হিমাল সাউথএশিয়ানের প্রতিবেদন
চরচা ডেস্ক

২১ বছর বয়সী সাইফুল ইসলামের মতো অনেক মানুষের কাছে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান শুধু শেখ হাসিনার পতন ছিল না, এটি ছিল দীর্ঘদিনের কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশকে নতুনভাবে গড়ে তোলার এক নতুন আশার শুরু। কিন্তু এখন তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার গণতান্ত্রিক সংস্কার বাস্তবায়নে ‘ধীরগতি’ দেখানোয় সাইফুলের মতো অনেকেই নিজেদের প্রতারিত মনে করছেন।
গত এপ্রিল মাসে ঢাকায় এক বিক্ষোভে অংশ নিয়ে সাইফুল বলেন, “গণভোটের রায় কার্যকর করতে ব্যর্থ হয়ে সরকার আবারও দেশকে কর্তৃত্ববাদী শাসনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।”
কলম্বোভিত্তিক সাময়িকী হিমাল সাউথএশিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত সংসদীয় নির্বাচনের পাশাপাশি একটি গণভোটও আয়োজন করা হয়, যেখানে গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক সংস্কার নিয়ে জনগণের মতামত নেওয়া হয়েছিল। তারেক রহমান ও বিএনপি তখন এসব সংস্কারের পক্ষে সক্রিয় প্রচারণা চালায়। গণভোটে ৬০ শতাংশের বেশি ভোটার সংস্কার প্রস্তাবগুলোর পক্ষে মত দেন। সাইফুলের ভাষায়, “যেকোনো মূল্যে আমরা গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করব।”
শেখ হাসিনার পতনের পর দায়িত্ব নেওয়া মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারও এসব সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল এবং কিছু উদ্যোগ বাস্তবায়ন শুরু করেছিল। ওই সময় দেশের সাধারণ মানুষ ও নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে একটি ব্যাপক ঐকমত্য তৈরি হয়েছিল। তারা চেয়েছিল রাষ্ট্রের ক্ষমতার কাঠামো এমনভাবে পুনর্গঠন করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো ব্যক্তি বা দল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে না পারে; যেমনটি দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার শাসনামলে দেখা গিয়েছিল।
মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী প্রশাসন রাষ্ট্র পুনর্গঠনের লক্ষ্য সামনে রেখে ব্যাপক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেয় এবং ১০০টিরও বেশি অধ্যাদেশ জারি করে। এসব উদ্যোগের মধ্যে ছিল গুম প্রতিরোধে আইনগত ব্যবস্থা, দুদক সংস্কার কমিশন, বিচার বিভাগের জন্য পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা এবং গুরুত্বপূর্ণ জনস্বার্থের বিষয়ে গণভোটের বিধান চালু করা। পরে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে, বর্তমানে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ছাড়া দেশের অন্য প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো একটি ঐতিহাসিক সমঝোতায় পৌঁছায়। কাঠামোগত, আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের লক্ষ্যে গৃহীত এই সমঝোতা ‘জুলাই চার্টার’ নামে পরিচিতি পায়।

পরবর্তী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত গণভোটে ‘জুলাই চার্টারের’ ভিত্তিতে চারটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব জনগণের সামনে তোলা হয়। এর মধ্যে ছিল—নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল এবং স্বাধীন নির্বাচন কমিশন ও বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠা; ভোটের আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন; পরবর্তী সরকারের জন্য ৩০টি মৌলিক সংস্কার বাধ্যতামূলক করা, যার মধ্যে মেয়াদসীমা নির্ধারণ (টার্ম লিমিট) ও নারীর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর বিষয়ও ছিল; এবং রাজনৈতিক দলগুলো যেন চার্টারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে বাধ্য থাকে, সে জন্য প্রয়োজনীয় কাঠামো তৈরি করা।
শেখ হাসিনার পতনের পর অনুষ্ঠিত প্রথম জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে। দলটির নির্বাচনী প্রচারণার অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার ছিল এসব সংস্কার বাস্তবায়ন। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর থেকেই তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার সংস্কার বাস্তবায়নে ধীরগতি দেখাতে শুরু করে।
