চরচা ডেস্ক

যুক্তরাষ্ট্রের হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসের সদস্য (নিউ জার্সির ফোর্থ ডিস্ট্রিক্ট) ক্রিস স্মিথ ওয়াশিংটন এক্সামিনার-এ প্রকাশিত তার একটি সাম্প্রতিক নিবন্ধে ভারত-মার্কিন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের এক অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও জটিল বাঁককে উন্মোচন করেছেন। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও যখন ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সফরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, ঠিক সেই মুহূর্তে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন সরকার এমন একটি আইন পাসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে যা দুই দেশের মধ্যকার দীর্ঘদিনের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সম্পর্ককে চিরতরে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
কংগ্রেস সদস্য স্মিথ অত্যন্ত স্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন যে, আগামী ২১ জুলাই থেকে ১২ আগস্ট পর্যন্ত অনুষ্ঠেয় ভারতের পার্লামেন্টে ‘বর্ষাকালীন অধিবেশন’-এ মোদি সরকার তাদের কুখ্যাত ‘ফরেইন কন্ট্রিবিউশন রেগুলেশন অ্যাক্ট’ বা বৈদেশিক অনুদান নিয়ন্ত্রণ আইনের একটি নতুন সংশোধনী বিল আনতে চলেছে। যদি এই বিলটি ভারতীয় পার্লামেন্ট পাস হয়ে যায়, তবে তা ভারতের ধর্মীয় সংখ্যালঘু, বিশেষ করে খ্রিস্টান সম্প্রদায় এবং তাদের দ্বারা পরিচালিত দাতব্য সংস্থাগুলোর অস্তিত্বের ওপর এক চরম আঘাত নেমে আসবে। স্মিথের মতে, এই বিলটি প্রত্যাহার করা বা একপাশে সরিয়ে রাখা কেবল ভারতের অভ্যন্তরীণ শান্তির জন্যই নয়, বরং ওয়াশিংটন ও নয়াদিল্লির মধ্যকার ‘উইন-উইন’ বা পারস্পরিক বিজয়ের এক অনন্য সুযোগ তৈরি করবে।
এফসিআরএ সংশোধনীর ভয়াবহতা ও এর আইনি ফাঁদ
কংগ্রেস সদস্য ক্রিস স্মিথ তার বিশ্লেষণে এই নতুন প্রস্তাবিত আইনের ভেতরের চরম বৈষম্যমূলক ও শাস্তিমূলক ধারাগুলোকে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছেন। নতুন সংশোধনীটি পাস হলে, ভারত সরকারের রাষ্ট্রীয় প্রশাসন এমন এক সীমাহীন ক্ষমতা লাভ করবে যার মাধ্যমে তারা যেকোনো বিদেশি অনুদানপ্রাপ্ত গোষ্ঠীর সমস্ত স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি এবং সম্পদ সরাসরি বাজেয়াপ্ত করতে পারবে। এই ধরনের বিদেশি তহবিলপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর সিংহভাগই হলো ভারতের স্থানীয় খ্রিস্টান চার্চ এবং তাদের দ্বারা পরিচালিত বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক দাতব্য প্রতিষ্ঠান, যেমন নামী হাসপাতাল, অনাথ আশ্রম এবং নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
নতুন আইনের ফাঁদে পড়ে সমগ্র চার্চ বা ডায়োসিস (ধর্মপ্রদেশ)-এর শত বছরের পুরোনো সম্পত্তি এক নিমেষেই ভারত সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। ভারতীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থায় যেকোনো চার্চ বা সংস্থার এফসিআরএ লাইসেন্স নবায়ন না হওয়া, বাতিল হওয়া বা সাময়িকভাবে স্থগিত হয়ে যাওয়াটা খুবই সাধারণ একটি ঘটনা এবং প্রায়শই এটি ঘটে থাকে অত্যন্ত সামান্য বা সাধারণ কোনো ত্রুটি কিংবা হিসাবরক্ষণের ছোটখাটো ভুলের কারণে।
