নস্টালজিয়া আসলে কী?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
নস্টালজিয়া আসলে কী?
কোনো পুরনো ছবি বা ভিডিও দেখে স্মৃতিকাতর হয়ে পড়াটা নস্টালজিয়া। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

নস্টালজিয়া বা স্মৃতিকাতরতা হলো অতীতের প্রতি এক ধরনের আবেগপূর্ণ টান। বিশেষ করে এমন কোনো সময় বা স্থানের প্রতি, যার সাথে আমাদের ব্যক্তিগত স্মৃতি জড়িয়ে আছে। সাধারণত অতীতের কোনো অভিজ্ঞতার কথা মনে করিয়ে দেয়–এমন কিছুর মাধ্যমেই এই নস্টালজিয়ার উদ্রেক ঘটে। একে প্রায়শই পুরনো কোনো সময়ে বা স্থানে ফিরে যাওয়ার এক তীব্র আকাঙ্ক্ষা বা ব্যাকুলতা হিসেবে অভিহিত করা হয়।

নস্টালজিয়াকে ‘সুখের স্মৃতি’ হিসেবেও বিবেচনা করা যেতে পারে, কারণ এটি মূলত অতীতের আনন্দদায়ক মুহূর্তগুলোর সাথে সম্পর্কিত। দুঃখ বা কষ্টের সময়ে এটি মনের প্রশান্তির একটি উৎস হতে পারে।

তবে, নস্টালজিয়া মানেই শুধু সুখের স্মৃতি নয়; এটি এমন এক সময়ের জন্য ব্যাকুলতা হতে পারে, যখন জীবন অনেক সহজ-সরল ছিল। অথবা এমন এক সময়ের প্রতি টান, যখন আমরা একে অপরের সাথে অনেক বেশি নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিলাম।

নস্টালজিয়া যখন মানসিক রোগ ছিল

নস্টালজিয়া ধারণাটি তুলনামূলকভাবে নতুন। ১৬৮৮ সালে সুইজারল্যান্ডের চিকিৎসক জোহানেস হোফার প্রথম এই শব্দটি উদ্ভাবন করেন। নস্টালজিয়া শব্দটি দুটি গ্রিক শব্দ থেকে এসেছে- ‘Nostos’ মানে বাড়ি ফেরা এবং ‘Algos’ মানে ব্যথা বা কষ্ট। তিনি একে একটি ‘মানসিক রোগ’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন। কারণ এর লক্ষণ ছিল নিরন্তর নিজের জন্মভূমির কথা চিন্তা করা এবং সেখানে ফিরে যাওয়ার জন্য ব্যাকুল হওয়া।

উনবিংশ শতাব্দীর আগে নস্টালজিয়াকে ইতিবাচক কোনো অনুভূতি হিসেবে দেখা হতো না। বরং একে একটি মানসিক রোগ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। তবে সুইস মনোরোগ বিশেষজ্ঞ কার্ল ইয়ুং নস্টালজিয়াকে আমাদের অতীতের সাথে পুনরায় সংযোগ স্থাপনের এবং বর্তমানকে বোঝার একটি মাধ্যম হিসেবে দেখেছিলেন। ইয়ুং-এর মতে, নস্টালজিয়া ছিল আমাদের 'যৌথ অবচেতন' অর্থাৎ মানবজাতি হিসেবে আমাদের সবার যে অভিন্ন ইতিহাস ও অভিজ্ঞতা রয়েছে, তাতে প্রবেশ করার একটি পথ।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় নস্টালজিয়া আবারও রোগের সমার্থক হয়ে ওঠে, কারণ যুদ্ধক্ষেত্রে থাকা সৈন্যরা বাড়ির আরাম-আয়েশ ও সান্নিধ্যের জন্য তীব্র ব্যাকুলতা অনুভব করতেন। তবে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর নস্টালজিয়া পুনরায় একটি ইতিবাচক অনুভূতি হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

পপ কালচারে নস্টালজিয়ার উদাহরণ

১৯৪৬ সালের চলচ্চিত্র ‘ইটস আ ওয়ান্ডারফুল লাইফ’–কে প্রায়শই সর্বকালের অন্যতম সেরা নস্টালজিক চলচ্চিত্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ছবিটির গল্প জর্জ বেইলিকে (জিমি স্টুয়ার্ট) ঘিরে, যিনি বড়দিনের আগের রাতে আত্মহত্যার কথা ভাবছিলেন। তবে, একজন ফেরেশতা তাকে এসে দেখান যে, তিনি যদি কখনো জন্মগ্রহণ না করতেন তবে তার এবং তার চারপাশের মানুষের জীবন কতটা আলাদা হতো। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে একটি ছোট শহরের জীবনের আবেগঘন চিত্রায়ন এই সিনেমাটিকে একটি ‘হলিডে ক্ল্যাসিক’-এ পরিণত করেছে।

টেলিভিশন সিরিজ ‘দ্য ওয়ান্ডার ইয়ার্স’ (১৯৮৮-১৯৯৩) নস্টালজিয়ার আরেকটি চমৎকার উদাহরণ। এই সিরিজে কেভিন আর্নল্ডের (ফ্রেড স্যাভেজ) গল্প বলা হয়েছে, যে ১৯৬০ এবং ১৯৭০-এর দশকে শহরতলির পরিবেশে বেড়ে উঠছিল। এই শোর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, বয়স্ক কেভিনের কণ্ঠস্বরের ধারাবর্ণনা, যা পুরো সিরিজটিকে অত্যন্ত নস্টালজিক বা স্মৃতিকাতর করে তোলে।

