Advertisement Banner

সৌদি আরব কেন ইরানের ধ্বংস চায়?

সৌদি আরব কেন ইরানের ধ্বংস চায়?
সৌদি যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমান। ছবি: রয়টার্স

মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে সৌদি আরব ও ইরান—এই দুই শক্তিশালী প্রতিবেশি দেশের বিরোধ আবারও সামনে এসেছে। দশকের পর দশক ধরে চলে আসা এই সংঘাতকে অনেক বিশ্লেষক ‘মধ্যপ্রাচ্যের শীতল যুদ্ধ’ হিসেবে অভিহিত করেন। ধর্মীয় মতভেদ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক আদর্শ এবং আঞ্চলিক শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের লড়াই এই দুই দেশকে খাদের কিনারায় দাঁড় করিয়েছে। সৌদি আরব কেন ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থার অবসান বা পতন চায়, তার পেছনে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট ও জটিল কারণ রয়েছে।

সৌদি আরব ও ইরানের বিরোধের মূলে রয়েছে ইসলামের দুটি প্রধান শাখার নেতৃত্ব নিয়ে দীর্ঘদিনের প্রতিযোগিতা। সৌদি আরব নিজেকে সুন্নি মুসলিম বিশ্বের প্রধান অভিভাবক মনে করে। অন্যদিকে, ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর ইরান শিয়া মতাদর্শের প্রধান শক্তিকেন্দ্র হিসেবে আবির্ভূত হয়। ওই বিপ্লবের পর ইরান যখন তাদের বৈপ্লবিক আদর্শ পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে দেওয়ার ঘোষণা দেয়, তখন থেকেই সৌদি রাজতন্ত্র একে নিজেদের অস্তিত্ব এবং সুন্নি নেতৃত্বের জন্য বড় হুমকি হিসেবে গণ্য করে আসছে।

এছাড়া, দুই দেশই মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব বা আধিপত্য বজায় রাখতে চায়। তারা সরাসরি যুদ্ধে না জড়িয়ে সিরিয়া, ইয়েমেন, লেবানন ও ইরাকের মতো দেশগুলোতে ‘ছায়া যুদ্ধে’ লিপ্ত। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে ইরান বাশার আল-আসাদ সরকারকে সমর্থন দিয়েছিল, যেখানে সৌদি আরব বিদ্রোহীদের পাশে দাঁড়িয়েছিল।

আবার ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের দমনে সৌদি আরব দীর্ঘকাল সামরিক অভিযান চালিয়েছে। রিয়াদের আশঙ্কা, এই দেশগুলোতে ইরানের প্রভাব বাড়লে সৌদি আরব আঞ্চলিকভাবে একঘরে হয়ে পড়বে।

ইরানে আমেরিকা-ইসরায়েলের যৌথ হামলা। ছবি: রয়টার্স
ইরানে আমেরিকা-ইসরায়েলের যৌথ হামলা। ছবি: রয়টার্স

এছাড়া ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে সৌদি আরব সব সময় আতঙ্কিত। রিয়াদের ধারণা, ইরান যদি পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করে, তবে এই অঞ্চলের শক্তির ভারসাম্য পুরোপুরি নষ্ট হবে এবং সৌদি আরবের নিরাপত্তা চরম হুমকির মুখে পড়বে। ২০১৫ সালের ইরানের সঙ্গে পশ্চিমাদের পারমাণবিক চুক্তির সময়ও সৌদি আরব ও ইসরায়েলের কঠোর বিরোধিতা করেছিল। তাদের দাবি ছিল, এই চুক্তি ইরানকে সাময়িকভাবে থামালেও দীর্ঘমেয়াদে আরও শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে।

সৌদি আরব একটি রক্ষণশীল রাজতন্ত্র, যারা পশ্চিমা দেশগুলোর (বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র) সাথে ঘনিষ্ঠ কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখে। অন্যদিকে ইরান একটি ইসলামি প্রজাতন্ত্র, যাদের পররাষ্ট্রনীতি মূলত পাশ্চাত্য ও ইসরায়েল-বিরোধী অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। এই দুই বিপরীতধর্মী শাসনব্যবস্থার সহাবস্থান মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার আরেকটি অন্যতম কারণ।

