কামাল আলম

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধ তীব্রতর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা উপসাগরীয় অঞ্চল ও লেবাননজুড়ে সহিংসতা ছড়িয়ে দিয়েছে। এরফলে পাকিস্তানের ওপর কোনো এক পক্ষকে বেছে নেওয়ার জন্য অভ্যন্তরীণ চাপ বাড়ছে।
পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরেই প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোর লড়াইয়ের একটি ক্ষেত্র। বিশেষ করে সৌদি আরব ও ইরানকে ঘিরে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনের মধ্যস্থতায় এই দুই দেশের মধ্যে সমঝোতায় ইসলামাবাদ ভূমিকা রাখলেও, সেই নিরপেক্ষতা এখন বড় পরীক্ষার মুখে। তবে আফগানিস্তান সীমান্তে তালেবানের সঙ্গে চলমান সংঘাত, বেলুচিস্তান ও খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশে বিদ্রোহ, এবং ভারতের সঙ্গে উচ্চমাত্রার উত্তেজনার কারণে পাকিস্তান আর কোনো অস্থিরতা সামলানোর অবস্থায় নেই। উপসাগরীয় মিত্রদের কেউ কেউ ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার জবাব দেওয়ার সম্ভাবনা বিবেচনা করায়, ইসলামাবাদ কূটনৈতিকভাবে পরিস্থিতি শান্ত রাখার চেষ্টা করছে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ইরান আক্রমণের প্রাথমিক পর্যায়ে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর পাকিস্তান সরাসরি নিন্দা না করে ‘উদ্বেগ’ প্রকাশ করে একটি নরম বিবৃতি দেয়। এর বিপরীতে, পাকিস্তান দ্রুত উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর ইরানের হামলার ‘নিন্দা’ জানায়। যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি নিন্দা করতে পাকিস্তানের অনীহার একটি বড় কারণ হলো–সাম্প্রতিক মাসগুলোতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান বিষয়ে পাকিস্তানের ওপর নির্ভর করতে শুরু করেছেন। সেখানে সেনাপ্রধান আসিম মুনির তার ‘প্রিয় ফিল্ড মার্শাল’ হয়ে উঠেছেন।
গত জুনে এক বৈঠকের পর, যেখানে তারা ইরানকে ঘিরে আগের উত্তেজনা নিয়ে আলোচনা করেন। ট্রাম্প তখন বলেন, পাকিস্তান ইরানকে ‘অন্যদের চেয়ে ভালো বোঝে’। পাকিস্তান ট্রাম্পের গাজা পরিকল্পনাতেও গুরুত্বপূর্ণভাবে যুক্ত ছিল, একই সময়ে আফগানিস্তানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানকে প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়েছে।
চাপ বাড়ছে
তবে পাকিস্তানের সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব যেখানে ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতাকে কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরছে, দেশের ভেতরে সেখানে গাজা ‘বোর্ড অব পিস’-এ অংশগ্রহণ এবং ট্রাম্পকে শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক অস্বস্তি রয়েছে।
পাকিস্তানের একজন শীর্ষস্থানীয় পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষক ও যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত সাবেক রাষ্ট্রদূত লিখেছেন– পাকিস্তানের গাজা থেকে দূরে থাকা উচিত। স্থানীয় বুদ্ধিজীবী ও অন্যান্য প্রভাবশালী মহল সামরিক ও বেসামরিক নেতৃত্বের ওপর ‘নিজেদের বিক্রি করে দেওয়া’র অভিযোগ তুলে চাপ বাড়িয়েছে। ইরান যুদ্ধ ও আফগানিস্তান সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
সৌদি আরবের ওপর ইরানের হামলার পর পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সতর্ক করেছেন, রিয়াদের সঙ্গে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির কারণে পাকিস্তানও এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে। একই সঙ্গে ইসলামাবাদ আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করছে।
কিছু বিশ্লেষক অভিযোগ করেছেন– সৌদিদের ওপর হামলার পর যথাযথ প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে পাকিস্তান তাদের হতাশ করেছে। সৌদি-পাকিস্তান সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ উমের করিম ‘অপূরণীয় সুনাম ক্ষতির’ ঝুঁকির কথা উল্লেখ করেছেন। অন্য প্রভাবশালী লোকজনও সরকারের সমালোচনা করেছেন। তারা বলছেন, সরকার দৃঢ় অবস্থান না নিয়ে সবাইকে খুশি করার চেষ্টা করছে, যেখানে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের বক্তব্য মূলত ‘উদ্বেগ’ বা ‘সংহতি’র কপি-পেস্ট ভাষায় সীমাবদ্ধ।