সংবিধান অনুযায়ী, নবনির্বাচিত সংসদকে প্রথম ৩০ দিনের মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা সংস্কারবিষয়ক অধ্যাদেশগুলো অনুমোদন বা বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিতে হতো। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোনো সিদ্ধান্ত না হলে অধ্যাদেশগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে অকার্যকর হয়ে যায়। তারেক রহমান প্রশাসন কার্যত সেই মেয়াদই শেষ হতে দেয়।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, সংস্কারগুলো আরও পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে এবং পরে সেগুলো বাস্তবায়ন করা হবে। আইনমন্ত্রী মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান অভিযোগ করেন, কিছু পক্ষ ইচ্ছাকৃতভাবে এমন ধারণা দিচ্ছে যে, সরকার সংস্কারগুলো বাতিল করেছে, অথচ প্রস্তাবগুলোর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির দিকগুলো নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করা হচ্ছে।
তবে সরকারের অবস্থান নিয়ে বিতর্ক আরও তীব্র হয় যখন গত ৩০ এপ্রিল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সংসদে বলেন, সংস্কার বাস্তবায়নের নির্দেশনাটি আইনগতভাবে বৈধ ছিল না। তিনি আরও দাবি করেন, নির্বাচনী সমঝোতার স্বার্থে বিএনপি ‘জুলাই চার্টার’ প্রণয়নের সময় কয়েকটি বিষয়ে আপস করতে বাধ্য হয়েছিল।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সংসদে বলেন, “নির্বাচনকে সামনে রেখে তখন আমরা অনেক বিষয়ে নীরব ছিলাম। সংস্কারের কারণে যেন নির্বাচন বাধাগ্রস্ত না হয়, সে জন্য আমরা আপস করেছি, এমনকি ‘জুলাই চার্টারেও’ স্বাক্ষর করেছি।” তবে এই বক্তব্যের পর বিএনপি সরকার সুশীল সমাজ, আইন বিশেষজ্ঞ এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে। সরকারের ব্যাখ্যায় তারা কেউই আশ্বস্ত হতে পারেননি।

অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্রের দুর্বলতা শনাক্ত করা এবং দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত পরিবর্তনের রূপরেখা তৈরির লক্ষ্যে সংবিধান, নির্বাচন ব্যবস্থা, বিচার বিভাগসহ বিভিন্ন খাতে ১১টি স্বাধীন কমিশন গঠন করেছিল। পাশাপাশি রাজনৈতিক ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে গঠন করা হয় ‘জাতীয় ঐকমত্য কমিশন’। এটি দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোকে একই আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসে। এই প্রক্রিয়ার ফল হিসেবেই ‘জুলাই চার্টার’-এর জন্ম হয়। সনদটিতে নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকানো এবং রাষ্ট্রে স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য গড়ে তোলার নানা প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত ছিল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এসব সংস্কার বাস্তবায়ন না হলে বাংলাদেশ আবারও দমন-পীড়ন ও ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণের পুরোনো চক্রে ফিরে যেতে পারে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরীর ভাষায়, বিএনপি যেন আবারও পুরোনো দলীয় রাজনীতির ধারাতেই ফিরে যাচ্ছে। তিনি হিমাল সাউথএশিয়ানকে বলেন, “২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের কাছ থেকে সংস্কার কর্মসূচি থেকে সরে আসা কেউ প্রত্যাশা করেনি। এটি মানুষের আকাঙ্ক্ষাকে ভেঙে দিয়েছে।”
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের আন্দোলনে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হন এবং আরও হাজার হাজার মানুষ আহত হন। সেই গণঅভ্যুত্থানই শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনাকে ভারতে পালিয়ে যেতে বাধ্য করে এবং আওয়ামী লীগের টানা ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটায়। যারা নির্বাচনী কারচুপি, রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন এবং দীর্ঘদিনের কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছিলেন, তারা বিশ্বাস করেছিলেন বাংলাদেশ এবার এমন এক পথে এগোবে, যেখানে আর কোনো নেতা গণতন্ত্রকে ব্যক্তিশাসনে রূপ দিতে পারবেন না।
এর আগে, আওয়ামী লীগ সরকারও একই ধরনের আইন ব্যবহার করে জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করেছিল। সে সময় মানবাধিকার সংগঠন ও সুশীল সমাজের অনেকেই এই পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেছিলেন এবং একে রাজনৈতিক দমননীতির অংশ হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন।
