Advertisement Banner

যুদ্ধের ধাক্কা: উপসাগরীয় দেশগুলোর ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের তহবিল চাপে

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
যুদ্ধের ধাক্কা: উপসাগরীয় দেশগুলোর ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের তহবিল চাপে
ইরানের হামলায় বাহরাইনের একটি ক্ষতিগ্রস্ত ভবন। ছবি: রয়টার্স

মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় দেশগুলোর বিশাল সার্বভৌম সম্পদ তহবিল বা সভরেন-ওয়েলথ ফান্ড দীর্ঘদিন ধরে বৈশ্বিক বিনিয়োগের অন্যতম বড় চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। বাহরাইন, কুয়েত, ওমান, কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)– এই ছয় দেশের জ্বালানি সম্পদ থেকে গড়ে ওঠা তহবিলগুলো গত কয়েক বছরে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে।

ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টের গত বুধবারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২১ সাল থেকে তারা সম্মিলিতভাবে ৪৩০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ করেছে, যার প্রায় ৭৫ শতাংশই বিদেশে গেছে। এরমধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থেকে শুরু করে প্রাইভেট ক্রেডিট, ইউরোপীয় ফুটবল ক্লাব এবং প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম– সব আছে। বর্তমানে এই তহবিলগুলোর মোট সম্পদের পরিমাণ ৫ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি, যা ২০২১ সালের ৩ ট্রিলিয়ন ডলার থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

কিন্তু ২০২৬ সালের এপ্রিলের মাঝামাঝি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি এই দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ কৌশলকে বড় ধরনের চাপে ফেলেছে। বিশেষ করে ইরানের পাল্টা হামলায় উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল ও গ্যাস অবকাঠামোর প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছে বলে পরামর্শক সংস্থা ওয়েলিজেন্স উল্লেখ করেছে। এই ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ করতে হবে, পাশাপাশি হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে বিকল্প পাইপলাইন তৈরির জন্য আরও ৩০ থেকে ৫০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হতে পারে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রতিরক্ষা খাতে অতিরিক্ত ব্যয়– মিসাইল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও গোলাবারুদ পুনরায় সংগ্রহের প্রয়োজনীয়তা।

এই পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় অর্থনীতিগুলোও ধাক্কা খাচ্ছে। জ্বালানি রপ্তানিতে বিঘ্ন এবং আঞ্চলিক অস্থিরতার কারণে অর্থনৈতিক কার্যক্রম ধীর হয়ে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে দুবাই ব্যবসা খাতকে সহায়তা দিতে প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। ফলে, রাষ্ট্রগুলোর ওপর চাপ বাড়ছে এবং অতীতের মতোই এই ব্যয়ভার বহনের জন্য সভরেন-ওয়েলথ ফান্ডগুলোর দিকে তাকানো হচ্ছে।

হরমুজ প্রণালিতে দুটি জাহাজ। ছবি: রয়টার্স
হরমুজ প্রণালিতে দুটি জাহাজ। ছবি: রয়টার্স

এর আগেও সংকটকালে এই তহবিলগুলো ব্যবহার করা হয়েছে। কোভিড-১৯ মহামারির সময় আবুধাবি ইনভেস্টমেন্ট অথরিটি প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলার এবং কুয়েত ইনভেস্টমেন্ট অথরিটি প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার তুলে নিয়েছিল, যা তাদের মোট সম্পদের প্রায় ৩-৪ শতাংশ। একইভাবে, আমিরাত ও কাতারের তহবিলগুলো নিজেদের জাতীয় বিমান সংস্থাগুলোকে প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার সহায়তা দিয়েছিল।

তবে এবারের পরিস্থিতি আরও জটিল। কারণ গত কয়েক বছরে এই তহবিলগুলো বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করেছে এমন খাতে, যেগুলো সহজে নগদায়ন করা যায় না। যেমন প্রাইভেট ইক্যুইটি, অবকাঠামো, রিয়েল এস্টেট এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে বিনিয়োগ। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব একাই প্রায় ১৪০ বিলিয়ন ডলার অবকাঠামো ও সম্পত্তিতে এবং আরও ৮০ বিলিয়ন ডলার প্রাইভেট ক্রেডিটে বিনিয়োগ করেছে। এই ধরনের সম্পদ দ্রুত বিক্রি করতে গেলে বড় ক্ষতির সম্মুখীন হওয়ার আশঙ্কা আছে।

