ট্রাম্পের শুল্কের খেলাতেও যেভাবে টিকে আছে বিশ্ব অর্থনীতি

ট্রাম্পের শুল্কের খেলাতেও যেভাবে টিকে আছে বিশ্ব অর্থনীতি
ট্রাম্প নিজেই এখন ভেনেজুয়েলা 'চালাতে' চান। ছবি: রয়টার্স

বিশ্ব অর্থনীতি নিয়ে যারা নৈরাশ্যবাদী ছিলেন, তাদের সময়টা মোটেও ভালো যাচ্ছে না। তাদের হতাশায় গুঁড়ে বালি দিয়ে প্রবৃদ্ধির দৌঁড়ে বিশ্ব অর্থনীতি বেশ ভালোভাবে এগিয়েছে। ২০২৫ সালে বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধির হার ছিল প্রায় ৩ শতাংশ, যা বসন্ত ও গ্রীষ্মকালে দেওয়া নেতিবাচক পূর্বাভাসগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। চলতি দশকের প্রবণতাও ঠিক এমনই। ২০২০-এর দশকের প্রতিটি বছরেই এই ‘টেফলন ইকোনমি’ অব্যাহত ছিল। অর্থাৎ বিশ্বব্যাংকের দেওয়া প্রতি বছরের পূর্বাভাসকে ছাড়িয়ে গেছে।

এখন প্রশ্ন উঠতেই পারে, এই টেফলন ইকোনমি আবার কী?

সহজ ভাষায়, কোনো দেশের অর্থনীতি যদি বড় ধরনের সংকট, বৈশ্বিক মন্দা বা অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার মধ্যেও কোনো ক্ষতি ছাড়াই টিকে থাকে বা উন্নতি করে, তখন তাকে ‘টেফলন ইকোনমি’ বলা হয়।

দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ইন্দারমিত গিল বলেন, “মহামারির পর থেকে একের পর এক ধাক্কার সম্মুখীন হওয়া সত্ত্বেও, বিশ্ব অর্থনীতি আশ্চর্যজনকভাবে এসব সংকট কাটিয়ে ওঠার সক্ষমতা দেখিয়েছে।”

ব্যাংকটির অর্থনীতিবিদদের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর মার্কিন অর্থনীতি ২.১ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি গত জুনে তাদের প্রত্যাশিত ১.৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধির তুলনায় অনেক ভালো পারফরম্যান্স। যদিও ২০২৪ সালের তুলনায় এর গতি কিছুটা ধীর। তারা চলতি বছরের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ১.৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২.২ শতাংশ এ উন্নীত করেছেন। বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সংক্রান্ত সরঞ্জাম এবং অবকাঠামো খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ এই প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে সহায়তা করেছে।

২০২৫ সালে আমেরিকার অর্থনীতি সব প্রত্যাশাকে হার মানিয়েছে। অভিবাসন হ্রাসের প্রভাব বাদ দিলে ডোনাল্ড ট্রাম্পের অধীনে দেশটির অর্থনীতির গতি কিছুটা মন্থর হয়েছে ঠিকই, তবে তা খুবই সামান্য। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে সুদের হার কমেছে; আর আমেরিকা, চীন ও জার্মানিতে রাজস্ব উদ্দীপনা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে সহায়তা করছে।

এই দশকের এ পর্যন্ত শিল্পনীতির ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে, সরবরাহ খাত খণ্ডিত হয়েছে এবং ট্রাম্প আমেরিকায় ১৯৩০-এর দশকের পর সর্বোচ্চ শুল্ক আরোপ করেছেন। তবুও, আপাতদৃষ্টিতে এই ক্ষতির চিহ্ন খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।

