তরুণ চক্রবর্তী

আদর্শ নিয়ে দোটানা রয়েছে। কিছু মানুষ বামপন্থায় বিশ্বাসী, আবার ডানপন্থায় বিশ্বাসী কিছু মানুষ। তবে বেশির ভাগই অবশ্য মধ্যপন্থী অবস্থানে। শুনতে সোনার পাথরবাটি মনে হলেও বিচিত্র এই উপমহাদেশে রয়েছে বাম, ডান, সেকুলার, কমিউনাল, আঞ্চলিক, আন্তর্জাতিক–হরেক কিসিমের রাজনৈতিক মতাদর্শের ককটেল। দক্ষিণ এশিয়ায় কট্টর ডান-বাম রাজনীতির বিকল্প হিসাবে মধ্যবর্তী পথটি বেশ জনপ্রিয়।
জন্মলগ্ন থেকেই ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোতে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার ধ্বজা উড়িয়ে ঘরোয়া রাজনীতিতে সফল যাত্রা শুরুর ঐতিহ্যও রয়েছে এই মধ্যপন্থীদের। সেই সাফল্যই পরবর্তীতে জন্ম দিয়েছে পরিবারতন্ত্রের। উদাহরণ শুধু আওয়ামী লীগ আর বিএনপির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিটি দেশই পরিবারতন্ত্র থেকে বের হতে পারছে না।
দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশ ভারত। জনসংখ্যা ১৪০ কোটি। ভারতের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে চোখ রাখলেই বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে। ভারতে সরাসরি ডান ও বাম দুই ধরনের রাজনীতিই বহুকাল ধরে চলছে। কিছুদিন আগেও বামেরা বেশ শক্তিশালী ছিল। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নামে সংসদীয় রাজনীতিতে বামেদের সর্বভারতীয় দাপট ছিল চোখে পড়ার মতো। পশ্চিমবঙ্গে টানা ৩৪ বছর ক্ষমতায় ছিল তারা। ত্রিপুরাতেও বামশাসন ছিল ৩০ বছরেরও বেশি। কেরালায় অবশ্য এখনও টানা ১০ বছর বাম গণতান্ত্রিক জোটের সরকার রয়েছে।
ভারতের একমাত্র বামশাসিত রাজ্য কেরালায় সামনেই নির্বাচন। তবে বিভিন্ন রাজনৈতিক জরিপ মতে, কেরালাতেও ডুবছে বামদূর্গ। গোটা দেশেই সংসদীয় রাজনীতিতে বামেদের বেহাল দশা চলছে। টেলিভিশনের টক শো আর সামাজিক মাধ্যমের বিভিন্ন পোস্ট ছাড়া তাদের খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় বামেরা জন্মশত্রু কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করেও একটি আসনে জিততে পারেনি। ত্রিপুরাতে তারা বিরোধী দলনেতার পদ পেলেও পরিস্থিতি সেখানেও খুব একটা ভালো নয়। ভারতের সংসদীয় রাজনীতিতে গণতন্ত্রে বিশ্বাসী বামেরা অনেকটাই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে।

ভারতীয় বামপন্থীদের মধ্যে আবার রয়েছে উগ্র-বামপন্থীরাও। নকশাল বা মাওবাদী নামে পরিচিত সশস্ত্র গেরিলা যোদ্ধা তারা। ভারতের বিস্তীর্ণ এলাকায় তারা অত্যাধুনিক অস্ত্র আর বামপন্থী আদর্শকে হাতিয়ার করে গড়ে তুলেছিল নিজস্ব লালদূর্গ। কিন্তু সেই দূর্গও অস্তমিত।