মধ্যপ্রাচ্যের তেলের বাজার এবং বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ উভয়ের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। সৌদি আরবের অভিযোগ, ইরান বিভিন্ন সময় তাদের তেল স্থাপনা ও তেলবাহী ট্যাঙ্কারে হামলা চালিয়ে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি করছে। ইসরায়েল ও আমেরিকা ইরানে হামলা চালানোয় হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ হওয়ার পর সৌদি আরব ও তার মিত্রদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়ছে।

সম্প্রতি মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য পরামর্শ দিচ্ছেন সৌদির যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমান।

ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সালমান ট্রাম্পকে বোঝাতে চাইছেন, মার্কিন-ইসরায়েলি অভিযান পশ্চিম এশিয়াকে নতুন করে ঢেলে সাজানোর এক ‘ঐতিহাসিক সুযোগ’ এনে দিয়েছে।

যুদ্ধ শুরুর পরে মার্চের শুরুর দিকে ওয়াশিংটন পোস্ট-এর এক প্রতিবেদনও সালমানের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছিল। সেখানে বলা হয়েছিল, ইরানে হামলার উস্কানি দিতে ট্রাম্পকে ঘন ঘন ফোন করেছিলেন সৌদির যুবরাজ। এ বার নিউইয়র্ক টাইম্‌স-ও জানাচ্ছে, গত সপ্তাহে ট্রাম্পের সঙ্গে একাধিক বার কথা বলেছেন সালমান। তিনি ট্রাম্পকে এটাই বোঝাতে চেয়েছেন যে ইরানের ‘কট্টরপন্থী’ শাসনকে ধ্বংস করা প্রয়োজন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

মার্কিন প্রেসিডেন্ট সাম্প্রতিক সময়ে ইরান যুদ্ধ নিয়ে বিভিন্ন ধরনের মন্তব্য করেছেন। কখনও তিনি বলেছেন, এই সংঘর্ষ আর খুব বেশি দিন চলবে না। আবার কখনও বলেছেন, সংঘর্ষ দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে। তবে সম্প্রতি ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের সঙ্গে আমেরিকার আলোচনা শুরু হয়েছে। দু’পক্ষের মধ্যে প্রাথমিক পর্বে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। এ অবস্থায় যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য সালমানের পরামর্শের কথা প্রকাশ্যে এল।

নিউইয়র্ক টাইমস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজনৈতিক কারণের পাশাপাশি অর্থনৈতিক কারণেও ইরানের বিরুদ্ধে সৌদি। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরানের একের পর এক হামলার জেরে হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ হয়ে রয়েছে। ফলে পশ্চিম এশিয়ায় জ্বালানি ক্ষেত্রে দৃশ্যত মুখ থুবড়ে পড়েছে। সৌদি, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং কুয়েতের তেল এই জলপথ দিয়েই আন্তর্জাতিক বাজারে যায়। হরমুজকে এড়ানোর জন্য সৌদি এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতও পাইপলাইনও তৈরি করেছে। কিন্তু সেই বিকল্প পথগুলোতেও হামলা করা হচ্ছে।

সম্প্রতি আরেক মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত এই সংঘর্ষে জড়ানোর প্রায় দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে রয়েছে। বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, যুদ্ধের ফলে সৌদির যে ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে, তা নিয়ে চিন্তিত সৌদি যুবরাজ। কিন্তু সংঘর্ষের এই পরিস্থিতিতে সব কিছু থেমে যাওয়ার পক্ষপাতী নন তিনি। সালমানের আশঙ্কা, এই মুহূর্তে আমেরিকা যুদ্ধ থামিয়ে পিছু হটলে ইরান সৌদি-সহ পশ্চিম এশিয়ায় আমেরিকার বন্ধু দেশগুলোর ওপর চেপে বসবে উপরে। তখন ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকার সাহায্য ছাড়া একাই লড়তে হবে তাদের। বিশ্লেষকদের ধারণা, সম্ভবত সেই আশঙ্কা থেকেই যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন সৌদির যুবরাজ।

তথ্যসূত্র: বিবিসি, রয়টার্স, নিউইয়র্ক টাইমস, ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল

সম্পর্কিত