জেন জি’রা কেন ‘বস’ হতে আগ্রহী নয়

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
জেন জি’রা কেন ‘বস’ হতে আগ্রহী নয়
জেন জিদের কাছে নেতৃত্বের চেয়ারে বসা সাফল্যের পরিচয় নয়। ছবি: ফ্রিপিক

এখনকার কর্মক্ষেত্রে একটি বিস্ময়কর পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। সেটি হলো, জেন জি প্রজন্মের বহু তরুণ-তরুণী 'বস' হতে আগ্রহী নন! এমনকি এ নিয়ে তাদের তেমন কোনো আকাঙ্ক্ষাও নেই।

সম্প্রতি ডেলয়েটের ২০২৫ সালের গ্লোবাল জেন জি ও মিলেনিয়াল সমীক্ষা অনুসারে, মাত্র ৬% জেন জি কর্মীর ক্যারিয়ারের প্রাথমিক লক্ষ্য হলো, উচ্চপদস্থ নেতৃত্বে পৌঁছানো। এদিকে গ্লোবাল রিক্রুটমেন্ট সংস্থা রবার্ট ওয়াল্টারসের সমীক্ষা বলছে, ৫২% জেন জি কর্মী মাঝারি পর্যায়ের ম্যানেজার হতে চায় না। এই অবস্থা থেকে বৈশ্বিক চাকরির বাজারে নতুন একটি বিষয় বেশ জনপ্রিয় হচ্ছে। সেটি হলো, ‘কনশাস আনবসিং’।

অথচ আগের প্রজন্মের কাছে নেতৃত্বের চেয়ারে বসা মানেই ছিল সাফল্যের সবচেয়ে বড় পরিচয়। তাহলে এই প্রজন্মের দৃষ্টিভঙ্গি এত আলাদা হলো কীভাবে? এর জবাব খুঁজলে উঠে আসে কিছু প্রজন্মগত, সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, কর্মক্ষেত্রে জেন জি প্রজন্ম স্বাধীনতা ও মানসিক শান্তিকে মাপকাঠি হিসেবে দেখে। তারা চাকরিকে জীবনের কেন্দ্র নয়, বরং জীবনের একটি অংশ মনে করে। বস হওয়ার সাথে আসে অতিরিক্ত দায়িত্ব, দীর্ঘ সময় কাজ, স্ট্রেস ও সারাক্ষণ ‘ডিউটি মোড’-এ থাকার চাপ। এটি জেন জি’দের কাছে জীবনের মান কমিয়ে দেয়। তারা জানে,মানসিক স্বাস্থ্য অগ্রাধিকার পাওয়ার মতো বিষয় এবং যদি কর্মক্ষেত্রে পাওয়া নেতৃত্বের পদ তাদের শান্তি ও স্বাধীনতাকে খেয়ে ফেলে, তাহলে সেই পদ থেকে দূরে থাকাই বরং ভালো বলে মনে করে তারা!

জেন জিরা সমতাভিত্তিক কর্মসংস্কৃতি পছন্দ করে যেখানে সবাই সমানভাবে মতামত দিতে পারে, সিদ্ধান্ত নিতে পারে। ছবি: ফ্রিপিক
জেন জিরা সমতাভিত্তিক কর্মসংস্কৃতি পছন্দ করে যেখানে সবাই সমানভাবে মতামত দিতে পারে, সিদ্ধান্ত নিতে পারে। ছবি: ফ্রিপিক

জেন জি’রা ক্ষমতার কাঠামোতে কম বিশ্বাসী। তারা এমন সমতাভিত্তিক কর্মসংস্কৃতি পছন্দ করে, যেখানে সবাই সমানভাবে মতামত দিতে পারে, সিদ্ধান্ত নিতে পারে। জেন জি’দের আকর্ষণ করে এমন কর্মক্ষেত্র, যেখানে কাজের মূল্যায়ন হয় দক্ষতার ভিত্তিতে, পদবির নয়। নেতৃত্ব মানেই তাদের কাছে দূরত্ব তৈরি করা বা কর্তৃত্ব দেখানো। এজন্য তারা সেই ভূমিকা এড়িয়ে যেতে চায়।