ভারত সরকারের ঘোষণা আগামী মার্চ মাসের মধ্যেই মাওবাদী বা নকশাল এলাকা বলে কিছু আর থাকবে না। এটা শুধু কথার কথা নয়, তার প্রমাণ হিসাবে সংখ্যাতত্ত্ব প্রকাশ করেছে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক। সেই সংখ্যাতত্ত্ব অনুযায়ী গত বছর নিরাপত্তারক্ষীদের হাতে ৩৩৫ জন মাওবাদী নেতা-কর্মী নিহত হয়েছেন। আত্মসমর্পণ করেছেন ২ হাজার ১৬৭ জন। গত এক দশকে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে মোট ১ হাজার ৮৬১ জন মাওবাদী নেতা-কর্মী নিহত হয়েছেন। গ্রেপ্তার করা হয়েছে ১৬ হাজার ৩৩৬ জনকে। আত্মসমর্পণ করেছেন ৯ হাজার ৫৮৮ জন। সিপিআই (মাওবাদী), পিএলজিএ (পিপলস লিবারেশন গেরিলা আর্মি) ইত্যাদি নামে আদিবাসী এলাকায় সন্ত্রাস সৃষ্টিকারীরা এখন অনেকটাই কোনঠাসা। ভারত সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের এপ্রিলে ১২৬টি জেলা ছিল মাওবাদী অধ্যুষিত। ২০২৫ সালের অক্টোবরে সেই সংখ্যা ১১টিতে নেমে এসেছে। ২০২৬ সালের মার্চে সেই সংখ্যাটি শূণ্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে ভারত সরকার। ফলে অতিবাম রাজনীতিও ধুঁকছে ভারতে।
এবার আসা যাক ডান বা দক্ষিণপন্থী রাজনীতিতে। কয়েক দশক আগেও সংসদীয় রাজনীতিতে বিজেপিকে বাইনোকুলার দিয়েও খুঁজে পাওয়া যেত না। এখন বিজেপি সর্বত্র। বামপন্থীদের দ্রুত পতনের মতোই ডানপন্থী দলটির উত্থানও দ্রুততার সঙ্গে ঘটেছে। বামেদের ঠিক বিপরীত আদর্শ নিয়ে বিজেপি বাজিমাৎ করার পরিকল্পনা নিয়েছিল। প্রাথমিকভাবে অটল বিহারী বাজপেয়ী, লালকৃষ্ণ আডবানী, মুরুল মনোহর যোশীরা সেই লক্ষ্যেই এগোচ্ছিলেন।

কিন্তু ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহেরা বিজেপির লাগাম হাতে নিয়েই বুঝে যান, শুধু আদর্শ দিয়ে চিঁড়ে ভিজবে না। তাই শুরু হয় দলবদলের খেলা। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল থেকে নেতা ভাঙিয়ে এনে বিজেপি তাদের প্রভাব বিস্তার করতে থাকে। সেইসঙ্গে কংগ্রেসকে দুর্বল করার খেলায় মেতে ওঠে। পরিবারতন্ত্রের অভিযোগ তুলে পারিবারিক রাজনীতিকেও সমান গুরুত্ব দিতে থাকে বিজেপির বর্তমান নেতৃত্ব। নরেন্দ্র মোদির সংসার না থাকলেও অমিত শাহের ছেলে ভারতীয় ক্রিকেটের সর্বময় কর্তা। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির নেতা শুভেন্দু অধিকারীও পারিবারিক রাজনীতি থেকেই উঠে এসেছেন। আসলে ডান বা বাম আদর্শের ভিত্তি ছাড়া এই উপমহাদেশে পরিবারতন্ত্রকে বাদ দিয়ে রাজনৈতিক সাফল্য ধরে রাখা অসম্ভব। মোঘলদের ইতিহাস আমাদের অজানা নয়।