২০২৬ সালের সন্ত্রাসবিরোধী সংশোধনী আইনটি এমন এক সময়ে পাস হলো, যখন বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছিল যে, তারা কোনো রাজনৈতিক দলকে রাজনীতির বাইরে ঠেলে দেওয়ার নীতিতে বিশ্বাস করে না। নির্বাচনের আগে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর একাধিকবার প্রকাশ্যে বলেছিলেন, বিএনপি কোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার পক্ষে নয়। কিন্তু সংসদে বক্তব্য দিতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ব্যাপক গণআন্দোলনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি হওয়ায় সরকার সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় দলটির ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বর্তমানে নির্বাসনে থাকা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, তারেক রহমান বারবার দাবি করেছিলেন যে বিএনপি বহুদলীয় গণতন্ত্রের ধারক ও বাহক। সেই বক্তব্য জনগণের মধ্যে রাজনৈতিক পরিবর্তনের আশা তৈরি করেছিল। কিন্তু তার মতে, “আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার বিল পাসের মধ্য দিয়ে সেই প্রত্যাশা ভেঙে গেছে।”
সন্ত্রাসবিরোধী আইন পাসের পাশাপাশি বিচার বিভাগ, গুম প্রতিরোধ এবং মানবাধিকার তদারকির মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারগুলো বাস্তবায়নে বিএনপির গড়িমসি রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন সরকারের উদ্দেশ্য নিয়ে গভীর প্রশ্ন তৈরি করেছে। সমালোচকদের প্রশ্ন বিএনপি কি ক্ষমতায় এসে সেই একই রাজনৈতিক ও আইনি কাঠামো পুনঃপ্রতিষ্ঠা করছে, যার বিরুদ্ধে তারা একসময় আন্দোলন করেছিল এবং যার শিকারও হয়েছিল? নাকি তারা সত্যিই নতুন এক গণতান্ত্রিক পথ নির্মাণ করতে চায়?
ছাত্র আন্দোলনের অংশগ্রহণকারী সাইফুল ইসলামের কথায় সেই হতাশার প্রতিফলন স্পষ্ট। তিনি বলেন, “নির্বাচনের আগে বিএনপি সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, গণভোটের পক্ষেও প্রচার চালিয়েছিল। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর মনে হচ্ছে তারা সবকিছু ভুলে গেছে। নির্বাচনের আগের বিএনপি আর এখনকার বিএনপির মধ্যে আমি কোনো মিল খুঁজে পাই না।”
সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, বাংলাদেশ যেন আবার শেখ হাসিনা আমলের ‘নিন্দনীয় চর্চাগুলোর’ পুনরাবৃত্তির দিকে না যায়।
এদিকে, প্রধান ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের মিত্র জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতৃত্বে বিরোধী দলগুলো সারা দেশে বিক্ষোভ চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের দাবি, গণভোটের রায় অনুযায়ী দ্রুত সংস্কার বাস্তবায়ন করতে হবে।
ছাত্রনেতা ও এনসিপির সংসদ সদস্য নাহিদ ইসলাম বলেন, তার দল বৃহত্তর গণআন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তার ভাষায়, “সংস্কার কোনো একক দলের এজেন্ডা নয়; এটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ ও অস্তিত্বের প্রশ্ন।”
২০২৩ সালে, যখন শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় ছিল, তখন বিএনপি রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে একটি ৩১ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে। এতে গণতান্ত্রিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য সংবিধান সংস্কার কমিশন গঠন, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল এবং আইনসভা, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। একইসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর টানা দুই মেয়াদের বেশি ক্ষমতায় থাকার সুযোগ সীমিত করার কথাও বলা হয়েছিল। চলতি বছরের নির্বাচনের আগে বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারা বারবার এসব সংস্কার বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেছিলেন।
বিএনপির ৩১ দফা কর্মসূচির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল বিচার বিভাগের সংস্কার। এতে একটি স্বাধীন বিচার বিভাগীয় কমিশন গঠনের প্রস্তাব করা হয়, যার মাধ্যমে অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলাবিষয়ক ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের অধীনে আনার কথা বলা হয়েছিল। পাশাপাশি আদালতের জন্য পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা এবং বিচারকদের অভিশংসনের জন্য ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল’ পুনর্বহালের লক্ষ্যে সাংবিধানিক সংশোধনের প্রস্তাবও ছিল। এসব উদ্যোগের উদ্দেশ্য ছিল বিচার বিভাগকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও স্বাধীন করা। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর বিএনপির অবস্থানে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখা যায়। গত ৯ এপ্রিল সংসদ অন্তর্বর্তী সরকারের প্রণীত সেই বিধান বাতিল করে, যার মাধ্যমে বিচারকদের নিয়োগ ও বিচার বিভাগের প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য পৃথক সচিবালয় গঠনের কথা ছিল। এর ফলে উচ্চ আদালতে বিচারপতি নিয়োগের ক্ষমতা কার্যত আবারও আইন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণে ফিরে যায়, যা অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কারের আগেও ছিল।
