চিররঞ্জন সরকার

দুনিয়াটা সত্যিই এক রঙ্গমঞ্চ। এক পাগল যখন আরেক পাগলকে বলে, “তুই তো একটা মহা পাগল!” তখন হেসে গড়িয়ে পড়া ছাড়া উপায় থাকে না।
আসলে ‘পাগল’ বা ‘ক্ষ্যাপা’ শব্দটা আমরা কতভাবেই না ব্যবহার করি। কারও মাথায় একটু সমস্যা থাকলে তাকেও পাগল বলি, আবার কেউ সাধারণ মানুষের চেয়ে বেশি বুঝলেও তাকে পাগল বলি। অনেকে তো ভালোবেসেও এই নামে ডাকে। এক সময় লোককবিদের মধ্যে এই নাম নেওয়ার একটা ট্রেন্ড ছিল। যেমন ধরেন পাগলা কানাই, কিংবা টিপু পাগলা-যিনি ইংরেজদের বিরুদ্ধে আন্দোলনই করে বসলেন। লালন সাঁই গেয়েছিলেন ‘তিন পাগলে হলো মেলা’, আর হাসন রাজা তো নিজেই নিজেকে পাগল ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু তাদের ‘পাগল’ কথার আসল রহস্য আমরা কজনই বা বুঝি?
এই শব্দের রয়েছে নানান মানে। মা যখন আদর করে বলেন, “পাগল ছেলে, তোর ওপর রাগ করতে পারি?” তখন কি মা গালি দেন? আবার নতুন বিয়ে হওয়া বউ যখন স্বামীকে বলে, “কী পাগলামি শুরু করলে!” সেটার মজাই আলাদা।
মান্না দে-র সেই গানটাই ধরেন, ‘তুমি যখন পাগল বলো, ধন্য যে হয় সেই পাগলামি’—এখানে পাগল শব্দটা পুরো রোমান্টিক। এমনকি দিলরুবা খানের ‘পাগল মন’ গানটা তো একসময় সবাইকে নাচিয়ে ছেড়েছিল।
আমাদের গানে গানেও এই পাগল শব্দটা ঘুরেফিরে আসে। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে’, নজরুল লিখেছেন ‘ওরে ও পাগলা ভোলা, দে রে দে প্রলয় দোলা’। আর স্বাধীনতার পর আজম খান যখন পপ গান নিয়ে এলেন, তিনিও গাইলেন, ‘পাগলীরে ফেলিয়া, পাগলা যায় চলিয়া’।
তো এই দুনিয়াটা যে আসলে একটা আস্ত পাগলা গারদ, সেটা নতুন কিছু না। কিন্তু মজা লাগে তখন, যখন এই গারদের দুই মস্ত বড় মাথা একে অপরকে ‘পাগল’ বলে সার্টিফিকেট দেয়। তখন আমাদের মতো সাধারণ মানুষের হাত তালি দেওয়া ছাড়া আর কোনো কাজ থাকে না।
সম্প্রতি বিশ্বরাজনীতিতে ঠিক এই জিনিসটাই ঘটল। ডোনাল্ড ট্রাম্প-যাকে দুনিয়ার মানুষ এমনিতেই একটু অন্য চোখে দেখে-তিনি ফোন করে তার খাস বন্ধু, ইসরায়েলের নেতানিয়াহুকে ডিরেক্ট বলে দিলেন, “আপনি একটা পাগল! এখন সবাই আপনাকে ঘৃণা করে, আর আপনার জন্য ইসরায়েলকেও লোক ঘৃণা করছে।”
পুরোনো সেই প্রবাদ আছে না, ‘সোনার হাতে সোনার কাঁকন, কে কাকে মানায়!’ এখানে সোনা বাদ দিয়ে পাগলামি বসালে একদম পারফেক্ট মিলে যায়। যে ট্রাম্পকে দুনিয়ার অর্ধেক মানুষ খামখেয়ালি ভাবে, সে যখন নেতানিয়াহুকে পাগলের খেতাব দেয়, তখন বুঝতে হবে বাজারে পাগলামির কম্পিটিশন বেশ কড়া!
