চরচা ডেস্ক

পরিবারে বড় সন্তানের তুলনায় ছোট ভাইবোনেরা পড়াশোনা ও আয়ের মতো সূচকে পিছিয়ে থাকে– এমন ধারণা বহুদিনের। এই বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন গবেষণায় বারবার দেখা গেছে, প্রথম সন্তানরা সাধারণত শিক্ষাগত সাফল্য এবং ভবিষ্যৎ আয়ের ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকে। তবে এর কারণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক ছিল।
অনেকেই মনে করতেন, বড় সন্তানেরা বেশি দায়িত্বশীল আর ছোটরা কিছুটা বিদ্রোহী স্বভাবের হয় এবং এই মানসিক পার্থক্যই সাফল্যের ব্যবধান তৈরি করে। কিন্তু সাম্প্রতিক এক গবেষণা এই প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বলছে, এর পেছনে বড় ভূমিকা থাকতে পারে একেবারে ভিন্ন একটি বিষয়। আর তা হলো– অসুস্থতা বা জীবাণুর প্রভাব। ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টের সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই বিশ্লেষণটি তুলে ধরা হয়েছে।
জন্মক্রম অনুযায়ী সাফল্যের পার্থক্য নিয়ে বহু দশক ধরে গবেষণা চলছে। ২০০৫ সালে নরওয়ের জনসংখ্যার ওপর পরিচালিত এক বড় গবেষণায় দেখা যায়, পরিবারের ছোট সন্তানেরা তুলনামূলকভাবে দ্রুত পড়াশোনা ছেড়ে দেয় এবং প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর তাদের আয়ও কম হয়। পরিবারে যত বেশি সন্তান, এই ব্যবধান তত বাড়তে থাকে। এমনকি ছোট মেয়েদের ক্ষেত্রে কিশোরী অবস্থায় গর্ভধারণের হারও তুলনামূলক বেশি দেখা যায়।
তবে নতুন গবেষণাটি এই পার্থক্যের একটি ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ডেনমার্কের গবেষকেরা যৌথভাবে পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখেছেন, ছোট ভাই-বোনদের জীবনের শুরুর দিকে অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকি বেশি। বিশেষ করে, বড় ভাই-বোনেরা বাড়িতে জীবাণু বহন করে নিয়ে আসতে পারে, যা নবজাতক বা ছোট শিশুদের সংক্রমিত করে।
ডেনমার্কের প্রশাসনিক তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা দেখেছেন, দ্বিতীয় বা পরবর্তী সন্তানদের জীবনের প্রথম বছরে গুরুতর শ্বাসযন্ত্রের রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার সম্ভাবনা প্রথম সন্তানদের তুলনায় দুই থেকে তিন গুণ বেশি।

এই প্রাথমিক স্বাস্থ্যঝুঁকি শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। গবেষণায় বলা হয়েছে, অসুস্থতা সরাসরি মস্তিষ্কে প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে, যা স্বাভাবিক বিকাশে বাধা দেয়। আবার পরোক্ষভাবেও প্রভাব ফেলে– যখন শরীর রোগের সঙ্গে লড়াই করে, তখন মস্তিষ্কের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তির একটি অংশ অন্যত্র ব্যয় হয়। ফলে শিশুর মানসিক বিকাশে ঘাটতি তৈরি হতে পারে।
গবেষকেরা আরও দেখেছেন, শৈশবের এই স্বাস্থ্যঝুঁকির সঙ্গে ভবিষ্যৎ আয়ের একটি সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। অর্থাৎ, যারা ছোটবেলায় বেশি অসুস্থ হয়েছে, বড় হওয়ার পর তাদের আয় তুলনামূলক কম হয়। ডেনমার্কের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম ও দ্বিতীয় সন্তানের মধ্যে আয়ের যে প্রায় ১.৯ শতাংশ ব্যবধান দেখা যায়, তার প্রায় অর্ধেকই এই অসুস্থতার কারণে ব্যাখ্যা করা সম্ভব।
