দ্য ডিপ্লোম্যাটের নিবন্ধ
সুধা রামাচন্দ্রন

ভারতের সীমান্ত ব্যবস্থাপনা কৌশল শিগগিরই একটি অপ্রচলিত, এমনকি বিতর্কিত ও আত্মঘাতী মোড় নিতে পারে। অনুপ্রবেশ ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ঠেকাতে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের নদীমাতৃক এলাকাগুলোতে বিষধর সাপ এবং কুমির ছাড়ার একটি পরিকল্পনা নিয়ে কর্মকর্তারা চিন্তাভাবনা করছেন।
গত ২৬শে মার্চ এক অভ্যন্তরীণ বার্তায় ভারতের সীমান্ত রক্ষা বাহিনীর (বিএসএফ) সদর দপ্তর থেকে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের ফিল্ড ইউনিটগুলোর কর্মকর্তাদের কাছে একটি নির্দেশ পাঠানো হয়েছে। এতে সীমান্তের যেসব দুর্গম নদীমাতৃক এলাকায় বেড়া দেওয়া সম্ভব হয়নি, সেখানে অপারেশনাল দৃষ্টিকোণ থেকে সরীসৃপ (যেমন সাপ বা কুমির) মোতায়েনের সম্ভাব্যতা যাচাই করতে বলা হয়েছে।
দ্য হিন্দুর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সরীসৃপ ব্যবহারের বিষয়টি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের নির্দেশনার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ।
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে যা সমতল ভূমি, পাহাড়, জঙ্গল এবং নদীর মধ্য দিয়ে গেছে। ভারত এই সীমান্তের একটি বড় অংশে বেড়া দিয়েছে। তবে ৮৫০ কিলোমিটার সীমান্ত এখনো বেড়া বিহীন, যার মধ্যে ১৭৫ কিলোমিটার এলাকা নদী ও জলাভূমি হওয়ায় বেড়া দেওয়ার অনুপযুক্ত বলে বিবেচিত।
বাংলাদেশি অভিবাসন ভারতের জন্য দুই দেশের মধ্যে একটি অত্যন্ত বিতর্কিত বিষয়। এই অভিবাসনের ফলে সৃষ্ট জনতাত্ত্বিক পরিবর্তন ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামে একটি শক্তিশালী বিদেশি বিরোধী আন্দোলন এবং সশস্ত্র বিদ্রোহের জন্ম দিয়েছিল। এর চূড়ান্ত পরিণতি ছিল ১৯৮৫ সালের আসাম চুক্তি।
এই চুক্তিতে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, উপযুক্ত স্থানে দেয়াল, কাঁটাতারের বেড়া এবং অন্যান্য প্রতিবন্ধকতা তৈরির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সীমান্তকে ভবিষ্যতের অনুপ্রবেশ থেকে সুরক্ষিত করা হবে। সীমান্ত রক্ষা বাহিনীর মাধ্যমে স্থল ও নদীপথে টহল পর্যাপ্ত পরিমাণে জোরদার করা হবে।
পরের বছর থেকেই ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে বেড়া দেওয়ার কাজ শুরু হয়। তবে এই নির্মাণ কাজ অত্যন্ত ধীরগতিতে এগিয়েছে। শুধু দুর্গম ভূপ্রকৃতির কারণেই নয়, বরং দ্য ডিপ্লোম্যাট-এর রাজীব ভট্টাচার্য ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে একটি নিবন্ধে উল্লেখ করেছেন যে, সীমান্ত নির্মাণের জন্য ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়াও বেশ চ্যালেঞ্জিং ছিল। কিছু জায়গায় গ্রামগুলো আন্তর্জাতিক সীমান্তের শূন্য রেখা (জিরো লাইন) পর্যন্ত বিস্তৃত, ফলে বাসিন্দাদের তাদের জমি ছাড়তে রাজি করানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