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব এবং প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী বলেন, দলের ৩১ দফা কর্মসূচির প্রতিশ্রুতিগুলো “ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে।”
আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি ছিল গুম বা বলপূর্বক নিখোঁজের ঘটনা। মানবাধিকার সংগঠন ও ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিযোগ, শেখ হাসিনার শাসনামলে বিরোধী দলের নেতা-কর্মী, সমালোচক ও ভিন্নমতাবলম্বীসহ শত শত মানুষ নিখোঁজ হন। এসব ঘটনার তদন্তে অন্তর্বর্তী সরকার একটি কমিশন গঠন করে এবং ২০২৫ সালে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ’ জারি করে।
অধ্যাদেশটিতে গুমকে ‘চলমান অপরাধ’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয় এবং দায়ীদের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়। কিন্তু বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর নির্ধারিত ৩০ দিনের মধ্যে এটি সংসদে উত্থাপন না করায় অধ্যাদেশটির কার্যকারিতা শেষ হয়ে যায়।
মানবাধিকারকর্মী এবং গুম তদন্ত কমিশনের সদস্য নূর খান লিটন বলেন, বিএনপি নিজেও অতীতে গুম ও রাজনৈতিক হত্যার অন্যতম বড় ভুক্তভোগী ছিল। তার ভাষায়, “দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এসব অধ্যাদেশ বাতিল করে তারা যেন আবার পুরোনো রাজনীতির পথেই ফিরে যাচ্ছে।”
এদিকে, বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠ সংসদ জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে শক্তিশালী করার জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের আনা একটি অধ্যাদেশও বাতিল করেছে। ৯ এপ্রিল বিরোধীদের আপত্তি উপেক্ষা করে কণ্ঠভোটে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (বাতিল ও পুনর্বহাল) বিল’ পাস হয়। রাষ্ট্রপতির অনুমোদন ও গেজেট প্রকাশের পর এটি কার্যকর হবে। আইনমন্ত্রী মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, বাতিল হওয়া অধ্যাদেশে বেশ কিছু দুর্বলতা ছিল এবং অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে নতুন আইন প্রণয়ন করা হবে।

এই পরিবর্তনের ফলে মানবাধিকার কমিশন-সংক্রান্ত অন্তর্বর্তী সরকারের তিনটি পৃথক অধ্যাদেশ বাতিল হয়ে যায় এবং ২০০৯ সালের আওয়ামী লীগ আমলের আইন পুনর্বহাল হয়। সমালোচকদের মতে, এই আইন কমিশনকে কার্যত সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করে রেখেছে। বিদ্যমান কাঠামোয় কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য নিয়োগে সরকারের প্রভাবের সুযোগ বেশি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতাও সীমিত। ফলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় কার্যকর ও স্বাধীন তদন্ত পরিচালনার সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়েছে।
বিরোধী দলগুলো সংসদে এ নিয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে সতর্ক করেছে যে, ভবিষ্যতে এই কমিশন আবারও রাজনৈতিক নিপীড়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।
নূর খান লিটনের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে স্বাধীন তদন্তের যে সুযোগ রাখা হয়েছিল, ২০০৯ সালের আইন পুনর্বহালের ফলে তা কার্যত বাতিল হয়ে গেছে। এখন এ ধরনের তদন্ত চালাতে সরকারের অনুমতি প্রয়োজন হবে। তার ভাষায়, “সরকার নিজের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত করতে এসব আইন বাতিল করছে।”
বিএনপির এই অবস্থানে দলের ভেতরেও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। এপ্রিলের শুরুতে মানবাধিকার সুরক্ষা ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে রাজনৈতিক বিশ্লেষক সাখাওয়াত হোসেন সায়ন্ত বলেন, “আমি ব্যক্তিগতভাবে বিএনপিকে সমর্থন করি, কিন্তু বর্তমান সরকারের পদক্ষেপগুলোকে সমর্থন করার মতো শক্ত কোনো যুক্তি খুঁজে পাচ্ছি না।”
ঢাকায় আরেকটি অনুষ্ঠানে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও বন ও পরিবেশমন্ত্রী আব্দুল আউয়াল মিন্টু সতর্ক করে বলেন, প্রতিশ্রুত সংস্কারের মাধ্যমে যদি রাজনীতি ও অর্থনীতিতে বাস্তব পরিবর্তন না আসে, তাহলে ‘জেন জি’ তরুণরা আবারও গণঅভ্যুত্থানে নামতে পারে।