ভারতে একাধিক সোশ্যালিস্ট বা সমাজবাদী দল গঠিত হলেও কালের নিয়মে সেটাও চলে পারিবারিক নিয়ন্ত্রণেই। যেমন, উত্তরপ্রদেশে প্রয়াত মুলায়ম সিং যাদব অন্য নেতাদের সঙ্গে নিয়ে সমাজবাদী দল (এসপি) প্রতিষ্ঠা করলেও এখন তার ছেলে অখিলেশ সেই দলের মাথা। একইভাবে লালুপ্রসাদ যাদব রাষ্ট্রীয় জনতা দল তৈরি করলেও তার ছেলে তেজস্বী যাদব দলের সর্বময় কর্তা। প্রথম শ্রেণীর কংগ্রেস নেতাদের সঙ্গে নিয়ে মমতা ব্যানার্জি তৃণমূল কংগ্রেস তৈরি করলেও তার ভাইপো অভিষেক ব্যানার্জি দলের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতা। আবার তামিলনাডুর প্রয়াত এআইডিএমকে নেত্রী জয়ললিতার কোনো সংসার না থাকায় দলটিই প্রায় উঠে গিয়েছে।
ভারতে বেশির ভাগ রাজনৈতিক দলের জন্ম হয়েছে কংগ্রেস নেতৃত্বের সঙ্গে মনোমালিন্যের জেরে। আরও স্পষ্ট করে বললে গান্ধী পরিবারের সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায়। বেশির ভাগ দলেই তাই প্রাক্তন কংগ্রেসিদেরই রমরমা। রাজনীতির ধরনটাও এক। বাম বা ডানেদের সঙ্গে পার্থক্য বিস্তর। তবে মিলও কম পাবেন না। ভোটের ভারসাম্য তাদের মধ্যপন্থাতেই জিইয়ে রেখেছে। নেতাদের মতো সাধারণ মানুষও এই পরিবারতন্ত্রকেই মেনে নিয়েছে। বা, মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে।
ভারতের মানুষ উগ্র বা প্রত্যক্ষ বাম বা ডান রাজনীতিকে পছন্দ করেন না। আদর্শের থেকেও অনেক বেশি কাজ করে জনসংযোগ ও জনসম্পর্ক। সমঝোতা ও প্রতিশ্রুতি। নির্বাচনে এখন অনেক বেশি প্রযুক্তি ও কৌশল ব্যবহৃত হয়। আদর্শ তেমন একটা দাগ কাটতে পারছে না। আদর্শভিত্তিক দলগুলো (সেই আদর্শের প্রতি আপনার সমর্থন থাকুক বা না থাকুক) সেটা বুঝতে পারছে। এক্ষেত্রে ‘আমরা সবাই রাজা’ মানসিকতাও কিছুটা দায়ী। দেখা গিয়েছে, মধ্যপন্থী দলগুলোতে পরিবারের বাইরে থেকে কোনো একজনকে সর্বোচ্চ নেতৃত্বে উত্তরসূরী হিসাবে তৈরি করা হয় না। কেউ নিজে থেকে তৈরি হওয়ার সুযোগও পান না। দল ভাঙে।
পারিবারিক উত্তরসূরী ব্যর্থ হলেও তার প্রতি আস্থা অটুট রেখে নিজেদের রাজনৈতিক পেশাকে জিইয়ে রাখতে চান অন্যরা। তাই রাহুল গান্ধী বা প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর দাদি বা ঠাকুমা ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে রাজনীতি করা নেতারাও মেনে নিয়েছেন নাতি-নাতনি সমদের উত্থান। কারণ বিকল্প নেই। মল্লিকার্জুন খাড়্গে কংগ্রেস সভাপতি হলেও তিনিও জানেন দলের অন্তত এক ডজন নেতা নিজেদেরকে তার থেকে বড় ও যোগ্য বলে মনে করেন। এই যোগ্যতার কোনো মাপকাঠি নেই। তাই আদর্শহীন রাজনীতিতে পারিবারতন্ত্রই এই উপমহাদেশের ভবিতব্য। ভারতের কংগ্রেস বা তৃণমূল কংগ্রেস, বাংলাদেশের বিএনপি বা আওয়ামী লীগ বলে কথা নয়, মধ্যপন্থী দলগুলোর কাছে অমুকের ছেলে বা মেয়ে বা বউ ছাড়া গতি নেই। তবে বিজেপি, কমিউনিস্ট পার্টি বা জামায়াত, সিপিবির সেই সমস্যা নেই।
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, কলকাতা (ভারত)