এছাড়া অনেক বিনিয়োগ সরাসরি বৈদেশিক নীতির সঙ্গে যুক্ত। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বা গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের নিয়ন্ত্রণে থাকার জন্য আফ্রিকা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বিভিন্ন প্রকল্পে বিনিয়োগ করা হয়েছে। এই ধরনের বিনিয়োগ কেবল আর্থিক নয়, কৌশলগত– ফলে এগুলো থেকে বেরিয়ে আসা আরও কঠিন।

অন্যদিকে, উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতিকে তেলনির্ভরতা থেকে সরিয়ে আনার যে পরিকল্পনা ছিল, সেটিও এখন চাপে পড়েছে। আবুধাবির বিভিন্ন তহবিল জাতীয় অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং আর্থিক কেন্দ্র গড়ে তোলার প্রকল্পে বিনিয়োগ করেছে। কিন্তু যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এই প্রকল্পগুলোর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে।

যুদ্ধের সরাসরি প্রভাবও ইতোমধ্যে দৃশ্যমান। অঞ্চলে বিমান চলাচল কমে যাওয়ায় বিমানবন্দর ও এয়ারলাইন্সের আয় কমছে। বিলাসবহুল হোটেলগুলোর অতিথির হার এবং দৈনিক ভাড়া কমে যাচ্ছে। এমিরেটস গ্লোবাল অ্যালুমিনিয়ামের মতো বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান ক্ষতির মুখে পড়েছে। সেখানে মিসাইলের ধ্বংসাবশেষ মেরামত করতে এক বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। রিয়েল এস্টেট কোম্পানিগুলোর বিক্রি ও ভাড়া কমে যাচ্ছে, যার ফলে তহবিলগুলোর আয় কমছে।

ইরানে আমেরিকা-ইসরায়েলের যৌথ হামলা। ছবি: রয়টার্স
ইরানে আমেরিকা-ইসরায়েলের যৌথ হামলা। ছবি: রয়টার্স

এছাড়া কিছু বড় প্রকল্প ইতোমধ্যেই স্থগিত বা বাতিল হয়েছে। সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে ৫০ বিলিয়ন ডলারের ‘মুকাব’ প্রকল্প স্থগিত করা হয়েছে। একইভাবে ‘দ্য লাইন’ এবং মরুভূমির স্কি রিসোর্ট ‘ট্রোজেনা’র মতো উচ্চাভিলাষী প্রকল্পগুলোও সংকটে পড়েছে। এই প্রকল্পগুলোর পেছনে বড় বিনিয়োগ থাকায়, ভবিষ্যতে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও কিছুটা সতর্ক হয়ে উঠছেন। অনেক পশ্চিমা বিনিয়োগকারী এবং ঠিকাদার উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রকল্প থেকে সরে আসছেন বা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন। ফলে, উপসাগরীয় দেশগুলোর দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক রূপান্তরের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন আরও কঠিন হয়ে পড়ছে। তবে সবকিছুর পরও এই তহবিলগুলো দ্রুত সম্পদ বিক্রি করবে– এমন সম্ভাবনা কম। কারণ তারা সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গিতে বিনিয়োগ করে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে তাদের বিনিয়োগ কৌশলে পরিবর্তন আনতে হতে পারে। ঝুঁকিপূর্ণ ও ভবিষ্যতমুখী প্রকল্পের পরিবর্তে তারা তুলনামূলক নিরাপদ ও স্থিতিশীল আয়ের উৎসের দিকে ঝুঁকতে পারে।

সব মিলিয়ে, উপসাগরীয় দেশগুলোর বিশাল সম্পদ তহবিল এখন এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। যুদ্ধের প্রভাব শুধু সামরিক বা রাজনৈতিক নয়, বরং অর্থনৈতিক ও বিনিয়োগ কাঠামোকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করছে। যতদিন এই সংঘাত চলবে, ততই এই তহবিলগুলোর জন্য ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন হয়ে উঠবে। একদিকে দেশের ভেতরের চাহিদা, অন্যদিকে বৈশ্বিক বিনিয়োগের লক্ষ্য– এই দ্বৈত চাপই আগামী দিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

সম্পর্কিত