স্নিগ্ধেন্দু ভট্টাচার্য

গুগল ম্যাপে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের উত্তর-পূর্ব কোণ ঘেঁষে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি গাঢ় সবুজ এলাকা সহজেই নজর কেড়ে নেয়। এটি মূলত ভারতের মেঘালয় রাজ্যের খাসিয়া পাহাড়ের এক ঘন বনজঙ্গল আর পাহাড়ি এলাকা। বিশ্বের অন্যতম বৃষ্টিপ্রবণ অঞ্চল চেরাপুঞ্জি-মৌসিনরাম সংরক্ষিত বনও এই এলাকার মধ্যেই পড়েছে।
এই সবুজ বনভূমির ডান দিক দিয়ে বয়ে চলা মেঘালয়ের জৈন্তিয়া পাহাড়ের মিন্টডু নদীটি বাংলাদেশের সমতলে প্রবেশ করেছে। বাংলাদেশে এই নদীটি সারি-গোয়াইন নামে পরিচিত। অন্যদিকে এর বাম দিক থেকে কিনশি নদী বাংলাদেশে প্রবেশ করে যাদুকাটা নাম ধারণ করেছে।
এই দুটি নদীই শেষ পর্যন্ত সুরমা নদীতে গিয়ে মিশেছে, যা বাংলাদেশের মেঘনা নদীর একটি অংশ। এই সুরমাও একটি আন্তঃসীমান্ত নদী, যা ভারতে বরাক নামে পরিচিত।
মেঘালয়ের জলবিদ্যুৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা যদি বাস্তবায়িত হয়, তবে মিন্টডু ও কিনশি নদীর ওপর অন্তত সাতটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প গড়ে উঠবে।
ভারত ও বাংলাদেশের অভিন্ন নদী ৫৪টি। এই আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর পানি বণ্টন দুই দেশের মধ্যে অন্যতম প্রধান বিরোধের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত ইস্যু দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয়গুলোর একটি। যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মনোভাবকে উসকে দিয়েছে।
ভারত এখনো তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা নিয়ে বাংলাদেশের দাবিতে সাড়া দেওয়ার মতো অবস্থায় নেই। কারণ ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য, যেখান দিয়ে নদীটি প্রবাহিত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে, তারা এই পানি বণ্টনের তীব্র বিরোধিতা করছে।

২০১২ সালে ভারত মিন্টডু নদীর ওপর ‘মিন্টডু-লেশকা স্টেজ-১’ নামক একটি বড় জলবিদ্যুৎ প্রকল্প চালু করে। সে সময় বাংলাদেশ এতে কোনো আপত্তি জানায়নি। ভারতের পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হয়েছিল যে, এটি একটি রান-অফ-দ্য-রিভার (আরওআর) বা প্রবাহমান নদীভিত্তিক প্রকল্প হওয়ায় এতে পানি জমিয়ে রাখার জন্য বড় কোনো জলাধার নেই। এটি মূলত সুড়ঙ্গের মাধ্যমে নদীর পানি ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে এবং পরে তা আবার ভাটির দিকে নদীতেই ছেড়ে দেয়।
তবে ২০১৩ সালে ভারত যখন স্টেজ-১-এর ভাটিতে মিন্টডু-লেশকা স্টেজ-২ প্রকল্প নির্মাণের ঘোষণা দেয়, তখন বাংলাদেশ এতে আনুষ্ঠানিকভাবে আপত্তি জানায়। সেই থেকে বিষয়টি যৌথ নদী কমিশনের মাধ্যমে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় একটি অমীমাংসিত ইস্যু হিসেবে রয়ে গেছে।
প্রায় একই সময়ে ভারতের বরাক নদীতে প্রস্তাবিত টিপাইমুখ বাঁধ নিয়েও বাংলাদেশে ব্যাপক জনবিক্ষোভ দেখা দিয়েছিল, যার ফলে ভারত শেষ পর্যন্ত প্রকল্পটি স্থগিত করতে বাধ্য হয়।
এখন মিন্টডু-লেশকা স্টেজ-২ (২১০ মেগাওয়াট) প্রকল্পটি বেশ গতি পেয়েছে। মেঘালয়ের বিদ্যুৎ মন্ত্রী মেতবাহ লিংডোহ ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে জানিয়েছেন যে, রাজ্য সরকার এই প্রকল্পটি বাস্তবায়নে বেশ গুরুত্ব দিচ্ছে এবং এর বিস্তারিত প্রকল্প প্রতিবেদন (ডিপিআর) ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।
মিন্টডু-লেশকা স্টেজ-২ সম্পর্কে মন্ত্রীকে বলা হয়েছে, “এই প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য সরকার শিগগিরই আর্থিক বিষয়টি চূড়ান্ত করবে। যার মধ্যে কেন্দ্রীয় আর্থিক সহায়তার বিকল্পটিও রাখা হয়েছে।”
এদিকে, মিন্টডু-লেশকা স্টেজ-১ (১২৬ মেগাওয়াট) এর উজান এলাকায় সেলিম (১৭০ মেগাওয়াট) জলবিদ্যুৎ প্রকল্পটিও নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছে। বর্তমানে এই প্রকল্পটির বিস্তারিত প্রতিবেদন তৈরির কাজ চলছে।