নতুন সংশোধনী অনুযায়ী, একটি মাত্র লেনদেনে সামান্য ভুলের অজুহাতে, ওই চার্চ বা ডায়োসিসের অধীনে থাকা সমস্ত সম্পত্তি–যার মধ্যে রয়েছে মূল্যবান চিকিৎসা সরঞ্জাম, জমি, হাসপাতাল ভবন, স্কুল এবং ব্যাংকে জমা থাকা সমস্ত তহবিল–তাৎক্ষণিকভাবে সরকার মনোনীত একটি কর্তৃপক্ষের অধীনে চলে যাবে। সেই সরকারি কর্তৃপক্ষ তখন সম্পূর্ণ নিজের ইচ্ছামতো ওই সমস্ত পবিত্র ও জনকল্যাণমূলক সম্পত্তি পরিচালনা, বিক্রয় বা যেকোনো উপায়ে নিষ্পত্তি করতে পারবে, যা প্রকারান্তরে রাষ্ট্রীয়করণ বা জোরপূর্বক সম্পত্তি দখলের শামিল।
আইনের ভূতাপেক্ষ প্রয়োগ ও মাদার তেরেসার উদাহরণ
এই প্রস্তাবিত আইনের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিকটি হলো এর ‘ভেস্টিং’ বা সম্পত্তি অর্পণ সংক্রান্ত বিধানের অন্ধ প্রয়োগ। স্মিথ সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, কোনো একটি বিশাল সম্পদের যদি অত্যন্ত সামান্যতম অংশও কোনো এক সময় বিদেশী অবদানে অর্থায়ন করা হয়ে থাকে, তবেই পুরো সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার আইনি বৈধতা পেয়ে যাবে প্রশাসন। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, শত শত চার্চের মালিকানাধীন একটি সম্পূর্ণ ডায়োসিস বা ধর্মীয় অঞ্চলের সমস্ত সম্পদ কেবল একটি ছোট বিদেশি অনুদান প্রক্রিয়াকরণের যান্ত্রিক ভুলের কারণে সরকার এক লহমায় কেড়ে নিতে পারবে।
আরও ভয়ের বিষয় হলো, এই সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার ক্ষমতাটি ‘ভূতাপেক্ষ’ বা অতীতের ঘটনাগুলোর ওপরও কার্যকর হবে। এর অর্থ হলো, যেসব খ্রিস্টান বা সমাজসেবামূলক প্রতিষ্ঠানের এফসিআরএ লাইসেন্স বহু বছর আগে বাতিল হয়ে গেছে বা নবায়ন করা হয়নি, বর্তমান সরকার চাইলে আজকেও সেই পুরোনো আইনের অজুহাতে তাদের সমস্ত সম্পত্তি ও জমিজমা ক্রোক করতে পারবে। স্মিথ এই প্রসঙ্গে ২০২২ সালের একটি বাস্তব ঘটনার অবতারণা করেছেন, যখন বিশ্ববিখ্যাত নোবেলজয়ী মাদার তেরেসার প্রতিষ্ঠিত ‘মিশনারিজ অব চ্যারিটি’-র এফসিআরএ লাইসেন্স সাময়িকভাবে স্থগিত করেছিল মোদি সরকার। যদিও পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে সেই লাইসেন্স ফিরিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু স্মিথের মতে, যদি এই নতুন সংশোধনীটি তখন বলবৎ থাকত, তবে মাদার তেরেসার ওই খ্রিষ্টান মিশনারি অর্ডারের সব সম্পদ স্থায়ীভাবে এবং চিরতরে ভারত সরকারের অধীনে চলে যেত এবং দরিদ্র মানুষের সেবায় নিয়োজিত এই আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানটি ভারতে তার সমস্ত অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলত।
ধর্মীয় স্বাধীনতার ঐতিহাসিক অবক্ষয় ও রাজনৈতিক দায়
