চরচা ডেস্ক

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর চলতি মাসের শেষের দিকে প্রথম বিদেশ সফরে মালয়েশিয়া ও চীন যাচ্ছেন তারেক রহমান। এই সফরকে বাংলাদেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির প্রতিফলন হিসেবে উল্লেখ করেছে ঢাকা। তবে প্রতিবেশী ভারতের আগে অন্য দুই দেশ সফরের সিদ্ধান্ত কূটনৈতিক মহলে বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বাংলাদেশের ভাষ্য, এই সিদ্ধান্তের মানে ভারতকে উপেক্ষা করা নয় বরং কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার প্রচেষ্টা।
হংকংভিত্তিক সংবাদমাধ্যম সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, আগামী ২১-২২ জুন মালয়েশিয়া সফর করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এরপর ২৩ জুন থেকে তিন দিনের সরকারি সফরে চীন যাবেন তিনি। দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিই হবে তার প্রথম বিদেশ সফর।
মালয়েশিয়া সফরে প্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমিকদের কল্যাণ, শ্রমবাজার, কর্মী নিয়োগের খরচ এবং বৈধ কর্মসংস্থানের সুযোগ নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। বর্তমানে মালয়েশিয়ায় প্রায় ৮ লাখ বাংলাদেশি কর্মরত আছেন। দেশটির উৎপাদন, নির্মাণ, বাগান ও কৃষি খাতে কর্মরত বিদেশি শ্রমিকদের প্রায় ৩৭ শতাংশই বাংলাদেশি।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ শাকিল ভূঁইয়ার মতে, চীন সফরে তারেক রহমান বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই)-এর আওতায় চলমান অবকাঠামো প্রকল্পগুলো এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি প্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃষি ও স্বাস্থ্য খাতে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণের চেষ্টা করবেন।
এই শিক্ষক বলেন, ঢাকা আরও ভালো শর্তে অর্থায়ন পাওয়ার চেষ্টা করতে পারে এবং যেসব প্রকল্প আটকে আছে সেগুলো আবার চালু করার উদ্যোগ নিতে পারে। বিশ্লেষকদের ভাষ্য, মালয়েশিয়া ও চীন সফরের এই ধারা ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির অংশ। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ শুরুতেই ভারত বা চীনের কোনো এক পক্ষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অবস্থানে যাচ্ছে–এমন বার্তা এড়াতে চায়।
এদিকে সীমান্তে উত্তেজনা, অমীমাংসিত পানি বণ্টন সমস্যা এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত না দেওয়ার কারণে ঢাকা ও নয়াদিল্লির সম্পর্ক কিছুটা টানাপোড়েনের মধ্যে রয়েছে।
তারেক রহমানের এই সফরগুলো গত বছর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের মালয়েশিয়া ও চীন সফরে হওয়া বিভিন্ন সমঝোতার ধারাবাহিকতা বজায় রাখবে। এর মধ্যে রয়েছে মালয়েশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে সহযোগিতা এবং চীনের সহায়তায় চট্টগ্রামে চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোনের উন্নয়ন ও মংলা বন্দর আধুনিকায়ন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক শফি মোহাম্মদ মোস্তফা বলেন, মালয়েশিয়া ও চীন সফর বাংলাদেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে অংশীদারত্ব জোরদারের প্রচেষ্টারই প্রতিফলন। তবে এর অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের অবনতি হচ্ছে।
এই বিশ্লেষক বলেন, “ভারত বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী। ভবিষ্যতে কোনো সরকারই ভারতকে উপেক্ষা করতে পারবে না।”
নিরাপত্তা বিশ্লেষক শফি মনে করেন, মালয়েশিয়া সফরের একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জোট আসিয়ানের (আসিয়ান) সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করা। বিশেষ করে কাশ্মীর ইস্যুতে ভারত-পাকিস্তানের কূটনৈতিক অচলাবস্থার কারণে সার্ক কার্যত স্থবির হয়ে থাকায় আসিয়ানের গুরুত্ব বেড়েছে। তিনি আরও বলেন, চীনের সঙ্গে আলোচনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নির্ভর শিল্প উন্নয়নের সুযোগও গুরুত্ব পেতে পারে।