সেলিম এইচইপি হলো মিন্টডু নদীর ওপর পরিকল্পিত সবচাইতে উজানের প্রকল্প। প্রস্তাব অনুযায়ী, ৪ দশমিক ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি টানেলের মাধ্যমে নদীর পানি ঘুরিয়ে নিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে এবং পরে তা আবার নদীতেই ছেড়ে দেওয়া হবে। সেখান থেকে পানি প্রায় তিন কিলোমিটার স্বাভাবিক গতিতে প্রবাহিত হয়ে স্টেজ-১ প্রকল্পের ডাইভারশন পয়েন্টে গিয়ে পৌঁছাবে।
বর্তমানে চালু থাকা স্টেজ-১ প্রকল্পটি মিন্টডু নদীর পানির একটি অংশ তিন কিলোমিটার দীর্ঘ টানেলের মাধ্যমে ঘুরিয়ে নিয়ে আবার নদীতে ফিরিয়ে দেয়। এখন প্রস্তাবিত স্টেজ-২ প্রকল্পের জন্য প্রায় তিন কিলোমিটার ভাটিতে ছয় কিলোমিটার দীর্ঘ একটি টানেলের মাধ্যমে পানি পুনরায় সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে, যা পরে আবারও নদীতে ছেড়ে দেওয়া হবে।
খারাখানা গ্রামের ভাটিতে অবস্থিত এই প্রকল্পটি বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে আনুমানিক মাত্র ১০ কিলোমিটার উত্তরে হতে যাচ্ছে।
বর্তমানে মেঘালয়ে ১০টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের মাধ্যমে মোট ৩৭৮ দশমিক ২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। রাজ্যটিতে সর্বশেষ বড় কোনো জলবিদ্যুৎ প্রকল্প চালু হয়েছিল ২০১৭ সালে। তবে ২০২৪ সালে নতুন বিদ্যুৎ নীতি প্রণয়নের পর থেকে সেখানে অতিরিক্ত জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য নতুন করে তোড়জোড় শুরু হয়েছে।
একটি নির্দিষ্ট দূরত্বের মধ্যে একই নদীতে তিনটি বাঁধের ধারাবাহিক অবস্থান (ক্যাসকেড), এমনকি সেগুলো যদি প্রবাহমান নদীভিত্তিক (আরওআর) প্রকল্পও হয়, তবুও নদীর পানির পরিমাণ, প্রবাহের ধরন এবং নদী অববাহিকার পরিবেশের ওপর নানামুখী প্রভাব ফেলতে পারে।
নদী বিজ্ঞানী কল্যাণ রুদ্র উল্লেখ করেছেন যে, এই ধরনের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোতে দিনের বেলা পানি জমিয়ে রাখা হয় এবং সন্ধ্যায় যখন বিদ্যুতের চাহিদা তুঙ্গে থাকে তখন তা ছাড়া হয়। এর ফলে নদীর স্বাভাবিক ছন্দ ব্যাহত হয়। এছাড়া, এই বাঁধগুলো পলি আটকে ফেলে। বাঁধ থেকে বেরিয়ে আসা পানি পলিহীন হওয়ায় তা ভাটির দিকে নদীর তলদেশ ও পাড় বেশি ক্ষয় করে থাকে। একইসাথে এসব প্রকল্প জীববৈচিত্র্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
কল্যাণ রুদ্র দ্য ডিপ্লোম্যাটকে বলেন, “একের পর এক পাহাড়ি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প পাহাড়ের ঢালের গঠন পরিবর্তন করে দিতে পারে, যা ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।”
২০২৫ সালের মেঘালয় বিদ্যুৎ বিভাগের একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মিন্টডু-লেশকা স্টেজ-১ একটি রান অফ দ্য রিভার প্রকল্প হওয়ায় এর পানি ধারণক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত। অধিক বৃষ্টিপাতের সময় এখান দিয়ে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১০ হাজার ৪৪০ কিউসেক পানি প্রবাহিত হয়।
প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে, বড় ধরনের বন্যার সময় জলাধারটি এত দ্রুত ভরে ওঠে যে কয়েক মিনিটের মধ্যেই বাঁধের ওপর দিয়ে পানি উপচে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়, যার জন্য ২৪ ঘণ্টা নিবিড় পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।
এদিকে কিনশি নদীতেও ধারাবাহিকভাবে কয়েকটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। সেখানে ২৭০ মেগাওয়াটের কিনশি স্টেজ-১ এবং ২৭৮ মেগাওয়াটের কিনশি স্টেজ-২ প্রকল্প দুটি পুনরায় সচল করা হচ্ছে। ২০২৫ সালের জুনে রাজ্য সরকার স্টেজ-১ প্রকল্পের কাজ পুনরায় শুরু করার জন্য একটি নতুন সমঝোতা স্মারক অনুমোদন করেছে। তবে এই প্রকল্পের বিস্তারিত প্রতিবেদন তৈরির কাজ এখনো শেষ হয়নি।
