এশিয়ার ক্ষেত্রে চীনের আধিপত্য বলয় বেড়েছে অত্যধিকভাবে। চীনের সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালের একই সময়ের তুলনায় ২০২৫ সালের প্রথম ১০ মাসে মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে চীনের বাণিজ্য বৃদ্ধি পেয়েছে।
আবু-নওফেল-সাজিদ

‘জিউস’কে গ্রিক দেবতাদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যিনি গ্রিক পুরাণে অলিম্পিয়ানদের রাজা, মাউন্ট অলিম্পাসের শাসক এবং আকাশ ও বজ্রের দেবতা হিসেবে পরিচিত। ‘জিউস’ ক্ষমতায় বসেছিলেন তার বাবা ক্রোনাসকে ক্ষমতাচ্যুত করে। ঠিক এভাবেই তিনি পৃথিবীর মানুষ ও অমর দেবতা–উভয়কেই নিয়ন্ত্রণ করতেন।
এই সময়ে হঠাৎ করে জিউসের গল্প কেন? এটা কি নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে, নাকি অন্য কোনো কারণে–তা বুঝতে হলে পুরো আলাপ শুনতে হবে।
আধুনিক বিশ্বব্যবস্থায় প্রতিটি দেশ পরস্পরের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে যুক্ত। কেউ কাউকে ছেড়ে চলতে পারে না। ফলে কেউ আক্রান্ত হলে, তা ওই সীমাতেই আর আটকে থাকে না। এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে সারা বিশ্বে। তবে বর্তমান সময়ে তা অনেকটাই মাল্টিপোলার ব্যবস্থা হয়ে যাচ্ছে। এই বিশ্বব্যবস্থার মধ্যে চীন রয়েছে স্ট্রাইকার অবস্থানে। যেখানে সে হয়তো খেলার বদলি খেলোয়াড় হিসেবে ৭০ মিনিটের দিকে মাঠে অবতরণ করবে। আর তার এই মাঠে প্রবেশেই হয়তো নতুন ইতিহাস লিখে দিবে।
বিশ্বের অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হতে ৭০ বছরেরও কম সময় লেগেছে দেশটির। এই রূপান্তর এশীয় দেশগুলোর মধ্যে দৈত্যাকার অর্থনীতির রাষ্ট্রে পরিণত করেছে চীনকে। গত ৪৫ বছরে চীন বাণিজ্য পথ ও বিনিয়োগ প্রবাহ উন্মুক্তের জন্য ধারাবাহিক কিছু সংস্কার প্রবর্তন করেছে। যা শেষ পর্যন্ত কোটি কোটি মানুষকে দারিদ্র্য থেকে মুক্তি দিয়েছে।
১৯৫০-এর দশকে চীনে ভয়াবহ মানবসৃষ্ট বিপর্যয় দেখা দিয়েছিল। বিপ্লবের পর মাও জেদং কৃষিনির্ভর অর্থনীতিকে দ্রুত শিল্পায়িত করতে ‘দ্য গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড’ শীর্ষক একটি উদ্যোগ নেন। কিন্তু তা সফল হয়নি। এর ফল দাঁড়ায় ১৯৫৯ থেকে ১৯৬১ সালের মধ্যে দুর্ভিক্ষে দেশটির ১ থেকে ৪ কোটি মানুষের মৃত্যু হয়, যা মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় দুর্ভিক্ষের একটি।
এর পরপরই ১৯৬০-এর দশকে শুরু হয় সাংস্কৃতিক বিপ্লব, যা অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। পাশাপাশি এটি দেশের সামাজিক কাঠামোর অধিকাংশই ধ্বংস করে দিয়েছিল। এরপর চীন ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে।
১৯৭৬ সালে মাও-এর মৃত্যুর পর দেং শিয়াওপিংয়ের নেতৃত্বে শুরু হওয়া সংস্কার কর্মসূচি চীনের অর্থনীতিকে নতুন রূপ দিতে শুরু করে। কৃষকদের নিজস্ব জমিতে চাষাবাদের অধিকার দেওয়া হয়, যা জীবনযাত্রার মান উন্নত করে এবং খাদ্য সংকট দূর করতে সাহায্য করে। ১৯৭৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর বিদেশি বিনিয়োগের দুয়ার খুলে যায়। সস্তা শ্রম এবং কম ভাড়ার সুযোগ নিতে বিনিয়োগকারীরা দেশটিতে প্রচুর অর্থ লগ্নি করতে শুরু করে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের গ্লোবাল প্রধান অর্থনীতিবিদ ডেভিড মান বলেন, “সত্তরের দশকের শেষভাগ থেকে আমরা এমন এক অর্থনৈতিক বিস্ময় দেখেছি, যা ইতিহাসের যেকোনো অর্থনীতির তুলনায় অনেক বেশি আকর্ষণীয়।”

নব্বইয়ের দশকজুড়ে চীন দ্রুতগতিতে প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে থাকে। ২০০১ সালে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় যোগদান দেশটির অর্থনীতিতে নতুন গতি আনে। অন্যান্য দেশের সাথে বাণিজ্য বাধা দূর হয় এবং শুল্ক কমে যাওয়ায় খুব দ্রুতই চীনা পণ্য বিশ্বের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে।
লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের কিছু পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায়, ১৯৭৮ সালে চীনের রপ্তানির পরিমাণ ছিল মাত্র ১ হাজার কোটি ডলার, যা তৎকালীন বিশ্ব বাণিজ্যের ১ শতাংশেরও কম।
১৯৮৫ সালের মধ্যে চীনের রপ্তানি ২ হাজার ৫০০ কোটি ডলারে পৌঁছায়। এর দুই দশকেরও কম সময়ের মধ্যে রপ্তানির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৪ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলারে।
বর্তমান সময়ে অর্থনৈতিক সংস্কার চীনের কোটি কোটি মানুষের ভাগ্য বদলে দিয়েছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, প্রায় ৮৫ কোটি মানুষকে দারিদ্র্যসীমার ওপর তুলে আনা হয়েছে।
একইসঙ্গে শিক্ষার হারও বেড়েছে ব্যাপক হারে। ‘স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড’-এর প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে চীনের কর্মীবাহিনীর প্রায় ২৭ শতাংশ উচ্চশিক্ষিত (বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষা) হবে। বর্তমানে দেশটিতে উচ্চশিক্ষিত কর্মী আছে মোট কর্মীবাহিনীর ২১ দশমিক ৮ শতাংশ, যা জার্মানির এখনকার হারের সমান।
বিশ্বব্যাংক বলছে, চীনের মাথাপিছু আয় এখনো একটি উন্নয়নশীল দেশের মতোই এবং উন্নত অর্থনীতিগুলোর গড় আয়ের চার ভাগের এক ভাগেরও কম। বিশ্বব্যাংকের ২০২৪ সালের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চীনের বার্ষিক গড় আয় প্রায় ১৩ হাজার ৩০৩ ডলার, যা ২০২০ সালেও ছিল ১০ হাজার মার্কিন ডলার।
বিশ্বজুড়ে দেশগুলো যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যুদ্ধে টালমাটাল, ঠিক সেই সময়েই বছরের প্রথম তিন মাসে চীনের অর্থনীতি প্রত্যাশার চেয়েও দ্রুত গতিতে বেড়েছে।

চীনা সরকারি তথ্যের বরাত দিয়ে বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এই মেয়াদে দেশটির জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৫ শতাংশে দাঁড়ায়।
একুশ শতকের প্রথম দশকে চীন আন্তর্জাতিক নিয়ম ও নীতি মেনে চলতে আগ্রহী থাকলেও সময়ের সঙ্গে বদল ঘটে। অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বেইজিং বিশ্ব পরিচালনায় আরও সক্রিয় হতে শুরু করে। এই সক্রিয়তা বিদ্যমান প্রতিষ্ঠান ও নিয়মগুলোকে চ্যালেঞ্জ করার পাশাপাশি নিজে নেতৃত্বের আসনে বসার সম্ভাবনারও জানান দেয়। এই শক্তি বৃদ্ধিতে চীন চারটি উপায়কে কাজে লাগিয়েছে–
১. আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে বড় ভূমিকা নেওয়া
২. নিজেদের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের প্রচার
৩. নিজস্ব কিছু সংস্থা তৈরির ভিত্তি স্থাপন
৪. মাঝেমধ্যে বিশ্ব পরিচালনার নিয়মগুলোকে ভিন্ন পথে পরিচালনা
২০১০ সালে চীন জাপানকে ছাড়িয়ে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হয় এবং বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলে (আইএমএফ) তৃতীয় সর্বোচ্চ ভোটের অধিকার অর্জন করে। এই সময়ের মধ্যেই চীনা নাগরিকরা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার উচ্চপদে আসীন হতে শুরু করে। ২০০৬ সালে মার্গারেট চ্যান বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক নিযুক্ত হন। দায়িত্ব পালনকালে তিনি বেইজিংয়ের বেশ কিছু লক্ষ্যকে সমর্থন করেন, যার মধ্যে ছিল চীনা চিকিৎসাবিদ্যাকেও প্রচারের পরিকল্পনা।
২০০৮ সালের অর্থনৈতিক মহামন্দার সময় বেইজিং সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রতিক্রিয়া সমন্বয়ের প্রচেষ্টায় অংশ নেয়। ২০০৮ সালের জি-২০ সম্মেলনে যোগ দেওয়ার আগে চীন যুক্তরাষ্ট্রের একটি বৃহৎ ও সমন্বিত আর্থিক প্যাকেজের আহ্বানে সাড়া দেয়।
সংবাদমাধ্যম ফ্রান্স২৪-এর এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, নিজ দেশে বেইজিং তাদের অর্থনীতির জন্য ৫৮০ বিলিয়ন ডলারের একটি প্যাকেজ চালু করে ২০০৮ সালে। এরপর বেইজিং রাষ্ট্রীয় প্রচারমাধ্যম এবং অন্যান্য মাধ্যম ব্যবহার করে বিশ্বের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে চীনের ভূমিকার কথা বৈশ্বিক পরিসরে তুলে ধরে।
