সুব্রত শুভ্র

মানুষের সমাজ ও রাষ্ট্রের নৈতিক কাঠামো একবার পুরোপুরি ভেঙে পড়লে শুধু আইন দিয়ে তা আর মেরামত করা যায় না। আসলে এই দেশের, সমাজের ভেতরে অসুখ হয়েছে। বহুকাল ধরেই, এখানে মৃত্যু শুধু দেহের শেষ নয়; মৃত্যু মানে ভয় নিয়ে বড় হওয়া, নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে হাঁটা, নীরবে সহ্য করা, এবং প্রতিদিন একটু একটু করে মানবিক মর্যাদা হারিয়ে ফেলা। কন্যাশিশুদের ক্ষেত্রে আরও নির্মম। কারণ, তাদের জীবন শুরু হওয়ার আগেই সমাজ ও নরপশুরা তাদের ওপর নিষ্ঠুরতার ছায়া ফেলে।
কন্যাশিশুর চোখে যদি খেলনার আগে আতঙ্ক এসে বসে, যদি একটি মেয়েশিশু নিজের ঘরের ভেতরেও নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে না পায়, তবে বুঝতে হবে, সেই সমাজ তার মানবিকতা অনেক আগেই হারিয়ে ফেলেছে। তাদের শৈশব হয়তো শুরুই হয় না। কষ্ট, ভয় আর অসম্মানের ভার বহন করতে করতেই তারা বড় হতে থাকে। যে মেয়ে-শিশু ঘরের ভেতরেও নিরাপদ নয়, তার কাছে পৃথিবী আর আশ্রয় থাকে না; হয়ে ওঠে এক ধীর, নিঃশব্দ ধ্বংসের ক্ষেত্র।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতা প্রায়ই এমনভাবে ঘটে, যেখানে অপরাধ শুধু শরীরকে আঘাত করে না; মন, আত্মসম্মান, ভবিষ্যৎ—সবকিছুকেই ক্ষতবিক্ষত করে দেয়। ধর্ষণ, নির্যাতন, হত্যার খবর যখন বারবার আসে, তখন সমাজের বিবেকেও এক ধরনের অবশতা জন্মায়। আমরা প্রতিটি ঘটনার পর সাময়িক ক্ষোভে ফেটে পড়ি। কিন্তু সেই ক্ষোভকে যদি ন্যায়বোধ, বিচার, নিরাপত্তা আর সংস্কারের দিকে নিয়ে যাওয়া না যায়, তবে প্রতিটি নতুন খবর আগের ক্ষতেরই পুনরাবৃত্তি হয়ে দাঁড়ায়।
এ দেশে প্রতিদিন ‘বারবার মরতে হয়’ আমাদেরকে, এখানে মৃত্যু একবার ঘটে না; একই মানুষ প্রতিবার খবরের শিরোনামে, প্রতিবার সামাজিক অবজ্ঞায়, প্রতিবার আইনের দুর্বলতায়, প্রতিবার নীরবতায় আবারও নিহত হয়।
মানুষে-সমাজে-রাষ্ট্রে এমন এক নৈতিক স্খলনের পরিবেশ, যেখানে জীবনের বদলে মৃত্যুর আশঙ্কাই বেশি বাস্তব। এই দেশে শিশু ও নারী যেন বেঁচে থাকে শর্তসাপেক্ষে। রাস্তায়, ঘরে, স্কুলে, কর্মক্ষেত্রে, এমনকি নিজেদের শরীরের মধ্যেও তারা পূর্ণ অধিকার নিয়ে দাঁড়াতে পারে না। এ দেশের সমাজে পরিবার, রাষ্ট্র, আর সামাজিক নীতির যে ফাঁকফোকর রয়েছে, সেখানেই এই সহিংসতার শেকড়।
শিশুরা নিরাপদ না থাকে, নারীরা সম্মান নিয়ে বাঁচতে না পারে যেখানে, সেখানে উন্নয়নের সব কথা কাগুজেই। যেখানে জীবনকে রক্ষা করার কথা থাকলেও বারবার জীবনই বিপন্ন হয়, আর সেই বিপন্নতার সবচেয়ে বড় শিকার হয় তারা, যাদের কণ্ঠ সবচেয়ে কম শোনা যায়।