তারা ‘ওয়ার্ক-লাইফ ফ্লেক্সিবিলিটি’–কে ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় সুবিধা মনে করে। বস হওয়া মানে অনেক ক্ষেত্রে নিজেকে নমনীয়তা বা ফ্লেক্সিবিলিটি থেকে বঞ্চিত করা। অনেক সিদ্ধান্ত তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও দৈনন্দিন কাজের চাপ তাদের ব্যক্তিগত সময়কে কমিয়ে দেয়। জেন জি বরং দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও টিম ওয়ার্ক’কে বেশি মূল্য দেয়; সিইও হওয়ার চেয়ে কোন নির্দিষ্ট কাজে একজন দক্ষ বিশেষজ্ঞ হওয়াতেও তারা সন্তুষ্ট।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রজন্ম অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে বড় হয়েছে। মহামারি, অর্থনৈতিক মন্দা, চাকরির অনিরাপত্তা, অটোমেশন ইত্যাদি তাদের মনোভাব গড়ে তুলেছে। তারা দেখে, উচ্চপদে থাকা মানুষরাও হঠাৎ চাকরি হারাচ্ছেন কিংবা কাজের চাপে মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্য হারাচ্ছেন। তাই পদোন্নতি তাদের চোখে নিরাপদ বা আকর্ষণীয় নয়।

জেন জিদের কাছে নিজের প্রজেক্টে নেতৃত্ব দেওয়া নেতৃত্বের শক্তিশালী রূপ। ছবি: ফ্রিপিক
জেন জিদের কাছে নিজের প্রজেক্টে নেতৃত্ব দেওয়া নেতৃত্বের শক্তিশালী রূপ। ছবি: ফ্রিপিক

বর্তমানে চাকরির বাজারে অবশ্য নেতৃত্বের ধারণাও বদলে গেছে। এটি এখন কেবল চেয়ারে বসে সিদ্ধান্ত নেওয়া নয়; বরং কর্মক্ষেত্রের ভিতর ও বাইরে থেকে প্রভাব তৈরি করা, মানুষের জীবনে পরিবর্তন আনা বা কোনো উদ্দেশ্যের পাশে দাঁড়ানো। এই প্রজন্ম মনে করে- ইনফ্লুয়েন্সার, উদ্যোক্তা, ফ্রিল্যান্সার কিংবা নিজের প্রজেক্টে নেতৃত্ব দেওয়া এসবই নেতৃত্বের শক্তিশালী রূপ। তাই তাদের কাছে ‘বস’ না হয়ে, ‘লিডার’ হওয়ার বিষয়টি বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে।

বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, জেন জি’দের ‘বার্নআউট’ হয়ে যাওয়ার ভয় অনেক। আগের প্রজন্ম ‘নীরবে সহ্য’ করে কাজ করত, কিন্তু জেন জি তা আর করতে রাজি নয়। তাদের কাছে সুখ, স্বাস্থ্য ও ব্যক্তিগত উন্নয়নই সাফল্যের নতুন সংজ্ঞা।

সব মিলিয়ে, জেন জি বস হতে চায় না মানে এই নয় যে, তারা দায়িত্ব নিতে পারে না বা নেতৃত্বদানে অক্ষম। বরং তারা নেতৃত্বকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে চায় কম চাপ, বেশি স্বাধীনতা আর মানবিকতার ভিত্তিতে। তারা এমন এক কর্মসংস্কৃতি তৈরি করতে চায় যেখানে নেতৃত্ব মানে ক্ষমতা নয়, বরং সহযোগিতা।

তথ্যসূত্র: ডেলয়েটের ওয়েবসাইট, টাইমস অব ইন্ডিয়া

সম্পর্কিত