আদর্শ নিয়ে দোটানা রয়েছে। কিছু মানুষ বামপন্থায় বিশ্বাসী, আবার ডানপন্থায় বিশ্বাসী কিছু মানুষ। তবে বেশির ভাগই অবশ্য মধ্যপন্থী অবস্থানে। শুনতে সোনার পাথরবাটি মনে হলেও বিচিত্র এই উপমহাদেশে রয়েছে বাম, ডান, সেকুলার, কমিউনাল, আঞ্চলিক, আন্তর্জাতিক–হরেক কিসিমের রাজনৈতিক মতাদর্শের ককটেল। দক্ষিণ এশিয়ায় কট্টর ডান-বাম রাজনীতির বিকল্প হিসাবে মধ্যবর্তী পথটি বেশ জনপ্রিয়।
জন্মলগ্ন থেকেই ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোতে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার ধ্বজা উড়িয়ে ঘরোয়া রাজনীতিতে সফল যাত্রা শুরুর ঐতিহ্যও রয়েছে এই মধ্যপন্থীদের। সেই সাফল্যই পরবর্তীতে জন্ম দিয়েছে পরিবারতন্ত্রের। উদাহরণ শুধু আওয়ামী লীগ আর বিএনপির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিটি দেশই পরিবারতন্ত্র থেকে বের হতে পারছে না।
দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশ ভারত। জনসংখ্যা ১৪০ কোটি। ভারতের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে চোখ রাখলেই বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে। ভারতে সরাসরি ডান ও বাম দুই ধরনের রাজনীতিই বহুকাল ধরে চলছে। কিছুদিন আগেও বামেরা বেশ শক্তিশালী ছিল। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নামে সংসদীয় রাজনীতিতে বামেদের সর্বভারতীয় দাপট ছিল চোখে পড়ার মতো। পশ্চিমবঙ্গে টানা ৩৪ বছর ক্ষমতায় ছিল তারা। ত্রিপুরাতেও বামশাসন ছিল ৩০ বছরেরও বেশি। কেরালায় অবশ্য এখনও টানা ১০ বছর বাম গণতান্ত্রিক জোটের সরকার রয়েছে।
ভারতের একমাত্র বামশাসিত রাজ্য কেরালায় সামনেই নির্বাচন। তবে বিভিন্ন রাজনৈতিক জরিপ মতে, কেরালাতেও ডুবছে বামদূর্গ। গোটা দেশেই সংসদীয় রাজনীতিতে বামেদের বেহাল দশা চলছে। টেলিভিশনের টক শো আর সামাজিক মাধ্যমের বিভিন্ন পোস্ট ছাড়া তাদের খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় বামেরা জন্মশত্রু কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করেও একটি আসনে জিততে পারেনি। ত্রিপুরাতে তারা বিরোধী দলনেতার পদ পেলেও পরিস্থিতি সেখানেও খুব একটা ভালো নয়। ভারতের সংসদীয় রাজনীতিতে গণতন্ত্রে বিশ্বাসী বামেরা অনেকটাই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে।

ভারতীয় বামপন্থীদের মধ্যে আবার রয়েছে উগ্র-বামপন্থীরাও। নকশাল বা মাওবাদী নামে পরিচিত সশস্ত্র গেরিলা যোদ্ধা তারা। ভারতের বিস্তীর্ণ এলাকায় তারা অত্যাধুনিক অস্ত্র আর বামপন্থী আদর্শকে হাতিয়ার করে গড়ে তুলেছিল নিজস্ব লালদূর্গ। কিন্তু সেই দূর্গও অস্তমিত।