যেমন, চীনের কথাই চিন্তা করুন। ট্রাম্প দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষমতায় বসার পর চীনের ওপর ‘পাহাড়সম’ শুল্ক চাপিয়ে দিয়েছিলেণ। ২০২৫ এবং ২০২৬ সালের বিভিন্ন রিপোর্ট অনুযায়ী, চীনের পণ্যের ওপর আমেরিকার গড় কার্যকর শুল্ক হার বর্তমানে প্রায় ৩০ শতাংশ থেকে ৪৮ শতাংশ এর মধ্যে। তবে গত বছর (২০২৫) এই হার কয়েক দফায় বৃদ্ধি পেয়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১০০ শতাংশ ছাড়িয়ে গিয়েছিল। কিন্তু বিশাল শুল্কের বোঝার ধাক্কা বেশ ভালোভাবে সামলে নিয়েছে চীন।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালে চীন রেকর্ড প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার কোটি ডলারের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত (রপ্তানি–আমদানির পার্থক্য) অর্জন করেছে। কাস্টমস ডেটা অনুযায়ী, এই অর্থ সৌদি আরবের মোট জিডিপির সমান। দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাংক ২০২৫ সালের জন্য চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৪.৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৪.৯ শতাংশ করেছে এবং চলতি বছরের জন্য তা ৪ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৪.৪ শতাংশ করেছে।

দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, গত বছর ইউরোজোনের অর্থনীতি ১.৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও গত জুনে তারা মাত্র ০.৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। ভারতের অবস্থা প্রত্যাশার চেয়ে অনেক দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্বব্যাংক ধারণা করেছিল, দেশটির জিডিপি ৬.৩ শতাংশ হারে বাড়বে। কিন্তু বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, ৭.২ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিভিন্ন দেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কারণে, ‘পপুলিস্ট’ নেতারা এখন দম্ভ করে বলছেন যে, বরাবরের মতোই অর্থনীতিবিদেরা ভুল ছিলেন। তাদের কারণেই এই উন্নয়ন। নেতাদের কথা কিছুটা হলেও সত্য।

বিশ্ব অর্থনীতির এই স্থিতিশীলতা বাজার উদারপন্থীদের বিভ্রান্ত করতে পারে, কারণ এই প্রবৃদ্ধি এমন এক সময়ে ঘটছে, যখন বিশ্বজুড়ে সংরক্ষণবাদী নীতির জয়জয়কার। এটি এমন একটি অর্থনৈতিক নীতি, যার মাধ্যমে একটি দেশের সরকার বিদেশি পণ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ বা বাধা আরোপ করে দেশের নিজস্ব শিল্প ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানকে বিদেশি প্রতিযোগিতা থেকে রক্ষা করে।

এটা সত্য যে, সংরক্ষণবাদ এখনো বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে লাইনচ্যুত করতে পারেনি। কিন্তু শিল্পনীতি এবং শুল্ক আরোপ তাদের মূল লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। আর তা হলো, উৎপাদন খাতের কর্মসংস্থান হ্রাসের ধারাকে থামিয়ে দেওয়া। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, বিশ্ব অর্থনীতি পপুলিজমের অধীনে বিকশিত হওয়ার বদলে কোনোমতে এর সাথে মানিয়ে নিয়ে টিকে আছে।

দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আমেরিকার উৎপাদন খাত স্থবির হয়ে পড়েছে। ব্রিটিশ এই সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত একটি জরিপ অনুসারে, ২০২৫ সালের মার্চ মাস থেকে প্রতি মাসেই এই খাত সংকুচিত হয়েছে। সেখানে আরও দেখা গেছে যে, কোম্পানিগুলো আমদানিকৃত যন্ত্রাংশের উচ্চমূল্য নিয়ে অভিযোগ করছে। গত এক বছরে উৎপাদন খাতে নির্মাণ ব্যয় যেমন কমেছে, তেমনি কমেছে তাদের কর্মসংস্থানের পরিমাণও।

শিল্প খাতের এই দুর্দশা শুধু আমেরিকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। জেপি মর্গান চেজ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, গত তিন বছর ধরে বিশ্বজুড়ে উৎপাদন খাত সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির তুলনায় পিছিয়ে আছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) মতে, ২০১৯ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে আফ্রিকা মহাদেশ বাদে প্রতিটি মহাদেশেই মোট কর্মসংস্থানের অনুপাতে উৎপাদন খাতের কর্মসংস্থান হ্রাস পেয়েছে। বাইডেনোমিক্স , ট্রাম্পোনোমিক্স, মেক ইন ইন্ডিয়া এবং এই ধরনের প্রকল্পগুলো দীর্ঘমেয়াদী এই নিম্নমুখী প্রবণতায় খুব সামান্যই পরিবর্তন আনতে পেরেছে।

