চাকরিতে প্রমোশন পেলেই কি জীবন কেরোসিন?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
চাকরিতে প্রমোশন পেলেই কি জীবন কেরোসিন?
কাজের ক্ষেত্রে যখন একটি পদের ভূমিকা প্রকৃত অর্থেই আলাদা, তখন নতুন গুণাবলি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

পদোন্নতি পেয়েছেন? আপনাকে অভিনন্দন! হয়ত ঠিক এখান থেকেই আপনার নিচে নামা শুরু হতে যাচ্ছে! জীবন কেরোসিন হতে যাচ্ছে। ভড়কে গেলেন? আপাতত ভয় পাওয়ার কিছু নেই। নিচে নামার যে কথাটি বলা হলো, তা সব চাকরির ক্ষেত্রে যে সত্যি হবে বিষয়টি মোটেও এমন নয়। সবার বা সব অফিসের ক্ষেত্রেও কথাটি ঠিক নয়। তবে অনেক সময়ই পদোন্নতি ভবিষ্যৎ সমস্যার পূর্বাভাস হয়ে দাঁড়ায়। কারণ, আপনার পদোন্নতি ভবিষ্যতের উন্নতির জন্য নয়, বরং অতীত সাফল্যের পুরস্কার হিসেবে দেওয়া হয়।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইকোনমিস্ট এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালান বেনসন, এমআইটি স্লোন স্কুল অব ম্যানেজমেন্টের ড্যানিয়েল লি এবং ইয়েল স্কুল অব ম্যানেজমেন্টের কেলি শু ২০১৮ সালে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। সেখানে তারা ‘পিটার পলিসি’ এর প্রমাণ খুঁজতে চেয়েছিলেন।

‘হায়ারার্কিওলজিস্ট’ লরেন্স জে. পিটার এই নীতির প্রবর্তন করেছিলেন। এই নীতির মূল বক্তব্য হলো, মানুষকে এমন স্তর পর্যন্ত পদোন্নতি দেওয়া হয়, যেখানে গিয়ে তারা আর দক্ষ থাকে না। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, অফিসের ইন্টার্ন থেকে শুরু করে সিইও পর্যন্ত; একদম নিচের দিকে সরকারি কর্মচারী থেকে রাষ্ট্রপ্রধান পর্যন্ত-এমন এক স্তরে পৌঁছাবে যেখানে তার অদক্ষতা প্রকাশ পাবেই। গবেষকেরা কিন্তু কানাডীয় শিক্ষাবিদ পিটারের তত্ত্বের প্রমাণ পেয়েছিলেন।

অ্যালান, ড্যানিয়েল এবং কেলি ২০০৫ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে ২১৪টি আমেরিকান প্রতিষ্ঠানের ৫০ হাজারেরও বেশি কর্মীর সেলস রিপোর্ট ও চাকরি পরিবর্তনের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষণা প্রবন্ধ লেখেন। এতে দেখা যায়, একজন ভালো সেলস পারসন হলে ব্যবস্থাপক পদে পদোন্নতির সম্ভাবনা বাড়ে। কিন্তু সেটি ভালো ব্যবস্থাপক হওয়ার আভাস দেয় না। অর্থাৎ, একজন খুব ভালো সেলস পারসন যখন ম্যানেজার হন, তখন তার অধস্তন কর্মীদের কর্মদক্ষতা সাধারণত কমে যায়।

২০০৯ সালে কাটানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আলেসান্দ্রো প্লুচিনো ও তার সহকর্মীরা ‘পিটার নীতির’ ওপর ভিত্তি করে একটি কমপিউটার সিমুলেশন তৈরি করেন। ওই সিমুলেশনে দেখা যায়, এমন কোনো প্রতিষ্ঠানে যেখানে আগের কাজ বা পদের দক্ষতার জন্য পদোন্নতি দেওয়া হয় এবং নতুন পদে ভিন্ন ধরনের দক্ষতা প্রয়োজন হয়, সেখানে মানুষকে এমন জায়গায় প্রমোশন দেওয়া হয়, যেখানে তারা ভালো করতে পারে না। গবেষকরা এই বলে ইতি টানলেন যে-এক্ষেত্রে দ্বৈবচয়নের মাধ্যমে (র‍্যান্ডমলি) পদোন্নতিই হয়ত ভালো ব্যবস্থা হতে পারে। আর এটি করলে কর্মক্ষেত্রে উত্তেজনা অন্তত বাড়বে।

পিটার নীতি বলছে, একদম নিচের দিকের সরকারি কর্মচারী থেকে রাষ্ট্রপ্রধান পর্যন্ত-এমন এক স্তরে পৌঁছাবে যেখানে তার অদক্ষতা প্রকাশ পাবেই। ছবি এআই দিয়ে তৈরি
পিটার নীতি বলছে, একদম নিচের দিকের সরকারি কর্মচারী থেকে রাষ্ট্রপ্রধান পর্যন্ত-এমন এক স্তরে পৌঁছাবে যেখানে তার অদক্ষতা প্রকাশ পাবেই। ছবি এআই দিয়ে তৈরি

