নাইর ইকবাল

বাংলাদেশের পেসার মোস্তাফিজুর রহমান বড় এক রাজনীতিরই ঘুঁটি হলেন। তবে দুঃখটা হলো, তিনি যে রাজনীতির ঘুঁটি হলেন, সেটি নিছক রাজনীতি নয়, তার সঙ্গে মিশে আছে ধর্মীয় উগ্রবাদ। খেলার মধ্যে রাজনীতি আনা, না আনা নিয়ে বিতর্ক আছে। তবে রাজনীতি খেলার মধ্যে ঢুকেছে চিরদিনই। কিন্তু মোস্তাফিজকে জড়িয়ে যে ব্যাপারটি হলো, সেটি রাজনীতি নয়, বিদ্বেষ।
মোস্তাফিজকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার পর রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়াটা যেসব দিক দিয়ে এসেছে, তার জন্য ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড পুরোপুরি প্রস্তুত ছিল, এটা বলা যাবে না। আগামী মাসে ভারতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। যেদিন বিশ্বকাপকে সামনে রেখে বাংলাদেশের দল ঘোষণা হলো, সেদিনই মোস্তাফিজের ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া দিতে হলো বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকে।
বাংলাদেশ সাফ জানিয়ে দিয়েছে, যেখানে ব্যক্তি মোস্তাফিজের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা, সেখানে পুরো দল নিয়ে বিশ্বকাপ খেলতে যাওয়ার কোনো মানে হয় না। বাংলাদেশ ভারতের মাটিতে বাংলাদেশের ম্যাচগুলো সরিয়ে শ্রীলঙ্কায় আয়োজনের অনুরোধ জানিয়েছে আইসিসিকে। সে অনুরোধ আইসিসি যদি রাখে, তাহলে ভালো। না হলে হয়তো বিশ্বকাপ থেকেই নাম তুলে নিতে পারে বাংলাদেশ। এখানেই শেষ নয়, বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয় বাংলাদেশে আইপিএলের টেলিভিশন সম্প্রচার বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে।
দুটি প্রতিক্রিয়াই কড়া। ভারতে বাংলাদেশ বিশ্বকাপ খেলতে যাবে না–এটা ভারতের জন্য ধাক্কা। ভারত চিরদিনই বাংলাদেশের ব্যাপারে একতরফা সিদ্ধান্ত নিয়ে এসেছে। এই তো ২০২৫-এর আগস্টেই এক সেনা কর্মকর্তার রেটোরিক বক্তব্যের ধুয়া তুলে দ্বিপক্ষীয় সিরিজ বাতিল করেছে তারা। বড় অর্থনীতি, ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় বাজার তারা। ভারত যদি সিরিজ বাতিল করে, সেটা দ্বিতীয় দেশটির জন্য বড় আর্থিক ক্ষতিই। বাংলাদেশ ব্যাপারটি হজম করেই নিয়েছিল। কিন্তু মোস্তাফিজের বিষয়ে বাংলাদেশ যা প্রতিক্রিয়া দেখাল, সেটি কোনোভাবেই প্রত্যাশিত ছিল না ভারতের জন্য। বিশ্বকাপের একক আয়োজক হিসেবে যে গৌরব, সেটিতেই বাংলাদেশ আঘাত দিয়েছে ভেন্যু বদলের দাবি তুলে। এর সঙ্গে আইপিএলের সম্প্রচার বন্ধের ব্যাপারটি যদি যোগ হয়, সেটি হবে বাণিজ্যিক ধাক্কা। অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে, বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমীরা আইপিএলের মোটামুটি বড় বাজারই।
