আরমান ভূঁইয়া

ঈদুল আজহার সময় ঘনিয়ে এলেই রাজধানী ঢাকার চেহারা বদলে যেতে শুরু করে। সড়কের পাশে সারি সারি ট্রাক, অস্থায়ী বাঁশের কাঠামো, গরুর ডাক আর মানুষের ভিড়ে জমে ওঠে কোরবানির পশুর হাট। কিন্তু এই হাট শুধু পশু কেনাবেচায় সীমিত থাকে না। ঢাকার পশুর হাট ঘিরে প্রভাব, নিয়ন্ত্রণ, আধিপত্য এবং কোটি কোটি টাকার অর্থনৈতিক স্বার্থসিদ্ধিতে চলে রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো, যার আড়ালে থাকে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের ছায়া।
প্রতি বছরই রাজধানীর পশুর হাট ঘিরে চলে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, দরপত্র নিয়ন্ত্রণ, স্থানীয় আধিপত্য ও নেপথ্য সমঝোতার অভিযোগ। ক্ষমতায় যে দল থাকে, মূলত তাদের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি, নেতা বা ব্যবসায়ীরাই হাটের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে বদলায় শুধু নিয়ন্ত্রকদের রাজনৈতিক পরিচয়; তবে নিয়ন্ত্রণের ধরন খুব একটা বদলায় না।
সংশ্লিষ্ট সূত্র, সিটি করপোরেশনের তথ্য, রাজনৈতিক নেতাকর্মী, স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবার রাজধানীর অধিকাংশ অস্থায়ী পশুর হাটের নিয়ন্ত্রণ গেছে বিএনপি ও দলটির অঙ্গসংগঠনের নেতাদের হাতে। কোথাও তারা সরাসরি ইজারাদার, আবার কোথাও আড়াল থেকে পুরো হাট পরিচালনা করছেন। কয়েকটি এলাকায় শীর্ষ সন্ত্রাসীদের অনুসারীরাও হাট পরিচালনায় সক্রিয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আগে থেকেই ঠিক হয়ে যায় কোন হাট কে পাবে। প্রতিযোগিতা দেখাতে একাধিক দরপত্র জমা হলেও ভেতরে ভেতরে সমঝোতা থাকে। ফলে রাজনৈতিক পরিচয় ছাড়া বড় হাটে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে।
গত ২৮ এপ্রিল রাতে রাজধানীর নিউ মার্কেট এলাকায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে খুন হন তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন। তিনি আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমনের শ্যালক ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, বছিলা পশুর হাটকে কেন্দ্র করে ইমনের অনুসারীরা টিটনকে হত্যা করে। তবে এই হত্যাকাণ্ডের পর বছিলা হাটের ইজারা বন্ধ রেখেছে ঢাকা উত্তর সিটি কররোরেশন (ডিএনসিসি)।
‘খোলা দরপত্র’, কিন্তু নিয়ন্ত্রণ নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর
এবার ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের। ২৩টি অস্থায়ী পশুর হাটের ইজারা দিয়েছে। যদিও দুই সিটি কররোরেশন মিলে ২৯টি পশুর হাট বসার কথা থাকলেও বাকিগুলোর ইজারা কার্যক্রম শেষ হয়নি বলে জানিয়েছে সংস্থা দুটি। এর মধ্যে ঢাকা উত্তরে ১২টি এবং দক্ষিণে ১১টি। পাশাপাশি গাবতলী ও সারুলিয়ায় রয়েছে দুটি স্থায়ী পশুর হাট।
সিটি করপোরেশন সূত্র বলছে, সরকারিভাবে সব হাট উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে ইজারা দেওয়া হয়। পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়, নির্ধারিত নিয়মে আবেদন নেওয়া হয়, এরপর সর্বোচ্চ দরদাতাকে হাট বুঝিয়ে দেওয়া হয়।
তবে মাঠপর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাস্তবে প্রভাবশালী রাজনৈতিক বলয়ের বাইরে থাকা অনেক ব্যবসায়ী দরপত্র জমা দিতেই ভয় পান। কারণ, হাট নিয়ন্ত্রণ মানে শুধু পশু কেনাবেচা নয়। এর সঙ্গে জড়িত থাকে ট্রাক প্রবেশ, খাজনা আদায়, জায়গা নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা, এমনকি স্থানীয় আধিপত্যের প্রশ্নও।

একাধিক ব্যবসায়ী জানান, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আগে থেকেই ঠিক হয়ে যায় কোন হাট কে পাবে। প্রতিযোগিতা দেখাতে একাধিক দরপত্র জমা হলেও ভেতরে ভেতরে সমঝোতা থাকে। ফলে রাজনৈতিক পরিচয় ছাড়া বড় হাটে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে।
দক্ষিণে বিএনপির আধিপত্য
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অধিকাংশ অস্থায়ী হাট এবার বিএনপি ও তাদের ঘনিষ্ঠদের নিয়ন্ত্রণে গেছে। পোস্তগোলা শ্মশানঘাটসংলগ্ন নদীপারের বড় পশুর হাট পেয়েছেন শ্যামপুর থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক কাজী মাহবুব মাওলা। প্রায় ৪ কোটি টাকায় তিনি হাটটির ইজারা নিয়েছেন। স্থানীয়দের ভাষ্য, অতীতে আওয়ামী লীগঘনিষ্ঠ নেতারা এই হাট নিয়ন্ত্রণ করলেও এখন সেখানে বিএনপির প্রভাব স্পষ্ট।
জানতে চাইলে কাজী মাহবুব মাওলা চরচাকে বলেন, “আমি নিয়ম মেনে ইজারা পেয়েছি। দলের প্রভাবে নয়।”
উত্তর শাহজাহানপুরের মৈত্রী সংঘ ক্লাবসংলগ্ন হাট পেয়েছেন ব্যবসায়ী আনিসুর রহমান, যিনি বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের এক নেতার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। তবে তিনি এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
ডেমরার আমুলিয়া মডেল টাউন এলাকার হাটের নিয়ন্ত্রণ গেছে ডেমরা থানা বিএনপির সাবেক সভাপতি জয়নাল আবেদীনের কাছে। গত বছরও তিনি এই হাট নিয়ন্ত্রণ করেছেন। তিনি বলেন, “দরপত্রের মাধ্যমে ইজারা পেয়েছি। এতে সমস্যা কোথায়?”