এই সময়ে বেইজিং-নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠান তৈরি হতে থাকে, যা ২০১০-এর দশকে আরো বিস্তৃত হয়। এর আগের দশকেই বেইজিং ‘সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন’ প্রতিষ্ঠা করেছিল। পূর্ববর্তী সাংহাই ফাইভ গ্রুপের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হওয়া এ সংস্থা চীন, রাশিয়া ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলোকে একত্রিত করে। ২০১০-এর দশকে এ সংস্থা বিদ্যমান বৈশ্বিক নিয়মগুলোকে চ্যালেঞ্জ করার একটি মাধ্যমে পরিণত হয়। উদাহরণ হিসেবে একটি বৈশ্বিক ও উন্মুক্ত ইন্টারনেট ব্যবস্থার বদলে চীনের সরকার-নিয়ন্ত্রিত ইন্টারনেট ব্যবস্থার ধারণা প্রচারের কথা উল্লেখ করা যায়।
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ও বারাক ওবামার অধীনে ওয়াশিংটনের বিশ্বাস ছিল–বেইজিং ক্রমশ বিশ্ব পরিচালনার নিয়ম ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমর্থন করবে। ২০০৫ সালে মার্কিন উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী রবার্ট জোলিক চীনকে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় একজন ‘দায়িত্বশীল অংশীদার’ হওয়ার জন্য প্রকাশ্যে আহ্বান জানান।
এর বিপরীতে, ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন বিদ্যমান নিয়মগুলো ক্ষুণ্ন করার বিষয়ে চীনা প্রচেষ্টা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে। বেইজিং যেভাবে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবহার করে তাদের পররাষ্ট্রনীতি এবং বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) মতো কর্মসূচিগুলো প্রচার করছিল, তার বিরুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসন অবস্থান নেয়।
অন্যদিকে, ২০১৩ সালে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং যখন এই প্রকল্পের ঘোষণা দেন, তখন ওবামা প্রশাসন একে সরাসরি সামরিক সংঘাত হিসেবে না দেখলেও ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করেছিল।
ওবামা প্রশাসনের প্রতিক্রিয়ার মূল ভিত্তি ছিল ‘পিভট টু এশিয়া’ নীতি। এর প্রধান লক্ষ্য ছিল এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং চীনের ক্রমবর্ধমান আধিপত্য ঠেকানো।
এর মধ্যে ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ ছিল ওবামার তুরুপের তাস। এর লক্ষ্য ছিল চীনের অর্থনৈতিক বলয়ের বাইরে ১২টি দেশের মধ্যে একটি শক্তিশালী বাণিজ্য জোট গঠন করা, যেখানে বাণিজ্যের নিয়মাবলী চীন নয় বরং যুক্তরাষ্ট্র নির্ধারণ করে। চীন যখন এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) গঠন করে, তখন ওবামা প্রশাসন যুক্তরাজ্য, জার্মানির মতো মিত্রদেশগুলোকে এতে যোগ না দিতে প্ররোচিত করেছিল। যদিও অনেক দেশ শেষ পর্যন্ত যোগ দিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছিল, চীনের প্রকল্পগুলো স্বচ্ছ নয় এবং এটি দেশগুলোকে ‘ঋণের ফাঁদে’ ফেলবে। পরিবর্তে ওবামা স্বচ্ছতা ও টেকসই উন্নয়নের ওপর জোর দিয়েছিলেন।
ওবামা সরাসরি বিআরআই বন্ধের চেষ্টা না করলেও টিপিপি এবং পিভট টু এশিয়া নীতির মাধ্যমে চীনের এই অর্থনৈতিক বিস্তারের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী বিকল্প তৈরি করতে চেয়েছিলেন।
চীনের জিয়াং জেমিনের উত্তরসূরি হু জিনতাওয়ের শাসনামলে চীন আন্তর্জাতিক নিয়মগুলোকে আরো বেশি করে চ্যালেঞ্জ করতে শুরু করে। দক্ষিণ চীন সাগরের বিতর্কিত অঞ্চলগুলোর ওপর বেইজিং তাদের সার্বভৌমত্বকে প্রধান স্বার্থ এবং অ-আলোচনাযোগ্য হিসেবে দাবি করে। যদিও তারা সে সময় অন্য দাবিদারদের সাথে আলোচনায় অংশ নিচ্ছিল। ফোর্বস ম্যাগাজিনের তথ্যমতে, বেইজিং দক্ষিণ চীন সাগরে তাদের প্রভাবও বিস্তার করে বিতর্কিত দ্বীপ ও কৃত্রিম কাঠামোর ওপর সামরিক স্থাপনা তৈরি করে এবং বিশ্বজুড়ে তাদের বৈদেশিক সাহায্যের পরিমাণ বৃদ্ধি করে।
চীনের সঙ্গে বিশ্বের সকল দেশের সম্পর্ক মিশ্র। তবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পরবর্তী সময়ে আধুনিক চীনকে নতুনভাবে চিনছে পৃথিবী।
এশিয়া সোসাইটি পলিসি ইনস্টিউটের তথ্যমতে, ২০২২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেন আক্রমণের ঠিক দুই সপ্তাহ আগে ভ্লাদিমির পুতিন ও শি জিনপিং বেইজিংয়ে একটি ঘোষণাপত্র স্বাক্ষর করেন। এর শিরোনাম ছিল–‘আন্তর্জাতিক সম্পর্ক: একটি নতুন যুগে পদার্পণ এবং বৈশ্বিক টেকসই উন্নয়ন বিষয়ে রুশ ফেডারেশন ও গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের যৌথ বিবৃতি।’ উভয় দেশের ভাষায় প্রকাশিত সেই বিবৃতিতে ঘোষণা করা হয়, রাশিয়া ও চীনের মধ্যে এই নতুন সম্পর্ক ‘স্নায়ু যুদ্ধ আমলের রাজনৈতিক ও সামরিক জোটগুলোর চেয়েও শ্রেষ্ঠ’।
এতে জোর দিয়ে বলা হয়, তাদের বন্ধুত্বের ‘কোনো সীমা নেই’; সহযোগিতার ক্ষেত্রে ‘কোনো নিষিদ্ধ এলাকা নেই’ এবং তাদের ক্রমবর্ধমান কৌশলগত সমন্বয় কোনো তৃতীয় পক্ষের বিরুদ্ধে পরিচালিত নয়; কিংবা বৈশ্বিক পরিস্থিতির পরিবর্তন দ্বারা সীমাবদ্ধ নয়।
এরপর আরো কিছু ঘোষণাপত্র এলেও সেগুলোতে সব সময় সহযোগিতার সেই ‘নিষিদ্ধ এলাকা নেই’ কথাটির উল্লেখ পাওয়া যায়নি। নাৎসি জার্মানির বিরুদ্ধে বিজয়ের ৮০তম বার্ষিকী স্মরণে ২০২৫ সালের ৮ থেকে ১০ মে শি-র মস্কো সফরকালে রুশ প্রেসিডেন্টের সাথে বেশ কিছু নথি স্বাক্ষরিত হয়। রাশিয়া ৯ মে-এর সামরিক কুচকাওয়াজে শি-সহ প্রায় ২০ জন রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানকে সম্মানিত অতিথি হিসেবে স্বাগত জানায় এবং মস্কোর রেড স্কয়ারে চীনা সেনারা মার্চ করে।
কূটনৈতিকভাবে, এই নথিগুলো তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সম্পর্কে স্পষ্ট হলেও এতে এমন কোনো বাধ্যতামূলক বিধান নেই, যা একে একটি আনুষ্ঠানিক জোটে রূপ দেবে বা কোনো চুক্তি স্বাক্ষরের বাধ্যবাধকতা তৈরি করবে। ফলে একটি কৌশলগত অস্পষ্টতা বজায় রয়েছে। তবে আলোচনার মাধ্যমে এটুকু বোঝা যায়–চীনের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্ক যেকোনো সময়ের চেয়ে অনন্য মাত্রায় রয়েছে।
স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (সিপরি) প্রকাশিত এক জার্নালের তথ্যমতে, ২০১৫ সালে চীন আনুমানিক ২৫০ কোটি ডলার মূল্যের ২৪টি এসইউ-৩৫ মাল্টিরোল ফাইটার জেটের জন্য একটি চুক্তি আলোচনা ও স্বাক্ষর করে। এর সরবরাহ ২০১৬ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে সম্পন্ন হয়েছিল।
অন্যদিকে সিএসআইএস মিসাইল প্রোজেক্ট পরিচালিত মিসাইল থ্রেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৪ সালে রাশিয়ার সঙ্গে দেশটির এস-৪০০ চুক্তি সম্পন্ন হয়। ৩০০ কোটি ডলারের এই চুক্তির মাধ্যমে একাধিক রেজিমেন্ট সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। যা ছিল এই উন্নত ব্যবস্থার প্রথম কোনো রপ্তানি। ২০১৮ সাল থেকে এর সরবরাহ শুরু হয়, যা চীনের আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতাকে পূর্বের এস-৩০০ এর তুলনায় আরও বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত করে।
১৯৯০-এর দশক এবং ২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে রাশিয়ার আমদানির ওপর চীনের নির্ভরতা ছিল প্রবল। ২০০৯ সালের পূর্ববর্তী ১৫ বছরে চীনের প্রধান সমরাস্ত্র সংগ্রহের প্রায় ৮৫ শতাংশই ছিল রাশিয়ার।
বিশ্বে ইরান-আমেরিকা যুদ্ধ চলছে। তার আগেও আমেরিকা রাশিয়া ও ইরানের ওপর সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছিল। এরপরও চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রাণালয়ের তথ্যমতে, ২০২৪ সালে চীন ও ইরানের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ ১৩ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। এর মধ্যে চীনের রপ্তানি ছিল ৮ দশমিক ৯৩ বিলিয়ন ডলার এবং আমদানি ছিল ৪ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলার। ২০২১ সালের মার্চে চীন-ইরান একটি সহযোগিতা পরিকল্পনা স্বাক্ষর করে। ২০২২ সালের জানুয়ারিতে উভয় পক্ষ এই সহযোগিতা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরুর ঘোষণা দেয়।
