পর্ব-৩
ফজলুল কবির

আগের পর্বেই দেশে নারী নিপীড়নের ক্রমবৃদ্ধির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতি বছর শতশত নারী ও কন্যাশিশু ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার মতো নিপীড়নের মুখোমুখি হচ্ছে। যৌন নিপীড়নের সংখ্যাকে এর সঙ্গে যুক্ত করলে, সংখ্যাটি ভয়াবহ মাত্রায় পৌঁছায়। কিন্তু কেন এত নিপীড়ন? কেন এত ধর্ষণ?
উত্তর খুঁজতে গেলে তাকাতে হবে সমাজের একেবারে ভেতরে। কারণ, আগের পর্বেই বলা হয়েছে–দেশে ধর্ষণের মতো অপরাধের স্বাভাবিকীকরণের পাশাপাশি এর প্রতিবাদের ভাষা-ভঙ্গি ইত্যাদিরও একটি সাধারণ প্রবণতা তৈরি হয়েছে। কিন্তু একের পর এক ঘটনা এবং এর কোনো কোনোটিতে মানুষের ফুঁসে ওঠাও অপরাধ কমাতে পারেনি। নারীর প্রান্তিকীকরণ যেন চড়ে বসেছে দ্রুতরথে। এ যেন থামার নয়।
এই ধর্ষণসহ নারীর বিরুদ্ধে যে যৌন সহিংসতা, তা বৃদ্ধির বহু কারণ সমাজতাত্ত্বিকেরা বলেছেন, বলছেন। আমরাও এক রকম গোল হয়ে বসে শুনছি সেই কবে থেকে। বুঝছি বা বোঝার ভান করছি। কিন্তু কাঠামোটি বদলাবার কোনো চেষ্টা করছি না। এই নিশ্চেষ্ট ভূমিকাই এই প্রান্তিকরণের পালে দিচ্ছে জোর হাওয়া।
ঠিক কী কী কারণে নারীর প্রতি সহিংসতা বাড়ছে? এমন প্রশ্ন তুললে সঙ্গে সঙ্গেই একগাদা উত্তর ছুটে আসবে। এর মধ্যে থাকবে–বিচারহীনতার সংস্কৃতি বা দীর্ঘসূত্রি বিচার, পুরুষ বাদে অন্য লৈঙ্গিক পরিচয়কে দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রণির নাগরিক হিসেবে বিবেচনা, সমাজ ও রাষ্ট্রের পৌরষিক সত্তাসহ আরও অনেক কিছু। তত্ত্বীয় আলোচনায় অনেকে হয়তো পুরুষতন্ত্রকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে একটা বেশ বাচিক বয়ান হাজির করবেন। কিন্তু তাতে পুরুষতন্ত্রের মুখোশ যেমন খসে পড়ে না, তেমনি সমাজের নানা স্তরকে সুশ্রুষার যাত্রাটিও শুরু হয় না। অনেকটা পুঁথিবদ্ধ জ্ঞানের মতোই থেকে যায় বিষয়টি।
আমরা যদি ধরে নিই যে, বাংলাদেশে একটি ধর্ষণের সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, তবে এর পেছনের কারণগুলোকে খুঁজতে হবে বিদ্যমান সমাজ ও সংস্কৃতির ভিতে দাঁড়িয়েই।
অনেকেই প্রশ্ন তোলেন–আমাদের সমাজ কি ভেঙে পড়েছে? একরাশ হতাশা নিয়ে এর প্রমাণ হিসেবে হাজির করা হয়, যদি সমাজ ভেঙেই না পড়ে তবে প্রতিবেশীর কাছে শিশু সন্তানেরা নিরাপদ থাকবে না কেন? যৌক্তিক প্রশ্ন বটে। কিন্তু একইসঙ্গে এই প্রশ্নও তো তোলা যায় যে, সমাজ তো একটা আছে, আর সমাজের ধর্মই তো হলো নতুন নতুন রূপ নেওয়া। ফলে মূল প্রশ্নটি আসলে হওয়া উচিত–আমরা কোন সমাজ নির্মাণ করলাম?