কিনশি নদীর উপনদী উমঙ্গি-এর ওপর উমঙ্গি এইচইপি (২×৩১ মেগাওয়াট) নামে একটি জলাধার-ভিত্তিক প্রকল্প এবং নংখলাইত এইচইপি (২×৬০ মেগাওয়াট) নামে একটি প্রবাহমান নদীভিত্তিক প্রকল্পের পরিকল্পনা করা হয়েছে। গত বছরের বাজেট বরাদ্দ অনুযায়ী, এই প্রকল্পগুলো বর্তমানে জরিপ ও তদন্ত পর্যায়ে রয়েছে। এছাড়া খাসিয়া পাহাড়ে কিনশির আরেকটি উপনদী ওয়াহব্লেইর ওপর ১৪০ মেগাওয়াটের মাওব্লেই এইচইপি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। বাজেট বরাদ্দের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এটিও এখন প্রাথমিক জরিপ ও তদন্তের স্তরে আছে।
সাধারণত প্রবাহমান নদীভিত্তিক প্রকল্পগুলোকে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহের জন্য কম ক্ষতিকর মনে করা হয়, কারণ এগুলোতে বড় জলাধারে পানি জমিয়ে রাখা হয় না। তবে যখন একই নদীতে ধারাবাহিকভাবে একাধিক প্রকল্প থাকে, তখন একটি পাওয়ার হাউস থেকে পানি নদীতে ফেরত পাঠাতে না পাঠাতেই পরবর্তী প্রকল্পের জন্য তা আবারও সরিয়ে নেওয়া হয়। এর ফলে মূল নদীখাতের দীর্ঘ অংশ তার স্বাভাবিক প্রবাহের সামান্যই পায়।
এই ক্ষেত্রে, ভাটির অঞ্চলগুলোর মধ্যে নিম্ন অববাহিকার দেশ বাংলাদেশের কিছু অংশও অন্তর্ভুক্ত। মিন্টডু নদীটি সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। অন্যদিকে, কিনশি নদী সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলা হয়ে বাংলাদেশে ঢুকেছে।

মেঘালয়ে আইনের প্রয়োজনীয়তা মেনে মিন্টডু-লেশকা স্টেজ-২ প্রকল্পের জন্য আয়োজিত গণশুনানিতে স্থানীয় কিছু বাসিন্দা তাদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন।
বরঘাট-জালিয়াখোলা অ্যাকুয়াটিক লাইফ ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ফেরমন সুচেন আশঙ্কা করেছেন, এই প্রকল্পটির কারণে নদীতে যেটুকু মাছ অবশিষ্ট আছে, তাও হারিয়ে যাবে। খনি সংক্রান্ত দূষণের ফলে নদীর পানির অম্লতা (অ্যাসিডিটি) বেড়ে যাওয়ায় মাছের সংখ্যা এমনিতেই কমে গেছে। সরকারি এক প্রতিবেদনে সুচেনকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, প্রকল্পের জন্য নদীর প্রবাহ ঘুরিয়ে দেওয়ায় গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালে যে পরিযায়ী মাছ, বিশেষ করে ইলিশ পাওয়া যায়, তাও আর দেখা যাবে না।
পাসাদোয়ার গ্রামের প্রধান ফার্স্টবর্ন পাম্বলাং এই প্রকল্প নিয়ে সরকারের কাছে তার উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। ‘দ্য ডিপ্লোম্যাট’-কে তিনি বলেন, স্টেজ-১ প্রকল্প থেকে বিশেষ করে বর্ষাকালে যেভাবে তীব্র স্রোতে পানি ছাড়া হয়, তাতে গ্রামবাসীর ইতিমধ্যেই অনেক ক্ষতি হয়েছে। তারা আশঙ্কা করছেন যে, নতুন এই প্রকল্পটি তাদের কৃষিকাজ, বিশেষ করে সুপারি চাষের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলবে।
খারাখানা গ্রামের ডেইমনমি বারেহ উল্লেখ করেন যে, বর্ষা মৌসুমে স্টেজ-১ প্রকল্পের কারণে তাদের ঘরবাড়ি ও ফসলি জমির অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তাদের ভয়, স্টেজ-২ প্রকল্প চালু হলে এই ক্ষতির পরিমাণ দ্বিগুণ হয়ে যাবে। এ কারণে তারা প্রস্তাবিত পাওয়ার হাউজটি তাদের গ্রাম থেকে দূরে সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
বোরঘাট গ্রামের বাসিন্দারা সরকারকে জানিয়েছেন যে, স্টেজ-১ প্রকল্পের নির্মাণকাজের সময় নদীতে তেল ও সিমেন্ট মিশে যাওয়ার ফলে পানি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছিল। তাদের অভিযোগ, বাঁধ দেওয়ার পর নদীটি শুকিয়ে গিয়েছিল, যা স্থানীয় ফেরি চলাচলেও বাধা সৃষ্টি করে। এছাড়া বাঁধ থেকে ছেড়ে দেওয়া পানির তীব্র স্রোত নদীর বালুচর ও নুড়িপাথর ধুয়ে নিয়ে যায়, যা স্থানীয়দের আয়ের উৎস ছিল।