দৃশ্যটা একটু ভেবে দেখেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প-যার নিজের মাথার চুল থেকে শুরু করে টুইটারের পোস্ট, সবকিছুই একটা আজব কাণ্ড; তিনি বসেছেন বিচারকের আসনে। ট্রাম্প যখন কাউকে পাগল বলেন, তখন সেটা আর সাধারণ গালি থাকে না। ওটা মনে হয় যেন এক পিএইচডি করা লোক আরেকজনকে দেখে বলছেন, “ভাই, তোমার পড়াশোনা তো কাঁচা!” আসলে এই দুই নেতার কীর্তিকলাপ দেখলে মনে হয়, এরা একই ফ্যাক্টরির দুইটা আলাদা মডেল।
ট্রাম্পের পাগলামির কথা বললে তো রাত পার হয়ে যাবে। করোনার সময় যখন ডাক্তাররা হন্যে হয়ে ওষুধ খুঁজছেন, ট্রাম্প তখন লাইভে এসে গম্ভীর মুখে বললেন-মানুষের শরীরে সরাসরি ডেটল বা জীবাণুনাশক ইনজেকশন ঢুকিয়ে দিলে কেমন হয়? ডাক্তাররা তো শুনে কপালে হাত দিয়ে বসে পড়েছিলেন। আবার যখন দেশে বড় হারিকেন আসছিল, ট্রাম্প বুদ্ধি দিলেন-ঝড়ের পেটের ভেতর একটা পারমাণবিক বোমা ফেলে দিলে কেমন হয়? বোমা ফাটলে নাকি ঝড় গায়েব হয়ে যেত! আবহাওয়া অফিসের কর্মকর্তারা তো চাকরি ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবছিলেন। আর কিম জং উনকে ‘ছোট রকেট ম্যান’ বলা, আবার পরে তাকেই প্রেমের চিঠি পাঠানো-এসব ট্রাম্প ছাড়া কে পারবে?
নিজের দেশের ভোটে হেরে যাওয়ার পর তার সমর্থকেরা যখন পার্লামেন্টে ভাঙচুর চালাল, সেটাকেও তিনি ‘ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ’ বলে দিলেন। এমন একজন ওস্তাদ মানুষ যখন নেতানিয়াহুকে পাগল বলেন, তখন একটু সোজা হয়ে বসতেই হয়।
এবার আসি ট্রাম্পের সেই ‘পাগল’ বন্ধু নেতানিয়াহুর কথায়। ট্রাম্পের পাগলামি তাও বিনোদন দেয়, কিন্তু নেতানিয়াহুর পাগলামিটা বেশ বিপজ্জনক। তার অহংকার এমন এক পর্যায়ে গেছে যে তিনি পুরো দুনিয়াকে বুড়ো আঙুল দেখাতে ভালোবাসেন। গাজাকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়ে, লাখ লাখ মানুষকে ঘরছাড়া করে, আন্তর্জাতিক আদালতের ওয়ারেন্ট পকেটে নিয়ে তিনি ভাবছেন-তিনিই পৃথিবীর রক্ষাকর্তা! পুরো দুনিয়া যখন যুদ্ধ থামানোর জন্য চিল্লাচ্ছে, আমেরিকার ছাত্ররা রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করছে, তখন নেতানিয়াহু চশমা ঠিক করতে করতে ভাবছেন, ‘সবাই বলদ, শুধু আমি একাই ঠিক।’
নিজের দেশেও তার পাগলামি কম না। কেস থেকে বাঁচতে পুরো দেশের আদালত ব্যবস্থাটাই বদলে দিতে চাইলেন, যার জন্য নিজের দেশের মানুষই তার বিরুদ্ধে রাস্তায় নামল। কিন্তু তার কানে তো শুধু যুদ্ধের বাজনা বাজে। ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে তিনি পুরো মধ্যপ্রাচ্যে আগুন লাগাতে পারেন। সবকিছু ধ্বংস করে নিজেকে জেতা ভাবার এই যে রোগ-একে পাগলামি ছাড়া আর কী বলবেন?