মোস্তাফিজকে বাদ দিতে গিয়ে নিরাপত্তার অজুহাত দিয়েছে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড। আগেই ‘বাংলাদেশি’ মোস্তাফিজকে বিমানবন্দরে নামতে না দেওয়া, তিনি খেললে পিচ খুঁড়ে ফেলার হুমকি দিয়েছিল উগ্রবাদীরা। সে হিসেবে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড ঠিক জায়গাতেই হাত দিয়েছে–যদি ব্যক্তি মোস্তাফিজের নিরাপত্তাই শঙ্কার মধ্যে থাকে, তাহলে পুরো বাংলাদেশ দলের নিরাপত্তা ভারতীয় বোর্ড কীভাবে দেবে? টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে তো শুধু বাংলাদেশ দল যাবে না, দলের সঙ্গে কর্মকর্তারা থাকবেন, থাকবেন সমর্থক ও গণমাধ্যম কর্মীরা। যদি বাংলাদেশি পরিচয়ই জীবনের জন্য হুমকি হয়, সেটা তো ভয়ংকর উদ্বেগের বিষয়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের পতনের পর থেকেই ভারতের আচরণ অস্থির। কেন অস্থির সেটি বোধগম্যই। হঠাৎ করেই বাংলাদেশ ভারতের গণমাধ্যমের লক্ষ্যবস্তু। যেটি ঘটছে, সেই খবর তো তারা লুফে নিচ্ছেই; যা ঘটেনি, সে বিষয় নিয়েও মনের মাধুরী মিশিয়ে অপতথ্য দিতে দেখছি আমরা। ডিসেম্বরে ভালুকায় পোশাক শ্রমিক দিপু চন্দ্র দাসকে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার অভিযোগ তুলে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। যে হত্যাকাণ্ডকে ভারত বাংলাদেশের সংখ্যালঘূ নির্যাতন হিসেবেই তুলে ধরছে। যিনি হত্যার শিকার হয়েছেন, তার নাম দিপু চন্দ্র দাস, এবং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ তুলেই তাকে হত্যা করা হয়েছে–এটা সত্য। কিন্তু সেটি কী সম্মিলিত সংখ্যালঘূ নির্যাতন, নাকি বিচ্ছিন্ন অপরাধমূলক ঘটনা, সে প্রশ্ন থাকেই। দিপু চন্দ্র দাস হত্যার সঙ্গে জড়িত অভিযোগে অনেককেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে, এ হত্যার বিরুদ্ধে বাংলাদেশে নিন্দার ঝড় উঠেছে। কিন্তু ভারতীয় গণমাধ্যম বাকি বিষয়গুলোকে এড়িয়ে এ নিয়ে একতরফা ভাষ্য তৈরি করছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে অপতথ্যও ছড়াচ্ছে, যা ৫ আগস্টের পর থেকেই করে চলেছে। মোস্তাফিজও তার শিকার হয়েছেন, এটা বলা যায়।

খেলার মধ্যে রাজনীতি আনা, না আনা নিয়ে বিতর্ক আছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, খেলায় রাজনীতি সব সময়ই ছিল। সেই রাজনীতিকে রাজনীতিকেরা নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছেন। খেলার মধ্যে জাতীয়বাতাবাদী ও ধর্মীয় বিদ্বেষও খুব সূক্ষ্ম প্রক্রিয়ায় ব্যবহার করা হয়। ভারতের আইনপ্রণেতা ও সাবেক মন্ত্রী শশী থারুর মোস্তাফিজকে বাদ দেওয়ার পর এক প্রতিক্রিয়ায় সেটিই তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, মোস্তাফিজের জায়গায় যদি লিটন দাস কিংবা সৌম্য সরকার থাকতেন, তাহলে কী তাদের বাদ দেওয়া হতো?