হুইটনি হিউস্টনের গাওয়া ‘আই উইল অলওয়েজ লাভ ইউ’ গানটিকেও প্রায়ই একটি নস্টালজিক গান হিসেবে গণ্য করা হয়। গানটি মূলত লিখেছিলেন ডলি পার্টন। এর বিষয়বস্তু এমন এক নারীকে নিয়ে, যে তার প্রেমিককে ছেড়ে চলে যাচ্ছে; কিন্তু সে কথা দিচ্ছে যে, তারা একসাথে না থাকলেও সে তাকে সারাজীবন ভালোবেসে যাবে। গানটির আবেগপূর্ণ কথা এবং সুর একে সর্বকালের অন্যতম জনপ্রিয় রোমান্টিক গানে পরিণত করেছে।

নস্টালজিয়ার প্রকারভেদ

নস্টালজিয়া বা স্মৃতিকাতরতা সাধারণত দুই ধরণের হয়ে থাকে: ইতিবাচক ও নেতিবাচক।

ইতিবাচক নস্টালজিয়া: এটি অতীতের সুখকর এবং রঙিন স্মৃতি দ্বারা চিহ্নিত। এই অনুভূতিটি মূলত উষ্ণতা, আনন্দ এবং প্রশান্তির সাথে জড়িত।

নেতিবাচক নস্টালজিয়া: অন্যদিকে, এটি অতীতের অম্ল-মধুর বা এমনকি বেদনাদায়ক স্মৃতি দ্বারা চিহ্নিত। এর সাথে সাধারণত ব্যাকুলতা, বিষণ্ণতা এবং অনুশোচনা জড়িয়ে থাকে।

নস্টালজিয়াকে আরও তিনটি ভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করা যেতে পারে। ব্যক্তিগত, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক।

কোন খাবারের স্বাদ বা ঘ্রাণে মানুষ নস্টালজিক হয়ে যেতে পারে। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি
কোন খাবারের স্বাদ বা ঘ্রাণে মানুষ নস্টালজিক হয়ে যেতে পারে। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

ব্যক্তিগত নস্টালজিয়া: নিজের জীবনের নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা ঘটনার স্মৃতি।

সামাজিক নস্টালজিয়া: এমন কোনো সময়ের স্মৃতি, যখন মানুষ অন্যের সাথে অনেক বেশি নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিল বলে অনুভব করে।

সাংস্কৃতিক নস্টালজিয়া: নিজের সংস্কৃতির সাথে গভীরভাবে যুক্ত থাকার সময়ের স্মৃতি।

নস্টালজিক হওয়ার উপকারিতা

গবেষণায় দেখা গেছে, নস্টালজিয়ার বেশ কিছু সুফল রয়েছে। যেমন, এটি-

  • মন মেজাজ ভালো করে।
  • আত্মসম্মান বৃদ্ধি করে।
  • সামাজিক সমর্থনের অনুভূতি জোগায়।
  • জীবনের কঠিন পরিবর্তনগুলো (যেমন: বিবাহবিচ্ছেদ, অবসর গ্রহণ বা মৃত্যু) কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করে।
  • শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপরও নস্টালজিয়ার ইতিবাচক প্রভাব রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, এটি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে এবং মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে। এছাড়া এটি জীবন নিয়ে সন্তুষ্টি বাড়াতে এবং দুশ্চিন্তা কমাতে সহায়ক হতে পারে।

অতিরিক্ত নস্টালজিয়া কি ক্ষতিকর?

তবে নস্টালজিয়ার কিছু নেতিবাচক দিকও থাকতে পারে। যেমন, এটি-

  • একাকীত্ব এবং বিচ্ছিন্নতাবোধ তৈরি করতে পারে।
  • মানুষকে অতীতের মোহে আটকে রেখে বর্তমানের প্রতি অসুখী করে তুলতে পারে।
  • বর্তমানের কোনো কাজে উদ্যোগী হওয়ার আগ্রহ কমিয়ে দিতে পারে।

নস্টালজিয়ার নেতিবাচক প্রভাব এড়িয়ে চলার উপায়

নস্টালজিয়া বা স্মৃতিকাতরতার নেতিবাচক প্রভাবগুলো এড়াতে নিচের পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা যেতে পারে-

  • এই মুহূর্তে আপনি এমন কী করছেন, যা আপনাকে আনন্দ দিচ্ছে? বর্তমানে মনোনিবেশ করার চেষ্টা করুন।
  • বর্তমান সময়ে অন্যদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করুন। আপনার প্রিয় মানুষদের সাথে সময় কাটান এবং তাদের কাছে আপনার সুখকর স্মৃতিগুলো শেয়ার করুন।
  • যেসব কাজ আপনাকে খুশি রাখে সেগুলো করুন। যেমন-পছন্দের গান শোনা, হাঁটতে যাওয়া অথবা প্রিয় কোনো সিনেমা দেখা।
  • যদি মানসিকভাবে খুব বেশি ভেঙে পড়েন, তবে একজন থেরাপিস্ট বা মনোবিদের সাথে কথা বলা আপনার জন্য সহায়ক হতে পারে।
  • আপনি অতীতের স্মৃতিতে কতটা সময় ব্যয় করছেন, সে সম্পর্কে সচেতন থাকুন। অতীতের মোহে যেন বর্তমান ডুবে না যায়, সেদিকে খেয়াল রাখুন।

তথ্যসূত্র: ভেরিওয়েল মাইন্ড

সম্পর্কিত