চরচা ডেস্ক

২০২৪ সালের ১৬ জুলাইয়ের সেই তপ্ত দুপুর। রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে আছেন ২৫ বছর বয়সী ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র আবু সাঈদ। হাতে সামান্য একটি লাঠি, কিন্তু চোখে অকুতোভয় দৃষ্টি। ১৫ মিটার দূর থেকে পুলিশের শটগানের গুলিতে লুটিয়ে পড়লেন সাঈদ।
সেই ২০ মিনিটের ভিডিওটি কেবল একটি মৃত্যু ছিল না, সেটি ছিল একটি শাসনের পতনের শুরু। তিন সপ্তাহের মাথায় ১৫ বছরের ক্ষমতা ছেড়ে হেলিকপ্টারে দেশত্যাগ করেন শেখ হাসিনা।
কিন্তু এর ঠিক বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে ইরানে এবং পশ্চিমা বিশ্বের গাজা সংহতি আন্দোলনে। ২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যু থেকে শুরু করে ২০২৬ সালের বর্তমান সময় পর্যন্ত ইরান বারবার বিক্ষোভে ফেটে পড়লেও শাসনব্যবস্থা সেখানে অটুট। গাজা ইস্যুতে ইউরোপ-আমেরিকার রাজপথ প্রকম্পিত হলেও বদলায়নি রাষ্ট্রীয় নীতি।
প্রশ্ন উঠছে—বিপুল জনসমর্থন থাকা সত্ত্বেও কেন কিছু আন্দোলন সফল হয়, আর কিছু আন্দোলন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়?
রাষ্ট্র যখন ভেতর থেকে ভাঙে
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দুর এক নিবন্ধে বিশ্লেষক প্রিয়াংশু তিয়াগি বলছেন, একটি আন্দোলনের সাফল্য কেবল রাজপথের জমায়েত বা নৈতিক দাবির ওপর নির্ভর করে না। বরং এটি নির্ভর করে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ কাঠামোর ওপর। বাংলাদেশ ও নেপালের সাম্প্রতিক অভ্যুত্থান এবং ইরান ও গাজা সংহতি আন্দোলনের তুলনামূলক চিত্র একটি বিষয় স্পষ্ট করে দেয়—জনগণ যখন ফুঁসে ওঠে, তখন রাষ্ট্র যদি ভেতর থেকে না ভাঙে, তবে বিজয় আসা কঠিন।
প্রিয়াংশু তিয়াগি বলছেন, বাংলাদেশে আবু সাঈদের মৃত্যুর ঘটনা আন্দোলনকে ‘এক দফা’ দাবিতে রূপ দিয়েছিল। কিন্তু ৫ আগস্টের ‘লং মার্চ টু ঢাকা’ সফল হওয়ার মূল কারণ ছিল সেনাবাহিনী। যখন সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান ঘোষণা করলেন, সেনাবাহিনী সাধারণ মানুষের ওপর গুলি চালাবে না, তখন শেখ হাসিনার ক্ষমতা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। একই চিত্র দেখা গেছে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে নেপালে। সেখানেও সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল অশোক রাজ সিগদেল নিরপেক্ষ অবস্থান নেন এবং দেশের তরুণ প্রজন্মের (জেন-জি) দাবির প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
বিপরীত দিকে, ইরানের আন্দোলনগুলো কেন সফল হচ্ছে না–তা বুঝতে হলে দেশটির নিরাপত্তা কাঠামোর দিকে তাকাতে হবে। ২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’ স্লোগানটি বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় হয়েছিল। কিন্তু ইরান সরকার এর জবাব দিয়েছে প্রযুক্তির মাধ্যমে।

প্রিয়াংশু তিয়াগি বলছেন, ইরানি রাষ্ট্রযন্ত্র বর্তমানে ফেশিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তির মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের চিহ্নিত করছে। বাসে, বাজারে বা ব্যক্তিগত গাড়িতে হিজাববিহীন নারীদের শনাক্ত করে সরাসরি জরিমানা ও জেল দেওয়া হচ্ছে। এই মুহূর্তে মুদ্রাস্ফীতির প্রতিবাদে হওয়া বিক্ষোভে দেশটিতে ইন্টারনেটের আলো নিভিয়ে দেওয়া হয় এবং প্রায় ২ হাজার থেকে ১২ হাজার মানুষকে হত্যা করা হয় বলে বিভিন্ন সূত্র দাবি করেছে। কিন্তু ইরানের সামরিক বাহিনী বা ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) ভেতর থেকে কেউ বিদ্রোহ করেনি। আর দেশটির অর্থনীতি ও ক্ষমতার চাবিকাঠি এই বাহিনীর হাতেই ‘জিম্মি’।