ভারত সরকারের ঘোষণা আগামী মার্চ মাসের মধ্যেই মাওবাদী বা নকশাল এলাকা বলে কিছু আর থাকবে না। এটা শুধু কথার কথা নয়, তার প্রমাণ হিসাবে সংখ্যাতত্ত্ব প্রকাশ করেছে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক। সেই সংখ্যাতত্ত্ব অনুযায়ী গত বছর নিরাপত্তারক্ষীদের হাতে ৩৩৫ জন মাওবাদী নেতা-কর্মী নিহত হয়েছেন। আত্মসমর্পণ করেছেন ২ হাজার ১৬৭ জন। গত এক দশকে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে মোট ১ হাজার ৮৬১ জন মাওবাদী নেতা-কর্মী নিহত হয়েছেন। গ্রেপ্তার করা হয়েছে ১৬ হাজার ৩৩৬ জনকে। আত্মসমর্পণ করেছেন ৯ হাজার ৫৮৮ জন। সিপিআই (মাওবাদী), পিএলজিএ (পিপলস লিবারেশন গেরিলা আর্মি) ইত্যাদি নামে আদিবাসী এলাকায় সন্ত্রাস সৃষ্টিকারীরা এখন অনেকটাই কোনঠাসা। ভারত সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের এপ্রিলে ১২৬টি জেলা ছিল মাওবাদী অধ্যুষিত। ২০২৫ সালের অক্টোবরে সেই সংখ্যা ১১টিতে নেমে এসেছে। ২০২৬ সালের মার্চে সেই সংখ্যাটি শূণ্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে ভারত সরকার। ফলে অতিবাম রাজনীতিও ধুঁকছে ভারতে।
এবার আসা যাক ডান বা দক্ষিণপন্থী রাজনীতিতে। কয়েক দশক আগেও সংসদীয় রাজনীতিতে বিজেপিকে বাইনোকুলার দিয়েও খুঁজে পাওয়া যেত না। এখন বিজেপি সর্বত্র। বামপন্থীদের দ্রুত পতনের মতোই ডানপন্থী দলটির উত্থানও দ্রুততার সঙ্গে ঘটেছে। বামেদের ঠিক বিপরীত আদর্শ নিয়ে বিজেপি বাজিমাৎ করার পরিকল্পনা নিয়েছিল। প্রাথমিকভাবে অটল বিহারী বাজপেয়ী, লালকৃষ্ণ আডবানী, মুরুল মনোহর যোশীরা সেই লক্ষ্যেই এগোচ্ছিলেন।

কিন্তু ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহেরা বিজেপির লাগাম হাতে নিয়েই বুঝে যান, শুধু আদর্শ দিয়ে চিঁড়ে ভিজবে না। তাই শুরু হয় দলবদলের খেলা। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল থেকে নেতা ভাঙিয়ে এনে বিজেপি তাদের প্রভাব বিস্তার করতে থাকে। সেইসঙ্গে কংগ্রেসকে দুর্বল করার খেলায় মেতে ওঠে। পরিবারতন্ত্রের অভিযোগ তুলে পারিবারিক রাজনীতিকেও সমান গুরুত্ব দিতে থাকে বিজেপির বর্তমান নেতৃত্ব। নরেন্দ্র মোদির সংসার না থাকলেও অমিত শাহের ছেলে ভারতীয় ক্রিকেটের সর্বময় কর্তা। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির নেতা শুভেন্দু অধিকারীও পারিবারিক রাজনীতি থেকেই উঠে এসেছেন। আসলে ডান বা বাম আদর্শের ভিত্তি ছাড়া এই উপমহাদেশে পরিবারতন্ত্রকে বাদ দিয়ে রাজনৈতিক সাফল্য ধরে রাখা অসম্ভব। মোঘলদের ইতিহাস আমাদের অজানা নয়।