সীমান্তে বেড়া দেওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকেও তীব্র বিরোধিতার সম্মুখীন হয়েছে। বাংলাদেশ দাবি করে যে, ১৯৭৫ সালের ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত কর্তৃপক্ষের নির্দেশিকা অনুযায়ী আন্তর্জাতিক সীমান্তের শূন্য রেখার ১৫০ গজের মধ্যে কোনো প্রতিরক্ষা কাঠামো নির্মাণ করা নিষিদ্ধ। ভারত অবশ্য দাবি করে যে, তাদের এক সারির বেড়া কোনো প্রতিরক্ষামূলক কাঠামো নয়।
বিএসএফ এবং বর্ডার গার্ডস বাংলাদেশের (বিজিবি) মধ্যে মাঝেমধ্যেই উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়, যার প্রতিফলন দেখা যায় সীমান্ত সংঘাতের মাধ্যমে। বেসামরিক নাগরিকরা প্রায়ই এই গুলি বিনিময়ের শিকার হন। অবৈধভাবে সীমান্ত পার হওয়ার চেষ্টাকারী বাংলাদেশি নাগরিকদের ওপর বিএসএফ-এর দেখামাত্র গুলি করার নীতি কয়েক দশক ধরে একটি উত্তপ্ত ইস্যু হয়ে আছে। ২০১১ সালে ১৫ বছর বয়সী কিশোরী ফেলানি খাতুনের নৃশংস হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশে ভারত-বিরোধী মনোভাবে এক বড় প্রভাব ফেলে। এই কিশোরী বিএসএফের গুলিতে নিহত হওয়ার পর তাকে সীমান্তের কাঁটাতারে ঝুলিয়ে রাখা হয়।
ভারত যদি সীমান্তে জলাভূমিগুলোতে বিষধর সাপ ও কুমির ছেড়ে দেয়, তবে সীমান্তে এই ধরনের বা এর চেয়েও ভয়াবহ ঘটনা ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। কেবল অবৈধ অভিবাসীই নয়, সীমান্তের উভয় পাশে বসবাসকারী গ্রামবাসীরাও এর ফলে প্রাণ হারাবেন, কারণ এগুলো অত্যন্ত জনবহুল এলাকা। এমনকি নিরাপত্তা বাহিনীও এর থেকে নিরাপদ থাকবে না।
সীমান্তে কাঁটাতার অথবা বেড়া অভিবাসন পুরোপুরি বন্ধ করতে পারে না। তাহলে কেন সরকারগুলো, বিশেষ করে জাতীয়তাবাদী এবং অভিবাসীবিরোধী সরকারগুলো সীমান্তে কঠোর সামরিকায়িত বেড়া দেওয়ার বিষয়ে এত আগ্রহী?
শরণার্থীবিষয়ক বই ‘ভায়োলেন্ট বর্ডারস: রিফিউজিস অ্যান্ড দ্য রাইট টু মুভ’-এর লেখক রিস জোনস ২০১৭ সালে আমাকে বলেছিলেন যে, সীমান্তের বেড়া হলো জাতীয়তাবাদী প্রতীক এবং এটি অন্য একটি জনগোষ্ঠীকে বাদ দেওয়ার ধারণার প্রতিনিধিত্ব করে।
ভারতের ক্ষমতাসীন হিন্দু জাতীয়তাবাদী ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নেতারা মুসলিমদের বাদ দিতে পছন্দ করেন এবং প্রায়শই তাদের বক্তৃতায় বাংলাদেশি মুসলিমদের লক্ষ্যবস্তু করেন। তাদের অনুপ্রবেশকারী হিসেবে অভিহিত করে খুঁজে বের করে বের করে দেওয়ার কথা বলেন। এমনকি অমিত শাহ বাংলাদেশি অভিবাসীদের উইপোকার সঙ্গে তুলনা করেছিলেন।
বিজেপি নেতারা প্রায়শই ‘বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মিঞা মুসলিমদের’ স্থানীয় জনসংখ্যাকে ছাড়িয়ে যাওয়ার ভয় দেখিয়ে রাজনীতি করেন। এটি এমন একটি কৌশল যা আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা বারবার জনগণকে মেরুকরণ করতে ব্যবহার করেছেন।