হ্যাঁ, ‘নির্মাণ করলাম’ কথাটাই বলা উচিত। কিন্তু এটা সহজে কেউ বলে না কেন? এখানেই আছে সংকট থেকে মুখ ফিরিয়ে ইউটোপিয়ায় বা অতীত স্থিতিতে আত্মপ্রসাদ লাভের প্রবণতা। কারণ, সমাজ ভেঙে পড়েছে–এমন দাবি বা অভিযোগ তুললে সেই অভিযোগ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখা যায় এবং বিদ্যমান সমাজের ক্লেদ থেকে নিজেকে অনেকটা মুক্ত থেকে সব দায় গা থেকে ঝেড়ে ফেলা যায়। কিন্তু এই ধর্ষণের সংস্কৃতির চলমানতায় দাঁড়িয়ে ‘কোন সমাজ নির্মাণ করলাম’–প্রশ্নটি তুললে আর যাই হোক দায় মোছা যায় না। কারণ, এই নির্মাতার তালিকায় তখন ‘আমি’ সত্তাটিও ঢুকে পড়ে। বিপরীতে প্রথম প্রশ্নটি অনেকটাই গা-বাঁচানো। কারণ, ওই প্রশ্নটি বলে যে, এই যে ক্লেদে ভরা, বর্জ্যে ডুবে যাওয়া সমাজ–এটি থেকে ‘আমি’ বিযুক্ত। ‘আমি’ তখন হয়ে পড়ে অন্য কোনো কাঠামোর, অন্য কোনো আদর্শ সমাজে বাস করা বা অন্য কোনো সমাজের প্রস্তাবক সত্তায়। এর মধ্য দিয়ে বিদ্যমান সমাজের অংশ হিসেবে সে নিজেকে অস্বীকার করে এবং পরোক্ষে সমাজের অন্য সহনাগরিকের ওপর এর জীর্ণতার দায় চাপায়। এভাবে প্রতিবাদকারী থেকে শুরু করে সকল সমালোচক বা সোচ্চার কণ্ঠ নিজেকে আলগোছে দায়িত্বের জায়গা থেকে সরিয়ে নেয়।
প্রথমে বোঝা যাক ধর্ষণ সংস্কৃতি বলতে আসলে কী বোঝায়? একটা সমাজে ধর্ষণ সংস্কৃতি গেঁড়ে বসেছে তখনই বলা হয়, যখন কোনো সমাজে ধর্ষণের মতো অপরাধ ও এ রকম ধারণাটি স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। কথা হলো–বাংলাদেশে কি এই ‘ধর্ষণ সংস্কৃতি’ তৈরি হয়েছে আসলেই?
উত্তরের জন্য আবারও আগের পর্বে উল্লিখিত আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) পরিসংখ্যানে চোখ বোলানোর অনুরোধ করব। একইসঙ্গে এও মনে রাখতে বলব যে, এই পরিসংখ্যানে সবচেয়ে কম ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার সংখ্যাটিও ৫ শতাধিক। আর তা আবার ২০২৪ সালে, যে বছর গণঅভ্যুত্থান ও তৎপরবর্তী নানা সংকটের কারণে নথিবদ্ধ তথ্য ছিল অপ্রতুল। এর আগের সবচেয়ে কম যে সংখ্যা, তা ২০১৪ সালের। ওই বছর এমন সংখ্যা ছিল ৬২৬টি। এখানে মনে রাখতে বলব যে, এটি শুধু ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার পরিসংখ্যান এবং আসকের এই প্রতিবেদন নথিভুক্ত ঘটনার প্রেক্ষাপটে তৈরি। আর বাংলাদেশে ধর্ষণসহ যৌন সহিংসতার ঘটনার ১০ শতাংশেরও কম নথিভুক্ত হয়। ফলে বাকি ৯০ শতাংশ আমাদের অগোচরে থেকে যায়। এবার হিসাব করুন, আসলে দিনে কতটি ঘটনা ঘটছে?
