সহিদুল আলম স্বপন

ভারত এবার সামরিক কূটনীতিতে নতুন এক অধ্যায় রচনা করতে যাচ্ছে। ‘প্রগতি’; অর্থাৎ, পার্টনারশিপ অব রিজিওনাল আর্মিস ফর গ্রোথ অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন ইন দ্য ইন্ডিয়ান ওশান রিজিয়ন শীর্ষক বহুপক্ষীয় সামরিক মহড়ার মাধ্যমে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ১১টি দেশকে একই ছাদের নিচে এনে নয়াদিল্লি একটি স্পষ্ট বার্তা দিতে চাইছে–আঞ্চলিক নিরাপত্তার কেন্দ্রবিন্দু হবে ভারত। মেঘালয়ের উমরোহিতে ১৮ মে থেকে ৩১ মে পর্যন্ত চলবে এই মহড়া। এতে লাওস, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা, ফিলিপাইন, নেপাল, মালদ্বীপ, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, ভুটান ও সিসিলি–এই ১১টি দেশ আমন্ত্রণ পেয়েছে। কিন্তু ৪ হাজার ১৫৬ কিলোমিটার সীমান্ত ভাগ করে নেওয়া, ভারতের সবচেয়ে কাছের প্রতিবেশী বাংলাদেশের নাম সেই তালিকায় নেই।
প্রশ্নটি স্বাভাবিকভাবেই উঠছে যে, এটি কি নিছক কূটনৈতিক বিস্মৃতি, নাকি সুচিন্তিত কৌশলগত বার্তা?
ইতিহাসের আলোয় একটি জটিল সম্পর্ক
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদান অনস্বীকার্য। সেই রক্তের ঋণ, সেই মৈত্রীর বন্ধন দুই দেশের সম্পর্কের ভিত্তিপ্রস্তর। কিন্তু ইতিহাস যতটা আবেগের, বর্তমান রাজনীতি ততটাই বাস্তববাদী। গত কয়েক দশকে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক অনেকটা সেই নদীর মতো, যার ওপরে প্রশান্ত স্রোত, ভেতরে তীব্র টান। তিস্তার পানি, বাণিজ্য বৈষম্য, সীমান্তে হত্যা, ট্রানজিট সুবিধার বিনিময়ে প্রতিদান না পাওয়া–এই দীর্ঘ অভিযোগের তালিকা বাংলাদেশের জনমানসে ভারতের প্রতি একটি মিশ্র অনুভূতি তৈরি করেছে।

২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতন এবং ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর থেকে দুই দেশের সম্পর্কে এক নতুন শীতলতা ভর করেছে। ঢাকা নয়াদিল্লির বলয় থেকে কিছুটা সরে গিয়ে বেইজিং ও ইসলামাবাদের সঙ্গে সম্পর্ক উষ্ণ করার চেষ্টা করছে বলে ভারতীয় কৌশলবিদরা মনে করছেন। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে মানবিক করিডোরের প্রস্তাব, চীনের সঙ্গে অবকাঠামো সহযোগিতার আলোচনা–এই পদক্ষেপগুলো নয়াদিল্লির কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। ভারত এখন বঙ্গোপসাগরে তার দীর্ঘদিনের কৌশলগত প্রভাব হারানোর আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন।
‘প্রগতি’ আসলে কার জন্য?