২১ বছর বয়সী সাইফুল ইসলামের মতো অনেক মানুষের কাছে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান শুধু শেখ হাসিনার পতন ছিল না, এটি ছিল দীর্ঘদিনের কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশকে নতুনভাবে গড়ে তোলার এক নতুন আশার শুরু। কিন্তু এখন তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার গণতান্ত্রিক সংস্কার বাস্তবায়নে ‘ধীরগতি’ দেখানোয় সাইফুলের মতো অনেকেই নিজেদের প্রতারিত মনে করছেন।
গত এপ্রিল মাসে ঢাকায় এক বিক্ষোভে অংশ নিয়ে সাইফুল বলেন, “গণভোটের রায় কার্যকর করতে ব্যর্থ হয়ে সরকার আবারও দেশকে কর্তৃত্ববাদী শাসনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।”
কলম্বোভিত্তিক সাময়িকী হিমাল সাউথএশিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত সংসদীয় নির্বাচনের পাশাপাশি একটি গণভোটও আয়োজন করা হয়, যেখানে গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক সংস্কার নিয়ে জনগণের মতামত নেওয়া হয়েছিল। তারেক রহমান ও বিএনপি তখন এসব সংস্কারের পক্ষে সক্রিয় প্রচারণা চালায়। গণভোটে ৬০ শতাংশের বেশি ভোটার সংস্কার প্রস্তাবগুলোর পক্ষে মত দেন। সাইফুলের ভাষায়, “যেকোনো মূল্যে আমরা গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করব।”
শেখ হাসিনার পতনের পর দায়িত্ব নেওয়া মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারও এসব সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল এবং কিছু উদ্যোগ বাস্তবায়ন শুরু করেছিল। ওই সময় দেশের সাধারণ মানুষ ও নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে একটি ব্যাপক ঐকমত্য তৈরি হয়েছিল। তারা চেয়েছিল রাষ্ট্রের ক্ষমতার কাঠামো এমনভাবে পুনর্গঠন করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো ব্যক্তি বা দল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে না পারে; যেমনটি দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার শাসনামলে দেখা গিয়েছিল।
মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী প্রশাসন রাষ্ট্র পুনর্গঠনের লক্ষ্য সামনে রেখে ব্যাপক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেয় এবং ১০০টিরও বেশি অধ্যাদেশ জারি করে। এসব উদ্যোগের মধ্যে ছিল গুম প্রতিরোধে আইনগত ব্যবস্থা, দুদক সংস্কার কমিশন, বিচার বিভাগের জন্য পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা এবং গুরুত্বপূর্ণ জনস্বার্থের বিষয়ে গণভোটের বিধান চালু করা। পরে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে, বর্তমানে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ছাড়া দেশের অন্য প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো একটি ঐতিহাসিক সমঝোতায় পৌঁছায়। কাঠামোগত, আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের লক্ষ্যে গৃহীত এই সমঝোতা ‘জুলাই চার্টার’ নামে পরিচিতি পায়।

পরবর্তী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত গণভোটে ‘জুলাই চার্টারের’ ভিত্তিতে চারটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব জনগণের সামনে তোলা হয়। এর মধ্যে ছিল—নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল এবং স্বাধীন নির্বাচন কমিশন ও বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠা; ভোটের আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন; পরবর্তী সরকারের জন্য ৩০টি মৌলিক সংস্কার বাধ্যতামূলক করা, যার মধ্যে মেয়াদসীমা নির্ধারণ (টার্ম লিমিট) ও নারীর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর বিষয়ও ছিল; এবং রাজনৈতিক দলগুলো যেন চার্টারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে বাধ্য থাকে, সে জন্য প্রয়োজনীয় কাঠামো তৈরি করা।
শেখ হাসিনার পতনের পর অনুষ্ঠিত প্রথম জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে। দলটির নির্বাচনী প্রচারণার অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার ছিল এসব সংস্কার বাস্তবায়ন। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর থেকেই তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার সংস্কার বাস্তবায়নে ধীরগতি দেখাতে শুরু করে।