বর্তমানে কাজে কে, কতটা ভালো করছে, তার ওপর ভিত্তি করে পদোন্নতি দেওয়া পুরোপুরি অবিবেচনাপ্রসূত নয়। কর্মক্ষেত্রকে মইয়ের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যাবে, কিছু ধাপে নতুন দক্ষতার প্রয়োজন হয় না। যেমন, একজন সিনিয়র কাস্টমার সার্ভিস প্রতিনিধি হয়ত প্রায় একই কাজ করেন, যা একজন নতুন কর্মী করে থাকেন। কাজে ভালো করার প্রণোদনা হিসেবে পুরস্কার থাকা প্রয়োজন। আর যারা উদ্যমী ও পরিশ্রমী তাদের পদোন্নতি দিলে নিজেদের গুণগুলো যেকোনো পদেই কাজে লাগতে পারে।

কিন্তু কাজের ক্ষেত্রে যখন একটি পদের ভূমিকা প্রকৃত অর্থেই আলাদা, তখন নতুন গুণাবলি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। ম্যানেজারিয়াল পদে ওঠা একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁকবদল। উদাহরণ হিসেবে, বেনসন ও তার সহকর্মীদের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সেলসে পূর্বে দলগতভাবে কাজ করার অভিজ্ঞতা-অর্থাৎ টিমে কাজ করতে পারার সক্ষমতা-একজন ব্যবস্থাপক হিসেবে ভালো পারফরম্যান্সের পূর্বাভাস দেয়।

কিছু ম্যানেজার প্রতিভাবান কর্মীদের বড়ো পদে আবেদন করতে উৎসাহিত করার পরিবর্তে তাদের আটকে রাখার চেষ্টা করেন। মিউনিখের লুডভিগ-ম্যাক্সিমিলিয়ান্স বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনগ্রিড হেগেল সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় একটি বৃহৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের জার্মান ইউনিটে নিয়োজিত পদস্থ ব্যক্তিদের আচরণ বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি দেখেছেন, যখন কোনো কর্মীর ভালো কাজ অন্যদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে, তখন বসরা ওই কর্মীর রেটিং কমিয়ে দিতেন। আবার যখন কোনো দলের ব্যবস্থাপক নিজেই চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতেন এবং কর্মীদের আটকে রাখার আগ্রহ কমে যেত, তখন ভেতরে ভেতরে অন্যান্য চাকরির জন্য আবেদনের সংখ্যা বেড়ে যেত।

পক্ষপাতও পদোন্নতির সিদ্ধান্তকে বিকৃত করে। বেনসন, লি ও শুর আরেকটি গবেষণায় উত্তর আমেরিকার একটি বড়ো খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৩০ হাজার কর্মীর মূল্যায়ন বিশ্লেষণ করা হয়। এই প্রতিষ্ঠান শুধু বর্তমান কর্মদক্ষতার ওপর নির্ভর করত না, তারা ‘নাইন-বক্স গ্রিড’ ব্যবহার করত। যেখানে কর্মীদের বর্তমান কাজের পারফরম্যান্স ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা-দুটোই বিবেচনা করা হতো। কিন্তু লিঙ্গবৈষম্য পর্যালোচকদের রায়কে প্রভাবিত করেছে। ওই প্রতিষ্ঠানে নারী কর্মীরা গড়ে বেশি পারফরম্যান্স রেটিং পেলেও তাদের ‘সম্ভাবনা’র স্কোর ছিল কম।

সময়ের সঙ্গে দেখা যায়, পুরুষদের তুলনায় নারীদের সম্ভাবনার রেটিং অনেক বেশি হারে বাড়লেও তাদের অর্জন পুরুষ সহকর্মীদের চেয়ে কমই থেকে গেছে। এটি যে শুধু পুরুষতন্ত্রের ফল এমন নয়। নারী বসের অধীনেও লিঙ্গভিত্তিক এই পার্থক্য লক্ষ্য করা গেছে। সম্ভবত ‘নেতৃত্বের সম্ভাবনা’ বলতে পুরুষালি স্টেরিওটাইপ অর্থাৎ আত্মবিশ্বাস, দৃঢ়তা, সীমিত আবেগ-এর কথা মনে আসে। আবার পদোন্নতিকে হয়ত ধরে রাখার কৌশল হিসেবেও ব্যবহার করা হয়েছে। পদোন্নতি না পেলে পুরুষদের চাকরি ছাড়ার সম্ভাবনা বেশি। গবেষকরা দেখেছেন, যাদের চলে যাওয়ার ঝুঁকি বেশি, তাদের সম্ভাবনার রেটিংও বেশি দেওয়া হয়।

অর্থাৎ, পদোন্নতি নিয়ে সিদ্ধান্ত নানা কিছুর দ্বারা আচ্ছন্ন হয়ে যায়। সবচেয়ে বড়ো কথা, পদোন্নতির আসল উদ্দেশ্য কী? সেরা মানুষদের ম্যানেজারিয়াল পদে আনা, এখনকার কাজে মানুষকে আরও ভালো করতে উৎসাহ দেওয়া, নাকি যারা চলে যেতে পারেন, তাদের ধরে রাখা? এগুলো সবই যুক্তিসংগত লক্ষ্য। কিন্তু একটিমাত্র উপায় দিয়ে এই সব উদ্দেশ্য পূরণ করতে গেলে সমস্যা হওয়াই স্বাভাবিক।

সম্পর্কিত