চোখ কচলে নিন। এবার বলুন যে, বাংলাদেশে কি ‘ধর্ষণ সংস্কৃতি’ আছে, নাকি নেই? সৎভাবে উত্তর দিতে পারলে ‘হ্যাঁ’ ছাড়া আর কিছু পাবেন না নিশ্চিত। কিন্তু কেন এই ‘ধর্ষণ সংস্কৃতি’, কীভাবে তৈরি হলো এটি? এটা কি হঠাৎ করেই সামনে এসেছে?
সোজা উত্তর–না। হঠাৎ করে সামনে আসেনি। একটি সমাজে ‘ধর্ষণ সংস্কৃতি’ একদিনে তৈরি হয় না। এর জন্য দীর্ঘদিনের অবহেলা, উপেক্ষার দরকার পড়ে। অনাচারের আচারে রূপান্তরের মতো বিষয়গুলো তো হুট করে হয় না। এটা এমন না যে, একদিন ঘুম ভেঙেই দেখলেন–কী আজিব সব এমন কেন?

কোনো দেশে বা কোনো সমাজে ‘ধর্ষণ সংস্কৃতি’ আছে কি না, তা বুঝতে হলে সমাজটির দিকে তাকাতে হয়। তাকিয়ে কী দেখবেন? এ ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞরা একটি পিরামিডের কথা বলেন। ‘রেপ কালচার’ বা ধর্ষণ সংস্কৃতি আছে কি নেই, তা এই পিরামিডের নানা স্তরের নানা বিষয়াদির দিকে তাকালে নিজেই বিচার করতে পারবেন। কী থাকে এই পিরামিডে?
এই পিরামিডের একেবারে নিচে রয়েছে–ভিকটিমাইজেশন বা সামাজিক নিগ্রহ। কী থাকে এতে? পীড়নমূলক আচরণ, ‘ছেলেরা এমনই’, ভুক্তভোগীকে দোষারোপ, যৌনগন্ধী কৌতুক, আচরণ ইত্যাদির মধ্য দিয়ে। এই পর্যায় শুরু হয় শারীরিক নয়; কিন্তু ক্ষতিকারক আচরণ দিয়ে এবং ধীরে ধীরে আক্রমণাত্মক ও হিংসাত্মক আচরণের দিকে অগ্রসর হয়। এ ক্ষেত্রে যৌন রসাত্মক কৌতুক, রাস্তায় শিষ দেওয়া বা কটূক্তি করা, যাকে বলে ইভটিজিং, চরিত্রহনন বা স্লাট শেমিং, ভুক্তভোগীকে দোষারোপ এবং বৈষম্যের নানাবিধ রূপ। এই আচরণগুলোকে আমরা সেভাবে ক্ষতিকারক বলেই মনে করি না। কেউ এ নিয়ে প্রশ্ন তুললে বরং পাল্টা প্রশ্ন তোলা হয়, তার ঔদার্য নিয়েই। কোনো বিশেষ রসিকতা নিয়ে আপনি যখন ভ্রু কুঁচকাবেন, অপরপক্ষ আপনাকে অনায়াসেই ‘বেরসিক’ আখ্যা দিয়ে দেবে। এই রসিকতা বড় ভয়ানক জেনেও আপনি হয়তো চুপ করে গেলেন–কারণ, কে আর যেচে বেরসিক হতে চায় বলুন। সমাজের অধিকাংশই একে স্বাভাবিকভাবেই দেখে। ইদানীং ফ্লার্টিংয়ের নামে এক ধরনের আচরণকে যারপরনাই ছাড় দেওয়া হয়, যার কোনো কোনোটি এই খাতাতেই পড়ে বইকি।
পিরামিডে এই স্তরটি পেরিয়ে ওপরের স্তরে গেলেই দেখা পাবেন সেসব ঘটনার, যাকে সমাজের কিছু অংশ ক্ষতিকর বলে মানে। এ স্তরে আছে–অনুমতি ছাড়া শরীরের সংবেদনশীল অংশ প্রদর্শন, সম্মতিহীন যৌন ছবি বা কনটেন্ট ছড়িয়ে দেওয়া, কাউকে ‘অসাবধানতাবশত’ স্পর্শ করা এবং শ্লীলতাহানি। এসব আচরণ ক্ষতিকর বলে সমাজের একটা পর্যায় পর্যন্ত এক ধরনের সম্মতি থাকলেও অনেকেই এসব আচরণ নিয়ে কোনো হইচই হলে যথারীতি ‘ভিকটিম ব্লেমিংয়ের’ মতো অস্ত্রটি নিয়ে হাজির হয়। কারণ, পিরামিডের