দেমলাকাং গ্রামের প্রধান কার্লি মিন্টলু উল্লেখ করেন যে, পাহাড়ি এলাকাগুলো এমনিতেই খরাপ্রবণ, তবে নদীর তীরবর্তী এলাকাগুলো বেশ উর্বর এবং চাষাবাদের উপযোগী। এখন এই প্রকল্পের কারণে যদি নদী শুকিয়ে যায়, তবে স্থানীয় মানুষের জীবনজীবিকা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। লাকাডং গ্রামের এশরম মিন্টলু আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, নদীর পাড়ে বসবাসকারী মানুষরা মাছ ধরা এবং বালু উত্তোলনের মাধ্যমে যে জীবিকা নির্বাহ করেন, তা চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে।
বোরঘাট গ্রামের বাসিন্দারা সরকারকে জানিয়েছেন যে, স্টেজ-১ প্রকল্পের নির্মাণকাজের সময় নদীতে তেল ও সিমেন্ট মিশে যাওয়ার ফলে পানি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছিল। তাদের অভিযোগ, বাঁধ দেওয়ার পর নদীটি শুকিয়ে গিয়েছিল, যা স্থানীয় ফেরি চলাচলেও বাধা সৃষ্টি করে। এছাড়া বাঁধ থেকে ছেড়ে দেওয়া পানির তীব্র স্রোত নদীর বালুচর ও নুড়িপাথর ধুয়ে নিয়ে যায়, যা স্থানীয়দের আয়ের উৎস ছিল।
স্থানীয়দের এই আশঙ্কাগুলো একদম ভিত্তিহীন নাও হতে পারে। ‘সাউথ এশিয়া নেটওয়ার্ক অন ড্যামস, রিভারস অ্যান্ড পিপল’ এর সমন্বয়কারী হিমাংশু ঠাক্কার বলেন, একের পর এক প্রবাহমান নদীভিত্তিক প্রকল্প এই অঞ্চলের ভাঙন, ভূমিধস, ভূমিকম্প এবং আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে। তারা উত্তর ভারতের হিমালয় অঞ্চলে এ ধরনের একাধিক প্রকল্পের প্রভাব নিয়ে গবেষণা করেছেন।
ঠাক্কার বলেন, “ভাটির এলাকাগুলোর জন্য এ ধরনের ধারাবাহিক প্রকল্পগুলো কেবল পানির পরিমাণের ওপরই নয়, বরং পানির প্রবাহের ধরনের ওপরও প্রভাব ফেলে, বিশেষ করে বর্ষা পরবর্তী মাসগুলোতে।”
এছাড়া নদী অববাহিকার ব্যাপক পরিবেশগত বিপর্যয় পানির প্রবাহের ধরন বদলে দিতে পারে। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে যে, এর ফলে জলজ ও স্থলজ জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ঠাক্কারের মতে, একটি বা দুটি আলাদা প্রকল্পের চেয়ে একাধিক প্রকল্পের সম্মিলিত প্রভাব অনেক বেশি ভয়াবহ হয়। এই কারণেই ওই অঞ্চলের সহনক্ষমতা নিয়ে গবেষণা এবং এর সামগ্রিক প্রভাব মূল্যায়ন করা অত্যন্ত জরুরি। প্রকল্পের কারণে পরিবর্তনের ধরন ও মাত্রা কেমন হবে, তা মূলত নদীর প্রবাহ এবং ওই অঞ্চলের বৃষ্টিপাতের ধরনের ওপর নির্ভর করে।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, মেঘালয় এবং বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের জলবায়ুর ধরনে বর্তমানে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। এই অঞ্চলটি যেমন ধীরে ধীরে শুকিয়ে যাচ্ছে, তেমনি একদিনে অতিবৃষ্টির ঘটনাও আগের তুলনায় প্রায় চার গুণ বেড়েছে। যা প্রায়ই আকস্মিক বন্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
বাংলাদেশের নৃ-তাত্ত্বিক গবেষক ইশিতা দস্তিদার মনে করেন, মেঘালয়ে অনিয়ন্ত্রিত পাথর ও কয়লা উত্তোলন এবং বন উজাড়ের ফলে সেখানে ইতিমধ্যেই ভূমিধসের ঘটনা বেড়ে গেছে। তিনি মূলত বাংলাদেশে বসবাসরত আদিবাসীদের নিয়ে কাজ করেছেন, বিশেষ করে মেঘালয়ের খাসিয়া পাহাড়ের দক্ষিণে বাংলাদেশের সমতল অঞ্চলে বসবাসরতদের ওপর।
তিনি উল্লেখ করেন যে, ভারী বৃষ্টিপাতের সময় আকস্মিক বন্যায় পাহাড় থেকে বালি ও ধ্বংসাবশেষ ভাটির দিকে ধুয়ে আসে। এর ফলে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী সমতল অঞ্চলগুলোর ফসলি জমি ও ঘরবাড়ির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।
ঈশিতা বলেন, “এই আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর ওপর ধারাবাহিক বাঁধ নির্মাণ করা হলে বাংলাদেশে এর পানির প্রবাহ অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তবে এই প্রভাব ঠিক কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা তখনই বোঝা সম্ভব হবে যখন এসব প্রকল্পের বিস্তারিত তথ্য জনসমক্ষে আসবে।”
*দ্য ডিপ্লোম্যাট অবলম্বনে *