এখন কথা হচ্ছে, ট্রাম্প যে নেতানিয়াহুর এই সমালোচনা করলেন, এটা কি আসলেই তার ভালো বুদ্ধি উদয় হওয়া, নাকি চোরের মুখে ধর্মের কাহিনী?
ট্রাম্প বলছেন, “আপনার জন্য সবাই ইসরায়েলকে ঘৃণা করে।” বাহ রে বাহ! ট্রাম্প সাহেব বোধহয় ভুলে গেছেন, নিজের আমলে জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী বানিয়ে এই ঘৃণার আগুনে প্রথম ঘি-টা তিনিই ঢেলেছিলেন। আজ যখন নিজের ভোট ব্যাংকে টান পড়ার ভয় জেগেছে, তখন হঠাৎ মনে হলো, “আরে, নেতানিয়াহু তো আস্ত একটা পাগল!” এটা ওই চোর-পুলিশ খেলার মতো। দুজন মিলে যখন কোনো ফায়দা লোটে, তখন সব ঠিক। কিন্তু যেই ধরা পড়ার ভয় থাকে, অমনি একজন চিল্লাইয়া বলে, ‘সব দোষ ওই পাগলের!’
এই পুরো ফোন কলের ঘটনাটা মনে করিয়ে দেয় যে, আমরা আসলে একটা আজব সার্কাসের ভেতর আছি। যেখানে রিংমাস্টাররা নিজেরা উন্মাদ, কিন্তু চাবুক উঁচিয়ে আমাদের শান্ত থাকতে বলছেন।

ঠাণ্ডা মাথায় ভাবেন-একদিকে ট্রাম্প, যিনি মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল তোলার জন্য পাগল ছিলেন, ক্লাইমেট চেঞ্জকে যিনি ‘চীনাদের নাটক’ বলতেন। অন্যদিকে নেতানিয়াহু, যিনি শান্তির সব রাস্তা বন্ধ করে শুধু ধ্বংস করতে জানেন। এখন প্রথম পাগল যখন দ্বিতীয় পাগলকে বলে, “তুমি একটু বেশি পাগলামি করছ ভাই, একটু কম করো।” তখন হাসবেন না কাঁদবেন, বুঝে পাওয়া মুশকিল।
আসলে এই দুনিয়ায় কে ভালো আর কে পাগল, চেনা খুব কঠিন। তবে ক্ষমতায় যারা বসে আছেন, তাদের পাগলামির খেসারত দিতে হয় সাধারণ মানুষকে। ট্রাম্পের পাগলামিতে গোটা বিশ্বের মানুষের নাভিশ্বাস দশা, আর নেতানিয়াহুর পাগলামিতে হাজার হাজার বাচ্চার প্রাণ যাচ্ছে।
তারপরও, পলিটিক্সের এই নাটকে এসব কথাবার্তা মাঝেমধ্যে একটু বিনোদন দেয়। ট্রাম্পের এই কথার পর নেতানিয়াহু নিশ্চয়ই আয়নায় নিজের মুখটা একবার দেখেছেন। মনে মনে হয়তো ভাবছেন, “যে ট্রাম্প নিজে মুখে কমলার মতো রঙ মেখে ঘুরে বেড়ায়, সে আমাকে বলছে পাগল!”
শেষ কথা হলো, দুনিয়াটা আসলেই একটা বড় পাগলা গারদ। আর সেই গারদের সেরা দুই পিস যখন মুখোমুখি হয়, তখন একটা দেখার মতো নাটক তৈরি হয়। ট্রাম্প আর নেতানিয়াহুর এই পাগলামির গল্প ইতিহাসের পাতায় একটা চরম হাসির খোরাক হয়েই থাকবে। জহুরি যেমন জহুর চেনে, পাগলও তেমন পাগল চিনতে ভুল করে না!
তবে নেতানিয়াহুর উচিত, রবীন্দ্রসংগীত শোনা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তো বলেই গেছেন, “যে তোরে পাগল বলে তারে তুই বলিস নে কিছু...।”
কাজেই, নো চিন্তা, ডু ফুর্তি!