মহড়াটির নাম ‘প্রগতি’ হলেও এর ভূ-রাজনৈতিক পাঠ মোটেও সরল নয়। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মেঘালয়ে এই মহড়ার আয়োজন নিছক ভৌগোলিক কাকতাল নয়। বাংলাদেশের সীমান্ত ঘেঁষা এই রাজ্যে সামরিক মহড়া আয়োজন করে ভারত একটি নীরব সংকেত পাঠাচ্ছে–আমাদের ঘরের পাশেই আমাদের বলয়।
তালিকায় যে দেশগুলো আছে, তাদের দিকে তাকালে একটি স্পষ্ট কৌশলগত চিত্র ফুটে ওঠে। ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া–এরা দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের আগ্রাসী মনোভাবের বিরুদ্ধে সরব। নেপাল ও ভুটান ভারতের হিমালয়ান বাফার। শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপ ভারত মহাসাগরের কৌশলগত দ্বীপরাষ্ট্র। অর্থাৎ, ‘প্রগতি’ মহড়া মূলত চীনের ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক প্রভাবকে মোকাবিলায় ভারতের নতুন কূটনৈতিক অস্ত্র।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশকে বাদ দেওয়াটা আরও তাৎপর্যপূর্ণ। ঢাকা যদি চীনের কাছাকাছি যাচ্ছে বলে দিল্লি মনে করে, তাহলে তাকে এই আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো থেকে দূরে রাখাটা ভারতের জন্য একটি সতর্কবার্তা পাঠানোর সুযোগ। ‘তুমি যদি আমার বলয়ে না থাকো, তাহলে আমার ছাতার নিচেও জায়গা নেই’–এই বার্তাটি নীরবে, কিন্তু কার্যকরভাবে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগ কতটা?
কিছু বিশ্লেষক বলছেন, এটি নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই। বাংলাদেশ এমনিতেই ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সামরিক মহড়ায় অংশ নেয়। সার্ক ও বিমস্টেকের মতো আঞ্চলিক মঞ্চে দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করে। তাই একটি নতুন বহুপক্ষীয় মহড়ায় প্রথমবার আমন্ত্রণ না পাওয়াটা বৈরিতার প্রমাণ নয়।
কিন্তু এই যুক্তি পুরোপুরি গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, ভারত যখন তার নিকটতম প্রতিবেশী, যে দেশটির সঙ্গে তার সবচেয়ে দীর্ঘ স্থল সীমান্ত, যে দেশটির ভেতর দিয়ে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সংযোগ, তাকে বাদ দিয়ে একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা মঞ্চ গড়ে তোলে, তখন সেটি কেবল প্রতীকী নয়, কৌশলগতভাবেও অর্থবহ। বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান এমন যে, এই অঞ্চলের যেকোনো সামরিক বা নিরাপত্তা কাঠামোতে তাকে উপেক্ষা করা কার্যত অসম্ভব, যদি না তা উদ্দেশ্যমূলকভাবে করা হয়।

এ ছাড়া ভারত সম্প্রতি বাংলাদেশের বিরুদ্ধে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে, যেগুলো উদ্বেগজনক। সীমান্তে পুশ-ইন বৃদ্ধি, বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ আরোপ, কূটনৈতিক উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগে শীতলতা–এই প্রেক্ষাপটে ‘প্রগতি’ মহড়া থেকে বাদ পড়াকে একটি ধারাবাহিক চাপ-প্রয়োগের কৌশলের অংশ হিসেবেই দেখতে হবে।
বাংলাদেশের করণীয় কী?
