রিতু চক্রবর্ত্তী

দ্রুত গতিতে হর্ন বাজিয়ে চলে যাচ্ছে বাস। ব্যস্ত মানুষের চলাচল, কোথাও তাকানোর ফুরসৎ নেই। সাভার। এই রাস্তার পাশেই এই যে মুষ্টিবদ্ধ হাত। কে তাকাবে এর দিকে? কার এত সময়?
এই মুষ্টিবদ্ধ হাত যে কথা বলতে চায়–তা শুনবার কান কারও নেই! ১,১৩৬ মরদেহ। পিষ্ট, ভেঙে যাওয়া, গলিতও কেউ কেউ। অধরচন্দ্র বিদ্যালয়। মনে পড়ে? এই ১,১৩৬ সৌধ হয়ে গেছে। পরিত্যক্ত, প্রায় অলক্ষ্যে থাকা এক সৌধ। শ্রমিকদের কে আর মনে রাখে?
নাজিম হিকমত বলেছিলেন, বিংশ শতাব্দীতে শোকের বয়স বড়জোর এক বছর। আর এ তো এখন একবিংশ শতাব্দী। সোশ্যাল মিডিয়ার যুগ। শোক ও স্মরণ এখন শুধু একটা ক্ষণিকের স্ট্যাটাসের ব্যাপার।
শোক নেই। ফুরিয়ে গেছে। কিন্তু স্মরণ হয়তো কেউ কেউ করবে। কেউ তবু রানা প্লাজার নামটা নেবে। মনে করিয়ে দেবে হয়তো–এই আজকের এই দিনেই প্রচণ্ড অবহেলা ও উপেক্ষায় কর্মমুখর ১১৩৬ শ্রমিক পিষ্ট হয়ে মরে গিয়েছিল।
প্রাকৃতিক দূর্যোগের দেশ বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে মানবসৃষ্ট যত ট্র্যাজেডি ঘটে গেছে, তার একেবারে শুরুর দিকে থাকবে ২০১৩ সালের রানা প্লাজা ভবন ধস। একে একে ১৩ বছর পার হয়ে গেছে। ১৩ বছর পার হয়ে গেলেও এই বিপর্যয়ের উল্লেখমাত্র নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের যে কারোর জন্যই যেন এক বিশাল অস্বস্তি।
কারো কারোর মতে বাংলাদেশ তো এরপরে অনেকটা পথ পেরিয়েছে, দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে শিল্পক্ষেত্রে। এতে অবশ্য দ্বিমতের সুযোগ নেই যে, দৃশ্যমান পরিবর্তন অবশ্যই হয়েছে। শুধু তৈরি পোশাক খাতেই দেখানো যাবে বেশ কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন। এই যেমন, আগের চেয়ে কমপ্লায়েন্স ফ্যাক্টরির সংখ্যা বা গ্রিন ফ্যাক্টরির সংখ্যা বেড়েছে।
তৈরি পোশাক খাতের অগ্নি, বিদ্যুৎ এবং ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তায় দৃশ্যত ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। তবে রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির ১৩ বছর পেরিয়ে গেলেও অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনার বিষয়টি আজও চরমভাবে উপেক্ষিত। এমনকি একটি মামলাতেও এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত রায় দিতে পারেনি কোনো আদালত। দুর্ঘটনার পর জরুরি মানবিক সাহায্য মিললেও ইতিহাসের এই ভয়াবহতম বিপর্যয়ে ক্ষতিগ্রস্তরা আইনিভাবে প্রাপ্য প্রকৃত ক্ষতিপূরণ থেকে এখনো বঞ্চিত।

রানা প্লাজার ঘটনায় ১,১৩৬ জন মানুষ নিহত হয়েছেন। আরো ২,৪৩৮ জন হয়েছেন পঙ্গু। সেইসাথে এই ঘটনায় বেঁচে ফেরাদেরকে জীবনভর ট্রমার মধ্যে রেখে গেছে। এদের একজন জীবন নাহার। রানা প্লাজা ট্রাজেডির স্মৃতি এখনো তার চোখে স্পষ্ট ভাসে। চরচাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “এখনো ওই দিনের কথা মনে পড়লে দু–এক রাত ঘুমাতে পারি না। চোখ বন্ধ করলেই মনে হয়, আবারও ধসে পড়ছে সবকিছু।”
