ফজলে রাব্বি

“৫টা গরুর চামড়া কিনছিলাম বড় আশা কইরা। ভাবছিলাম, কিছু লাভ হইব। এখন সায়েন্সল্যাবে আইনা দেখি আড়তদাররা দামই কয় না। শ্রমিক খরচ, ভ্যানভাড়া—সব মিলায়া নিজের পকেটের টাকা গচ্চা গেছে। তওবা করতাছি, জীবনে আর এই ব্যবসা করমু না।”
রাজধানীর সায়েন্সল্যাব মোড়ে চামড়াভর্তি ভ্যানের পাশে দাঁড়িয়ে ক্ষোভ আর হতাশায় কথাগুলো বলছিলেন সোবহানবাগ মৌসুমি ব্যবসায়ী রহমত উল্লাহ। শুধু তিনি নন, ঈদুল আজহাকে ঘিরে দেশের কাঁচা চামড়ার বাজারে এবারও সিন্ডিকেট ও আড়তদারদের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন হাজারো মৌসুমি ব্যবসায়ী।
সরকার নির্ধারিত দামের তোয়াক্কা না করে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়া বিক্রি হয়েছে অত্যন্ত কম দামে। কোথাও কোথাও ন্যায্যমূল্য না পেয়ে চামড়া ফেলে দেওয়া বা মাটিতে পুঁতে রাখার ঘটনাও ঘটেছে।
সরকারি দর কাগজে, বাস্তবে ধস
গত ১৩ মে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ঢাকায় লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৬২ থেকে ৬৭ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৫৭ থেকে ৬২ টাকা নির্ধারণ করে। তবে মাঠপর্যায়ে সেই দামের প্রতিফলন দেখা যায়নি।
রাজধানীর সায়েন্সল্যাব, মোহাম্মদপুর ও পোস্তগোলা এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বড় আকারের গরুর চামড়া—যেগুলো মৌসুমি ব্যবসায়ীরা ৬০০ থেকে ১ হাজার টাকায় কিনেছেন—সেগুলোর দাম আড়তদাররা হাঁকছেন মাত্র ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা। মাঝারি আকারের চামড়া বিক্রি হয়েছে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকায়, আর ছোট চামড়া ১৫০ থেকে ২৫০ টাকায়।
তবে পোস্তার চিত্র কিছুটা ভিন্ন। পোস্তার পাইকার হাজী মোহাম্মদ আমির হোসেন বললেন, ‘‘চামড়ার দাম যেমন কমছে, কোয়ালিটিও খারাপ হইছে। আমরা পড়ছি বিপাকে। ট্যানারি মালিকরা রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে যে দামে কিনতাছে, আমরা তারচেয়ে বেশি দিয়া কিনতাছি।’’
সবচেয়ে খারাপ অবস্থা ছাগল ও খাসির চামড়ার বাজারে। সরকার খাসির চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ২৫ থেকে ৩০ টাকা নির্ধারণ করলেও বাস্তবে অনেক এলাকায় ছাগলের চামড়া ৫ থেকে ১০ টাকা পিস দরে বিক্রি হয়েছে।
সন্ধ্যার পরের চিত্র আরও করুণ
দুপুরের দিকে যে মাঝারি ও বড় চামড়া ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল, মাগরিবের পর আড়তদাররা তার দাম আরও কমিয়ে দিয়েছেন। পোস্তগোলায় সন্ধ্যার পর মাঝারি থেকে বড় আকারের অনেক গরুর চামড়া মাত্র ৩০০ থেকে ৪০০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। এক মৌসুমি ব্যবসায়ী তিনটি মাঝারি মানের চামড়া পোস্তায় নিয়ে আসেন। সেখানে পাইকারি প্রতিষ্ঠান ‘কামাল অ্যান্ড সন্স’-এর কর্মীরা তিনটি চামড়ার দাম মাত্র ৬০০ টাকা বলেন। কোনো অবস্থাতেই এর চেয়ে বেশি দামে চামড়াগুলো কিনতে রাজি হননি আড়তের কর্মীরা, ফলে চরম বিপাকে পড়েন ওই ব্যবসায়ী।
সিন্ডিকেটের অভিযোগ
মৌসুমি ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ট্যানারি মালিক ও আড়তদারদের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট প্রতি বছরের মতো এবারও বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। দুপুরের পর থেকেই সমন্বিতভাবে দাম কমিয়ে দেওয়া হয়, যাতে কম মূল্যে বিপুল পরিমাণ চামড়া সংগ্রহ করা যায়।
বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের (বিএইচএসএমএ) মহাসচিব হাজী টিপু সুলতান বলেন, ‘‘বেচাকেনার টাকা নেই। আমাদের ১০০ কোটি টাকা ট্যানারি রেখে দিয়েছে। ট্যানারির লোকজন এই খাত দেখিয়ে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে অন্যখাতে ব্যয় করে। গেম সব ট্যানারির হাতে।’’
