ভেনেজুয়েলায় অবৈধ ক্যু, এরপর কোথায়?

সিমন টিসডাল
সিমন টিসডাল
ভেনেজুয়েলায় অবৈধ ক্যু, এরপর কোথায়?
গ্রেপ্তারের পর নিকোলাস মাদুরো। ছবি: সংগৃহীত

আমেরিকার সামরিক বাহিনীর হাতে ভেনেজুয়েলার কট্টর সমাজতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর ক্ষমতাচ্যুতি ও আটক বিশ্বজুড়ে আতঙ্ক, উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার সৃষ্টি করেছে। এই অভ্যুত্থান অবৈধ, উসকানিবিহীন এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার জন্য মারাত্মকভাবে বিপজ্জনক।

এই অভিযান আন্তর্জাতিক রীতিনীতি ও নিয়মকানুনকে কার্যত উল্টে দিয়েছে, সার্বভৌম ভূখণ্ডের অধিকার উপেক্ষা করা হয়েছে এবং ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরেই এক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির জন্ম দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে।

এই বিশৃঙ্খলাই যেন এখন নীতিতে পরিণত হয়েছে। এই নীতি এগিয়েছে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাত ধরে। ভেনেজুয়েলার ওপর সরাসরি এই হামলা আমেরিকার লাগামহীন ক্ষমতার এক ভয়ংকর প্রদর্শন। একদিকে ট্রাম্প ভেনেজুয়েলাতে হামলা চালালেন, অন্যদিকে ইরানকেও হুমকি দিয়ে চলেছেন।

এর আগে মাদুরোর ওপর মাসের পর মাস ধরে সামরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ বাড়িয়েছে আমেরিকা। এমনকি মাদক পাচার করা হচ্ছে, এই অভিযোগে ক্যারিবীয় অঞ্চলে নৌযানে প্রাণঘাতী হামলাও চালানো হয়েছে।

ট্রাম্পের দাবি, ভেনেজুয়েলা হয়ে আমেরিকায় অবৈধ মাদক প্রবেশ ঠেকানো এবং তথাকথিত ‘অপরাধী’ অভিবাসীদের আসা বন্ধ করতেই তিনি এ পদক্ষেপ নিচ্ছেন। তবে ২০০৩ সালে ইরাকে চালানো আগ্রাসনের মতোই এবারও অভিযোগ উঠেছে— ভেনেজুয়েলার বিপুল তেল ও গ্যাস সম্পদের প্রতি তার লোভই এই অভিযানের কারণ। এই সন্দেহ আরও জোরালো হয়েছে ভেনেজুয়েলার তেলবাহী জাহাজ বারবার অবৈধভাবে জব্দ করার ঘটনায়।

তবে ট্রাম্পের মূল আগ্রহের জায়গা সম্ভবত মাদুরোর সঙ্গে ব্যক্তিগত শত্রুতা এবং উনিশ শতকের মনরো ডকট্রিনকে পুনরুজ্জীবিত করে পশ্চিম গোলার্ধে আমেরিকার প্রভাব ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠার বাসনা।

কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোসহ সম্প্রতি ট্রাম্পের বিরোধ দেখা গেছে, এমন অনেক আঞ্চলিক নেতা এই ক্যু নিয়ে ক্ষোভ ও শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তাদের আশঙ্কা, ওয়াশিংটনের এই আগ্রাসী নতুন আধিপত্যবাদে তারাও একদিন নিশানা হয়ে উঠতে পারেন।

আমেরিকার হামলায় কারাকাসে ক্ষতিগ্রস্থ একটি যুদ্ধযান। ছবি: রয়টার্স
আমেরিকার হামলায় কারাকাসে ক্ষতিগ্রস্থ একটি যুদ্ধযান। ছবি: রয়টার্স

কিউবার বামপন্থী সরকারের উদ্বেগের কারণ আরও গভীর। কারণ তারা সস্তা জ্বালানি ও রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সহায়তার জন্য ব্যাপকভাবে ভেনেজুয়েলার ওপর নির্ভরশীল।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও প্রকাশ্যেই হাভানায় সরকার পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছেন। পানামাতেও উদ্বেগ তীব্র। পানামা খালের নিয়ন্ত্রণ ইস্যুতে ট্রাম্প আগেও সেখানে সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকি দিয়েছিলেন। মাদুরোর এই আটক অনেককেই মনে করিয়ে দিচ্ছে ১৯৮৯ সালে পানামায় আমেরিকার আগ্রাসন এবং তৎকালীন শাসক ম্যানুয়েল নোরিয়েগার পতন ও গ্রেপ্তারের ঘটনা।