শশী থারুর বাংলাদেশের বা মোস্তাফিজের প্রসঙ্গে বলেছেন, “মোস্তাফিজকে বাদ দেওয়া অপ্রয়োজনীয় ও অযৌক্তিক। বাংলাদেশ পাকিস্তান নয়। বাংলাদেশ সীমান্ত পেরিয়ে সন্ত্রাসী পাঠাচ্ছে না। এই দুই দেশের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কও ভিন্ন। বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের আলোচনা বা কূটনৈতিক সম্পর্কের যে পর্যায়, তা পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের পর্যায় থেকে আলাদা। এই দুই দেশকে এক সরল সমীকরণে ফেলা যায় না।”
বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে খেলতে ভারতে যেতে অস্বীকৃতি জানানোর ব্যাপারে তার কথা, “আমরা নিজেরাই এই লজ্জার পরিস্থিতি ডেকে এনেছি।”
মোস্তাফিজকে নিয়ে যা হয়েছে, এর সঙ্গে ভোটের রাজনীতির একটা বড় যোগ আছে। এ বছরই পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচন। প্রায় গোটা ভারতই হিন্দুত্ববাদী ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) করায়ত্ত হলেও পশ্চিমবঙ্গটা কোনোভাবেই দখলে নেওয়া যাচ্ছে না। হঠাৎ করেই মোস্তাফিজকে লক্ষ্যবস্তু বানানো, সেই ভোটের কৌশলেরই অংশ। পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশ-বিদ্বেষ দেখিয়ে ভোটের বাক্স ভরাই এর মূল লক্ষ্য। বাংলাদেশে সংখ্যালঘূ নির্যাতনের অভিযোগের ফলে সৃষ্ট ধর্মীয় ভাবাবেগই নিজেদের বাক্সে ভোট নিতে সাহায্য করবে বলে মনে করে বিজেপি। আগেই বলেছি, মোস্তাফিজ শুধুই এই নোংরা খেলার ঘুঁটি। ক্রিকেট হচ্ছে একটা অস্ত্র, যা ভারতে অন্তত খুব কার্যকর অস্ত্র হিসেবেই বিবেচিত।
মোস্তাফিজকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, এর প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশ আগামী মাসে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতে খেলতে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, বাংলাদেশ সরকার আইপিএলের সম্প্রচার বাংলাদেশে বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে। এরপর কী! ক্রিকেটে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এখন কোথায় গিয়ে ঠেকবে? পাকিস্তানের মতোই হবে পুরো বিষয়টি? দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সিরিজগুলোর কী হবে? এসব প্রশ্ন উঠবে।
ভারত এসবেরও পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখাবে। এটা তো অস্বীকারের কোনো উপায় নেই যে, ক্রিকেট চলেই ভারতের টাকায়। এ নিয়ে তাদের বড়াইয়ের অন্ত নেই। পরবর্তী সময়ে যেটা হবে, তা হলো, ভারত নানা দিক দিয়ে বাংলাদেশকে চাপে ফেলার চেষ্টা করবে। বাংলাদেশের ক্রিকেটকে আর্থিক দিক দিয়ে সামনে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে। এগুলো অবধারিতই।
সামনের দিনগুলোতে এসব মোকাবিলায় নিজেদের ক্রিকেটের ভিত শক্ত করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই বাংলাদেশের সামনে। বাংলাদেশ কি প্রস্তুত?
নাইর ইকবাল: বিশেষ প্রতিনিধি, চরচা

বাংলাদেশের পেসার মোস্তাফিজুর রহমান বড় এক রাজনীতিরই ঘুঁটি হলেন। তবে দুঃখটা হলো, তিনি যে রাজনীতির ঘুঁটি হলেন, সেটি নিছক রাজনীতি নয়, তার সঙ্গে মিশে আছে ধর্মীয় উগ্রবাদ। খেলার মধ্যে রাজনীতি আনা, না আনা নিয়ে বিতর্ক আছে। তবে রাজনীতি খেলার মধ্যে ঢুকেছে চিরদিনই। কিন্তু মোস্তাফিজকে জড়িয়ে যে ব্যাপারটি হলো, সেটি রাজনীতি নয়, বিদ্বেষ।
মোস্তাফিজকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার পর রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়াটা যেসব দিক দিয়ে এসেছে, তার জন্য ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড পুরোপুরি প্রস্তুত ছিল, এটা বলা যাবে না। আগামী মাসে ভারতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। যেদিন বিশ্বকাপকে সামনে রেখে বাংলাদেশের দল ঘোষণা হলো, সেদিনই মোস্তাফিজের ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া দিতে হলো বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকে।