গাজা ইস্যুতে পশ্চিমা বিশ্বের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর ভূমিকাও আজ প্রশ্নের মুখে। প্রিয়াংশু তিয়াগির মতে, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং জার্মানির মতো দেশগুলোতে গাজার সমর্থনে বিশাল মিছিল হলেও রাষ্ট্রগুলো সেগুলোকে দমনের জন্য আইনি ও পুলিশি কৌশল বেছে নিয়েছে। লন্ডনে একক কোনো মিছিলে সবচেয়ে বেশি গ্রেপ্তারের রেকর্ড হয়েছে ২০২৫ সালে।
জার্মানি এবং ফ্রান্সে প্রাক-প্রস্তুতিমূলকভাবে গাজা সংহতি মিছিল নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ফিলিস্তিনপন্থী আন্দোলনগুলোকে ‘সন্ত্রাসবাদের সমর্থক’ বা ‘উগ্রবাদ’ হিসেবে তকমা দিয়ে দমন করা হয়েছে। এখানেও রাষ্ট্রের সংহতি ছিল লক্ষ্যণীয়। এসব দেশে রাষ্ট্রীয় নীতি ও ইসরায়েলের সাথে কৌশলগত জোট এতোটাই দৃঢ় যে, রাজপথের জনমত সেই নীতিকে টলাতে পারেনি।
অন্যদিকে বাংলাদেশ ও নেপালের আন্দোলনে আন্তর্জাতিক চাপ বিশেষ একটি বড় ভূমিকা পালন করেছিল বলে মনে করেন প্রিয়াংশু তিয়াগি। আর ইরানের ওপর দশকের পর দশক মার্কিন নিষেধাজ্ঞা থাকলেও চীন ও রাশিয়ার মতো দেশগুলোর প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সহায়তা তাদের টিকে থাকতে সাহায্য করছে।
তাই প্রিয়াংশু তিয়াগি মনে করেন, পার্থক্যটি কেবল সাহসের নয়, পার্থক্যটি হলো রাষ্ট্রযন্ত্রের সক্ষমতার। বাংলাদেশ ও নেপাল প্রমাণ করেছে রাষ্ট্র যখন ভেতর থেকে নড়বড়ে হয়, তখন সাধারণ মানুষ জয়ী হয়। আর ইরান ও গাজা পরিস্থিতি বুঝিয়ে দেয়, রাষ্ট্র যখন প্রযুক্তিতে বলীয়ান এবং নিজের আদর্শে অনড় থাকে, তখন কেবল নৈতিক সমর্থন দিয়ে পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। পরবর্তী বৈশ্বিক অভ্যুত্থানগুলোর ভাগ্যও সম্ভবত রাজপথের স্লোগানে নয়, বরং রাষ্ট্রের বন্দুকের নলের অভিমুখ কোন দিকে—তার ওপরই নির্ভর করবে বলে মনে করেন প্রিয়াংশু তিয়াগি।

২০২৪ সালের ১৬ জুলাইয়ের সেই তপ্ত দুপুর। রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে আছেন ২৫ বছর বয়সী ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র আবু সাঈদ। হাতে সামান্য একটি লাঠি, কিন্তু চোখে অকুতোভয় দৃষ্টি। ১৫ মিটার দূর থেকে পুলিশের শটগানের গুলিতে লুটিয়ে পড়লেন সাঈদ।
সেই ২০ মিনিটের ভিডিওটি কেবল একটি মৃত্যু ছিল না, সেটি ছিল একটি শাসনের পতনের শুরু। তিন সপ্তাহের মাথায় ১৫ বছরের ক্ষমতা ছেড়ে হেলিকপ্টারে দেশত্যাগ করেন শেখ হাসিনা।
কিন্তু এর ঠিক বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে ইরানে এবং পশ্চিমা বিশ্বের গাজা সংহতি আন্দোলনে। ২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যু থেকে শুরু করে ২০২৬ সালের বর্তমান সময় পর্যন্ত ইরান বারবার বিক্ষোভে ফেটে পড়লেও শাসনব্যবস্থা সেখানে অটুট। গাজা ইস্যুতে ইউরোপ-আমেরিকার রাজপথ প্রকম্পিত হলেও বদলায়নি রাষ্ট্রীয় নীতি।
প্রশ্ন উঠছে—বিপুল জনসমর্থন থাকা সত্ত্বেও কেন কিছু আন্দোলন সফল হয়, আর কিছু আন্দোলন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়?