লেখক: গবেষক ও লেখক

দুনিয়াটা সত্যিই এক রঙ্গমঞ্চ। এক পাগল যখন আরেক পাগলকে বলে, “তুই তো একটা মহা পাগল!” তখন হেসে গড়িয়ে পড়া ছাড়া উপায় থাকে না।
আসলে ‘পাগল’ বা ‘ক্ষ্যাপা’ শব্দটা আমরা কতভাবেই না ব্যবহার করি। কারও মাথায় একটু সমস্যা থাকলে তাকেও পাগল বলি, আবার কেউ সাধারণ মানুষের চেয়ে বেশি বুঝলেও তাকে পাগল বলি। অনেকে তো ভালোবেসেও এই নামে ডাকে। এক সময় লোককবিদের মধ্যে এই নাম নেওয়ার একটা ট্রেন্ড ছিল। যেমন ধরেন পাগলা কানাই, কিংবা টিপু পাগলা-যিনি ইংরেজদের বিরুদ্ধে আন্দোলনই করে বসলেন। লালন সাঁই গেয়েছিলেন ‘তিন পাগলে হলো মেলা’, আর হাসন রাজা তো নিজেই নিজেকে পাগল ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু তাদের ‘পাগল’ কথার আসল রহস্য আমরা কজনই বা বুঝি?
এই শব্দের রয়েছে নানান মানে। মা যখন আদর করে বলেন, “পাগল ছেলে, তোর ওপর রাগ করতে পারি?” তখন কি মা গালি দেন? আবার নতুন বিয়ে হওয়া বউ যখন স্বামীকে বলে, “কী পাগলামি শুরু করলে!” সেটার মজাই আলাদা।
মান্না দে-র সেই গানটাই ধরেন, ‘তুমি যখন পাগল বলো, ধন্য যে হয় সেই পাগলামি’—এখানে পাগল শব্দটা পুরো রোমান্টিক। এমনকি দিলরুবা খানের ‘পাগল মন’ গানটা তো একসময় সবাইকে নাচিয়ে ছেড়েছিল।
আমাদের গানে গানেও এই পাগল শব্দটা ঘুরেফিরে আসে। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে’, নজরুল লিখেছেন ‘ওরে ও পাগলা ভোলা, দে রে দে প্রলয় দোলা’। আর স্বাধীনতার পর আজম খান যখন পপ গান নিয়ে এলেন, তিনিও গাইলেন, ‘পাগলীরে ফেলিয়া, পাগলা যায় চলিয়া’।
তো এই দুনিয়াটা যে আসলে একটা আস্ত পাগলা গারদ, সেটা নতুন কিছু না। কিন্তু মজা লাগে তখন, যখন এই গারদের দুই মস্ত বড় মাথা একে অপরকে ‘পাগল’ বলে সার্টিফিকেট দেয়। তখন আমাদের মতো সাধারণ মানুষের হাত তালি দেওয়া ছাড়া আর কোনো কাজ থাকে না।
সম্প্রতি বিশ্বরাজনীতিতে ঠিক এই জিনিসটাই ঘটল। ডোনাল্ড ট্রাম্প-যাকে দুনিয়ার মানুষ এমনিতেই একটু অন্য চোখে দেখে-তিনি ফোন করে তার খাস বন্ধু, ইসরায়েলের নেতানিয়াহুকে ডিরেক্ট বলে দিলেন, “আপনি একটা পাগল! এখন সবাই আপনাকে ঘৃণা করে, আর আপনার জন্য ইসরায়েলকেও লোক ঘৃণা করছে।”
পুরোনো সেই প্রবাদ আছে না, ‘সোনার হাতে সোনার কাঁকন, কে কাকে মানায়!’ এখানে সোনা বাদ দিয়ে পাগলামি বসালে একদম পারফেক্ট মিলে যায়। যে ট্রাম্পকে দুনিয়ার অর্ধেক মানুষ খামখেয়ালি ভাবে, সে যখন নেতানিয়াহুকে পাগলের খেতাব দেয়, তখন বুঝতে হবে বাজারে পাগলামির কম্পিটিশন বেশ কড়া!