সংবিধান অনুযায়ী, নবনির্বাচিত সংসদকে প্রথম ৩০ দিনের মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা সংস্কারবিষয়ক অধ্যাদেশগুলো অনুমোদন বা বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিতে হতো। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোনো সিদ্ধান্ত না হলে অধ্যাদেশগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে অকার্যকর হয়ে যায়। তারেক রহমান প্রশাসন কার্যত সেই মেয়াদই শেষ হতে দেয়।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, সংস্কারগুলো আরও পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে এবং পরে সেগুলো বাস্তবায়ন করা হবে। আইনমন্ত্রী মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান অভিযোগ করেন, কিছু পক্ষ ইচ্ছাকৃতভাবে এমন ধারণা দিচ্ছে যে, সরকার সংস্কারগুলো বাতিল করেছে, অথচ প্রস্তাবগুলোর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির দিকগুলো নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করা হচ্ছে।
তবে সরকারের অবস্থান নিয়ে বিতর্ক আরও তীব্র হয় যখন গত ৩০ এপ্রিল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সংসদে বলেন, সংস্কার বাস্তবায়নের নির্দেশনাটি আইনগতভাবে বৈধ ছিল না। তিনি আরও দাবি করেন, নির্বাচনী সমঝোতার স্বার্থে বিএনপি ‘জুলাই চার্টার’ প্রণয়নের সময় কয়েকটি বিষয়ে আপস করতে বাধ্য হয়েছিল।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সংসদে বলেন, “নির্বাচনকে সামনে রেখে তখন আমরা অনেক বিষয়ে নীরব ছিলাম। সংস্কারের কারণে যেন নির্বাচন বাধাগ্রস্ত না হয়, সে জন্য আমরা আপস করেছি, এমনকি ‘জুলাই চার্টারেও’ স্বাক্ষর করেছি।” তবে এই বক্তব্যের পর বিএনপি সরকার সুশীল সমাজ, আইন বিশেষজ্ঞ এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে। সরকারের ব্যাখ্যায় তারা কেউই আশ্বস্ত হতে পারেননি।

অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্রের দুর্বলতা শনাক্ত করা এবং দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত পরিবর্তনের রূপরেখা তৈরির লক্ষ্যে সংবিধান, নির্বাচন ব্যবস্থা, বিচার বিভাগসহ বিভিন্ন খাতে ১১টি স্বাধীন কমিশন গঠন করেছিল। পাশাপাশি রাজনৈতিক ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে গঠন করা হয় ‘জাতীয় ঐকমত্য কমিশন’। এটি দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোকে একই আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসে। এই প্রক্রিয়ার ফল হিসেবেই ‘জুলাই চার্টার’-এর জন্ম হয়। সনদটিতে নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকানো এবং রাষ্ট্রে স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য গড়ে তোলার নানা প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত ছিল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এসব সংস্কার বাস্তবায়ন না হলে বাংলাদেশ আবারও দমন-পীড়ন ও ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণের পুরোনো চক্রে ফিরে যেতে পারে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরীর ভাষায়, বিএনপি যেন আবারও পুরোনো দলীয় রাজনীতির ধারাতেই ফিরে যাচ্ছে। তিনি হিমাল সাউথএশিয়ানকে বলেন, “২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের কাছ থেকে সংস্কার কর্মসূচি থেকে সরে আসা কেউ প্রত্যাশা করেনি। এটি মানুষের আকাঙ্ক্ষাকে ভেঙে দিয়েছে।”
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের আন্দোলনে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হন এবং আরও হাজার হাজার মানুষ আহত হন। সেই গণঅভ্যুত্থানই শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনাকে ভারতে পালিয়ে যেতে বাধ্য করে এবং আওয়ামী লীগের টানা ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটায়। যারা নির্বাচনী কারচুপি, রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন এবং দীর্ঘদিনের কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছিলেন, তারা বিশ্বাস করেছিলেন বাংলাদেশ এবার এমন এক পথে এগোবে, যেখানে আর কোনো নেতা গণতন্ত্রকে ব্যক্তিশাসনে রূপ দিতে পারবেন না।
এর আগে, আওয়ামী লীগ সরকারও একই ধরনের আইন ব্যবহার করে জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করেছিল। সে সময় মানবাধিকার সংগঠন ও সুশীল সমাজের অনেকেই এই পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেছিলেন এবং একে রাজনৈতিক দমননীতির অংশ হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন।