রাষ্ট্র যখন ভেতর থেকে ভাঙে
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দুর এক নিবন্ধে বিশ্লেষক প্রিয়াংশু তিয়াগি বলছেন, একটি আন্দোলনের সাফল্য কেবল রাজপথের জমায়েত বা নৈতিক দাবির ওপর নির্ভর করে না। বরং এটি নির্ভর করে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ কাঠামোর ওপর। বাংলাদেশ ও নেপালের সাম্প্রতিক অভ্যুত্থান এবং ইরান ও গাজা সংহতি আন্দোলনের তুলনামূলক চিত্র একটি বিষয় স্পষ্ট করে দেয়—জনগণ যখন ফুঁসে ওঠে, তখন রাষ্ট্র যদি ভেতর থেকে না ভাঙে, তবে বিজয় আসা কঠিন।
প্রিয়াংশু তিয়াগি বলছেন, বাংলাদেশে আবু সাঈদের মৃত্যুর ঘটনা আন্দোলনকে ‘এক দফা’ দাবিতে রূপ দিয়েছিল। কিন্তু ৫ আগস্টের ‘লং মার্চ টু ঢাকা’ সফল হওয়ার মূল কারণ ছিল সেনাবাহিনী। যখন সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান ঘোষণা করলেন, সেনাবাহিনী সাধারণ মানুষের ওপর গুলি চালাবে না, তখন শেখ হাসিনার ক্ষমতা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। একই চিত্র দেখা গেছে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে নেপালে। সেখানেও সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল অশোক রাজ সিগদেল নিরপেক্ষ অবস্থান নেন এবং দেশের তরুণ প্রজন্মের (জেন-জি) দাবির প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
বিপরীত দিকে, ইরানের আন্দোলনগুলো কেন সফল হচ্ছে না–তা বুঝতে হলে দেশটির নিরাপত্তা কাঠামোর দিকে তাকাতে হবে। ২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’ স্লোগানটি বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় হয়েছিল। কিন্তু ইরান সরকার এর জবাব দিয়েছে প্রযুক্তির মাধ্যমে।

প্রিয়াংশু তিয়াগি বলছেন, ইরানি রাষ্ট্রযন্ত্র বর্তমানে ফেশিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তির মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের চিহ্নিত করছে। বাসে, বাজারে বা ব্যক্তিগত গাড়িতে হিজাববিহীন নারীদের শনাক্ত করে সরাসরি জরিমানা ও জেল দেওয়া হচ্ছে। এই মুহূর্তে মুদ্রাস্ফীতির প্রতিবাদে হওয়া বিক্ষোভে দেশটিতে ইন্টারনেটের আলো নিভিয়ে দেওয়া হয় এবং প্রায় ২ হাজার থেকে ১২ হাজার মানুষকে হত্যা করা হয় বলে বিভিন্ন সূত্র দাবি করেছে। কিন্তু ইরানের সামরিক বাহিনী বা ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) ভেতর থেকে কেউ বিদ্রোহ করেনি। আর দেশটির অর্থনীতি ও ক্ষমতার চাবিকাঠি এই বাহিনীর হাতেই ‘জিম্মি’।
গাজা ইস্যুতে পশ্চিমা বিশ্বের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর ভূমিকাও আজ প্রশ্নের মুখে। প্রিয়াংশু তিয়াগির মতে, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং জার্মানির মতো দেশগুলোতে গাজার সমর্থনে বিশাল মিছিল হলেও রাষ্ট্রগুলো সেগুলোকে দমনের জন্য আইনি ও পুলিশি কৌশল বেছে নিয়েছে। লন্ডনে একক কোনো মিছিলে সবচেয়ে বেশি গ্রেপ্তারের রেকর্ড হয়েছে ২০২৫ সালে।
জার্মানি এবং ফ্রান্সে প্রাক-প্রস্তুতিমূলকভাবে গাজা সংহতি মিছিল নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ফিলিস্তিনপন্থী আন্দোলনগুলোকে ‘সন্ত্রাসবাদের সমর্থক’ বা ‘উগ্রবাদ’ হিসেবে তকমা দিয়ে দমন করা হয়েছে। এখানেও রাষ্ট্রের সংহতি ছিল লক্ষ্যণীয়। এসব দেশে রাষ্ট্রীয় নীতি ও ইসরায়েলের সাথে কৌশলগত জোট এতোটাই দৃঢ় যে, রাজপথের জনমত সেই নীতিকে টলাতে পারেনি।
অন্যদিকে বাংলাদেশ ও নেপালের আন্দোলনে আন্তর্জাতিক চাপ বিশেষ একটি বড় ভূমিকা পালন করেছিল বলে মনে করেন প্রিয়াংশু তিয়াগি। আর ইরানের ওপর দশকের পর দশক মার্কিন নিষেধাজ্ঞা থাকলেও চীন ও রাশিয়ার মতো দেশগুলোর প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সহায়তা তাদের টিকে থাকতে সাহায্য করছে।
তাই প্রিয়াংশু তিয়াগি মনে করেন, পার্থক্যটি কেবল সাহসের নয়, পার্থক্যটি হলো রাষ্ট্রযন্ত্রের সক্ষমতার। বাংলাদেশ ও নেপাল প্রমাণ করেছে রাষ্ট্র যখন ভেতর থেকে নড়বড়ে হয়, তখন সাধারণ মানুষ জয়ী হয়। আর ইরান ও গাজা পরিস্থিতি বুঝিয়ে দেয়, রাষ্ট্র যখন প্রযুক্তিতে বলীয়ান এবং নিজের আদর্শে অনড় থাকে, তখন কেবল নৈতিক সমর্থন দিয়ে পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। পরবর্তী বৈশ্বিক অভ্যুত্থানগুলোর ভাগ্যও সম্ভবত রাজপথের স্লোগানে নয়, বরং রাষ্ট্রের বন্দুকের নলের অভিমুখ কোন দিকে—তার ওপরই নির্ভর করবে বলে মনে করেন প্রিয়াংশু তিয়াগি।