প্রবন্ধকার ক্রিস স্মিথ এই বিষয়ে অত্যন্ত নিরপেক্ষ ও কঠোর অবস্থান নিয়েছেন যে, ভারতে ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রতি এই অবমাননা বা চার্চের ওপর নিপীড়নের ইতিহাস কেবল বর্তমান বিজেপি বা নরেন্দ্র মোদির শাসনামলের সৃষ্টি নয়। এর শিকড় আরও গভীরে। মোদি সরকারের ক্ষমতায় আসার অনেক আগে থেকেই, ভারতের পূর্ববর্তী ধর্মনিরপেক্ষ দাবিদার দল ‘কংগ্রেস পার্টি’র নেতৃত্বাধীন সরকারগুলোও দেশের ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষা করতে এবং সংখ্যালক্ষীদের নিরাপত্তা দিতে বারবার ব্যর্থ হয়েছে।
ভারতের তথাকথিত ‘ধর্মান্তর বিরোধী’ কঠোর আইনগুলো বিজেপির উত্থানের অনেক আগেই বিভিন্ন রাজ্যে পাস করা হয়েছিল। তবে স্মিথ খুব দৃঢ়ভাবে উল্লেখ করেছেন যে, ২০১৪ সাল থেকে নরেন্দ্র মোদি ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে একচ্ছত্র ক্ষমতায় আসীন আছেন এবং তার দল বিজেপিই দেশের নীতি নির্ধারণ করছে। ফলে, আজ তারা যে বৈষম্যমূলক এফসিআরএ আইনটি পাসের প্রস্তাব করছে, তার সমস্ত রাজনৈতিক এবং ঐতিহাসিক দায়ভার সম্পূর্ণভাবে মোদি এবং তার দল বিজেপির ওপরেই বর্তায়। তারা কোনোভাবেই পূর্ববর্তী সরকারের অজুহাত দিয়ে এই চরম দমনমূলক আইনি পদক্ষেপের দায় এড়াতে পারেন না।
ভারত-মার্কিন কৌশলগত অংশীদারত্বের ভবিষ্যৎ ও বৈশ্বিক গুরুত্ব
এতসব অভ্যন্তরীণ নেতিবাচক দিক থাকা সত্ত্বেও, ক্রিস স্মিথ ভারত-মার্কিন সম্পর্কের বৃহত্তর এবং উজ্জ্বল দিকটিকে অস্বীকার করেননি। তিনি অকপটে স্বীকার করেছেন যে, ভারত নিজেকে একটি অত্যন্ত প্রাচীন ও মহান ‘সভ্যতার রাষ্ট্র’ এবং একটি হিন্দু সাংস্কৃতিক পরাশক্তি হিসেবে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করার সম্পূর্ণ অধিকার রাখে। একই সাথে ভারত একটি প্রাণবন্ত, মুক্ত এবং স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক দেশ, যা বিশ্বের অন্যতম সফল রাষ্ট্রগুলোর একটি। আজকের পরিবর্তনশীল ভূ-রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারতের মধ্যে একটি সত্যিকারের ও দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। যখন চীনের কমিউনিস্ট সরকার তার নিজস্ব নাগরিকদের ওপর এক চরম স্বৈরাচারী ও ডিস্টোপিয়ান (ভয়াবহ অন্ধকারময়) নজরদারি এবং সামাজিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চাপিয়ে দিচ্ছে, এবং অন্যদিকে ইউরোপের পুরোনো পরাশক্তিগুলো দুঃখজনকভাবে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবক্ষয়ের দিকে ধাবিত হচ্ছে, তখন এই পৃথিবীতে যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারতের মধ্যকার শক্তিশালী জোটের চেয়ে মানবজাতির কল্যাণে বেশি অবদান রাখতে পারে এমন কোনো দ্বিতীয় দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আর অবশিষ্ট নেই।
কিন্তু এই বিশেষ বৈশ্বিক অংশীদারত্ব গড়ে তোলার কাজটি অত্যন্ত নাজুক এবং সংবেদনশীল। এর জন্য প্রয়োজন একে অপরের সংস্কৃতি ও বিশ্বাসের প্রতি গভীর ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং একে অপরের কাছ থেকে আন্তরিকভাবে শেখার মানসিকতা। স্মিথ প্রশ্ন তুলেছেন, ভারতের সরকার যদি দেশের খ্রিস্টান সংখ্যালঘুদের সম্পত্তি উচ্ছেদ ও রাষ্ট্রীয়করণের জন্য সুপরিকল্পিতভাবে এমন নিপীড়নমূলক আইন পাস করে, তবে আমেরিকার সাথে সেই আদর্শিক ও কৌশলগত সম্পর্ক কীভাবে ডানা মেলবে?