রহমতগঞ্জ ক্লাব মাঠের ইজারা পেয়েছেন আরেক বিএনপি নেতা টিপু সুলতান, যিনি রহমতগঞ্জ মুসলিম ফ্রেন্ডস সোসাইটির সভাপতি এবং চকবাজার থানা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি। তিনি অভিযোগ করে বলেন, “লালবাগ এলাকায় আরেকটি হাটের ইজারা দেওয়া হয়েছে। সেটি পেয়েছেন যুবদলের এক নেতা হৃদয়। তিনি আমাদের ছেলে-পেলেদের সঙ্গে ঝামেলা করছেন। আমাদের হাটে আসা পশুবাহী গাড়ি তাদের হাটে নিয়ে যাচ্ছে। আমরা বিষয়টি স্থানীয় সংসদ সদস্যের মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করছি।”
ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্লাবসংলগ্ন এলাকার খালি জায়গায় পশুর হাটের ইজারা পেয়েছেন মোহাম্মদ ইসমাইল হোসেন। তিনি যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা।
গ্রীন বনশ্রী হাউজিং সোসাইটির খালি জায়গায় ৭০ লাখ ২০ হাজার টাকায় পশুর হাটের ইজারা পেয়েছেন মো. গোলাম হোসেন। তিনি ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক। জানতে চাইলে তিনি বলেন, “উন্মুক্ত দরপত্রের ভিত্তিতে আমরা সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে ইজারা পেয়েছি। এখানে দলীয় প্রভাবের কিছু নেই।”
গোপীবাগ ও সিকদার মেডিকেল কলেজসংলগ্ন হাটগুলোর সঙ্গেও বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে কাজলা-মাতুয়াইল এলাকার হাট পেয়েছে জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত একটি প্রতিষ্ঠান। গোলাপবাগ এলাকার একটি হাটের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে এনসিপিঘনিষ্ঠ এক ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধেও। মোবাইল ফোনে তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা (উপসচিব) মো. রেজাউল করিম চরচাকে বলেন, “অবৈধ পশুর হাট বসানো অভিযোগ আমরাও পাচ্ছি। অভিযোগ পাওয়ার পরপরই সেটাকে অ্যাড্রেস করছি। আমাদের ম্যাজিস্ট্রেট সেখানে গিয়েছেন, পুলিশকে জানিয়েছি এবং বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কেউ অবৈধভাবে হাট চালাতে পারবে না। বিভিন্ন জায়গায় যেভাবে হাট বসে যাচ্ছে, সেটা আমরা কোনোভাবেই সমর্থন করি না।”
পশুর হাটের ইজারা নিয়ে দলীয় নেতাকর্মীদের প্রভাবের অভিযোগ প্রসঙ্গে ডিএনসিসির এই শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, “কে কোন দল করে, সেটা আমরা দেখি না। আমরা বিজ্ঞপ্তি দিয়েছি, নিয়ম অনুযায়ী টেন্ডার নেওয়া হয়েছে। যারা সরকারি নির্ধারিত মূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বা তারচেয়ে বেশি দর দিয়েছেন, তাদেরই ইজারা দেওয়া হয়েছে।”
হাট ইজারার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের প্রভাব বা পেশিশক্তির সুযোগ নেই। সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী সর্বোচ্চ দরদাতাকেই ইজারা দেওয়া হবে। কে কোন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত, সেটি বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে না। দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি পে-অর্ডারসহ সংশ্লিষ্ট সব নথি যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছে।
রেজাউল করিম বলেন, “ইজারাদার কেউ রাজনৈতিকভাবে সম্পৃক্ত থাকতেই পারে, কিন্তু সেটা করপোরেশনের বিষয় না। আমাদের বিষয় হলো—সরকারি মূল্য পাওয়া গেছে কি না এবং তারা নিয়ম মেনে টেন্ডারে অংশ নিয়েছে কি না। সেই নিয়মের মধ্যেই আমরা ইজারা দিয়েছি।”
একইভাবে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালাম উত্থাপিত এসব অভিযোগকে ‘ভিত্তিহীন’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। চরচাকে তিনি বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বলয়ের প্রভাবের কারণে রাজধানীর পশুর হাটগুলোতে প্রকৃত প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি হয়নি। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই তুলনামূলক কম দামে ইজারা সম্পন্ন হতো। তবে এবার উন্মুক্ত ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ পরিবেশে দরপত্র জমা পড়েছে। তাই এসব অভিযোগ আসলে ভিত্তিহীন।”
ডিএসসিসির এই প্রশাসক বলেন, “হাট ইজারার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের প্রভাব বা পেশিশক্তির সুযোগ নেই। সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী সর্বোচ্চ দরদাতাকেই ইজারা দেওয়া হবে। কে কোন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত, সেটি বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে না। দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি পে-অর্ডারসহ সংশ্লিষ্ট সব নথি যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছে।”
এ ছাড়া কোনো হাটের দরপত্র নিয়ে অংশগ্রহণকারীদের আপত্তি থাকলে তা লিখিতভাবে জমা দেওয়ার আহ্বানও জানান তিনি। পাশাপাশি যেসব হাটের ইজারা এখনও সম্পন্ন হয়নি, সেগুলোর জন্য পুনরায় দরপত্র আহ্বান করা হবে বলেও উল্লেখ করেন এই প্রশাসক।
উত্তরেও বিএনপি, যুবদল-স্বেচ্ছাসেবক দলের দাপট