বিশ্বজুড়ে কর্তৃত্ববাদী ও গণতন্ত্রবিরোধী শাসনগুলো যেমন ট্রাম্পের পরবর্তী পদক্ষেপ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে, ঠিক তেমনি ওয়াশিংটনের গণতান্ত্রিক মিত্ররাও করছে।

ইরান এই অভ্যুত্থানের নিন্দা জানিয়েছে এবং তা করার যথেষ্ট কারণ তাদের রয়েছে। তবে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন হয়তো তার ভেনেজুয়েলান মিত্রের পতনে পুরোপুরি অসন্তুষ্ট নন।

ট্রাম্পের এই উসকানিবিহীন সহিংসতা ইউক্রেনে পুতিনের আগ্রাসনের থেকে খুব একটা আলাদা নয়। দুজনই প্রতিবেশী রাষ্ট্রে অবৈধ হামলা চালিয়ে তাদের নেতৃত্ব উৎখাতের চেষ্টা করেছেন।

এদিকে, চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সামরিক বাহিনী গত সপ্তাহেই তাইওয়ানের ‘বিচ্ছিন্নতাবাদীদের’ বিরুদ্ধে সামরিক মহড়া চালিয়েছে। তাদের জন্য ট্রাম্প এক বিপজ্জনক নজির স্থাপন করলেন। সি চিন পিং’ও একদিন এটি অনুসরণ করতে পারেন।

ট্রাম্পের এই অভ্যুত্থান ব্রিটেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও পশ্চিমা গণতন্ত্রগুলোর জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়। এর নিঃশর্ত নিন্দা করা এই দেশগুলোর কর্তব্য। ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ তাদের সমর্থিত আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলার নিয়ম ও নীতিকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানায়।

ভেনিজুয়েলায় আমেরিকার হামলা। ছবি: ফেসবুক
ভেনিজুয়েলায় আমেরিকার হামলা। ছবি: ফেসবুক

আমেরিকা আবারও জাতিসংঘ ও আন্তঃরাষ্ট্রীয় বিরোধ নিষ্পত্তির প্রচলিত পথ উপেক্ষা করেছে এবং ভেনেজুয়েলায় পরবর্তী পরিস্থিতি কী হবে, তা নিয়ে কোনো চিন্তা করেনি বললেই চলে।

কারাকাসের সরকারের কার্যত শিরশ্ছেদ হয়েছে, তবে শাসন কাঠামোর অন্য শীর্ষ ব্যক্তিরা এখনো বহাল রয়েছেন। তারা প্রতিরোধের ডাক দিচ্ছেন, এমনকি আমেরিকার বিরুদ্ধে প্রতিশোধের কথাও বলছেন। বেসামরিক হতাহতের খবর রয়েছে, যদিও তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

যদি ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হয়, তবে আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে, গৃহযুদ্ধ বা সামরিক অভ্যুত্থানের আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আর আমেরিকার সর্বশেষ সামরিক অভিযান এখানেই শেষ, নাকি আরও বিস্তৃত হবে—তাও স্পষ্ট নয়।

২০২৫ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী নির্বাসিত বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদোর মতো ব্যক্তিরা দ্রুত ফিরে এসে পূর্ণ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করবেন—এমন ধারণা নিতান্তই সরলতা। সামনের দিনগুলো হবে অত্যন্ত সংকটপূর্ণ। আর এর দায় পুরোপুরি ট্রাম্পের কাঁধেই।

ট্রাম্পের এই বেপরোয়া পদক্ষেপের পর তার নিজেকে ‘বিশ্ব শান্তির দূত’ হিসেবে তুলে ধরার বিভ্রান্তিকর দাবির অবসান ঘটানো উচিত। কিয়ার স্টারমার ও অন্যান্য ইউরোপীয় নেতাদের এখনই প্রকাশ্যে তাকে তার প্রকৃত পরিচয়ে চিহ্নিত করা দরকার। তিনি বিশ্ব শান্তির দূত নন, বরং একজন বৈশ্বিক যুদ্ধবাজ, সবার জন্য হুমকি।