এছাড়া গর্ভাবস্থায় মায়ের জ্বর বা শ্বাসযন্ত্রের রোগও ভ্রূণের মস্তিষ্কের বিকাশে প্রভাব ফেলতে পারে, এমন প্রমাণও অন্য গবেষণায় পাওয়া গেছে। অর্থাৎ, জন্মের আগে এবং পরে– দুই পর্যায়েই স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি ভবিষ্যতের সক্ষমতায় প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে শুধু অসুস্থতা নয়, পারিবারিক আচরণও এই পার্থক্যে বড় ভূমিকা রাখে। যুক্তরাষ্ট্রের সময়-ব্যবহার সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, প্রথম সন্তানেরা প্রতিদিন গড়ে ২০ থেকে ৩০ মিনিট বেশি কোয়ালিটি টাইম পায় তাদের বাবা-মায়ের কাছ থেকে। এই সময়ের মধ্যে পড়াশোনা, গল্প করা, খেলাধুলা বা অন্যান্য মানসিক বিকাশে সহায়ক কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত থাকে।
গবেষকেরা মনে করেন, বাবা-মা সাধারণত একসঙ্গে সব সন্তানকে সমান সময় দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু প্রথম সন্তানের ক্ষেত্রে সে যখন একমাত্র সন্তান থাকে, তখন সে পুরো মনোযোগ পায়। পরে নতুন সন্তান জন্মালে সেই মনোযোগ ভাগ হয়ে যায়। ফলে প্রথম সন্তান তার শৈশবের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে বেশি মনোযোগ ও মানসিক উদ্দীপনা পায়, যা তার বুদ্ধিবিকাশে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
অন্যদিকে, ছোট ভাইবোনদের ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের সময় ও মনোযোগ তুলনামূলকভাবে কমে যায়, বিশেষ করে যখন পরিবারে একাধিক শিশু থাকে। এর ফলে তাদের বিকাশে কিছুটা পিছিয়ে পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়।

সব মিলিয়ে, এই নতুন গবেষণা দেখাচ্ছে যে, জন্মক্রমের প্রভাব কেবল মানসিক বা সামাজিক নয়, বরং জৈবিক ও পরিবেশগত কারণের সমন্বয়ে গঠিত। অসুস্থতার ঝুঁকি, শৈশবের স্বাস্থ্য এবং বাবা-মায়ের সময়– সবকিছু মিলেই বড় ও ছোট সন্তানের মধ্যে পার্থক্য তৈরি করে।
গবেষণাটি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে– ছোট ভাই-বোনদের অভিযোগ যে তারা কম মনোযোগ পায়, তা পুরোপুরি ভিত্তিহীন নয়। বাস্তবেই তারা কিছু ক্ষেত্রে বঞ্চিত হয়, যা তাদের ভবিষ্যৎ সাফল্যে প্রভাব ফেলতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে গবেষকেরা মনে করছেন, ছোট সন্তানদের জন্য অতিরিক্ত যত্ন, স্বাস্থ্যসেবা এবং মানসিক উদ্দীপনা নিশ্চিত করা গেলে এই ব্যবধান কমানো সম্ভব। অর্থাৎ, সঠিক নীতিনির্ধারণ ও সচেতনতার মাধ্যমে জন্মক্রমজনিত এই বৈষম্য কিছুটা হলেও দূর করা যেতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, ‘বড় সন্তান বেশি বুদ্ধিমান’– এই প্রচলিত ধারণার পেছনে কেবল সামাজিক বা মানসিক ব্যাখ্যা নয়, বরং বৈজ্ঞানিক ভিত্তিও রয়েছে। তবে এই পার্থক্য অপরিবর্তনীয় নয়; বরং যথাযথ পরিবেশ ও যত্নের মাধ্যমে প্রতিটি শিশুই তার পূর্ণ সম্ভাবনা অর্জন করতে পারে।