বিপাকে মাদরাসা ও এতিমখানা
প্রতি বছরের মতো এবারও বিপুল পরিমাণ কোরবানির চামড়া মাদরাসা ও এতিমখানায় দান করা হয়েছে। তবে ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় এসব প্রতিষ্ঠানও আর্থিক অনিশ্চয়তায় পড়েছে।
রাজধানীর একটি মাদরাসার শিক্ষক আলীম উদ্দিন বলেন, “ছাত্ররা কষ্ট করে বাড়ি বাড়ি গিয়ে চামড়া সংগ্রহ করেছে। কিন্তু এখন আড়তে নিয়ে ন্যায্য দাম পাওয়া যাচ্ছে না। যে অর্থ দিয়ে এতিম শিশুদের বছরের বড় একটি ব্যয় মেটানো হতো, এবার সেই সুযোগও কমে গেছে।”
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একাধিক তদারকি দল রাজধানীর বিভিন্ন চামড়া সংগ্রহ কেন্দ্র পরিদর্শন করেছে। কর্মকর্তারা বলছেন, সরকার লবণযুক্ত চামড়ার দাম নির্ধারণ করেছে, কাঁচা চামড়ার নয়। পাশাপাশি চামড়া সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত লবণের সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে এবং সীমান্ত দিয়ে চামড়া পাচার ঠেকাতে বিজিবিকে সতর্ক রাখা হয়েছে।
গতকাল বুধবার দুপুরে সিলেট সার্কিট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির চামড়ার ন্যায্য দাম নিশ্চিতে নজরদারি করা হবে বলে আশ্বাস দেন। তিনি বলেন, প্রান্তিক চামড়া সংগ্রহকারীরা যাতে ন্যায্যমূল্য পান, সে জন্য সরকারের নজরদারি থাকবে।
তবে মাঠপর্যায়ের ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সরকারি নজরদারি বাস্তবে কার্যকর হয়নি। তাদের দাবি, বাজারে সিন্ডিকেটের প্রভাব ভাঙতে না পারায় প্রতি বছরের মতো এবারও ক্ষতির মুখে পড়েছেন প্রান্তিক ব্যবসায়ী ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে দেশের চামড়া খাত আবারও বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির শঙ্কায় পড়েছে।

“৫টা গরুর চামড়া কিনছিলাম বড় আশা কইরা। ভাবছিলাম, কিছু লাভ হইব। এখন সায়েন্সল্যাবে আইনা দেখি আড়তদাররা দামই কয় না। শ্রমিক খরচ, ভ্যানভাড়া—সব মিলায়া নিজের পকেটের টাকা গচ্চা গেছে। তওবা করতাছি, জীবনে আর এই ব্যবসা করমু না।”
রাজধানীর সায়েন্সল্যাব মোড়ে চামড়াভর্তি ভ্যানের পাশে দাঁড়িয়ে ক্ষোভ আর হতাশায় কথাগুলো বলছিলেন সোবহানবাগ মৌসুমি ব্যবসায়ী রহমত উল্লাহ। শুধু তিনি নন, ঈদুল আজহাকে ঘিরে দেশের কাঁচা চামড়ার বাজারে এবারও সিন্ডিকেট ও আড়তদারদের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন হাজারো মৌসুমি ব্যবসায়ী।
সরকার নির্ধারিত দামের তোয়াক্কা না করে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়া বিক্রি হয়েছে অত্যন্ত কম দামে। কোথাও কোথাও ন্যায্যমূল্য না পেয়ে চামড়া ফেলে দেওয়া বা মাটিতে পুঁতে রাখার ঘটনাও ঘটেছে।
সরকারি দর কাগজে, বাস্তবে ধস
গত ১৩ মে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ঢাকায় লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৬২ থেকে ৬৭ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৫৭ থেকে ৬২ টাকা নির্ধারণ করে। তবে মাঠপর্যায়ে সেই দামের প্রতিফলন দেখা যায়নি।
রাজধানীর সায়েন্সল্যাব, মোহাম্মদপুর ও পোস্তগোলা এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বড় আকারের গরুর চামড়া—যেগুলো মৌসুমি ব্যবসায়ীরা ৬০০ থেকে ১ হাজার টাকায় কিনেছেন—সেগুলোর দাম আড়তদাররা হাঁকছেন মাত্র ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা। মাঝারি আকারের চামড়া বিক্রি হয়েছে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকায়, আর ছোট চামড়া ১৫০ থেকে ২৫০ টাকায়।