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, যুক্তরাজ্য ও চীনের মধ্যে ঘনিষ্ঠ জনযোগাযোগ এবং সাংস্কৃতিক বিনিময় রয়েছে।
দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার ও পুনর্গঠনের লক্ষ্যে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার গত ২৮ থেকে ৩১ জানুয়ারি চীন সফর করেন। ২০১৮ সালের পর এই প্রথম কোনো ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চীন সফর করলেন। তার এই সফরের মাধ্যমে একটি ‘প্র্যাগম্যাটিক রিসেট’ নিশ্চিত হয়েছে। ফলে ২২০ কোটি ডলারের রপ্তানি চুক্তি এবং ২৩০ কোটি ডলারের বাজার সুবিধা পাওয়ার চুক্তি স্বাক্ষর হয়। এই চুক্তিগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, গাড়ি নির্মাণ, পরিবেশবান্ধব জ্বালানি, অর্থায়ন, স্বাস্থ্যসেবা ও ফার্মাসিউটিক্যালসের মতো বেশ কিছু কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রকে অন্তর্ভুক্ত করেছে।

অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের তথ্যমতে, পণ্য ও পরিষেবার বাণিজ্যের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের পর চীন ইউরোপীয় ইউনিয়নের তৃতীয় বৃহত্তম অংশীদার। তবে শুধু পণ্য বাণিজ্যের দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রর পর চীনই ইইউর দ্বিতীয় বৃহত্তম অংশীদার।
চীন থেকে ইইউর আমদানির পরিমাণ অনেক দিন ধরেই উচ্চ। রপ্তানির ক্ষেত্রে চীন ইইউ-এর তৃতীয় বৃহত্তম অংশীদার এবং আমদানির ক্ষেত্রে বৃহত্তম। ২০২৪ সালে চীন-ইইউ বাণিজ্যে ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৩৫৯.৮ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৩ সালের ৩৫০.৩ বিলিয়ন ডলারকে ছাড়িয়ে যায়। ২০২৪ সালে ইইউ থেকে চীনে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ২৫১.২১ বিলিয়ন ডলার, অন্যদিকে চীন থেকে ইইউ-এর আমদানির পরিমাণ ছিল ৬১২.৬ বিলিয়ন ডলার।
এশিয়ার ক্ষেত্রে চীনের আধিপত্য বলয় বেড়েছে অত্যধিকভাবে। চীনের সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালের একই সময়ের তুলনায় ২০২৫ সালের প্রথম ১০ মাসে মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে চীনের বাণিজ্য বৃদ্ধি পেয়েছে।
ইউরেশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক তাদের এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ২০২৫ সালের মাঝামাঝি নাগাদ মধ্য এশিয়ার দেশগুলোতে চীনের মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ৩৫.৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা ২০২০ সালের তুলনায় ১ দশমিক ৫ গুণ বেশি। গত ১৮ মাসে এই বিনিয়োগের প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে, যা ১৩ শতাংশ বেড়েছে।
কাজাখস্তানে ১১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। উজবেকিস্তানে ১০ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার। তুর্কমেনিস্তানে ৯ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। তাজিকিস্তানে ২ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার। কিরগিজস্তানে ২ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার।
চীনের প্রভাব দক্ষিণ এশিয়ায়ও ক্রমশ বাড়ছে। জিআইএস রিপোর্টসের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ভুটান ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় সব দেশেরই বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার এখন চীন। ২০২৪ সালে চীন ও দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ২০০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা গত এক দশকে দ্বিগুণ হয়েছে এবং এর গড় বার্ষিক বৃদ্ধির হার ৬ দশমিক ৩ শতাংশ।
এর মধ্যে ভারতের সঙ্গে চীনের বাণিজ্য ছিল ১০০ বিলিয়ন ডলার, পাকিস্তানের সঙ্গে ২৩ বিলিয়ন, বাংলাদেশের সঙ্গে ২৭ বিলিয়ন, শ্রীলঙ্কার সঙ্গে ৫ বিলিয়ন, নেপালের সাথে দেড় বিলিয়ন এবং মালদ্বীপের সঙ্গে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য। এই অর্থনৈতিক সংহতির অর্থ হলো–চীনের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা এই দেশগুলোর জন্যই বেশি ক্ষতিকর হবে।
ভারত বাদে দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী প্রায় সব দেশেই চীন প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের প্রধান সরবরাহকারী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র যেখানে দেশগুলোকে মার্কিন অস্ত্র কেনার জন্য সামরিক সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থানে থাকে, সেখানে বেইজিংয়ের সহজ শর্তের ঋণ দেশগুলোকে চীনা অস্ত্র কিনতে উৎসাহিত করে।
চীনের বৃহত্তম অস্ত্র ক্রেতা পাকিস্তান ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত চীনের মোট অস্ত্র বিক্রির দুই-তৃতীয়াংশ দখল করে ছিল। ঘনিষ্ঠ সামরিক সম্পর্কের পাশাপাশি দেশ দুটির মধ্যে পারমাণবিক প্রযুক্তিতেও শক্তিশালী বন্ধন রয়েছে। এ ছাড়া ২০১৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশও তার প্রয়োজনীয় অস্ত্রের ৭২ শতাংশ চীন থেকে সংগ্রহ করেছে।
শিক্ষা ক্ষেত্রেও চীন তার ‘সফট পাওয়ার’ বাড়িয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো থেকে হাজার হাজার শিক্ষার্থী বর্তমানে চীনের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়াশোনা করছে।
বিআরআইয়ের মাধ্যমে চীন তাদের অর্থনৈতিক প্রভাব আরো বিস্তৃত করেছে। ভারত ও ভুটান ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার বাকি সব দেশই এ প্রকল্পে অংশ নিচ্ছে। পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কা এই প্রকল্পের প্রধান অংশীদার। বিআরআইয়ের একটি ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্প হলো ‘চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর’ (সিপেক), যা ৩ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ একটি অবকাঠামো নেটওয়ার্কের মাধ্যমে চীনের জিনজিয়াং প্রদেশকে পাকিস্তানের গদর বন্দরের সাথে সংযুক্ত করবে (বর্তমানে নির্মাণাধীন)।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চীন দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে ৪৮ বিলিয়ন ডলার ঋণ দিয়েছে। এর মধ্যে পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশের বেইজিংয়ের কাছে দেনার পরিমাণ রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে। ২০২৪ সালে চীন পাকিস্তানের বৃহত্তম পাওনাদারে পরিণত হয়েছে, যার ঋণের পরিমাণ প্রায় ২৯ বিলিয়ন ডলার।
বিবিসির তথ্যমতে, দুই অর্থনৈতিক পরাশক্তির মধ্যে পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ গত বছর প্রায় ৫৮৫ বিলিয়ন ডলারে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও চীন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের আমদানির পরিমাণ ৪৪০ বিলিয়ন ডলার, যা চীনের আমেরিকা থেকে আমদানির ১৪৫ বিলিয়নের তুলনায় অনেক বেশি। ফলে ২০২৪ সালে চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়ায় ২৯৫ বিলিয়ন ডলারে, যা মার্কিন অর্থনীতির প্রায় ১ শতাংশের সমান।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে চীনের ওপর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ শুল্কারোপ করেছিলেন। পরে জো বাইডেনের প্রশাসন তা অব্যাহত রাখে।
এই বাণিজ্য বাধাগুলো চীন থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি ২০১৬ সালের ২১ শতাংশ থেকে কমিয়ে গত বছর ১৩ শতাংশে নামিয়ে আনতে সাহায্য করে। গত এক দশকে চীনের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য নির্ভরশীলতা কমেছে।