এখন প্রশ্ন হলো এত কিছু পরিবর্তনের যে দাবি করা হয়, তার মধ্যে আদৌ কি কোনো সারবস্তু আছে? ঠিক আগের বছর, মাসের হিসাবে ৬ মাসও হবে না–তাজরিন ফ্যাশনসে অগ্নিকাণ্ডে শতাধিক শ্রমিক নিহত হয়, আটকা পড়ে, শুধু জরুরি নির্গমণ পথে কলাপসিবল গেট বন্ধ থাকার কারণে। তখনো সবাই খুব গম্ভীর মুখ করে বসেছিল। শ্রমিকদের দাবির বিপরীতে একের পর এক এসেছিল সরকারি প্রেসনোট, শোকবার্তা। কিন্তু কিছুই বদলায়নি। এই না বদলানোর প্রমাণ রয়েছে রানা প্লাজার হাজারের বেশি মৃত চোখে।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও শ্রমিক নেতা জলি তালুকদারের বলেন, “তাজরিন গার্মেন্টসের মালিক তো গেট বন্ধ করে দিয়েছিল।”
রানা প্লাজা তাই শুধু রানা প্লাজা নয়। ১৩ বছরেও এমন বেশ কিছু ঘটনা ঘটে গেছে, যা সত্যিই কোনো পরিবর্তন হলে ঘটার কথাই নয়। কিন্তু ঘটছে। নিয়মিত বিরতিতেই। এবং প্রাথমিক উত্তেজনা ও আহাজারির পর কারো কোনো রা ছাড়াই।
এ নিয়ে জলি তালুকদার বলেন, “সরকারের সাথে মালিকদের একটা ঘনিষ্ট সমন্বয় থাকে। ঘটনাগুলো ঘটার পর যে ধরনের শাস্তি পাওয়ার কথা, তারা তা পায় না। তারা ঘুরে বেড়াচ্ছে। সবাই এক ধরনের জামিন পেয়ে গেছে। তাজরিনের বেলায় বারবার বলেছে সাক্ষি নেই। অথচ তাজরিনের শ্রমিকেরা কিন্তু প্রেসক্লাবের সামনে দীর্ঘদিন লড়াই করেছে।” জলির ভাষায়–এটা সরকারের একটা চরম গাফিলতির বিষয়।
একই প্রশ্নে উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ মাহা মির্জা বলেন, “সরকারের ভেতরেই তো প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরা থাকেন।”
দ্য ডেইলি স্টারের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, বর্তমানে রানা প্লাজা সংক্রান্ত মোট ১৪টি মামলা ঝুলে আছে। কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (ডিআইএফই) ভবন ও কারখানা মালিকসহ ১৪ জনের বিরুদ্ধে শ্রম আদালতে ১১টি মামলা করেছিল। অভিযুক্তদের মধ্যে ১১ জনই পলাতক, আর বাকি তিনজনকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। ২০১৩ সালে করা তিনটি ফৌজদারি মামলার বিচারকাজও ঝুলে আছে। রাজউকের করা একটি মামলা বর্তমানে ঢাকার অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বিচারাধীন। দণ্ডবিধির অধীনে করা অন্য দুটি মামলার চার্জশিট জমা হলেও কার্যক্রম পরবর্তী তারিখের অপেক্ষায় থমকে আছে।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) ও বাংলাদেশে বিদ্যমান শ্রম আইন আমাদের শ্রমিকদের তাহলে কী সুরক্ষা দিচ্ছে–এই প্রশ্নে মাহা মির্জা বলেন, “আইন থাকলেও যে আইনের প্রয়োগ হয় না, তার ক্ল্যাসিক এক্সামপল বাংলাদেশ। কোনো সরকারই পারেনি কারণ, ব্যবসায়ীরা খুবই প্রভাবশালী।”