দ্বিতীয় বা মধ্যবর্তী স্তরে আপনি উঠলেন মানে যে, ভিত্তি স্তরটি হাপিস হয়ে গেল, তা তো নয়। ফলে মধ্যবর্তী স্তরে আপনি আছেন, মানে ভিত্তির সবগুলো চিহ্নসহই আছেন। ফলে এ ক্ষেত্রে সমাজের সেই অংশকে ভীষণভাবে সক্রিয় দেখতে পাবেন, যারা এগুলোকে কোনো রকম অপরাধই মনে করে না। এ কারণেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীকে হয়রানির পর আটক ব্যক্তিকে শাহবাগ থানা থেকে একদল লোককে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করতে দেখা যায়।
আর শীর্ষ স্তরে রয়েছে অবশ্যই ধর্ষণের মতো অপরাধ। ধর্ষণ, ধর্ষণচেষ্টা ও ধর্ষণের পর হত্যা–এসব এই স্তরেই ঘটে। যখন কোনো সমাজে এ ধরনের অপরাধ বেড়ে যায়, তখন বুঝতে হবে সমাজটি ‘রেপ কালচার’ পিরামিডের সবগুলো স্তর অতিক্রম করেছে। এবার বলুন–বাংলাদেশে ‘ধর্ষণ সংস্কৃতি’ আছে নাকি নেই?

যদি উত্তর ‘হ্যাঁ’ পান, তবে ভাবুন–আপনি এই পিরামিডের কোথায় আছেন? আপনার নিরীহ কৌতুক, আপনার রসবোধ এবং তা প্রকাশের ভঙ্গি, আপনার দৃষ্টি কেমন? অন্য কারও এ ধরনের আচরণের প্রতি আপনি সমর্থন দিচ্ছেন কি? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে বাস্তব জীবনে নানা চর্চায়, আচরণে, অন্যের ইনবক্সে দেওয়া আপনার টেক্সট বা ছবিতে, ক্ষুব্ধ অবস্থায় আপনার দেওয়া পোস্টে, আপনার ব্যবহৃত ছবি ও কথায়, আপনার ভাষাভঙ্গি ও ভাষার সঙ্গে জড়িত দেহভঙ্গিতে কতটা যৌনতা লেপ্টে আছে, আর সেই লেপ্টে থাকা যৌনতা আপনার পার্শ্ববর্তী নারীকে বা অন্য লিঙ্গের মানুষকে বস্তুতে রূপান্তর করছে কি? যদি এসবের উত্তর ‘হ্যাঁ’ হয় কিংবা এর উত্তর দিতে গিয়ে দ্বিধায় ভোগেন, নিজেকে নিয়ে নিশ্চিত হতে না পারেন, তাহলে স্থির হয়ে একবার বসুন। আজ যে ধর্ষণের প্রতিবাদে আপনি সোচ্চার–তার ক্ষেত্রটি প্রস্ততে, সে ধরনের একটি সংস্কৃতি নির্মাণে সম্ভবত আপনিও ভূমিকা রাখছেন–হতে পারে অজ্ঞাতেই। ফলে একটু আয়নার সামনে দাঁড়ান। দাাঁড়াবেন কি? দাঁড়ালেই দেখবেন, যে সমাজটা নষ্ট হয়ে গেছে বা যাচ্ছে বলে প্রায়ই একরাশ হতাশা বাতাসে ছুড়ে দেন, যে সমাজটা ভেঙে গেছে বলে নিত্য করেন হা-পিত্যেশ, তার নষ্ট হওয়া বা ভেঙে পড়ার তো বটেই, এই কদর্য সমাজটার অন্যতম নির্মাতা আপনিও।
চলবে…
লেখক: বার্তা সম্পাদক, চরচা

আগের পর্বেই দেশে নারী নিপীড়নের ক্রমবৃদ্ধির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতি বছর শতশত নারী ও কন্যাশিশু ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার মতো নিপীড়নের মুখোমুখি হচ্ছে। যৌন নিপীড়নের সংখ্যাকে এর সঙ্গে যুক্ত করলে, সংখ্যাটি ভয়াবহ মাত্রায় পৌঁছায়। কিন্তু কেন এত নিপীড়ন? কেন এত ধর্ষণ?