উদাহরণস্বরূপ, ২০১৮ সালে ট্রাম্প প্রশাসন চীনা সৌর প্যানেল আমদানির ওপর ৩০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছিল। চীনও এর প্রত্যুত্তর দিয়েছে কৌশলে। মার্কিন বাণিজ্য বিভাগের ২০২৩ সালের তথ্যমতে, চীনা সৌর প্যানেল নির্মাতারা তাদের সংযোজন কার্যক্রম মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনামের মতো দেশগুলোতে সরিয়ে নিয়েছে এবং তারপর ওই দেশগুলো থেকে ফিনিশড পণ্যগুলো আমেরিকায় পাঠিয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসন বেইজিংয়ের ওপর ইতোমধ্যেই যে ২০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছিল, তার কারণে চীন থেকে আসা এই সমস্ত আমদানিকৃত পণ্য আমেরিকানদের জন্য বেশ ব্যয়বহুল হয়ে ওঠার কথা ছিল। এরপর শুল্কযুদ্ধ শুরু হলে তা বাড়িয়ে ১২৫ শতাংশে এবং এমনকি কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে ১৪৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছিল। চীনও প্রতিশোধমূলক শুল্কারোপ শুরু করে।

আমেরিকা ও চীনের মধ্যকার বাণিজ্য যুদ্ধ বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি ও অর্থনীতিতে এক নতুন মোড় এনেছে। বাণিজ্য যুদ্ধের ফলে আমেরিকা চীনের ওপর শুল্কারোপ করলে চীন বসে থাকেনি। তারা তাদের রপ্তানি বাজারে বৈচিত্র্য ঘটিয়েছে। আমেরিকা নির্ভরতা কমিয়ে চীন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর সাথে বাণিজ্য বাড়িয়েছে। ২০২০ সালে ইইউকে ছাড়িয়ে আসিয়ান চীনের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার হয়ে ওঠে। এটি চীনের বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে সাহায্য করেছে।
আমেরিকা যখন হুয়াওয়ে বা সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়, তখন চীন নিজের প্রযুক্তি নিজে তৈরির ওপর জোর দেয়। ‘মেইড ইন চায়না ২০২৫’ প্রকল্পের মাধ্যমে তারা চিপ ও হাই-টেক শিল্পে বিনিয়োগ বাড়ায়। অনেক উন্নয়নশীল দেশ এখন পশ্চিমা দামি প্রযুক্তির বিকল্প হিসেবে চীনের সাশ্রয়ী ও শক্তিশালী প্রযুক্তির ওপর আস্থা রাখছে।
আমেরিকা যখন ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির অজুহাতে প্যারিস জলবায়ু চুক্তির মতো বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চুক্তি থেকে সরে আসছিল, চীন তখন বিআরআই এবং রিজিওনাল কম্প্রেহেন্সিভ ইকোনোমিক পার্টনার প্রোগ্রামের মাধ্যমে বিশ্বের সামনে নিজেকে একজন নির্ভরযোগ্য বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে তুলে ধরেছে। ফলে বিশ্বের অনেক দেশ চীনের দিকে ঝুঁকে পড়েছে।
বাণিজ্য যুদ্ধের চাপে চীন ও তার মিত্র দেশগুলো ডলারের পরিবর্তে ইউয়ানে বাণিজ্যের দিকে ঝুঁকছে। এর প্রমাণ পাওয়া যায় হরমুজ প্রণালীতে ইরানের অবরোধ আরোপের পর ইউয়ানই সেখানে মুক্তির উপায় হিসেবে হাজির হয়, যা চীনের কূটনৈতিক শক্তির পরিচায়ক।
গত কয়েক দশকে চীন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। তাদের এই উত্থান কেবল সংখ্যার বিচারে নয়, বরং বিশ্বব্যবস্থায় এক কাঠামোগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। বিআরআইয়ের মাধ্যমে এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের দেশগুলোর অবকাঠামো উন্নয়নে বিপুল বিনিয়োগ করে চীন বৈশ্বিক বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ হাতে নিয়েছে।
পাশাপাশি নিজস্ব প্রযুক্তিতে উন্নত যুদ্ধবিমান, নৌবহর ও হাইপারসনিক মিসাইল তৈরির মাধ্যমে চীন এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক ভারসাম্য বদলে দিচ্ছে। অন্যদিকে অন্যান্য দেশগুলো এই বলয়ের মধ্যে ক্রমে ঢুকে পড়ছে। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের বলয়টি ধীরে হলেও ছোট হয়ে আসছে।
উৎপাদনমুখী অর্থনীতি থেকে প্রযুক্তিনির্ভর পরাশক্তিতে রূপান্তরের মাধ্যমে চীন বিশ্বমঞ্চে এক অপরিহার্য ও প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
এখন গল্পের শুরুতে চলে যাই গ্রিক দেবতা ‘জিউস’ এর কথা বলেছিলাম। এই প্রতিবেদনে চীনের গত কয়েক দশকে বহির্বিশ্বের সঙ্গে সামগ্রিক অবস্থান দেখে বোঝা যায়, দেশটি অন্যান্য দেশের অর্থনীতি এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে আষ্টে-পিষ্টে জড়িয়ে রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়া এবং ইউরোপের সঙ্গে একছত্র ব্যবসা ধরে রেখেছে চীন। অন্যদিকে আফ্রিকার দেশগুলোতে চীন হয়ে উঠেছে বড় ঋণদাতা বন্ধু হিসেবে। এ হিসেব কষে দাঁড়ায় এটা যদি উক্ত দেশগুলো হয় একটি মানব কোষ তাহলে চীন এই কোষের মাইট্রোকন্ডিয়া।
এবার আসা যাক শুরুতে বলা জিউসের প্রসঙ্গে। গ্রিক মিথ অনুযায়ী, জিউস অলিম্পিয়ানদের রাজা, মাউন্ট অলিম্পাসের শাসক এবং আকাশ ও বজ্রের দেবতা। জিউস দেবকূলে তার প্রভাব বিস্তার করেছিলেন তার বজ্রের ব্যবহারের মধ্য দিয়ে এক ধরনের রুদ্রমূর্তি উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে। পাশাপাশি জিউসের স্ত্রী হেরার প্রভাবও দেবকূলে নিজের প্রভাব বিস্তারে খুবই কৌশলের সঙ্গে কাজে লাগিয়েছিলেন। চীনের সঙ্গে জিউসের তুলনাটি আসছে মুখ্যত বিভিন্ন দেবতার সঙ্গে জিউসের সম্পর্ক, সেই সম্পর্কের ব্যবহার এবং নিজের শক্তি-সামর্থ্যের প্রয়োগের মধ্য দিয়ে। চীনও ঠিক একই কাজ করছে। এখন পর্যন্ত অবশ্য রণক্ষেত্রে চীনের সরাসরি উপস্থিতি সীমিত। কিন্তু ইরান যুদ্ধে পরোক্ষে অবস্থান নিয়ে চীন তার কূটনৈতিক ও সামরিক সক্ষমতার পরিচয় বিশ্বের সামনে বেশ জোরালোভাবে হাজির করেছে।
খুব সহজ দৃষ্টিতে তাকালে দেখা যায়, দক্ষিণ এশিয়া হোক, কিংবা আফ্রিকা, বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের দেশগুলো ক্রমেই চীনা বলয়ে ঢুকে পড়ছে। এখনো সেই অর্থে ‘পোল’ বা মেরু দৃষ্টিগ্রাহ্য না হলেও সকল সম্ভাবনা দৃষ্টিগ্রাহ্য হচ্ছে ক্রমেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের দ্বিমেরু বৈশ্বিক কাঠামো সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর একমেরু কাঠামোয় রূপান্তরিত হয়। বার্লিন দেয়ালের পতনের পর তিন দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। এই পুরো সময়টা এবং এখন পর্যন্ত একক মেরু হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র টিকে আছে। কিন্তু আগেই বলা হয়েছে এই কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে চীন–দেশ হিসেবে এবং বৈশ্বিক নানা প্রকল্পের মধ্য দিয়ে। এই চ্যালেঞ্জ শেষ পর্যন্ত নয়া কাঠামোর উদ্বোধন করবে নাকি, যুক্তরাষ্ট্রের মরিয়া চেষ্টায় একমেরু আরো কিছুকাল রাজ করবে, সে সিদ্ধান্তে এখনো আসার সুযোগ নেই। কিন্তু সকল চিহ্ন প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে।
চীন এ ক্ষেত্রে তার বাণিজ্যিক প্রকল্প, এআইআইবি, এনডিবি, বিআরআই, পুরনো সিল্করুটের পুনরুদ্ধার শুধু নয়, সম্প্রসারণ, দ্বিপক্ষীয়-বহুপক্ষীয় নানা চুক্তি ও বিনিয়োগের মধ্য দিয়ে কূটনৈতিক সম্প্রসারণ ঘটাচ্ছে। আর সামরিক সক্ষমতায় দেশটি যে অনেক এগিয়েছে, তা হলের ইরান যুদ্ধ বলি বা ভারত-পাকিস্তানের সর্বশেষ মুখোমুখি সংঘাতেই প্রকাশ্যে এসেছে। বৈশ্বিক সমরাস্ত্রের দুনিয়ায় দেশটি ক্রমেই তার অবস্থানকে দৃঢ় করছে। অস্ত্র বাজারেরও একটা বড় ভাগ সে চায়। ফলে জিউসের বজ্র ও সম্পর্কের বিস্তারের মধ্য দিয়ে আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার উভয় কৌশলই সে প্রয়োগ করছে। মিত্রের সম্প্রসারণের মধ্য দিয়ে চীন বৈশ্বিক আস্থা অর্জনের পাশাপাশি নিজেদেরকে ‘গ্লোবাল প্লেয়ার’ হিসেবে আবির্ভুত করেছে। যখন আমেরিকা শুল্ক, যুদ্ধ, নিষেধোজ্ঞা নিয়ে দিন সাজাচ্ছে, সেখানে চীন বরাবরই বন্ধুত্ব, চুক্তি, বাণিজ্য দিয়ে সম্পর্ক মজবুত করছে।
ইতিহাসের পাতায় ক্রোনোস আর জিউসের যে ক্ষমতার পালাবদল আমরা দেখেছি, সমকালীন ভূ-রাজনীতিতে তারই এক আধুনিক সংস্করণ মঞ্চস্থ হচ্ছে। আমেরিকার নিষেধাজ্ঞার ‘ব্যারিকেড’ যখন বিভাজন তৈরি করছে, চীন তখন বাণিজ্য আর আস্থার ‘সেতু’ দিয়ে সাজাচ্ছে নতুন বিশ্বব্যবস্থা। ক্যাপিটালিজমের এই দীর্ঘ দৌড়ে চীন শেষ পর্যন্ত ‘জিউস’ হয়ে উঠতে পারবে, আর যুক্তরাষ্ট্র কি ক্রোনাসের ভাগ্য বরণ করবে–তা সময়ই বলে দেবে।