২০২৬ সালের সন্ত্রাসবিরোধী সংশোধনী আইনটি এমন এক সময়ে পাস হলো, যখন বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছিল যে, তারা কোনো রাজনৈতিক দলকে রাজনীতির বাইরে ঠেলে দেওয়ার নীতিতে বিশ্বাস করে না। নির্বাচনের আগে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর একাধিকবার প্রকাশ্যে বলেছিলেন, বিএনপি কোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার পক্ষে নয়। কিন্তু সংসদে বক্তব্য দিতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ব্যাপক গণআন্দোলনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি হওয়ায় সরকার সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় দলটির ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বর্তমানে নির্বাসনে থাকা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, তারেক রহমান বারবার দাবি করেছিলেন যে বিএনপি বহুদলীয় গণতন্ত্রের ধারক ও বাহক। সেই বক্তব্য জনগণের মধ্যে রাজনৈতিক পরিবর্তনের আশা তৈরি করেছিল। কিন্তু তার মতে, “আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার বিল পাসের মধ্য দিয়ে সেই প্রত্যাশা ভেঙে গেছে।”
সন্ত্রাসবিরোধী আইন পাসের পাশাপাশি বিচার বিভাগ, গুম প্রতিরোধ এবং মানবাধিকার তদারকির মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারগুলো বাস্তবায়নে বিএনপির গড়িমসি রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন সরকারের উদ্দেশ্য নিয়ে গভীর প্রশ্ন তৈরি করেছে। সমালোচকদের প্রশ্ন বিএনপি কি ক্ষমতায় এসে সেই একই রাজনৈতিক ও আইনি কাঠামো পুনঃপ্রতিষ্ঠা করছে, যার বিরুদ্ধে তারা একসময় আন্দোলন করেছিল এবং যার শিকারও হয়েছিল? নাকি তারা সত্যিই নতুন এক গণতান্ত্রিক পথ নির্মাণ করতে চায়?
ছাত্র আন্দোলনের অংশগ্রহণকারী সাইফুল ইসলামের কথায় সেই হতাশার প্রতিফলন স্পষ্ট। তিনি বলেন, “নির্বাচনের আগে বিএনপি সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, গণভোটের পক্ষেও প্রচার চালিয়েছিল। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর মনে হচ্ছে তারা সবকিছু ভুলে গেছে। নির্বাচনের আগের বিএনপি আর এখনকার বিএনপির মধ্যে আমি কোনো মিল খুঁজে পাই না।”
সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, বাংলাদেশ যেন আবার শেখ হাসিনা আমলের ‘নিন্দনীয় চর্চাগুলোর’ পুনরাবৃত্তির দিকে না যায়।
এদিকে, প্রধান ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের মিত্র জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতৃত্বে বিরোধী দলগুলো সারা দেশে বিক্ষোভ চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের দাবি, গণভোটের রায় অনুযায়ী দ্রুত সংস্কার বাস্তবায়ন করতে হবে।
ছাত্রনেতা ও এনসিপির সংসদ সদস্য নাহিদ ইসলাম বলেন, তার দল বৃহত্তর গণআন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তার ভাষায়, “সংস্কার কোনো একক দলের এজেন্ডা নয়; এটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ ও অস্তিত্বের প্রশ্ন।”
২০২৩ সালে, যখন শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় ছিল, তখন বিএনপি রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে একটি ৩১ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে। এতে গণতান্ত্রিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য সংবিধান সংস্কার কমিশন গঠন, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল এবং আইনসভা, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। একইসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর টানা দুই মেয়াদের বেশি ক্ষমতায় থাকার সুযোগ সীমিত করার কথাও বলা হয়েছিল। চলতি বছরের নির্বাচনের আগে বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারা বারবার এসব সংস্কার বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেছিলেন।
বিএনপির ৩১ দফা কর্মসূচির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল বিচার বিভাগের সংস্কার। এতে একটি স্বাধীন বিচার বিভাগীয় কমিশন গঠনের প্রস্তাব করা হয়, যার মাধ্যমে অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলাবিষয়ক ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের অধীনে আনার কথা বলা হয়েছিল। পাশাপাশি আদালতের জন্য পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা এবং বিচারকদের অভিশংসনের জন্য ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল’ পুনর্বহালের লক্ষ্যে সাংবিধানিক সংশোধনের প্রস্তাবও ছিল। এসব উদ্যোগের উদ্দেশ্য ছিল বিচার বিভাগকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও স্বাধীন করা। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর বিএনপির অবস্থানে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখা যায়। গত ৯ এপ্রিল সংসদ অন্তর্বর্তী সরকারের প্রণীত সেই বিধান বাতিল করে, যার মাধ্যমে বিচারকদের নিয়োগ ও বিচার বিভাগের প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য পৃথক সচিবালয় গঠনের কথা ছিল। এর ফলে উচ্চ আদালতে বিচারপতি নিয়োগের ক্ষমতা কার্যত আবারও আইন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণে ফিরে যায়, যা অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কারের আগেও ছিল।