গুগল ম্যাপে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের উত্তর-পূর্ব কোণ ঘেঁষে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি গাঢ় সবুজ এলাকা সহজেই নজর কেড়ে নেয়। এটি মূলত ভারতের মেঘালয় রাজ্যের খাসিয়া পাহাড়ের এক ঘন বনজঙ্গল আর পাহাড়ি এলাকা। বিশ্বের অন্যতম বৃষ্টিপ্রবণ অঞ্চল চেরাপুঞ্জি-মৌসিনরাম সংরক্ষিত বনও এই এলাকার মধ্যেই পড়েছে।
এই সবুজ বনভূমির ডান দিক দিয়ে বয়ে চলা মেঘালয়ের জৈন্তিয়া পাহাড়ের মিন্টডু নদীটি বাংলাদেশের সমতলে প্রবেশ করেছে। বাংলাদেশে এই নদীটি সারি-গোয়াইন নামে পরিচিত। অন্যদিকে এর বাম দিক থেকে কিনশি নদী বাংলাদেশে প্রবেশ করে যাদুকাটা নাম ধারণ করেছে।
এই দুটি নদীই শেষ পর্যন্ত সুরমা নদীতে গিয়ে মিশেছে, যা বাংলাদেশের মেঘনা নদীর একটি অংশ। এই সুরমাও একটি আন্তঃসীমান্ত নদী, যা ভারতে বরাক নামে পরিচিত।
মেঘালয়ের জলবিদ্যুৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা যদি বাস্তবায়িত হয়, তবে মিন্টডু ও কিনশি নদীর ওপর অন্তত সাতটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প গড়ে উঠবে।
ভারত ও বাংলাদেশের অভিন্ন নদী ৫৪টি। এই আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর পানি বণ্টন দুই দেশের মধ্যে অন্যতম প্রধান বিরোধের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত ইস্যু দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয়গুলোর একটি। যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মনোভাবকে উসকে দিয়েছে।
ভারত এখনো তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা নিয়ে বাংলাদেশের দাবিতে সাড়া দেওয়ার মতো অবস্থায় নেই। কারণ ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য, যেখান দিয়ে নদীটি প্রবাহিত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে, তারা এই পানি বণ্টনের তীব্র বিরোধিতা করছে।

২০১২ সালে ভারত মিন্টডু নদীর ওপর ‘মিন্টডু-লেশকা স্টেজ-১’ নামক একটি বড় জলবিদ্যুৎ প্রকল্প চালু করে। সে সময় বাংলাদেশ এতে কোনো আপত্তি জানায়নি। ভারতের পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হয়েছিল যে, এটি একটি রান-অফ-দ্য-রিভার (আরওআর) বা প্রবাহমান নদীভিত্তিক প্রকল্প হওয়ায় এতে পানি জমিয়ে রাখার জন্য বড় কোনো জলাধার নেই। এটি মূলত সুড়ঙ্গের মাধ্যমে নদীর পানি ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে এবং পরে তা আবার ভাটির দিকে নদীতেই ছেড়ে দেয়।
তবে ২০১৩ সালে ভারত যখন স্টেজ-১-এর ভাটিতে মিন্টডু-লেশকা স্টেজ-২ প্রকল্প নির্মাণের ঘোষণা দেয়, তখন বাংলাদেশ এতে আনুষ্ঠানিকভাবে আপত্তি জানায়। সেই থেকে বিষয়টি যৌথ নদী কমিশনের মাধ্যমে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় একটি অমীমাংসিত ইস্যু হিসেবে রয়ে গেছে।
প্রায় একই সময়ে ভারতের বরাক নদীতে প্রস্তাবিত টিপাইমুখ বাঁধ নিয়েও বাংলাদেশে ব্যাপক জনবিক্ষোভ দেখা দিয়েছিল, যার ফলে ভারত শেষ পর্যন্ত প্রকল্পটি স্থগিত করতে বাধ্য হয়।
এখন মিন্টডু-লেশকা স্টেজ-২ (২১০ মেগাওয়াট) প্রকল্পটি বেশ গতি পেয়েছে। মেঘালয়ের বিদ্যুৎ মন্ত্রী মেতবাহ লিংডোহ ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে জানিয়েছেন যে, রাজ্য সরকার এই প্রকল্পটি বাস্তবায়নে বেশ গুরুত্ব দিচ্ছে এবং এর বিস্তারিত প্রকল্প প্রতিবেদন (ডিপিআর) ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।
মিন্টডু-লেশকা স্টেজ-২ সম্পর্কে মন্ত্রীকে বলা হয়েছে, “এই প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য সরকার শিগগিরই আর্থিক বিষয়টি চূড়ান্ত করবে। যার মধ্যে কেন্দ্রীয় আর্থিক সহায়তার বিকল্পটিও রাখা হয়েছে।”
এদিকে, মিন্টডু-লেশকা স্টেজ-১ (১২৬ মেগাওয়াট) এর উজান এলাকায় সেলিম (১৭০ মেগাওয়াট) জলবিদ্যুৎ প্রকল্পটিও নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছে। বর্তমানে এই প্রকল্পটির বিস্তারিত প্রতিবেদন তৈরির কাজ চলছে।