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান
নিবন্ধের শেষ অংশে ক্রিস স্মিথ ভারতকে একটি চরম ঐতিহাসিক ভুলের বিষয়ে সতর্ক করে দিয়েছেন। তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, অতীতে ঠিক এই একই দমনমূলক পথ অবলম্বন করেছিল সোভিয়েত রাশিয়া, কমিউনিস্ট চীন এবং অন্যান্য একনায়কতান্ত্রিক কমিউনিস্ট সরকারগুলো, যারা চার্চ ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সম্পত্তি জবরদস্তিমূলকভাবে জাতীয়করণ করেছিল। আর এই একটি মাত্র ব্যবস্থাপনাই তৎকালীন সময়ে ওইসব দেশের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের মাঝে এক স্থায়ী এবং অলঙ্ঘনীয় প্রাচীর বা দূরত্বের জন্ম দিয়েছিল, যা আজ পর্যন্ত ঘোচেনি। ভারত যদি সেই একই পথে হাঁটে, তবে তা হবে আত্মঘাতী।
তাই স্মিথ মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে জোরালোভাবে অনুরোধ করেছেন যাতে তিনি তার এই নয়াদিল্লি সফরে ভারতীয় সমকক্ষদের সাথে আলোচনার টেবিলে এই এফসিআরএ সংশোধনীর বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তোলেন এবং এটি প্রত্যাহারের জন্য মোদি সরকারকে চাপ দেন। স্মিথের শেষ কথাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ–ভারত ও আমেরিকার মধ্যকার সম্পর্কের সার্বিক উন্নয়ন কেবল বাণিজ্য বা সামরিক চুক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না, এর মধ্যে অবশ্যই ভারতে ধর্মীয় ও বিশ্বাসভিত্তিক সংগঠনগুলোর স্বাধীনভাবে কাজ করার অধিকার এবং তাদের সম্পদ রাষ্ট্রীয়করণের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার নিশ্চয়তা অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসের সদস্য (নিউ জার্সির ফোর্থ ডিস্ট্রিক্ট) ক্রিস স্মিথ ওয়াশিংটন এক্সামিনার-এ প্রকাশিত তার একটি সাম্প্রতিক নিবন্ধে ভারত-মার্কিন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের এক অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও জটিল বাঁককে উন্মোচন করেছেন। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও যখন ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সফরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, ঠিক সেই মুহূর্তে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন সরকার এমন একটি আইন পাসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে যা দুই দেশের মধ্যকার দীর্ঘদিনের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সম্পর্ককে চিরতরে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
কংগ্রেস সদস্য স্মিথ অত্যন্ত স্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন যে, আগামী ২১ জুলাই থেকে ১২ আগস্ট পর্যন্ত অনুষ্ঠেয় ভারতের পার্লামেন্টে ‘বর্ষাকালীন অধিবেশন’-এ মোদি সরকার তাদের কুখ্যাত ‘ফরেইন কন্ট্রিবিউশন রেগুলেশন অ্যাক্ট’ বা বৈদেশিক অনুদান নিয়ন্ত্রণ আইনের একটি নতুন সংশোধনী বিল আনতে চলেছে। যদি এই বিলটি ভারতীয় পার্লামেন্ট পাস হয়ে যায়, তবে তা ভারতের ধর্মীয় সংখ্যালঘু, বিশেষ করে খ্রিস্টান সম্প্রদায় এবং তাদের দ্বারা পরিচালিত দাতব্য সংস্থাগুলোর অস্তিত্বের ওপর এক চরম আঘাত নেমে আসবে। স্মিথের মতে, এই বিলটি প্রত্যাহার করা বা একপাশে সরিয়ে রাখা কেবল ভারতের অভ্যন্তরীণ শান্তির জন্যই নয়, বরং ওয়াশিংটন ও নয়াদিল্লির মধ্যকার ‘উইন-উইন’ বা পারস্পরিক বিজয়ের এক অনন্য সুযোগ তৈরি করবে।
