়ে কি আতঙ্কই স্থায়ী হচ্ছে?

নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, তাৎক্ষণিক ঝুঁকি মোকাবিলায় কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা জরুরি। তবে দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক সচেতনতা, সাংস্কৃতিক শিক্ষার প্রসার এবং উগ্রবাদবিরোধী ঐক্যবদ্ধ অবস্থান প্রয়োজন। উৎসবের নিরাপত্তা কেবল বাহিনীর দায়িত্ব নয়, এটি সামগ্রিক সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয়। তাই পয়লা বৈশাখের মূল সুর-ঐক্য, সহনশীলতা ও মানবিকতা-বাস্তব জীবনে প্রতিষ্ঠিত হলে, নিরাপত্তা আতঙ্কও একদিন অতীত হতে পারে।

অবশ্য এবারের পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে রাজধানীতে জঙ্গি হামলা বা বড় ধরনের কোনো নিরাপত্তা শঙ্কা নেই বলে জানিয়েছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মো. সরওয়ার। রোববার বিকেলে রমনা বটমূলে নিরাপত্তা পরিদর্শন শেষে তিনি জানিয়েছেন, বর্ষবরণ উৎসবকে কেন্দ্র করে ঢাকা মহানগরকে ৯টি মূল সেক্টর ও ১৪টি উপ-সেক্টরে ভাগ করে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এছাড়া গুজব রোধে সাইবার পেট্রোলিং জোরদার করা হয়েছে এবং সন্দেহজনক কিছু দেখলে দ্রুত পুলিশকে জানানোর আহ্বানও জানিয়েছেন এই পুলিশ কর্মকর্তা।

সম্পর্কিত