জলি তালুকদার মনে করেন শ্রমিকদের সুরক্ষা দেওয়ার জন্য আইএলও কনভেনশন ঠিক থাকলেও বাংলাদেশের শ্রম আইন পর্যাপ্ত নয়। তিনি জানান, আইএলও কনভেনশন অনুযায়ী কোনো শ্রমিক যদি ২৫ বছর বয়সে কারখানায় নিহত হয়, তাহলে তিনি তার কর্মক্ষমতা যত বছর থাকার কথা, সে অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ পাবে। কিন্তু দেশে বিদ্যমান শ্রম আইন অনুযায়ী সেই ক্ষতিপুরণের পরিমাণ অনেক কম।
ট্রেড ইউনিয়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “এমনও হয় যে, তারাই ট্রেড ইউনিয়নের অনুমতি পায়, যারা মালিকপক্ষের সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত।” এ ক্ষেত্রে আবার শ্রম আইন আমাদের সংবিধানের সাথেও সাংঘর্ষিক বলে মনে করেন তিনি। তিনি বলেন, “সংবিধান সংগঠিত হওয়ার অধিকার দেয়। কিন্তু শ্রম আইন অনুযায়ী কোনো ফ্যাক্টরির ২০ শতাংশ শ্রমিক না হলে তারা ট্রেড ইউনিয়ন গঠন করতে পারে না। আবার যে কয়েক হাজার ট্রেড ইউনিয়ন আছে, তাদের অধিকাংশেরই গনতান্ত্রিক চর্চা নাই। বড় ফ্যাক্টরিতে ট্রেড ইউনিয়নের কোনো ফাংশন নেই, ছোটোগুলোর কথা তো বাদই দিলাম।”
এতকিছুর পরও আমাদের শ্রমিকরা নিজেদের অধিকার আদায় করে নিতে পারে না। আর তার প্রমাণ আমরা দেখি প্রতিটা ঘটনার পর। ঝুকিপূর্ণ ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে কাজ করতে তারা বাধ্য হয়। এই জায়গায় তারা কোনো ধরনের ব্ল্যাকমেইলের শিকার হয় কি না, জানতে চাইলে মাহা মির্জা বলেন, “আমাদের প্রয়োজনের তুলনায় উদ্বৃত্ত শ্রম থাকায় শ্রমিকরা কাজ নিয়ে অনিরাপত্তায় থাকে। শ্রমিকেরা ছাটাইয়ের ভয়ে তটস্থ থাকে।”
বাংলাদেশে যেহেতু চাকরি অত্যন্ত দুর্লভ, তাই শ্রমিকরা তাদের অধিকার আদায়ে আওয়াজ তুলতে ভয় পায়। মাহা মির্জা বাংলাদেশের কর্ম পরিবেশকে ‘শ্রমিক অবান্ধব পরিবেশ’ বলেন।
যা হোক, ফিরে যাই রানা প্লাজার ঘটনায়। দ্য ডেইলি স্টারে প্রকাশিত এক নিবন্ধে বলা হয়, রানা প্লাজার পর প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে জমা পড়া ১২৭ কোটি টাকার মধ্যে বড় একটি অংশের (প্রায় ৮৫ কোটি টাকা) কোনো হদিস আজও মেলেনি।
শ্রম আইন ২০০৬-এ মৃত্যুর জন্য মাত্র ২ লাখ এবং স্থায়ী পঙ্গুত্বের জন্য আড়াই লাখ টাকার যে সীমা রয়েছে, তা বর্তমান সময়ে অত্যন্ত নগণ্য। তখন থেকে ২০ বছরে বেড়েছে নিত্যপণ্যের দাম, বেড়েছে জিডিপি। এমনকি বেড়েছে জীবনযাত্রার মান। কিন্তু শ্রমিকের জীবনের দাম ২০ বছরেও বাড়েনি। আর তাই হয়তো কাঠামোগত হত্যার শিকার শ্রমিকদের স্মৃতিতে সাভারে নির্মিত স্মৃতি সৌধও অযত্নে পড়ে থাকে।

দ্রুত গতিতে হর্ন বাজিয়ে চলে যাচ্ছে বাস। ব্যস্ত মানুষের চলাচল, কোথাও তাকানোর ফুরসৎ নেই। সাভার। এই রাস্তার পাশেই এই যে মুষ্টিবদ্ধ হাত। কে তাকাবে এর দিকে? কার এত সময়?