ভারতে একাধিক সোশ্যালিস্ট বা সমাজবাদী দল গঠিত হলেও কালের নিয়মে সেটাও চলে পারিবারিক নিয়ন্ত্রণেই। যেমন, উত্তরপ্রদেশে প্রয়াত মুলায়ম সিং যাদব অন্য নেতাদের সঙ্গে নিয়ে সমাজবাদী দল (এসপি) প্রতিষ্ঠা করলেও এখন তার ছেলে অখিলেশ সেই দলের মাথা। একইভাবে লালুপ্রসাদ যাদব রাষ্ট্রীয় জনতা দল তৈরি করলেও তার ছেলে তেজস্বী যাদব দলের সর্বময় কর্তা। প্রথম শ্রেণীর কংগ্রেস নেতাদের সঙ্গে নিয়ে মমতা ব্যানার্জি তৃণমূল কংগ্রেস তৈরি করলেও তার ভাইপো অভিষেক ব্যানার্জি দলের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতা। আবার তামিলনাডুর প্রয়াত এআইডিএমকে নেত্রী জয়ললিতার কোনো সংসার না থাকায় দলটিই প্রায় উঠে গিয়েছে।
ভারতে বেশির ভাগ রাজনৈতিক দলের জন্ম হয়েছে কংগ্রেস নেতৃত্বের সঙ্গে মনোমালিন্যের জেরে। আরও স্পষ্ট করে বললে গান্ধী পরিবারের সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায়। বেশির ভাগ দলেই তাই প্রাক্তন কংগ্রেসিদেরই রমরমা। রাজনীতির ধরনটাও এক। বাম বা ডানেদের সঙ্গে পার্থক্য বিস্তর। তবে মিলও কম পাবেন না। ভোটের ভারসাম্য তাদের মধ্যপন্থাতেই জিইয়ে রেখেছে। নেতাদের মতো সাধারণ মানুষও এই পরিবারতন্ত্রকেই মেনে নিয়েছে। বা, মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে।
ভারতের মানুষ উগ্র বা প্রত্যক্ষ বাম বা ডান রাজনীতিকে পছন্দ করেন না। আদর্শের থেকেও অনেক বেশি কাজ করে জনসংযোগ ও জনসম্পর্ক। সমঝোতা ও প্রতিশ্রুতি। নির্বাচনে এখন অনেক বেশি প্রযুক্তি ও কৌশল ব্যবহৃত হয়। আদর্শ তেমন একটা দাগ কাটতে পারছে না। আদর্শভিত্তিক দলগুলো (সেই আদর্শের প্রতি আপনার সমর্থন থাকুক বা না থাকুক) সেটা বুঝতে পারছে। এক্ষেত্রে ‘আমরা সবাই রাজা’ মানসিকতাও কিছুটা দায়ী। দেখা গিয়েছে, মধ্যপন্থী দলগুলোতে পরিবারের বাইরে থেকে কোনো একজনকে সর্বোচ্চ নেতৃত্বে উত্তরসূরী হিসাবে তৈরি করা হয় না। কেউ নিজে থেকে তৈরি হওয়ার সুযোগও পান না। দল ভাঙে।
পারিবারিক উত্তরসূরী ব্যর্থ হলেও তার প্রতি আস্থা অটুট রেখে নিজেদের রাজনৈতিক পেশাকে জিইয়ে রাখতে চান অন্যরা। তাই রাহুল গান্ধী বা প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর দাদি বা ঠাকুমা ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে রাজনীতি করা নেতারাও মেনে নিয়েছেন নাতি-নাতনি সমদের উত্থান। কারণ বিকল্প নেই। মল্লিকার্জুন খাড়্গে কংগ্রেস সভাপতি হলেও তিনিও জানেন দলের অন্তত এক ডজন নেতা নিজেদেরকে তার থেকে বড় ও যোগ্য বলে মনে করেন। এই যোগ্যতার কোনো মাপকাঠি নেই। তাই আদর্শহীন রাজনীতিতে পারিবারতন্ত্রই এই উপমহাদেশের ভবিতব্য। ভারতের কংগ্রেস বা তৃণমূল কংগ্রেস, বাংলাদেশের বিএনপি বা আওয়ামী লীগ বলে কথা নয়, মধ্যপন্থী দলগুলোর কাছে অমুকের ছেলে বা মেয়ে বা বউ ছাড়া গতি নেই। তবে বিজেপি, কমিউনিস্ট পার্টি বা জামায়াত, সিপিবির সেই সমস্যা নেই।
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, কলকাতা (ভারত)