এই পরিস্থিতি বদলানোর ওপর বাজি না ধরাই ভালো। এআই বা অটোমেশনের কারণে হোয়াইট-কলার বা দাপ্তরিক চাকরিগুলো অনিশ্চয়তার মুখে থাকলেও, প্রকৃতপক্ষে কারখানার শ্রমিকরাই বিশ্বের সবচেয়ে বেশি কর্মহীনতার ঝুঁকিতে থাকা কর্মী হিসেবে রয়ে গেছেন। বিশ্বজুড়ে মোট কর্মসংস্থানের অনুপাতে উৎপাদন খাতের চাকরি কমে যাওয়ার গতি গত তিন দশকের তুলনায় ২০-এর দশকে কিছুটা দ্রুততর হয়েছে।

দ্য ইকোনমিস্টের প্রকাশিত প্রতিবেদন বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে আমেরিকার অফিসগুলোর তুলনায় কারখানাগুলোতে চাকরির সুযোগ দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। যদিও চ্যাটবট দিয়ে উৎপাদন খাতের কাজ সরাসরি হুমকির মুখে নেই, তবুও সেন্সর এবং ক্যামেরার তথ্য ব্যবহার করে প্রশিক্ষিত এআই মডেলগুলো কারখানার রোবটগুলোকে আরও দক্ষ করে তুলছে।

গত ৫ জানুয়ারি এনভিডিয়ার প্রধান জেনসেন হুয়াং ঘোষণা করেছেন, “রোবোটিক্সের জন্য চ্যাটজিপিটি মুহূর্ত চলে এসেছে।” এটি হয়তো উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে, কিন্তু রাজনীতিকরা যে ধরনের কর্মসংস্থান সৃষ্টির আপ্রাণ চেষ্টা করছেন, তা সম্ভবত আরও দুর্লভ হয়ে পড়বে।

উৎপাদন খাত যেখানে সমৃদ্ধ হচ্ছে এবং কারখানার কর্মসংস্থান মোটামুটি স্থিতিশীল রয়েছে–এমন একটি জায়গা হলো চীন। বিশ্বজুড়ে উৎপাদন খাতের মোট মূল্যের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই আসে চীন থেকে, যা আমেরিকার তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। চীনের এই শিল্প-শক্তি গুরুত্বপূর্ণ শিল্পগুলোর ওপর তাদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে পশ্চিমের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে এটি দেশটির জন্য খুব একটা বড় অর্থনৈতিক আশীর্বাদ হিসেবেও প্রমাণিত হচ্ছে না।

সরকারি অর্থ দিয়ে উৎপাদনকারীদের সহায়তা করার ক্ষেত্রে চীনা নেতাদের অতি-আগ্রহ দেশটির অর্থনীতিকে ভারসাম্যহীন করে তুলেছে। এর ফলে চীনা কারখানাগুলোতে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি হয়েছে, যা দেশটির মুদ্রাসংকোচন সমস্যায় বড় ভূমিকা রাখছে।

পরিহাসের বিষয় হলো, বাজারের এই মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতাই বিশ্ব অর্থনীতিকে বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতার বিরুদ্ধে স্থিতিশীল করে তুলেছে। বছরের পর বছর ধরে সরবরাহ ব্যবস্থা যেকোনো বাধাকে এড়িয়ে নিজের পথ করে নিয়েছে। আর ওয়াশিংটনের শিল্প পরিকল্পনাকারীরা নন, বরং আমেরিকার বেসরকারি খাতই মূলত এআইয়ের জয়যাত্রার জন্য দায়ী। মুক্ত বাজারের এই চলমান সাফল্য আসলে সংরক্ষণবাদ যে ক্ষতিগুলো করছে, তা আড়াল করে দিচ্ছে। বিশ্ব অর্থনীতির এই ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতাকে যেন ট্রাম্পের মতো ব্যক্তিদের সংরক্ষণবাদী নীতির বিজয় বলে ভুল করা না হয়।

সম্পর্কিত