অন্যদিকে, দিল্লিভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের সহযোগী ফেলো সোহিনী বসু মনে করেন, ভারতের আগে মালয়েশিয়া সফর করা একটি বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত। এতে বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে অপ্রয়োজনীয় জল্পনা-কল্পনা এড়ানো সম্ভব হবে।
এই বিশ্লষকের ভাষ্য, তারেক রহমানের এই সফরগুলো গত বছর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের মালয়েশিয়া ও চীন সফরে হওয়া বিভিন্ন সমঝোতার ধারাবাহিকতা বজায় রাখবে। এর মধ্যে রয়েছে মালয়েশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে সহযোগিতা এবং চীনের সহায়তায় চট্টগ্রামে চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোনের উন্নয়ন ও মংলা বন্দর আধুনিকায়ন।
সোহিনী আরও উল্লেখ করেন, চলতি বছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরান সংঘাতের কারণে সৃষ্ট বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের সময় বাংলাদেশ ডিজেল সরবরাহের জন্য ভারতের সহায়তা নিয়েছিল। এতে বোঝা যায়, ভারতরে সঙ্গে স্থিতিশীল দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের গুরুত্ব উপলব্ধি করে বাংলাদেশ।
তার মতে, “দিল্লি ও ঢাকার সম্পর্ক পুনর্গঠন উভয় দেশের জন্যই অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। এ বিষয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বাস্তবধর্মী উপলব্ধি রয়েছে।”
বিশ্লেষকদের মতে, মালয়েশিয়া ও চীন সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশ্বকে জানাতে চায় যে রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় পেরিয়ে দেশে এখন স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরে এসেছে।
সিঙ্গাপুরভিত্তিক নীতিগত পরামর্শক প্রতিষ্ঠান সোলারিস স্ট্র্যাটেজিসের জ্যেষ্ঠ আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক মুস্তাফা ইজ্জুদ্দিন বলেন, এই সফরগুলোর মূল উদ্দেশ্য হলো বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করা। তিনি জানান, বাংলাদেশ আসিয়ানের ‘সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার’ মর্যাদা পাওয়ার চেষ্টা করছে। এ মর্যাদা পেলে পূর্ণ সদস্য না হয়েও নির্দিষ্ট নীতিগত বিষয়ে জোটটির সঙ্গে কাজ করা সম্ভব হবে।

মুস্তাফা ইজ্জুদ্দিন বলেন, খুব শিগগিরই তারেক রহমান ভারত সফর করবেন। কারণ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য ভারত এখনো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোহাম্মদ শাকিল ভূঁইয়ার মতে, সফরের ক্রম নিয়ে ভারতের কোনো উদ্বেগ থাকলে তার কারণ হলো চীনকে ঘিরে তাদের নিরাপত্তা-উদ্বেগ এবং এ অঞ্চলে প্রভাব হারানোর আশঙ্কা। তিনি বলেন, গত মাসে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভারত সফরই প্রমাণ করে যে ঢাকা ভারতের সঙ্গে সম্মানজনক ও ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক চায়।
মালয়েশিয়া ও চীন সফর চীন-ভারত প্রতিদ্বন্দ্বিতার বাইরে গিয়ে বাংলাদেশের স্বতন্ত্র কূটনৈতিক অবস্থানকে তুলে ধরবে এবং পরিস্থিতিকে অযথা জটিল হতে দেবে না বলে মনে করেন এই অধ্যাপক।
এদিকে, সীমান্ত ও অভিবাসনসংক্রান্ত বিরোধ এখনো বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে অবৈধ অনুপ্রবেশ এবং ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর পুশ-ইনের ঘটনাগুলো এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
ভারত এসব পদক্ষেপকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় বলে মনে করলেও বাংলাদেশ বলছে, কাউকে ফেরত পাঠানোর আগে অবশ্যই আনুষ্ঠানিক যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।
গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক ও কৌশলগত বিশ্লেষক মো. হিমেল রহমান বলেন, মালয়েশিয়া সফরে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য মালয়েশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আরও সুযোগ সৃষ্টি এবং রোহিঙ্গা সংকটে কূটনৈতিক সমর্থন চাওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পেতে পারে।

এই শিক্ষক বলেন, মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ পুনরায় চালুর বিষয়টিও আলোচনার অন্যতম প্রধান এজেন্ডা হতে পারে। মানবপাচার ও শ্রমিক শোষণের অভিযোগে মালয়েশিয়া গত বছরের জুনে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ স্থগিত করেছিল।
বর্তমানে মালয়েশিয়ায় প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী রয়েছে, যাদের অধিকাংশেরই বৈধ আইনি মর্যাদা নেই। অন্যদিকে বাংলাদেশে কক্সবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে, যা বাংলাদেশের জন্য বড় আর্থিক চাপ তৈরি করেছে।
হিমেল রহমান বলেন, ২০২৯ সালে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের কথা মাথায় রেখে চীনের কাছ থেকে আরও বিনিয়োগ ও সহজ শর্তে ঋণ পাওয়া এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি চীনের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশাধিকার বাড়ানোর চেষ্টাও থাকবে।
তার ভাষ্য, “প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বিদেশ সফরের জন্য মালয়েশিয়াকে বেছে নিয়ে ঢাকা দুটি বার্তা দিতে চায়। প্রথমত, দেশের জনগণকে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির বার্তা দেওয়া এবং দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক মহলকে জানানো যে ভারত-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বাংলাদেশ কোনো পক্ষ বেছে নিতে চায় না।”

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর চলতি মাসের শেষের দিকে প্রথম বিদেশ সফরে মালয়েশিয়া ও চীন যাচ্ছেন তারেক রহমান। এই সফরকে বাংলাদেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির প্রতিফলন হিসেবে উল্লেখ করেছে ঢাকা। তবে প্রতিবেশী ভারতের আগে অন্য দুই দেশ সফরের সিদ্ধান্ত কূটনৈতিক মহলে বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বাংলাদেশের ভাষ্য, এই সিদ্ধান্তের মানে ভারতকে উপেক্ষা করা নয় বরং কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার প্রচেষ্টা।
হংকংভিত্তিক সংবাদমাধ্যম সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, আগামী ২১-২২ জুন মালয়েশিয়া সফর করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এরপর ২৩ জুন থেকে তিন দিনের সরকারি সফরে চীন যাবেন তিনি। দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিই হবে তার প্রথম বিদেশ সফর।
মালয়েশিয়া সফরে প্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমিকদের কল্যাণ, শ্রমবাজার, কর্মী নিয়োগের খরচ এবং বৈধ কর্মসংস্থানের সুযোগ নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। বর্তমানে মালয়েশিয়ায় প্রায় ৮ লাখ বাংলাদেশি কর্মরত আছেন। দেশটির উৎপাদন, নির্মাণ, বাগান ও কৃষি খাতে কর্মরত বিদেশি শ্রমিকদের প্রায় ৩৭ শতাংশই বাংলাদেশি।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ শাকিল ভূঁইয়ার মতে, চীন সফরে তারেক রহমান বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই)-এর আওতায় চলমান অবকাঠামো প্রকল্পগুলো এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি প্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃষি ও স্বাস্থ্য খাতে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণের চেষ্টা করবেন।