বাংলাদেশি মুসলিমদের এই ভীতি কেবল বিজেপি নেতাদের নির্বাচনী বক্তৃতায় নয়, বরং কেন্দ্র ও আসামের মতো রাজ্যগুলোতে বিজেপি সরকারের নীতিতেও প্রতিফলিত হয়। যেখানে পর্যাপ্ত নাগরিকত্বের নথিপত্র নেই এমন ব্যক্তিদের (যার মধ্যে ভারতীয় মুসলিমরাও রয়েছেন) বাংলাদেশে পুশ ব্যাক বা ফেরত পাঠানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
যদিও কেন্দ্রে কংগ্রেস ও বিজেপি উভয় সরকারই অবৈধ অভিবাসী ও অপরাধীদের ঠেকাতে সীমান্তে বেড়া দেওয়ার কাজ হাতে নিয়েছে, তবে বিজেপি এটি অনেক বেশি আগ্রাসীভাবে করছে। কারণ হিন্দু আধিপত্যবাদীদের শত্রু তৈরির বয়ানে বাংলাদেশি মুসলিমরা একটি মূল জায়গা দখল করে আছে।

এই প্রেক্ষাপটেই বাংলাদেশি মুসলিমদের ঠেকাতে কুমির ও সাপ মোতায়েনের অমিত শাহের প্রস্তাবটিকে দেখতে হবে। ২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের অবনতি ঘটে। পরবর্তী ১৮ মাসে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অবনতির পাশাপাশি বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মনোভাব অভূতপূর্বভাবে বৃদ্ধি পায়।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ঢাকায় নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরই কেবল দুই পক্ষ সম্পর্ক স্বাভাবিকের কাজ শুরু করেছে। গত সপ্তাহে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দিল্লি সফর করেছেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও শিগগিরই ভারত সফর করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। দুই দেশের কূটনৈতিক কর্মকর্তারা সম্পর্কোন্নয়নের জন্য ছোট ছোট পদক্ষেপ নিচ্ছেন।
সম্পর্কোন্নয়নের এই প্রচেষ্টার মধ্যেই ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই প্রাণঘাতী মোতায়েন পরিকল্পনার খবর এল।
তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন একবার পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিনা রব্বানি খারের উপস্থিতিতে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, ‘‘আপনি আপনার বাড়ির আঙিনায় সাপ পুষে এই আশা করতে পারেন না যে, তারা কেবল আপনার প্রতিবেশীদেরই কামড়াবে।’’ তিনি আরও যোগ করেছিলেন যে, ‘‘শেষ পর্যন্ত সেই সাপগুলো তাদের দিকেই ফিরে আসবে যারা তাদের আঙিনায় পুষেছে।’’
ক্লিনটনের এই মন্তব্যটি ছিল পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের সন্ত্রাসীদের লালন-পালন করার নীতির প্রেক্ষিতে, যা তারা প্রতিবেশীদের বিরুদ্ধে তাদের পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়নে ব্যবহার করত।
অমিত শাহ ক্লিনটনের এই মন্তব্যটি মাথায় রাখলে ভালো করবেন। তিনি সীমান্তে যে কুমির মোতায়েন করার পরিকল্পনা করছেন, তা যদি বাস্তবায়িত হয়, তবে সেগুলো বাংলাদেশি ও ভারতীয়দের মধ্যে পার্থক্য করার সম্ভাবনা কম। তার এই পরিকল্পনা ভারতের ভূখণ্ড বা নাগরিকদের সুরক্ষিত করার সম্ভাবনা ক্ষীণ। এটি বিপর্যয়কর ছাড়া আর কিছুই নয়।
লেখক: ‘দ্য ডিপ্লোম্যাট’–এর দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সম্পাদক