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের হাটগুলোতেও বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাদের প্রভাব স্পষ্ট। সবচেয়ে বড় হাট উত্তরা দিয়াবাড়ির বউবাজার পশুর হাটের ইজারা পেয়েছে এস এফ করপোরেশনের মো. শেখ ফরিদ হোসেন। তিনি মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলে সভাপতি। তিনি প্রায় ১৪ কোটি টাকার বেশি দরে হাটটির ইজারা পেয়েছন। চরচাকে তিনি বলেন, “আমি নিয়ম মেনে সর্বচ্চ দরদাতা হিসেবে হাটের ইজারা পেয়েছি। দলীয় কোনো প্রভাব বা পরিচয় এখানে আসার কোনো কারণ নেই।”
ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটসংলগ্ন হাট পেয়েছেন যুবদল নেতা আমিনুল ইসলাম। এই হাট পরিচালনায় স্থানীয় বিএনপির আরও কয়েকজন নেতা যুক্ত রয়েছেন বলে জানা গেছে।
খিলক্ষেত থানাধীন মস্তুল এলাকায় পশুর হাটের ইজারা পেয়েছেন থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক বিল্লাল হোসেন। চরচাকে তিনি বলেন, “আমরা দল করি। হাট পরিচালনা করার মতো আমাদের লোকজন আছে।” তবে তিনি অভিযোগ করে বলেন, “আমাদের হাটের আগে প্রধান বনরূপায় একটি হাট রয়েছে। আমাদের হাটে আসা পশুর গাড়িগুলো জোর করে তাদের হাটের নিয়ে যাচ্ছে।”
বনরূপা আবিাসিক প্রকল্পের খালি জায়গায় হাটের ইজারা পেয়েছেন আরিফিন অ্যান্ড আরাফ এন্টারপ্রাইজের আবুল কালাম আজাদ। তিনি তুরাগ থানা বিএনপির নেতা। এই হাটের দরপত্র মাত্র তিনজন ক্রয় করেছেন। হাটের দরমূল ছিল ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা। সেখানে তিনি ১ কোটি ৮০ লাখ ১০ হাজার টাকায় ইজারা পেয়েছেন। তিনি বলেন, “এই হাটের কেউ ইজারা নিতে আগ্রহী নন। তাই আমরা এই হাটের ইজারা পেয়েছি।”
কিন্তু দরমূলে সমপরিমাণে কীভাবে ইজারা পেলেন–জানতে চাইলে ফোন কেটে দেন আবুল কালাম আজাদ।
বাড্ডা স্বদেশ প্রোপার্টির খালি জায়গায় ইজারা পেয়েছেন যুবদলের নেতা মুহাম্মদ তুহিনুল ইসলাম। অন্যদিকে বড় বেরাইদ বসুন্ধারা আবাসিক এলাকায় খালি জায়গায় ইজারা পেয়েছেন এ এম এন্টারপ্রাাইজের মো. আতাউর রহমান। তিনি বিএনপির নেতা। তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
এ ছাড়া কাঁচকুড়া, ডুমনি ও পূর্ব হাজীপাড়ার হাটগুলোর সঙ্গেও বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে জানান সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্টরা।
এ ছাড়া মিরপুরে দুটি হাটের ইজারা দেওয়া হয়েছে। তবে সরকারি দরপত্রের প্রায় সমমূলে হাট দুটি হাজার দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, হাট দুটি ইজারাকারীরা বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং তারা ডিএনসিসির প্রশাসকের ঘনিষ্ঠ। মিরপুর ৬ নম্বর সেকশনে ইস্টার্ন হাউজিং এলাকায় হাটের ইজারা পেয়েছেন মেসার্স ইসলাম এন্টারপ্রাাইজের মো. সিরাজুল ইসলাম। এই হাটের সরকারি দর ছিল ১ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। সেখানে সিরাজুল ইসলাম এই হাটটি ১ কোটি ৭৮ লাখ টাকায় পেয়েছেন। জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমি একজন ব্যবসায়ী। আমার রাজনৈতিক কোনো পোস্টপদবি নেই। আর হাটের দরপত্র ক্রয় করাটা সবার জন্যই উন্মুক্ত ছিল। ফলে এই হাটের দরপত্র কম কেনা হয়েছে। আর কিছু আমার জানা নেই।”
অন্যদিকে মিরপুর কালশী বালুর মাঠের ইজারা পেয়েছেন রেদোয়ান রহমান নামে স্থা্নীয় বিএনপির আরেক নেতা। এই হাটের সরকারি দর ছিল ৩০ লাখ টাকা। সেখানে ৩০ লাখ ১১ হাজার টাকায় হাটের ইজারা পেয়েছেন রেদোয়ান। নামমাত্র টাকায় কীভাবে ইজারা পেয়েছেন জানতে চেয়ে তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হয়। তবে তিনি কল রিসভ করেননি।
এসব বিষয়ে জানতে ঢাকা উত্তর সিটি করপোররেশনের (ডিএনসিসি) প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা মোহাম্মদ শওকত ওসমানের সঙ্গে টেলিফোনে বারবার যোগাযোগ করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। পরে মেসেজ পাঠানো হলেও তিনি সাড়া দেননি।
‘নেপথ্যের নিয়ন্ত্রক’দের উত্থান
কিছু এলাকায় সিটি করপোরেশনের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন ছাড়াই পশুর হাট বসানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিশেষ করে মোহাম্মদপুর, বছিলা, তেজগাঁও, মিরপুর এবং হাজারীবাগ এলাকায় স্থানীয় প্রভাবশালী ও সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর সক্রিয়তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
সূত্র বলছে, বছিলা পশুর হাট নিয়ে অতীতে সংঘর্ষ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছিল। এ কারণে এবার কিছু হাটের আনুষ্ঠানিক ইজারা বন্ধ রাখা হলেও বাস্তবে স্থানীয় প্রভাবশালী মহল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে হাট বসিয়েছে।

মোহাম্মদপুরের কয়েকটি হাট স্থানীয় রাজনৈতিক দলের নেতা ও সন্ত্রাসী গ্রুপের অনুসারীরা পরিচালনা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। কোথাও কোথাও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রচ্ছায়ায় এসব হাট চলছে বলে দাবি স্থানীয় বাসিন্দাদের।
সূত্র বলছে, মোহাম্মদপুর বছিলা পশুর হাটের ইজারা নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরেই খুন হন শীর্ষ সন্ত্রাসী টিটন। এই কারণে এবার বছিলা পশুর হাটের ইজারা বন্ধ রেখেছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন। ফলে এবার মোহাম্মদপুর কেন্দ্রীয় চারটি পশুর হাট বসিয়েছে স্থানীয় বিএনপি নেতা ও শীর্ষ সন্ত্রাসীদের অনুসারীরা। তবে এসব হাটের অনুমোদন দেয়নি সিটি কররোরেশন।