পরিবারে বড় সন্তানের তুলনায় ছোট ভাইবোনেরা পড়াশোনা ও আয়ের মতো সূচকে পিছিয়ে থাকে– এমন ধারণা বহুদিনের। এই বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন গবেষণায় বারবার দেখা গেছে, প্রথম সন্তানরা সাধারণত শিক্ষাগত সাফল্য এবং ভবিষ্যৎ আয়ের ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকে। তবে এর কারণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক ছিল।
অনেকেই মনে করতেন, বড় সন্তানেরা বেশি দায়িত্বশীল আর ছোটরা কিছুটা বিদ্রোহী স্বভাবের হয় এবং এই মানসিক পার্থক্যই সাফল্যের ব্যবধান তৈরি করে। কিন্তু সাম্প্রতিক এক গবেষণা এই প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বলছে, এর পেছনে বড় ভূমিকা থাকতে পারে একেবারে ভিন্ন একটি বিষয়। আর তা হলো– অসুস্থতা বা জীবাণুর প্রভাব। ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টের সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই বিশ্লেষণটি তুলে ধরা হয়েছে।
জন্মক্রম অনুযায়ী সাফল্যের পার্থক্য নিয়ে বহু দশক ধরে গবেষণা চলছে। ২০০৫ সালে নরওয়ের জনসংখ্যার ওপর পরিচালিত এক বড় গবেষণায় দেখা যায়, পরিবারের ছোট সন্তানেরা তুলনামূলকভাবে দ্রুত পড়াশোনা ছেড়ে দেয় এবং প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর তাদের আয়ও কম হয়। পরিবারে যত বেশি সন্তান, এই ব্যবধান তত বাড়তে থাকে। এমনকি ছোট মেয়েদের ক্ষেত্রে কিশোরী অবস্থায় গর্ভধারণের হারও তুলনামূলক বেশি দেখা যায়।
তবে নতুন গবেষণাটি এই পার্থক্যের একটি ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ডেনমার্কের গবেষকেরা যৌথভাবে পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখেছেন, ছোট ভাই-বোনদের জীবনের শুরুর দিকে অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকি বেশি। বিশেষ করে, বড় ভাই-বোনেরা বাড়িতে জীবাণু বহন করে নিয়ে আসতে পারে, যা নবজাতক বা ছোট শিশুদের সংক্রমিত করে।
ডেনমার্কের প্রশাসনিক তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা দেখেছেন, দ্বিতীয় বা পরবর্তী সন্তানদের জীবনের প্রথম বছরে গুরুতর শ্বাসযন্ত্রের রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার সম্ভাবনা প্রথম সন্তানদের তুলনায় দুই থেকে তিন গুণ বেশি।

এই প্রাথমিক স্বাস্থ্যঝুঁকি শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। গবেষণায় বলা হয়েছে, অসুস্থতা সরাসরি মস্তিষ্কে প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে, যা স্বাভাবিক বিকাশে বাধা দেয়। আবার পরোক্ষভাবেও প্রভাব ফেলে– যখন শরীর রোগের সঙ্গে লড়াই করে, তখন মস্তিষ্কের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তির একটি অংশ অন্যত্র ব্যয় হয়। ফলে শিশুর মানসিক বিকাশে ঘাটতি তৈরি হতে পারে।
গবেষকেরা আরও দেখেছেন, শৈশবের এই স্বাস্থ্যঝুঁকির সঙ্গে ভবিষ্যৎ আয়ের একটি সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। অর্থাৎ, যারা ছোটবেলায় বেশি অসুস্থ হয়েছে, বড় হওয়ার পর তাদের আয় তুলনামূলক কম হয়। ডেনমার্কের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম ও দ্বিতীয় সন্তানের মধ্যে আয়ের যে প্রায় ১.৯ শতাংশ ব্যবধান দেখা যায়, তার প্রায় অর্ধেকই এই অসুস্থতার কারণে ব্যাখ্যা করা সম্ভব।