এই মুহূর্তে বাংলাদেশের সামনে দুটি বিপদ। প্রথমত, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক এতটাই শীতল হয়ে পড়া যে, আঞ্চলিক কূটনীতিতে ঢাকা প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। দ্বিতীয়ত, চীনের সঙ্গে অতিমাত্রায় ঘনিষ্ঠতা, যা ভারতকে আরও বেশি প্রতিক্রিয়াশীল করে তুলতে পারে। এই দুই বিপদের মাঝখানে বাংলাদেশকে একটি সুচিন্তিত ভারসাম্যের নীতি অনুসরণ করতে হবে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতি ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়’ আজও প্রাসঙ্গিক। কিন্তু এই নীতি কার্যকর করতে হলে শুধু বক্তৃতা মঞ্চে নয়, কূটনৈতিক টেবিলে সক্রিয় থাকতে হবে। ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অমীমাংসিত বিষয়গুলো তিস্তা চুক্তি, বাণিজ্য ঘাটতি, সীমান্ত হত্যা–এগুলো সমাধানে সরব কূটনৈতিক উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি, চীন বা পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নকে ভারতের বিরুদ্ধে কার্ড হিসেবে ব্যবহার না করে, বরং জাতীয় স্বার্থে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির অংশ হিসেবে উপস্থাপন করতে হবে।
ভূগোল বদলায় না, নীতি বদলায়
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক শুধু দুটি দেশের মধ্যে নয়, এটি দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতার একটি অক্ষ। এই সম্পর্ক যখন টানাপোড়েনে পড়ে, তখন শুধু দুই দেশ নয়, পুরো অঞ্চল অস্থির হয়ে ওঠে। ‘প্রগতি’ মহড়া থেকে বাংলাদেশকে বাদ দেওয়া হয়তো একটি কৌশলগত সংকেত, হয়তো একটি সাময়িক কূটনৈতিক ঠান্ডা হাওয়া। কিন্তু এই সংকেতকে উপেক্ষা করা বাংলাদেশের জন্য বিপজ্জনক হবে।
ভূগোল বদলানো যায় না। বাংলাদেশ চিরকাল ভারতের প্রতিবেশী থাকবে। সেই প্রতিবেশীত্বকে শত্রুতায় নয়, সম্মানজনক অংশীদারত্বে রূপ দেওয়াই হোক উভয় দেশের লক্ষ্য। ঢাকা ও নয়াদিল্লি উভয়কেই মনে রাখতে হবে, শক্তিমান প্রতিবেশী যদি বুলডোজার হয়ে ওঠে, তাহলে ছোট প্রতিবেশী আস্তে আস্তে দূরে সরে যায়। আর সেই দূরত্বই একদিন হয়ে ওঠে অন্য শক্তির সুযোগ।
‘প্রগতি’ মহড়ার নামে যে অগ্রগতির স্বপ্ন দেখছে ভারত, সেই অগ্রগতি তখনই টেকসই হবে, যখন তার সবচেয়ে কাছের প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্কটাও এগিয়ে যাবে, পিছিয়ে নয়।
লেখক: সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও কলামিস্ট

ভারত এবার সামরিক কূটনীতিতে নতুন এক অধ্যায় রচনা করতে যাচ্ছে। ‘প্রগতি’; অর্থাৎ, পার্টনারশিপ অব রিজিওনাল আর্মিস ফর গ্রোথ অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন ইন দ্য ইন্ডিয়ান ওশান রিজিয়ন শীর্ষক বহুপক্ষীয় সামরিক মহড়ার মাধ্যমে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ১১টি দেশকে একই ছাদের নিচে এনে নয়াদিল্লি একটি স্পষ্ট বার্তা দিতে চাইছে–আঞ্চলিক নিরাপত্তার কেন্দ্রবিন্দু হবে ভারত। মেঘালয়ের উমরোহিতে ১৮ মে থেকে ৩১ মে পর্যন্ত চলবে এই মহড়া। এতে লাওস, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা, ফিলিপাইন, নেপাল, মালদ্বীপ, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, ভুটান ও সিসিলি–এই ১১টি দেশ আমন্ত্রণ পেয়েছে। কিন্তু ৪ হাজার ১৫৬ কিলোমিটার সীমান্ত ভাগ করে নেওয়া, ভারতের সবচেয়ে কাছের প্রতিবেশী বাংলাদেশের নাম সেই তালিকায় নেই।
প্রশ্নটি স্বাভাবিকভাবেই উঠছে যে, এটি কি নিছক কূটনৈতিক বিস্মৃতি, নাকি সুচিন্তিত কৌশলগত বার্তা?