জনতা বাজারে পশুর হাট বসিয়েছে পাপ্পু ওরফে কিলার পাপ্পু, ইমন মুন্সী এবং মোহাম্মদপুর থানা ছাত্রদলের সাবেক সহ-সভাপতি মির্জা রাজিবুল আলম রয়েল। পাপ্পু শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলালের অনুসারী।
মোহাম্মাদি হাউজিং সোসাইটি প্রধান সড়কে ছাত্রদলের আরিফ, যুবদলের রিয়াদ, দিপক, মামুন এবং বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক কবির মিলে হাট বসিয়েছেন।
অন্যদিকে চন্দ্রিমা হাউজিং এলাকায় পশুর হাট বসিয়েছেন মনোয়ার হোসেন জীবন ওরফে লেদু হাসান। লেদু হাসান সানজিদুল ইসলাম ইমন ওরফে ক্যাপ্টেন ইমনের অনুসারী। এর সঙ্গে মোহাম্মদপুর থানা ও ১০০ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির একাধিক নেতাকর্মী রয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া আদাবরে মনসুরাবাদ ৮ নম্বর সড়কে আরেকটি হাট বসিয়েছে আদাবর থানা বিএনপির সভাপতি সাদিক।
রায়ের বাজার এলাকায় জিয়া মাঠে আরেকটি পশুর হাট বসিয়েছেন রাজেস নামে স্থানীয় এক প্রভাবশালী ব্যক্তি, যিনি ক্যাপ্টেন ইমনের অনুসারী।
স্থানীয় এক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে চরচাকে বলেন, “হাটের ভেতরে কে গরু নামাবে, কে ট্রাক ঢোকাবে, কোথায় জায়গা পাবে–সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে নির্দিষ্ট গ্রুপ। বাইরে থেকে কেউ এলে টিকতে পারে না।”
কোটি টাকার অর্থনীতি
পশুর হাটকে কেন্দ্র করে যে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তৈরি হয়, তার পরিমাণও বিশাল। শুধু ইজারা থেকেই কোটি কোটি টাকা আয় হয় সিটি করপোরেশনের। এর বাইরে রয়েছে ট্রাক পার্কিং, শ্রমিক ভাড়া, পশু নামানো, নিরাপত্তা, খাবারের দোকান, অস্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণসহ নানা খাত।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, বড় একটি হাটে প্রতিদিন কয়েক হাজার পশু কেনাবেচা হয়। প্রতিটি পশুর ওপর আলাদা খাজনা আদায় করা হয়। ফলে পাঁচ দিনের একটি হাট থেকেও বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থের লেনদেন হয়।
এই বিশাল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণেই রাজনৈতিক দল, স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠী এবং বিভিন্ন ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট হাটের নিয়ন্ত্রণ নিতে আগ্রহী হয়ে ওঠে।
হাট ঘিরে পুলিশ যা করছে
পশুর হাটকে কেন্দ্র করে জাল টাকা, ছিনতাই, মলম পার্টি ও চাঁদাবাজির ঝুঁকি থাকে প্রতি বছরই। এ কারণে এবার ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) বিশেষ নিরাপত্তা পরিকল্পনা নিয়েছে।
ডিএমপির পক্ষ থেকে হাটগুলোতে সিসি ক্যামেরা, ওয়াচ টাওয়ার, পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা, ব্যাংকিং বুথ এবং জাল নোট শনাক্তকরণ মেশিন রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পোশাকধারী ও সাদা পোশাকের পুলিশ মোতায়েনের পরিকল্পনাও রয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, চাঁদাবাজি ও অবৈধ প্রভাব বিস্তার ঠেকাতে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। তবে বাস্তবে স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠীর কারণে অনেক সময় আইন প্রয়োগ কঠিন হয়ে পড়ে।
তবে ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন স্থানে বসা অবৈধ হাটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার তেমন দৃষ্টান্ত দেখা যায়নি। যদিও ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) এন এম নাসিরুদ্দিন চরচাকে বলেন, “নির্ধারিত পশুর হাটের বাইরে কোথাও হাট বসানোর অনুমতি নেই। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ ও বিভাগীয় ডিসিদের আগেই প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।”
নির্ধারিত স্থানের বাইরে কোথাও অবৈধভাবে হাট বসানোর তথ্য পেলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান এই পুলিশ কর্মকর্তা। কিন্তু নানা জায়গা থেকে অভিযোগ এলেও তেমন কোনো ব্যবস্থার দেখা মেলেনি।
শর্ত থাকে, মানে না কেউ
সিটি করপোরেশন প্রতি বছরই পশুর হাট বসানোর জন্য কিছু শর্ত দেয়। যেমন–আবাসিক এলাকায় হাট বসানো যাবে না, ফুটপাত ও মূল সড়ক দখল করা যাবে না, যান চলাচলে বাধা সৃষ্টি করা যাবে না এবং দ্রুত বর্জ্য অপসারণ করতে হবে।
কিন্তু বাস্তবে প্রায় প্রতি বছরই দেখা যায়, হাট সীমানা ছাড়িয়ে সড়ক ও আবাসিক এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। পশুবাহী ট্রাক রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। এতে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয় এবং ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ মানুষ।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা বলছেন, হাট শুরুর পর থেকে স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হয়। দুর্গন্ধ, যানজট ও শব্দদূষণও বাড়ে কয়েকগুণ।
বদলায় শুধু রাজনৈতিক রং
সংশ্লিষ্টদের মতে, রাজধানীর পশুর হাট এখন রাজনৈতিক অর্থনীতির অংশ হয়ে গেছে। ক্ষমতার কেন্দ্রের কাছাকাছি থাকা ব্যক্তি বা গোষ্ঠীই মূলত এসব হাটের নিয়ন্ত্রণ নেয়।
একসময় এসব হাটের নিয়ন্ত্রণ ছিল আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ নেতাকর্মীদের হাতে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এখন সেই জায়গায় এসেছে বিএনপি ও তাদের ঘনিষ্ঠরা।