ভারতের সীমান্ত ব্যবস্থাপনা কৌশল শিগগিরই একটি অপ্রচলিত, এমনকি বিতর্কিত ও আত্মঘাতী মোড় নিতে পারে। অনুপ্রবেশ ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ঠেকাতে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের নদীমাতৃক এলাকাগুলোতে বিষধর সাপ এবং কুমির ছাড়ার একটি পরিকল্পনা নিয়ে কর্মকর্তারা চিন্তাভাবনা করছেন।
গত ২৬শে মার্চ এক অভ্যন্তরীণ বার্তায় ভারতের সীমান্ত রক্ষা বাহিনীর (বিএসএফ) সদর দপ্তর থেকে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের ফিল্ড ইউনিটগুলোর কর্মকর্তাদের কাছে একটি নির্দেশ পাঠানো হয়েছে। এতে সীমান্তের যেসব দুর্গম নদীমাতৃক এলাকায় বেড়া দেওয়া সম্ভব হয়নি, সেখানে অপারেশনাল দৃষ্টিকোণ থেকে সরীসৃপ (যেমন সাপ বা কুমির) মোতায়েনের সম্ভাব্যতা যাচাই করতে বলা হয়েছে।
দ্য হিন্দুর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সরীসৃপ ব্যবহারের বিষয়টি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের নির্দেশনার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ।
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে যা সমতল ভূমি, পাহাড়, জঙ্গল এবং নদীর মধ্য দিয়ে গেছে। ভারত এই সীমান্তের একটি বড় অংশে বেড়া দিয়েছে। তবে ৮৫০ কিলোমিটার সীমান্ত এখনো বেড়া বিহীন, যার মধ্যে ১৭৫ কিলোমিটার এলাকা নদী ও জলাভূমি হওয়ায় বেড়া দেওয়ার অনুপযুক্ত বলে বিবেচিত।
বাংলাদেশি অভিবাসন ভারতের জন্য দুই দেশের মধ্যে একটি অত্যন্ত বিতর্কিত বিষয়। এই অভিবাসনের ফলে সৃষ্ট জনতাত্ত্বিক পরিবর্তন ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামে একটি শক্তিশালী বিদেশি বিরোধী আন্দোলন এবং সশস্ত্র বিদ্রোহের জন্ম দিয়েছিল। এর চূড়ান্ত পরিণতি ছিল ১৯৮৫ সালের আসাম চুক্তি।
এই চুক্তিতে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, উপযুক্ত স্থানে দেয়াল, কাঁটাতারের বেড়া এবং অন্যান্য প্রতিবন্ধকতা তৈরির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সীমান্তকে ভবিষ্যতের অনুপ্রবেশ থেকে সুরক্ষিত করা হবে। সীমান্ত রক্ষা বাহিনীর মাধ্যমে স্থল ও নদীপথে টহল পর্যাপ্ত পরিমাণে জোরদার করা হবে।
পরের বছর থেকেই ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে বেড়া দেওয়ার কাজ শুরু হয়। তবে এই নির্মাণ কাজ অত্যন্ত ধীরগতিতে এগিয়েছে। শুধু দুর্গম ভূপ্রকৃতির কারণেই নয়, বরং দ্য ডিপ্লোম্যাট-এর রাজীব ভট্টাচার্য ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে একটি নিবন্ধে উল্লেখ করেছেন যে, সীমান্ত নির্মাণের জন্য ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়াও বেশ চ্যালেঞ্জিং ছিল। কিছু জায়গায় গ্রামগুলো আন্তর্জাতিক সীমান্তের শূন্য রেখা (জিরো লাইন) পর্যন্ত বিস্তৃত, ফলে বাসিন্দাদের তাদের জমি ছাড়তে রাজি করানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