এফসিআরএ সংশোধনীর ভয়াবহতা ও এর আইনি ফাঁদ
কংগ্রেস সদস্য ক্রিস স্মিথ তার বিশ্লেষণে এই নতুন প্রস্তাবিত আইনের ভেতরের চরম বৈষম্যমূলক ও শাস্তিমূলক ধারাগুলোকে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছেন। নতুন সংশোধনীটি পাস হলে, ভারত সরকারের রাষ্ট্রীয় প্রশাসন এমন এক সীমাহীন ক্ষমতা লাভ করবে যার মাধ্যমে তারা যেকোনো বিদেশি অনুদানপ্রাপ্ত গোষ্ঠীর সমস্ত স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি এবং সম্পদ সরাসরি বাজেয়াপ্ত করতে পারবে। এই ধরনের বিদেশি তহবিলপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর সিংহভাগই হলো ভারতের স্থানীয় খ্রিস্টান চার্চ এবং তাদের দ্বারা পরিচালিত বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক দাতব্য প্রতিষ্ঠান, যেমন নামী হাসপাতাল, অনাথ আশ্রম এবং নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
নতুন আইনের ফাঁদে পড়ে সমগ্র চার্চ বা ডায়োসিস (ধর্মপ্রদেশ)-এর শত বছরের পুরোনো সম্পত্তি এক নিমেষেই ভারত সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। ভারতীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থায় যেকোনো চার্চ বা সংস্থার এফসিআরএ লাইসেন্স নবায়ন না হওয়া, বাতিল হওয়া বা সাময়িকভাবে স্থগিত হয়ে যাওয়াটা খুবই সাধারণ একটি ঘটনা এবং প্রায়শই এটি ঘটে থাকে অত্যন্ত সামান্য বা সাধারণ কোনো ত্রুটি কিংবা হিসাবরক্ষণের ছোটখাটো ভুলের কারণে।
নতুন সংশোধনী অনুযায়ী, একটি মাত্র লেনদেনে সামান্য ভুলের অজুহাতে, ওই চার্চ বা ডায়োসিসের অধীনে থাকা সমস্ত সম্পত্তি–যার মধ্যে রয়েছে মূল্যবান চিকিৎসা সরঞ্জাম, জমি, হাসপাতাল ভবন, স্কুল এবং ব্যাংকে জমা থাকা সমস্ত তহবিল–তাৎক্ষণিকভাবে সরকার মনোনীত একটি কর্তৃপক্ষের অধীনে চলে যাবে। সেই সরকারি কর্তৃপক্ষ তখন সম্পূর্ণ নিজের ইচ্ছামতো ওই সমস্ত পবিত্র ও জনকল্যাণমূলক সম্পত্তি পরিচালনা, বিক্রয় বা যেকোনো উপায়ে নিষ্পত্তি করতে পারবে, যা প্রকারান্তরে রাষ্ট্রীয়করণ বা জোরপূর্বক সম্পত্তি দখলের শামিল।
আইনের ভূতাপেক্ষ প্রয়োগ ও মাদার তেরেসার উদাহরণ
এই প্রস্তাবিত আইনের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিকটি হলো এর ‘ভেস্টিং’ বা সম্পত্তি অর্পণ সংক্রান্ত বিধানের অন্ধ প্রয়োগ। স্মিথ সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, কোনো একটি বিশাল সম্পদের যদি অত্যন্ত সামান্যতম অংশও কোনো এক সময় বিদেশী অবদানে অর্থায়ন করা হয়ে থাকে, তবেই পুরো সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার আইনি বৈধতা পেয়ে যাবে প্রশাসন। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, শত শত চার্চের মালিকানাধীন একটি সম্পূর্ণ ডায়োসিস বা ধর্মীয় অঞ্চলের সমস্ত সম্পদ কেবল একটি ছোট বিদেশি অনুদান প্রক্রিয়াকরণের যান্ত্রিক ভুলের কারণে সরকার এক লহমায় কেড়ে নিতে পারবে।