‘জিউস’কে গ্রিক দেবতাদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যিনি গ্রিক পুরাণে অলিম্পিয়ানদের রাজা, মাউন্ট অলিম্পাসের শাসক এবং আকাশ ও বজ্রের দেবতা হিসেবে পরিচিত। ‘জিউস’ ক্ষমতায় বসেছিলেন তার বাবা ক্রোনাসকে ক্ষমতাচ্যুত করে। ঠিক এভাবেই তিনি পৃথিবীর মানুষ ও অমর দেবতা–উভয়কেই নিয়ন্ত্রণ করতেন।
এই সময়ে হঠাৎ করে জিউসের গল্প কেন? এটা কি নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে, নাকি অন্য কোনো কারণে–তা বুঝতে হলে পুরো আলাপ শুনতে হবে।
আধুনিক বিশ্বব্যবস্থায় প্রতিটি দেশ পরস্পরের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে যুক্ত। কেউ কাউকে ছেড়ে চলতে পারে না। ফলে কেউ আক্রান্ত হলে, তা ওই সীমাতেই আর আটকে থাকে না। এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে সারা বিশ্বে। তবে বর্তমান সময়ে তা অনেকটাই মাল্টিপোলার ব্যবস্থা হয়ে যাচ্ছে। এই বিশ্বব্যবস্থার মধ্যে চীন রয়েছে স্ট্রাইকার অবস্থানে। যেখানে সে হয়তো খেলার বদলি খেলোয়াড় হিসেবে ৭০ মিনিটের দিকে মাঠে অবতরণ করবে। আর তার এই মাঠে প্রবেশেই হয়তো নতুন ইতিহাস লিখে দিবে।
বিশ্বের অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হতে ৭০ বছরেরও কম সময় লেগেছে দেশটির। এই রূপান্তর এশীয় দেশগুলোর মধ্যে দৈত্যাকার অর্থনীতির রাষ্ট্রে পরিণত করেছে চীনকে। গত ৪৫ বছরে চীন বাণিজ্য পথ ও বিনিয়োগ প্রবাহ উন্মুক্তের জন্য ধারাবাহিক কিছু সংস্কার প্রবর্তন করেছে। যা শেষ পর্যন্ত কোটি কোটি মানুষকে দারিদ্র্য থেকে মুক্তি দিয়েছে।
১৯৫০-এর দশকে চীনে ভয়াবহ মানবসৃষ্ট বিপর্যয় দেখা দিয়েছিল। বিপ্লবের পর মাও জেদং কৃষিনির্ভর অর্থনীতিকে দ্রুত শিল্পায়িত করতে ‘দ্য গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড’ শীর্ষক একটি উদ্যোগ নেন। কিন্তু তা সফল হয়নি। এর ফল দাঁড়ায় ১৯৫৯ থেকে ১৯৬১ সালের মধ্যে দুর্ভিক্ষে দেশটির ১ থেকে ৪ কোটি মানুষের মৃত্যু হয়, যা মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় দুর্ভিক্ষের একটি।
এর পরপরই ১৯৬০-এর দশকে শুরু হয় সাংস্কৃতিক বিপ্লব, যা অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। পাশাপাশি এটি দেশের সামাজিক কাঠামোর অধিকাংশই ধ্বংস করে দিয়েছিল। এরপর চীন ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে।
১৯৭৬ সালে মাও-এর মৃত্যুর পর দেং শিয়াওপিংয়ের নেতৃত্বে শুরু হওয়া সংস্কার কর্মসূচি চীনের অর্থনীতিকে নতুন রূপ দিতে শুরু করে। কৃষকদের নিজস্ব জমিতে চাষাবাদের অধিকার দেওয়া হয়, যা জীবনযাত্রার মান উন্নত করে এবং খাদ্য সংকট দূর করতে সাহায্য করে। ১৯৭৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর বিদেশি বিনিয়োগের দুয়ার খুলে যায়। সস্তা শ্রম এবং কম ভাড়ার সুযোগ নিতে বিনিয়োগকারীরা দেশটিতে প্রচুর অর্থ লগ্নি করতে শুরু করে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের গ্লোবাল প্রধান অর্থনীতিবিদ ডেভিড মান বলেন, “সত্তরের দশকের শেষভাগ থেকে আমরা এমন এক অর্থনৈতিক বিস্ময় দেখেছি, যা ইতিহাসের যেকোনো অর্থনীতির তুলনায় অনেক বেশি আকর্ষণীয়।”

নব্বইয়ের দশকজুড়ে চীন দ্রুতগতিতে প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে থাকে। ২০০১ সালে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় যোগদান দেশটির অর্থনীতিতে নতুন গতি আনে। অন্যান্য দেশের সাথে বাণিজ্য বাধা দূর হয় এবং শুল্ক কমে যাওয়ায় খুব দ্রুতই চীনা পণ্য বিশ্বের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে।
লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের কিছু পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায়, ১৯৭৮ সালে চীনের রপ্তানির পরিমাণ ছিল মাত্র ১ হাজার কোটি ডলার, যা তৎকালীন বিশ্ব বাণিজ্যের ১ শতাংশেরও কম।
১৯৮৫ সালের মধ্যে চীনের রপ্তানি ২ হাজার ৫০০ কোটি ডলারে পৌঁছায়। এর দুই দশকেরও কম সময়ের মধ্যে রপ্তানির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৪ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলারে।
বর্তমান সময়ে অর্থনৈতিক সংস্কার চীনের কোটি কোটি মানুষের ভাগ্য বদলে দিয়েছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, প্রায় ৮৫ কোটি মানুষকে দারিদ্র্যসীমার ওপর তুলে আনা হয়েছে।
একইসঙ্গে শিক্ষার হারও বেড়েছে ব্যাপক হারে। ‘স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড’-এর প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে চীনের কর্মীবাহিনীর প্রায় ২৭ শতাংশ উচ্চশিক্ষিত (বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষা) হবে। বর্তমানে দেশটিতে উচ্চশিক্ষিত কর্মী আছে মোট কর্মীবাহিনীর ২১ দশমিক ৮ শতাংশ, যা জার্মানির এখনকার হারের সমান।
বিশ্বব্যাংক বলছে, চীনের মাথাপিছু আয় এখনো একটি উন্নয়নশীল দেশের মতোই এবং উন্নত অর্থনীতিগুলোর গড় আয়ের চার ভাগের এক ভাগেরও কম। বিশ্বব্যাংকের ২০২৪ সালের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চীনের বার্ষিক গড় আয় প্রায় ১৩ হাজার ৩০৩ ডলার, যা ২০২০ সালেও ছিল ১০ হাজার মার্কিন ডলার।
বিশ্বজুড়ে দেশগুলো যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যুদ্ধে টালমাটাল, ঠিক সেই সময়েই বছরের প্রথম তিন মাসে চীনের অর্থনীতি প্রত্যাশার চেয়েও দ্রুত গতিতে বেড়েছে।

চীনা সরকারি তথ্যের বরাত দিয়ে বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এই মেয়াদে দেশটির জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৫ শতাংশে দাঁড়ায়।
একুশ শতকের প্রথম দশকে চীন আন্তর্জাতিক নিয়ম ও নীতি মেনে চলতে আগ্রহী থাকলেও সময়ের সঙ্গে বদল ঘটে। অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বেইজিং বিশ্ব পরিচালনায় আরও সক্রিয় হতে শুরু করে। এই সক্রিয়তা বিদ্যমান প্রতিষ্ঠান ও নিয়মগুলোকে চ্যালেঞ্জ করার পাশাপাশি নিজে নেতৃত্বের আসনে বসার সম্ভাবনারও জানান দেয়। এই শক্তি বৃদ্ধিতে চীন চারটি উপায়কে কাজে লাগিয়েছে–
১. আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে বড় ভূমিকা নেওয়া
২. নিজেদের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের প্রচার
৩. নিজস্ব কিছু সংস্থা তৈরির ভিত্তি স্থাপন
৪. মাঝেমধ্যে বিশ্ব পরিচালনার নিয়মগুলোকে ভিন্ন পথে পরিচালনা
২০১০ সালে চীন জাপানকে ছাড়িয়ে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হয় এবং বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলে (আইএমএফ) তৃতীয় সর্বোচ্চ ভোটের অধিকার অর্জন করে। এই সময়ের মধ্যেই চীনা নাগরিকরা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার উচ্চপদে আসীন হতে শুরু করে। ২০০৬ সালে মার্গারেট চ্যান বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক নিযুক্ত হন। দায়িত্ব পালনকালে তিনি বেইজিংয়ের বেশ কিছু লক্ষ্যকে সমর্থন করেন, যার মধ্যে ছিল চীনা চিকিৎসাবিদ্যাকেও প্রচারের পরিকল্পনা।
২০০৮ সালের অর্থনৈতিক মহামন্দার সময় বেইজিং সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রতিক্রিয়া সমন্বয়ের প্রচেষ্টায় অংশ নেয়। ২০০৮ সালের জি-২০ সম্মেলনে যোগ দেওয়ার আগে চীন যুক্তরাষ্ট্রের একটি বৃহৎ ও সমন্বিত আর্থিক প্যাকেজের আহ্বানে সাড়া দেয়।
সংবাদমাধ্যম ফ্রান্স২৪-এর এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, নিজ দেশে বেইজিং তাদের অর্থনীতির জন্য ৫৮০ বিলিয়ন ডলারের একটি প্যাকেজ চালু করে ২০০৮ সালে। এরপর বেইজিং রাষ্ট্রীয় প্রচারমাধ্যম এবং অন্যান্য মাধ্যম ব্যবহার করে বিশ্বের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে চীনের ভূমিকার কথা বৈশ্বিক পরিসরে তুলে ধরে।