বাংলাদেশ সাফ জানিয়ে দিয়েছে, যেখানে ব্যক্তি মোস্তাফিজের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা, সেখানে পুরো দল নিয়ে বিশ্বকাপ খেলতে যাওয়ার কোনো মানে হয় না। বাংলাদেশ ভারতের মাটিতে বাংলাদেশের ম্যাচগুলো সরিয়ে শ্রীলঙ্কায় আয়োজনের অনুরোধ জানিয়েছে আইসিসিকে। সে অনুরোধ আইসিসি যদি রাখে, তাহলে ভালো। না হলে হয়তো বিশ্বকাপ থেকেই নাম তুলে নিতে পারে বাংলাদেশ। এখানেই শেষ নয়, বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয় বাংলাদেশে আইপিএলের টেলিভিশন সম্প্রচার বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে।
দুটি প্রতিক্রিয়াই কড়া। ভারতে বাংলাদেশ বিশ্বকাপ খেলতে যাবে না–এটা ভারতের জন্য ধাক্কা। ভারত চিরদিনই বাংলাদেশের ব্যাপারে একতরফা সিদ্ধান্ত নিয়ে এসেছে। এই তো ২০২৫-এর আগস্টেই এক সেনা কর্মকর্তার রেটোরিক বক্তব্যের ধুয়া তুলে দ্বিপক্ষীয় সিরিজ বাতিল করেছে তারা। বড় অর্থনীতি, ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় বাজার তারা। ভারত যদি সিরিজ বাতিল করে, সেটা দ্বিতীয় দেশটির জন্য বড় আর্থিক ক্ষতিই। বাংলাদেশ ব্যাপারটি হজম করেই নিয়েছিল। কিন্তু মোস্তাফিজের বিষয়ে বাংলাদেশ যা প্রতিক্রিয়া দেখাল, সেটি কোনোভাবেই প্রত্যাশিত ছিল না ভারতের জন্য। বিশ্বকাপের একক আয়োজক হিসেবে যে গৌরব, সেটিতেই বাংলাদেশ আঘাত দিয়েছে ভেন্যু বদলের দাবি তুলে। এর সঙ্গে আইপিএলের সম্প্রচার বন্ধের ব্যাপারটি যদি যোগ হয়, সেটি হবে বাণিজ্যিক ধাক্কা। অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে, বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমীরা আইপিএলের মোটামুটি বড় বাজারই।
মোস্তাফিজকে বাদ দিতে গিয়ে নিরাপত্তার অজুহাত দিয়েছে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড। আগেই ‘বাংলাদেশি’ মোস্তাফিজকে বিমানবন্দরে নামতে না দেওয়া, তিনি খেললে পিচ খুঁড়ে ফেলার হুমকি দিয়েছিল উগ্রবাদীরা। সে হিসেবে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড ঠিক জায়গাতেই হাত দিয়েছে–যদি ব্যক্তি মোস্তাফিজের নিরাপত্তাই শঙ্কার মধ্যে থাকে, তাহলে পুরো বাংলাদেশ দলের নিরাপত্তা ভারতীয় বোর্ড কীভাবে দেবে? টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে তো শুধু বাংলাদেশ দল যাবে না, দলের সঙ্গে কর্মকর্তারা থাকবেন, থাকবেন সমর্থক ও গণমাধ্যম কর্মীরা। যদি বাংলাদেশি পরিচয়ই জীবনের জন্য হুমকি হয়, সেটা তো ভয়ংকর উদ্বেগের বিষয়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের পতনের পর থেকেই ভারতের আচরণ অস্থির। কেন অস্থির সেটি বোধগম্যই। হঠাৎ করেই বাংলাদেশ ভারতের গণমাধ্যমের লক্ষ্যবস্তু। যেটি ঘটছে, সেই খবর তো তারা লুফে নিচ্ছেই; যা ঘটেনি, সে বিষয় নিয়েও মনের মাধুরী মিশিয়ে অপতথ্য দিতে দেখছি আমরা। ডিসেম্বরে ভালুকায় পোশাক শ্রমিক দিপু চন্দ্র দাসকে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার অভিযোগ তুলে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। যে হত্যাকাণ্ডকে ভারত বাংলাদেশের সংখ্যালঘূ নির্যাতন হিসেবেই তুলে ধরছে। যিনি হত্যার শিকার হয়েছেন, তার নাম দিপু চন্দ্র দাস, এবং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ তুলেই তাকে হত্যা করা হয়েছে–এটা সত্য। কিন্তু সেটি কী সম্মিলিত সংখ্যালঘূ নির্যাতন, নাকি বিচ্ছিন্ন অপরাধমূলক ঘটনা, সে প্রশ্ন থাকেই। দিপু চন্দ্র দাস হত্যার সঙ্গে জড়িত অভিযোগে অনেককেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে, এ হত্যার বিরুদ্ধে বাংলাদেশে নিন্দার ঝড় উঠেছে। কিন্তু ভারতীয় গণমাধ্যম বাকি বিষয়গুলোকে এড়িয়ে এ নিয়ে একতরফা ভাষ্য তৈরি করছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে অপতথ্যও ছড়াচ্ছে, যা ৫ আগস্টের পর থেকেই করে চলেছে। মোস্তাফিজও তার শিকার হয়েছেন, এটা বলা যায়।

খেলার মধ্যে রাজনীতি আনা, না আনা নিয়ে বিতর্ক আছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, খেলায় রাজনীতি সব সময়ই ছিল। সেই রাজনীতিকে রাজনীতিকেরা নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছেন। খেলার মধ্যে জাতীয়বাতাবাদী ও ধর্মীয় বিদ্বেষও খুব সূক্ষ্ম প্রক্রিয়ায় ব্যবহার করা হয়। ভারতের আইনপ্রণেতা ও সাবেক মন্ত্রী শশী থারুর মোস্তাফিজকে বাদ দেওয়ার পর এক প্রতিক্রিয়ায় সেটিই তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, মোস্তাফিজের জায়গায় যদি লিটন দাস কিংবা সৌম্য সরকার থাকতেন, তাহলে কী তাদের বাদ দেওয়া হতো?