সরকার বদলায়, রাজনৈতিক পরিচয় বদলায়, কিন্তু পশুর হাটকে কেন্দ্র করে প্রভাব বিস্তার, আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণের সংস্কৃতি খুব একটা বদলায় না।

ঈদুল আজহার সময় ঘনিয়ে এলেই রাজধানী ঢাকার চেহারা বদলে যেতে শুরু করে। সড়কের পাশে সারি সারি ট্রাক, অস্থায়ী বাঁশের কাঠামো, গরুর ডাক আর মানুষের ভিড়ে জমে ওঠে কোরবানির পশুর হাট। কিন্তু এই হাট শুধু পশু কেনাবেচায় সীমিত থাকে না। ঢাকার পশুর হাট ঘিরে প্রভাব, নিয়ন্ত্রণ, আধিপত্য এবং কোটি কোটি টাকার অর্থনৈতিক স্বার্থসিদ্ধিতে চলে রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো, যার আড়ালে থাকে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের ছায়া।
প্রতি বছরই রাজধানীর পশুর হাট ঘিরে চলে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, দরপত্র নিয়ন্ত্রণ, স্থানীয় আধিপত্য ও নেপথ্য সমঝোতার অভিযোগ। ক্ষমতায় যে দল থাকে, মূলত তাদের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি, নেতা বা ব্যবসায়ীরাই হাটের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে বদলায় শুধু নিয়ন্ত্রকদের রাজনৈতিক পরিচয়; তবে নিয়ন্ত্রণের ধরন খুব একটা বদলায় না।
সংশ্লিষ্ট সূত্র, সিটি করপোরেশনের তথ্য, রাজনৈতিক নেতাকর্মী, স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবার রাজধানীর অধিকাংশ অস্থায়ী পশুর হাটের নিয়ন্ত্রণ গেছে বিএনপি ও দলটির অঙ্গসংগঠনের নেতাদের হাতে। কোথাও তারা সরাসরি ইজারাদার, আবার কোথাও আড়াল থেকে পুরো হাট পরিচালনা করছেন। কয়েকটি এলাকায় শীর্ষ সন্ত্রাসীদের অনুসারীরাও হাট পরিচালনায় সক্রিয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আগে থেকেই ঠিক হয়ে যায় কোন হাট কে পাবে। প্রতিযোগিতা দেখাতে একাধিক দরপত্র জমা হলেও ভেতরে ভেতরে সমঝোতা থাকে। ফলে রাজনৈতিক পরিচয় ছাড়া বড় হাটে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে।
গত ২৮ এপ্রিল রাতে রাজধানীর নিউ মার্কেট এলাকায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে খুন হন তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন। তিনি আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমনের শ্যালক ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, বছিলা পশুর হাটকে কেন্দ্র করে ইমনের অনুসারীরা টিটনকে হত্যা করে। তবে এই হত্যাকাণ্ডের পর বছিলা হাটের ইজারা বন্ধ রেখেছে ঢাকা উত্তর সিটি কররোরেশন (ডিএনসিসি)।
‘খোলা দরপত্র’, কিন্তু নিয়ন্ত্রণ নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর
এবার ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের। ২৩টি অস্থায়ী পশুর হাটের ইজারা দিয়েছে। যদিও দুই সিটি কররোরেশন মিলে ২৯টি পশুর হাট বসার কথা থাকলেও বাকিগুলোর ইজারা কার্যক্রম শেষ হয়নি বলে জানিয়েছে সংস্থা দুটি। এর মধ্যে ঢাকা উত্তরে ১২টি এবং দক্ষিণে ১১টি। পাশাপাশি গাবতলী ও সারুলিয়ায় রয়েছে দুটি স্থায়ী পশুর হাট।
সিটি করপোরেশন সূত্র বলছে, সরকারিভাবে সব হাট উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে ইজারা দেওয়া হয়। পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়, নির্ধারিত নিয়মে আবেদন নেওয়া হয়, এরপর সর্বোচ্চ দরদাতাকে হাট বুঝিয়ে দেওয়া হয়।
তবে মাঠপর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাস্তবে প্রভাবশালী রাজনৈতিক বলয়ের বাইরে থাকা অনেক ব্যবসায়ী দরপত্র জমা দিতেই ভয় পান। কারণ, হাট নিয়ন্ত্রণ মানে শুধু পশু কেনাবেচা নয়। এর সঙ্গে জড়িত থাকে ট্রাক প্রবেশ, খাজনা আদায়, জায়গা নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা, এমনকি স্থানীয় আধিপত্যের প্রশ্নও।

একাধিক ব্যবসায়ী জানান, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আগে থেকেই ঠিক হয়ে যায় কোন হাট কে পাবে। প্রতিযোগিতা দেখাতে একাধিক দরপত্র জমা হলেও ভেতরে ভেতরে সমঝোতা থাকে। ফলে রাজনৈতিক পরিচয় ছাড়া বড় হাটে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে।
দক্ষিণে বিএনপির আধিপত্য
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অধিকাংশ অস্থায়ী হাট এবার বিএনপি ও তাদের ঘনিষ্ঠদের নিয়ন্ত্রণে গেছে। পোস্তগোলা শ্মশানঘাটসংলগ্ন নদীপারের বড় পশুর হাট পেয়েছেন শ্যামপুর থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক কাজী মাহবুব মাওলা। প্রায় ৪ কোটি টাকায় তিনি হাটটির ইজারা নিয়েছেন। স্থানীয়দের ভাষ্য, অতীতে আওয়ামী লীগঘনিষ্ঠ নেতারা এই হাট নিয়ন্ত্রণ করলেও এখন সেখানে বিএনপির প্রভাব স্পষ্ট।
জানতে চাইলে কাজী মাহবুব মাওলা চরচাকে বলেন, “আমি নিয়ম মেনে ইজারা পেয়েছি। দলের প্রভাবে নয়।”
উত্তর শাহজাহানপুরের মৈত্রী সংঘ ক্লাবসংলগ্ন হাট পেয়েছেন ব্যবসায়ী আনিসুর রহমান, যিনি বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের এক নেতার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। তবে তিনি এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
ডেমরার আমুলিয়া মডেল টাউন এলাকার হাটের নিয়ন্ত্রণ গেছে ডেমরা থানা বিএনপির সাবেক সভাপতি জয়নাল আবেদীনের কাছে। গত বছরও তিনি এই হাট নিয়ন্ত্রণ করেছেন। তিনি বলেন, “দরপত্রের মাধ্যমে ইজারা পেয়েছি। এতে সমস্যা কোথায়?”