এই মুষ্টিবদ্ধ হাত যে কথা বলতে চায়–তা শুনবার কান কারও নেই! ১,১৩৬ মরদেহ। পিষ্ট, ভেঙে যাওয়া, গলিতও কেউ কেউ। অধরচন্দ্র বিদ্যালয়। মনে পড়ে? এই ১,১৩৬ সৌধ হয়ে গেছে। পরিত্যক্ত, প্রায় অলক্ষ্যে থাকা এক সৌধ। শ্রমিকদের কে আর মনে রাখে?
নাজিম হিকমত বলেছিলেন, বিংশ শতাব্দীতে শোকের বয়স বড়জোর এক বছর। আর এ তো এখন একবিংশ শতাব্দী। সোশ্যাল মিডিয়ার যুগ। শোক ও স্মরণ এখন শুধু একটা ক্ষণিকের স্ট্যাটাসের ব্যাপার।
শোক নেই। ফুরিয়ে গেছে। কিন্তু স্মরণ হয়তো কেউ কেউ করবে। কেউ তবু রানা প্লাজার নামটা নেবে। মনে করিয়ে দেবে হয়তো–এই আজকের এই দিনেই প্রচণ্ড অবহেলা ও উপেক্ষায় কর্মমুখর ১১৩৬ শ্রমিক পিষ্ট হয়ে মরে গিয়েছিল।
প্রাকৃতিক দূর্যোগের দেশ বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে মানবসৃষ্ট যত ট্র্যাজেডি ঘটে গেছে, তার একেবারে শুরুর দিকে থাকবে ২০১৩ সালের রানা প্লাজা ভবন ধস। একে একে ১৩ বছর পার হয়ে গেছে। ১৩ বছর পার হয়ে গেলেও এই বিপর্যয়ের উল্লেখমাত্র নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের যে কারোর জন্যই যেন এক বিশাল অস্বস্তি।
কারো কারোর মতে বাংলাদেশ তো এরপরে অনেকটা পথ পেরিয়েছে, দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে শিল্পক্ষেত্রে। এতে অবশ্য দ্বিমতের সুযোগ নেই যে, দৃশ্যমান পরিবর্তন অবশ্যই হয়েছে। শুধু তৈরি পোশাক খাতেই দেখানো যাবে বেশ কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন। এই যেমন, আগের চেয়ে কমপ্লায়েন্স ফ্যাক্টরির সংখ্যা বা গ্রিন ফ্যাক্টরির সংখ্যা বেড়েছে।
তৈরি পোশাক খাতের অগ্নি, বিদ্যুৎ এবং ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তায় দৃশ্যত ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। তবে রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির ১৩ বছর পেরিয়ে গেলেও অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনার বিষয়টি আজও চরমভাবে উপেক্ষিত। এমনকি একটি মামলাতেও এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত রায় দিতে পারেনি কোনো আদালত। দুর্ঘটনার পর জরুরি মানবিক সাহায্য মিললেও ইতিহাসের এই ভয়াবহতম বিপর্যয়ে ক্ষতিগ্রস্তরা আইনিভাবে প্রাপ্য প্রকৃত ক্ষতিপূরণ থেকে এখনো বঞ্চিত।

রানা প্লাজার ঘটনায় ১,১৩৬ জন মানুষ নিহত হয়েছেন। আরো ২,৪৩৮ জন হয়েছেন পঙ্গু। সেইসাথে এই ঘটনায় বেঁচে ফেরাদেরকে জীবনভর ট্রমার মধ্যে রেখে গেছে। এদের একজন জীবন নাহার। রানা প্লাজা ট্রাজেডির স্মৃতি এখনো তার চোখে স্পষ্ট ভাসে। চরচাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “এখনো ওই দিনের কথা মনে পড়লে দু–এক রাত ঘুমাতে পারি না। চোখ বন্ধ করলেই মনে হয়, আবারও ধসে পড়ছে সবকিছু।”