তবে পোস্তার চিত্র কিছুটা ভিন্ন। পোস্তার পাইকার হাজী মোহাম্মদ আমির হোসেন বললেন, ‘‘চামড়ার দাম যেমন কমছে, কোয়ালিটিও খারাপ হইছে। আমরা পড়ছি বিপাকে। ট্যানারি মালিকরা রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে যে দামে কিনতাছে, আমরা তারচেয়ে বেশি দিয়া কিনতাছি।’’
সবচেয়ে খারাপ অবস্থা ছাগল ও খাসির চামড়ার বাজারে। সরকার খাসির চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ২৫ থেকে ৩০ টাকা নির্ধারণ করলেও বাস্তবে অনেক এলাকায় ছাগলের চামড়া ৫ থেকে ১০ টাকা পিস দরে বিক্রি হয়েছে।
সন্ধ্যার পরের চিত্র আরও করুণ
দুপুরের দিকে যে মাঝারি ও বড় চামড়া ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল, মাগরিবের পর আড়তদাররা তার দাম আরও কমিয়ে দিয়েছেন। পোস্তগোলায় সন্ধ্যার পর মাঝারি থেকে বড় আকারের অনেক গরুর চামড়া মাত্র ৩০০ থেকে ৪০০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। এক মৌসুমি ব্যবসায়ী তিনটি মাঝারি মানের চামড়া পোস্তায় নিয়ে আসেন। সেখানে পাইকারি প্রতিষ্ঠান ‘কামাল অ্যান্ড সন্স’-এর কর্মীরা তিনটি চামড়ার দাম মাত্র ৬০০ টাকা বলেন। কোনো অবস্থাতেই এর চেয়ে বেশি দামে চামড়াগুলো কিনতে রাজি হননি আড়তের কর্মীরা, ফলে চরম বিপাকে পড়েন ওই ব্যবসায়ী।
সিন্ডিকেটের অভিযোগ
মৌসুমি ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ট্যানারি মালিক ও আড়তদারদের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট প্রতি বছরের মতো এবারও বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। দুপুরের পর থেকেই সমন্বিতভাবে দাম কমিয়ে দেওয়া হয়, যাতে কম মূল্যে বিপুল পরিমাণ চামড়া সংগ্রহ করা যায়।
বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের (বিএইচএসএমএ) মহাসচিব হাজী টিপু সুলতান বলেন, ‘‘বেচাকেনার টাকা নেই। আমাদের ১০০ কোটি টাকা ট্যানারি রেখে দিয়েছে। ট্যানারির লোকজন এই খাত দেখিয়ে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে অন্যখাতে ব্যয় করে। গেম সব ট্যানারির হাতে।’’
বিপাকে মাদরাসা ও এতিমখানা
প্রতি বছরের মতো এবারও বিপুল পরিমাণ কোরবানির চামড়া মাদরাসা ও এতিমখানায় দান করা হয়েছে। তবে ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় এসব প্রতিষ্ঠানও আর্থিক অনিশ্চয়তায় পড়েছে।
রাজধানীর একটি মাদরাসার শিক্ষক আলীম উদ্দিন বলেন, “ছাত্ররা কষ্ট করে বাড়ি বাড়ি গিয়ে চামড়া সংগ্রহ করেছে। কিন্তু এখন আড়তে নিয়ে ন্যায্য দাম পাওয়া যাচ্ছে না। যে অর্থ দিয়ে এতিম শিশুদের বছরের বড় একটি ব্যয় মেটানো হতো, এবার সেই সুযোগও কমে গেছে।”
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একাধিক তদারকি দল রাজধানীর বিভিন্ন চামড়া সংগ্রহ কেন্দ্র পরিদর্শন করেছে। কর্মকর্তারা বলছেন, সরকার লবণযুক্ত চামড়ার দাম নির্ধারণ করেছে, কাঁচা চামড়ার নয়। পাশাপাশি চামড়া সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত লবণের সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে এবং সীমান্ত দিয়ে চামড়া পাচার ঠেকাতে বিজিবিকে সতর্ক রাখা হয়েছে।
গতকাল বুধবার দুপুরে সিলেট সার্কিট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির চামড়ার ন্যায্য দাম নিশ্চিতে নজরদারি করা হবে বলে আশ্বাস দেন। তিনি বলেন, প্রান্তিক চামড়া সংগ্রহকারীরা যাতে ন্যায্যমূল্য পান, সে জন্য সরকারের নজরদারি থাকবে।
তবে মাঠপর্যায়ের ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সরকারি নজরদারি বাস্তবে কার্যকর হয়নি। তাদের দাবি, বাজারে সিন্ডিকেটের প্রভাব ভাঙতে না পারায় প্রতি বছরের মতো এবারও ক্ষতির মুখে পড়েছেন প্রান্তিক ব্যবসায়ী ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে দেশের চামড়া খাত আবারও বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির শঙ্কায় পড়েছে।