উত্তর খুঁজতে গেলে তাকাতে হবে সমাজের একেবারে ভেতরে। কারণ, আগের পর্বেই বলা হয়েছে–দেশে ধর্ষণের মতো অপরাধের স্বাভাবিকীকরণের পাশাপাশি এর প্রতিবাদের ভাষা-ভঙ্গি ইত্যাদিরও একটি সাধারণ প্রবণতা তৈরি হয়েছে। কিন্তু একের পর এক ঘটনা এবং এর কোনো কোনোটিতে মানুষের ফুঁসে ওঠাও অপরাধ কমাতে পারেনি। নারীর প্রান্তিকীকরণ যেন চড়ে বসেছে দ্রুতরথে। এ যেন থামার নয়।
এই ধর্ষণসহ নারীর বিরুদ্ধে যে যৌন সহিংসতা, তা বৃদ্ধির বহু কারণ সমাজতাত্ত্বিকেরা বলেছেন, বলছেন। আমরাও এক রকম গোল হয়ে বসে শুনছি সেই কবে থেকে। বুঝছি বা বোঝার ভান করছি। কিন্তু কাঠামোটি বদলাবার কোনো চেষ্টা করছি না। এই নিশ্চেষ্ট ভূমিকাই এই প্রান্তিকরণের পালে দিচ্ছে জোর হাওয়া।
ঠিক কী কী কারণে নারীর প্রতি সহিংসতা বাড়ছে? এমন প্রশ্ন তুললে সঙ্গে সঙ্গেই একগাদা উত্তর ছুটে আসবে। এর মধ্যে থাকবে–বিচারহীনতার সংস্কৃতি বা দীর্ঘসূত্রি বিচার, পুরুষ বাদে অন্য লৈঙ্গিক পরিচয়কে দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রণির নাগরিক হিসেবে বিবেচনা, সমাজ ও রাষ্ট্রের পৌরষিক সত্তাসহ আরও অনেক কিছু। তত্ত্বীয় আলোচনায় অনেকে হয়তো পুরুষতন্ত্রকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে একটা বেশ বাচিক বয়ান হাজির করবেন। কিন্তু তাতে পুরুষতন্ত্রের মুখোশ যেমন খসে পড়ে না, তেমনি সমাজের নানা স্তরকে সুশ্রুষার যাত্রাটিও শুরু হয় না। অনেকটা পুঁথিবদ্ধ জ্ঞানের মতোই থেকে যায় বিষয়টি।
আমরা যদি ধরে নিই যে, বাংলাদেশে একটি ধর্ষণের সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, তবে এর পেছনের কারণগুলোকে খুঁজতে হবে বিদ্যমান সমাজ ও সংস্কৃতির ভিতে দাঁড়িয়েই।
অনেকেই প্রশ্ন তোলেন–আমাদের সমাজ কি ভেঙে পড়েছে? একরাশ হতাশা নিয়ে এর প্রমাণ হিসেবে হাজির করা হয়, যদি সমাজ ভেঙেই না পড়ে তবে প্রতিবেশীর কাছে শিশু সন্তানেরা নিরাপদ থাকবে না কেন? যৌক্তিক প্রশ্ন বটে। কিন্তু একইসঙ্গে এই প্রশ্নও তো তোলা যায় যে, সমাজ তো একটা আছে, আর সমাজের ধর্মই তো হলো নতুন নতুন রূপ নেওয়া। ফলে মূল প্রশ্নটি আসলে হওয়া উচিত–আমরা কোন সমাজ নির্মাণ করলাম?