একই সময়ে, চলতি মাসের শুরুতে করাচিতে যুক্তরাষ্ট্রের কনস্যুলেটের সামনে বিক্ষোভকারীদের হত্যার ঘটনায় জনরোষ দেখা গেছে। সেখানে গুলি চালানোর অভিযোগ থাকা মার্কিন মেরিনদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের নিন্দা না জানানো নিয়েও ক্ষোভ রয়েছে। ইসলামাবাদ ও লাহোরে অন্যান্য মার্কিন কূটনৈতিক স্থাপনার সামনে বিক্ষোভ ঠেকাতে রাস্তাও বন্ধ করে দেওয়া হয়।
মানুষ স্পষ্টতই ইরান যুদ্ধ ও খামেনির হত্যাকাণ্ড নিয়ে ক্ষুব্ধ, পাশাপাশি পাকিস্তানের দুর্বল প্রতিক্রিয়ায় অসন্তুষ্ট। শিয়া অধ্যুষিত এলাকায় অস্থায়ী কারফিউ জারি হওয়ায় অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার বাস্তব ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ইসরায়েল সফরও আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা অবস্থানে ইসলামাবাদের জন্য নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী সতর্ক করেছেন, দেশটি চারদিক থেকে হুমকিতে ঘিরে যাচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে তারা হেডলাইটে পড়া হরিণের মতো– ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে অবস্থান নিতে হিমশিম খাচ্ছে, যখন দেশের ভেতরে ক্ষোভ বাড়ছে।
ভারত ও আফগানিস্তানের সঙ্গে উত্তেজনা ও সংঘাতের মধ্যে, ইরান ইস্যুতে হামলা যদি চলতে থাকে, তাহলে দ্রুত স্পষ্ট কৌশল না নিলে পাকিস্তান বড় সংকটে পড়তে পারে।
লেখক: মধ্যপ্রাচ্যের সমসাময়িক সামরিক ইতিহাসের বিশেষজ্ঞ। বর্তমানে তিনি ইনস্টিটিউট ফর স্টেটক্রাফটের ফেলো এবং আটলান্টিক কাউন্সিলে নন-রেসিডেন্ট সিনিয়র ফেলো হিসেবে কাজ করছেন। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সামরিক স্টাফ কলেজে পাঠদান করেন।
(লেখাটি ইস্ট আই-এর সৌজন্যে)

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধ তীব্রতর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা উপসাগরীয় অঞ্চল ও লেবাননজুড়ে সহিংসতা ছড়িয়ে দিয়েছে। এরফলে পাকিস্তানের ওপর কোনো এক পক্ষকে বেছে নেওয়ার জন্য অভ্যন্তরীণ চাপ বাড়ছে।
পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরেই প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোর লড়াইয়ের একটি ক্ষেত্র। বিশেষ করে সৌদি আরব ও ইরানকে ঘিরে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনের মধ্যস্থতায় এই দুই দেশের মধ্যে সমঝোতায় ইসলামাবাদ ভূমিকা রাখলেও, সেই নিরপেক্ষতা এখন বড় পরীক্ষার মুখে। তবে আফগানিস্তান সীমান্তে তালেবানের সঙ্গে চলমান সংঘাত, বেলুচিস্তান ও খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশে বিদ্রোহ, এবং ভারতের সঙ্গে উচ্চমাত্রার উত্তেজনার কারণে পাকিস্তান আর কোনো অস্থিরতা সামলানোর অবস্থায় নেই। উপসাগরীয় মিত্রদের কেউ কেউ ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার জবাব দেওয়ার সম্ভাবনা বিবেচনা করায়, ইসলামাবাদ কূটনৈতিকভাবে পরিস্থিতি শান্ত রাখার চেষ্টা করছে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ইরান আক্রমণের প্রাথমিক পর্যায়ে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর পাকিস্তান সরাসরি নিন্দা না করে ‘উদ্বেগ’ প্রকাশ করে একটি নরম বিবৃতি দেয়। এর বিপরীতে, পাকিস্তান দ্রুত উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর ইরানের হামলার ‘নিন্দা’ জানায়। যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি নিন্দা করতে পাকিস্তানের অনীহার একটি বড় কারণ হলো–সাম্প্রতিক মাসগুলোতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান বিষয়ে পাকিস্তানের ওপর নির্ভর করতে শুরু করেছেন। সেখানে সেনাপ্রধান আসিম মুনির তার ‘প্রিয় ফিল্ড মার্শাল’ হয়ে উঠেছেন।