এছাড়া গর্ভাবস্থায় মায়ের জ্বর বা শ্বাসযন্ত্রের রোগও ভ্রূণের মস্তিষ্কের বিকাশে প্রভাব ফেলতে পারে, এমন প্রমাণও অন্য গবেষণায় পাওয়া গেছে। অর্থাৎ, জন্মের আগে এবং পরে– দুই পর্যায়েই স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি ভবিষ্যতের সক্ষমতায় প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে শুধু অসুস্থতা নয়, পারিবারিক আচরণও এই পার্থক্যে বড় ভূমিকা রাখে। যুক্তরাষ্ট্রের সময়-ব্যবহার সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, প্রথম সন্তানেরা প্রতিদিন গড়ে ২০ থেকে ৩০ মিনিট বেশি কোয়ালিটি টাইম পায় তাদের বাবা-মায়ের কাছ থেকে। এই সময়ের মধ্যে পড়াশোনা, গল্প করা, খেলাধুলা বা অন্যান্য মানসিক বিকাশে সহায়ক কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত থাকে।
গবেষকেরা মনে করেন, বাবা-মা সাধারণত একসঙ্গে সব সন্তানকে সমান সময় দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু প্রথম সন্তানের ক্ষেত্রে সে যখন একমাত্র সন্তান থাকে, তখন সে পুরো মনোযোগ পায়। পরে নতুন সন্তান জন্মালে সেই মনোযোগ ভাগ হয়ে যায়। ফলে প্রথম সন্তান তার শৈশবের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে বেশি মনোযোগ ও মানসিক উদ্দীপনা পায়, যা তার বুদ্ধিবিকাশে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
অন্যদিকে, ছোট ভাইবোনদের ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের সময় ও মনোযোগ তুলনামূলকভাবে কমে যায়, বিশেষ করে যখন পরিবারে একাধিক শিশু থাকে। এর ফলে তাদের বিকাশে কিছুটা পিছিয়ে পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়।

সব মিলিয়ে, এই নতুন গবেষণা দেখাচ্ছে যে, জন্মক্রমের প্রভাব কেবল মানসিক বা সামাজিক নয়, বরং জৈবিক ও পরিবেশগত কারণের সমন্বয়ে গঠিত। অসুস্থতার ঝুঁকি, শৈশবের স্বাস্থ্য এবং বাবা-মায়ের সময়– সবকিছু মিলেই বড় ও ছোট সন্তানের মধ্যে পার্থক্য তৈরি করে।
গবেষণাটি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে– ছোট ভাই-বোনদের অভিযোগ যে তারা কম মনোযোগ পায়, তা পুরোপুরি ভিত্তিহীন নয়। বাস্তবেই তারা কিছু ক্ষেত্রে বঞ্চিত হয়, যা তাদের ভবিষ্যৎ সাফল্যে প্রভাব ফেলতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে গবেষকেরা মনে করছেন, ছোট সন্তানদের জন্য অতিরিক্ত যত্ন, স্বাস্থ্যসেবা এবং মানসিক উদ্দীপনা নিশ্চিত করা গেলে এই ব্যবধান কমানো সম্ভব। অর্থাৎ, সঠিক নীতিনির্ধারণ ও সচেতনতার মাধ্যমে জন্মক্রমজনিত এই বৈষম্য কিছুটা হলেও দূর করা যেতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, ‘বড় সন্তান বেশি বুদ্ধিমান’– এই প্রচলিত ধারণার পেছনে কেবল সামাজিক বা মানসিক ব্যাখ্যা নয়, বরং বৈজ্ঞানিক ভিত্তিও রয়েছে। তবে এই পার্থক্য অপরিবর্তনীয় নয়; বরং যথাযথ পরিবেশ ও যত্নের মাধ্যমে প্রতিটি শিশুই তার পূর্ণ সম্ভাবনা অর্জন করতে পারে।