সেলিম এইচইপি হলো মিন্টডু নদীর ওপর পরিকল্পিত সবচাইতে উজানের প্রকল্প। প্রস্তাব অনুযায়ী, ৪ দশমিক ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি টানেলের মাধ্যমে নদীর পানি ঘুরিয়ে নিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে এবং পরে তা আবার নদীতেই ছেড়ে দেওয়া হবে। সেখান থেকে পানি প্রায় তিন কিলোমিটার স্বাভাবিক গতিতে প্রবাহিত হয়ে স্টেজ-১ প্রকল্পের ডাইভারশন পয়েন্টে গিয়ে পৌঁছাবে।
বর্তমানে চালু থাকা স্টেজ-১ প্রকল্পটি মিন্টডু নদীর পানির একটি অংশ তিন কিলোমিটার দীর্ঘ টানেলের মাধ্যমে ঘুরিয়ে নিয়ে আবার নদীতে ফিরিয়ে দেয়। এখন প্রস্তাবিত স্টেজ-২ প্রকল্পের জন্য প্রায় তিন কিলোমিটার ভাটিতে ছয় কিলোমিটার দীর্ঘ একটি টানেলের মাধ্যমে পানি পুনরায় সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে, যা পরে আবারও নদীতে ছেড়ে দেওয়া হবে।
খারাখানা গ্রামের ভাটিতে অবস্থিত এই প্রকল্পটি বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে আনুমানিক মাত্র ১০ কিলোমিটার উত্তরে হতে যাচ্ছে।
বর্তমানে মেঘালয়ে ১০টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের মাধ্যমে মোট ৩৭৮ দশমিক ২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। রাজ্যটিতে সর্বশেষ বড় কোনো জলবিদ্যুৎ প্রকল্প চালু হয়েছিল ২০১৭ সালে। তবে ২০২৪ সালে নতুন বিদ্যুৎ নীতি প্রণয়নের পর থেকে সেখানে অতিরিক্ত জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য নতুন করে তোড়জোড় শুরু হয়েছে।
একটি নির্দিষ্ট দূরত্বের মধ্যে একই নদীতে তিনটি বাঁধের ধারাবাহিক অবস্থান (ক্যাসকেড), এমনকি সেগুলো যদি প্রবাহমান নদীভিত্তিক (আরওআর) প্রকল্পও হয়, তবুও নদীর পানির পরিমাণ, প্রবাহের ধরন এবং নদী অববাহিকার পরিবেশের ওপর নানামুখী প্রভাব ফেলতে পারে।
নদী বিজ্ঞানী কল্যাণ রুদ্র উল্লেখ করেছেন যে, এই ধরনের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোতে দিনের বেলা পানি জমিয়ে রাখা হয় এবং সন্ধ্যায় যখন বিদ্যুতের চাহিদা তুঙ্গে থাকে তখন তা ছাড়া হয়। এর ফলে নদীর স্বাভাবিক ছন্দ ব্যাহত হয়। এছাড়া, এই বাঁধগুলো পলি আটকে ফেলে। বাঁধ থেকে বেরিয়ে আসা পানি পলিহীন হওয়ায় তা ভাটির দিকে নদীর তলদেশ ও পাড় বেশি ক্ষয় করে থাকে। একইসাথে এসব প্রকল্প জীববৈচিত্র্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
কল্যাণ রুদ্র দ্য ডিপ্লোম্যাটকে বলেন, “একের পর এক পাহাড়ি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প পাহাড়ের ঢালের গঠন পরিবর্তন করে দিতে পারে, যা ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।”
২০২৫ সালের মেঘালয় বিদ্যুৎ বিভাগের একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মিন্টডু-লেশকা স্টেজ-১ একটি রান অফ দ্য রিভার প্রকল্প হওয়ায় এর পানি ধারণক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত। অধিক বৃষ্টিপাতের সময় এখান দিয়ে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১০ হাজার ৪৪০ কিউসেক পানি প্রবাহিত হয়।
প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে, বড় ধরনের বন্যার সময় জলাধারটি এত দ্রুত ভরে ওঠে যে কয়েক মিনিটের মধ্যেই বাঁধের ওপর দিয়ে পানি উপচে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়, যার জন্য ২৪ ঘণ্টা নিবিড় পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।
এদিকে কিনশি নদীতেও ধারাবাহিকভাবে কয়েকটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। সেখানে ২৭০ মেগাওয়াটের কিনশি স্টেজ-১ এবং ২৭৮ মেগাওয়াটের কিনশি স্টেজ-২ প্রকল্প দুটি পুনরায় সচল করা হচ্ছে। ২০২৫ সালের জুনে রাজ্য সরকার স্টেজ-১ প্রকল্পের কাজ পুনরায় শুরু করার জন্য একটি নতুন সমঝোতা স্মারক অনুমোদন করেছে। তবে এই প্রকল্পের বিস্তারিত প্রতিবেদন তৈরির কাজ এখনো শেষ হয়নি।