এই সময়ে বেইজিং-নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠান তৈরি হতে থাকে, যা ২০১০-এর দশকে আরো বিস্তৃত হয়। এর আগের দশকেই বেইজিং ‘সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন’ প্রতিষ্ঠা করেছিল। পূর্ববর্তী সাংহাই ফাইভ গ্রুপের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হওয়া এ সংস্থা চীন, রাশিয়া ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলোকে একত্রিত করে। ২০১০-এর দশকে এ সংস্থা বিদ্যমান বৈশ্বিক নিয়মগুলোকে চ্যালেঞ্জ করার একটি মাধ্যমে পরিণত হয়। উদাহরণ হিসেবে একটি বৈশ্বিক ও উন্মুক্ত ইন্টারনেট ব্যবস্থার বদলে চীনের সরকার-নিয়ন্ত্রিত ইন্টারনেট ব্যবস্থার ধারণা প্রচারের কথা উল্লেখ করা যায়।
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ও বারাক ওবামার অধীনে ওয়াশিংটনের বিশ্বাস ছিল–বেইজিং ক্রমশ বিশ্ব পরিচালনার নিয়ম ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমর্থন করবে। ২০০৫ সালে মার্কিন উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী রবার্ট জোলিক চীনকে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় একজন ‘দায়িত্বশীল অংশীদার’ হওয়ার জন্য প্রকাশ্যে আহ্বান জানান।
এর বিপরীতে, ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন বিদ্যমান নিয়মগুলো ক্ষুণ্ন করার বিষয়ে চীনা প্রচেষ্টা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে। বেইজিং যেভাবে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবহার করে তাদের পররাষ্ট্রনীতি এবং বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) মতো কর্মসূচিগুলো প্রচার করছিল, তার বিরুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসন অবস্থান নেয়।
অন্যদিকে, ২০১৩ সালে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং যখন এই প্রকল্পের ঘোষণা দেন, তখন ওবামা প্রশাসন একে সরাসরি সামরিক সংঘাত হিসেবে না দেখলেও ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করেছিল।
ওবামা প্রশাসনের প্রতিক্রিয়ার মূল ভিত্তি ছিল ‘পিভট টু এশিয়া’ নীতি। এর প্রধান লক্ষ্য ছিল এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং চীনের ক্রমবর্ধমান আধিপত্য ঠেকানো।
এর মধ্যে ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ ছিল ওবামার তুরুপের তাস। এর লক্ষ্য ছিল চীনের অর্থনৈতিক বলয়ের বাইরে ১২টি দেশের মধ্যে একটি শক্তিশালী বাণিজ্য জোট গঠন করা, যেখানে বাণিজ্যের নিয়মাবলী চীন নয় বরং যুক্তরাষ্ট্র নির্ধারণ করে। চীন যখন এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) গঠন করে, তখন ওবামা প্রশাসন যুক্তরাজ্য, জার্মানির মতো মিত্রদেশগুলোকে এতে যোগ না দিতে প্ররোচিত করেছিল। যদিও অনেক দেশ শেষ পর্যন্ত যোগ দিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছিল, চীনের প্রকল্পগুলো স্বচ্ছ নয় এবং এটি দেশগুলোকে ‘ঋণের ফাঁদে’ ফেলবে। পরিবর্তে ওবামা স্বচ্ছতা ও টেকসই উন্নয়নের ওপর জোর দিয়েছিলেন।
ওবামা সরাসরি বিআরআই বন্ধের চেষ্টা না করলেও টিপিপি এবং পিভট টু এশিয়া নীতির মাধ্যমে চীনের এই অর্থনৈতিক বিস্তারের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী বিকল্প তৈরি করতে চেয়েছিলেন।
চীনের জিয়াং জেমিনের উত্তরসূরি হু জিনতাওয়ের শাসনামলে চীন আন্তর্জাতিক নিয়মগুলোকে আরো বেশি করে চ্যালেঞ্জ করতে শুরু করে। দক্ষিণ চীন সাগরের বিতর্কিত অঞ্চলগুলোর ওপর বেইজিং তাদের সার্বভৌমত্বকে প্রধান স্বার্থ এবং অ-আলোচনাযোগ্য হিসেবে দাবি করে। যদিও তারা সে সময় অন্য দাবিদারদের সাথে আলোচনায় অংশ নিচ্ছিল। ফোর্বস ম্যাগাজিনের তথ্যমতে, বেইজিং দক্ষিণ চীন সাগরে তাদের প্রভাবও বিস্তার করে বিতর্কিত দ্বীপ ও কৃত্রিম কাঠামোর ওপর সামরিক স্থাপনা তৈরি করে এবং বিশ্বজুড়ে তাদের বৈদেশিক সাহায্যের পরিমাণ বৃদ্ধি করে।
চীনের সঙ্গে বিশ্বের সকল দেশের সম্পর্ক মিশ্র। তবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পরবর্তী সময়ে আধুনিক চীনকে নতুনভাবে চিনছে পৃথিবী।
এশিয়া সোসাইটি পলিসি ইনস্টিউটের তথ্যমতে, ২০২২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেন আক্রমণের ঠিক দুই সপ্তাহ আগে ভ্লাদিমির পুতিন ও শি জিনপিং বেইজিংয়ে একটি ঘোষণাপত্র স্বাক্ষর করেন। এর শিরোনাম ছিল–‘আন্তর্জাতিক সম্পর্ক: একটি নতুন যুগে পদার্পণ এবং বৈশ্বিক টেকসই উন্নয়ন বিষয়ে রুশ ফেডারেশন ও গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের যৌথ বিবৃতি।’ উভয় দেশের ভাষায় প্রকাশিত সেই বিবৃতিতে ঘোষণা করা হয়, রাশিয়া ও চীনের মধ্যে এই নতুন সম্পর্ক ‘স্নায়ু যুদ্ধ আমলের রাজনৈতিক ও সামরিক জোটগুলোর চেয়েও শ্রেষ্ঠ’।
এতে জোর দিয়ে বলা হয়, তাদের বন্ধুত্বের ‘কোনো সীমা নেই’; সহযোগিতার ক্ষেত্রে ‘কোনো নিষিদ্ধ এলাকা নেই’ এবং তাদের ক্রমবর্ধমান কৌশলগত সমন্বয় কোনো তৃতীয় পক্ষের বিরুদ্ধে পরিচালিত নয়; কিংবা বৈশ্বিক পরিস্থিতির পরিবর্তন দ্বারা সীমাবদ্ধ নয়।
এরপর আরো কিছু ঘোষণাপত্র এলেও সেগুলোতে সব সময় সহযোগিতার সেই ‘নিষিদ্ধ এলাকা নেই’ কথাটির উল্লেখ পাওয়া যায়নি। নাৎসি জার্মানির বিরুদ্ধে বিজয়ের ৮০তম বার্ষিকী স্মরণে ২০২৫ সালের ৮ থেকে ১০ মে শি-র মস্কো সফরকালে রুশ প্রেসিডেন্টের সাথে বেশ কিছু নথি স্বাক্ষরিত হয়। রাশিয়া ৯ মে-এর সামরিক কুচকাওয়াজে শি-সহ প্রায় ২০ জন রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানকে সম্মানিত অতিথি হিসেবে স্বাগত জানায় এবং মস্কোর রেড স্কয়ারে চীনা সেনারা মার্চ করে।
কূটনৈতিকভাবে, এই নথিগুলো তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সম্পর্কে স্পষ্ট হলেও এতে এমন কোনো বাধ্যতামূলক বিধান নেই, যা একে একটি আনুষ্ঠানিক জোটে রূপ দেবে বা কোনো চুক্তি স্বাক্ষরের বাধ্যবাধকতা তৈরি করবে। ফলে একটি কৌশলগত অস্পষ্টতা বজায় রয়েছে। তবে আলোচনার মাধ্যমে এটুকু বোঝা যায়–চীনের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্ক যেকোনো সময়ের চেয়ে অনন্য মাত্রায় রয়েছে।
স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (সিপরি) প্রকাশিত এক জার্নালের তথ্যমতে, ২০১৫ সালে চীন আনুমানিক ২৫০ কোটি ডলার মূল্যের ২৪টি এসইউ-৩৫ মাল্টিরোল ফাইটার জেটের জন্য একটি চুক্তি আলোচনা ও স্বাক্ষর করে। এর সরবরাহ ২০১৬ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে সম্পন্ন হয়েছিল।
অন্যদিকে সিএসআইএস মিসাইল প্রোজেক্ট পরিচালিত মিসাইল থ্রেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৪ সালে রাশিয়ার সঙ্গে দেশটির এস-৪০০ চুক্তি সম্পন্ন হয়। ৩০০ কোটি ডলারের এই চুক্তির মাধ্যমে একাধিক রেজিমেন্ট সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। যা ছিল এই উন্নত ব্যবস্থার প্রথম কোনো রপ্তানি। ২০১৮ সাল থেকে এর সরবরাহ শুরু হয়, যা চীনের আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতাকে পূর্বের এস-৩০০ এর তুলনায় আরও বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত করে।
১৯৯০-এর দশক এবং ২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে রাশিয়ার আমদানির ওপর চীনের নির্ভরতা ছিল প্রবল। ২০০৯ সালের পূর্ববর্তী ১৫ বছরে চীনের প্রধান সমরাস্ত্র সংগ্রহের প্রায় ৮৫ শতাংশই ছিল রাশিয়ার।
বিশ্বে ইরান-আমেরিকা যুদ্ধ চলছে। তার আগেও আমেরিকা রাশিয়া ও ইরানের ওপর সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছিল। এরপরও চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রাণালয়ের তথ্যমতে, ২০২৪ সালে চীন ও ইরানের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ ১৩ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। এর মধ্যে চীনের রপ্তানি ছিল ৮ দশমিক ৯৩ বিলিয়ন ডলার এবং আমদানি ছিল ৪ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলার। ২০২১ সালের মার্চে চীন-ইরান একটি সহযোগিতা পরিকল্পনা স্বাক্ষর করে। ২০২২ সালের জানুয়ারিতে উভয় পক্ষ এই সহযোগিতা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরুর ঘোষণা দেয়।