দৃশ্যটা একটু ভেবে দেখেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প-যার নিজের মাথার চুল থেকে শুরু করে টুইটারের পোস্ট, সবকিছুই একটা আজব কাণ্ড; তিনি বসেছেন বিচারকের আসনে। ট্রাম্প যখন কাউকে পাগল বলেন, তখন সেটা আর সাধারণ গালি থাকে না। ওটা মনে হয় যেন এক পিএইচডি করা লোক আরেকজনকে দেখে বলছেন, “ভাই, তোমার পড়াশোনা তো কাঁচা!” আসলে এই দুই নেতার কীর্তিকলাপ দেখলে মনে হয়, এরা একই ফ্যাক্টরির দুইটা আলাদা মডেল।
ট্রাম্পের পাগলামির কথা বললে তো রাত পার হয়ে যাবে। করোনার সময় যখন ডাক্তাররা হন্যে হয়ে ওষুধ খুঁজছেন, ট্রাম্প তখন লাইভে এসে গম্ভীর মুখে বললেন-মানুষের শরীরে সরাসরি ডেটল বা জীবাণুনাশক ইনজেকশন ঢুকিয়ে দিলে কেমন হয়? ডাক্তাররা তো শুনে কপালে হাত দিয়ে বসে পড়েছিলেন। আবার যখন দেশে বড় হারিকেন আসছিল, ট্রাম্প বুদ্ধি দিলেন-ঝড়ের পেটের ভেতর একটা পারমাণবিক বোমা ফেলে দিলে কেমন হয়? বোমা ফাটলে নাকি ঝড় গায়েব হয়ে যেত! আবহাওয়া অফিসের কর্মকর্তারা তো চাকরি ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবছিলেন। আর কিম জং উনকে ‘ছোট রকেট ম্যান’ বলা, আবার পরে তাকেই প্রেমের চিঠি পাঠানো-এসব ট্রাম্প ছাড়া কে পারবে?
নিজের দেশের ভোটে হেরে যাওয়ার পর তার সমর্থকেরা যখন পার্লামেন্টে ভাঙচুর চালাল, সেটাকেও তিনি ‘ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ’ বলে দিলেন। এমন একজন ওস্তাদ মানুষ যখন নেতানিয়াহুকে পাগল বলেন, তখন একটু সোজা হয়ে বসতেই হয়।
এবার আসি ট্রাম্পের সেই ‘পাগল’ বন্ধু নেতানিয়াহুর কথায়। ট্রাম্পের পাগলামি তাও বিনোদন দেয়, কিন্তু নেতানিয়াহুর পাগলামিটা বেশ বিপজ্জনক। তার অহংকার এমন এক পর্যায়ে গেছে যে তিনি পুরো দুনিয়াকে বুড়ো আঙুল দেখাতে ভালোবাসেন। গাজাকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়ে, লাখ লাখ মানুষকে ঘরছাড়া করে, আন্তর্জাতিক আদালতের ওয়ারেন্ট পকেটে নিয়ে তিনি ভাবছেন-তিনিই পৃথিবীর রক্ষাকর্তা! পুরো দুনিয়া যখন যুদ্ধ থামানোর জন্য চিল্লাচ্ছে, আমেরিকার ছাত্ররা রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করছে, তখন নেতানিয়াহু চশমা ঠিক করতে করতে ভাবছেন, ‘সবাই বলদ, শুধু আমি একাই ঠিক।’
নিজের দেশেও তার পাগলামি কম না। কেস থেকে বাঁচতে পুরো দেশের আদালত ব্যবস্থাটাই বদলে দিতে চাইলেন, যার জন্য নিজের দেশের মানুষই তার বিরুদ্ধে রাস্তায় নামল। কিন্তু তার কানে তো শুধু যুদ্ধের বাজনা বাজে। ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে তিনি পুরো মধ্যপ্রাচ্যে আগুন লাগাতে পারেন। সবকিছু ধ্বংস করে নিজেকে জেতা ভাবার এই যে রোগ-একে পাগলামি ছাড়া আর কী বলবেন?