রাশিয়া-ইউক্রেন বা ইসরায়েল-ফিলিস্তিনের মতো সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে তিনি যখনই হঠকারীভাবে ঢুকে সময়সীমা বেঁধে দেন, হুমকি ছুড়ে দেন, পক্ষ বেছে নেন এবং দুর্ভোগকে একপ্রকার পণ্যে পরিণত করেন, তখন ন্যায় ও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা আরও পিছিয়ে যায়। তার হস্তক্ষেপে শান্তি অধরাই থেকে যায়।

বিস্ময়করভাবে, নিজেকে ‘নিরপেক্ষ’, ‘শান্তিকামী’ ও ‘হস্তক্ষেপবাদী’ নন বলে উপস্থাপন করলেও ট্রাম্প একই সঙ্গে সারা বিশ্বের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন। জরিপ বলছে, গত বছর মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকায় আমেরিকা রেকর্ডসংখ্যক বিমান হামলা চালিয়েছে।

স্ত্রীর সঙ্গে মাদুরো। ছবি: এপিএর সৌজন্যে
স্ত্রীর সঙ্গে মাদুরো। ছবি: এপিএর সৌজন্যে

এক বছর আগে ক্ষমতায় ফিরে আসার পর তথাকথিত শান্তিপ্রিয় ট্রাম্প ইয়েমেনে বোমা ফেলেছেন, যেখানে অসংখ্য বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছে। এরপর নাইজেরিয়ায় বোমাবর্ষণ করেছেন, যার ফল হয়েছে উল্টো। সোমালিয়া, ইরাক ও সিরিয়ায় হামলা চালিয়েছেন, এমনকি ইরানেও বোমা ফেলেছেন। সেখানে আবার তিনি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার সাফল্য সম্পর্কে মিথ্যা বাড়াবাড়ি করেছেন। এমনকি ন্যাটোভুক্ত মিত্র ডেনমার্কের সার্বভৌম ভূখণ্ড গ্রিনল্যান্ডে বোমা মারার আশঙ্কাও তিনি নাকচ করেননি।

ট্রাম্পের মাথার ভেতরে আসলে কী চলছে? এর একটি সহজ ব্যাখ্যা হতে পারে—যুদ্ধ ও শান্তির প্রশ্নে তিনি আদৌ জানেন না, তিনি কী করছেন। তার কোনো কৌশল নেই, কোনো দিশা নেই, মনের অবস্থার ওপর ভর করে নীতি বানাচ্ছেন।

আরেকটি ভয়াবহ ব্যাখ্যা হলো—তিনি সবই জানেন এবং সামনে আরও খারাপ কিছু অপেক্ষা করছে। দ্বিতীয় মেয়াদে এসে ঘরোয়া রাজনীতিতে পথ ফুরিয়ে যাওয়া আগের প্রেসিডেন্টদের মতোই ট্রাম্প বিশ্বমঞ্চে ক্ষমতা ও অহং প্রদর্শনের বড় সুযোগ দেখছেন। তিনি রক্তে লেখা এক উত্তরাধিকার গড়ছেন।

ট্রাম্পের দায়িত্বজ্ঞানহীন ও বিপজ্জনকভাবে অস্থির আচরণ দিন দিন আরও খারাপ হচ্ছে। ভেনেজুয়েলায় তার এই ‘সাফল্য’ তাকে আরও বড়, আরও বেপরোয়া আগ্রাসনে উৎসাহিত করতে পারে। রোমের বীর মার্ক এন্টনির মতো যুদ্ধপোশাক ও প্রজ্ঞা বাদ দিয়ে ট্রাম্পের ভূমিকাও মূলত তার বিখ্যাত সেই লুটপাট ও ধ্বংসযজ্ঞের অনুমতি দেওয়ার সংকেতের মতো। সেটি হলো—“সর্বনাশ বলে চিৎকার করে ওঠো, আর যুদ্ধের কুকুরদের ছেড়ে দাও!”

লেখক: সিমন টিসডাল, ব্রিটিশ গণমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট

অনুবাদ করেছেন: কেয়া সরকার

সম্পর্কিত