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, যুক্তরাজ্য ও চীনের মধ্যে ঘনিষ্ঠ জনযোগাযোগ এবং সাংস্কৃতিক বিনিময় রয়েছে।
দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার ও পুনর্গঠনের লক্ষ্যে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার গত ২৮ থেকে ৩১ জানুয়ারি চীন সফর করেন। ২০১৮ সালের পর এই প্রথম কোনো ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চীন সফর করলেন। তার এই সফরের মাধ্যমে একটি ‘প্র্যাগম্যাটিক রিসেট’ নিশ্চিত হয়েছে। ফলে ২২০ কোটি ডলারের রপ্তানি চুক্তি এবং ২৩০ কোটি ডলারের বাজার সুবিধা পাওয়ার চুক্তি স্বাক্ষর হয়। এই চুক্তিগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, গাড়ি নির্মাণ, পরিবেশবান্ধব জ্বালানি, অর্থায়ন, স্বাস্থ্যসেবা ও ফার্মাসিউটিক্যালসের মতো বেশ কিছু কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রকে অন্তর্ভুক্ত করেছে।

অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের তথ্যমতে, পণ্য ও পরিষেবার বাণিজ্যের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের পর চীন ইউরোপীয় ইউনিয়নের তৃতীয় বৃহত্তম অংশীদার। তবে শুধু পণ্য বাণিজ্যের দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রর পর চীনই ইইউর দ্বিতীয় বৃহত্তম অংশীদার।
চীন থেকে ইইউর আমদানির পরিমাণ অনেক দিন ধরেই উচ্চ। রপ্তানির ক্ষেত্রে চীন ইইউ-এর তৃতীয় বৃহত্তম অংশীদার এবং আমদানির ক্ষেত্রে বৃহত্তম। ২০২৪ সালে চীন-ইইউ বাণিজ্যে ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৩৫৯.৮ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৩ সালের ৩৫০.৩ বিলিয়ন ডলারকে ছাড়িয়ে যায়। ২০২৪ সালে ইইউ থেকে চীনে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ২৫১.২১ বিলিয়ন ডলার, অন্যদিকে চীন থেকে ইইউ-এর আমদানির পরিমাণ ছিল ৬১২.৬ বিলিয়ন ডলার।
এশিয়ার ক্ষেত্রে চীনের আধিপত্য বলয় বেড়েছে অত্যধিকভাবে। চীনের সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালের একই সময়ের তুলনায় ২০২৫ সালের প্রথম ১০ মাসে মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে চীনের বাণিজ্য বৃদ্ধি পেয়েছে।
ইউরেশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক তাদের এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ২০২৫ সালের মাঝামাঝি নাগাদ মধ্য এশিয়ার দেশগুলোতে চীনের মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ৩৫.৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা ২০২০ সালের তুলনায় ১ দশমিক ৫ গুণ বেশি। গত ১৮ মাসে এই বিনিয়োগের প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে, যা ১৩ শতাংশ বেড়েছে।
কাজাখস্তানে ১১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। উজবেকিস্তানে ১০ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার। তুর্কমেনিস্তানে ৯ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। তাজিকিস্তানে ২ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার। কিরগিজস্তানে ২ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার।
চীনের প্রভাব দক্ষিণ এশিয়ায়ও ক্রমশ বাড়ছে। জিআইএস রিপোর্টসের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ভুটান ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় সব দেশেরই বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার এখন চীন। ২০২৪ সালে চীন ও দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ২০০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা গত এক দশকে দ্বিগুণ হয়েছে এবং এর গড় বার্ষিক বৃদ্ধির হার ৬ দশমিক ৩ শতাংশ।
এর মধ্যে ভারতের সঙ্গে চীনের বাণিজ্য ছিল ১০০ বিলিয়ন ডলার, পাকিস্তানের সঙ্গে ২৩ বিলিয়ন, বাংলাদেশের সঙ্গে ২৭ বিলিয়ন, শ্রীলঙ্কার সঙ্গে ৫ বিলিয়ন, নেপালের সাথে দেড় বিলিয়ন এবং মালদ্বীপের সঙ্গে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য। এই অর্থনৈতিক সংহতির অর্থ হলো–চীনের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা এই দেশগুলোর জন্যই বেশি ক্ষতিকর হবে।
ভারত বাদে দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী প্রায় সব দেশেই চীন প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের প্রধান সরবরাহকারী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র যেখানে দেশগুলোকে মার্কিন অস্ত্র কেনার জন্য সামরিক সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থানে থাকে, সেখানে বেইজিংয়ের সহজ শর্তের ঋণ দেশগুলোকে চীনা অস্ত্র কিনতে উৎসাহিত করে।
চীনের বৃহত্তম অস্ত্র ক্রেতা পাকিস্তান ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত চীনের মোট অস্ত্র বিক্রির দুই-তৃতীয়াংশ দখল করে ছিল। ঘনিষ্ঠ সামরিক সম্পর্কের পাশাপাশি দেশ দুটির মধ্যে পারমাণবিক প্রযুক্তিতেও শক্তিশালী বন্ধন রয়েছে। এ ছাড়া ২০১৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশও তার প্রয়োজনীয় অস্ত্রের ৭২ শতাংশ চীন থেকে সংগ্রহ করেছে।
শিক্ষা ক্ষেত্রেও চীন তার ‘সফট পাওয়ার’ বাড়িয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো থেকে হাজার হাজার শিক্ষার্থী বর্তমানে চীনের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়াশোনা করছে।
বিআরআইয়ের মাধ্যমে চীন তাদের অর্থনৈতিক প্রভাব আরো বিস্তৃত করেছে। ভারত ও ভুটান ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার বাকি সব দেশই এ প্রকল্পে অংশ নিচ্ছে। পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কা এই প্রকল্পের প্রধান অংশীদার। বিআরআইয়ের একটি ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্প হলো ‘চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর’ (সিপেক), যা ৩ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ একটি অবকাঠামো নেটওয়ার্কের মাধ্যমে চীনের জিনজিয়াং প্রদেশকে পাকিস্তানের গদর বন্দরের সাথে সংযুক্ত করবে (বর্তমানে নির্মাণাধীন)।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চীন দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে ৪৮ বিলিয়ন ডলার ঋণ দিয়েছে। এর মধ্যে পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশের বেইজিংয়ের কাছে দেনার পরিমাণ রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে। ২০২৪ সালে চীন পাকিস্তানের বৃহত্তম পাওনাদারে পরিণত হয়েছে, যার ঋণের পরিমাণ প্রায় ২৯ বিলিয়ন ডলার।
বিবিসির তথ্যমতে, দুই অর্থনৈতিক পরাশক্তির মধ্যে পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ গত বছর প্রায় ৫৮৫ বিলিয়ন ডলারে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও চীন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের আমদানির পরিমাণ ৪৪০ বিলিয়ন ডলার, যা চীনের আমেরিকা থেকে আমদানির ১৪৫ বিলিয়নের তুলনায় অনেক বেশি। ফলে ২০২৪ সালে চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়ায় ২৯৫ বিলিয়ন ডলারে, যা মার্কিন অর্থনীতির প্রায় ১ শতাংশের সমান।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে চীনের ওপর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ শুল্কারোপ করেছিলেন। পরে জো বাইডেনের প্রশাসন তা অব্যাহত রাখে।
এই বাণিজ্য বাধাগুলো চীন থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি ২০১৬ সালের ২১ শতাংশ থেকে কমিয়ে গত বছর ১৩ শতাংশে নামিয়ে আনতে সাহায্য করে। গত এক দশকে চীনের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য নির্ভরশীলতা কমেছে।