গত জুনে এক বৈঠকের পর, যেখানে তারা ইরানকে ঘিরে আগের উত্তেজনা নিয়ে আলোচনা করেন। ট্রাম্প তখন বলেন, পাকিস্তান ইরানকে ‘অন্যদের চেয়ে ভালো বোঝে’। পাকিস্তান ট্রাম্পের গাজা পরিকল্পনাতেও গুরুত্বপূর্ণভাবে যুক্ত ছিল, একই সময়ে আফগানিস্তানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানকে প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়েছে।
চাপ বাড়ছে
তবে পাকিস্তানের সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব যেখানে ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতাকে কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরছে, দেশের ভেতরে সেখানে গাজা ‘বোর্ড অব পিস’-এ অংশগ্রহণ এবং ট্রাম্পকে শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক অস্বস্তি রয়েছে।
পাকিস্তানের একজন শীর্ষস্থানীয় পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষক ও যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত সাবেক রাষ্ট্রদূত লিখেছেন– পাকিস্তানের গাজা থেকে দূরে থাকা উচিত। স্থানীয় বুদ্ধিজীবী ও অন্যান্য প্রভাবশালী মহল সামরিক ও বেসামরিক নেতৃত্বের ওপর ‘নিজেদের বিক্রি করে দেওয়া’র অভিযোগ তুলে চাপ বাড়িয়েছে। ইরান যুদ্ধ ও আফগানিস্তান সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
সৌদি আরবের ওপর ইরানের হামলার পর পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সতর্ক করেছেন, রিয়াদের সঙ্গে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির কারণে পাকিস্তানও এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে। একই সঙ্গে ইসলামাবাদ আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করছে।
কিছু বিশ্লেষক অভিযোগ করেছেন– সৌদিদের ওপর হামলার পর যথাযথ প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে পাকিস্তান তাদের হতাশ করেছে। সৌদি-পাকিস্তান সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ উমের করিম ‘অপূরণীয় সুনাম ক্ষতির’ ঝুঁকির কথা উল্লেখ করেছেন। অন্য প্রভাবশালী লোকজনও সরকারের সমালোচনা করেছেন। তারা বলছেন, সরকার দৃঢ় অবস্থান না নিয়ে সবাইকে খুশি করার চেষ্টা করছে, যেখানে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের বক্তব্য মূলত ‘উদ্বেগ’ বা ‘সংহতি’র কপি-পেস্ট ভাষায় সীমাবদ্ধ।
একই সময়ে, চলতি মাসের শুরুতে করাচিতে যুক্তরাষ্ট্রের কনস্যুলেটের সামনে বিক্ষোভকারীদের হত্যার ঘটনায় জনরোষ দেখা গেছে। সেখানে গুলি চালানোর অভিযোগ থাকা মার্কিন মেরিনদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের নিন্দা না জানানো নিয়েও ক্ষোভ রয়েছে। ইসলামাবাদ ও লাহোরে অন্যান্য মার্কিন কূটনৈতিক স্থাপনার সামনে বিক্ষোভ ঠেকাতে রাস্তাও বন্ধ করে দেওয়া হয়।
মানুষ স্পষ্টতই ইরান যুদ্ধ ও খামেনির হত্যাকাণ্ড নিয়ে ক্ষুব্ধ, পাশাপাশি পাকিস্তানের দুর্বল প্রতিক্রিয়ায় অসন্তুষ্ট। শিয়া অধ্যুষিত এলাকায় অস্থায়ী কারফিউ জারি হওয়ায় অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার বাস্তব ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ইসরায়েল সফরও আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা অবস্থানে ইসলামাবাদের জন্য নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী সতর্ক করেছেন, দেশটি চারদিক থেকে হুমকিতে ঘিরে যাচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে তারা হেডলাইটে পড়া হরিণের মতো– ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে অবস্থান নিতে হিমশিম খাচ্ছে, যখন দেশের ভেতরে ক্ষোভ বাড়ছে।
ভারত ও আফগানিস্তানের সঙ্গে উত্তেজনা ও সংঘাতের মধ্যে, ইরান ইস্যুতে হামলা যদি চলতে থাকে, তাহলে দ্রুত স্পষ্ট কৌশল না নিলে পাকিস্তান বড় সংকটে পড়তে পারে।
লেখক: মধ্যপ্রাচ্যের সমসাময়িক সামরিক ইতিহাসের বিশেষজ্ঞ। বর্তমানে তিনি ইনস্টিটিউট ফর স্টেটক্রাফটের ফেলো এবং আটলান্টিক কাউন্সিলে নন-রেসিডেন্ট সিনিয়র ফেলো হিসেবে কাজ করছেন। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সামরিক স্টাফ কলেজে পাঠদান করেন।
(লেখাটি ইস্ট আই-এর সৌজন্যে)