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব এবং প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী বলেন, দলের ৩১ দফা কর্মসূচির প্রতিশ্রুতিগুলো “ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে।”
আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি ছিল গুম বা বলপূর্বক নিখোঁজের ঘটনা। মানবাধিকার সংগঠন ও ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিযোগ, শেখ হাসিনার শাসনামলে বিরোধী দলের নেতা-কর্মী, সমালোচক ও ভিন্নমতাবলম্বীসহ শত শত মানুষ নিখোঁজ হন। এসব ঘটনার তদন্তে অন্তর্বর্তী সরকার একটি কমিশন গঠন করে এবং ২০২৫ সালে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ’ জারি করে।
অধ্যাদেশটিতে গুমকে ‘চলমান অপরাধ’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয় এবং দায়ীদের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়। কিন্তু বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর নির্ধারিত ৩০ দিনের মধ্যে এটি সংসদে উত্থাপন না করায় অধ্যাদেশটির কার্যকারিতা শেষ হয়ে যায়।
মানবাধিকারকর্মী এবং গুম তদন্ত কমিশনের সদস্য নূর খান লিটন বলেন, বিএনপি নিজেও অতীতে গুম ও রাজনৈতিক হত্যার অন্যতম বড় ভুক্তভোগী ছিল। তার ভাষায়, “দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এসব অধ্যাদেশ বাতিল করে তারা যেন আবার পুরোনো রাজনীতির পথেই ফিরে যাচ্ছে।”
এদিকে, বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠ সংসদ জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে শক্তিশালী করার জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের আনা একটি অধ্যাদেশও বাতিল করেছে। ৯ এপ্রিল বিরোধীদের আপত্তি উপেক্ষা করে কণ্ঠভোটে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (বাতিল ও পুনর্বহাল) বিল’ পাস হয়। রাষ্ট্রপতির অনুমোদন ও গেজেট প্রকাশের পর এটি কার্যকর হবে। আইনমন্ত্রী মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, বাতিল হওয়া অধ্যাদেশে বেশ কিছু দুর্বলতা ছিল এবং অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে নতুন আইন প্রণয়ন করা হবে।

এই পরিবর্তনের ফলে মানবাধিকার কমিশন-সংক্রান্ত অন্তর্বর্তী সরকারের তিনটি পৃথক অধ্যাদেশ বাতিল হয়ে যায় এবং ২০০৯ সালের আওয়ামী লীগ আমলের আইন পুনর্বহাল হয়। সমালোচকদের মতে, এই আইন কমিশনকে কার্যত সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করে রেখেছে। বিদ্যমান কাঠামোয় কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য নিয়োগে সরকারের প্রভাবের সুযোগ বেশি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতাও সীমিত। ফলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় কার্যকর ও স্বাধীন তদন্ত পরিচালনার সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়েছে।
বিরোধী দলগুলো সংসদে এ নিয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে সতর্ক করেছে যে, ভবিষ্যতে এই কমিশন আবারও রাজনৈতিক নিপীড়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।
নূর খান লিটনের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে স্বাধীন তদন্তের যে সুযোগ রাখা হয়েছিল, ২০০৯ সালের আইন পুনর্বহালের ফলে তা কার্যত বাতিল হয়ে গেছে। এখন এ ধরনের তদন্ত চালাতে সরকারের অনুমতি প্রয়োজন হবে। তার ভাষায়, “সরকার নিজের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত করতে এসব আইন বাতিল করছে।”
বিএনপির এই অবস্থানে দলের ভেতরেও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। এপ্রিলের শুরুতে মানবাধিকার সুরক্ষা ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে রাজনৈতিক বিশ্লেষক সাখাওয়াত হোসেন সায়ন্ত বলেন, “আমি ব্যক্তিগতভাবে বিএনপিকে সমর্থন করি, কিন্তু বর্তমান সরকারের পদক্ষেপগুলোকে সমর্থন করার মতো শক্ত কোনো যুক্তি খুঁজে পাচ্ছি না।”
ঢাকায় আরেকটি অনুষ্ঠানে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও বন ও পরিবেশমন্ত্রী আব্দুল আউয়াল মিন্টু সতর্ক করে বলেন, প্রতিশ্রুত সংস্কারের মাধ্যমে যদি রাজনীতি ও অর্থনীতিতে বাস্তব পরিবর্তন না আসে, তাহলে ‘জেন জি’ তরুণরা আবারও গণঅভ্যুত্থানে নামতে পারে।