উদাহরণস্বরূপ, ২০১৮ সালে ট্রাম্প প্রশাসন চীনা সৌর প্যানেল আমদানির ওপর ৩০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছিল। চীনও এর প্রত্যুত্তর দিয়েছে কৌশলে। মার্কিন বাণিজ্য বিভাগের ২০২৩ সালের তথ্যমতে, চীনা সৌর প্যানেল নির্মাতারা তাদের সংযোজন কার্যক্রম মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনামের মতো দেশগুলোতে সরিয়ে নিয়েছে এবং তারপর ওই দেশগুলো থেকে ফিনিশড পণ্যগুলো আমেরিকায় পাঠিয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসন বেইজিংয়ের ওপর ইতোমধ্যেই যে ২০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছিল, তার কারণে চীন থেকে আসা এই সমস্ত আমদানিকৃত পণ্য আমেরিকানদের জন্য বেশ ব্যয়বহুল হয়ে ওঠার কথা ছিল। এরপর শুল্কযুদ্ধ শুরু হলে তা বাড়িয়ে ১২৫ শতাংশে এবং এমনকি কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে ১৪৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছিল। চীনও প্রতিশোধমূলক শুল্কারোপ শুরু করে।

আমেরিকা ও চীনের মধ্যকার বাণিজ্য যুদ্ধ বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি ও অর্থনীতিতে এক নতুন মোড় এনেছে। বাণিজ্য যুদ্ধের ফলে আমেরিকা চীনের ওপর শুল্কারোপ করলে চীন বসে থাকেনি। তারা তাদের রপ্তানি বাজারে বৈচিত্র্য ঘটিয়েছে। আমেরিকা নির্ভরতা কমিয়ে চীন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর সাথে বাণিজ্য বাড়িয়েছে। ২০২০ সালে ইইউকে ছাড়িয়ে আসিয়ান চীনের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার হয়ে ওঠে। এটি চীনের বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে সাহায্য করেছে।
আমেরিকা যখন হুয়াওয়ে বা সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়, তখন চীন নিজের প্রযুক্তি নিজে তৈরির ওপর জোর দেয়। ‘মেইড ইন চায়না ২০২৫’ প্রকল্পের মাধ্যমে তারা চিপ ও হাই-টেক শিল্পে বিনিয়োগ বাড়ায়। অনেক উন্নয়নশীল দেশ এখন পশ্চিমা দামি প্রযুক্তির বিকল্প হিসেবে চীনের সাশ্রয়ী ও শক্তিশালী প্রযুক্তির ওপর আস্থা রাখছে।
আমেরিকা যখন ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির অজুহাতে প্যারিস জলবায়ু চুক্তির মতো বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চুক্তি থেকে সরে আসছিল, চীন তখন বিআরআই এবং রিজিওনাল কম্প্রেহেন্সিভ ইকোনোমিক পার্টনার প্রোগ্রামের মাধ্যমে বিশ্বের সামনে নিজেকে একজন নির্ভরযোগ্য বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে তুলে ধরেছে। ফলে বিশ্বের অনেক দেশ চীনের দিকে ঝুঁকে পড়েছে।
বাণিজ্য যুদ্ধের চাপে চীন ও তার মিত্র দেশগুলো ডলারের পরিবর্তে ইউয়ানে বাণিজ্যের দিকে ঝুঁকছে। এর প্রমাণ পাওয়া যায় হরমুজ প্রণালীতে ইরানের অবরোধ আরোপের পর ইউয়ানই সেখানে মুক্তির উপায় হিসেবে হাজির হয়, যা চীনের কূটনৈতিক শক্তির পরিচায়ক।
গত কয়েক দশকে চীন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। তাদের এই উত্থান কেবল সংখ্যার বিচারে নয়, বরং বিশ্বব্যবস্থায় এক কাঠামোগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। বিআরআইয়ের মাধ্যমে এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের দেশগুলোর অবকাঠামো উন্নয়নে বিপুল বিনিয়োগ করে চীন বৈশ্বিক বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ হাতে নিয়েছে।
পাশাপাশি নিজস্ব প্রযুক্তিতে উন্নত যুদ্ধবিমান, নৌবহর ও হাইপারসনিক মিসাইল তৈরির মাধ্যমে চীন এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক ভারসাম্য বদলে দিচ্ছে। অন্যদিকে অন্যান্য দেশগুলো এই বলয়ের মধ্যে ক্রমে ঢুকে পড়ছে। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের বলয়টি ধীরে হলেও ছোট হয়ে আসছে।
উৎপাদনমুখী অর্থনীতি থেকে প্রযুক্তিনির্ভর পরাশক্তিতে রূপান্তরের মাধ্যমে চীন বিশ্বমঞ্চে এক অপরিহার্য ও প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
এখন গল্পের শুরুতে চলে যাই গ্রিক দেবতা ‘জিউস’ এর কথা বলেছিলাম। এই প্রতিবেদনে চীনের গত কয়েক দশকে বহির্বিশ্বের সঙ্গে সামগ্রিক অবস্থান দেখে বোঝা যায়, দেশটি অন্যান্য দেশের অর্থনীতি এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে আষ্টে-পিষ্টে জড়িয়ে রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়া এবং ইউরোপের সঙ্গে একছত্র ব্যবসা ধরে রেখেছে চীন। অন্যদিকে আফ্রিকার দেশগুলোতে চীন হয়ে উঠেছে বড় ঋণদাতা বন্ধু হিসেবে। এ হিসেব কষে দাঁড়ায় এটা যদি উক্ত দেশগুলো হয় একটি মানব কোষ তাহলে চীন এই কোষের মাইট্রোকন্ডিয়া।
এবার আসা যাক শুরুতে বলা জিউসের প্রসঙ্গে। গ্রিক মিথ অনুযায়ী, জিউস অলিম্পিয়ানদের রাজা, মাউন্ট অলিম্পাসের শাসক এবং আকাশ ও বজ্রের দেবতা। জিউস দেবকূলে তার প্রভাব বিস্তার করেছিলেন তার বজ্রের ব্যবহারের মধ্য দিয়ে এক ধরনের রুদ্রমূর্তি উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে। পাশাপাশি জিউসের স্ত্রী হেরার প্রভাবও দেবকূলে নিজের প্রভাব বিস্তারে খুবই কৌশলের সঙ্গে কাজে লাগিয়েছিলেন। চীনের সঙ্গে জিউসের তুলনাটি আসছে মুখ্যত বিভিন্ন দেবতার সঙ্গে জিউসের সম্পর্ক, সেই সম্পর্কের ব্যবহার এবং নিজের শক্তি-সামর্থ্যের প্রয়োগের মধ্য দিয়ে। চীনও ঠিক একই কাজ করছে। এখন পর্যন্ত অবশ্য রণক্ষেত্রে চীনের সরাসরি উপস্থিতি সীমিত। কিন্তু ইরান যুদ্ধে পরোক্ষে অবস্থান নিয়ে চীন তার কূটনৈতিক ও সামরিক সক্ষমতার পরিচয় বিশ্বের সামনে বেশ জোরালোভাবে হাজির করেছে।
খুব সহজ দৃষ্টিতে তাকালে দেখা যায়, দক্ষিণ এশিয়া হোক, কিংবা আফ্রিকা, বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের দেশগুলো ক্রমেই চীনা বলয়ে ঢুকে পড়ছে। এখনো সেই অর্থে ‘পোল’ বা মেরু দৃষ্টিগ্রাহ্য না হলেও সকল সম্ভাবনা দৃষ্টিগ্রাহ্য হচ্ছে ক্রমেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের দ্বিমেরু বৈশ্বিক কাঠামো সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর একমেরু কাঠামোয় রূপান্তরিত হয়। বার্লিন দেয়ালের পতনের পর তিন দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। এই পুরো সময়টা এবং এখন পর্যন্ত একক মেরু হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র টিকে আছে। কিন্তু আগেই বলা হয়েছে এই কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে চীন–দেশ হিসেবে এবং বৈশ্বিক নানা প্রকল্পের মধ্য দিয়ে। এই চ্যালেঞ্জ শেষ পর্যন্ত নয়া কাঠামোর উদ্বোধন করবে নাকি, যুক্তরাষ্ট্রের মরিয়া চেষ্টায় একমেরু আরো কিছুকাল রাজ করবে, সে সিদ্ধান্তে এখনো আসার সুযোগ নেই। কিন্তু সকল চিহ্ন প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে।
চীন এ ক্ষেত্রে তার বাণিজ্যিক প্রকল্প, এআইআইবি, এনডিবি, বিআরআই, পুরনো সিল্করুটের পুনরুদ্ধার শুধু নয়, সম্প্রসারণ, দ্বিপক্ষীয়-বহুপক্ষীয় নানা চুক্তি ও বিনিয়োগের মধ্য দিয়ে কূটনৈতিক সম্প্রসারণ ঘটাচ্ছে। আর সামরিক সক্ষমতায় দেশটি যে অনেক এগিয়েছে, তা হলের ইরান যুদ্ধ বলি বা ভারত-পাকিস্তানের সর্বশেষ মুখোমুখি সংঘাতেই প্রকাশ্যে এসেছে। বৈশ্বিক সমরাস্ত্রের দুনিয়ায় দেশটি ক্রমেই তার অবস্থানকে দৃঢ় করছে। অস্ত্র বাজারেরও একটা বড় ভাগ সে চায়। ফলে জিউসের বজ্র ও সম্পর্কের বিস্তারের মধ্য দিয়ে আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার উভয় কৌশলই সে প্রয়োগ করছে। মিত্রের সম্প্রসারণের মধ্য দিয়ে চীন বৈশ্বিক আস্থা অর্জনের পাশাপাশি নিজেদেরকে ‘গ্লোবাল প্লেয়ার’ হিসেবে আবির্ভুত করেছে। যখন আমেরিকা শুল্ক, যুদ্ধ, নিষেধোজ্ঞা নিয়ে দিন সাজাচ্ছে, সেখানে চীন বরাবরই বন্ধুত্ব, চুক্তি, বাণিজ্য দিয়ে সম্পর্ক মজবুত করছে।
ইতিহাসের পাতায় ক্রোনোস আর জিউসের যে ক্ষমতার পালাবদল আমরা দেখেছি, সমকালীন ভূ-রাজনীতিতে তারই এক আধুনিক সংস্করণ মঞ্চস্থ হচ্ছে। আমেরিকার নিষেধাজ্ঞার ‘ব্যারিকেড’ যখন বিভাজন তৈরি করছে, চীন তখন বাণিজ্য আর আস্থার ‘সেতু’ দিয়ে সাজাচ্ছে নতুন বিশ্বব্যবস্থা। ক্যাপিটালিজমের এই দীর্ঘ দৌড়ে চীন শেষ পর্যন্ত ‘জিউস’ হয়ে উঠতে পারবে, আর যুক্তরাষ্ট্র কি ক্রোনাসের ভাগ্য বরণ করবে–তা সময়ই বলে দেবে।