এখন কথা হচ্ছে, ট্রাম্প যে নেতানিয়াহুর এই সমালোচনা করলেন, এটা কি আসলেই তার ভালো বুদ্ধি উদয় হওয়া, নাকি চোরের মুখে ধর্মের কাহিনী?
ট্রাম্প বলছেন, “আপনার জন্য সবাই ইসরায়েলকে ঘৃণা করে।” বাহ রে বাহ! ট্রাম্প সাহেব বোধহয় ভুলে গেছেন, নিজের আমলে জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী বানিয়ে এই ঘৃণার আগুনে প্রথম ঘি-টা তিনিই ঢেলেছিলেন। আজ যখন নিজের ভোট ব্যাংকে টান পড়ার ভয় জেগেছে, তখন হঠাৎ মনে হলো, “আরে, নেতানিয়াহু তো আস্ত একটা পাগল!” এটা ওই চোর-পুলিশ খেলার মতো। দুজন মিলে যখন কোনো ফায়দা লোটে, তখন সব ঠিক। কিন্তু যেই ধরা পড়ার ভয় থাকে, অমনি একজন চিল্লাইয়া বলে, ‘সব দোষ ওই পাগলের!’
এই পুরো ফোন কলের ঘটনাটা মনে করিয়ে দেয় যে, আমরা আসলে একটা আজব সার্কাসের ভেতর আছি। যেখানে রিংমাস্টাররা নিজেরা উন্মাদ, কিন্তু চাবুক উঁচিয়ে আমাদের শান্ত থাকতে বলছেন।

ঠাণ্ডা মাথায় ভাবেন-একদিকে ট্রাম্প, যিনি মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল তোলার জন্য পাগল ছিলেন, ক্লাইমেট চেঞ্জকে যিনি ‘চীনাদের নাটক’ বলতেন। অন্যদিকে নেতানিয়াহু, যিনি শান্তির সব রাস্তা বন্ধ করে শুধু ধ্বংস করতে জানেন। এখন প্রথম পাগল যখন দ্বিতীয় পাগলকে বলে, “তুমি একটু বেশি পাগলামি করছ ভাই, একটু কম করো।” তখন হাসবেন না কাঁদবেন, বুঝে পাওয়া মুশকিল।
আসলে এই দুনিয়ায় কে ভালো আর কে পাগল, চেনা খুব কঠিন। তবে ক্ষমতায় যারা বসে আছেন, তাদের পাগলামির খেসারত দিতে হয় সাধারণ মানুষকে। ট্রাম্পের পাগলামিতে গোটা বিশ্বের মানুষের নাভিশ্বাস দশা, আর নেতানিয়াহুর পাগলামিতে হাজার হাজার বাচ্চার প্রাণ যাচ্ছে।
তারপরও, পলিটিক্সের এই নাটকে এসব কথাবার্তা মাঝেমধ্যে একটু বিনোদন দেয়। ট্রাম্পের এই কথার পর নেতানিয়াহু নিশ্চয়ই আয়নায় নিজের মুখটা একবার দেখেছেন। মনে মনে হয়তো ভাবছেন, “যে ট্রাম্প নিজে মুখে কমলার মতো রঙ মেখে ঘুরে বেড়ায়, সে আমাকে বলছে পাগল!”
শেষ কথা হলো, দুনিয়াটা আসলেই একটা বড় পাগলা গারদ। আর সেই গারদের সেরা দুই পিস যখন মুখোমুখি হয়, তখন একটা দেখার মতো নাটক তৈরি হয়। ট্রাম্প আর নেতানিয়াহুর এই পাগলামির গল্প ইতিহাসের পাতায় একটা চরম হাসির খোরাক হয়েই থাকবে। জহুরি যেমন জহুর চেনে, পাগলও তেমন পাগল চিনতে ভুল করে না!
তবে নেতানিয়াহুর উচিত, রবীন্দ্রসংগীত শোনা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তো বলেই গেছেন, “যে তোরে পাগল বলে তারে তুই বলিস নে কিছু...।”
কাজেই, নো চিন্তা, ডু ফুর্তি!
লেখক: গবেষক ও লেখক