কিনশি নদীর উপনদী উমঙ্গি-এর ওপর উমঙ্গি এইচইপি (২×৩১ মেগাওয়াট) নামে একটি জলাধার-ভিত্তিক প্রকল্প এবং নংখলাইত এইচইপি (২×৬০ মেগাওয়াট) নামে একটি প্রবাহমান নদীভিত্তিক প্রকল্পের পরিকল্পনা করা হয়েছে। গত বছরের বাজেট বরাদ্দ অনুযায়ী, এই প্রকল্পগুলো বর্তমানে জরিপ ও তদন্ত পর্যায়ে রয়েছে। এছাড়া খাসিয়া পাহাড়ে কিনশির আরেকটি উপনদী ওয়াহব্লেইর ওপর ১৪০ মেগাওয়াটের মাওব্লেই এইচইপি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। বাজেট বরাদ্দের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এটিও এখন প্রাথমিক জরিপ ও তদন্তের স্তরে আছে।
সাধারণত প্রবাহমান নদীভিত্তিক প্রকল্পগুলোকে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহের জন্য কম ক্ষতিকর মনে করা হয়, কারণ এগুলোতে বড় জলাধারে পানি জমিয়ে রাখা হয় না। তবে যখন একই নদীতে ধারাবাহিকভাবে একাধিক প্রকল্প থাকে, তখন একটি পাওয়ার হাউস থেকে পানি নদীতে ফেরত পাঠাতে না পাঠাতেই পরবর্তী প্রকল্পের জন্য তা আবারও সরিয়ে নেওয়া হয়। এর ফলে মূল নদীখাতের দীর্ঘ অংশ তার স্বাভাবিক প্রবাহের সামান্যই পায়।
এই ক্ষেত্রে, ভাটির অঞ্চলগুলোর মধ্যে নিম্ন অববাহিকার দেশ বাংলাদেশের কিছু অংশও অন্তর্ভুক্ত। মিন্টডু নদীটি সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। অন্যদিকে, কিনশি নদী সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলা হয়ে বাংলাদেশে ঢুকেছে।

মেঘালয়ে আইনের প্রয়োজনীয়তা মেনে মিন্টডু-লেশকা স্টেজ-২ প্রকল্পের জন্য আয়োজিত গণশুনানিতে স্থানীয় কিছু বাসিন্দা তাদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন।
বরঘাট-জালিয়াখোলা অ্যাকুয়াটিক লাইফ ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ফেরমন সুচেন আশঙ্কা করেছেন, এই প্রকল্পটির কারণে নদীতে যেটুকু মাছ অবশিষ্ট আছে, তাও হারিয়ে যাবে। খনি সংক্রান্ত দূষণের ফলে নদীর পানির অম্লতা (অ্যাসিডিটি) বেড়ে যাওয়ায় মাছের সংখ্যা এমনিতেই কমে গেছে। সরকারি এক প্রতিবেদনে সুচেনকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, প্রকল্পের জন্য নদীর প্রবাহ ঘুরিয়ে দেওয়ায় গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালে যে পরিযায়ী মাছ, বিশেষ করে ইলিশ পাওয়া যায়, তাও আর দেখা যাবে না।
পাসাদোয়ার গ্রামের প্রধান ফার্স্টবর্ন পাম্বলাং এই প্রকল্প নিয়ে সরকারের কাছে তার উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। ‘দ্য ডিপ্লোম্যাট’-কে তিনি বলেন, স্টেজ-১ প্রকল্প থেকে বিশেষ করে বর্ষাকালে যেভাবে তীব্র স্রোতে পানি ছাড়া হয়, তাতে গ্রামবাসীর ইতিমধ্যেই অনেক ক্ষতি হয়েছে। তারা আশঙ্কা করছেন যে, নতুন এই প্রকল্পটি তাদের কৃষিকাজ, বিশেষ করে সুপারি চাষের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলবে।
খারাখানা গ্রামের ডেইমনমি বারেহ উল্লেখ করেন যে, বর্ষা মৌসুমে স্টেজ-১ প্রকল্পের কারণে তাদের ঘরবাড়ি ও ফসলি জমির অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তাদের ভয়, স্টেজ-২ প্রকল্প চালু হলে এই ক্ষতির পরিমাণ দ্বিগুণ হয়ে যাবে। এ কারণে তারা প্রস্তাবিত পাওয়ার হাউজটি তাদের গ্রাম থেকে দূরে সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
বোরঘাট গ্রামের বাসিন্দারা সরকারকে জানিয়েছেন যে, স্টেজ-১ প্রকল্পের নির্মাণকাজের সময় নদীতে তেল ও সিমেন্ট মিশে যাওয়ার ফলে পানি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছিল। তাদের অভিযোগ, বাঁধ দেওয়ার পর নদীটি শুকিয়ে গিয়েছিল, যা স্থানীয় ফেরি চলাচলেও বাধা সৃষ্টি করে। এছাড়া বাঁধ থেকে ছেড়ে দেওয়া পানির তীব্র স্রোত নদীর বালুচর ও নুড়িপাথর ধুয়ে নিয়ে যায়, যা স্থানীয়দের আয়ের উৎস ছিল।