সীমান্তে বেড়া দেওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকেও তীব্র বিরোধিতার সম্মুখীন হয়েছে। বাংলাদেশ দাবি করে যে, ১৯৭৫ সালের ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত কর্তৃপক্ষের নির্দেশিকা অনুযায়ী আন্তর্জাতিক সীমান্তের শূন্য রেখার ১৫০ গজের মধ্যে কোনো প্রতিরক্ষা কাঠামো নির্মাণ করা নিষিদ্ধ। ভারত অবশ্য দাবি করে যে, তাদের এক সারির বেড়া কোনো প্রতিরক্ষামূলক কাঠামো নয়।
বিএসএফ এবং বর্ডার গার্ডস বাংলাদেশের (বিজিবি) মধ্যে মাঝেমধ্যেই উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়, যার প্রতিফলন দেখা যায় সীমান্ত সংঘাতের মাধ্যমে। বেসামরিক নাগরিকরা প্রায়ই এই গুলি বিনিময়ের শিকার হন। অবৈধভাবে সীমান্ত পার হওয়ার চেষ্টাকারী বাংলাদেশি নাগরিকদের ওপর বিএসএফ-এর দেখামাত্র গুলি করার নীতি কয়েক দশক ধরে একটি উত্তপ্ত ইস্যু হয়ে আছে। ২০১১ সালে ১৫ বছর বয়সী কিশোরী ফেলানি খাতুনের নৃশংস হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশে ভারত-বিরোধী মনোভাবে এক বড় প্রভাব ফেলে। এই কিশোরী বিএসএফের গুলিতে নিহত হওয়ার পর তাকে সীমান্তের কাঁটাতারে ঝুলিয়ে রাখা হয়।
ভারত যদি সীমান্তে জলাভূমিগুলোতে বিষধর সাপ ও কুমির ছেড়ে দেয়, তবে সীমান্তে এই ধরনের বা এর চেয়েও ভয়াবহ ঘটনা ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। কেবল অবৈধ অভিবাসীই নয়, সীমান্তের উভয় পাশে বসবাসকারী গ্রামবাসীরাও এর ফলে প্রাণ হারাবেন, কারণ এগুলো অত্যন্ত জনবহুল এলাকা। এমনকি নিরাপত্তা বাহিনীও এর থেকে নিরাপদ থাকবে না।
সীমান্তে কাঁটাতার অথবা বেড়া অভিবাসন পুরোপুরি বন্ধ করতে পারে না। তাহলে কেন সরকারগুলো, বিশেষ করে জাতীয়তাবাদী এবং অভিবাসীবিরোধী সরকারগুলো সীমান্তে কঠোর সামরিকায়িত বেড়া দেওয়ার বিষয়ে এত আগ্রহী?
শরণার্থীবিষয়ক বই ‘ভায়োলেন্ট বর্ডারস: রিফিউজিস অ্যান্ড দ্য রাইট টু মুভ’-এর লেখক রিস জোনস ২০১৭ সালে আমাকে বলেছিলেন যে, সীমান্তের বেড়া হলো জাতীয়তাবাদী প্রতীক এবং এটি অন্য একটি জনগোষ্ঠীকে বাদ দেওয়ার ধারণার প্রতিনিধিত্ব করে।
ভারতের ক্ষমতাসীন হিন্দু জাতীয়তাবাদী ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নেতারা মুসলিমদের বাদ দিতে পছন্দ করেন এবং প্রায়শই তাদের বক্তৃতায় বাংলাদেশি মুসলিমদের লক্ষ্যবস্তু করেন। তাদের অনুপ্রবেশকারী হিসেবে অভিহিত করে খুঁজে বের করে বের করে দেওয়ার কথা বলেন। এমনকি অমিত শাহ বাংলাদেশি অভিবাসীদের উইপোকার সঙ্গে তুলনা করেছিলেন।
বিজেপি নেতারা প্রায়শই ‘বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মিঞা মুসলিমদের’ স্থানীয় জনসংখ্যাকে ছাড়িয়ে যাওয়ার ভয় দেখিয়ে রাজনীতি করেন। এটি এমন একটি কৌশল যা আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা বারবার জনগণকে মেরুকরণ করতে ব্যবহার করেছেন।