এখন প্রশ্ন হলো এত কিছু পরিবর্তনের যে দাবি করা হয়, তার মধ্যে আদৌ কি কোনো সারবস্তু আছে? ঠিক আগের বছর, মাসের হিসাবে ৬ মাসও হবে না–তাজরিন ফ্যাশনসে অগ্নিকাণ্ডে শতাধিক শ্রমিক নিহত হয়, আটকা পড়ে, শুধু জরুরি নির্গমণ পথে কলাপসিবল গেট বন্ধ থাকার কারণে। তখনো সবাই খুব গম্ভীর মুখ করে বসেছিল। শ্রমিকদের দাবির বিপরীতে একের পর এক এসেছিল সরকারি প্রেসনোট, শোকবার্তা। কিন্তু কিছুই বদলায়নি। এই না বদলানোর প্রমাণ রয়েছে রানা প্লাজার হাজারের বেশি মৃত চোখে।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও শ্রমিক নেতা জলি তালুকদারের বলেন, “তাজরিন গার্মেন্টসের মালিক তো গেট বন্ধ করে দিয়েছিল।”
রানা প্লাজা তাই শুধু রানা প্লাজা নয়। ১৩ বছরেও এমন বেশ কিছু ঘটনা ঘটে গেছে, যা সত্যিই কোনো পরিবর্তন হলে ঘটার কথাই নয়। কিন্তু ঘটছে। নিয়মিত বিরতিতেই। এবং প্রাথমিক উত্তেজনা ও আহাজারির পর কারো কোনো রা ছাড়াই।
এ নিয়ে জলি তালুকদার বলেন, “সরকারের সাথে মালিকদের একটা ঘনিষ্ট সমন্বয় থাকে। ঘটনাগুলো ঘটার পর যে ধরনের শাস্তি পাওয়ার কথা, তারা তা পায় না। তারা ঘুরে বেড়াচ্ছে। সবাই এক ধরনের জামিন পেয়ে গেছে। তাজরিনের বেলায় বারবার বলেছে সাক্ষি নেই। অথচ তাজরিনের শ্রমিকেরা কিন্তু প্রেসক্লাবের সামনে দীর্ঘদিন লড়াই করেছে।” জলির ভাষায়–এটা সরকারের একটা চরম গাফিলতির বিষয়।
একই প্রশ্নে উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ মাহা মির্জা বলেন, “সরকারের ভেতরেই তো প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরা থাকেন।”
দ্য ডেইলি স্টারের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, বর্তমানে রানা প্লাজা সংক্রান্ত মোট ১৪টি মামলা ঝুলে আছে। কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (ডিআইএফই) ভবন ও কারখানা মালিকসহ ১৪ জনের বিরুদ্ধে শ্রম আদালতে ১১টি মামলা করেছিল। অভিযুক্তদের মধ্যে ১১ জনই পলাতক, আর বাকি তিনজনকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। ২০১৩ সালে করা তিনটি ফৌজদারি মামলার বিচারকাজও ঝুলে আছে। রাজউকের করা একটি মামলা বর্তমানে ঢাকার অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বিচারাধীন। দণ্ডবিধির অধীনে করা অন্য দুটি মামলার চার্জশিট জমা হলেও কার্যক্রম পরবর্তী তারিখের অপেক্ষায় থমকে আছে।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) ও বাংলাদেশে বিদ্যমান শ্রম আইন আমাদের শ্রমিকদের তাহলে কী সুরক্ষা দিচ্ছে–এই প্রশ্নে মাহা মির্জা বলেন, “আইন থাকলেও যে আইনের প্রয়োগ হয় না, তার ক্ল্যাসিক এক্সামপল বাংলাদেশ। কোনো সরকারই পারেনি কারণ, ব্যবসায়ীরা খুবই প্রভাবশালী।”