ইতিহাসের আলোয় একটি জটিল সম্পর্ক
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদান অনস্বীকার্য। সেই রক্তের ঋণ, সেই মৈত্রীর বন্ধন দুই দেশের সম্পর্কের ভিত্তিপ্রস্তর। কিন্তু ইতিহাস যতটা আবেগের, বর্তমান রাজনীতি ততটাই বাস্তববাদী। গত কয়েক দশকে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক অনেকটা সেই নদীর মতো, যার ওপরে প্রশান্ত স্রোত, ভেতরে তীব্র টান। তিস্তার পানি, বাণিজ্য বৈষম্য, সীমান্তে হত্যা, ট্রানজিট সুবিধার বিনিময়ে প্রতিদান না পাওয়া–এই দীর্ঘ অভিযোগের তালিকা বাংলাদেশের জনমানসে ভারতের প্রতি একটি মিশ্র অনুভূতি তৈরি করেছে।

২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতন এবং ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর থেকে দুই দেশের সম্পর্কে এক নতুন শীতলতা ভর করেছে। ঢাকা নয়াদিল্লির বলয় থেকে কিছুটা সরে গিয়ে বেইজিং ও ইসলামাবাদের সঙ্গে সম্পর্ক উষ্ণ করার চেষ্টা করছে বলে ভারতীয় কৌশলবিদরা মনে করছেন। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে মানবিক করিডোরের প্রস্তাব, চীনের সঙ্গে অবকাঠামো সহযোগিতার আলোচনা–এই পদক্ষেপগুলো নয়াদিল্লির কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। ভারত এখন বঙ্গোপসাগরে তার দীর্ঘদিনের কৌশলগত প্রভাব হারানোর আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন।
‘প্রগতি’ আসলে কার জন্য?
মহড়াটির নাম ‘প্রগতি’ হলেও এর ভূ-রাজনৈতিক পাঠ মোটেও সরল নয়। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মেঘালয়ে এই মহড়ার আয়োজন নিছক ভৌগোলিক কাকতাল নয়। বাংলাদেশের সীমান্ত ঘেঁষা এই রাজ্যে সামরিক মহড়া আয়োজন করে ভারত একটি নীরব সংকেত পাঠাচ্ছে–আমাদের ঘরের পাশেই আমাদের বলয়।
তালিকায় যে দেশগুলো আছে, তাদের দিকে তাকালে একটি স্পষ্ট কৌশলগত চিত্র ফুটে ওঠে। ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া–এরা দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের আগ্রাসী মনোভাবের বিরুদ্ধে সরব। নেপাল ও ভুটান ভারতের হিমালয়ান বাফার। শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপ ভারত মহাসাগরের কৌশলগত দ্বীপরাষ্ট্র। অর্থাৎ, ‘প্রগতি’ মহড়া মূলত চীনের ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক প্রভাবকে মোকাবিলায় ভারতের নতুন কূটনৈতিক অস্ত্র।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশকে বাদ দেওয়াটা আরও তাৎপর্যপূর্ণ। ঢাকা যদি চীনের কাছাকাছি যাচ্ছে বলে দিল্লি মনে করে, তাহলে তাকে এই আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো থেকে দূরে রাখাটা ভারতের জন্য একটি সতর্কবার্তা পাঠানোর সুযোগ। ‘তুমি যদি আমার বলয়ে না থাকো, তাহলে আমার ছাতার নিচেও জায়গা নেই’–এই বার্তাটি নীরবে, কিন্তু কার্যকরভাবে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগ কতটা?
কিছু বিশ্লেষক বলছেন, এটি নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই। বাংলাদেশ এমনিতেই ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সামরিক মহড়ায় অংশ নেয়। সার্ক ও বিমস্টেকের মতো আঞ্চলিক মঞ্চে দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করে। তাই একটি নতুন বহুপক্ষীয় মহড়ায় প্রথমবার আমন্ত্রণ না পাওয়াটা বৈরিতার প্রমাণ নয়।
কিন্তু এই যুক্তি পুরোপুরি গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, ভারত যখন তার নিকটতম প্রতিবেশী, যে দেশটির সঙ্গে তার সবচেয়ে দীর্ঘ স্থল সীমান্ত, যে দেশটির ভেতর দিয়ে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সংযোগ, তাকে বাদ দিয়ে একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা মঞ্চ গড়ে তোলে, তখন সেটি কেবল প্রতীকী নয়, কৌশলগতভাবেও অর্থবহ। বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান এমন যে, এই অঞ্চলের যেকোনো সামরিক বা নিরাপত্তা কাঠামোতে তাকে উপেক্ষা করা কার্যত অসম্ভব, যদি না তা উদ্দেশ্যমূলকভাবে করা হয়।

এ ছাড়া ভারত সম্প্রতি বাংলাদেশের বিরুদ্ধে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে, যেগুলো উদ্বেগজনক। সীমান্তে পুশ-ইন বৃদ্ধি, বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ আরোপ, কূটনৈতিক উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগে শীতলতা–এই প্রেক্ষাপটে ‘প্রগতি’ মহড়া থেকে বাদ পড়াকে একটি ধারাবাহিক চাপ-প্রয়োগের কৌশলের অংশ হিসেবেই দেখতে হবে।
বাংলাদেশের করণীয় কী?