বাংলাদেশি মুসলিমদের এই ভীতি কেবল বিজেপি নেতাদের নির্বাচনী বক্তৃতায় নয়, বরং কেন্দ্র ও আসামের মতো রাজ্যগুলোতে বিজেপি সরকারের নীতিতেও প্রতিফলিত হয়। যেখানে পর্যাপ্ত নাগরিকত্বের নথিপত্র নেই এমন ব্যক্তিদের (যার মধ্যে ভারতীয় মুসলিমরাও রয়েছেন) বাংলাদেশে পুশ ব্যাক বা ফেরত পাঠানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
যদিও কেন্দ্রে কংগ্রেস ও বিজেপি উভয় সরকারই অবৈধ অভিবাসী ও অপরাধীদের ঠেকাতে সীমান্তে বেড়া দেওয়ার কাজ হাতে নিয়েছে, তবে বিজেপি এটি অনেক বেশি আগ্রাসীভাবে করছে। কারণ হিন্দু আধিপত্যবাদীদের শত্রু তৈরির বয়ানে বাংলাদেশি মুসলিমরা একটি মূল জায়গা দখল করে আছে।

এই প্রেক্ষাপটেই বাংলাদেশি মুসলিমদের ঠেকাতে কুমির ও সাপ মোতায়েনের অমিত শাহের প্রস্তাবটিকে দেখতে হবে। ২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের অবনতি ঘটে। পরবর্তী ১৮ মাসে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অবনতির পাশাপাশি বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মনোভাব অভূতপূর্বভাবে বৃদ্ধি পায়।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ঢাকায় নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরই কেবল দুই পক্ষ সম্পর্ক স্বাভাবিকের কাজ শুরু করেছে। গত সপ্তাহে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দিল্লি সফর করেছেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও শিগগিরই ভারত সফর করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। দুই দেশের কূটনৈতিক কর্মকর্তারা সম্পর্কোন্নয়নের জন্য ছোট ছোট পদক্ষেপ নিচ্ছেন।
সম্পর্কোন্নয়নের এই প্রচেষ্টার মধ্যেই ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই প্রাণঘাতী মোতায়েন পরিকল্পনার খবর এল।
তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন একবার পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিনা রব্বানি খারের উপস্থিতিতে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, ‘‘আপনি আপনার বাড়ির আঙিনায় সাপ পুষে এই আশা করতে পারেন না যে, তারা কেবল আপনার প্রতিবেশীদেরই কামড়াবে।’’ তিনি আরও যোগ করেছিলেন যে, ‘‘শেষ পর্যন্ত সেই সাপগুলো তাদের দিকেই ফিরে আসবে যারা তাদের আঙিনায় পুষেছে।’’
ক্লিনটনের এই মন্তব্যটি ছিল পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের সন্ত্রাসীদের লালন-পালন করার নীতির প্রেক্ষিতে, যা তারা প্রতিবেশীদের বিরুদ্ধে তাদের পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়নে ব্যবহার করত।
অমিত শাহ ক্লিনটনের এই মন্তব্যটি মাথায় রাখলে ভালো করবেন। তিনি সীমান্তে যে কুমির মোতায়েন করার পরিকল্পনা করছেন, তা যদি বাস্তবায়িত হয়, তবে সেগুলো বাংলাদেশি ও ভারতীয়দের মধ্যে পার্থক্য করার সম্ভাবনা কম। তার এই পরিকল্পনা ভারতের ভূখণ্ড বা নাগরিকদের সুরক্ষিত করার সম্ভাবনা ক্ষীণ। এটি বিপর্যয়কর ছাড়া আর কিছুই নয়।
লেখক: ‘দ্য ডিপ্লোম্যাট’–এর দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সম্পাদক