আরও ভয়ের বিষয় হলো, এই সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার ক্ষমতাটি ‘ভূতাপেক্ষ’ বা অতীতের ঘটনাগুলোর ওপরও কার্যকর হবে। এর অর্থ হলো, যেসব খ্রিস্টান বা সমাজসেবামূলক প্রতিষ্ঠানের এফসিআরএ লাইসেন্স বহু বছর আগে বাতিল হয়ে গেছে বা নবায়ন করা হয়নি, বর্তমান সরকার চাইলে আজকেও সেই পুরোনো আইনের অজুহাতে তাদের সমস্ত সম্পত্তি ও জমিজমা ক্রোক করতে পারবে। স্মিথ এই প্রসঙ্গে ২০২২ সালের একটি বাস্তব ঘটনার অবতারণা করেছেন, যখন বিশ্ববিখ্যাত নোবেলজয়ী মাদার তেরেসার প্রতিষ্ঠিত ‘মিশনারিজ অব চ্যারিটি’-র এফসিআরএ লাইসেন্স সাময়িকভাবে স্থগিত করেছিল মোদি সরকার। যদিও পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে সেই লাইসেন্স ফিরিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু স্মিথের মতে, যদি এই নতুন সংশোধনীটি তখন বলবৎ থাকত, তবে মাদার তেরেসার ওই খ্রিষ্টান মিশনারি অর্ডারের সব সম্পদ স্থায়ীভাবে এবং চিরতরে ভারত সরকারের অধীনে চলে যেত এবং দরিদ্র মানুষের সেবায় নিয়োজিত এই আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানটি ভারতে তার সমস্ত অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলত।
ধর্মীয় স্বাধীনতার ঐতিহাসিক অবক্ষয় ও রাজনৈতিক দায়
প্রবন্ধকার ক্রিস স্মিথ এই বিষয়ে অত্যন্ত নিরপেক্ষ ও কঠোর অবস্থান নিয়েছেন যে, ভারতে ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রতি এই অবমাননা বা চার্চের ওপর নিপীড়নের ইতিহাস কেবল বর্তমান বিজেপি বা নরেন্দ্র মোদির শাসনামলের সৃষ্টি নয়। এর শিকড় আরও গভীরে। মোদি সরকারের ক্ষমতায় আসার অনেক আগে থেকেই, ভারতের পূর্ববর্তী ধর্মনিরপেক্ষ দাবিদার দল ‘কংগ্রেস পার্টি’র নেতৃত্বাধীন সরকারগুলোও দেশের ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষা করতে এবং সংখ্যালক্ষীদের নিরাপত্তা দিতে বারবার ব্যর্থ হয়েছে।
ভারতের তথাকথিত ‘ধর্মান্তর বিরোধী’ কঠোর আইনগুলো বিজেপির উত্থানের অনেক আগেই বিভিন্ন রাজ্যে পাস করা হয়েছিল। তবে স্মিথ খুব দৃঢ়ভাবে উল্লেখ করেছেন যে, ২০১৪ সাল থেকে নরেন্দ্র মোদি ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে একচ্ছত্র ক্ষমতায় আসীন আছেন এবং তার দল বিজেপিই দেশের নীতি নির্ধারণ করছে। ফলে, আজ তারা যে বৈষম্যমূলক এফসিআরএ আইনটি পাসের প্রস্তাব করছে, তার সমস্ত রাজনৈতিক এবং ঐতিহাসিক দায়ভার সম্পূর্ণভাবে মোদি এবং তার দল বিজেপির ওপরেই বর্তায়। তারা কোনোভাবেই পূর্ববর্তী সরকারের অজুহাত দিয়ে এই চরম দমনমূলক আইনি পদক্ষেপের দায় এড়াতে পারেন না।
ভারত-মার্কিন কৌশলগত অংশীদারত্বের ভবিষ্যৎ ও বৈশ্বিক গুরুত্ব
এতসব অভ্যন্তরীণ নেতিবাচক দিক থাকা সত্ত্বেও, ক্রিস স্মিথ ভারত-মার্কিন সম্পর্কের বৃহত্তর এবং উজ্জ্বল দিকটিকে অস্বীকার করেননি। তিনি অকপটে স্বীকার করেছেন যে, ভারত নিজেকে একটি অত্যন্ত প্রাচীন ও মহান ‘সভ্যতার রাষ্ট্র’ এবং একটি হিন্দু সাংস্কৃতিক পরাশক্তি হিসেবে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করার সম্পূর্ণ অধিকার রাখে। একই সাথে ভারত একটি প্রাণবন্ত, মুক্ত এবং স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক দেশ, যা