জলি তালুকদার মনে করেন শ্রমিকদের সুরক্ষা দেওয়ার জন্য আইএলও কনভেনশন ঠিক থাকলেও বাংলাদেশের শ্রম আইন পর্যাপ্ত নয়। তিনি জানান, আইএলও কনভেনশন অনুযায়ী কোনো শ্রমিক যদি ২৫ বছর বয়সে কারখানায় নিহত হয়, তাহলে তিনি তার কর্মক্ষমতা যত বছর থাকার কথা, সে অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ পাবে। কিন্তু দেশে বিদ্যমান শ্রম আইন অনুযায়ী সেই ক্ষতিপুরণের পরিমাণ অনেক কম।
ট্রেড ইউনিয়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “এমনও হয় যে, তারাই ট্রেড ইউনিয়নের অনুমতি পায়, যারা মালিকপক্ষের সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত।” এ ক্ষেত্রে আবার শ্রম আইন আমাদের সংবিধানের সাথেও সাংঘর্ষিক বলে মনে করেন তিনি। তিনি বলেন, “সংবিধান সংগঠিত হওয়ার অধিকার দেয়। কিন্তু শ্রম আইন অনুযায়ী কোনো ফ্যাক্টরির ২০ শতাংশ শ্রমিক না হলে তারা ট্রেড ইউনিয়ন গঠন করতে পারে না। আবার যে কয়েক হাজার ট্রেড ইউনিয়ন আছে, তাদের অধিকাংশেরই গনতান্ত্রিক চর্চা নাই। বড় ফ্যাক্টরিতে ট্রেড ইউনিয়নের কোনো ফাংশন নেই, ছোটোগুলোর কথা তো বাদই দিলাম।”
এতকিছুর পরও আমাদের শ্রমিকরা নিজেদের অধিকার আদায় করে নিতে পারে না। আর তার প্রমাণ আমরা দেখি প্রতিটা ঘটনার পর। ঝুকিপূর্ণ ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে কাজ করতে তারা বাধ্য হয়। এই জায়গায় তারা কোনো ধরনের ব্ল্যাকমেইলের শিকার হয় কি না, জানতে চাইলে মাহা মির্জা বলেন, “আমাদের প্রয়োজনের তুলনায় উদ্বৃত্ত শ্রম থাকায় শ্রমিকরা কাজ নিয়ে অনিরাপত্তায় থাকে। শ্রমিকেরা ছাটাইয়ের ভয়ে তটস্থ থাকে।”
বাংলাদেশে যেহেতু চাকরি অত্যন্ত দুর্লভ, তাই শ্রমিকরা তাদের অধিকার আদায়ে আওয়াজ তুলতে ভয় পায়। মাহা মির্জা বাংলাদেশের কর্ম পরিবেশকে ‘শ্রমিক অবান্ধব পরিবেশ’ বলেন।
যা হোক, ফিরে যাই রানা প্লাজার ঘটনায়। দ্য ডেইলি স্টারে প্রকাশিত এক নিবন্ধে বলা হয়, রানা প্লাজার পর প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে জমা পড়া ১২৭ কোটি টাকার মধ্যে বড় একটি অংশের (প্রায় ৮৫ কোটি টাকা) কোনো হদিস আজও মেলেনি।
শ্রম আইন ২০০৬-এ মৃত্যুর জন্য মাত্র ২ লাখ এবং স্থায়ী পঙ্গুত্বের জন্য আড়াই লাখ টাকার যে সীমা রয়েছে, তা বর্তমান সময়ে অত্যন্ত নগণ্য। তখন থেকে ২০ বছরে বেড়েছে নিত্যপণ্যের দাম, বেড়েছে জিডিপি। এমনকি বেড়েছে জীবনযাত্রার মান। কিন্তু শ্রমিকের জীবনের দাম ২০ বছরেও বাড়েনি। আর তাই হয়তো কাঠামোগত হত্যার শিকার শ্রমিকদের স্মৃতিতে সাভারে নির্মিত স্মৃতি সৌধও অযত্নে পড়ে থাকে।