এই শিক্ষক বলেন, ঢাকা আরও ভালো শর্তে অর্থায়ন পাওয়ার চেষ্টা করতে পারে এবং যেসব প্রকল্প আটকে আছে সেগুলো আবার চালু করার উদ্যোগ নিতে পারে। বিশ্লেষকদের ভাষ্য, মালয়েশিয়া ও চীন সফরের এই ধারা ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির অংশ। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ শুরুতেই ভারত বা চীনের কোনো এক পক্ষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অবস্থানে যাচ্ছে–এমন বার্তা এড়াতে চায়।
এদিকে সীমান্তে উত্তেজনা, অমীমাংসিত পানি বণ্টন সমস্যা এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত না দেওয়ার কারণে ঢাকা ও নয়াদিল্লির সম্পর্ক কিছুটা টানাপোড়েনের মধ্যে রয়েছে।
তারেক রহমানের এই সফরগুলো গত বছর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের মালয়েশিয়া ও চীন সফরে হওয়া বিভিন্ন সমঝোতার ধারাবাহিকতা বজায় রাখবে। এর মধ্যে রয়েছে মালয়েশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে সহযোগিতা এবং চীনের সহায়তায় চট্টগ্রামে চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোনের উন্নয়ন ও মংলা বন্দর আধুনিকায়ন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক শফি মোহাম্মদ মোস্তফা বলেন, মালয়েশিয়া ও চীন সফর বাংলাদেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে অংশীদারত্ব জোরদারের প্রচেষ্টারই প্রতিফলন। তবে এর অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের অবনতি হচ্ছে।
এই বিশ্লেষক বলেন, “ভারত বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী। ভবিষ্যতে কোনো সরকারই ভারতকে উপেক্ষা করতে পারবে না।”
নিরাপত্তা বিশ্লেষক শফি মনে করেন, মালয়েশিয়া সফরের একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জোট আসিয়ানের (আসিয়ান) সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করা। বিশেষ করে কাশ্মীর ইস্যুতে ভারত-পাকিস্তানের কূটনৈতিক অচলাবস্থার কারণে সার্ক কার্যত স্থবির হয়ে থাকায় আসিয়ানের গুরুত্ব বেড়েছে। তিনি আরও বলেন, চীনের সঙ্গে আলোচনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নির্ভর শিল্প উন্নয়নের সুযোগও গুরুত্ব পেতে পারে।

অন্যদিকে, দিল্লিভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের সহযোগী ফেলো সোহিনী বসু মনে করেন, ভারতের আগে মালয়েশিয়া সফর করা একটি বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত। এতে বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে অপ্রয়োজনীয় জল্পনা-কল্পনা এড়ানো সম্ভব হবে।
এই বিশ্লষকের ভাষ্য, তারেক রহমানের এই সফরগুলো গত বছর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের মালয়েশিয়া ও চীন সফরে হওয়া বিভিন্ন সমঝোতার ধারাবাহিকতা বজায় রাখবে। এর মধ্যে রয়েছে মালয়েশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে সহযোগিতা এবং চীনের সহায়তায় চট্টগ্রামে চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোনের উন্নয়ন ও মংলা বন্দর আধুনিকায়ন।
সোহিনী আরও উল্লেখ করেন, চলতি বছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরান সংঘাতের কারণে সৃষ্ট বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের সময় বাংলাদেশ ডিজেল সরবরাহের জন্য ভারতের সহায়তা নিয়েছিল। এতে বোঝা যায়, ভারতরে সঙ্গে স্থিতিশীল দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের গুরুত্ব উপলব্ধি করে বাংলাদেশ।
তার মতে, “দিল্লি ও ঢাকার সম্পর্ক পুনর্গঠন উভয় দেশের জন্যই অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। এ বিষয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বাস্তবধর্মী উপলব্ধি রয়েছে।”
বিশ্লেষকদের মতে, মালয়েশিয়া ও চীন সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশ্বকে জানাতে চায় যে রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় পেরিয়ে দেশে এখন স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরে এসেছে।