এই মুহূর্তে বাংলাদেশের সামনে দুটি বিপদ। প্রথমত, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক এতটাই শীতল হয়ে পড়া যে, আঞ্চলিক কূটনীতিতে ঢাকা প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। দ্বিতীয়ত, চীনের সঙ্গে অতিমাত্রায় ঘনিষ্ঠতা, যা ভারতকে আরও বেশি প্রতিক্রিয়াশীল করে তুলতে পারে। এই দুই বিপদের মাঝখানে বাংলাদেশকে একটি সুচিন্তিত ভারসাম্যের নীতি অনুসরণ করতে হবে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতি ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়’ আজও প্রাসঙ্গিক। কিন্তু এই নীতি কার্যকর করতে হলে শুধু বক্তৃতা মঞ্চে নয়, কূটনৈতিক টেবিলে সক্রিয় থাকতে হবে। ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অমীমাংসিত বিষয়গুলো তিস্তা চুক্তি, বাণিজ্য ঘাটতি, সীমান্ত হত্যা–এগুলো সমাধানে সরব কূটনৈতিক উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি, চীন বা পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নকে ভারতের বিরুদ্ধে কার্ড হিসেবে ব্যবহার না করে, বরং জাতীয় স্বার্থে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির অংশ হিসেবে উপস্থাপন করতে হবে।
ভূগোল বদলায় না, নীতি বদলায়
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক শুধু দুটি দেশের মধ্যে নয়, এটি দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতার একটি অক্ষ। এই সম্পর্ক যখন টানাপোড়েনে পড়ে, তখন শুধু দুই দেশ নয়, পুরো অঞ্চল অস্থির হয়ে ওঠে। ‘প্রগতি’ মহড়া থেকে বাংলাদেশকে বাদ দেওয়া হয়তো একটি কৌশলগত সংকেত, হয়তো একটি সাময়িক কূটনৈতিক ঠান্ডা হাওয়া। কিন্তু এই সংকেতকে উপেক্ষা করা বাংলাদেশের জন্য বিপজ্জনক হবে।
ভূগোল বদলানো যায় না। বাংলাদেশ চিরকাল ভারতের প্রতিবেশী থাকবে। সেই প্রতিবেশীত্বকে শত্রুতায় নয়, সম্মানজনক অংশীদারত্বে রূপ দেওয়াই হোক উভয় দেশের লক্ষ্য। ঢাকা ও নয়াদিল্লি উভয়কেই মনে রাখতে হবে, শক্তিমান প্রতিবেশী যদি বুলডোজার হয়ে ওঠে, তাহলে ছোট প্রতিবেশী আস্তে আস্তে দূরে সরে যায়। আর সেই দূরত্বই একদিন হয়ে ওঠে অন্য শক্তির সুযোগ।
‘প্রগতি’ মহড়ার নামে যে অগ্রগতির স্বপ্ন দেখছে ভারত, সেই অগ্রগতি তখনই টেকসই হবে, যখন তার সবচেয়ে কাছের প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্কটাও এগিয়ে যাবে, পিছিয়ে নয়।
লেখক: সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও কলামিস্ট