নারী ও শিশুদের কাছে জীবন যেন শর্তসাপেক্ষ এক অনুমতি, অধিকার নয়। তারা হাঁটে ভয়ে, বাঁচে সতর্কতায়, কথা বলে সঙ্কোচে, আর দিন কাটায় সম্ভাব্য বিপদের ছায়া মাথায় নিয়ে। যাদের নিরাপত্তা সবচেয়ে জরুরি, তারাই সবচেয়ে বেশি অনিরাপদ। এই অনিরাপত্তা শুধু দেহে ক্ষত তৈরি করে না, সমাজের বিবেককেও ক্ষতবিক্ষত করে।
এই দেশে এখন মানুষ সহিংসতার খবর শুনে শুধু কেঁপে ওঠে না, অভ্যস্ত হয়ে যায়। আর সেই অভ্যস্ততাই সবচেয়ে ভয়ংকর মৃত্যু, কারণ তখন অন্যের কষ্ট আর কারও হৃদয়ে নাড়া দেয় না। যাদের সবচেয়ে বেশি সুরক্ষা পাওয়ার কথা, তারাই সবচেয়ে বেশি অনিরাপদ। অবাধ্য, ক্ষুব্ধ হয়ে কেউ কেউ আমরা প্রচলিত সভ্যতার মুখোশ ছিঁড়ে ফেলতে চাই আর্তনাদে, সমাজ ও রাষ্ট্রকে লজ্জা দিতে চায়, জাগাতে। কিন্তু সমাজ ও রাষ্ট্রের লজ্জা আদতেই কি আছে?
কারণ যে সমাজ ও রাষ্ট্র তার শিশুদের, বিশেষ করে তার কন্যাশিশু ও নারীদের নিরাপত্তা দিতে পারে না, সে সমাজ ও রাষ্ট্র মানবিকতার দাবি করার কোনো অধিকার রাখে না। আমাদের হৃদয় এখনও কাঁপে। এখনও জ্বলে। হয়তো সেই আগুনই একদিন এই অন্ধকারকে পুড়িয়ে ছাই করে দেবে।
লেখক: মাল্টিডিসিপ্লিনারি আর্টিস্ট, সাংস্কৃতিক কর্মী ও সংগঠক

মানুষের সমাজ ও রাষ্ট্রের নৈতিক কাঠামো একবার পুরোপুরি ভেঙে পড়লে শুধু আইন দিয়ে তা আর মেরামত করা যায় না। আসলে এই দেশের, সমাজের ভেতরে অসুখ হয়েছে। বহুকাল ধরেই, এখানে মৃত্যু শুধু দেহের শেষ নয়; মৃত্যু মানে ভয় নিয়ে বড় হওয়া, নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে হাঁটা, নীরবে সহ্য করা, এবং প্রতিদিন একটু একটু করে মানবিক মর্যাদা হারিয়ে ফেলা। কন্যাশিশুদের ক্ষেত্রে আরও নির্মম। কারণ, তাদের জীবন শুরু হওয়ার আগেই সমাজ ও নরপশুরা তাদের ওপর নিষ্ঠুরতার ছায়া ফেলে।
কন্যাশিশুর চোখে যদি খেলনার আগে আতঙ্ক এসে বসে, যদি একটি মেয়েশিশু নিজের ঘরের ভেতরেও নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে না পায়, তবে বুঝতে হবে, সেই সমাজ তার মানবিকতা অনেক আগেই হারিয়ে ফেলেছে। তাদের শৈশব হয়তো শুরুই হয় না। কষ্ট, ভয় আর অসম্মানের ভার বহন করতে করতেই তারা বড় হতে থাকে। যে মেয়ে-শিশু ঘরের ভেতরেও নিরাপদ নয়, তার কাছে পৃথিবী আর আশ্রয় থাকে না; হয়ে ওঠে এক ধীর, নিঃশব্দ ধ্বংসের ক্ষেত্র।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতা প্রায়ই এমনভাবে ঘটে, যেখানে অপরাধ শুধু শরীরকে আঘাত করে না; মন, আত্মসম্মান, ভবিষ্যৎ—সবকিছুকেই ক্ষতবিক্ষত করে দেয়। ধর্ষণ, নির্যাতন, হত্যার খবর যখন বারবার আসে, তখন সমাজের বিবেকেও এক ধরনের অবশতা জন্মায়। আমরা প্রতিটি ঘটনার পর সাময়িক ক্ষোভে ফেটে পড়ি। কিন্তু সেই ক্ষোভকে যদি ন্যায়বোধ, বিচার, নিরাপত্তা আর সংস্কারের দিকে নিয়ে যাওয়া না যায়, তবে প্রতিটি নতুন খবর আগের ক্ষতেরই পুনরাবৃত্তি হয়ে দাঁড়ায়।