হ্যাঁ, ‘নির্মাণ করলাম’ কথাটাই বলা উচিত। কিন্তু এটা সহজে কেউ বলে না কেন? এখানেই আছে সংকট থেকে মুখ ফিরিয়ে ইউটোপিয়ায় বা অতীত স্থিতিতে আত্মপ্রসাদ লাভের প্রবণতা। কারণ, সমাজ ভেঙে পড়েছে–এমন দাবি বা অভিযোগ তুললে সেই অভিযোগ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখা যায় এবং বিদ্যমান সমাজের ক্লেদ থেকে নিজেকে অনেকটা মুক্ত থেকে সব দায় গা থেকে ঝেড়ে ফেলা যায়। কিন্তু এই ধর্ষণের সংস্কৃতির চলমানতায় দাঁড়িয়ে ‘কোন সমাজ নির্মাণ করলাম’–প্রশ্নটি তুললে আর যাই হোক দায় মোছা যায় না। কারণ, এই নির্মাতার তালিকায় তখন ‘আমি’ সত্তাটিও ঢুকে পড়ে। বিপরীতে প্রথম প্রশ্নটি অনেকটাই গা-বাঁচানো। কারণ, ওই প্রশ্নটি বলে যে, এই যে ক্লেদে ভরা, বর্জ্যে ডুবে যাওয়া সমাজ–এটি থেকে ‘আমি’ বিযুক্ত। ‘আমি’ তখন হয়ে পড়ে অন্য কোনো কাঠামোর, অন্য কোনো আদর্শ সমাজে বাস করা বা অন্য কোনো সমাজের প্রস্তাবক সত্তায়। এর মধ্য দিয়ে বিদ্যমান সমাজের অংশ হিসেবে সে নিজেকে অস্বীকার করে এবং পরোক্ষে সমাজের অন্য সহনাগরিকের ওপর এর জীর্ণতার দায় চাপায়। এভাবে প্রতিবাদকারী থেকে শুরু করে সকল সমালোচক বা সোচ্চার কণ্ঠ নিজেকে আলগোছে দায়িত্বের জায়গা থেকে সরিয়ে নেয়।
প্রথমে বোঝা যাক ধর্ষণ সংস্কৃতি বলতে আসলে কী বোঝায়? একটা সমাজে ধর্ষণ সংস্কৃতি গেঁড়ে বসেছে তখনই বলা হয়, যখন কোনো সমাজে ধর্ষণের মতো অপরাধ ও এ রকম ধারণাটি স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। কথা হলো–বাংলাদেশে কি এই ‘ধর্ষণ সংস্কৃতি’ তৈরি হয়েছে আসলেই?
উত্তরের জন্য আবারও আগের পর্বে উল্লিখিত আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) পরিসংখ্যানে চোখ বোলানোর অনুরোধ করব। একইসঙ্গে এও মনে রাখতে বলব যে, এই পরিসংখ্যানে সবচেয়ে কম ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার সংখ্যাটিও ৫ শতাধিক। আর তা আবার ২০২৪ সালে, যে বছর গণঅভ্যুত্থান ও তৎপরবর্তী নানা সংকটের কারণে নথিবদ্ধ তথ্য ছিল অপ্রতুল। এর আগের সবচেয়ে কম যে সংখ্যা, তা ২০১৪ সালের। ওই বছর এমন সংখ্যা ছিল ৬২৬টি। এখানে মনে রাখতে বলব যে, এটি শুধু ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার পরিসংখ্যান এবং আসকের এই প্রতিবেদন নথিভুক্ত ঘটনার প্রেক্ষাপটে তৈরি। আর বাংলাদেশে ধর্ষণসহ যৌন সহিংসতার ঘটনার ১০ শতাংশেরও কম নথিভুক্ত হয়। ফলে বাকি ৯০ শতাংশ আমাদের অগোচরে থেকে যায়। এবার হিসাব করুন, আসলে দিনে কতটি ঘটনা ঘটছে?
চোখ কচলে নিন। এবার বলুন যে, বাংলাদেশে কি ‘ধর্ষণ সংস্কৃতি’ আছে, নাকি নেই? সৎভাবে উত্তর দিতে পারলে ‘হ্যাঁ’ ছাড়া আর কিছু পাবেন না নিশ্চিত। কিন্তু কেন এই ‘ধর্ষণ সংস্কৃতি’, কীভাবে তৈরি হলো এটি? এটা কি হঠাৎ করেই সামনে এসেছে?
সোজা উত্তর–না। হঠাৎ করে সামনে আসেনি। একটি সমাজে ‘ধর্ষণ সংস্কৃতি’ একদিনে তৈরি হয় না। এর জন্য দীর্ঘদিনের অবহেলা, উপেক্ষার দরকার পড়ে। অনাচারের আচারে রূপান্তরের মতো বিষয়গুলো তো হুট করে হয় না। এটা এমন না যে, একদিন ঘুম ভেঙেই দেখলেন–কী আজিব সব এমন কেন?

কোনো দেশে বা কোনো সমাজে ‘ধর্ষণ সংস্কৃতি’ আছে কি না, তা বুঝতে হলে সমাজটির দিকে তাকাতে হয়। তাকিয়ে কী দেখবেন? এ ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞরা একটি পিরামিডের কথা বলেন। ‘রেপ কালচার’ বা ধর্ষণ সংস্কৃতি আছে কি নেই, তা এই পিরামিডের নানা স্তরের নানা বিষয়াদির দিকে তাকালে নিজেই বিচার করতে পারবেন। কী থাকে এই পিরামিডে?
এই পিরামিডের একেবারে নিচে রয়েছে–ভিকটিমাইজেশন বা সামাজিক নিগ্রহ। কী থাকে এতে? পীড়নমূলক আচরণ, ‘ছেলেরা এমনই’, ভুক্তভোগীকে দোষারোপ, যৌনগন্ধী কৌতুক, আচরণ ইত্যাদির মধ্য দিয়ে। এই পর্যায় শুরু হয় শারীরিক নয়; কিন্তু ক্ষতিকারক আচরণ দিয়ে এবং ধীরে ধীরে আক্রমণাত্মক ও হিংসাত্মক আচরণের দিকে অগ্রসর হয়। এ ক্ষেত্রে যৌন রসাত্মক কৌতুক, রাস্তায় শিষ দেওয়া বা কটূক্তি করা, যাকে বলে ইভটিজিং, চরিত্রহনন বা স্লাট শেমিং, ভুক্তভোগীকে দোষারোপ এবং বৈষম্যের নানাবিধ রূপ। এই আচরণগুলোকে আমরা সেভাবে ক্ষতিকারক বলেই মনে করি না। কেউ এ নিয়ে প্রশ্ন তুললে বরং পাল্টা প্রশ্ন তোলা হয়, তার ঔদার্য নিয়েই। কোনো বিশেষ রসিকতা নিয়ে আপনি যখন ভ্রু কুঁচকাবেন, অপরপক্ষ আপনাকে অনায়াসেই ‘বেরসিক’ আখ্যা দিয়ে দেবে। এই রসিকতা বড় ভয়ানক জেনেও আপনি হয়তো চুপ করে গেলেন–কারণ, কে আর যেচে বেরসিক হতে চায় বলুন। সমাজের অধিকাংশই একে স্বাভাবিকভাবেই দেখে। ইদানীং ফ্লার্টিংয়ের নামে এক ধরনের আচরণকে যারপরনাই ছাড় দেওয়া হয়, যার কোনো কোনোটি এই খাতাতেই পড়ে বইকি।
পিরামিডে এই স্তরটি পেরিয়ে ওপরের স্তরে গেলেই দেখা পাবেন সেসব ঘটনার, যাকে সমাজের কিছু অংশ ক্ষতিকর বলে মানে। এ স্তরে আছে–অনুমতি ছাড়া শরীরের সংবেদনশীল অংশ প্রদর্শন, সম্মতিহীন যৌন ছবি বা কনটেন্ট ছড়িয়ে দেওয়া, কাউকে ‘অসাবধানতাবশত’ স্পর্শ করা এবং শ্লীলতাহানি। এসব আচরণ ক্ষতিকর বলে সমাজের একটা পর্যায় পর্যন্ত এক ধরনের সম্মতি থাকলেও অনেকেই এসব আচরণ নিয়ে কোনো হইচই হলে যথারীতি ‘ভিকটিম ব্লেমিংয়ের’ মতো অস্ত্রটি নিয়ে হাজির হয়। কারণ, পিরামিডের দ্বিতীয় বা মধ্যবর্তী স্তরে আপনি উঠলেন মানে যে, ভিত্তি স্তরটি হাপিস হয়ে গেল, তা তো নয়। ফলে মধ্যবর্তী স্তরে আপনি আছেন, মানে ভিত্তির সবগুলো চিহ্নসহই আছেন। ফলে এ ক্ষেত্রে সমাজের সেই অংশকে ভীষণভাবে সক্রিয় দেখতে পাবেন, যারা এগুলোকে কোনো রকম অপরাধই মনে করে না। এ কারণেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীকে হয়রানির পর আটক ব্যক্তিকে শাহবাগ থানা থেকে একদল লোককে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করতে দেখা যায়।
আর শীর্ষ স্তরে রয়েছে অবশ্যই ধর্ষণের মতো অপরাধ। ধর্ষণ, ধর্ষণচেষ্টা ও ধর্ষণের পর হত্যা–এসব এই স্তরেই ঘটে। যখন কোনো সমাজে এ ধরনের অপরাধ বেড়ে যায়, তখন বুঝতে হবে সমাজটি ‘রেপ কালচার’ পিরামিডের সবগুলো স্তর অতিক্রম করেছে। এবার বলুন–বাংলাদেশে ‘ধর্ষণ সংস্কৃতি’ আছে নাকি নেই?

যদি উত্তর ‘হ্যাঁ’ পান, তবে ভাবুন–আপনি এই পিরামিডের কোথায় আছেন? আপনার নিরীহ কৌতুক, আপনার রসবোধ এবং তা প্রকাশের ভঙ্গি, আপনার দৃষ্টি কেমন? অন্য কারও এ ধরনের আচরণের প্রতি আপনি সমর্থন দিচ্ছেন কি? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে বাস্তব জীবনে নানা চর্চায়, আচরণে, অন্যের ইনবক্সে দেওয়া আপনার টেক্সট বা ছবিতে, ক্ষুব্ধ অবস্থায় আপনার দেওয়া পোস্টে, আপনার ব্যবহৃত ছবি ও কথায়, আপনার ভাষাভঙ্গি ও ভাষার সঙ্গে জড়িত দেহভঙ্গিতে কতটা যৌনতা লেপ্টে আছে, আর সেই লেপ্টে থাকা যৌনতা আপনার পার্শ্ববর্তী নারীকে বা অন্য লিঙ্গের মানুষকে বস্তুতে রূপান্তর করছে কি? যদি এসবের উত্তর ‘হ্যাঁ’ হয় কিংবা এর উত্তর দিতে গিয়ে দ্বিধায় ভোগেন, নিজেকে নিয়ে নিশ্চিত হতে না পারেন, তাহলে স্থির হয়ে একবার বসুন। আজ যে ধর্ষণের প্রতিবাদে আপনি সোচ্চার–তার ক্ষেত্রটি প্রস্ততে, সে ধরনের একটি সংস্কৃতি নির্মাণে সম্ভবত আপনিও ভূমিকা রাখছেন–হতে পারে অজ্ঞাতেই। ফলে একটু আয়নার সামনে দাঁড়ান। দাাঁড়াবেন কি? দাঁড়ালেই দেখবেন, যে সমাজটা নষ্ট হয়ে গেছে বা যাচ্ছে বলে প্রায়ই একরাশ হতাশা বাতাসে ছুড়ে দেন, যে সমাজটা ভেঙে গেছে বলে নিত্য করেন হা-পিত্যেশ, তার নষ্ট হওয়া বা ভেঙে পড়ার তো বটেই, এই কদর্য সমাজটার অন্যতম নির্মাতা আপনিও।
চলবে…
লেখক: বার্তা সম্পাদক, চরচা