রহমতগঞ্জ ক্লাব মাঠের ইজারা পেয়েছেন আরেক বিএনপি নেতা টিপু সুলতান, যিনি রহমতগঞ্জ মুসলিম ফ্রেন্ডস সোসাইটির সভাপতি এবং চকবাজার থানা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি। তিনি অভিযোগ করে বলেন, “লালবাগ এলাকায় আরেকটি হাটের ইজারা দেওয়া হয়েছে। সেটি পেয়েছেন যুবদলের এক নেতা হৃদয়। তিনি আমাদের ছেলে-পেলেদের সঙ্গে ঝামেলা করছেন। আমাদের হাটে আসা পশুবাহী গাড়ি তাদের হাটে নিয়ে যাচ্ছে। আমরা বিষয়টি স্থানীয় সংসদ সদস্যের মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করছি।”
ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্লাবসংলগ্ন এলাকার খালি জায়গায় পশুর হাটের ইজারা পেয়েছেন মোহাম্মদ ইসমাইল হোসেন। তিনি যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা।
গ্রীন বনশ্রী হাউজিং সোসাইটির খালি জায়গায় ৭০ লাখ ২০ হাজার টাকায় পশুর হাটের ইজারা পেয়েছেন মো. গোলাম হোসেন। তিনি ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক। জানতে চাইলে তিনি বলেন, “উন্মুক্ত দরপত্রের ভিত্তিতে আমরা সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে ইজারা পেয়েছি। এখানে দলীয় প্রভাবের কিছু নেই।”
গোপীবাগ ও সিকদার মেডিকেল কলেজসংলগ্ন হাটগুলোর সঙ্গেও বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে কাজলা-মাতুয়াইল এলাকার হাট পেয়েছে জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত একটি প্রতিষ্ঠান। গোলাপবাগ এলাকার একটি হাটের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে এনসিপিঘনিষ্ঠ এক ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধেও। মোবাইল ফোনে তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা (উপসচিব) মো. রেজাউল করিম চরচাকে বলেন, “অবৈধ পশুর হাট বসানো অভিযোগ আমরাও পাচ্ছি। অভিযোগ পাওয়ার পরপরই সেটাকে অ্যাড্রেস করছি। আমাদের ম্যাজিস্ট্রেট সেখানে গিয়েছেন, পুলিশকে জানিয়েছি এবং বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কেউ অবৈধভাবে হাট চালাতে পারবে না। বিভিন্ন জায়গায় যেভাবে হাট বসে যাচ্ছে, সেটা আমরা কোনোভাবেই সমর্থন করি না।”
পশুর হাটের ইজারা নিয়ে দলীয় নেতাকর্মীদের প্রভাবের অভিযোগ প্রসঙ্গে ডিএনসিসির এই শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, “কে কোন দল করে, সেটা আমরা দেখি না। আমরা বিজ্ঞপ্তি দিয়েছি, নিয়ম অনুযায়ী টেন্ডার নেওয়া হয়েছে। যারা সরকারি নির্ধারিত মূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বা তারচেয়ে বেশি দর দিয়েছেন, তাদেরই ইজারা দেওয়া হয়েছে।”
হাট ইজারার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের প্রভাব বা পেশিশক্তির সুযোগ নেই। সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী সর্বোচ্চ দরদাতাকেই ইজারা দেওয়া হবে। কে কোন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত, সেটি বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে না। দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি পে-অর্ডারসহ সংশ্লিষ্ট সব নথি যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছে।
রেজাউল করিম বলেন, “ইজারাদার কেউ রাজনৈতিকভাবে সম্পৃক্ত থাকতেই পারে, কিন্তু সেটা করপোরেশনের বিষয় না। আমাদের বিষয় হলো—সরকারি মূল্য পাওয়া গেছে কি না এবং তারা নিয়ম মেনে টেন্ডারে অংশ নিয়েছে কি না। সেই নিয়মের মধ্যেই আমরা ইজারা দিয়েছি।”
একইভাবে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালাম উত্থাপিত এসব অভিযোগকে ‘ভিত্তিহীন’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। চরচাকে তিনি বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বলয়ের প্রভাবের কারণে রাজধানীর পশুর হাটগুলোতে প্রকৃত প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি হয়নি। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই তুলনামূলক কম দামে ইজারা সম্পন্ন হতো। তবে এবার উন্মুক্ত ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ পরিবেশে দরপত্র জমা পড়েছে। তাই এসব অভিযোগ আসলে ভিত্তিহীন।”
ডিএসসিসির এই প্রশাসক বলেন, “হাট ইজারার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের প্রভাব বা পেশিশক্তির সুযোগ নেই। সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী সর্বোচ্চ দরদাতাকেই ইজারা দেওয়া হবে। কে কোন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত, সেটি বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে না। দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি পে-অর্ডারসহ সংশ্লিষ্ট সব নথি যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছে।”
এ ছাড়া কোনো হাটের দরপত্র নিয়ে অংশগ্রহণকারীদের আপত্তি থাকলে তা লিখিতভাবে জমা দেওয়ার আহ্বানও জানান তিনি। পাশাপাশি যেসব হাটের ইজারা এখনও সম্পন্ন হয়নি, সেগুলোর জন্য পুনরায় দরপত্র আহ্বান করা হবে বলেও উল্লেখ করেন এই প্রশাসক।
উত্তরেও বিএনপি, যুবদল-স্বেচ্ছাসেবক দলের দাপট
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের হাটগুলোতেও বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাদের প্রভাব স্পষ্ট। সবচেয়ে বড় হাট উত্তরা দিয়াবাড়ির বউবাজার পশুর হাটের ইজারা পেয়েছে এস এফ করপোরেশনের মো. শেখ ফরিদ হোসেন। তিনি মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলে সভাপতি। তিনি প্রায় ১৪ কোটি টাকার বেশি দরে হাটটির ইজারা পেয়েছন। চরচাকে তিনি বলেন, “আমি নিয়ম মেনে সর্বচ্চ দরদাতা হিসেবে হাটের ইজারা পেয়েছি। দলীয় কোনো প্রভাব বা পরিচয় এখানে আসার কোনো কারণ নেই।”
ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটসংলগ্ন হাট পেয়েছেন যুবদল নেতা আমিনুল ইসলাম। এই হাট পরিচালনায় স্থানীয় বিএনপির আরও কয়েকজন নেতা যুক্ত রয়েছেন বলে জানা গেছে।
খিলক্ষেত থানাধীন মস্তুল এলাকায় পশুর হাটের ইজারা পেয়েছেন থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক বিল্লাল হোসেন। চরচাকে তিনি বলেন, “আমরা দল করি। হাট পরিচালনা করার মতো আমাদের লোকজন আছে।” তবে তিনি অভিযোগ করে বলেন, “আমাদের হাটের আগে প্রধান বনরূপায় একটি হাট রয়েছে। আমাদের হাটে আসা পশুর গাড়িগুলো জোর করে তাদের হাটের নিয়ে যাচ্ছে।”
বনরূপা আবিাসিক প্রকল্পের খালি জায়গায় হাটের ইজারা পেয়েছেন আরিফিন অ্যান্ড আরাফ এন্টারপ্রাইজের আবুল কালাম আজাদ। তিনি তুরাগ থানা বিএনপির নেতা। এই হাটের দরপত্র মাত্র তিনজন ক্রয় করেছেন। হাটের দরমূল ছিল ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা। সেখানে তিনি ১ কোটি ৮০ লাখ ১০ হাজার টাকায় ইজারা পেয়েছেন। তিনি বলেন, “এই হাটের কেউ ইজারা নিতে আগ্রহী নন। তাই আমরা এই হাটের ইজারা পেয়েছি।”
কিন্তু দরমূলে সমপরিমাণে কীভাবে ইজারা পেলেন–জানতে চাইলে ফোন কেটে দেন আবুল কালাম আজাদ।
বাড্ডা স্বদেশ প্রোপার্টির খালি জায়গায় ইজারা পেয়েছেন যুবদলের নেতা মুহাম্মদ তুহিনুল ইসলাম। অন্যদিকে বড় বেরাইদ বসুন্ধারা আবাসিক এলাকায় খালি জায়গায় ইজারা পেয়েছেন এ এম এন্টারপ্রাাইজের মো. আতাউর রহমান। তিনি বিএনপির নেতা। তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
এ ছাড়া কাঁচকুড়া, ডুমনি ও পূর্ব হাজীপাড়ার হাটগুলোর সঙ্গেও বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে জানান সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্টরা।
এ ছাড়া মিরপুরে দুটি হাটের ইজারা দেওয়া হয়েছে। তবে সরকারি দরপত্রের প্রায় সমমূলে হাট দুটি হাজার দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, হাট দুটি ইজারাকারীরা বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং তারা ডিএনসিসির প্রশাসকের ঘনিষ্ঠ। মিরপুর ৬ নম্বর সেকশনে ইস্টার্ন হাউজিং এলাকায় হাটের ইজারা পেয়েছেন মেসার্স ইসলাম এন্টারপ্রাাইজের মো. সিরাজুল ইসলাম। এই হাটের সরকারি দর ছিল ১ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। সেখানে সিরাজুল ইসলাম এই হাটটি ১ কোটি ৭৮ লাখ টাকায় পেয়েছেন। জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমি একজন ব্যবসায়ী। আমার রাজনৈতিক কোনো পোস্টপদবি নেই। আর হাটের দরপত্র ক্রয় করাটা সবার জন্যই উন্মুক্ত ছিল। ফলে এই হাটের দরপত্র কম কেনা হয়েছে। আর কিছু আমার জানা নেই।”
অন্যদিকে মিরপুর কালশী বালুর মাঠের ইজারা পেয়েছেন রেদোয়ান রহমান নামে স্থা্নীয় বিএনপির আরেক নেতা। এই হাটের সরকারি দর ছিল ৩০ লাখ টাকা। সেখানে ৩০ লাখ ১১ হাজার টাকায় হাটের ইজারা পেয়েছেন রেদোয়ান। নামমাত্র টাকায় কীভাবে ইজারা পেয়েছেন জানতে চেয়ে তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হয়। তবে তিনি কল রিসভ করেননি।
এসব বিষয়ে জানতে ঢাকা উত্তর সিটি করপোররেশনের (ডিএনসিসি) প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা মোহাম্মদ শওকত ওসমানের সঙ্গে টেলিফোনে বারবার যোগাযোগ করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। পরে মেসেজ পাঠানো হলেও তিনি সাড়া দেননি।
‘নেপথ্যের নিয়ন্ত্রক’দের উত্থান
কিছু এলাকায় সিটি করপোরেশনের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন ছাড়াই পশুর হাট বসানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিশেষ করে মোহাম্মদপুর, বছিলা, তেজগাঁও, মিরপুর এবং হাজারীবাগ এলাকায় স্থানীয় প্রভাবশালী ও সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর সক্রিয়তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
সূত্র বলছে, বছিলা পশুর হাট নিয়ে অতীতে সংঘর্ষ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছিল। এ কারণে এবার কিছু হাটের আনুষ্ঠানিক ইজারা বন্ধ রাখা হলেও বাস্তবে স্থানীয় প্রভাবশালী মহল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে হাট বসিয়েছে।

মোহাম্মদপুরের কয়েকটি হাট স্থানীয় রাজনৈতিক দলের নেতা ও সন্ত্রাসী গ্রুপের অনুসারীরা পরিচালনা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। কোথাও কোথাও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রচ্ছায়ায় এসব হাট চলছে বলে দাবি স্থানীয় বাসিন্দাদের।
সূত্র বলছে, মোহাম্মদপুর বছিলা পশুর হাটের ইজারা নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরেই খুন হন শীর্ষ সন্ত্রাসী টিটন। এই কারণে এবার বছিলা পশুর হাটের ইজারা বন্ধ রেখেছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন। ফলে এবার মোহাম্মদপুর কেন্দ্রীয় চারটি পশুর হাট বসিয়েছে স্থানীয় বিএনপি নেতা ও শীর্ষ সন্ত্রাসীদের অনুসারীরা। তবে এসব হাটের অনুমোদন দেয়নি সিটি কররোরেশন।
জনতা বাজারে পশুর হাট বসিয়েছে পাপ্পু ওরফে কিলার পাপ্পু, ইমন মুন্সী এবং মোহাম্মদপুর থানা ছাত্রদলের সাবেক সহ-সভাপতি মির্জা রাজিবুল আলম রয়েল। পাপ্পু শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলালের অনুসারী।
মোহাম্মাদি হাউজিং সোসাইটি প্রধান সড়কে ছাত্রদলের আরিফ, যুবদলের রিয়াদ, দিপক, মামুন এবং বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক কবির মিলে হাট বসিয়েছেন।
অন্যদিকে চন্দ্রিমা হাউজিং এলাকায় পশুর হাট বসিয়েছেন মনোয়ার হোসেন জীবন ওরফে লেদু হাসান। লেদু হাসান সানজিদুল ইসলাম ইমন ওরফে ক্যাপ্টেন ইমনের অনুসারী। এর সঙ্গে মোহাম্মদপুর থানা ও ১০০ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির একাধিক নেতাকর্মী রয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া আদাবরে মনসুরাবাদ ৮ নম্বর সড়কে আরেকটি হাট বসিয়েছে আদাবর থানা বিএনপির সভাপতি সাদিক।
রায়ের বাজার এলাকায় জিয়া মাঠে আরেকটি পশুর হাট বসিয়েছেন রাজেস নামে স্থানীয় এক প্রভাবশালী ব্যক্তি, যিনি ক্যাপ্টেন ইমনের অনুসারী।
স্থানীয় এক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে চরচাকে বলেন, “হাটের ভেতরে কে গরু নামাবে, কে ট্রাক ঢোকাবে, কোথায় জায়গা পাবে–সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে নির্দিষ্ট গ্রুপ। বাইরে থেকে কেউ এলে টিকতে পারে না।”
কোটি টাকার অর্থনীতি
পশুর হাটকে কেন্দ্র করে যে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তৈরি হয়, তার পরিমাণও বিশাল। শুধু ইজারা থেকেই কোটি কোটি টাকা আয় হয় সিটি করপোরেশনের। এর বাইরে রয়েছে ট্রাক পার্কিং, শ্রমিক ভাড়া, পশু নামানো, নিরাপত্তা, খাবারের দোকান, অস্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণসহ নানা খাত।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, বড় একটি হাটে প্রতিদিন কয়েক হাজার পশু কেনাবেচা হয়। প্রতিটি পশুর ওপর আলাদা খাজনা আদায় করা হয়। ফলে পাঁচ দিনের একটি হাট থেকেও বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থের লেনদেন হয়।
এই বিশাল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণেই রাজনৈতিক দল, স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠী এবং বিভিন্ন ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট হাটের নিয়ন্ত্রণ নিতে আগ্রহী হয়ে ওঠে।
হাট ঘিরে পুলিশ যা করছে
পশুর হাটকে কেন্দ্র করে জাল টাকা, ছিনতাই, মলম পার্টি ও চাঁদাবাজির ঝুঁকি থাকে প্রতি বছরই। এ কারণে এবার ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) বিশেষ নিরাপত্তা পরিকল্পনা নিয়েছে।
ডিএমপির পক্ষ থেকে হাটগুলোতে সিসি ক্যামেরা, ওয়াচ টাওয়ার, পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা, ব্যাংকিং বুথ এবং জাল নোট শনাক্তকরণ মেশিন রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পোশাকধারী ও সাদা পোশাকের পুলিশ মোতায়েনের পরিকল্পনাও রয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, চাঁদাবাজি ও অবৈধ প্রভাব বিস্তার ঠেকাতে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। তবে বাস্তবে স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠীর কারণে অনেক সময় আইন প্রয়োগ কঠিন হয়ে পড়ে।
তবে ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন স্থানে বসা অবৈধ হাটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার তেমন দৃষ্টান্ত দেখা যায়নি। যদিও ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) এন এম নাসিরুদ্দিন চরচাকে বলেন, “নির্ধারিত পশুর হাটের বাইরে কোথাও হাট বসানোর অনুমতি নেই। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ ও বিভাগীয় ডিসিদের আগেই প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।”
নির্ধারিত স্থানের বাইরে কোথাও অবৈধভাবে হাট বসানোর তথ্য পেলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান এই পুলিশ কর্মকর্তা। কিন্তু নানা জায়গা থেকে অভিযোগ এলেও তেমন কোনো ব্যবস্থার দেখা মেলেনি।
শর্ত থাকে, মানে না কেউ
সিটি করপোরেশন প্রতি বছরই পশুর হাট বসানোর জন্য কিছু শর্ত দেয়। যেমন–আবাসিক এলাকায় হাট বসানো যাবে না, ফুটপাত ও মূল সড়ক দখল করা যাবে না, যান চলাচলে বাধা সৃষ্টি করা যাবে না এবং দ্রুত বর্জ্য অপসারণ করতে হবে।
কিন্তু বাস্তবে প্রায় প্রতি বছরই দেখা যায়, হাট সীমানা ছাড়িয়ে সড়ক ও আবাসিক এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। পশুবাহী ট্রাক রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। এতে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয় এবং ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ মানুষ।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা বলছেন, হাট শুরুর পর থেকে স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হয়। দুর্গন্ধ, যানজট ও শব্দদূষণও বাড়ে কয়েকগুণ।
বদলায় শুধু রাজনৈতিক রং
সংশ্লিষ্টদের মতে, রাজধানীর পশুর হাট এখন রাজনৈতিক অর্থনীতির অংশ হয়ে গেছে। ক্ষমতার কেন্দ্রের কাছাকাছি থাকা ব্যক্তি বা গোষ্ঠীই মূলত এসব হাটের নিয়ন্ত্রণ নেয়।
একসময় এসব হাটের নিয়ন্ত্রণ ছিল আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ নেতাকর্মীদের হাতে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এখন সেই জায়গায় এসেছে বিএনপি ও তাদের ঘনিষ্ঠরা।
সরকার বদলায়, রাজনৈতিক পরিচয় বদলায়, কিন্তু পশুর হাটকে কেন্দ্র করে প্রভাব বিস্তার, আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণের সংস্কৃতি খুব একটা বদলায় না।