শশী থারুর বাংলাদেশের বা মোস্তাফিজের প্রসঙ্গে বলেছেন, “মোস্তাফিজকে বাদ দেওয়া অপ্রয়োজনীয় ও অযৌক্তিক। বাংলাদেশ পাকিস্তান নয়। বাংলাদেশ সীমান্ত পেরিয়ে সন্ত্রাসী পাঠাচ্ছে না। এই দুই দেশের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কও ভিন্ন। বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের আলোচনা বা কূটনৈতিক সম্পর্কের যে পর্যায়, তা পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের পর্যায় থেকে আলাদা। এই দুই দেশকে এক সরল সমীকরণে ফেলা যায় না।”
বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে খেলতে ভারতে যেতে অস্বীকৃতি জানানোর ব্যাপারে তার কথা, “আমরা নিজেরাই এই লজ্জার পরিস্থিতি ডেকে এনেছি।”
মোস্তাফিজকে নিয়ে যা হয়েছে, এর সঙ্গে ভোটের রাজনীতির একটা বড় যোগ আছে। এ বছরই পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচন। প্রায় গোটা ভারতই হিন্দুত্ববাদী ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) করায়ত্ত হলেও পশ্চিমবঙ্গটা কোনোভাবেই দখলে নেওয়া যাচ্ছে না। হঠাৎ করেই মোস্তাফিজকে লক্ষ্যবস্তু বানানো, সেই ভোটের কৌশলেরই অংশ। পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশ-বিদ্বেষ দেখিয়ে ভোটের বাক্স ভরাই এর মূল লক্ষ্য। বাংলাদেশে সংখ্যালঘূ নির্যাতনের অভিযোগের ফলে সৃষ্ট ধর্মীয় ভাবাবেগই নিজেদের বাক্সে ভোট নিতে সাহায্য করবে বলে মনে করে বিজেপি। আগেই বলেছি, মোস্তাফিজ শুধুই এই নোংরা খেলার ঘুঁটি। ক্রিকেট হচ্ছে একটা অস্ত্র, যা ভারতে অন্তত খুব কার্যকর অস্ত্র হিসেবেই বিবেচিত।
মোস্তাফিজকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, এর প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশ আগামী মাসে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতে খেলতে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, বাংলাদেশ সরকার আইপিএলের সম্প্রচার বাংলাদেশে বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে। এরপর কী! ক্রিকেটে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এখন কোথায় গিয়ে ঠেকবে? পাকিস্তানের মতোই হবে পুরো বিষয়টি? দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সিরিজগুলোর কী হবে? এসব প্রশ্ন উঠবে।
ভারত এসবেরও পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখাবে। এটা তো অস্বীকারের কোনো উপায় নেই যে, ক্রিকেট চলেই ভারতের টাকায়। এ নিয়ে তাদের বড়াইয়ের অন্ত নেই। পরবর্তী সময়ে যেটা হবে, তা হলো, ভারত নানা দিক দিয়ে বাংলাদেশকে চাপে ফেলার চেষ্টা করবে। বাংলাদেশের ক্রিকেটকে আর্থিক দিক দিয়ে সামনে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে। এগুলো অবধারিতই।
সামনের দিনগুলোতে এসব মোকাবিলায় নিজেদের ক্রিকেটের ভিত শক্ত করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই বাংলাদেশের সামনে। বাংলাদেশ কি প্রস্তুত?
নাইর ইকবাল: বিশেষ প্রতিনিধি, চরচা