বিশ্বের অন্যতম সফল রাষ্ট্রগুলোর একটি। আজকের পরিবর্তনশীল ভূ-রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারতের মধ্যে একটি সত্যিকারের ও দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। যখন চীনের কমিউনিস্ট সরকার তার নিজস্ব নাগরিকদের ওপর এক চরম স্বৈরাচারী ও ডিস্টোপিয়ান (ভয়াবহ অন্ধকারময়) নজরদারি এবং সামাজিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চাপিয়ে দিচ্ছে, এবং অন্যদিকে ইউরোপের পুরোনো পরাশক্তিগুলো দুঃখজনকভাবে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবক্ষয়ের দিকে ধাবিত হচ্ছে, তখন এই পৃথিবীতে যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারতের মধ্যকার শক্তিশালী জোটের চেয়ে মানবজাতির কল্যাণে বেশি অবদান রাখতে পারে এমন কোনো দ্বিতীয় দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আর অবশিষ্ট নেই।
কিন্তু এই বিশেষ বৈশ্বিক অংশীদারত্ব গড়ে তোলার কাজটি অত্যন্ত নাজুক এবং সংবেদনশীল। এর জন্য প্রয়োজন একে অপরের সংস্কৃতি ও বিশ্বাসের প্রতি গভীর ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং একে অপরের কাছ থেকে আন্তরিকভাবে শেখার মানসিকতা। স্মিথ প্রশ্ন তুলেছেন, ভারতের সরকার যদি দেশের খ্রিস্টান সংখ্যালঘুদের সম্পত্তি উচ্ছেদ ও রাষ্ট্রীয়করণের জন্য সুপরিকল্পিতভাবে এমন নিপীড়নমূলক আইন পাস করে, তবে আমেরিকার সাথে সেই আদর্শিক ও কৌশলগত সম্পর্ক কীভাবে ডানা মেলবে?
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান
নিবন্ধের শেষ অংশে ক্রিস স্মিথ ভারতকে একটি চরম ঐতিহাসিক ভুলের বিষয়ে সতর্ক করে দিয়েছেন। তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, অতীতে ঠিক এই একই দমনমূলক পথ অবলম্বন করেছিল সোভিয়েত রাশিয়া, কমিউনিস্ট চীন এবং অন্যান্য একনায়কতান্ত্রিক কমিউনিস্ট সরকারগুলো, যারা চার্চ ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সম্পত্তি জবরদস্তিমূলকভাবে জাতীয়করণ করেছিল। আর এই একটি মাত্র ব্যবস্থাপনাই তৎকালীন সময়ে ওইসব দেশের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের মাঝে এক স্থায়ী এবং অলঙ্ঘনীয় প্রাচীর বা দূরত্বের জন্ম দিয়েছিল, যা আজ পর্যন্ত ঘোচেনি। ভারত যদি সেই একই পথে হাঁটে, তবে তা হবে আত্মঘাতী।
তাই স্মিথ মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে জোরালোভাবে অনুরোধ করেছেন যাতে তিনি তার এই নয়াদিল্লি সফরে ভারতীয় সমকক্ষদের সাথে আলোচনার টেবিলে এই এফসিআরএ সংশোধনীর বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তোলেন এবং এটি প্রত্যাহারের জন্য মোদি সরকারকে চাপ দেন। স্মিথের শেষ কথাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ–ভারত ও আমেরিকার মধ্যকার সম্পর্কের সার্বিক উন্নয়ন কেবল বাণিজ্য বা সামরিক চুক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না, এর মধ্যে অবশ্যই ভারতে ধর্মীয় ও বিশ্বাসভিত্তিক সংগঠনগুলোর স্বাধীনভাবে কাজ করার অধিকার এবং তাদের সম্পদ রাষ্ট্রীয়করণের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার নিশ্চয়তা অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে।