সাইরুল ইসলাম

বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে এখনো গাছের নিচে বা মাটির ওপর দাগ কেটে অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে ‘বাঘবন্দী’ খেলতে দেখা যায়। যদিও আজকাল এই দৃশ্য বিরল। অনেকেই ছেলেবেলায় এই খেলা খেলেছেন। প্রচণ্ড গরমে গাছের নিচে বসে খেলা হতো বাঘবন্দী। আবার বৃষ্টির দিন বাইরে অন্য কোনো খেলার সুযোগ না থাকলে ঘরের কোণা বা বারান্দায় বসেও খেলা হতো।
একদিকে ক্ষীপ্র ও আক্রমণাত্মক ২টি (কোনো কোনো এলাকায় ৪টি) বাঘ; অন্যদিকে সংখ্যায় ভারী কিন্তু এককভাবে দুর্বল ২৪ কিংবা ৩২টি ছাগল। বাঘের লক্ষ্য ছাগল শিকার করা। আর ছাগলের লক্ষ্য বাঘগুলোকে চারদিক থেকে এমনভাবে অবরুদ্ধ করা, যেন তারা আর নড়াচড়া করতে না পারে। নেপালেও এই ধরনের খেলা রয়েছে, নাম ‘বাঘ ছাল’। প্রায় একই ধরনের হলেও নিয়মে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে সেখানে।
এ খেলায় বেশিরভাগ সময়ই বাঘের জয় হয়। কারণ প্রতি লাফে একটি করে ছাগল শিকার করতে পারে সে। এভাবে ছাগল কমে গেলে বাঘই জিতে যায়। কিন্তু একটু বুদ্ধি খাটিয়ে খেলতে পারলে বাঘকে বন্দী করে ফেলা যায়। বেশিরভাগ সময় যেটা হয়–এ খেলায় একটা অচলাবস্থা চলে আসে, যেখানে বাঘেরও নড়াচড়া করার জায়গা থাকে, আবার ছাগলও টিকে থাকে। ওই সময় বাঘ নিজেকে জয়ী দাবি করলেও আসলে জয়ী ছাগল।
গাণিতিক ও কৌশলগত গবেষণায় দেখা গেছে, দুই পক্ষই যদি দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দেখায়, তবে এই খেলার পরিণতি সবসময় ড্র বা অমীমাংসিত ছকে গিয়ে ঠেকে।
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে ঠিক এই বাঘবন্দী খেলাই চলছে এক বিশাল ক্যানভাসে। যেখানে ‘বাঘ’ হিসেবে অবতীর্ণ হয়েছে মার্কিন-ইসরায়েল অক্ষ এবং ‘ছাগল’ হিসেবে নিজেদের প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা তৈরি করেছে ইরান ও তার প্রতিরোধ অক্ষ। তারা বাঘবন্দী খেলার মতো বাঘকে শিকার থেকে অব্যাহত রাখতে সক্ষম হয়েছে।
বাঘের প্রথম থাবা
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি আমেরিকা ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের ওপর একটি বিশাল বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করে, যার সামরিক নাম দেওয়া হয় ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স ও সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার তৎকালীন প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই হামলায় ইরানের পারমাণবিক অবকাঠামো, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির কারখানা এবং সামরিক ঘাঁটিগুলোকে নিখুঁত নিশানা করা হয়। এমনকি এই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হন, যা ইরানের জন্য ছিল একটি প্রচণ্ড ধাক্কা।
প্রথম কয়েক সপ্তাহে মনে হচ্ছিল, আধুনিক প্রযুক্তিতে বলীয়ান ‘বাঘ’ বুঝি খেলাটি একতরফা জিতে যাবে। ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে ফেলা হয়েছিল এবং তাদের প্রথাগত নৌবাহিনীও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
কিন্তু ‘বাঘবন্দী’ খেলার একটি মূল নিয়ম হলো–বাঘ যদি তার শক্তির দম্ভে অন্ধ হয়ে বোর্ডের এদিক-ওদিক ছুটে গিয়ে কেবল ছাগল শিকার করতে থাকে, তবে একপর্যায়ে সে নিজের অজান্তেই ছাগলের তৈরি ফাঁদে অবরুদ্ধ বা ‘বন্দী’ হয়ে পড়ে।
যেভাবে চাল দিল ইরান
ইরানের বিগত দুই দশকের সামরিক কৌশলটি কোনো প্রথাগত বাঘের মতো ছিল না। তারা মূলত বোর্ডে ছাগল সাজানোর মতো করে পুরো মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে একটি ‘নিরাপত্তা মোজাইক’ বা নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে। লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুতি এবং ইরাক ও সিরিয়ার শিয়া মিলিশিয়া গ্রুপগুলো হলো এই বোর্ডের একেকটি নিখুঁত ছাগলের ঘুঁটি।
সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই-এর বিশ্লেষণ অনুসারে, ইরানের মূল ভূখণ্ডের জাগ্রোস পর্বতমালার ভূপ্রকৃতি এবং মাটির গভীরে ছড়িয়ে থাকা সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্কের কারণে মার্কিন-ইসরায়েল অক্ষ ইরানকে চূড়ান্ত ধরাশায়ী করতে পারেনি। উল্টো ইরান ও তার প্রক্সি শক্তিগুলো অত্যন্ত কৌশলে পাল্টা চাল দেয়।

হরমুজ প্রণালি কার্যকরভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়, যা বিশ্ববাজারের ২০-২৫ শতাংশ তেলের সরবরাহকে স্থবির করে দেয়। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তীব্র অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) সদস্য রাষ্ট্রগুলো (যেমন সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), কাতার, সৌদি আরব) মার্কিন-ইসরায়েল জোটকে ঘাঁটি ব্যবহার করতে দিলেও তারা ইরানের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হয়। বাঘবন্দী খেলার ভাষায়, বাঘ ও ছাগলের মাঝখানে পড়ে এই অঞ্চলের অন্য রাষ্ট্রগুলো একটি বড় সংকটে রূপ নেয়।
অমীমাংসিত সমাপ্তি
সংবাদমাধ্যম এশিয়া টাইমস বলছে, এই যুদ্ধে ইরানকে টিকিয়ে রাখতে পেছন থেকে পরোক্ষ অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক ও প্রযুক্তিগত লাইফলাইন দিয়েছে রাশিয়া ও চীন। ফলস্বরূপ, এপ্রিলে যুদ্ধবিরতি যখন কার্যকর হয়, ততক্ষণে পরিষ্কার হয়ে যায় যে–কোনো পক্ষই জয়ী হতে পারেনি। বিপুল জানমালের ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করেও ইরান তার অবস্থান ধরে রেখেছে। আর মার্কিন-ইসরায়েল জোট সর্বাধুনিক অস্ত্র ব্যবহার করেও ইরানকে তাদের শর্ত মানতে বাধ্য করতে পারেনি।
বাঘবন্দী খেলা ও ভূ-রাজনৈতিক শিক্ষা
এ সংক্রান্ত এক প্রতিবেদনে এশিয়া টাইমস কিছু রাজনৈতিক শিক্ষার কথা উল্লেখ করেছে। নেপালেও বাঘবন্দীর মতো একটি খেলা রয়েছে। নেপালের ওই খেলার সঙ্গে তুলনা করে এশিয়া টাইমসের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা শিক্ষাগুলো হলো–
১. সামরিক শ্রেষ্ঠত্বই শেষ কথা নয়: অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্য থাকার পরও মার্কিন-ইসরায়েল অক্ষ ইরানকে তাদের কাঙ্ক্ষিত আত্মসমর্পণ করাতে পারেনি।
২. সহনশীলতাই ক্ষমতার নতুন রূপ: বাঘবন্দী খেলায় ছাগল যেমন কামড়াতে পারে না, কিন্তু নিজের জায়গায় শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে বাঘের পথ রোধ করে; ইরানের ক্ষেত্রেও বিপুল অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক আঘাত সয়ে টিকে থাকার দেওয়ালটিই বড় অস্ত্র হিসেবে কাজ করেছে।
৩. বোর্ডের নিয়ন্ত্রণই আসল: কতজন শত্রু সেনা নিহত হলো তার চেয়ে বড় বিষয় হলো–আঞ্চলিক ভূখণ্ডের কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ কার হাতে রয়েছে। ইরান তার প্রক্সি ও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বোর্ডের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
‘বাঘবন্দী’; বাংলাদেশের এই পুরনো খেলাটির ভেতরেই লুকিয়ে আছে ভূ-রাজনীতির এক চিরন্তন সত্য। যুদ্ধের শুরুতে যাকে অনেক বেশি শক্তিশালী ও বিজয়ী মনে হয়, রণকৌশল ও সঠিক সিদ্ধান্তের অভাবে দিনশেষে সে-ই চারদিক থেকে অবরুদ্ধ বা ‘বন্দী’ হয়ে পরাজয় বরণ করতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের বুকে বাঘেরা গর্জন করেছিল ঠিকই, কিন্তু ছাগলেরা তাদের থাবা আটকে দিয়েছে। ফলে খেলাটি আপাতত একটি ঐতিহাসিক ‘ড্র’-তেই রয়েছে বলে মনে হচ্ছে, বাঘবন্দী খেলায় বেশিরভাগ সময় যেটি হয়ে থাকে। তবে এই ড্র–কে বাঘ নিজের জয় হিসেবে জাহির করছে। কিন্তু আসল জয়টা হয়েছে ছাগলের, যারা বাঘকে আর শিকার করতে দিচ্ছে না।

বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে এখনো গাছের নিচে বা মাটির ওপর দাগ কেটে অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে ‘বাঘবন্দী’ খেলতে দেখা যায়। যদিও আজকাল এই দৃশ্য বিরল। অনেকেই ছেলেবেলায় এই খেলা খেলেছেন। প্রচণ্ড গরমে গাছের নিচে বসে খেলা হতো বাঘবন্দী। আবার বৃষ্টির দিন বাইরে অন্য কোনো খেলার সুযোগ না থাকলে ঘরের কোণা বা বারান্দায় বসেও খেলা হতো।
একদিকে ক্ষীপ্র ও আক্রমণাত্মক ২টি (কোনো কোনো এলাকায় ৪টি) বাঘ; অন্যদিকে সংখ্যায় ভারী কিন্তু এককভাবে দুর্বল ২৪ কিংবা ৩২টি ছাগল। বাঘের লক্ষ্য ছাগল শিকার করা। আর ছাগলের লক্ষ্য বাঘগুলোকে চারদিক থেকে এমনভাবে অবরুদ্ধ করা, যেন তারা আর নড়াচড়া করতে না পারে। নেপালেও এই ধরনের খেলা রয়েছে, নাম ‘বাঘ ছাল’। প্রায় একই ধরনের হলেও নিয়মে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে সেখানে।
এ খেলায় বেশিরভাগ সময়ই বাঘের জয় হয়। কারণ প্রতি লাফে একটি করে ছাগল শিকার করতে পারে সে। এভাবে ছাগল কমে গেলে বাঘই জিতে যায়। কিন্তু একটু বুদ্ধি খাটিয়ে খেলতে পারলে বাঘকে বন্দী করে ফেলা যায়। বেশিরভাগ সময় যেটা হয়–এ খেলায় একটা অচলাবস্থা চলে আসে, যেখানে বাঘেরও নড়াচড়া করার জায়গা থাকে, আবার ছাগলও টিকে থাকে। ওই সময় বাঘ নিজেকে জয়ী দাবি করলেও আসলে জয়ী ছাগল।
গাণিতিক ও কৌশলগত গবেষণায় দেখা গেছে, দুই পক্ষই যদি দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দেখায়, তবে এই খেলার পরিণতি সবসময় ড্র বা অমীমাংসিত ছকে গিয়ে ঠেকে।
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে ঠিক এই বাঘবন্দী খেলাই চলছে এক বিশাল ক্যানভাসে। যেখানে ‘বাঘ’ হিসেবে অবতীর্ণ হয়েছে মার্কিন-ইসরায়েল অক্ষ এবং ‘ছাগল’ হিসেবে নিজেদের প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা তৈরি করেছে ইরান ও তার প্রতিরোধ অক্ষ। তারা বাঘবন্দী খেলার মতো বাঘকে শিকার থেকে অব্যাহত রাখতে সক্ষম হয়েছে।
বাঘের প্রথম থাবা
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি আমেরিকা ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের ওপর একটি বিশাল বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করে, যার সামরিক নাম দেওয়া হয় ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স ও সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার তৎকালীন প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই হামলায় ইরানের পারমাণবিক অবকাঠামো, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির কারখানা এবং সামরিক ঘাঁটিগুলোকে নিখুঁত নিশানা করা হয়। এমনকি এই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হন, যা ইরানের জন্য ছিল একটি প্রচণ্ড ধাক্কা।
প্রথম কয়েক সপ্তাহে মনে হচ্ছিল, আধুনিক প্রযুক্তিতে বলীয়ান ‘বাঘ’ বুঝি খেলাটি একতরফা জিতে যাবে। ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে ফেলা হয়েছিল এবং তাদের প্রথাগত নৌবাহিনীও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
কিন্তু ‘বাঘবন্দী’ খেলার একটি মূল নিয়ম হলো–বাঘ যদি তার শক্তির দম্ভে অন্ধ হয়ে বোর্ডের এদিক-ওদিক ছুটে গিয়ে কেবল ছাগল শিকার করতে থাকে, তবে একপর্যায়ে সে নিজের অজান্তেই ছাগলের তৈরি ফাঁদে অবরুদ্ধ বা ‘বন্দী’ হয়ে পড়ে।
যেভাবে চাল দিল ইরান
ইরানের বিগত দুই দশকের সামরিক কৌশলটি কোনো প্রথাগত বাঘের মতো ছিল না। তারা মূলত বোর্ডে ছাগল সাজানোর মতো করে পুরো মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে একটি ‘নিরাপত্তা মোজাইক’ বা নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে। লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুতি এবং ইরাক ও সিরিয়ার শিয়া মিলিশিয়া গ্রুপগুলো হলো এই বোর্ডের একেকটি নিখুঁত ছাগলের ঘুঁটি।
সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই-এর বিশ্লেষণ অনুসারে, ইরানের মূল ভূখণ্ডের জাগ্রোস পর্বতমালার ভূপ্রকৃতি এবং মাটির গভীরে ছড়িয়ে থাকা সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্কের কারণে মার্কিন-ইসরায়েল অক্ষ ইরানকে চূড়ান্ত ধরাশায়ী করতে পারেনি। উল্টো ইরান ও তার প্রক্সি শক্তিগুলো অত্যন্ত কৌশলে পাল্টা চাল দেয়।

হরমুজ প্রণালি কার্যকরভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়, যা বিশ্ববাজারের ২০-২৫ শতাংশ তেলের সরবরাহকে স্থবির করে দেয়। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তীব্র অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) সদস্য রাষ্ট্রগুলো (যেমন সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), কাতার, সৌদি আরব) মার্কিন-ইসরায়েল জোটকে ঘাঁটি ব্যবহার করতে দিলেও তারা ইরানের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হয়। বাঘবন্দী খেলার ভাষায়, বাঘ ও ছাগলের মাঝখানে পড়ে এই অঞ্চলের অন্য রাষ্ট্রগুলো একটি বড় সংকটে রূপ নেয়।
অমীমাংসিত সমাপ্তি
সংবাদমাধ্যম এশিয়া টাইমস বলছে, এই যুদ্ধে ইরানকে টিকিয়ে রাখতে পেছন থেকে পরোক্ষ অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক ও প্রযুক্তিগত লাইফলাইন দিয়েছে রাশিয়া ও চীন। ফলস্বরূপ, এপ্রিলে যুদ্ধবিরতি যখন কার্যকর হয়, ততক্ষণে পরিষ্কার হয়ে যায় যে–কোনো পক্ষই জয়ী হতে পারেনি। বিপুল জানমালের ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করেও ইরান তার অবস্থান ধরে রেখেছে। আর মার্কিন-ইসরায়েল জোট সর্বাধুনিক অস্ত্র ব্যবহার করেও ইরানকে তাদের শর্ত মানতে বাধ্য করতে পারেনি।
বাঘবন্দী খেলা ও ভূ-রাজনৈতিক শিক্ষা
এ সংক্রান্ত এক প্রতিবেদনে এশিয়া টাইমস কিছু রাজনৈতিক শিক্ষার কথা উল্লেখ করেছে। নেপালেও বাঘবন্দীর মতো একটি খেলা রয়েছে। নেপালের ওই খেলার সঙ্গে তুলনা করে এশিয়া টাইমসের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা শিক্ষাগুলো হলো–
১. সামরিক শ্রেষ্ঠত্বই শেষ কথা নয়: অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্য থাকার পরও মার্কিন-ইসরায়েল অক্ষ ইরানকে তাদের কাঙ্ক্ষিত আত্মসমর্পণ করাতে পারেনি।
২. সহনশীলতাই ক্ষমতার নতুন রূপ: বাঘবন্দী খেলায় ছাগল যেমন কামড়াতে পারে না, কিন্তু নিজের জায়গায় শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে বাঘের পথ রোধ করে; ইরানের ক্ষেত্রেও বিপুল অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক আঘাত সয়ে টিকে থাকার দেওয়ালটিই বড় অস্ত্র হিসেবে কাজ করেছে।
৩. বোর্ডের নিয়ন্ত্রণই আসল: কতজন শত্রু সেনা নিহত হলো তার চেয়ে বড় বিষয় হলো–আঞ্চলিক ভূখণ্ডের কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ কার হাতে রয়েছে। ইরান তার প্রক্সি ও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বোর্ডের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
‘বাঘবন্দী’; বাংলাদেশের এই পুরনো খেলাটির ভেতরেই লুকিয়ে আছে ভূ-রাজনীতির এক চিরন্তন সত্য। যুদ্ধের শুরুতে যাকে অনেক বেশি শক্তিশালী ও বিজয়ী মনে হয়, রণকৌশল ও সঠিক সিদ্ধান্তের অভাবে দিনশেষে সে-ই চারদিক থেকে অবরুদ্ধ বা ‘বন্দী’ হয়ে পরাজয় বরণ করতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের বুকে বাঘেরা গর্জন করেছিল ঠিকই, কিন্তু ছাগলেরা তাদের থাবা আটকে দিয়েছে। ফলে খেলাটি আপাতত একটি ঐতিহাসিক ‘ড্র’-তেই রয়েছে বলে মনে হচ্ছে, বাঘবন্দী খেলায় বেশিরভাগ সময় যেটি হয়ে থাকে। তবে এই ড্র–কে বাঘ নিজের জয় হিসেবে জাহির করছে। কিন্তু আসল জয়টা হয়েছে ছাগলের, যারা বাঘকে আর শিকার করতে দিচ্ছে না।