সিঙ্গাপুরভিত্তিক নীতিগত পরামর্শক প্রতিষ্ঠান সোলারিস স্ট্র্যাটেজিসের জ্যেষ্ঠ আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক মুস্তাফা ইজ্জুদ্দিন বলেন, এই সফরগুলোর মূল উদ্দেশ্য হলো বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করা। তিনি জানান, বাংলাদেশ আসিয়ানের ‘সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার’ মর্যাদা পাওয়ার চেষ্টা করছে। এ মর্যাদা পেলে পূর্ণ সদস্য না হয়েও নির্দিষ্ট নীতিগত বিষয়ে জোটটির সঙ্গে কাজ করা সম্ভব হবে।

মুস্তাফা ইজ্জুদ্দিন বলেন, খুব শিগগিরই তারেক রহমান ভারত সফর করবেন। কারণ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য ভারত এখনো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোহাম্মদ শাকিল ভূঁইয়ার মতে, সফরের ক্রম নিয়ে ভারতের কোনো উদ্বেগ থাকলে তার কারণ হলো চীনকে ঘিরে তাদের নিরাপত্তা-উদ্বেগ এবং এ অঞ্চলে প্রভাব হারানোর আশঙ্কা। তিনি বলেন, গত মাসে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভারত সফরই প্রমাণ করে যে ঢাকা ভারতের সঙ্গে সম্মানজনক ও ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক চায়।
মালয়েশিয়া ও চীন সফর চীন-ভারত প্রতিদ্বন্দ্বিতার বাইরে গিয়ে বাংলাদেশের স্বতন্ত্র কূটনৈতিক অবস্থানকে তুলে ধরবে এবং পরিস্থিতিকে অযথা জটিল হতে দেবে না বলে মনে করেন এই অধ্যাপক।
এদিকে, সীমান্ত ও অভিবাসনসংক্রান্ত বিরোধ এখনো বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে অবৈধ অনুপ্রবেশ এবং ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর পুশ-ইনের ঘটনাগুলো এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
ভারত এসব পদক্ষেপকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় বলে মনে করলেও বাংলাদেশ বলছে, কাউকে ফেরত পাঠানোর আগে অবশ্যই আনুষ্ঠানিক যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।
গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক ও কৌশলগত বিশ্লেষক মো. হিমেল রহমান বলেন, মালয়েশিয়া সফরে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য মালয়েশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আরও সুযোগ সৃষ্টি এবং রোহিঙ্গা সংকটে কূটনৈতিক সমর্থন চাওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পেতে পারে।

এই শিক্ষক বলেন, মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ পুনরায় চালুর বিষয়টিও আলোচনার অন্যতম প্রধান এজেন্ডা হতে পারে। মানবপাচার ও শ্রমিক শোষণের অভিযোগে মালয়েশিয়া গত বছরের জুনে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ স্থগিত করেছিল।
বর্তমানে মালয়েশিয়ায় প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী রয়েছে, যাদের অধিকাংশেরই বৈধ আইনি মর্যাদা নেই। অন্যদিকে বাংলাদেশে কক্সবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে, যা বাংলাদেশের জন্য বড় আর্থিক চাপ তৈরি করেছে।
হিমেল রহমান বলেন, ২০২৯ সালে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের কথা মাথায় রেখে চীনের কাছ থেকে আরও বিনিয়োগ ও সহজ শর্তে ঋণ পাওয়া এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি চীনের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশাধিকার বাড়ানোর চেষ্টাও থাকবে।
তার ভাষ্য, “প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বিদেশ সফরের জন্য মালয়েশিয়াকে বেছে নিয়ে ঢাকা দুটি বার্তা দিতে চায়। প্রথমত, দেশের জনগণকে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির বার্তা দেওয়া এবং দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক মহলকে জানানো যে ভারত-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বাংলাদেশ কোনো পক্ষ বেছে নিতে চায় না।”