এ দেশে প্রতিদিন ‘বারবার মরতে হয়’ আমাদেরকে, এখানে মৃত্যু একবার ঘটে না; একই মানুষ প্রতিবার খবরের শিরোনামে, প্রতিবার সামাজিক অবজ্ঞায়, প্রতিবার আইনের দুর্বলতায়, প্রতিবার নীরবতায় আবারও নিহত হয়।
মানুষে-সমাজে-রাষ্ট্রে এমন এক নৈতিক স্খলনের পরিবেশ, যেখানে জীবনের বদলে মৃত্যুর আশঙ্কাই বেশি বাস্তব। এই দেশে শিশু ও নারী যেন বেঁচে থাকে শর্তসাপেক্ষে। রাস্তায়, ঘরে, স্কুলে, কর্মক্ষেত্রে, এমনকি নিজেদের শরীরের মধ্যেও তারা পূর্ণ অধিকার নিয়ে দাঁড়াতে পারে না। এ দেশের সমাজে পরিবার, রাষ্ট্র, আর সামাজিক নীতির যে ফাঁকফোকর রয়েছে, সেখানেই এই সহিংসতার শেকড়।
শিশুরা নিরাপদ না থাকে, নারীরা সম্মান নিয়ে বাঁচতে না পারে যেখানে, সেখানে উন্নয়নের সব কথা কাগুজেই। যেখানে জীবনকে রক্ষা করার কথা থাকলেও বারবার জীবনই বিপন্ন হয়, আর সেই বিপন্নতার সবচেয়ে বড় শিকার হয় তারা, যাদের কণ্ঠ সবচেয়ে কম শোনা যায়।
নারী ও শিশুদের কাছে জীবন যেন শর্তসাপেক্ষ এক অনুমতি, অধিকার নয়। তারা হাঁটে ভয়ে, বাঁচে সতর্কতায়, কথা বলে সঙ্কোচে, আর দিন কাটায় সম্ভাব্য বিপদের ছায়া মাথায় নিয়ে। যাদের নিরাপত্তা সবচেয়ে জরুরি, তারাই সবচেয়ে বেশি অনিরাপদ। এই অনিরাপত্তা শুধু দেহে ক্ষত তৈরি করে না, সমাজের বিবেককেও ক্ষতবিক্ষত করে।
এই দেশে এখন মানুষ সহিংসতার খবর শুনে শুধু কেঁপে ওঠে না, অভ্যস্ত হয়ে যায়। আর সেই অভ্যস্ততাই সবচেয়ে ভয়ংকর মৃত্যু, কারণ তখন অন্যের কষ্ট আর কারও হৃদয়ে নাড়া দেয় না। যাদের সবচেয়ে বেশি সুরক্ষা পাওয়ার কথা, তারাই সবচেয়ে বেশি অনিরাপদ। অবাধ্য, ক্ষুব্ধ হয়ে কেউ কেউ আমরা প্রচলিত সভ্যতার মুখোশ ছিঁড়ে ফেলতে চাই আর্তনাদে, সমাজ ও রাষ্ট্রকে লজ্জা দিতে চায়, জাগাতে। কিন্তু সমাজ ও রাষ্ট্রের লজ্জা আদতেই কি আছে?
কারণ যে সমাজ ও রাষ্ট্র তার শিশুদের, বিশেষ করে তার কন্যাশিশু ও নারীদের নিরাপত্তা দিতে পারে না, সে সমাজ ও রাষ্ট্র মানবিকতার দাবি করার কোনো অধিকার রাখে না। আমাদের হৃদয় এখনও কাঁপে। এখনও জ্বলে। হয়তো সেই আগুনই একদিন এই অন্ধকারকে পুড়িয়ে ছাই করে দেবে।
লেখক: মাল্টিডিসিপ্লিনারি আর্টিস্ট, সাংস্কৃতিক কর্মী ও সংগঠক