দেমলাকাং গ্রামের প্রধান কার্লি মিন্টলু উল্লেখ করেন যে, পাহাড়ি এলাকাগুলো এমনিতেই খরাপ্রবণ, তবে নদীর তীরবর্তী এলাকাগুলো বেশ উর্বর এবং চাষাবাদের উপযোগী। এখন এই প্রকল্পের কারণে যদি নদী শুকিয়ে যায়, তবে স্থানীয় মানুষের জীবনজীবিকা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। লাকাডং গ্রামের এশরম মিন্টলু আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, নদীর পাড়ে বসবাসকারী মানুষরা মাছ ধরা এবং বালু উত্তোলনের মাধ্যমে যে জীবিকা নির্বাহ করেন, তা চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে।
বোরঘাট গ্রামের বাসিন্দারা সরকারকে জানিয়েছেন যে, স্টেজ-১ প্রকল্পের নির্মাণকাজের সময় নদীতে তেল ও সিমেন্ট মিশে যাওয়ার ফলে পানি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছিল। তাদের অভিযোগ, বাঁধ দেওয়ার পর নদীটি শুকিয়ে গিয়েছিল, যা স্থানীয় ফেরি চলাচলেও বাধা সৃষ্টি করে। এছাড়া বাঁধ থেকে ছেড়ে দেওয়া পানির তীব্র স্রোত নদীর বালুচর ও নুড়িপাথর ধুয়ে নিয়ে যায়, যা স্থানীয়দের আয়ের উৎস ছিল।
স্থানীয়দের এই আশঙ্কাগুলো একদম ভিত্তিহীন নাও হতে পারে। ‘সাউথ এশিয়া নেটওয়ার্ক অন ড্যামস, রিভারস অ্যান্ড পিপল’ এর সমন্বয়কারী হিমাংশু ঠাক্কার বলেন, একের পর এক প্রবাহমান নদীভিত্তিক প্রকল্প এই অঞ্চলের ভাঙন, ভূমিধস, ভূমিকম্প এবং আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে। তারা উত্তর ভারতের হিমালয় অঞ্চলে এ ধরনের একাধিক প্রকল্পের প্রভাব নিয়ে গবেষণা করেছেন।
ঠাক্কার বলেন, “ভাটির এলাকাগুলোর জন্য এ ধরনের ধারাবাহিক প্রকল্পগুলো কেবল পানির পরিমাণের ওপরই নয়, বরং পানির প্রবাহের ধরনের ওপরও প্রভাব ফেলে, বিশেষ করে বর্ষা পরবর্তী মাসগুলোতে।”
এছাড়া নদী অববাহিকার ব্যাপক পরিবেশগত বিপর্যয় পানির প্রবাহের ধরন বদলে দিতে পারে। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে যে, এর ফলে জলজ ও স্থলজ জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ঠাক্কারের মতে, একটি বা দুটি আলাদা প্রকল্পের চেয়ে একাধিক প্রকল্পের সম্মিলিত প্রভাব অনেক বেশি ভয়াবহ হয়। এই কারণেই ওই অঞ্চলের সহনক্ষমতা নিয়ে গবেষণা এবং এর সামগ্রিক প্রভাব মূল্যায়ন করা অত্যন্ত জরুরি। প্রকল্পের কারণে পরিবর্তনের ধরন ও মাত্রা কেমন হবে, তা মূলত নদীর প্রবাহ এবং ওই অঞ্চলের বৃষ্টিপাতের ধরনের ওপর নির্ভর করে।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, মেঘালয় এবং বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের জলবায়ুর ধরনে বর্তমানে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। এই অঞ্চলটি যেমন ধীরে ধীরে শুকিয়ে যাচ্ছে, তেমনি একদিনে অতিবৃষ্টির ঘটনাও আগের তুলনায় প্রায় চার গুণ বেড়েছে। যা প্রায়ই আকস্মিক বন্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
বাংলাদেশের নৃ-তাত্ত্বিক গবেষক ইশিতা দস্তিদার মনে করেন, মেঘালয়ে অনিয়ন্ত্রিত পাথর ও কয়লা উত্তোলন এবং বন উজাড়ের ফলে সেখানে ইতিমধ্যেই ভূমিধসের ঘটনা বেড়ে গেছে। তিনি মূলত বাংলাদেশে বসবাসরত আদিবাসীদের নিয়ে কাজ করেছেন, বিশেষ করে মেঘালয়ের খাসিয়া পাহাড়ের দক্ষিণে বাংলাদেশের সমতল অঞ্চলে বসবাসরতদের ওপর।
তিনি উল্লেখ করেন যে, ভারী বৃষ্টিপাতের সময় আকস্মিক বন্যায় পাহাড় থেকে বালি ও ধ্বংসাবশেষ ভাটির দিকে ধুয়ে আসে। এর ফলে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী সমতল অঞ্চলগুলোর ফসলি জমি ও ঘরবাড়ির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।
ঈশিতা বলেন, “এই আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর ওপর ধারাবাহিক বাঁধ নির্মাণ করা হলে বাংলাদেশে এর পানির প্রবাহ অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তবে এই প্রভাব ঠিক কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা তখনই বোঝা সম্ভব হবে যখন এসব প্রকল্পের বিস্তারিত তথ্য জনসমক্ষে আসবে।”
*দ্য ডিপ্লোম্যাট অবলম্বনে *